#প্রণয়ী_পায়রা
লাবিবা ওয়াহিদ
| পর্ব ০৪ |
আরোরার ভাবনা অনুযায়ী ফায়ান ঠিকই তাকে পানিশমেন্ট দেয়। পানিশমেন্ট হলো ক্লাসরুমের বাইরে পুরো ক্লাস দাঁড়িয়ে থাকা। উষ্ণ আবহাওয়া সাথে কাঠফাটা রোদও ক্যারিডোরে কড়াভাবে প্রবেশ করেছে। এই তাপের উত্তাপে দাঁড়ানোর মতো অবস্থা আরোরার নেই। তাই সে সেখানে দাঁড়িয়ে না থেকে পুরো ক্যাম্পাস ঘুরে বেড়ায়। ক্যান্টিন গিয়ে কোল্ড কফিও খেয়ে নেয়। আরোরার ভাব এমন “কারো আদেশ মানি না, আমি চির স্বাধীন!” টাইপ। সে আবেশে কফি গিলে ক্লাস শেষ হবার কিয়ৎক্ষণ পূর্বে ক্লাসের বাইরে এসে ভদ্র মেয়ের মতো দাঁড়িয়ে রইলো। মিনিটখানেকের মাঝেই ফায়ান ক্লাস শেষ করে বের হলো। আরোরার পানে অগ্নিময় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে লম্বা লম্বা পা ফেলে চলে গেলো!
ফায়ান যেতেই যেন সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। আরোরার অন্তঃপুরে যেন প্রশান্তি বিরাজ করছে। ফিলিংস এমন ইংরেজদের পুণরায় বাঙালি হারিয়ে দিলো নিখুঁত বুদ্ধির সাহায্যে। পুণরায় বাঙালির জয় হলো বাহ! আরোরা সুখের নিঃশ্বাস ফেলে ঠোঁট জোড়ায় তার চিরচেনা মিষ্টি হাসি ফুটালো। প্রকাশ্যে না হোক, ফায়ানের অগোচরে তো ঠিকই তার কথার অমান্য করেছে। আরোরা জানে সে প্রকাশ্যে কখনোই ফায়ানের সাথে লাগতে পারবে না, যতোই হোক সে টিচার আর আরোরা স্টুডেন্ট। আরোরার বিবেক ওতোটাও তুচ্ছ নয় যে সে প্রকাশ্যে স্যারের সাথে বেয়াদবি করবে। তাই সে ফায়ানকে না জানিয়েই এরূপ কাজ করেছে। ফায়ান যদি নিজের কাছে এসাইনমেন্ট রেখে আরোরাকে পানিশমেন্ট দেয় তাহলে আরোরাও পানিশমেন্টকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে পুরো ক্যাম্পাস ঘুরে বেড়াতে পারে।
আরোরা খুশি খুশি মনে ক্লাসে প্রবেশ করতেই আরিশা এবং রুহান ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো। যেই মেয়ের এতক্ষণে ঘামে জর্জরিত হয়ে, ওড়না দিয়ে বাতাস করার ভঙ্গিতে হা-হুতাশ করার কথা সেই মেয়ে কানে চুল গুজে হাসি-খুশি মুখে ক্লাসে প্রবেশ করছে। এ যেন পাগলে ধরার পূর্ব লক্ষণ! আরোরা ওদের দিকে ধ্যান না দিয়েই আয়েশ করে নিজের সিটে বসে শান্তির নিঃশ্বাস ফেলতে লাগলো। অন্তঃপুরে সে একটাই স্লোগান দিচ্ছে,
“সে পেরেছে, পেরেছে। ফায়ানকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখাতে পেরেছে, পেরেছে!”
আরোরার প্রশান্তিতে হঠাৎ বেগড়া বাঁধালো আরোরার ক্লাসের এক মেয়ে গ্যাং! তাদের মধ্যে লামিসা কটাক্ষ স্বরে বলে,
-‘এই পিউ! আরোরাকে না ফায়ান স্যার পানিশমেন্ট দিয়েছিলো? হা হা হা! লাস্ট মোমেন্টে ফায়ান স্যার কী ধমকটাই না দিলো। আমি তো ভাবলাম বেচারী কেঁদে ক্লাস ভাসাবে! কিন্তু দেখ, বেহায়ার মতো হাসছে। এই মেয়েগুলাও যে এতো বেহায়া কীভাবে হয়, মাই গড!’
লামিসার বাক্যগুলি আরোরার কর্ণাধারে প্রবেশ করতেই সে চোখ খুলে সোজা হয়ে বসলো। অতঃপর ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে মিষ্টি করেই বলতে লাগে,
-‘আসলে হয়েছে কী লামিসা, আমি একজন স্টুডেন্ট। সেই হিসেবে ভুল-ত্রুটির জন্যে স্যারদের থেকে কতোই তো পানিশমেন্ট ধমক খেতে হয়! তুমিও দেখো না গতকাল তুমি আর তোমার পুরো গ্যাংকে রফিক স্যার কান ধরে উঠবস করালো! কই আমি তো একবারও তোমায় পর্যবেক্ষণ করে দেখিনি যে তুমি হাসছো না কাঁদছো? হেসেছো তো নিশ্চয়ই কারণ, তোমার ওই বি নেগেটিভ মার্কা হাসিতে তো ক্লাসের দেয়ালও কানে হাত দিয়ে রাখে! যাইহোক, এর থেকেই প্রমাণিত হয় তুমিও যেমন স্টুডেন্ট তেমনই আমিও! তুমিও বেহায়া আমিও বেহায়া, হিসাব মিলে গেছে সিম্পল। সামান্য কিছু সময়ের পানিশমেন্টে কাঁদার মতো মেয়ে অন্তত আমি নই!’
আরোরার কথায় ক্লাসের সবাই একদফা হাসলো। লামিসা ফুঁসতে ফুঁসতে আরোরার দিকে অগ্নিময় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আছে। রাগে সে খানিকটা বেসামালও হয়ে পরেছে। যেই কিছু বলবে তৎক্ষণাৎ টিচার প্রবেশ করলো। সকলে বিন্যস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে টিচারকে সালাম জানালো। অতঃপর ধারাবাহিকতা অবলম্বন করেই বাকি ক্লাসগুলো শেষ হয়।
———————
বাসায় আসার পর থেকেই আরোরা তার মাকে কেমন গোমড়া মুখো অবস্থায় দেখছে। আরোরাকেও কিছু বলছে না সে। নিশ্চুপ হয়ে রান্না সেরে নিজের ঘরে চলে যায় অনন্যা। অনন্যার এরূপ আচরণে আরোরা বিস্মিত হয়। তার মা তো এমন নয়। তাহলে? কী হলো হুট করে? আরোরা যেন গভীর চিন্তায় মজে গেলো। ফ্রেশ হয়ে কিচেনে গিয়ে নিজেই খাবার বেড়ে নেয়। অতঃপর খাবার নিয়ে বৈঠকঘরের দিকে অগ্রসর হয়। লাঞ্চ সেরে আরোরা আবারও কিচেনে চলে যায়। টিস্যু দিয়ে ভেঁজা হাত মুছতে মুছতে মায়ের ঘরে চলে গেলো। গিয়ে দেখলো অনন্যা একটা এলবাম দেখছে এবং কিছুক্ষণ পরপর তর্জনী আঙুল দিয়ে চোখের কোণ মুছে যাচ্ছে। আরোরা বেসামাল হয়ে পরলো।
সে দ্রুত মায়ের সামনে গিয়ে বসলো এবং কাতর স্বরে বললো,
-‘কী হয়েছে আম্মু? কাঁদছো কেন তুমি?”
অনন্যা ছলছল নয়নে আরোরার দিকে তাকালো। আরোরা বিমূঢ় দৃষ্টিতে অশ্রুসিক্ত আঁখিদুটির দিকে তাকিয়ে রইলো৷ অনন্যা একটি এলবাম এগিয়ে উনিশ শতকের একটা ছবি দেখিয়ে বলে,
-‘ও আমার ছোট বোন প্রভা! তোর ছোট খালামনি। তোর খালামনির পড়ার খুব সখ ছিলো ঠিক তোর মতোই। তাকে বিয়ের কথা বললে সে খুব রাগ করতো। পরিবারের সাথে যুদ্ধ করে এবং নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে উচ্চ-ডিগ্রির জন্যে অন্য শহরে একাই দুঃসাহস করে চলে যায়! মাসখানেক কেটে যায়, তোর নানু প্রভাকে ছাড়া পাগল-প্রায় ছিলো। সমাজ বলতো আমার বোন পালিয়েছে পড়ার নাম করে৷ মা দুশ্চিন্তা করতো এবং ওর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করতো। এক মাস যোগাযোগ হলেও অনেক কম হতো। একসময় মায়ের এক দুঃস্বপ্নে ঘুম ভেঙ্গে যায়। মায়ের সেই স্বপ্নের কিছুদিন পরই আমার বোনটা সাদা কাফনে জড়ানো অবস্থায় বাড়িতে ফিরে আসে!’
বলেই অনন্যা ডুকরে কেঁদে ওঠলো। আরোরা নির্বাক হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। কর্ণাধারে উক্তিগুলো পৌঁছাতেই যেন সে পুরো অবশ হয়ে যায়। আরোরা ভাঙ্গা গলায় বলে,
-‘খা..খালামনির মৃত্যু কীভাবে হলো?’
-‘রুমমেটের জন্য ওষুধ কিনতে বেরিয়েছিলো রাত ন’টার দিকে। তখনই কিছু জা’নো’য়া’র.. আমার বোনটাকে ছাড়লো না রে মা! কী চেয়েছিলো সে জীবনে? শুধুই তো নিজের পড়ার ইচ্ছে পূরণ করতেই পরিবার ছেড়েছিলো, ও তো কোনো পাপ করেনি! আমার নিষ্পাপ বোনকে কেন..?’
-‘আম্মু! থামো, এভাবে কেঁদো না। এতদিন কেন বলো নি আমায়?’
-‘এখন তো জানালাম। কেন তোকে বিয়ে দিতে চাই তা কী বুঝিস না আরু? দেখ! আমার বোন তার জলজ্যান্ত প্রমাণ! এই সমাজে মেয়েদের বাঁচতে হলে একটি ঢাল প্রয়োজন। তোকেও তো আমার একা ছাড়তে মন চায় না। কিন্তু উপায় কী? তোর বাবা সকালেই অফিস চলে যায়, আর আইমানও চাকরিতে জয়েন হবার পর থেকে ব্যস্ত হয়ে পরে। আমার মন যে সায় দেয় না এই নিষ্ঠুর সমাজে তোকে একা ছাড়তে।’
-‘বিয়ে কী করে এসবের সমাধান হয় আম্মু?’
আরোরার গাল ছুঁয়ে আলতো স্বরে বলতে লাগে,
-‘বিয়ে মানে অনেক নিয়ামত মা! স্বামী নামক এক ভরসা পাবি। যে তোকে আগলে রাখবে, তোকে সকল খারাপ ছায়া থেকে প্রোটেক্ট করবে। ভাবিস না কোনো বেপরোয়া ছেলের সঙ্গে তোর জীবন জুড়বো। ছেলে একটা ভালো না হলে আরও দশটা দেখবো তাও আমার মেয়ের জন্য বেস্টটাই চয়েস করবো। কারণ, বিয়ে মানে পুরো একটা জীবনের ব্যাপার। তবে অবশ্যই তুই পছন্দ করবি। কারণ, ছেলেটির সঙ্গে জীবন তুই কাটাবি, আমরা নই। তাই আমাদের চেয়ে তুই ভালো বুঝবি, কে তোর জীবনে সব থেকে বেশি পারফেক্ট!’
আরোরা মনোযোগ দিয়ে মায়ের কথাগুলো শুনলো। শুনলো বললে ভুল হবে, প্রতিটি কথা মনে গেঁথে রাখলো। বারংবার কর্ণাধারে মায়ের বলা শেষোক্ত বাক্যই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ‘আমাদের চেয়ে তুই ভালো বুঝবি, কে তোর জীবনে সব থেকে বেশি পারফেক্ট!’
আরোরা মুহূর্তেই চিন্তায় পরে গেলো। তার জীবনের পারফেক্ট মানুষটাকে কী সে আদৌ নির্বাচন করতে সক্ষম হবে? নাকি তার জীবনটা নিকষ কালো রজনীতে ছেয়ে যাবে?
——————-
আরোরা মুখ ঘুচে আইমানের সামনে বসে আছে। আইমান দু-একবার দরজার দিকে উঁকি দিয়ে দেখে নিলো অনন্যা আছে কি না। যখন বিষয়টি কনফার্ম হলো তখনই আইমান আরোরার সামনাসামনি বসে ফিঁসফিঁস করে বলে,
-‘রাতের আগে রুম থেকে বের হোস না। তোর কোন স্যার ফোন করে মাকে জানিয়েছে তুই এসাইনমেন্ট করিসনি, সাথে ক্লাসের সময় ক্যাম্পাস ঘুরে বেড়িয়েছিস। এটা শোনার পরপরই মা এমন তুফান শুরু করেছে। আমি তোরে বাঁচাতে পারবো না। এডভাইস দেয়ার দরকার ছিলো দিলাম এখন আমি ঘুমাতে গেলাম!’
বলেই আইমান হাই তুলতে তুলতে রুম প্রস্থান করলো। আইমান যেতেই আরোরা বিড়বিড় করে বললো,
-‘ইংরেজদের আসলেই বাঙালির সুখ সহ্য হয় না! ইংরেজটা জানলো কী করে আমি ঘুরে বেড়িয়েছি? কোন চামচা স্পাইগিরি করে? আল্লাহ এই রাজাকার গুলাকে হেদায়াত দান করো আর ইংরেজটাকে কঠিন শিক্ষা দেয়ার তৌফিক দান করো! ব্যাটা ভার্সিটির কাহীনি আমার বাসায় কেন লাগাবে? এতো কিসের শত্রামি আমার সঙ্গে! বাজে লোক একটা!’
———————–
ইয়ামিন যখন আরোরার নেশায় মত্ত তৎক্ষণাৎ ইয়ামিনের একজন লোক হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসলো। ইয়ামিন তার হাঁপানো দেখে কোনোরূপ আগ্রহ না দেখিয়ে উল্টো বিরক্তিতে চোখ-মুখ কুচকে ফেললো। আরোরাকে নিয়ে ভাবনার মাঝে ব্যাঘাত ঘটানো ইয়ামিন মোটেও পছন্দ করলো না। যেই বাজখাঁই গলায় গাল-মন্দ ছেড়ে বিদায় করবে তখনই ছেলেটি হাঁপাতে হাঁপাতে বলে ওঠে,
-‘বস! সর্বনাশ হয়ে গেছে। কারা জানি আমাদের দলের কিছু ছেলেকে মেরে গাতায় ফেলে যায়। শা’লারা একটা ক্লু অবধি ছেড়ে যায়নি!’
ইয়ামিন তৎক্ষনাৎ আধশোয়া থেকে সটান হয়ে বসলো। তার চোখ-মুখ মুহূর্তেই লাল হতে শুরু করলো। ইয়ামিন হাঁক ছেড়ে বললো,
-‘আমি এতো সব বুঝি না! দ্রুত ওদের ডিটেইল বের কর! আমার ওদের চাই-ই চাই! কার এতো দুঃসাহস ইয়ামিনের লোকদের উপর হামলা দেয়ার! গো ফাস্ট!’
ছেলেটি আদেশ পেয়ে পুণরায় ছুটে বেরিয়ে গেলো। ইয়ামিন কপালে আঙুলের বিচরণ চালিয়ে ভাবতে লাগে কে এই কাজ করতে পারে! হু?
~চলবে, ইনশাল্লাহ।