#দৃষ্টির_অন্তরালে_নিস্তব্ধতা
#লেখনী_মায়মুনা_আক্তার_মারিয়া
#পর্ব:৯
শপিং করতে করতে একেকজন হাঁপিয়ে গেছে। সেই সকালে নাস্তা করে বের হয়েছে নাফিসার সাথে বাড়ির তিন মেয়ে। ফারাজকে বলা হয়েছিলো তাদের নিয়ে আসতে কিন্তু তার নির্বাচনের জন্য সে আসতে পারেনি বিকালে চলে গেলে তিন দিনের জন্য এই দিকটা সামলাতে পারবে না তাই আগে থেকে তার লোকদের সব বুঝিয়ে দিতে হবে না হয় দেখা যাবে মফিজ কিছু একটা করে বসবে আর ঝামেলা বেধে যাবে।উৎসকে জোর করে পাঠানো হয়।উৎস শপিং মলের ভেতরে ঢুকবে না বলে দেয় সে গাড়িতে বসেই অপেক্ষা করছে।কিন্তু তার ছোট মা আর বোনদের দেখা নেই এখনো আসছে না।মেয়েরা কেনাকাটা করতে বের হলে সহজে তাদের শেষ হয় না তা উৎস এখন হারে হারে বুঝতে পারছে।উৎস বিরক্ত হয়ে গাড়ি থেকে বের হয়ে ভিতরে ঢুকলো তাদের তাড়া না দিলে সারাদিন পার করবে।প্রত্যেকের গায়ে শীতের পোশাক ছিলো কিন্তু শপিং করতে গিয়ে প্রত্যেকের নাজেহাল অবস্থা।তাই সবাই সবার শীতের পোশাক খুলে হাতে নিয়ে রেখেছে।উৎস গাড়ি থেকে একটা পানির বোতল নিয়ে আসে সাথে করে। সেটা নিশাতের হাতে দিয়ে সবাইকে খেয়ে নিতে বলে।তারপর ছোট মা কে বললো,
-“তোমাদের আর কতক্ষন লাগবে?”
-“এই তো বাবা আর একটু।”
-“একটু তা কখন শেষ হবে!”
-“মেহেকের কোনো জুতোই পছন্দ হচ্ছে না।”
-“তাহলে বাড়ি চলো।”
মেহেক অবাক হয়ে বললো,
-“আমি কী খালি পায়ে থাকবো নাকি!”
-“বাসায় তো কয়েক জোড়া আছে ওইগুলো পড়বি।”
-“না আমার নতুন জুতো লাগবে।”
নিশাত বললো,
-“তোর তো পছন্দ হচ্ছে না তো যা আছে তাই পর আর ওইখানে গিয়ে যদি পছন্দ হয় তখন ওইখান থেকে কিনে দিবো।”
-“সত্যি তো। আমাকে নিয়ে যাবে তো।”
-“হুম নিয়ে যাবো।”
মেহেক রাজি হয়।সব ব্যাগ গুলো উৎসর হাতে সবাই ধরিয়ে দিয়ে গাড়ির দিকে এগোয়।এতোগুলো ব্যাগ দেখে উৎস হতবাক। সবার জন্যই কিছু না কিছু কেনা হয়েছে কিন্তু তারপরও ব্যাগ দেখে মনে হচ্ছে বিশ জনের মতো।একটা ব্যাগে যে একটা জামা এমন না দুই তিনটাও আছে!প্রত্যেকটা শপিং ব্যাগ ভারি!
বাড়িতে এসে সবাইকে সবারটা দিয়ে যার যার ব্যাগ গুছিয়ে নেয়।হঠাৎ করে এরিদের শরীর গরম হয়ে আসে।হালকা হালকা জ্বর তাই ওকে আর ওদের সাথে পাঠালো না।দুপুরের খাওয়া শেষ করে বাড়ির পাঁচ ছেলে মেয়ে বড়দের থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে যায়।
গাড়ি চলছে পদ্মা সেতুর উপর দিয়ে।উৎস ড্রাইভ করছে তার পাশের সিটে ফারাজ বসা এবং পিছনে তিন বোন বসেছে একসাথে।সেতুর দুই পাশে দেখা যাচ্ছে নদী।তিন বোন মিলে দেখছে বাহিরের প্রকৃতি আর গল্প করছে।উৎস কিছুক্ষন পরপর আড়চোখে সামনের মিররে মেহেককে দেখছে আর ফারাজ ফোন স্কল করছে।হঠাৎ মেহেকের সাথে উৎসর চোখাচোখি হয়ে যায় মেহেকের মনে পরে যায় গত রাতের মূহুর্তের কথা।মেহেক লজ্জা পেয়ে চোখ সড়িয়ে বাহিরের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে।সারা রাস্তায় উৎসর দিকে মেহেক আর তাকায় নি।
দুপুর দুটোর দিকে রওনা হয় তারা ফুপু রাহিমার বাসায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। ফুপর বাসায় আসতেই চার বোন ও তিন ভাইয়ের একটা আড্ডা হয়ে যায়। রাতে মেহেদীর অনুষ্ঠান ঘরোয়া ভাবে করা হবে।সবাই রেডি হতে চলে যায়।রাত নয়টার দিকে মেহেদী অনুষ্ঠান শুরু হয়।স্রোত সবুজ রঙের শাড়ি পড়েছে।বাকিরা যে যার পছন্দ মতো ড্রেস পড়েছে।মেহেদী দেওয়ার জন্য দুইটা মেয়ে আসবে তারা সবাইকে মেহেদী পড়িয়ে দিবে এক এক করে।মেহেদীর জন্য বাড়ির ড্রয়িং রুমটাই সাজানো হয়েছে।মেহেদীর ডালা ও বিভিন্ন খাবার স্রোতের সামনে রাখা। ক্যামেরা ম্যান ছেলেটা একেক বার একেক ভবে স্রোতের ছবি তোলায় ব্যস্ত।মেহেদী দেওয়ার আগেই কতোভাবে যে ছবি তুললো মেহেদী দেওয়ার পরতো আরো তুলবে।এরিমধ্যে মেহেদী আর্টিস চলে এসেছে। দুই জন স্রোতের দুই হাতে লাগাতে বসলো তারপর বাকি সবাইকে দিয়ে দিবে।স্রোতের কিছু কাজিন ও তার দুই বান্ধবী ব্যতিত আর কেউ নেই তবে এখানেই দশ বারো জন তো হবে।সবাই সমবয়সী কয়েক বছর এদিক ওদিক হবে।গল্পে মেতে উঠেছে সবাই।রাহিমা বেগম সবার জন্য আরো কিছু নাস্তা এনে টেবিলে রেখে বললো,
-“শুধু বোনরা মিলে গল্প করলে চলবে।তিন ভাই ঘরের মধ্যে বসে আছে।একটু নাচ গান না হলে চলে!”
মায়ের কথায় সম্মতি দিয়ে স্রোত বললো,
-“ঠিক তো।এই মেহেক আমার তিন ভাইকে ডাক দিয়ে নিয়ে আয় তো।”
-“আমি!”
-“হুমম যা।”
মেহেক উঠে ডাকতে গেলো।সিজানের ঘরের সামনে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ভেতরে ধুকে বললো,
-“তোমাদের ডাকছে।”
উৎস সিজানের ঘরের ডিভানে বসে আছে,সিজান ও ফারাজ খাটে শুয়ে কথা বলছে।নক না করে সোজা ঘরো ঢোকায় উৎস ভ্রু কুচক্রে বললো,
-“বাসা থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে ভদ্রতা কী শরবতের সাথে খেয়ে ফেলেছিস!”
শরবতের কথা বলে তাকে খোঁচা মারলো!এক গ্লাসের জায়গায় দুই গ্লাসি তো খেয়েছিলো তাতে তার কী? তার ভাগের তা তো খায়নি।তারা যখন বাসায় এসেছিলো তাদের ফুপু নাস্তার সাথে শরবত দিলে মেহেক দুই গ্লাস শরবত খায় অন্য কিছু আর খায়নি তার পানি তৃষ্ণা পেয়েছিলো।
-“আমি তো আর কারো মতো সব নাস্তা রাক্ষসের মতো একা সাভার করি নাই।”
-“আমাকে রাক্ষস বললি!”
-“আমি কি একবারও বলিছি আপনি রাক্ষস। আমি তো বলেছি যে একা সব খেয়েছে। আপনি যেহেতু নিজেই নিজেকে রাক্ষস উপাধি দিয়েছেন তাহলে সেটাই।”
উৎস রাগী স্বরে বললো,
-“মেহেক”
মেহেক অভিমানী মুখ করে তার ভাইদের কিছু বলবে তখনি দেখে তারা দুই জন ব্যতিত কেউ নেই এই ঘরে!তাদের দুই জনের কথা কাটাকাটি দেখে সিজান ও ফারাজ কখন যে বের হয়ে গেছে তারা খেয়ালি করেনি।মেহেক মুখ বাকিয়ে বিরবির করতে করতে বললো,
-“একেক সময় একেক রুপ দেখায় যত্তসব!আমার সাথে তামাশা না করে তার গফ এর সাথে করুক।”
উৎস মেহেকের পুরো কথা না শুনলেও কিছুটা শুনেছে।সে গম্ভীর স্বরে বললো,
-“আমি তামাশা করছি?”
-“আপনার নাক তো বোঁচা কানটা বোঁচা হতে পারলো না এতো খাঁড়া কান কেনো আপনার?”
উৎসকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই এক দৌড়ে তার জায়গা ত্যাগ করে।উৎস অবাক হয়ে তার ফোনের ক্যামেরায় তার মুখ দেখে।তার নাক না হয় একটু বোঁচা এই জন্য অপমান করবে ওর সাহস কতো বড়!দেখতে তো মাশাল্লাহ শুধু নাক’টাই বোঁচা হয়েছে!
মেহেককে দৌঁড়ে আসতে দেখে রোদসী বললো,
-“দৌড়াচ্ছিস কেনো?”
মেহেক রোদসীর পাশে বসে।সিজান বললো,
-“মৌমাছি তাড়া করেছিলো হয়তো তাই না মেহেক?”
মেহেক মিটিমিটি হেসে বললো,
-“জ্বি সিজান ভাই।”
স্রোত বললো,
-“আশেপাশে তো মৌমাছির চাক নেই তাহলে মৌমাছি আসলো কোথা থেকে?”
-“যেখানে ফুল আছে সেখনে মৌমাছি থাকবেই।”
উৎসর গলার শব্দ পেয়ে সবাই তার দিকে তাকালো।উৎস সিজানের পাশে গিয়ে বসে।ফারাজের পাশে বসলে খোঁচা দিতে দিতে শেষ করবে।বড় ভাই হলে কী হবে কথা যেনো ঠোঁটের আগায় থাকে।বড় হয়েছে ঠিকই কিন্তু কোনো কান্ড জ্ঞান নেই ছোট ভাইয়ের সাথেও পিরীতের আলাপ করতে তার বাধে না।অবশ্য তারা তিন ভাই ছোট বড় হলে কী হবে? ফ্রেন্ড এর মতো একে অন্যকে সব শেয়ার করে।কেউ কারো থেকে কোনো কিছু লুকোচুরি করে না ঠিক যেমন উৎসের জীবনের চরম সত্য’তাই।
———
মেহেক যখন সদ্য জন্ম নেয়,মায়ের একটা অংশ থেকে তার নিজস্ব একটা অস্তিত্ব হয়।মেহেক মেয়ে হয়েছে তাই সুফিয়া কিছুটা মন খারাপ করে।সে চেয়েছিল এক মেয়ের পর একটা ছেলে কিন্তু সেটা হয়নি।তবে সাফওয়ান চৌধুরী মেয়ে হয়েছে বলে মন খারাপ করেনি।তার কাছে মেয়ে মানে অমর রত্ন।চৌধুরী নিবাসের ছোট মেয়ে মেহেক।সুফিয়া জন্মের পর মেহেককে কিছুটা দূরে ঠেলে দিলেও বাড়ির সকল সদস্যের চোখের মনি ছিলো মেহেক।মেহেক হওয়ার পর থেকে তার তিন বাবার পেশাগত দিক থেকে উন্নতি হয়।তাদের ভাগ্যের চাকা ক্রমাগত ঘুরতে থাকে। সহজ হয় তাদের জীবনের পথ চলা।মেজো মার মেহেককে দূরে ঠেলে দেওয়া উৎসের একদম পছন্দ হতো না।উৎস তখন আট বছরের বাচ্চা ছেলে।সে দেখতো নিশাতকে তার মেজো মা আদর করলেও মেহেককে করতো না তাকে তেমন কোলেও নিতো না।তারা সবাই তো চৌধুরী নিবাসের সন্তান তাদের কারো তো আদর যত্নে এুটি ছিলো না তাহলে ওর সাথে এমন হচ্ছে কেনো?উৎস তার মেজো মাকে জিজ্ঞেস করতো এমন করার কারণ কী কিন্তু সে কিছু বলতো না।একটা ছেলের জন্য একটা মেয়েকে দূরে ঠেলে দেওয়া কোনো মানে হয়!উৎস তার মার কাছে ছুটে যেতো আর বলতো তার মেজো মা আদর করে না তার বোনের,খুদা লাগলে খেতে দেয় না।মালিহা তখন উৎসকে বলতো আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে।কিন্তু উৎস সে ছোট থেকেই বদমেজাজি, গম্ভীর ছিলো।সে যা বলবে তার কথা সবাইকে শুনতেই হবে।উৎসের হাজারটা প্রশ্নের জন্য মালিহা একদিন বলেই দেয় সুফিয়ার ছেলে লাগবে মেয়ে না।তার কথা শুনে উৎস বলেছিলো,
-“আমরা দুই ভাই তো আছি।”
-“তোর মেজো মা নিজের ছেলে সন্তান চায়।”
উৎস ওইদিন অনেক রেগে গিয়েছিল। এক দৌড়ে তার সাত দিনের ছোট বোনকে কুলে নিয়ে ড্রয়িং রুমে আসে এবং সবাইকে ডাকে। সবাই উপস্থিত হলে সে তার কোলে থাকা ছোট বাবুটার মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,
-“ও হয়েছে আজ সাত দিন হলো তোমরা কেউ ওর নাম রাখোনি কেনো? কই আমাদের সময় তো এমন কিছু হয়নি!”
উৎস একটু থেমে উচ্চস্বরে আবার বললো,
-“চৌধুরী বাড়ির ছোট মেয়ের নাম আমি রাখবো।ওর নাম শেহরোজা চৌধুরী মেহেক।আর ও আমার বোন নয়।আমি একদিন অনেক বড় হবো ওইদিন ওকে আমি বিয়ে করে আমার বউ বানাবো।ও আমার ব্যাক্তিগত রোজ।”
উৎসর কথা শুনে উপস্থিত সবাই থমকে যায়।আট বছরের উৎস কী বলছে এসব?পর মূহুর্তে সবাই কথাটা উড়িয়ে দেয় মজার ছলে কিন্তু উৎসর রাখা নামটাই রয়ে যায় মেহেকের জন্য প্রযোজ্য।তারপর থেকে মেহেকের খেয়াল রাখা,খাওয়া দাওয়া,গোসল করার জন্য হালকা কুসুম গরম পানি ও সব ধরনের কাজ উৎসই করতে থাকে।আসল কথা হচ্ছে উৎস মেহেককে বউ বউ বলে ডাকা শুরু করে,যা সুফিয়ার বিরক্ত লাগতো।এতে বাড়ির কারো বাধা ছিলো না।মেহেক যতো বড় হতে লাগলো তার রুপ যেনো ততোই উজ্জ্বল হতে লাগলো।নিশাত,রোদসীর থেকেও মেহেক হয়েছিলো অসম্ভব সুন্দর।মালিহা,নাফিসা নিয়মিত বুঝাতো সুফিয়াকে মেয়েকে কাছে টেনে নিতে।প্রয়োজনে আবার চেষ্টা করুক ছেলে সন্তানের জন্য।কিন্তু সেটা আর সম্ভব না ডাক্তার বলে দিয়েছে সুফিয়া আর সন্তান ধারণ করতে পারবে না এই কথাটা সুফিয়া সবার থেকে আড়াল করে রেখেছে।মেহেকে চৌধুরী বাড়ির জন্য এক জীবন্ত ফুল। সেই ফুল ছাড়া বাড়িতা সৌন্দর্যহীন গাছে পরিণত হবে।ফারাজ,উৎস,নিশাত ও রোদসী মেহেককে অনেক আদর-যত্ন করতো।মেহেক কাঁদলে তাদের বুক ফেটে যেতো।একদিন শাহাদাত চৌধুরী সুফিয়া ও সাফওয়ানকে ডাকে কিছু বলার জন্য।সাফওয়ানও স্ত্রীর জন্য মেয়ের কাছে যেতে পারতো না।মালিহা ও উৎসই মেহেককে বড় করতে লাগলো।শাহাদাত চৌধুরী মেহেকের প্রতি এমন ব্যবহার মানতে পারছিলো না।তিনি তার ছোট ভাই ও ভাইয়ের বউয়ের উদ্দেশ্য বললো,
-“তোমরা কী তোমাদের মেয়েকে চাও না।”
সুফিয়া ও সাফওয়ান দুজনেই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলো।তাদের নীরবতা দেখে তাদের অনুভতি বুঝতে পারলো শাহাদাত।
-“বৃদ্ধ বয়সে দেখার জন্য ছেলে লাগবে বলছো তোমরা।এতো নিচু ভাবনা কিভাবে ভাবতে পারলে সুফিয়া!তোমাকে আর নাফিসাকে আমার ছোট বোনের মতো দেখি।রাহিমা আমার বোন হলে তোমরাও আমার বোন।ছেলে নিয়ে চিন্তা করছো আমার তো মেয়ে নেই দুই ছেলে আছে।লাগবে তোমার দুই ছেলে নিয়ে যাও আর তোমার দুই মেয়েকে আমাকে দাও।”
বাড়ির সকলে শাহাদাত চৌধুরী দিকে অবাক চোখে তাকায়।উৎস, ফারাজও তার বাবার কথায় হতবাক।তার বাবা কী বলছে তাদের দিয়ে দিবে মানে!শাহাদাত চৌধুরী আবার বললেন,
-“আমার ছেলে তোমার ছেলে আমার মেয়ে তোমার মেয়ে এসব কী তুলনা করছো!ওরা এ বাড়ির ছেলে মেয়ে মানে আমাদের সকলের সন্তান।”
শাহাদাত চৌধুরী থেমে পুনরায় বলেন,
-“উৎস, ফারাজ, নিশাত, রোদসী তোমরা আজ থেকে বাবা মার সাথে বাকিদের চাচা চাচি নয় বড় মেজো,ছোট মা বলবে।”
সুফিয়া বললো,
-“ডাকলেই মা বাবা হয়ে যায় না।”
উৎস রাগি স্বরে বললো,
-“আমরা দুই ভাই আজ থেকে তোমার ছেলে এতে আমাদের কোনো সমস্যা নেই তোমার আছে।”
মালিহা সুফিয়াকে বুঝালো।সাফওয়ান সুফিয়াকে বললো মেনে নিতে আমরা তো আমরাই।
সুফিয়া অপমানবোধ করলো।বিয়ের পর থেকে শাহাদাত ও মালিহা সবাইকে এক সাথে রাখার চেষ্টা করছে আর সে কি না আমার তোমার নিয়ে পার্থক্য করলো।তার নিজের ছেলে লাগবে!নিজের ভুল বুঝতে পেরে সবার কাছে সুফিয়া ক্ষমা চায়।তারপর থেকে সুফিয়া বাড়ির সব সন্তানকে নিজের সন্তান বলে দাবি করে তার সাথে মালিহা ও নাফিসাও।মেহেকের জন্য উৎস,ফারাজ,নিশাত ও রোদসী এক মায়ের জায়গায় তিন মা পেলো তারাও খুশি।আস্তে আস্তে মেহেক হয়ে উঠলো সবার চোখের মনি।তার দুষ্টুমি বেরেই চললো দিনদিন তাকে কেই বাধা দিতো না।উৎসের চোখের মনি সে।মেহেকের কিচ্ছু হলে যতো কষ্ট পেতো তার থেকে বেশি কষ্ট পেতো উৎস।সারাক্ষণ বউ বউ বলে পুরো বাড়ি মাতিয়ে রাখতো।মেহেককে কেউ বকতেও পারতো না উৎসের জন্য।এভাবে দিনের পর দিন বছরের পর বছর চলতে থাকে।তার সাথে বাড়তে লাগলো তার পুচকে বউয়ের প্রতি ভালোবাসা।উৎস যখন এইচএসসি দেয় তারপর সে স্কলারশিপ পেয়ে বাহিরে চলে যায়।সে যেতে চায়নি তার কাছের মানুষটাকে ছেড়ে।উৎসের বয়স উনিশ ও মেহেকের বয়স ছিলো এগারো।উৎস চলে গেলে তার বউয়ের দেখাশোনা কে করবে,কে স্কুলে দিয়ে আসবে ও নিয়ে আসবে?সবাই মেহেকের প্রতি উৎসের এমন পাগলামো দেখে হাসতো আর ভাবতে মজা করে কারণ বাড়ির ছেলে মেয়ের বিয়ে এতা অসম্ভব!আত্নীয় স্বজনরা কী বলবে?চাচাতো ভাই বোনের বিয়ে এটা কখনোই চৌধুরী বাড়ির কেউ মানবে না। কিন্তু মালিহার চোখে এটা মজা মনে হয়নি।ছেলের কান্ড দেখে তিনি নিজেই ছিলো হতবাক। উৎসের তো ক্যারিয়ার আছে সেই দিকে তো তার লক্ষ্য রাখতে হবে সবাই তাকে যেতে বললেও সে যেতে চায়নি।তার না যাওয়ার কারণ শুধুই মেহেক কিন্তু মেহেককে যে ভালোবাসে সেটা কাউকে বলতে পারেনি আর না মেহেককে।মেহেককে বললে কী হবে এগারো বছরের মেয়ে কি বুঝবে ভালোবাসা কাকে বলে?না যাওয়ার কোনো রাস্তা না পেয়ে বাধ্য হয়ে তার যেতেই হয়।তবে যাওয়ার আগে জন্মদাএী মাকে তার ভালোবাসার কথা বলে যায়।
উৎস যেই দিন চলে যাবে তার আগের দিন রাতে তার মায়ের কাছে যায়।মায়ের কোলে মাথা রেখে উৎস মিনতির স্বরে বলে,
-“আম্মু আমি মেহেককে ভালোবাসি।ওকে ছাড় আমি বাঁচবো না আমি চলে গেলে তুমি ওকে দেখে রাখবে তো।প্লিজ আম্মু তুমি আমার রোজকে অন্য কারো হতে দিও না।”
ছেলের আবদার শুনে কিছুক্ষনের জন্য থ মেরে বসে থাকে মালিহা।তার ছেলে যে আসলেই মেহেককে ভালোবেসে ফেলেছে কিন্তু এ বাড়িতে এই সম্পর্ক তো কেউ মেনে নিবে না।তখনি সেই ঘরে প্রবেশ করে সিজান ও ফারাজ।তারা তাদের ছোট ভইয়ের ভালোবাসাকে অন্য কারো হতে দিবে না বলে।তারা দেখেছে কীভাবে প্রিয় মানুষকে আগলে রাখতে হয়!উৎসের খুশি তাদের খুশি।তাছাড়া মেহেক উৎসের কাছে যতোটা ভালো থাকবে তা অন্য কারো কাছে না।সিজান তার বড় মামির কাঁধে হাত রেখে বললো,
-“তোমরা তো চাও আমরা খুশি থাকি তাহলে ওদের দু’জনের সুখটা কেঁড়ে নিও না বড় মামি।”
মালিহার কোনো জবাব না পেয়ে উৎস উঠে বসে।ফারাজ এবার বললো,
-“আম্মু মেনে নাও না।”
মালিহা ধীর স্বরে মুচকি হাসি দিয়ে বললো,
-“আমার ছেলের পছন্দ আছে বলতে হয়।তুই নিশ্চিন্ত থাক তোর পুচকে বউ তুই আসা অব্ধি আমার কব্জায় থাকবে।”
মালিহা খানের কথা শুনে সবাই খুশি হয়ে যায়।মা রাজি হয়েছে দেখে উৎস তার মাকে জড়িয়ে ধরে।সিজান ও ফারাজও পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে।সবাই মিলে শব্দ করে হেঁসে দেয়।উৎস বাহিরে চলে গেলে সবাই মিলে মেহেকের খেয়াল রাখে শুধু মেহেকের না নিশাত ও রোদসীরও।তারা যাতে কারো সাথে সম্পর্কে না জড়ায় এবং খারাপ পথে পা না বাড়ায় সেই দিকে তাদের উপর ছিলো কঠর নজরদারি।
#চলবে

