Home "ধারাবাহিক গল্প প্রণয়ের অন্তরমহল প্রণয়ের অন্তরমহল পর্ব-২২

প্রণয়ের অন্তরমহল পর্ব-২২

0
646

#প্রণয়ের_অন্তরমহল
#তাহরিশমিতা_মুনতাহা
#পর্বঃ২২ (প্রথমাংশ)

⚠️ অনুমতি ব্যতীত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫

ইতিমধ্যেই ভয়াবহ এই খবর পৌঁছে গেছে খাঁন বাড়িতে। একইসঙ্গে জানানো হয়েছে মোল্লা বাড়িতেও। এহেন আকস্মিক দুঃসংবাদে দিয়ার বাবা, নেওয়াজ মোল্লা, স্ট্রোক করে তৎক্ষণাৎ হসপিটালে ভর্তি হয়েছেন। স্টেশনের আশেপাশে ভিড় করা মানুষগুলো এগিয়ে এলেও, ট্রেনের ধাক্কায় ছিন্নভিন্ন হওয়া দিয়ার লাশ কিংবা অবচেতন হয়ে পড়ে থাকা নদীকে ছোঁয়ার সাহস করেনি ঘুণাক্ষরেও।

খান বাড়ির পুরুষেরা দ্রুত স্টেশনে এলেও, বাড়ির মহিলারা ছুটেছেন হসপিটালে দিয়ার বাবা নেওয়াজ মোল্লার কাছে। নির্ণয় দিয়ার এমন মর্মান্তিক ও ছিন্নভিন্ন শরীর দেখে ঘটনাস্থলেই জ্ঞান হারিয়েছে। নদী এবং জ্ঞান হারানো নির্ণয় দুজনকেই স্থানীয় মানুষের সহায়তায় তড়িঘড়ি হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

থমথমে রেললাইনের ধারে, যেখানে নৃশংস ঘটনাটি ঘটেছে, সেখানে এখন কেবল পুলিশি তৎপরতা।

ড. মুখার্জি, ফরেনসিক প্যাথলজিস্ট হিসেবে, কয়েকজন কনস্টেবলকে নিয়ে ঘটনাস্থলে এসেছেন। চারদিকে ছড়িয়ে থাকা দিয়ার শরীরের খণ্ডাংশগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খুঁজে একত্রিত করার কাজ চলছে। ড. মুখার্জির পরনে সাদা অ্যাপ্রন, হাতে নীল ডিসপোজেবল গ্লাভস। অত্যন্ত পেশাদারী স্থিরতা বজায় রেখে তিনি প্রতিটি ছোট ছোট অংশ চিহ্নিত করছেন।

প্লাস্টিকের বিশেষ ব্যাগে মোড়া দিয়ার শরীরের খণ্ডাংশগুলো প্যাথলজিস্ট ড. মুখার্জি এবং কনস্টেবলরা সাবধানে স্ট্রেচারে রাখলেন। রেললাইনের ধার ধরে প্রায় পঞ্চাশ মিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দেহাবশেষ একত্রিত করতে ঘণ্টাখানেক সময় লেগেছিল।

ড. মুখার্জি মাথা নাড়লেন, “ট্রেন দ্রুত গতিতে যাচ্ছিল। ইমপ্যাক্টটা সাংঘাতিক ছিল।” তিনি কনস্টেবলদের দিকে ফিরলেন। “আপনারা আশেপাশে ভালো করে চেক করুন। কোনো ব্যক্তিগত জিনিসপত্র, যেমন মোবাইল বা ব্যাগ পাওয়া গেলে তা খুব জরুরি। এটি অ্যাকসিডেন্ট নাকি আত্মহত্যা নাকি হত্যা তা বোঝার জন্য ঘটনাস্থলের আলামত খুব কাজে দেবে।”

তিনি এরপর লাশের দিকে মনোযোগ দিলেন। যত দ্রুত সম্ভব পোস্টমর্টেমের জন্য ডেডবডি মর্গে নিয়ে যেতে হবে,” ড. মুখার্জি সহকারীকে বললেন। “পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে, বিশেষত এই ধরনের বিকৃত দেহের ক্ষেত্রে।

অতঃপর ডাক্তারের নির্দেশে, পুলিশ ক্রাইম সিন কর্ডন করে রাখল। লাশের খণ্ডাংশগুলো নিয়ে যাওয়ার পর তাদের কাজ হল সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা, যা দিয়েই এই মর্মান্তিক ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্রটি আঁকা সম্ভব হবে।

ড. মুখার্জির দল যখন দেহাবশেষ নিয়ে মর্গ অভিমুখে রওয়ানা হলো, সাব-ইন্সপেক্টর রথীন দে তখন আশপাশের মানুষজনের বয়ান নেওয়া শুরু করলেন। এই বয়ানগুলোই ইন্সপেক্টর রথীন দে এর সন্দেহ দীগুণ বাড়িয়ে দিল।

সাক্ষী হিসেবে দাঁড়ানো একজন দোকানি জানালেন, “আমি স্পষ্ট শুনেছি, এক্সিডেন্ট হওয়ার ঠিক মিনিটখানেক আগে ওই মেয়েটা (দিয়া) আর অন্য মেয়েটা (নদী) দু’জনের মধ্যে তুমুল ঝগড়া হচ্ছিল। গলার স্বর খুব চড়া ছিল।”

আরেকজন যাত্রী যোগ করলেন, “ঝগড়া হওয়ার পরই মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে উল্টো ঘুরে দৌড় দিতেই দ্রুতগামী ট্রেনের ধাক্কা লেগে ছিন্নভিন্ন হয়ে ছিটকে পড়ে মেয়েটা।”

প্রাথমিক দুর্ঘটনা হিসেবে শুরু হওয়া তদন্ত এখন সন্দেহজনক মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছে। সাক্ষ্যগুলো শোনার পর রথীন দে এর এখন নদীকে সন্দেহ হচ্ছে।”

তিনি তৎক্ষণাৎ ওয়াকিটকি তুলে নিলেন।

“হাসপাতালে দু’জন কনস্টেবল পাঠাও এবং ওই মেয়েটার (নদী) ওপর কড়া নজর রাখো। ওর স্টেটমেন্ট নেওয়া হবে। ফরেনসিক রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত কাউকেই ক্লিন চিট দেওয়া হবে না। এটি এখন সাসপিসিয়াস ডেথ হিসেবে বিবেচিত হবে।”

_________

রেললাইন থেকে প্রায় অনেকটাই দূরে অবস্থিত একটি প্রাইভেট হাসপাতালের জরুরি বিভাগেও তখন পরিস্থিতি থমথমে। স্টেশন থেকে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে করে নির্ণয় এবং নদীকে এখানে আনা হয়েছে। নেওয়াজ মোল্লা ও এই হাসপাতালেই।

খান বাড়ির মহিলারা- শাশুড়ি, ননদ ও অন্যান্য আত্মীয়রা, নেওয়াজ মোল্লার কেবিনের বাইরে ভিড় করে আছেন। দিয়ার বাবা নেওয়াজ মোল্লার এমন আকস্মিক স্ট্রোক পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। ডাক্তাররা দ্রুত তাঁকে পর্যবেক্ষণে রেখেছেন, তবে তাঁর অবস্থা এখনও সঙ্কটমুক্ত নয়।

পাশের একটি কেবিনে নির্ণয়, জ্ঞান ফিরেছে। তবে নির্ণয় তখনও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক নয়; ফ্যালফ্যাল করে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে।সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না যে ওটা দিয়া। ওটা দিয়া কীভাবে হতে পারে? না ওটা দিয়া হতেই পারে না। নির্ণয় মাঝেমধ্যে কেবল অস্ফুটে দিয়ার নাম ধরে ডেকে উঠছে। ডাক্তাররা তাঁকে শক্তিশালী ঘুমের ওষুধ দিয়ে শান্ত রাখার চেষ্টা করছেন, কারণ তাঁর মানসিক অবস্থা যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে।

তবে সবচেয়ে ভয়ের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে নদীকে নিয়ে। ওকে একটি বেডে রাখা হয়েছে। যদিও তার পালস এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক, তবুও সে অবচেতন বা শকে আচ্ছন্ন। সে চোখ খুলছে না, কোনো শব্দ করছে না। ডাক্তাররা ধারণা করছেন, হয়তো প্রচণ্ড মানসিক আঘাত তাকে সাময়িকভাবে এই অসাড় অবস্থায় নিয়ে গেছে।

**********

সাব-ইন্সপেক্টর রথীন দে-র নির্দেশে, কনস্টেবল রফিক এবং একজন মহিলা কনস্টেবল হাসপাতালে এসে পৌঁছেছেন। তাদের লক্ষ্য নদীর দিকে, কারণ ঘটনাস্থলের সাক্ষীদের বয়ান অনুযায়ী, নদী সেই কালপ্রিট।

রফিক কেবিনের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা স্বর্ণা বেগম কে ডেকে নদী কে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “মেয়েটির নাম কি? তার সঙ্গে নিহত মেয়েটার কী সম্পর্ক?”

স্বর্ণা বেগম চোখের পানি মুছতে মুছতে ভাঙ্গা গলায় বললেন-

“নদী” দিয়া মানে নিহত মেয়েটার বড় বোন”

মহিলা কনস্টেবল নদীর বেডের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। নদীর অবচেতন মুখের দিকে তাকিয়ে তার সন্দেহ আরও বাড়ল। মেয়েটার অবচেতন থাকাটা কি সত্যিই মানসিক ট্রমা? নাকি জিজ্ঞাসাবাদ এড়ানোর কোনো কৌশল?

“ওর শরীর পরীক্ষা হয়েছে? কোনো আঘাতের চিহ্ন?” মহিলা কনস্টেবল নার্সকে জিজ্ঞেস করলেন।

নার্স ফাইল দেখতে দেখতে বললেন, “শারীরিকভাবে গুরুতর কোনো আঘাত নেই। মনে হচ্ছে, তীব্র মানসিক ট্রমা।”

বাকি কথা বলার আগেই হুড়মুড়িয়ে কেবিনে ঢুকে পড়লেন রুহানি বেগম। অবচেতন নদীর বাহু ধরে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে জানতে চাইলেন-

“রাক্ষসী’ ওরে অপয়া’ খেয়ে ফেললি আমার কলিজার টুকরা টারে। হত্যা করে ফেললি আমার ওই টুকু মেয়েটাকে। তুই একটা খুনী হত্যাকারী তুই।”

কনস্টেবল মহিলাটি টেনেও সরাতে পারছেন না রুহানি বেগম কে। তিনি মেয়েকে হারিয়ে বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গিয়েছেন।

“উনাকে নিয়ে জান এখান থেকে। এটা হসপিটাল বুঝতে হবে আপনাদের এখানে আরও পেসেন্ট আছেন তাদের অসুবিধা হচ্ছে।”

ভিতু স্বরে বললেন একজন নার্স। কনস্টেবল মহিলাটি রুহানি বেগম কে টেনে বাহিরে নিয়ে গেলেন। রুহানি বেগমের আহাজারি থামছেনা কিছুতেই। মেয়েকে হারিয়ে দিশেহারা তিনি।

________________

দীর্ঘ এক রাত পেরিয়ে ভোরের আলো ফুটল ধরণীতে। হাসপাতালের জানালা গলে আসা সেই নরম আলো যেন করিডোরের তীব্র শোককে কিছুটা হলেও ম্লান করার চেষ্টা করছে।

মিনিট পাঁচেক হবে নদীর জ্ঞান ফিরেছে। অবচেতন থেকে ফিরে আসার পর তার চোখ তখনও শূন্যতায় স্থির, কিন্তু ক্ষীণভাবে সে পরিবেশকে উপলব্ধি করতে পারছে। ডক্টর এসে চেকাপ করে জানালেন-

“মেয়েটা এখন কিছুটা সুস্থ, তবে ট্রমা থেকে পুরোপুরি বেরোতো সময় লাগবে” আপনারা জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেন, তবে সাবধানে।”

কনস্টেবল মহিলাটি মাথা নাড়লেন। দ্রুত কেবিনের বাইরে অপেক্ষারত কনস্টেবল রফিককে ইঙ্গিত দিলেন। রফিক তৎক্ষণাৎ পকেট থেকে ওয়াকিটকি বের করলেন-

“স্যার কনস্টেবল রফিক বলছি। হসপিটাল থেকে রিপোর্ট করছি। নদী নামক মেয়েটার জ্ঞান ফিরেছে। ডাক্তার পরীক্ষা করে জানিয়েছেন, সে এখন কথা বলতে পারবে।”

“খুব ভালো খবর,” ওপাশ থেকে সাব-ইন্সপেক্টর রথীন দে-র দৃঢ় কণ্ঠস্বর এল। “তোমরা ওকে কড়া নজরে রাখো। আমি পোশাক পাল্টে এক্ষুণি আসছি।”

•••••••••••

রথীন দে মিনিট দশেকের মধ্যেই হাসপাতালে পৌঁছে গেলেন। তিনি সরাসরি নদীর কেবিনে ঢুকলেন। ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় কেবিনের ভেতরে এক অস্বাভাবিক নীরবতা বিরাজ করছে।

রথীন দে নদীর বেডের পাশে একটি চেয়ার টেনে বসলেন। তার চোখে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, তবে তীক্ষ্ণতা স্পষ্ট। তার গলার স্বর শান্ত কিন্তু কর্তৃত্বপূর্ণ।

“তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছো? আমি সাব-ইন্সপেক্টর রথীন দে। তোমাকে এখন কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। এটা তদন্তের অংশ।”

নদী শুকনো ঢোঁক গিলে ধীরে মাথা নাড়ল। ওর চোখে ভয়ের গভীর ছাপ। রথীন শান্ত স্বরে শুধালেন-

“তোমার আর দিয়ার মধ্যে কী নিয়ে ঝগড়া হয়েছিল…..

নদী ক্ষীণ স্বরে কথা বলার চেষ্টা করল।

“ঝগড়…. ঝগড়া তো হয়নি সামান্য কথা কাটাকাটি হয়েছিল।”

“সামান্য কথা কাটাকাটি হয়েছে? Like seriously? শুনো মেয়ে খবরদার মিথ্যে বলার চেষ্টাও করোনা। স্টেশনের কাছে যারা ছিল, তারা সবাই বলেছে তোমাদের মাঝে তুমুল ঝগড়া হয়েছে, এখন কী নিয়ে ঝগড়া হয়েছে সেটা ফলো ফটাফট।”

নদী চোখ বন্ধ করল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে একে একে ব্যাখ্যা করল সকল ঘটনা। ইন্সপেক্টর নিরবে শুনলেন সমস্ত ঘটনাবলি। তিনি যা বুঝার বুঝে গেলেন। এটা নিতান্তই একটি দুর্ঘটনা বলেই গণ্য করা হবে।

নদীর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হতেই কেবিনের দরজায় হঠাৎ নার্সদের ছুটোছুটি শুরু হলো। রথীন দে দ্রুত কেবিনের বাইরে এলেন। করিডোরের শেষ প্রান্তে, দিয়ার বাবা নেওয়াজ মোল্লার কেবিনের বাইরে উত্তেজনা।

দিয়ার মা রুহানি বেগমের কান্নার তীব্র শব্দ করিডোরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। খান বাড়ির পুরুষ ও মহিলারা ঘিরে আছেন নেওয়াজ মোল্লার কেবিনের দরজা। ঠিক তখনই, একজন নিউরোসার্জন দ্রুত পায়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে এলেন, তার মুখে উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট।

রুহানি বেগম ডক্টরের দিকে ছুটে গেলেন, ডক্টর গম্ভীর স্বরে জানালেন,

(আগেই বলে রাখি নিচের অংশ টুকু লিখতে আমি চ্যাটজিপিটির সাহায্য নিয়েছি। তাই ভুল ত্রুটি হতেই পারে কেননা আমার সাইন্স সম্পর্কে আমার কোনো ধারনা নেই। আশা করি আপনারা বুঝতে পারবেন)

“স্ট্রোকটা খুবই গুরুতর। প্রাথমিক স্ক্যানে ধরা পড়েছে যে মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে গুরুতর রক্তক্ষরণ (Intra-cranial Hemorrhage) হচ্ছে। চাপ ক্রমশ বাড়ছে। এই অবস্থায় সময় নষ্ট করা যাবে না, না হলে বাঁচার সম্ভাবনা কমে যাবে। আমাদের ইমিডিয়েটলি অপারেশন করতে হবে।”

ডক্টরের কথা শুনে রুহানি বেগমের কান্নার আওয়াজ আরও বেড়ে গেল। এক দিনে দুটি চরম আঘাত, একদিকে মেয়ের মর্মান্তিক মৃত্যু, অন্যদিকে স্বামীর জীবনের জন্য লড়াই। হাসপাতালের করিডোরটি তখন শোক, উদ্বেগ আর অস্থিরতার এক মিশ্র পরিস্থিতি তৈরি হলো।

**************

ডাক্তারের জরুরি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগ তোলপাড়। নেওয়াজ মোল্লাকে দ্রুত অস্ত্রোপচার কক্ষে (Operation Theatre – OT) স্থানান্তরিত করার প্রস্তুতি শুরু হলো। রুহানি বেগম এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা হতবিহ্বল অবস্থায় করিডোরে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাদের সামনে এখন কেবল অপেক্ষার প্রহর—একদিকে মেয়ের ছিন্নভিন্ন দেহের ময়নাতদন্ত, অন্যদিকে স্বামীর জীবন বাঁচানোর শেষ চেষ্টা।

অস্ত্রোপচার শুরুর আগে নিউরোসার্জন দ্রুত রুহানি বেগমকে ডেকে নিলেন।

“বেগমসাব, আপনার স্বামীর অবস্থা খুবই সঙ্কটজনক। হেমোরেজ (রক্তক্ষরণ) থামানোর জন্য আমাদের জরুরি ভিত্তিতে ক্র্যানিওটমি (Craniotomy – মাথার খুলি কেটে অস্ত্রোপচার) করতে হবে। তবে বয়স এবং স্ট্রোকের তীব্রতার কারণে, অপারেশনে ফিফটি-ফিফটি চান্স।”

কাঁপা হাতে সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করলেন রুহানি বেগম। তার হাতে ধরা থাকা দিয়ার একটি পুরোনো ছবি তখন ভিজে উঠল। জীবন-মৃত্যুর এই চরম মুহূর্তে তিনি কেবল আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা করতে পারছিলেন।

___________________

প্রায় চার ঘণ্টা পর, অস্ত্রোপচার শেষ হলো। নিউরোসার্জন ও তার দল ক্লান্ত মুখে বেরিয়ে এলেন। রুহানি বেগম সহ সবাই ছুটে গেলেন তাদের দিকে।

ডক্টর গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে বললেন, “আমরা সফলভাবে রক্তক্ষরণ থামাতে পেরেছি এবং মাথার ভেতরের চাপ কমাতে পেরেছি। অস্ত্রোপচার সফল হয়েছে। আমরা তাঁকে বাঁচাতে পেরেছি।”

পরিবারের মধ্যে ক্ষণিকের জন্য প্রবল স্বস্তির নিঃশ্বাস নামল। রুহানি বেগম ডক্টরকে কাঁদতে কাঁদতে ধন্যবাদ জানালেন।

ডক্টর সাবধান করলেন, “তবে আপনাদের বুঝতে হবে, এটি অত্যন্ত গুরুতর হেমোরেজিক স্ট্রোক ছিল। তিনি এখন আইসিইউতে থাকবেন এবং তার অবস্থা এখনও অত্যন্ত সঙ্কটজনক (Extremely Critical)। নিউরোলজিক্যাল ক্ষতির কারণে তিনি কোমা-সদৃশ (Coma-like) অবস্থায় আছেন। তিনি হয়তো বেঁচে থাকবেন, কিন্তু কখন জ্ঞান ফিরবে, বা ফিরলেও স্থায়ী ক্ষতি কতটা হবে—যেমন আংশিক পক্ষাঘাত বা অন্য কোনো জটিলতা—তা এখনই বলা সম্ভব নয়। আমাদের শুধু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে।”

স্বামীর বেঁচে থাকার খবর পেয়ে রুহানি বেগম কিছুটা শান্তি পেলেন, কিন্তু তার নিস্তেজ শরীর এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা পরিবারটিকে গভীর উদ্বেগে ডুবিয়ে রাখল।

__________________

নির্ণয়ের জ্ঞান ফিরেছে। তাকে শান্ত রাখা যাচ্ছে না কিছুতেই। বারবার শুধু দিয়াকে এনে দিতে বলছে, যেতে চাচ্ছে দিয়ার কাছে। কেমন পাগলামো করছে কিছুতেই মানতে চাইছেনা যে ওটা দিয়া, বারবার ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট চাচ্ছে। নির্ণয়ের অবস্থা বেগতিক। বাড়ির সকলে শুধু নিরবে চোখের পানি বিসর্জন দিয়ে যাচ্ছে।

তখনই ময়না তদন্তের রিপোর্ট ও ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে কেবিনে প্রবেশ করলেন ইন্সপেক্টর রথীন দে। ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট দিলেন নির্ণয়ের হাতে। রিপোর্টে চোখ বুলাতেই নির্ণয়ের পায়ের তলার মাটি সরে গেল। পিছিয়ে গেল কয়েক কদম। নিজের ভারসাম্য হারিয়ে ধপ করে মেঝেতে পড়ে গেল।

চিৎকার করে বলে উঠল-

“না, না এটা কিছুতেই হতে পারে না! আমার দিয়া… আমার ডোডো আমাকে ছেঁড়ে যেতে পারে না।”

বসা থেকে হুড়মুড়িয়ে উঠে দাঁড়ালো নির্ণয় আশা বেগমের নিকটে গিয়ে ঝাপটে জরিয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো-

“ও মা’ মা গো, আমার… আমার পাখি’ আমার ডোডো’ আমার দিয়া ও কীভাবে পারল এটা করতে! ও মা ও বেইমানি করল আমার সাথে।

নির্ণয়ের আহাজারি উত্তেজনা বাড়িয়ে দিতে কেবিনে প্রবেশ করলেন খান পরিবারের দীর্ঘদিনের পরিচিত পারিবারিক ডক্টর আসাদ গাজী। লোকটার মুখটা গম্ভীর। তিনি এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন নির্ণয়ের সামনে, আল্ট্রাসনোগ্রাফির কয়েকটি রিপোর্ট নির্ণয়ের মুখের উপর ছুঁড়ে দিয়ে বললেন-

“সেদিন আমি তোমাকে বলেছিলাম মেয়েটার একটু যত্ন নেও। একটু চোখে চোখে রাখ। কিন্তু তুমি কি করলে?”

নির্ণয় সহ কেবিনে থাকা সকলে অবাক চোখে চেয়ে আছে ডক্টরের দিকে। নির্ণয় খানিক ঝুঁকে রিপোর্ট গুলো হাতে নিল। প্রশ্ন করল-

“এগুলো কিসের রিপোর্ট?”

বলেই আলতো চোখ বুলালো রিপোর্টে এবার যেন নির্ণয়ের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। কাঁপা গলায় প্রশ্ন করল-

“দিয়া….. দিয়া প্রে….প্রেগনেন্ট ছিল? দু…..দুই মাসের?”

ডক্টর আসাদ তাচ্ছিল্য হাঁসলেন। বললেন-

“হ্যাঁ দিয়া দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিল। কিন্তু?

নির্ণয় হিংস্র থাবায় চেপে ধরলো আসাদের শার্টের কলার। গর্জে উঠে বলল-

“ও অন্তঃসত্ত্বা ছিল আমাকে এটা আগে কেনো কস নাই কুত্তার বাচ্চা!”এখন…. এখন কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিতে আইছোত?”

ডক্টর আসাদ ঝাঁকি দিয়ে ছাড়িয়ে নিল নির্ণয়ের হাত। বললেন-

“দিয়া বারণ করেছিল বলতে। কারণ ও চাইছিল তোমাকে সারপ্রাইজ দিতে। কিন্তু হায় তার আগেই তুমি ওকে সারপ্রাইজ দিয়ে দিয়েছ।”

আশরাফুল খাঁন এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন ডক্টর আসাদের সামনে, জিজ্ঞাসা করলেন-

“ঘটনা কী? খুলে বল! আর কিসের সারপ্রাইজ?”

“আমি বলছি ঘটনা কী! আর কিসের সারপ্রাইজ..!!

হঠাৎ কারো তীক্ষ্ণ কন্ঠ স্বর কানে ভাজতেই সবাই দৃষ্টি ঘুরিয়ে তাকালো দরজার দিকে, সেখানে ওয়াহিদ দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে। সবার দৃষ্টি এড়িয়ে ভিতরে প্রবেশ করল ওয়াহিদ, গিয়ে দাঁড়ালো নির্ণয়ের মুখোমুখি বলল-

“কী ফেরেস্তা মহাসয় ঘটনা কী আপনি বলবেন নাকি আমি বলবো?”

নির্ণয় বিভস মুখে তাকালো ওয়াহিদের দিকে। ছেলেটার চোখের পানি টুপটাপ করে ঝড়ে পড়ছে শরীরে এরপর মেঝেতে। প্রশ্ন করল-

“মানে?”

ওয়াহিদ কেমন করে যেন হাঁসলো’ বলল-

“দেখছেন কাহিনী? এখন সে মানে খুঁজছে!”

আশরাফুল খাঁন বিরক্ত হলো ওয়াহিদের এহেন ব্যবহারে, যেতে উঠে বললেন-

#চলবে

#প্রণয়ের_অন্তরমহল
#তাহরিশমিতা_মুনতাহা
#পর্বঃ২২ (বর্ধিতাংশ)

⚠️ অনুমতি ব্যতীত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫

“কী বলতে চাও সোজাসাপ্টা বল। এত ঘুরানো পেছানোর তো মানে হয়না”

ওয়াহিদ ঠোঁট এলিয়ে হালকা হাঁসলো। বেডের ওপর বসতে বসতে বলল-

“সোজাসাপ্টা ভাবে বললে কথার ভার সামলাতে পারবেন তো আঙ্কেল?”

নির্ণয়ের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গছে প্রতি মূহুর্তে প্রতি সেকেন্ডে। তবুও সে নিজেকে সংযত করে বলল-

“কী বলতে চাইছিস?”

ওয়াহিদ ফের বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। পকেট থেকে মোবাইল বের করে একটা ভিডিও চালিয়ে ধরলো সবার সামনে।

ভিডিও টাই স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে নির্ণয় নদীর সাথে অন্তরঙ্গ মুহূর্তে। এমন অপ্রীতিকর দৃশ্য দেখে আশরাফুল খাঁন পিছিয়ে গেলেন কয়েক কদম। বাড়ির সকলে হতবাক হতবুদ্ধি বাকহারা। আশা বেগম তেতে উঠে সজোরে এক চড় বসিয়ে দিলেন নির্ণয়ের গালে’ পরপর আরও কয়েকটা। নির্ণয়ের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। কেমন পাথরের মূর্তির ন্যায় ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটা যেন সে জমে গেছে এখানেই।

কয়েক মূহুর্তে হৈচৈ শুরু হয়ে গেল কেবিনের ভেতর। নির্ণয় দুই হাতে শক্ত করে চেপে ধরেছে ওয়াহিদের কন্ঠ নালী।

“এ্যাই শু*য়ো”রের বাচ্চা এই ভিডিও দেখিয়ে তুই কী বুঝাইতে চাস? আমি আমারই বউ এর বড় বোনের সাথে পরকীয়া করছি? এ্যাই জবাব দে”

ওয়াহিদ ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে দিল নির্ণয়ের হাত। চেঁচিয়ে উঠে বলল-

“ভিডিও টা কী মিথ্যে মনে হচ্ছে? এটাতে স্পষ্ট ভাবে দেখা যে এটা তুই, আর আমার নিজের চোখে দেখা টা তো ভুল হতে পারে না তাই না?”

নির্ণয় পাগলের মত চিৎকার করে বলল-

“বিশ্বাস কর ভাই’ আমার রবের কসম এটা আমি নাহ’ আমি এসবের কিছুই জানি না। তোদের কোথাও একটা ভুল হচ্ছে।

আশরাফুল খাঁন কেমন নিরব হয়ে গেছেন। উনি কোনো কথা বলছেন না চুপচাপ শুধু শুনে যাচ্ছেন। রুহানি বেগম ও অবাক চোখে চেয়ে আছে নির্ণয়ের দিকে। নির্ণয় কেমন ছটফট করে উঠল রুহানি বেগমের হাত দুটো ধরে বলল-

“বিশ্বাস করুন আম্মা এই লোকটা আমি না, এ… এটা অন্য কেউ। আমাকে ওরা ফাঁসাচ্ছে। আমি এটা হতেই পারি না।”

রুহানি বেগম ছলছল চোখে তাকালো নির্ণয়ের দিকে। আটকে আসা স্বরে বললেন-

“আমার মেয়েটা তো তোমাকে মেনে নিয়েছিল বাবা’ মেনে নিয়েছিল নিজের নিয়তি কে, তাহলে তুমি… তুমি এটা কীভাবে করতে পারলে আমার ওইটুকু মেয়েটার সাথে।”

নির্ণয় এবার নিজের চুল গুলো খামচে ধরে মেঝেতে বসে পড়ল। চেঁচিয়ে উঠে বলল-

“আমি আপনাদের কীভাবে বিশ্বাস করাব যে ওটা আমি না।”

ওয়াহিদ মোবাইল টা পকেটে ঢুকিয়ে রেখে এগিয়ে এলো নির্ণয়ের নিকট। বলল-

“ডাক নদীকে তাহলেই তো হয়ে যায়”

***

কেবিনের এক কোণে দেয়াল ঘেঁষে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন ইন্সপেক্টর রথীন দে। তার চোখের দৃষ্টি স্থির, তবে মনের ভেতরে তখন তুষের আগুনের মতো দগদগে হিসেবের খেলা চলছে। তার এতক্ষণ এটা একটা এক্সিডেন্ট মনে হলেও এখন মনে হচ্ছে এটা একটা কোল্ড ব্লাডেড মার্ডার।

হঠাৎ পকেটে ফোন বেজে উঠতেই চমকে উঠলেন ইন্সপেক্টর রথীন দে। এই মুহূর্তে তার মনোযোগ ছিল অন্য কোথাও তাই আকস্মিক রিংটোনে তিনি যেন বাস্তবে ফিরে এলেন।

তাড়াহুড়ো করে পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকালেন। স্ক্রিনে জলজল করে উঠলো: সেভ করা নাম্বারটি’ এস. পি. রঞ্জন মিত্র। তিনি তাড়াহুড়ো করে রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো কারো কর্কশ কন্ঠ স্বর-

“এত সময় লাগে ফোন রিসিভ করতে?

“স…সরি স্যার”

“তাড়াতাড়ি অফিসে আসো”

“জ্বী স্যার”

বাক্য শেষ হতেই কল কাট হলো। ইন্সপেক্টর রথীন তড়িঘড়ি করে বের হয়ে এলেন কেবিন থেকে। কনস্টেবল কে কিছু একটা ইশারায় বললেন অতঃপর গাড়িতে বসে চলে গেলেন নিজ গন্তব্যে।

***

নদী কে অন্য কেবিন থেকে একজন নার্স ধরে নিয়ে এসেছেন নির্ণয়ের কেবিনে। নদী ভেতরে প্রবেশ করতেই ওর উপর প্রচন্ড ক্ষোভে ঝাঁপিয়ে পড়লো নির্ণয়।

“ওটা আমি ছিলাম? বল সত্যি কথা বলবি নয়তো জ্যান্ত দাফন করে দিব। একটা মিথ্যা ও শুনতে চায়না আমি।”

নির্ণয়ের হিংস্র থাবায় ভয়ে জমে গেছে নদী। লোকটা কে সে রেগে গিয়ে এভাবে উচ্চ স্বরে কথা বলতে দেখেনি কখনো।

“এই জবাব দে। কথা ক”

নদী ভয়ে এবার ঠুকরে কেঁদে উঠল, নির্ণয়ের পায়ের কাছে বসে পা দুটো জাপটে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। আকস্মিক এহেন কান্ডে খানিক ভরকালো নির্ণয়, দু কদম পিছিয়ে গিয়ে খেকিয়ে বলে উঠল-

“একদম ছুঁবিনা আমাকে, দূরে যাহ।

নদীর কান্না থামছে না কিছুতেই। ভয়ে গুটিয়ে গেছে মেয়েটা। ওয়াহিদ এগিয়ে এসে দাঁড়ালো নদীর সামনে। ভিডিও টা ফের চালিয়ে ধরলো নদীর সামনে ছেলেটাকে দেখিয়ে বলল-

“এটা কে?

নদী দৃষ্টি তুলে একবার তাকালো নির্ণয়ের দিকে, শুকনো ঢোঁক গিলে আমতা আমতা করে বলল-

“নি…..নির্ণয়’

নির্ণয়ের রাগ এবার আকাশ সম। ও হুংকার ছেড়ে বলল-

“এ্যাই চোতমারানি’ কী কইলি? আবার ক’ আমি শুনি নাই আবার ক”

ওয়াহিদ নদী ও নির্ণয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে, নির্ণয়ের উদ্দেশ্যে বলল-

“মুখ সামলে নির্ণয় ও তোর বউ না”

নির্ণয় নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে অত্যন্ত শান্ত স্বরে বলল-

“ওটা কি আমি ছিলাম নদী? সত্যিটা কি সেটা বল প্লিজ”

সবাই তাকিয়ে আছে নদীর মুখের দিকে। নদী ফের আরেকবার সবার দিকে দৃষ্টি ঘুরালো। অপরাধীর ন্যায় মাথা নত করে বলল-

“ওটা নির্ণয় না অন্য কেউ ছিল। তবে কিছুটা নির্ণয়ের মতই দেখতে।

______________

দুপুরের তপ্ত রোদে নাজেহাল অবস্থা সকলের। নদীর পরনে থাকা জামাটা ঘামে ভিজে একাকার। এই ভর দুপুরে কেউ বাসা থেকে বের হয়না বললেই চলে। তবে নদী বেরিয়েছে। হাতে তার একটি বড় সড় বাজারের ব্যাগ! আর ব্যাগ ভর্তি বাজার।

নদীর হাসবেন্ড মোশারফ বাড়িতে পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে। আর বউ দিয়ে ঘরে বাহিরে সকল কাজ করাচ্ছে। নদীর মেজাজ তখন তুঙ্গে এত বড় ব্যাগ নিয়ে হাঁটা যায় নাকি? তখনই পেছন থেকে কেউ ডেকে উঠল-

“এ্যাই যে শুনেন আপনার টাকা পড়ে গেছে”

নদী প্রথমে পাত্তা না দিলেও ছেলেটা যখন তার সামনে এসে পথ আটকে দাঁড়ালো নদীর চোখ যেন ছানাবড়া। একি ছেলেটা তো হুবুহু নির্ণয়ের মতো দেখতে। ফর্সা গায়ের রং একদম নির্ণয়ের মত, দেখতেও কিছুটা নির্ণয়ের মতই। নির্ণয়ের কার্বন কপি বলা যায়।

“কী দেখেন এভাবে তাকিয়ে? কোনোদিন সুন্দর ছেলে দেখেননি বুঝি?”

নদী কপাল কুঁচকে বিরক্তি নিয়ে তেতে উঠে বলল-

“এ্যাই ছেলে সর সামনে থেকে’ রাস্তা ঘাটে একা একটা মেয়ে দেখলেই চুলকানি উঠে?”

ছেলেটা নদীর কথার বিপরীতে হালকা হাসলো। হাতে থাকা পাঁচশত টাকা নোট টা নদীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল-

“আপনার মত তো আর সবাই টাকা ফেলে রেখে যায় না, তাই চুলকানি ও উঠে না।”

নদী হাতের ব্যাগটা এক সাইডে রেখে পার্সটা চেক দিতেই দেখলো সত্যি পাঁচশত টাকা উধাও। নদী কিছুটা অপ্রস্তুত হেঁসে বলল-

“সরি কিছু মনে করবেন না, আমি বুঝতে পারিনি।”

লোকটা মৃদু হেঁসে বলল-

“কোনো বেপার নাহহ’

****

এই পর্যায়ে এসে থামলো নদী। নির্ণয় কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। প্রশ্ন করল-

“তারপর?”

নদী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল-

তারপর অনেকদিন কেটে গেল। মাঝে মাঝে ছেলেটার সাথে দেখা হলে কথা হতো। দু’জন খুশ গল্প করত জমিয়ে। আসতে আসতে ভালো বন্ধু হয়ে উঠল দু’জন।

হঠাৎ একদিন নদীর হাসবেন্ড মোশারফ নতুন এক মেয়ে মানে বউ নিয়ে বাড়ি ফিরলো। নদীর মাথায় যেন আসমান ভেঙ্গে পড়লো। যার জন্য সব ছেড়ে আসলো আজ সে লোকটাই তাকে ছেড়ে দিল। নদী হাজার বুঝিয়েও লাভ হলো না কিছুই। তাই নদীর এসব মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো রাস্তা ছিল না।

এভাবে চলতে থাকল দিনকাল। প্রথম কয়েকদিন ভালো চললেই পরের দিন গুলো ছিল ভয়াবহ। নদীর সতীন উঠে পড়ে লাগলো মেয়েটাকে তারাতে। রোজ মারধর’ খাবার না দেওয়া আরও কত অত্যাচার।

এভাবে কাটতে থাকলো দিন। না খেয়ে বাড়ির সব কাজ করা, শ্বাশুড়ির অত্যাচার সতিনের স্বামীর সব মিলিয়ে নদী অতৃপ্ত। ডিভোর্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। এরপর মোশাররফের সাথে ডিভোর্স হয়ে গেল নদীর।

চলে এলো বাপের বাড়ি। চলতে থাকলো দিন। বাবা মায়ের হাজার খানেক কটু কথা গ্রামের মানুষের কথা হজম করে চলতে থাকলো। দিয়া তখন বেশ সুখী নদীর চোখে। হিংসা হলো খুব। এই সুখ আমার হওয়ার কথা ছিল। এসব আমার। যেগুলো এখন দিয়ার। এসব আমার ফিরত চাই।

নদী হিংসাত্মক হয়ে পরিকল্পনা সাজানো শুরু করলো নির্ণয়ের বিরুদ্ধে। তবে তেমন কিছুই পাচ্ছিল না যেটা দিয়ে দু’জন কে আলাদা করা যায়।

এরপর হঠাৎ একদিন দেখা হয় সেই ছেলেটার সাথে’ নাম তার আলামিন’ নদীর মাথায় তখন হাজার খানেক শয়তানি বুদ্ধি জেকে বসে।

সেদিন শুক্রবারে যখন নদী দেখল নির্ণয় দিয়ার সাথে রেগে বেরিয়ে গেছে বাড়ি থেকে। তখনই নদী আলামিন কে ডেকে আনে খাঁন বাড়িতে। আর নিজের পরিকল্পনা মত কাজ করে।

ভাগ্য বসত সেদিন শুধু দিয়া নয় ওয়াহিদ ও দেখে সেই ঘটনা। এবং দূর থেকে ভেবে নেই এটাই নির্ণয়। আর আমার কাজ সফল হয়ে যায়।

_______

পুরো কেবিন থমথমে। কারো মুখে কোন কথা নেই। নির্ণয় ছুটে এসে শক্ত হাতে খামচে ধরল নদীর চুলের মুঠি। চিৎকার করে বলল-

“আমার বউ কই?

নদী ঠুকরে কেঁদে ওঠে উঠলো। মেয়েটা হয়তো বুঝতে পেরেছে নিজের ভুল। তাই তো সে অনুতপ্ত। কাঁদতে কাঁদতে বলল-

“বিশ্বাস করুন আমি কখনো এমনটা চাইনি। আমি শুধু চেয়েছি আপনাদের আলাদা করতে। এর থেকে বেশী কিছু না।”

“আমার দিয়া কোথায়? কী করেছো তুমি ওর সাথে?

“আমি কিছু করিনি। ও… ও নিজে গিয়ে ধাক্কা খেয়েছে ট্রেনের সাথে আমার… আমার চোখের সামনে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে ও….

ওয়াহিদ এগিয়ে এলো বলল-

“যাক মেয়েটা অন্তত মুক্তি পেয়েছে তোর এমন অমানবিক নির্যাতন থেকে।”

একটার পর একটা ধাক্কা সামলে উঠতে পারছেনা কেউই। তবুও শক্ত পাথরের ন্যায় দাঁড়িয়ে। আশরাফুল খাঁন এবার মুখ খুললেন-

“নির্যাতন মানে? কি বলছ ভেবে চিন্তে বলছ তো?”

“জ্বী আঙ্কেল ভেবে চিন্তেই বলছি। জিজ্ঞাসা করুন তো আপনার এই নিষ্পাপ ছেলেকে। বিয়ের দিন থেকে ঠিক কী কী করেছে মেয়েটার সাথে?”

আশরাফুল খাঁন খানিক্ষণ চুপ থেকে নির্ণয়ের উদ্দেশ্যে বলল-

“কি বলছে ও এসব?”

নির্ণয় দুই হাত দিয়ে চেপে ধরল নিজের মুখ। নিম্ন স্বরে বলল-

“যা বলেছে সব সত্যি আব্বু।”

বাক্য শেষ হতে সময় লাগলেও নির্ণয়ের গালে সপাটে চড় পড়তে দেরি হল না মোটেই। আশরাফুল খাঁনের শক্ত হাতের চড় এতটাই জোরে ছিল যে নির্ণয় কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। গালে হাত দিয়ে অবাক চোখে তাকালো আশরাফুল খাঁনের দিকে।

আশরাফুল খাঁন গর্জে উঠে বললেন-

“তুই আমার ছেলে হতেই পারিস না। ছিঃ তোর থেকে অন্তত এটা আশা করিনি কখনো। চলে যা আমার চোখের সামনে থেকে এক্ষুনি নয়তো আজ তুই আমার হাতে খুন হবি।”

“ভাইজান চুপ করো, মানুষ জন শুনতাছে।

স্বর্ণা বেগমের কথায় আরও খানিকটা তেতে উঠলেন আশরাফুল খাঁন। বললেন-

“তোদের আঙ্কারা পেয়ে পেয়ে ছেলেটা আজ অমানুষ হয়ে গেছে।”

বাক্য শেষ করে নিজেই বেরিয়ে গেলেন কেবিন থেকে। পেছনে পেছনে গেল ওয়াহিদ। পুরো কেবিন নিস্তব্ধ। কারো মুখে কোন রা নেই। সবাই যেন পাথরের মূর্তি।

________________

ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবেশদ্বারের সামনে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওয়াহিদ। তার চোখেমুখে সুস্পষ্ট অস্থিরতা, যা চাপা দিতে সে বার বার এদিক ওদিক তাকাচ্ছে।

বিমানবন্দরের বিশাল কাঁচের দেওয়ালে রাতের শহরের ঝলমলে আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। ওয়াহিদ প্রধান ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে অধীর আগ্রহে ঘড়ি দেখছে বার বার। বোধহয় কোনো গুরুত্বপূর্ণ কারও অপেক্ষায় সে।

সময় তখন রাত ৯টা বেজে ৩৫ মিনিট। শীতকালীন রাতের ঠান্ডা বাতাস বিমানবন্দরের প্রশস্ত চত্বরে বইছে, কিন্তু ওয়াহিদের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে, সে অস্থির। এভাবে আরও মিনিট দশেক কেটে গেল। ওয়াহিদের অস্থিরতা ক্রমশ বাড়ছে।

ওয়াহিদ ফের ঘড়ি দেখল। ৯টা বেজে ৪৫ মিনিট। ঠিক তখনই, তার সামনে এসে দাঁড়ালো এক ব্যক্তি।

কালো পোশাক, হাঁটু পর্যন্ত লম্বা ওভারকোট এবং একই রঙের মাস্কে মুখ ঢাকা। চুলগুলো শক্ত করে পেছনে বাঁধা। ওয়াহিদ লোকটার দিকে তাকাল। মাস্ক এবং শীতের পোশাকের আড়ালে সে পুরুষ নাকি নারী, তা স্পষ্ট নয়।

ওয়াহিদ লোকটির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। লোকটির হাতে একটি কালো অ্যাটাচি কেস। ওয়াহিদ তাকালো লোকটার দিকে এরপর কেবল মাথা নেড়ে নীরবে ইশারা করল। আর কোনো কথা নয়।

কালো পোশাক পরিহিত ব্যক্তিটি দৃষ্টি তুলে একবার তাকালো ওয়াহিদের মুখের দিকে এবং মুহূর্তের জন্য ওয়াহিদের চোখে চোখ রেখে ঘুরে দাঁড়ালো। তারপর দ্রুতপায়ে প্রস্থান গেটের দিকে হেঁটে গেল।

কাঁচের ফাঁকা দিয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সব কিছু। কয়েক মিনিটের মধ্যেই লোকটি প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সেরে ফেলল এবং গেট ৮-এর দিকে দ্রুত হেঁটে যেতে যেতে একবার তাকালো পেছন ফিরে।

বিমানবন্দরে তখন বিমান ছাড়ার গুঞ্জন। ওয়াহিদ শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে সেদিকে। দুবাইগামী বিমানটি কিছুক্ষণের মধ্যেই রানওয়ে ধরে ছুটে চলল, লোকটা কে নিয়ে উড়াল দিল অজানা গন্তব্যের দিকে। ওয়াহিদ শুধু চেয়ে রইলো নির্বিঘ্নে।

#চলবে