#প্রণয়ী_পায়রা
লাবিবা ওয়াহিদ
| পর্ব ০৩ |
(কপি নিষেধ)
ফায়ান নিঃশব্দে পিস্তলের গুলি চেক করছে আর তার চাচ্চু সিগারেট ফুঁকছে। তার নিষ্প্রভ চাহনি ফায়ানের দিকেই স্থির। বেশ কৌতুহল নিয়ে ফায়ানের কাজগুলো দেখছে সে। ফায়ান গুলি চেক করতে করতেই ইকবালকে প্রশ্ন করলো,
-’তুমি বারবার আমার শুট করা কেন দেখতে চাও?’
-‘এক আলাদা আকর্ষণ আছে তাই সারাদিন লাগিয়ে দেখলেও বিরক্তি আসে না। তোকে আর তোর শুট করা দেখার মতো শান্তি এ দুনিয়ায় আমার জন্য দুটো আছে বলে মনে হয় না! অনেকে মেয়ের নেশা করে আর আমি নাহয় তোর নেশা করি!’
ফায়ান হাসলো। ফায়ানের হাসির কোনো শব্দ নেই। ইকবাল আবারও সপ্তপর্ণে বলে ওঠে,
-‘বিশ্বাস কর ফাই, তুই যে আমার কতো বড় ইচ্ছা পূরণ করলি তুই নিজেও ভাবতে পারছিস না। শেষ পর্যন্ত আমার ভাইপো মা…’
-‘বাদ দাও! গান রেডি!’
বলেই চোখে নরমাল গ্লাস দেয়ার বদলে সে সানগ্লাস পরলো। বড়ো মোটা হেডফোনও কানে লাগালো। ইকবাল অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে,
-‘একি ফাই? এই আবছা আলোর মাঝে আবার সানগ্লাস পরেছিস কেন? নিশানা ছুটে গেলে?’
এতক্ষণে ফায়ানের অধর জোড়ায় বাঁকা হাসি আসলো। হাসিটা বড্ড রহস্যময়। ফায়ান তার গান নিশানায় ধরে বাঁকা হাসি দিয়েই বলে,
-‘আজ নাহয় তোমায় আরেকটু আকর্ষণ করাই!’
ইকবাল হাতে সিগারেট ধরেই অধর জোড়া কিঞ্চিৎ ফাঁক করে বিস্মিত দৃষ্টিতে ফায়ানের দিকে তাকিয়ে আছে। ফায়ান একবার চোখ বুঝলো! অতঃপর চোখ মেলে তীক্ষ্ম দৃষ্টিপাত নিক্ষেপ করলো নিশানার দিকে। মুহূর্তে-ই গুলির শব্দ হলো! ইকবাল চেয়ে চেয়ে শুধু দেখলোই। হাতে সিগারেটের ছ্যাঁকা লাগতেই সিগারেটটা হাত ফসকে পরে যায় এবং ইকবালের ধ্যান ভাঙ্গে। ফায়ান ততক্ষণে বার দুয়েক গুলি করে ফেলে। ইকবাল এবার এক গার্ডকে লাইট জ্বালানোর ব্যবস্থা করতে বলে কারণ, নিশানাটা আলোর থেকে কিছুটা দূরে।
গার্ড বড় লাইট অন করতেই ইকবাল সটান করে উঠে দাঁড়ায়। ফায়ান ততক্ষণে হেডফোন আর গ্লাসটা খুলে ফেলে। ইকবাল তুলোর মোটা ডলটা মানে নিশানার চারপাশে ভালো করে লক্ষ্য করতে ব্যস্ত। গুলি একদম বুক বরাবর লেগেছে। ফায়ান তার ফোন চেক করতে করতেই ইকবালকে জানায়,
-‘আজকের জন্যে এইটুকুই চাচ্চু! আমার কাজ আছে যেতে হবে। আর হ্যাঁ! তোমাকে আজ যেই এগ্রিমেন্ট দেয়া হয়েছে সেটা বাস্কেটে ফেলে দেও।’
-‘মানেহ?’
-‘শুনো নি? ওটা ফেলে দেও, ভুল করেও ওটায় কলমের দাগও লাগাবা না! ওটা একটা ট্রেপ! ফাঁদে পা দিও না।’
-‘সেটা নাহয় বুঝলাম কিন্তু তুই খবর পেলি কীভাবে আমি আজ কোনো এগ্রিমেন্ট পেয়েছি?’
ফায়ান তার সত্যটি চেপে বললো,
-‘কী জানি? এনিওয়ে, আই উইল বি গো নাও! গুড নাইট!’
বলেই ফায়ান সিক্রেট রুমটি প্রস্থান করলো। ইকবাল সেখানেই ‘থ’ মেরে দাঁড়িয়ে রইলো। বিড়বিড় করে বললো,
-‘তোর সব ভালো লাগে কিন্তু এই ভার্সিটির শিক্ষকতা করাটা কেন যেন ভালো লাগে না। কতো দিক সামলাবি তুই?’
নিকষ কালো রাত! ঘন্টাখানেক পূর্বেই মেঘরাশির দল চাঁদকে ঘিরে রেখেছে, যেন চাঁদ তার মিষ্টি রূপ দুনিয়ায় বহিঃপ্রকাশ করতে না পারে। শীতল বাতাসে রাতটা বড়োই বেসামাল লাগছে। যেন এখনই মেঘ গর্জে উঠবে! অবশ্য তীক্ষ্ম আলোর ঝলক পশ্চিমাম্বরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ যেন বৃষ্টির পূর্বাভাস! এই আবহাওয়ায় ফায়ান তার ফার্মহাউজের দিকে ছুটছে। ড্রাইভিং করতে করতে হঠাৎ তার ফোন বেজে ওঠে। ফায়ান কোণা চোখে ফোনের ওপাশ তাকালো। বড়ো বড়ো অক্ষরে “অনল” নামটি ভেসে উঠেছে। ফায়ান এক হাতে ফোন নিয়ে রিসিভ করলো। অনল কিছু বলার আগেই ফায়ান বলে ওঠে,
-‘আসছি আমি, তুমি সেখানেই থাকো!’
বলেই অনলকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ফায়ান খট করে কল কেটে দেয়।
——————————–
-‘আজ ভার্সিটিতে যারা সিনক্রিয়েট করেছিলো তাদের সকলের ফুল ডিটেইলস আমার চাই! আই নিড দেয়ার ডিটেইল! এজ সোন এজ পসিবল!’
-‘এই পার্সেল্টার কী করবো স্যার?’ হাত দিয়ে সামনের পার্সেলগুলোর দিকে ইশারা করলো!
-‘কাটারটা আমায় দেও!’
অনল ফায়ানের হাতে কাটারটা এগিয়ে দিতেই ফায়ান সেই পার্সেলগুলো খুলে দেখলো এখানে সব ধরণের দামী দামী ড্রাগস! ফায়ান বাঁকা হাসলো। ফায়ান সরু দৃষ্টিতে ড্রাগস গুলোকে পর্যবেক্ষণ করে অনলের উদ্দেশ্যে বলে,
-‘ড্রাগসে আগুন জ্বলে ভালো! সেই ব্যবস্থাই করে ফেলো!’
অনল বিস্মিত হয়ে ফায়ানের দিকে তাকালো। এতো দামী ড্রাগস তার উদ্ধার করলো আর সেই ড্রাগস কে কি না এক মেছের কাঠিতেই জ্বালিয়ে খা করে দিবে? অনল অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে,
-‘কিন্তু স্যার, এতো দামী…’
-‘দিস ইজ মাই ফাস্ট এন্ড ফাইনাল ডিসিশন!’ অনলের কথায় ফোড়ন কেটে ফায়ান কাঠ কাঠ গলায় বললো। অনল দ্বিরুক্তি করার সাহস পেলো না। পদতলের নিকট দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মাথা নাড়িয়ে গার্ডদের অর্ডার করে। তারা ড্রাগসগুলো নিয়ে বেরিয়ে যায়। ফায়ান উঠে দাঁড়ায় এবং মুখে এক চুইংগাম পুরে সেটা চিবুতে চিবুতে তার পুরো সিক্রেট রুমটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগে। দেয়ালের এক পাশ পেপারের ছোট বড় অগণিত টুকরো। কিছু কিছু চিরকুটে গাঢ় মার্কারের দাগ! আবার অনেকের ছবিও লাগানো আছে। ফায়ান তার মাঝে এক কোণায় লাগানো ছবিটি দেখে আনমনে হেসে উঠলো। আলতো করে ছবিটা ছুঁয়ে আবারও নিজের হাত পকেটে ঢুকিয়ে নিলো।
—————————–
আরোরা একপ্রকার দৌড়াচ্ছে ভার্সিটির থার্ড ফ্লোরের কর্ণারে। এমনেই লেট করে ফেলেছে তার উপর লাস্ট উইকে ফায়ানের দেয়া এসাইনমেন্টটা সে হারিয়ে ফেলেছে। দেরী হয়ে যাওয়ায় এসাইনমেন্টটা ব্যাগে না রেখে হাতে নিয়েই ছুটেছিলো। এখন তাড়াহুড়োয় কখন হাত ফসকে গেছে আরোরা ভেবেই পাচ্ছে না। আজ নির্ঘাত তার কপালে গভীর দুঃখ আছে। ফায়ান তো এমনিতেই তাকে সহ্য করতে পারে না। আরোরা তার মুখে পরা চুলগুলো কানে গুঁজে ঘর্মাক্ত কপালে কপালে ওড়নার বিচরণ চালালো। অতঃপর সিঁড়ির দিকে যাওয়ার আগেই আরিশা এবং রুহান চলে আসলো। ক্লাস শুরু হতে আর কিছুক্ষণ বাকি! আরোরা কপালে হাত দিয়ে ফুঁ দেয়ার মতো মুখ করে নিঃশ্বাস ফেলছে। অনেকটা হাঁপিয়ে গেছে সে। আরিশা আরোরার উদ্দেশ্যে বললো,
-‘কী হলো এখনো পাসনি?’
-‘নাহ! কই ফেলেছি বুঝে উঠতে পারছি না!’
-‘এখন উপায়?’
-‘জানি না আমি! মাথা কাজ করছে না। ওই ইংরেজটা নির্ঘাত আমায় চাউমিন বানিয়ে খাবে। এ তো ইংরেজ তার উপর আল্লাহ জানে কেমন পানিশমেন্ট দেয়! আমেরিকান স্টাইল দিলে আমি সেখানেই ইন্না-লিল্লাহ হয়ে যাবো!’
আরিশা কিছু বলার আগেই রুহান শক্ত করে আরিশার হাত চেপে ধরলো। আরিশা বিরক্তি নিয়ে রুহানের দিকে তাকালো এবং বিরক্তির স্বরে বললো,
-‘কী?’
রুহান চোখ বড়ো বড়ো করে আরোরার পিছে কিছু ইশারা করলো। আরিশা রুহানের ইশারা বুঝতে না পেরে সেদিকে তাকালো এবং সে নিজেও রুহানের মতো মুখ-ভঙ্গি করে থম মেরে রইলো। আরোরা ওদের এহেম কান্ডে বেকুব বনে গেলো। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছে ফিরতেই আরোরার ঘর্মাক্ত মুখশ্রী আরও দ্বিগুণ করে ঘামতে লাগলো। অন্তঃপুরে অলরেডি ঢিপঢিপ শব্দ শুরু হয়েছে এবং তা তীব্র ভাবে বেড়েই চলেছে। ভয়ে মৃদু কাঁপছে তার অধরজোড়া! অঢেল ভয় নিয়ে কম্পিত গলায় বলে ওঠলো,
-‘স..স্যার?’
ফায়ান পূর্বের ন্যায়ই অগ্নিময় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকিয়ে আছে আরোরার দিকে। রাগ দেখেই বোঝা যাচ্ছে আরোরার সব কথা সে শুনে নিয়েছে! ফায়ান এক পকেটে হাত গুঁজে আরেক হাতের কাগজগুলো নেড়ে নেড়ে গলায় কাঠিন্য এনে বলে,
-‘আমি ইংরেজ?’
-‘না মানে, ক..কে বললো আপনি ইংরেজ?’ ফায়ানের উক্তিকে অস্বীকার করে তোতলানো ভঙ্গিতে বললো আরোরা।
ফায়ান আরোরার উপর থেকে নিচ অবধি দেখে বলে,
-‘তাহলে কাকে ইংরেজ বলছিলে?’
আরোরা কী বলবে ভেবে পেলো না। আরোরার ভাবনার মাঝেই আরিশা ফট করে বলে ওঠে,
-‘একচুয়ালি স্যার, আমরা সতেরো শতকের ইংরেজ নিয়ে আলোচনা করছিলাম। আমার ছোট বোন আবার আর্টসের ছাত্রী। সে বিষয়েই…’
-‘ওহ ফাইন! তা ক্লাসে না গিয়ে এখানে কী করছো?’
-‘একচুয়ালি স্যার, আমার ইংলিশ এসাইনমেন্টটা হারিয়ে ফেলেছি। সেটাই খুঁজছি!’
ফায়ান তার হাতের কাগজ গুলোতে চোখ বুলিয়ে কিঞ্চিৎ ভ্রু কুচকালো। ভ্রু যুগল একত্রিত করে বললো,
-‘আরোরা বিনতে মুনীব! এটা তুমি-ই রাইট?’
-‘ই..য়েস স্যার! তাহলে আমার এসাইনমেন্ট কী এটাই?’ মুখশ্রীতে আনন্দ ফুটিয়ে বললো আরোরা।
-‘নাম যেহেতু আছে সেহেতু তোমারই!’
আরোরা ফায়ানের থেকে এসাইনমেন্টটা নিতে গেলেই ফায়ান হাত অন্যদিকে নিয়ে হতবিহ্বল হয়ে বললো,
-‘নিচ্ছো কেন?’
-‘আমার এসাইনমেন্ট, আপনি না দিলে ক্লাসে কীভাবে দেখাবো স্যার?’
ফায়ান হাতের এসাইনমেন্টের দিকে তাকিয়ে বললো,
-‘এটা তো তুমি হারিয়ে ফেলেছো এন্ড আমি এটা পেয়েছি। এখন এটা তুমি কিছুতেই পাবে না। যে সামান্য এসাইনমেন্টের খেয়াল রাখে না, তাকে হেল্প করা আমার পার্সোনালিটির সাথে যায় না। গো টু ক্লাস! নয়তো আমার পরে ক্লাসে ঢুকলে কঠিন পানিশমেন্ট দেয়া হবে। স্পেশালি ইউ, কেয়ারলেস গার্ল!’
বলেই ফায়ান সেখানে না দাঁড়িয়ে সিঁড়ির দিকে চলে গেলো। হয়তো আরোরার এসাইনমেন্ট’টা তার কেবিনে রেখে আসতে। আরিশা ব্যথিত হয়ে বললো,
-‘ক্লাসে চল! এখানে দাঁড়িয়ে থেকে কাজ নেই!’
-‘ইংরেজের বংশধর!’
-‘প্লিজ বোন আবার ওই খাতারনাক ওয়ার্ড ইউজ করিস না! দেখলি না কেমন ফাঁসলাম?’
-‘তুই চুপ কর, আরিশা! ওই ইংরেজটা ইচ্ছা করে, ইচ্ছা করেই আমার এসাইনমেন্ট আটকিয়েছে!’
-‘মানে? কেন?’ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিপাত নিক্ষেপ করে বললো রুহান।
-‘ওইযে আমি ইংরেজ বলেছি তাই। এও ভুল টাইমে এন্ট্রি নিয়েছে। এ তো পানিশমেন্ট দেয়ার জন্যে দুই ধাপ এগিয়ে থাকে। যতোই বলুক, আমি তার চালাকী ভালোভাবেই ধরতে পেরেছি!’
-‘এখন কী করবো?’
-‘উপায় থাকলে বলে দে কী করতে হবে?’ আরিশার দিকে অগ্নিময় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো আরোরা। আরিশা উপায়ন্তর না পেয়ে চুপ করে রয়! অতঃপর তিনজনই নিরাশ হয়ে ক্লাসে চলে গেলো। কে জানে ফায়ান আরোরার সঙ্গে কী করে!
~চলবে, ইনশাল্লাহ।
বিঃদ্রঃ আজ রিচেক দেয়ার সৎ সুযোগ হয়ে ওঠেনি পাঠকমহল, তাই ভুলত্রুটি ক্ষমাসুলভ দৃষ্টিতে দেখবেন।