Home "ধারাবাহিক গল্প প্রণয়ের অন্তরমহল প্রণয়ের অন্তরমহল পর্ব-০৫

প্রণয়ের অন্তরমহল পর্ব-০৫

0
1106

#প্রণয়ের_অন্তরমহল
#তাহরিশমিতা_মুনতাহা
#পর্বঃ৫

(অনুমতি ব্যতীত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫

গত এক সপ্তাহ যাবত এই বদ্ধ ঘরে পড়ে আছে দিয়া। বাইরের আলো বাতাস তার চোখে পড়েনি বললেই চলে। এই ঘরটিতে কোনো জানালা নেই। বাইরের আলো বাতাস আসে না মোটেই। দিয়ার কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে কত যুগ ধরে সে বাইরের দুনিয়া হতে বিচ্ছিন্ন। দিয়া অনেকবার অনুরোধ করেছে নির্ণয় কে তবে নির্ণয় টু শব্দটিও করেনি।

দিয়ার মনে হলো সে কোনো গোলকধাঁধায় ফেঁসে গেছে। খুব বাজে ভাবে ফেঁসে গেছে। যেখান থেকে তার মুক্তি নেই এ জীবনে। এই কথা ভাবতেই দিয়া কেমন ছটফট করে উঠলো। না, না এভাবে থাকা যায় নাকি। যেভাবেই হোক এখান থেকে বেরোতে হবে। তবে কী করে? এ বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাবার উপায় কি? খানিকক্ষণ ভাবলো দিয়া, তবে কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে খামচে ধরলো নিজের লম্বা কেশদ্বয়। নিজেকে কেমন বদ্ধ উন্মাদ মনে হচ্ছে দিয়ার।

নির্ণয় এ ঘরে আসেনা প্রায় দুইদিন। ম্যাড দিয়ে খাবার পাঠিয়ে দেয়। যদি আসতো তবে দিয়া পা ধরে হলেও এখান থেকে মুক্ত হতো, দিয়া ভাবলো পা ধরলে কী লোকটি তাকে মুক্তি দিতো? হয়তো হ্যাঁ হয়তোবা না। হঠাৎই দিয়ার মনে হলো নির্ণয় লোকটা কেমন যেন অদ্ভুত। একটু বেশীই অদ্ভুত। তাকে ঠিক বুঝে ওঠা যায় না। কেননা লোকটা এ্যাই ভালো তো এ্যাই খারাপ।

কিন্তু তাকে এখানে কেন আটকে রেখেছে দিয়া সেটা জানে না। কেনোই বা তার সাথে এতটা নিষ্ঠুর তা ও জানে না। তবে মাঝে দিয়ার নিজের জন্য খুব মায়া হয়। এমন জীবনও কারো হয় নাকি ছিঃ।

দিয়া ভাবলো যদি সেদিন সে এই বিয়েটা না করতো, তাহলে আজ সে মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়াতো। সুখে থাকতো, তার একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ হতো- ভাবতে ভাবতে দিয়া ঠুকরে কেঁদে উঠলো। কতদিন আব্বু আম্মু কে দেখে না। তাদের আদর মেশানো কন্ঠস্বর শুনে না। আব্বু বুকে জড়িয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে শান্তনা দিয়ে বলে না।

“ভয় কিসের আব্বু আছি তো।”

দিয়া বাধ ভাঙ্গা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। ইশশ্ যদি আব্বু আম্মু কে একটি বার দেখতে পেতো, তবে কলিজাটা শান্তি পেত বোধহয়। দিয়া কান্না করছে খুব করে কান্না করছে। কান্না করতে করতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে কী যেন বিড়বিড় করছে। কেউ আচমকা দেখলে ধরে নিবে, এ মেয়ে নির্ঘাত পাগল হয়ে গেছে।

দিয়ার কান্না হঠাৎই থেমে গেলো। সিলিংয়ের দিকে আঙুল ঘুরাতে ঘুরাতে গভীর চিন্তায় মগ্ন হলো। খানিক্ষণ কী যেন ভাবলো, এরপর আচানক উঠে বসলো। লম্বা কেশদ্বয় গুলো উঁচু করে খোঁপা বাঁধলো। ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এলো। তার ঠোঁটে রহস্য জনক হাঁসি ফুটে উঠেছে, কেমন অদ্ভুত সেই হাঁসি।

____________

আজ শুক্রবার নির্ণয় বাড়িতেই। এ’কদিন খুব ব্যস্ত থাকায় দিয়ার খোঁজ খবর নিতে পারেনি ঠিক মতো। সেই সকালে বেরিয়ে সন্ধ্যায় ফিরেছে, আবার রাতে বের হয়ে, মধ্যে রাতে ফিরেছে। তাই ভাবলো মেয়েটাকে একটু দেখে আসা উঠিত। যেই ভাবনা সেই কাজ। হাতে এক প্যাকেট বিরিয়ানী নিয়ে দিয়ার উদ্দেশ্যে ছুটলো নির্ণয়।

আজ সব ম্যাডদের ছুটি। তার জন্যই নির্ণয় বাইরে থেকে বিরিয়ানি অর্ডার করে এনেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে দিয়ার ঘরের সামনে এসে দাড়ালো। দরজার সামনে ইয়া বড় একটা তালা ঝুলছে। নির্ণয় পকেট থেকে চাবি বের করে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখলো দিয়া চুপচাপ এক কোনে বসে আছে।

নির্ণয় স্ক্রু হাসলো। এগিয়ে গেল দিয়ার নিকট। হাতে থাকা বিরিয়ানীর প্যাকেটটা এগিয়ে দিলো। দিয়া কোনো বাক্যব্যয় না করে চুপচাপ খাবারের প্যাকেটটা নিজের সামনে নিয়ে কয়েক লোকমা মুখে তুললো। হঠাৎ কী ভেবে যেন তাকালো নির্ণয়ের দিকে। নিম্ন স্বরে প্রশ্ন করলো-

“আপনি খেয়েছেন?”

নির্ণয় সেই সকালেই খেয়ে এসেছে রেস্টুরেন্ট থেকে। তবুও দিয়ার থেকে তা লুকালো। ছোট্ট করে উত্তর করলো-

“নাহহহ”

নির্ণয়ের উত্তর শুনে মনে মনে হাসলো দিয়া। ও আন্দাজ করতে পেরেছিলো নির্ণয় খেয়ে থাকলেও ওকে বলবে, খায়নি। দিয়া এগিয়ে এলো কিছুটা, বললো-

“আ…আমি কী খাইয়ে দিবো?

নির্ণয় হাঁসলো, মাথা নেড়ে সম্মতি দিয়ে বললো-
“হ্যা দাও”

দিয়া ভয়ে ভয়ে এক লোকমা খাবার তুলে ধরলো নির্ণয়ের মুখের সামনে। নির্ণয় স্মিত হেসে হাঁ করে খাবারটা মুখে পুরে নিলো। খাবার শেষ হতেই দিয়া নিচু স্বরে প্রশ্ন করলো-

“দুইদিন এলেন না যে আমাকে দেখতে?”

নির্ণয় শব্দ করে নিঃশ্বাস ছাড়লো-
“একটু ব্যস্ত ছিলাম তাই! এক মিনিট তুমি কি আমাকে মিস্ করেছো?

দিয়া জবাব দিতে পারলো না। লোকটার সামনে এলেই তার হাত পা কেমন মির্কি রোগীর ন্যায় কাঁপে। নির্ণয় ফের প্রশ্ন করল-

“আজকে এতো শান্ত যে? মতলব কী?

দিয়া দু’পাশে মাথা নাড়লো-
“কোনো মতলব নেই। নিজের ভাগ্য কে মেনে নিচ্ছি।

“খুব ভালো ডিসিশন”

দু’জনেল মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ বাক্যবিনিময় হলো! এবার দিয়া কথায় কথায় আসল প্রশ্নটা করেই ফেললো-

“আমাকে এখানে আটকে রাখার কারণ?”

নির্ণয় ছোট্ট উত্তর-
“কোনো কারণ নেই!”

“তাহলে আটকে রেখেছেন কেনো?”

“মনটা খুব করে চাইলো তোমাকে আটকে রাখতে, তাই আটকে রেখেছি।”

“এতো কষ্ট দেন, এতো অত্যাচার করেন! আপনার মনে আমার জন্য একটুও ভালোবাসা জাগে না? মায়া হয় না?”

“উঁহু প্রশ্নয় উঠে না!”

“যদি এই মিথ্যে বন্ধন ছিন্ন করে বহু দূরে পালিয়ে যায়।”

“পথ যতই দুর্গম হোক, আমি তোমাকে আবার আমার খাঁচায় বন্দী করবো।”

দিয়া চোখ তুলে তাকালো নির্ণয়ের চোখের দিকে-

“তবে আমি স্বেচ্ছায় এই নশ্বর জীবন ত্যাগ করবো।”

নির্ণয় খানিক্ষণ দিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে মুচকি হেসে বললো-

“পুনরায় জন্ম নিয়ো” আমি সে জন্মেও কেবল তোমাকেই আমার জীবনসঙ্গীনি করবো।”

দিয়া এবার ঠুকরে কেঁদে উঠলো-

“পুণরায় জন্ম নিলে আপনার মতো নিকৃষ্ট মানুষের থেকে দূরে থাকবো।”

নির্ণয় এবার ও ছোট্ট করে উত্তর করলো-

“সমস্যা নেই কাছে নিয়ে আসবো।”

“কোনো ভাবেই ছাড়বেন না?”

“নাহহ!”

“কোনোদিন ভালোবাসবেন নাহহ?”

“নাহহ!”

“কেনো?”

“জানিনা!”

“দোষটা কী আমার?”

“আমাকে বিয়ে করা!”

***

দিয়া শব্দ করে কেঁদে উঠে নির্ণয়ের শার্ট আঁকড়ে ধরে বুকে মাথা ঠেকালো। নির্ণয়ের শিড় দাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেলো। কেমন ছটফট করে উঠে বললো-

“কান্না থামাও! এভাবে কাঁদছো কেনো? কেউ মরেছে?”

দিয়া বোধহয় এবার একটা বড়সড় অন্যায় করে বসলো। ও দু’হাতে নির্ণয়ের পিঠ আঁকড়ে ধরে শক্ত করে জরিয়ে ধরলো। দিয়ার আচমকা এহেন কান্ডে নির্ণয় কেমন ঘাবড়ে গেলো, হার্টবিটও ক্রমশ বাড়ছে, সে ধাক্কা দিয়ে দিয়াকে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দিলো।

নির্ণয়ের হঠাৎ ধাক্কায় দিয়া কয়েক কদম পিছিয়ে গেলো, অবাকও হলো ভীষণ। বড় বড় চোখ মেলে তাকালো নির্ণয়ের দিকে। বুঝতে পারলো না নির্ণয়ের হাবভাব। দুই কদম এগিয়ে এসে দাড়ালো নির্ণয়ের সামনে। বললো-

“কী হয়েছে?”

নির্ণয় খানিক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎই দিয়ার গলা চেপে ধরলো। হিসহিসিয়ে বললো-

“তোর ভাবসাব তো ঠিক লাগছে না! এতো কাছে আসছিস যে মতলব কী?”

দিয়া কোনোরকমে উত্তর করলো-

“কোনো মতলব নেই। আপনি আমার স্বামী তাই আপনার কাছে আসতে অবশ্য কোনো মতলবের প্রয়োজন পড়বে না আমার।”

নির্ণয় ছেড়ে দিলো দিয়ার গলা। গম্ভীর গলায় বললো-

“কী চাস তুই?”

দিয়া নিম্ন স্বরে বললো-

“যদি বলি আপনাকে চাই? তাহলে কী দিবেন আমায়?”

নির্ণয় ঠোঁট কামড়ে হাসলো তার খানিকটা খটকা লাগলো দিয়ার ব্যবহার ও কথা বার্তায়, কিছু একটা ভাবতে লাগলো। নির্ণয় কে চুপ হয়ে যেতে দেখে দিয়া শুকনো ঢোঁক গিললো লোকটা কী সব বুঝে ফেললো নাকি? না, না কোনোভাবেই তাকে কিছু বুঝতে দাওয়া যাবেনা। তাই তো শাকপাস না ভেবেই করে বসলো আরেক আকাম।

এগিয়ে গিয়ে নির্ণয়ের শার্টের কলার ধরে তাকে নিজের দিকে ঝুঁকিয়ে দখল করে নিল নির্ণয়ের গোলাপী অধর জুড়া। নির্ণয় এবার অবাকের সপ্তম আসমানে। তার হাত পা কেমন অবশ হয়ে গেছে।

তবে দিয়া সেসবে তেমন পাত্তা দিলো না। ও উদভ্রান্তের ন্যায় চুমু খাচ্ছে নির্ণয়ের ঠোঁটে। নির্ণয় আর কিছু ভাবতে পারলো না। মেয়েটার মতলব কী ভাববার জন্য সময় ব্যয় করলো না এক সেকেন্ডও। দু’হাতে আঁকড়ে ধরলো দিয়ার লতানো কোমড়। নিজের সবটুকু উজাড় করে চুমু খেতে লাগলো দিয়ার অধরে।

নির্ণয় যে দিয়াকে সায় দিচ্ছে এটা দেখেই দিয়া ঠোঁট বাঁকিয়ে হাঁসলো। তবে নির্ণয়ের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। সে মত্ত দিয়ার অধরে। দিয়া প্রায় দশ মিনিট পর ছেঁড়ে দিলো নির্ণয়ের অধর। ছাড়া পেয়ে দু’জনই জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। নির্ণয় করলো কী দিয়াকে এক টানে কোলে তুলে নিয়ে, হাঁটা ধরলো নিজের ঘরের উদ্দেশ্যে।

দিয়া দু’হাতে আঁকড়ে ধরলো নির্ণয়ের গলা। ছোট ছোট চুমু খেলো সারা মুখে। নির্ণয় নিশ্চুপ, কিছু বলছে না। দিয়া নির্ণয়ের মুখে হাত বুলিয়ে বললো-

“আপনি অনেক সুন্দর! তবে মনটা কুৎসিত।”

নির্ণয় এবারও নিশ্চুপ কোনো উত্তর করলো না, শুধু হাসলো।…….

#চলবে