#প্রিয়া_তুমি
#পর্বঃ৪
#লেখিকা_লক্ষী_দেব
রাফসান তানিয়ার দিকে নিষ্প’লক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পর চোখ গেল তানিয়ার বেনী করা চুলগুলোর নিচে থাকা কালো তিলটার উপর। তিলটা ঠিক তানিয়ার ঘাড়ের মধ্যে। ঘাড়ের নিচের ছোট ছোট কয়েকটা চুল তিলটার উপর পড়ে আছে। ফর্সা ঘাড়ে তিলটা বেশ আকর্ষণীয় লাগল রাফসানের কাছে। রাফসান মু’গ্ধ কন্ঠে তানিয়ার উদ্দেশ্যে বলল,
“তোমার ঘাড়ের তিলটা বেশ সুন্দর।
তানিয়া এতোক্ষণ চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু চোখের পাতায় ঘুম কিছুতেই ধরা দিচ্ছে না। রাফসান পাশে থাকায় বড্ড অস্ব’স্তি হচ্ছে। ঘুম আসছে না। যেমনটা বিয়ের প্রথম পাঁচটা দিন কেটেছে ঠিক তেমনটাই। রাফসানের মুখে তিলের কথা শুনে ফট করে চোখ মেলে তাকাল তানিয়া। ভ্রুঁ কুঁচকে রাফসানের দিকে তাকাল। অনেকটা আ’শ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করল,
“আমার ঘাড়ে তিল?
রাফসান মাথা নাড়ালো। তানিয়ার আ’শ্চর্য হওয়ার ভ’ঙ্গি দেখে খানিকটা অবাক হলো। এমন আ’শ্চর্য হওয়ার কি আছে? মেয়েটা কি জানে না ওর ঘাড়ে একটা কালো তিল আছে? রাফসান অবাক কন্ঠে বলল,
“কেন? তুমি কি জানো না?
তানিয়া মনে করার চেষ্টা করল আজ পর্যন্ত কেউ তাকে ঘাড়ের তিলের কথা জিঙ্গেস করেছে কি-না। কিন্তু স্মৃতির পাতা হাতড়ে কোথাও তিলের কথা মনে করতে পারল না। আজ পর্যন্ত কেউ তাকে তিলের কথা বলেনি। তানিয়া দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,
“না, তো।
তানিয়া কথাটা বলেই টের পেল ঘাড়ের কাছে কিছু পিলপিল করছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বুঝতে পারল জায়গাটা চুলকাচ্ছে। তানিয়া বাম হাতটা ঘাড়ের নিচে দিতেই বুঝতে পারল ছোট্ট প্রানীটার অ’স্তিত্ব। দুই আঙ্গুলের মধ্যে করে সামনে আনলো চুলের ছোট কীট-টাকে। রাফসান তানিয়ার হাতের দিকে তাকিয়ে হত’ভম্ব হয়ে তাকাল। আ’শ্চর্য হয়ে বলল,
“আমি এতক্ষন এটাকে তিল ভাবছিলাম?
তানিয়া ল’জ্জায় রাফসানের দিকে তাকাতে পারলো না। রাফসান কি ভাববে এখন? ভাববে তার মাথায় এসব চুলের কীট অনেক? কিন্তু তার মাথায় তো এসব কীট ছিল না। কয়েকদিন আগেই হয়েছে। তানিয়া কীট-টাকে মেরে আবারো আগের মতোই শুয়ে পড়ল। প্রচুর অস্ব’স্তি লাগছে।
রাফসান বিমূঢ় হয়ে বসে রইল। এই কীট-টাকে এতক্ষণ ধরে তিল ভেবে রইল? যদি উপন্যাসের নায়কদের মতো তিলটাকে ছুঁয়ে দেওয়ার ইচ্ছে হতো? তানিয়াকে জাপটে ধরে যদি ছোট্ট একটা চুমু খেত? তাহলে? তাহলে কি রকম অবস্থা হতো? রাফসানের শরীরটা রী রী করে উঠলো। নিজেকে ধি’ক্কার দিয়ে বলল,
“ছি’হ রাফসান। এসব কি ভাবছিস?
রাফসান মাথা থেকে এসব উ’দ্ভট চিন্তা-ভাবনা ঝেড়ে ফেলে উঠে দাঁড়াল। রুমের লাইটটা নিভিয়ে দিয়ে তানিয়ার পাশে এসে শুয়ে পড়লো। তানিয়ার দিকে মুখ করে আবছা আলোয় তানিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। মনটা কেমন করছে। খুবই বেপরোয়া হতে ইচ্ছে করছে। ইচ্ছে করছে ছোট্ট দেহটাকে নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে নিতে।
রাফসান দুচোখ বন্ধ করে শ্বা’স নিল। তানিয়াকে জড়িয়ে ধরে বুকের মাঝে মিশিয়ে নেওয়ার তীব্র ইচ্ছা হলো। ইচ্ছেটা গভীর থেকে গভীরতর হতেই রাফসান এগিয়ে গেল। তানিয়ার খুব নিকটে গিয়ে তানিয়াকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল।
তানিয়া রাফসানের কাজে চমকে উঠল। রাফসান যে এমন করবে এটা ভাবনাতীত ছিল। রাফসান তানিয়াকে দুহাতে জড়িয়ে ধরলে তানিয়া ছট’ফট করতে লাগলো। রাফসানের হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগলো। কিন্তু রাফসানের শক্তির কাছে হেরে গিয়ে বলে উঠল,
“আমায় ছেড়ে দিন। ছাড়ুন আমায়।
রাফসান তানিয়াকে ছাড়ল না। বরং আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
“ছেড়ে দিলে যে শান্তি পাব না। শান্তির খাতায় ইয়া বড় শূন্য মিলবে। শূন্যের হাত থেকে রক্ষা পেতে যে ধরে রাখতে হবে।
তানিয়া রাফসানের কথায় চোখ মুখ শক্ত করে তাকাল। রাফসানের থেকে বন্ধনমুক্ত হওয়ার জন্য অ’স্থির হয়ে পড়ল। তানিয়ার এতো ছটফটানি, এতো অস্থি’রতা দেখে রাফসান বলল,
“উফ, এতো নড়ছো কেন? এভাবে নড়াচড়া করলে কীভাবে হবে?
তানিয়া মুখে রাগের আভাস দেখা দিচ্ছে। রাফসানের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলল,
“আমাকে ছাড়তে বলেছি।
তানিয়ার কথায় রাফসানের মাঝে কোনো পরিবর্তন হলো না। তানিয়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,
“ছেড়ে দেওয়ার জন্য ধরিনি। যদি ছাড়িয়ে নিতে পারো তাহলে ছেড়ে দিব।
রাফসানের কথায় তানিয়া নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করল। কিন্তু রাফসানের পেশীবহুল হাতের শক্তির সাথে পেরে উঠলো না। অনেকক্ষণ হম্ভি’তম্ভি করেও যখন লাভ হলো না তখন তানিয়া শান্ত হয়ে গেল। রাফসানের হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার আর চেষ্টা করল না।
তানিয়া একদম শান্ত হয়ে যেতে দেখে রাফসান মুচকি হাসল। তানিয়ার মাথায় আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে নিজ মনে বলল,
“আজকে যেমন নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে না পেরে আমার বুকের মধ্যের অবস্থানটা মেনে নিলে, তেমন করে একদিন সব রাগ, অভিমান ভুলে গিয়ে আমায় মেনে নিবে।
__________________
সকালে ঘুম ভাঙতেই তানিয়া নিজেকে একা বিছানায় আবিষ্কার করলো। পাশ ফিরে তাকিয়ে রাফসানকে দেখতে পেল না। আজ কি দেরি করে উঠে ফেলেছে? তানিয়া তাড়াতাড়ি করে বিছানা থেকে নেমে ওয়াশরুমের দিকে গেল। আজ সত্যি অন্য দিনের তুলনায় দেরি করে ঘুম থেকে উঠেছে। তানিয়া ফ্রেশ হয়ে বিছানা ঠিক করল। তারপর দ্রুতগতিতে পা চালালো নিচে যাওয়ার উদ্দেশ্যে।
তানিয়া মাথায় ঘোমটা টেনে রান্নাঘরের দিকে এগোলো। ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে আছে রনিত। তানিয়াকে ড্রয়িং রুম পেরিয়ে রান্নাঘরের দিকে যেতে দেখে তানিয়ার যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল। তানিয়া যেই না রান্নাঘরে পা বাড়াবে অমনি চেঁচিয়ে বলে উঠল,
“ভাবী এক কাপ চা দিয়েন তো।
রনিতের কথায় তানিয়ার পা থেমে গেল। পেছন ফিরে রনিতের দিকে অ’গ্নি দৃষ্টিতে তাকাল। তানিয়ার ক্রু’দ্ধ দৃষ্টি দেখে রনিত কুটিল হাসলো। তা দেখে তানিয়ার শরীর রাগে জ্ব’লে উঠল। রনিত কথাটা চেঁচিয়ে বলায় রান্নাঘরে থাকা তানিয়া শাশুড়ি, চাচী শাশুড়ি দুজনই শুনতে পেল। সালমা বেগম তানিয়াকে রনিতের দিকে চেয়ে থাকতে দেখে বলল,
“কি হলো, দাঁড়িয়ে আছে কেন? আমার ছেলেটা যে চা চেয়েছে শুনতে পাওনি। নাকি এক কাপ চা দিয়ে আসতে ক’ষ্ট হবে? ক’ষ্ট হলে আমি গিয়ে দিয়ে আসছি।
তানিয়া সালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে ফেলল। গলার স্বর নিচু করে বলল,
“আপনাকে দিয়ে আসতে হবে না। আমিই যাচ্ছি। এটা এমন কোনো কঠিন কাজ নয়।
সালমা বেগম তানিয়ার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলে তানিয়া রান্নাঘরে যায়। গরম করে রাখা চা কাপে করে নিয়ে যায় রনিতের কাছে। রনিত তানিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। তানিয়া চায়ের কাপটা রনিতের দিকে বাড়িয়ে দিলে ডান হাতে চায়ের কাপ নিয়ে বাম হাতে তানিয়ার হাতটা ধরে ফেলে রনিত।
তানিয়া রনিতের কাজে ক্রু’দ্ধ দৃষ্টিতে তাকায়। রনিত তা দেখেও না দেখার ভান করে চায়ের কাপে চুমুক দেয়। দু চোখ বুজে বলে,
“চা-টা বেশ ভালো হয়েছে তো।
তানিয়া দাঁত কিড়মিড় করতে থাকে। আপাতত ড্রয়িং রুমে রনিত ছাড়া অন্য কোনো মানুষ নেই। সেই সুযোগে রনিত তানিয়ার হাত চেপে ধরে। তানিয়া চিবিয়ে চিবিয়ে বলে উঠল,
“আপনি খুব খারাপ আচরণ করছেন। হাতটা ছাড়ুন নয়তো…
তানিয়ার কথাটা শেষ করতে দিল না রনিত। সম্পূর্ণ কথাটা না শুনেই বলে,
“নয়তো কি?
তানিয়া এবার বাহাতে রনিতের গালে সপাটে থা’প্পড় লাগায়। রনিত তানিয়ার কান্ডে চরম অবাক হয়ে যায়। তানিয়া থা’প্পড় মারায় ক্ষে’পে যায় তানিয়ার উপর। তানিয়া রনিতের রাগা’ন্বিত মুখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠে,
“থা’প্পড় একটা মেরেছি। এখনও হাতটা না ছাড়লে দ্বিতীয়বার থা’প্পড় মারতে দুবার ভাববো না।
তানিয়ার এমন নিরব হুমকিতে রনিতের রাগটা দ্বিগুণ হয়ে যায়। তানিয়ার হাতটা আরেকটু শক্ত করে ধরে। চোখে, মনে রাগ নিয়ে ফুঁসে উঠে বলে,
“হাত ছাড়বো না। দেখি তোমার কতো সাহস। আরেকবার থা’প্পড় মারো দেখি।
“ভাবীর হাতটা বুঝি খুব নরম রনিত? এভাবে ধরে আছিস যে। দেখে মনে হচ্ছে ছাড়ার ইচ্ছে-টিচ্ছে নেই।
আচমকা এমন কথায় রনিত ভয় পেয়ে যায়। ফট করে তানিয়ার হাতটা ছেড়ে দিয়ে পেছন ফিরে উক্ত কথাটা বলা মানুষটার দিকে তাকায়।
#চলবে