Home "ধারাবাহিক গল্প প্রণয়ের অন্তরমহল প্রণয়ের অন্তরমহল পর্ব-০৭

প্রণয়ের অন্তরমহল পর্ব-০৭

0
828

#প্রণয়ের_অন্তরমহল
#তাহরিশমিতা_মুনতাহা
#পর্বঃ৭

⚠️ অনুমতি ব্যতীত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫

রাস্তার ধারেই একটি পুরনো বেঞ্চে মাথা চেপে বসে আছে নির্ণয়। ভোরের আবছা আলো তার ক্লান্ত মুখের ওপর পড়েছে, তবে তার চোখে ঘুম নেই, আছে এক তীব্র অস্থিরতা। সারারাত ধরে শহরের আনাচে-কানাচে লোক লাগিয়েও দিয়ার কোনো খোঁজ মেলেনি। নির্ণয়ের মাথার ভেতরটা কেমন দপদপ করছে।

তার বাবা, আশরাফুল খাঁন, সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন— “বউ ছাড়া বাড়ি ফিরলে এ বাড়িতে তোমার কোনো যায়গা হবে না।”

একদিকে বাবার হুমকি, অন্যদিকে দিয়ার কোনো খোঁজ না পাওয়া, সব মিলিয়ে নির্ণয়ের যেন পাগল পাগল অবস্থা। মনে মনে ভাবলো— “মেয়েটার কিছু হয়ে গেলো না তো? পরক্ষণেই আবার বিড়বিড় করে উঠলো— “না, না ওর কিচ্ছু হতে পারে না! ওর কিছু হয়ে গেলে আমি কষ্ট দিবো কাকে?

এই ভাবনাতেই নির্ণয় এক দীর্ঘশ্বাস ফেললো। সে কি মেয়েটাকে বড্ড বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলেছে? আবার পরমুহূর্তেই তার কঠিন মনটা যুক্তি দেখালো— “আর দিলেই বা কী? মেয়েটা তো এটারই যোগ্য।” মনকে সে অনেক বোঝালো, কিন্তু মন সেসব যুক্তিতে কিছুতেই সায় দিচ্ছিল না। ভেতরে একটা অজানা শূন্যতা যেন ক্রমশ বাসা বাঁধছিল।

নির্ণয় বারবার মুঠোয় থাকা স্মার্টফোনটি দেখছে, যদি কোনো মেসেজ কিংবা কল আসে! যদি তার লোকজনের কেউ দিয়ার একটা সামান্য খোঁজও দিতে পারে! কিন্তু না, ফোনটি নীরব। কোনো মেসেজ নেই, কোনো কল নেই। কেউ কি মেয়েটার কোনো খোঁজ পেলো না?

এবার সত্যি সত্যিই নির্ণয়ের ভয় হতে শুরু করেছে। বুকের ভেতরটা কেমন যেন মুচড়ে উঠছে, এক অসহ্য ব্যথাও অনুভব হচ্ছে। জোর করে চোখ বন্ধ করল। দিয়াকে কষ্ট দেওয়ার যে তীব্র বাসনা এতদিন মনে ছিল, সেই বাসনার জায়গায় আজ জন্ম নিচ্ছে এক নতুন অচেনা অনুভূতি। হয়তো এটাই উদ্বেগ, অথবা হয়তো এর থেকেও গভীর কিছু। নির্ণয় অনুভব করল দিয়াকে খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত এই কষ্ট আর এই ভয় তার পিছু ছাড়বে না।

নিজের এলোমেলো চুলে হাত বুলিয়ে নির্ণয় উঠে দাঁড়ালো। আর এভাবে বসে থাকা সম্ভব নয়। তার ভেতরে ভয় আর রাগ এক মিশ্র অনুভূতি তৈরি করছে, যা তাকে আরও বেপরোয়া করে তুলছে।

—”রফিক! গাড়ি ঘোরা।”

রফিক গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। নির্ণয়ের কন্ঠ শুনে তড়িঘড়ি করে গাড়িতে উঠে বসলো-

—“কই যাইবেন ওস্তাদ?”

—“জানি না!”

নির্ণয়ের ছোট্ট জবাব। রফিক ঘাড় কাত করে তাকালো বিধ্বস্ত নির্ণয়ের পানে। তা দেখে নির্ণয় ফের বলে উঠলো-

—“লোক লাগা, যত পারিস লোক লাগা! এই লোক দিয়ে হবে না।

—“ওস্তাদ….”

—“সকাল সাতটার আগে ওই মেয়েকে আমার চাই। চাই মানে চাই, যেভাবেই হোক খোঁজে বের কর।

নির্ণয়ের কণ্ঠস্বর আদেশ হলেও তাতে এক চড়া সুরের অস্থিরতা ছিল। রফিক দীর্ঘশ্বাস ফেললো।

—“ওস্তাদ গাড়ি ঘুরাইতে কইলো কিন্তু গাড়ি ঘুরাইয়া যামু ডা কোথায় সেটাই তো কইলো না।”

নির্ণয় ফের গাড়িতে থেকে নেমে দাঁড়ালো। মাথা কাজ করছে না। কোথায় যাবে? কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না। পায়চারি করছে উন্মাদের মতো। হঠাৎই হাতের মুঠোয় থাকা ফোনটি টুং করে উঠলো! নির্ণয় তড়িঘড়ি করে ফোনটি চোখের সামনে ধরতেই স্ক্রিনজুড়ে ভেসে উঠল একটি পরিচিত নম্বর থেকে আসা মেসেজ।

নির্ণয় কাঁপা হাতে মেসেজটি খুলল। প্রথমটায় তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু যখন সে অক্ষরগুলো পড়ল, তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো।

বার্তায় লেখা:

—”তুই চিন্তা করিস না। দিয়াকে নিয়ে আমি খাঁন বাড়িতে যাচ্ছি। তুইও চলে আয়।”

মুহূর্তে নির্ণয়ের রক্ত হিম হয়ে গেল। এক তীব্র ক্রোধ এবং স্বস্তি নির্ণয়ের শিরায় শিরায় বইতে লাগল। স্বস্তি, কারণ দিয়া অক্ষত আছে। ক্রোধ, কারণ দিয়া ফিরে আসছে।

নির্ণয় মুহূর্তে গাড়িতে উঠে বসলো। তার অস্থিরতা এখন এক নতুন জেদে পরিণত হয়েছে। দ্রুত রফিক কে আদেশ করল-

—”গাড়ি ঘোরা! সোজা ওই বাড়ির দিকে চল। ফুল স্পিডে!”

_____________

প্রায় ভোর পাঁচটা।

বাইক তখন ছুটছে গ্রামের প্রধান মেঠো পথ ধরে। চারদিকে শুধু ঘন বাঁশঝাড় আর গাছের সারি, ভোরের আবছা আলো তখনও ভালোভাবে ফোটেনি। ওয়াহিদের বাইকের পেছনে বসে আছে দিয়া, ভয়ে সে ওয়াহিদের শার্ট খামচে ধরে আছে। সারারাত পথে পথে ঘুরে দিয়া তখনও ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত।

বাইক অন্য রাস্তায় যেতে দেখে দিয়া চেঁচিয়ে উঠলো-

—“এই ভাইয়া! কোথায় নিয়ে যাচ্ছো? এটাতো তোমাদের বাড়ির রাস্তা নয়। ভাইয়া, বাইক থামাও! আমি নামবো!”

ওয়াহিদ বাইকের গতি কমালো খানিক। শান্ত কন্ঠে বললো-

—“ষাঁড়ের মতো চেঁচাচ্ছিস কেনো কানের কাছে? একটু অপেক্ষা কর নিজ চোখেই দেখতে পাবি কোথায় নিয়ে যাচ্ছি।”

—“না, না তুমি এক্ষুনি বাইক থামাও! আমি তোমার সাথে যাবো না। আসলে তোমাকে বিশ্বাস করাটাই আমার ভুল হয়েছে।”

ওয়াহিদ কোনো প্রতিউত্তর করলো না। চুপচাপ বাইক চালাতে মনোনিবেশ করলো।

____________________

সারারাত ধরে বারান্দায় বসে আছেন নেওয়াজ মোল্লা। মেয়ের চিন্তায় চোখে ঘুম ধরা দেয়নি এক ফোঁটাও। তারই পাশে মেঝেতে বসে দেয়ালে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে আছেন রুহানি বেগম। তিনি ও সারারাত ঘুমোতে পারেননি স্বামীর সাথে এখানেই বসে ছিলেন।

নেওয়াজ মোল্লা একবার তাকালেন ঘুমন্ত রুহানি বেগমের মুখের দিকে। এই মহিলাটি তার জন্য কি না করেছেন। যদি এই মহিলাটি না থাকতো কি হতো নেওয়াজ মোল্লার? কেই বা খেয়াল রাখতো উনার? ভেবে পাননা তিনি।

—“শুনছো রুহানি? উঠে ঘরে গিয়ে ঘুমাও।

রুহানি বেগম চোখ মেলে তাকালেন স্বামীর দিকে। নিম্ন স্বরে বললেন-

—“আপনি তো সারারাত ঘুমাননি, এভাবে চলতে থাকলে আপনি আরও অসুস্থ হয়ে পড়বেন। তাই বলি কী একটু ঘুমিয়ে নিন আপনি।”

নেওয়াজ মোল্লা ঠোঁট প্রশারিত করে হাসলেন-

—“কিচ্ছু হবেনা আমার, তুমি বরং খানিকটা সময় ঘুমিয়ে নাও।

রুহানি বেগম নাকচ করলেন। তিনি কিছুতেই ঘুমোবেন না। নেওয়াজ মোল্লা ও আর জোর করলেন না। এমনি তেই মেয়েটার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। কোথায় আছে, কি করছে, কে জানে!”

দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি। একবার খাঁন বাড়িতে কল করে খবর নিতে হবে।

(পরবর্তী পর্ব পেতে পেইজটি ফলো করুন 👇🏻)
https://www.facebook.com/profile.php?id=61582690763418

_____________________

সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছেন আশরাফুল খাঁন। তার সামনে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছে নির্ণয়। আশরাফুল খাঁনের দুই সাইডে বসে আছেন স্বর্ণালী খাঁন ও ইসমাইল খাঁন-

—“তোমাকে বলেছিলাম যে বউ ছাড়া ফিরতে না, তুমি কীভাবে খালি হাতে বাড়ি ফিরলে? বউ মা কোথায়?

নির্ণয় জবাব দিচ্ছে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। যেন সে আসামি আর তার বসে আছেন তিনজন জাজ। যারা যে কোনো মুহূর্তে ফাঁসির আদেশ দিয়ে দিবেন। নির্ণয় শুকনো ঢোঁক গিললো। আশরাফুল খাঁন এবার পূর্বের তুলনায় খানিক জোরে চেঁচিয়ে উঠলেন –

—“জবাব দিচ্ছো না কেনো? বউমা কোথায়? তুমি কী করেছো মেয়েটার সাথে?

নির্ণয় এবার ও চুপ। শুধু মনে মনে আওড়ালো-

—“সালা এখনো আসছে না কেনো?

*****

হঠাৎ খাঁন মঞ্জিলের বিশাল গেটের সামনে এসে দাঁড়াল একটি বাইক। ভোরের আবছা আলো তখনো চারপাশের সবকিছুকে ভালো করে ফোটায়নি, কিন্তু গেটের আলোয় বাইক এবং তার দুই আরোহীকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। বাইক থামতেই দিয়া নেমে দাঁড়াল। ভয়ে তার শরীর জুবুথুবু। ওয়াহিদের প্রতি তীব্র অবিশ্বাস আর রাগ তাকে গ্রাস করছে। সে যদি ঘুণাক্ষরেও টের পেতো যে এই বেয়াদব লোকটা তাকে আবার এই খাঁন বাড়িতে, এই নরকের মুখে টেনে আনবে, তাহলে সে এই জনমে তাকে বিশ্বাস করত না!

ওয়াহিদ হেলমেট খুলল। তার ঠোঁটে লেগে আছে দুষ্টু হাঁসি। দিয়া রাগে দুঃখে কেঁদে উঠলো! অভিমানী স্বরে বললো-

—”ভাইয়া তুমি… তুমি বিশ্বাসঘাতকতা করলে? কেন এমন করলে?

মূলত ওয়াহিদই নির্ণয় কে মেসেজ দিয়ে এ বাড়িতে আসতে বলেছে। আর দিয়া কে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে এ বাড়িতে নিয়ে এসেছে।

—“তোর ভালোর জন্যই আমি এই কাজটা করেছি। তোকে এখানে না নিয়ে আসলে তোর বিপদ হতে পারতো। আর নির্ণয় তোর থেকে বয়সে বড় তো কী হয়েছে? আমি জানি ও তোকে অনেক সুখে রাখবে।”

দিয়া এবার তাচ্ছিল্যে হেঁসে উঠলো-

—“সুখ? সেটাও আবার এই লোকটার সাথে? হাহাহা। এটাও সম্ভব?”

বলেই দিয়া নিজের জামাটা খানিকটা উপরে তুলে দেখালো বেল্ট দিয়ে মারার দাগ গুলো। যে গুলো এখনো স্পষ্ট ভাবে ফর্সা চামড়ায় চেয়ে আছে। ওয়াহিদ সেই দাগ দেখে সিউরে উঠলো-

—“এগুলো? এ……এগুলো নির্ণয়…”

বাকি কথা টুকু ওয়াহিদের কন্ঠ নালী দিয়ে বের হলো না। কেমন ঘোরের মধ্যে চলে গেছে। ও তো দিয়ার মিথ্যে গুলো বিশ্বাস করে নিয়েছিল, যার জন্যে ওকে আবার এই বাড়িতে এটা ভেবে ফিরিয়ে এনেছে যে আসতে আসতে দিয়া নির্ণয় কে মেনে নিবে, বয়সে বড় তো কী হয়েছে।

—“আসলে কী জানো তো ভাইয়া? আমি তো তোমার মায়ের পেটের কিংবা আপন বোন নয়! তাই এই কাজটা করতে তুমি দু-বার ভাবো নি। যাক গে যা করেছো ভালো করেছো! জানো তো? আমি এটারি যোগ্য। আমার শিক্ষা হয়ে থাকলে আর কখনোই তোমাদের মতো লোককে বিশ্বাস করবো না। ধন্যবাদ তোমাকে”

ওয়াহিদ বোবা বনে গেছে সে ভাবতেই পারেনি এমন কিছু। ও অপরাধী দৃষ্টিতে তাকালো দিয়ার দিকে, দিয়া সেই দৃষ্টি দেখে কেমন করে যেন হাসলো-

—“তোমার এই ভুলটা সারাজীবন তোমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাক”

বলেই দিয়া আর এক সেকেন্ড ও দেরি করলো না হাঁটা ধরলো বাড়ির ভেতরের উদ্দেশ্যে। ওয়াহিদ ডাকতে ডাকতে দিয়ার পিছনে ছুটছে তবে দিয়া কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না।

বাইকের শব্দ শুনে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এসেছে নির্ণয়। দিয়াকে এদিকে আসতে দেখে কুটিল হাসলো। শেষমেষ হাতের নাগালে চলেই এলো। দিয়া এসে দাড়ালো নির্ণয়ের সামনে, দিয়ার পেছনে ওয়াহিদ। ওয়াহিদ কে টেনে বুকে জড়িয়ে নিলো নির্ণয়-

—“আরেহ দোস্ত কতদিন পর! দেশে ফিরলি কবে?

ওয়াহিদ ছোট্ট করে উত্তর করলো-

—“কালই ফিরেছি!”

—“ওভাবে তাকিয়ে আছিস কেনো? আর বাহিরেই দাঁড়িয়ে থাকবি নাকি? চল চল ভেতরে চল!”

ওয়াহিদ কোনো প্রতিউত্তর করলো না চুপচাপ বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলো। নির্ণয় ফের নিচু স্বরে প্রশ্ন করলো-

—“দিয়া কে কোথায় পেলি তুই?

—“গ্রামের শেষ মাথায়!”

এবার ও ছোট্ট উত্তর ওয়াহিদের। নির্ণয়ের সন্দেহ হলো কোথাও আবার এই মেয়ে ওয়াহিদ কে সবটা বলে দেইনি তো? ফের ভাবলো বলে দিলে নিশ্চয়ই এ বাড়িতে নিয়ে আসতো নাহহ..!!

#চলবে