Home "ধারাবাহিক গল্প প্রণয়ের অন্তরমহল প্রণয়ের অন্তরমহল পর্ব-০৬

প্রণয়ের অন্তরমহল পর্ব-০৬

0
947

#প্রণয়ের_অন্তরমহল
#তাহরিশমিতা_মুনতাহা
#পর্বঃ৬ (প্রথমাংশ)

⚠️অনুমতি ব্যতীত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ🚫

শুনশান রাস্তায় প্রানপণে দৌড়াচ্ছে দিয়া। চারপাশ একেবারে নীরব, জন-মানবহীন। রাস্তার দু’পাশে মাথা উঁচু করে অশরীরীর ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকা ল্যাম্পপোস্টগুলোর ম্লান হলদে আলোয় কোনোমতে রাস্তাটা চোখে পড়ছে। দিয়া একনাগাড়ে দৌঁড়াচ্ছে আর কিছু সময় পর পর আতঙ্কে পেছনে ফিরে তাকাচ্ছে। কেউ তাকে অনুসরণ করছে কি না। যখন দেখল না কেউ তাকে ফলো করছে না, দেখে স্বস্তি পেলো।

দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে এসে থামল একটি ব্রিজের উপর। খালি পা, জুতো জোড়া বোধহয় ছিঁড়ে গেছে মাঝ রাস্তায়। পায়ের ক্ষতস্থান থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত পড়ছে, কিন্তু সেদিকে দিয়ার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। ও ধপ করে ব্রিজের ঠান্ডা কংক্রিটের উপর বসে পড়ল। কিছুক্ষণ ওভাবেই স্থবির হয়ে বসে রইল।

এরপর হঠাৎই বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। হাত-পা কেমন মির্গি রোগীর ন্যায় থরথর করে কাঁপছে। ও লক্ষ্য করল, জামার হাতা কিছু অংশ ছেঁড়া, সেই ছেঁড়া অংশ দিয়ে স্পষ্ট দৃশ্যমান ফর্সা হাতে গভীর আঁচড়ের চিহ্ন।

দিয়া এদিক সেদিক পা- চালালো। কোথাও কেউ নেই। মানুষ তো দূরের কথা, দূর-দূরান্তে একটা কুকুরও দেখা যাচ্ছে না। জায়গাটাও তার কাছে সম্পূর্ণ অচেনা, এর আগে কখনো এখানে আসেনি বললেই চলে! তাহলে এখানে কীভাবে এলো?

***

কিছু সময় আগের ঘটনা-

~

রাস্তার একপাশে মুখে উরনার আঁচল চেপে গাড়ির জন্য দাঁড়িয়ে আছে দিয়া। তবে এই সন্ধ্যা রাতে এমন রাস্তায় গাড়ি পাওয়া মুস্কিল। কিন্তু এখানে দাঁড়ানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। মেন রাস্তায় যেতে পারবে না কেননা দিয়া কে কম বেশী প্রায় সবাই চেনে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর স্ত্রী বলে কথা চেনা’টা অস্বাভাবিক কিছু নয়। যদি এতো রাতে ওকে কেউ দেখে নির্ণয় কে কল করে জানিয়ে দেয়। তাহলে ওর সব প্ল্যান ভেস্তে যাবে।

এই ভেবেই একটা গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে দিয়া। প্রায় অনেকক্ষণ পর একটা সিএনজি এদিকে আসতে দেখে বড্ডো খুশী হলো। বাড়ি থেকে আসার সময় গেটের বাইরে দিয়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই মধ্যেবয়সী পরিচারিকা পাঁচশত টাকা হাতে দিয়ে বলেছিলো- গাড়ি নিয়ে এখান থেকে চলে যেয়ো।

দিয়া ও করলো তাই সিএনজি চালক কে দাঁড় করালো! বললো- হাজী বাড়ি যাবেন। সিএনজি চালক শুধু একবার দিয়ার পা-থেকে মাথা অব্দি চোখ বুলালো। বললো- “উঠেন!

দিয়া কোনো কিছু না ভেবেই উঠে বসলো গাড়িতে। কিছুক্ষণ পর খেয়াল করে দেখলো সিএনজি চালক ভুল রাস্তায় নিয়ে যাচ্ছে। দিয়া ভয়ে চেঁচিয়ে উঠলো-

“কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? গাড়ি থামান বলছি।

তবে ড্রাইভার কোনো প্রতিউত্তর করলো না। শুধু লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে কেমন করে যেন হাসলো। কী বিব্রতকর ভয়ানক সেই হাঁসি। দিয়া আরো ভয় পেয়ে গেলো-

“প্লিজ গাড়ি থামান। কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে?

লোকটি ছোট করে উত্তর করলো-

“জাহান্নামে!

দিয়া এবার ভয়ে কেঁদে উঠলো-

“গাড়ি থামান বলছি, নয়তো আমি কিন্তু চেঁচাবো।

“চেঁচাও, যত খুশী চেঁচাও কোনো লাভ নেই।

সত্যি সত্যি কোনো লাভ হলো না। ওর চিৎকার কারো কান অব্দি পৌঁছালোই না। যখন দেখল ওর আর্তনাদ এই নির্জন রাস্তায় কোনো কাজে আসছে না, আর চালকের ভয়ংকর হাসি প্রমাণ করছে যে সে সত্যিই তাকে এক মারাত্মক বিপদের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তখন দিয়া বাঁচার জন্য মরিয়া হয়ে উঠল।

চালকটি এক হাতে স্টিয়ারিং অন্য হাতে পিছন ফিরে দিয়াকে আক্রমণ করে। সেই মুহূর্তে ধস্তাধস্তির ফলেই দিয়ার জামার হাতা ছিঁড়ে গিয়েছিল এবং তার ফর্সা হাতে গভীর আঁচড়ের দাগ বসেছিল। দিয়া বুঝতে পারছিল, এই জানোয়ারের হাত থেকে বাঁচতে হলে তাকে এখন চরম কিছু করতে হবে।

ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে, সিএনজির সিটে বসে থাকা অবস্থায়, দিয়া তার মনের মধ্যে কেবল একটাই চিন্তা করল, যেকোনো মূল্যে নিজেকে বাঁচাতে হবে! তার মনে পড়ল, বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় সে আত্মরক্ষার জন্য তার ওড়নার আড়ালে একটি ছোট সুইস-নাইফ লুকিয়ে এনেছিল।

দ্রুত হাতে, প্রায় অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় সে ছুরিটা বের করল। সিএনজির চালক তখনো তার উপর আক্রমণের জন্য ঝুঁকে ছিল।

কোনো কিছু না ভেবেই, দিয়া শরীরের সমস্ত শক্তি এক করে হিংস্র পশুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল সিএনজি চালকের উপর। ছুরিটা সজোরে তার কাঁধ লক্ষ্য করে বসিয়ে দিল!

“আহ্হহ!”—যন্ত্রণা মিশ্রিত আর্তনাদ করে উঠল চালক। যন্ত্রণায় তার হাত ফসকে গেল স্টিয়ারিং থেকে।

কিন্তু দিয়া তখনো থামল না। জীবন বিপন্ন বুঝতে পেরে সে আরও একবার ছোরা চালালো লোকটির হাতে, যাতে সে স্টিয়ারিং নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে।

মুহূর্তের মধ্যে গতি নিয়ন্ত্রণ হারাল সিএনজি। বিকট শব্দে রাস্তার পাশের একটি গাছের সাথে সজোরে ধাক্কা খেল।

সংঘর্ষের ফলে সিএনজির কাঁচগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। দিয়ার মাথা সজোরে ড্যাশবোর্ডে গিয়ে ঠেকলো। চারপাশ রক্ত, কাঁচ আর ধাতুর কর্কশ শব্দে ভরে গেল।

দিয়া যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠল, কিন্তু জ্ঞান হারাল না। সে দেখল, চালকটি স্টিয়ারিং-এর উপর নিথর হয়ে পড়ে আছে, তার শরীর থেকে গরম রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে।

দিয়া দ্রুত নিজেকে সিএনজির ধ্বংসাবশেষ থেকে টেনে বের করল। সে তখনো ভয়ে কাঁপছে, কিন্তু তার চোখে এখন বাঁচবার আগুন। তার গায়ের জামা আরও ছিঁড়ে গেছে, মাথায় আঘাত লেগেছে, কিন্তু তার লক্ষ্য একটাই, এই জায়গা থেকে পালাতে হবে!

এরপর আগপিছ না ভেবে ছুটতে শুরু করে যেদিকে দু’চোখ যায়।

__________

—বর্তমান—

দিয়া ফের দৌড়াচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে যানে না। বাবার বাড়ি যেতে পারবে না কোনোভাবেই, কেননা ওই বাড়ি গেলে বিপদে পরবে ওর পরিবার, আর ও কোনো ভাবেই চাইনা পরিবার কে বিপদে ফেলতে। তাই তো দু’চোখ যেদিকে যাচ্ছে সেদিকেই দৌড়াচ্ছে।

একপ্রকার গন্তব্যহীনভাবে ছুটছিল দিয়া। তার মনোযোগ তখন কেবল পেছনে ফেলে আসা বিপদ আর পরিবারের সুরক্ষার চিন্তায়। সে এতটাই আতঙ্কিত ছিল যে, খেয়ালই করেনি সে রাস্তার মাঝে চলে এসেছে।

হঠাৎ একটি বাইক তীব্র গতিতে দিয়ার দিকে ছুটে এলো। দিয়ি প্রায়ই বাইকের সাথে ধাক্কা খেতে বসেছিলো, তবে বাইক চালানো লোকটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ঠিক শেষ মুহূর্তে বাইকটি ব্রেক করল। টায়ারের তীক্ষ্ণ ঘর্ষণের শব্দে পরিবেশটা কেঁপে উঠল। কিন্তু হঠাৎই বাইক ব্রেক কষতে গিয়ে লোকটি বোধহয় খানিক ব্যথা পেলো। দিয়া লোকটির কাছে এগিয়ে গিয়ে অপরাধী গলায় বললো-

“সরি! সরি! আসলে আমি খুবই দুঃখিত! আমি খেয়াল করিনি। আপনি কি খুব বেশি আঘাত পেয়েছেননননন…

বলতে বলতেই থেমে গেলো দিয়া। লোকটির মাথায় থাকা হ্যালমেট খুলে ফেলেছে ইতিমধ্যেই। দিয়া অবাক হলো ভীষণ। কাঁপা গলায় প্রশ্ন করলো-

“আপনি এখানে কি করে? দেশে ফিরলেন কবে?

দিয়ার দিকে তাকিয়ে লোকটি মুহূর্তেই ভীষণ অবাক হয়ে গেল। এতো রাতে, এই জনশূন্য রাস্তায়, দিয়াকে এমন বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে তার চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। সে যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। এই পরিস্থিতিতে, এই পোশাকে দিয়াকে দেখতে পাবে, তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি।

লোকটি বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে নিজের ব্যথা প্রায় ভুলেই গেল। কয়েক মুহূর্ত দিয়াকে নিরীক্ষণ করার পর, অবাক কণ্ঠে শুধু বললো-

“ত…তুমি? এতো রাতে এ..এখানো?

#চলবে

#প্রণয়ের_অন্তরমহল
#তাহরিশমিতা_মুনতাহা
#পর্বঃ৬ (বর্ধিতাংশ)

⚠️অনুমতি ব্যতীত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ🚫

লোকটি বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে নিজের ব্যথা প্রায় ভুলেই গেল। কয়েক মুহূর্ত দিয়াকে নিরীক্ষণ করার পর, অবাক কণ্ঠে শুধু বললো-

—“ত…তুমি? এতো রাতে এ..এখানো?

লোকটির বলা বাক্য দিয়ার কান অব্দি পৌঁছালো কি না সন্দেহ। ও শুধু অবাক চোখে চেয়ে দেখছে লোকটিকে। দিয়া কে কোনো জবাব দিতে না দেখে লোকটি ফের প্রশ্ন করলো-

—“কী হয়েছে তোমার এই অবস্থা কেনো? এতো রাতে এভাবে তুমি এখানে কী করছো? এনি প্রবলেম?

দিয়া কয়েকবার চোখের পলক ফেললো। দৃষ্টি ঘোরালো এদিক সেদিক। মাথা নুইয়ে তাকালো মাটির দিকে। এরপর ভাবতে লাগলো কয়েক ঘন্টা আগের ঘটনা।

______________

—কয়েক ঘন্টা আগের ঘটনা—

—“আপনি অনেক সুন্দর” তবে মনটা কুৎসিত”

নির্ণয় এবার ও নিশ্চুপ কোনো উত্তর করলো না! শুধু হাঁসলো‌। দিয়া ফের বললো-

—“আপনার মতো হ্যান্ডসাম ছেলে আমি আমার জীবনে কখনো দেখিনি।

নির্ণয় ফের হাসলো-

—“Are you flatting with me?

দিয়া দুই দিকে মাথা নাড়িয়ে নাকচ করলো-

—”I am not trying to flatter you at all”

—“সেটাতো দেখেই বুঝতে পারছি”

—“ওহ্ রিয়েলি?”

—“Yes My fucking DoDo”

দিয়া কপাল কুঁচকে তাকালো নির্ণয়ের দিকে, তবে কিছু বললো না। কেননা ওর মনে এখন শুধু একটাই চিন্তা এখান থেকে বের হবে কীভাবে? আর লোকটাই বা ওকে ছারবে কখন?

নির্ণয় ঘরে ঢুকেই দিয়া কে বিছানার উপর ছুড়ে ফেললো! এরপর নিজেও ঝাঁপিয়ে পড়লো মেয়েটার উপর। দিয়া আজ নির্ণয় কে বাঁধা দিলো না। না ছাড়া পাবার জন্য চিৎকার করলো। শুধু নিরবে সহ্য করলো উন্মাদ নির্ণয়কে।

প্রায় তিন ঘন্টা পর দিয়াকে ছেঁড়ে দিলো নির্ণয়। আজ সে খুউব তৃপ্তি পেয়েছে। কেননা ধস্তাধস্তি করতে হয়নি দিয়ার সাথে। নির্ণয় ঠোঁট প্রশারিত করে হাসলো। দিয়া ফ্রেশ হবার জন্য বিছানা ছেড়ে উঠতে নিলেই নির্ণয় দু’হাতে ঝাপটে জরিয়ে ধরলো। বললো-

—“ডোন্ট মুভ! একটু ঘুমোতে দাও, পরে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিয়ো।

দিয়া কোনো বাক্যব্যয় করলো না। ভালো মেয়ের মতো পড়ে রইলো নির্ণয়ের বাহুতে। প্রায় অনেকক্ষণ। ক্লান্ত নির্ণয় পাড়ি জমিয়েছে ঘুমের রাজ্যে। দিয়া আসতে করে উঠে পড়লো। তখন প্রায় সন্ধ্যা। পুরো শরীর ব্যথায় অবস হয়ে আসছে, তবে সেসবে তোয়াক্কা না করে প্রথমেই ফ্রেশ হয়ে নিলো। এরপর ছুটলো কিচেনে। কড়া করে এক কাপ ব্ল্যাক কফি বানালো। ও ম্যাডদের কাছে শুনেছে লোকটার নাকি ব্ল্যাক কফি খুউব পছন্দ। এরপর একটি ঘুমের ট্যাবলেট মিশিয়ে দিলো কফির ভেতর।

এই ঘুমের ট্যাবলেট আর বাড়ির ডুপ্লিকেট চাবি দিয়াকে দিয়েছিলেন সেই ম্যাড টা যাকে সে মায়ের মতো দেখে। মহিলাটা ভীষণ ভালো, দিয়াকে এই জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবার রাস্তা বের করে দিয়েছেন। তবে মহিলাটা খুব ভালো করেই জানেন সে দিয়াকে পালাতে সাহায্য করেছে, কথাটা নির্ণয়ের কানে গেলে পরিণাম কতটা ভয়াবহ হতে পারে। কিন্তু তিনি সেসব তোয়াক্কা না করে সাহায্য করেছেন দিয়া কে। দিয়া চিরকৃতজ্ঞ মহিলাটির কাছে।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে কফির মগ হাতে উপরে গেলো দিয়া। টেবিলের উপর খুব সন্তর্পণে মগ টি রেখে বেড়িয়ে পড়লো বাড়ি থেকে। ও জানে ঘুম থেকে উঠে নির্ণয় দিয়া কে না দেখতে পেয়ে চিন্তিত হয়ে পড়বে, তখন এই কফিটা পান করবে এবং আবারো ঘুমে অচেতন হয়ে পড়বে। মনে মনে কুটিল হাসলো দিয়া।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে খানিক এগোতেই দেখলো মহিলাটি দাঁড়িয়ে আছে। দিয়া মুচকি হেসে এগিয়ে গেলো-

—“আন্টিমা আপনি এখানে দাঁড়িয়ে যে?

মহিলাটি এক চিলতে হাসলো-

—“তোমার জন্যই দাঁড়িয়ে ছিলাম। এই নেও টাকা টা রাখো, এখান থেকে অনেক দূরে চলে যাও।

দিয়ার চোখে পানি ছলছল করে উঠলো। মহিলাটা কত্তো ভালো। ও দু’হাতে ঝাপটে জড়িয়ে ধরে বিদায় জানালো।

_______________

—বর্তমান—

—“এই মেয়ে জবাব দিচ্ছো না কেনো?

লোকটার ডাকে ভাবনার সুতো ছিঁড়তেই দিয়া চোখ মেলে তাকালো। নির্ণয়ের তার উপর করা সকল অত্যাচার নির্যাতন লুকিয়ে মেকি হেসে বললো-

—“ওই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কে আমার পছন্দ নয় তাই পালিয়ে এসেছি।

লোকটি ভ্রু যুগল হালকা নাচালো-

—“কেনো? নির্ণয়ের মধ্যে কিসের কমতি আছে?

—“লোকটা বুরো। বয়স অনেক বেশী তাই।

—“এটা তোমার বিয়ের আগে ভাবা উচিত ছিলো এখন নয়।

—“এখন ভাবলে সমস্যাটা কোথায়?

লোকটি কোনো প্রতিউত্তর করলো না। শুধু আসতে করে বললো-

—“বাইকে উঠো।

দিয়া নাকচ করে বললো-

—“না, আপনার সাথে যাব না! আপনি আবার আমাকে ওই লোকটার কাছে দিয়ে আসবেন।

লোকটি বিরক্তিতে মুখ দিয়ে ‘চ’ শব্দ উচ্চারণ করলো-

—“বাইকে উঠো, আম্মু তোমাকে দেখলে অনেক খুশী হবে।

দিয়া চিন্তিত কন্ঠে শুধালো-

—“কিন্তু ভাইয়া আব্বু জানতে পারলে খুব রাগ করবে।

হ্যাঁ ঠিকই শুনেছেন। এই লোকটি দিয়ার ভাইয়া। ফুপাতো ভাইয়া। নাম- ওয়াহিদ সুজন। ওয়াহিদের মা ভালোবেসে পালিয়ে বিয়ে করেন ওয়াহিদের বাবা কে। কিন্তু নেওয়াজ মোল্লা সেটা মেনে নিতে পারেননি। উনার একটি মাত্র বোন তিনি চেয়েছিলেন ভালো ঘরে বিয়ে দিতে। তবে ‘রাজেয়া’ ওয়াহিদের মা পালান একটি বেকার যুবকের হাত ধরে। তাই নেওয়াজ মোল্লা এখন পর্যন্ত মেনে নিতে পারেননি বোন কে।

—“জানতে পারবেন না উনি, তুই বোস।

দিয়া আর তর্ক করলো না। শরীর খুব ক্লান্ত। সেই সন্ধ্যায় বেরিয়েছে, এখন রাত প্রায় বারোটা। খুদাও লেগেছে খুব, দিয়া একবার তাকালো ওয়াহিদের শক্ত চোয়ালে, কথা বলার সাহস হলো না তাই চুপচাপ উঠে বসলো বাইকে। এরপর সেকেন্ডের মধ্যেই বাইক মিলিয়ে গেলো হাওয়ায়।

(পরবর্তী পর্ব পেতে পেইজটি ফলো করুন 👇🏻)
https://www.facebook.com/profile.php?id=61582690763418

_______________

বাড়ির বউ পালিয়েছে কথাটা কর্ণপাত হতেই হাতের মুঠোয় থাকা ফোনটি আছড়ে পড়লো মেঝেতে। আশরাফুল খাঁন বিস্ময়ে হতভম্ব। ফোনের ওপাশ থেকে এখনো শোনা যাচ্ছে নির্ণয়ের ব্যাকুল কণ্ঠস্বর। মেঝেতে পড়ে থাকা ফোনের ভাঙা স্ক্রিন থেকে নির্ণয় চেঁচিয়ে চলেছে-

—”বাবা! বাবা, আপনি শুনছেন? কী হলো, কথা বলছেন না কেন?

কিন্তু আশরাফুল খাঁনের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। তিনি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, যেন তার পুরো শরীর হঠাৎ জমাট বেঁধে গেছে। তার চোখ দুটো কেবল দেখছে, কিন্তু মস্তিষ্ক কোনো নির্দেশ দিতে পারছে না। তিনি হতভম্ব হয়ে দেখলেন। তার পায়ের কাছে পড়ে থাকা দামি ফোনটা থেকে নির্ণয়ের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ঘরের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করছে।

দীর্ঘ এক নীরবতার পর, আশরাফুল খাঁন অবশেষে হাঁটু গেঁড়ে বসলেন ফোনটার কাছে। নির্ণয়ের কণ্ঠস্বর তখন ক্ষীণ হয়ে এসেছে। কিন্তু আশরাফুল খাঁনের মুখ দিয়ে একটিও শব্দ বের হচ্ছে না। তিনি ঠিক বুঝে উঠতে পারলেন না কী বলবেন।

তাই খানিক্ষণ ওভাবেই বসে রইলেন। এরপর নিজেকে কিছুটা ধাতস্থ করে প্রশ্ন করলেন-

—“তুমি কী মেয়েটার সাথে কিছু করেছো বাবা? যার কারণে মেয়েটা পালালো।

নির্ণয় শুকনো ঢোঁক গিললো। দুনিয়ার সকলের সামনে আদ্রিয়ান খাঁন নির্ণয় সিংহ হলেও বাবার সামনে সে ভেজা বিড়াল। নির্ণয় কখনো ওর বাবাকে মিথ্যে বলেনি। বাবাকে মিথ্যে বলা যায় নাকি? এটা তো ঘোর অন্যায়। কিন্তু সত্যিটা ও তো বলা যাবেনা, তাই চুপ করে রইলো। ছেলেকে চুপ থাকতে দেখে যা বুঝার বুঝে গেলেন আশরাফুল খাঁন। তিনি গম্ভীর গলায় বললেন-

—“আগামী এক ঘন্টার মধ্যে বাড়ির বউ বাড়ি ফিরা চাই।

—“কিন্তু বাবা…”

নির্ণয় কে কিছু বলতে না দিয়ে আশরাফুল খাঁন এবার খেকিয়ে উঠলেন-

—“কিসের কিন্তু? যেটা বলেছি সেটা করো। সময় মাত্র এক ঘন্টা।

একটু থেমে, ঘড়ি দেখে ফের বললেন-

—“দুটো বেজে পঁয়তাল্লিশ মিনিট, Stop wasting time and go! I want her back by three forty-five sharp!”

নিজের বাক্য সম্পূর্ণ করেই নির্ণয়ের মুখের উপর ফোন কাট করে দিলেন আশরাফুল খাঁন। নির্ণয় হতভম্বের মতো ফোনটা কানের পাশ থেকে নামিয়ে আনলো। ফোনের কালো স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। রাগে তার শরীরের রক্ত টগবগ করছে-

—“চোতমারি একবার তোরে হাতের নাগালে পেয়ে নেই তারপর দেখিস তোর কী হাল করি।

_______________

মোল্লা বাড়িতেও ইতিমধ্যে দিয়ার পালিয়ে যাওয়ার খবর পৌঁছে গেছে। নেওয়াজ মোল্লা কেমন শান্ত পাথরের মতো শক্ত হয়ে বসে আছেন। এত বড় খবরেও লোকটার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই! দৃষ্টি স্থির দূরের শূন্যে নিবদ্ধ। রুহানি বেগম স্বামীর পাশে বসে নিস্তব্ধে চোখের পানি ফেলছেন।

নেওয়াজ মোল্লা মুখে কিছু না বললেও মন মস্তিষ্কে তার হাজার খানেক প্রশ্নেরা ভিড় করেছে। তার বাহ্যিক শান্তভাব কেবলই একটি শক্ত মুখোশ যার আড়ালে চলছে এক নীরব তোলপাড়। “মেয়ে কেন পালালো? নির্ণয় কী মেয়ের উপর অত্যাচার নির্যাতন করেছে? মেয়েটার তো এমন করার কথা নয়, তাহলে কেনো?

এমন হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে মন মস্তিষ্কে। তিনি ভাবলেন-

—“ যদি নির্ণয় এমন কিছু করেও থাকে তাহলে আমাকে কেন জানালো না? আমার মেয়েটা কেন একবারের জন্যেও আমাকে কিছু জানতে দিলো না? সে কি তার বাবাকেও বিশ্বাস করতে পারেনি?

নেওয়াজ মোল্লা অনুভব করলেন, তিনি তার জীবনের সবচেয়ে বড় চুক্তিটি করে ফেলেছন, কিন্তু বিনিময়ে মেয়েকে সুখের বদলে বিশাল এক যন্ত্রণার দিকে ঠেলে দিয়েছেন। তিনি তার মন থেকে এই ভাবনা গুলো কিছুতেই সরাতে পারছিলেন না, “তার মেয়ে সুখী নয়, বরং পালিয়ে বাঁচতে চাইছে।

তিনি বুঝলেন, এই হাজারো প্রশ্নের কোনো উত্তর তিনি পাবেন না, যতক্ষণ না দিয়া নিজে ফিরে আসছে বা তার কাছ থেকে কোনো খবর আসছে। এখন কেবল অপেক্ষা, আর সেই অপেক্ষার প্রতিটি মুহূর্ত যেন অনুশোচনায় মোড়া।

#চলবে