#প্রিয়া_তুমি
#পর্বঃ৫
#লেখিকা_লক্ষী_দেব
রনিত, তানিয়া পেছনের দিকে তাকিয়ে রাফসানের মুখ দেখতে পেল। রাফসানের বাম হাতটা পকেটে গুঁজে রেখেছে। মুখটা একেবারে শান্ত, শীতল। এ যেন ঝড়ের পূর্বাভাস। রাফসানের কথায় কিছুটা ভয় পেলেও রাফসানকে দেখে রনিতের মাঝে কোনো পরিবর্তন হলো না। রাফসানের কথায় মুচকি হেসে তানিয়ার দিকে কু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“ভাবীর হাতটা তুলার মতো নরম মনে হলো। ইশ, যদি আরেকটু ধরে রাখতে পারতাম।
তানিয়ার শরীরটা রা’গে ঘৃ’ণায় রী রী করে উঠলো। রনিতকে ক’ষিয়ে আরেকটা থা’প্পড় মারতে ইচ্ছে হলো। তানিয়া রাফসানের দিকে তাকাল। কিন্তু রাফসানের শান্ত মুখশ্রী থেকে আশ্চ’র্য হলো। মানুষটা চুপ করে কথাগুলো হজম করছে? তানিয়া রাফসানের থেকে চোখ ফিরিয়ে নিল।
রাফসান ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। রনিতের মুখের দিকে তাকিয়ে শান্ত, শীতল কন্ঠে তানিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আগের থা’প্পড়টা যেভাবে মেরেছিলে এবারো সেভাবে একটা থা’প্পড় মারো।
তানিয়া অবাক চোখে রাফসানের দিকে তাকাল। রনিতের মুখে স্প’ষ্ট রাগের আভাস দেখা দিচ্ছে। রাফসানের দিকে তাকিয়ে ফুঁসে উঠে বলল,
“আমাকে থা’প্পড় মারতে বলছিস? আমাকে? আমি কিন্তু তুলকালাম ঘটিয়ে ফেলব রাফসান।
রনিতের কথায় রাফসানের কোনো পরিবর্তন হলো না। তানিয়াকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল,
“দাঁড়িয়ে আছো কেন? বললাম তো থা’প্পড় মারতে।
তানিয়া রাফসানের দিকে এক পলক তাকিয়ে রনিতের গালে ঠাস করে থা’প্পড় বসিয়ে দিল। থা’প্পড়ের শব্দটা ড্রয়িং রুম পেরিয়ে রান্নাঘরে পৌঁছাল। সালমা বেগম রান্নাঘর ছেড়ে ড্রয়িং রুমে চলে এলো। ব্যস্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“কি হলো? কিসের শব্দ হলো এটা? মনে হলো যেন থা’প্পড়ের শব্দ শুনলাম।
তানিয়া সালমা বেগমের কথায় শুকনো ঢোক গিলল। মাথা নিচু করে মেঝের দিকে তাকাল। রনিতের মুখটা রাগের চোটে ক্ষি’প্ত হয়ে আছে। রাফসান সালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“কই ছোট আম্মু কোন শব্দ তো হলো না। থা’প্পড়ের শব্দ শুনবে কি করে? এখানে কে কাকে থা’প্পড় মারবে? কি বলিস রনিত?
রাফসানের জিঙ্গেসায় রনিত চোখ ঘুরিয়ে রাফসানের দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে মুখে মি’থ্যে হাসি ফুটিয়ে সালমা বেগমের উদ্দেশ্যে বলল,
“হ্যাঁ-হ্যাঁ। কি যা তা বলছো আম্মু। এখানে কে কাকে থা’প্পড় মারবে?
সালমা বেগম ভ্রুঁ কুঁচকালো। এতোটা ভুল হলো তার? এতোটা? দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“কি জানি? হয়তো আমি ভুল শুনে….!
কথাটা সম্পূর্ণ শেষ করার আগেই সালমা বেগমের চোখ গেল রনিতের গালের দিকে। ফর্সা গালে পাঁচ আঙুলের ছাপ ফুটে উঠছে। রনিতের সাথে সালমা বেগমের চোখাচোখি হতেই রনিত সালমা বেগমকে ইশারায় কিছু বুঝালো। সালমা বেগম রাফসান, তানিয়ার দিকে তী’ক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে চলে গেল।
___________
রনিত নিজের রুমে পাইচারি করছে। রাগে, ক্ষো’ভে শরীরটা জ্ব’লে যাচ্ছে। রাগের কারণে চোখ, মুখ লাল হয়ে আছে। রনিত রাগে গজগজ করতে করতে বলল,
“আমার পোষা পাখিকে ছিনিয়ে নিয়েছিস। আমি তোকে সুখে সংসার করতে দিব না রাফসান।
সালমা বেগম হন্ত’হন্ত হয়ে রনিতের রুমে ছুটে এলেন। যখন থেকে রনিতের গালে পাঁচ আঙুলের ছাপ দেখেছে তখন থেকে উনার বুকের ভেতর তোলপাড় শুরু হয়েছে। ছেলেটাকে মেরেছে। কিন্তু কে মেরেছে? সালমা বেগম রনিতের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে গালে হাত দিয়ে উ’দ্বিগ্ন কন্ঠে বললেন,
“বাবা তোর গালে কিসের দাগ? কে থা’প্পড় মেরেছে তোকে?
রনিত ঝটকা মেরে সালমা বেগমের হাতটা সরিয়ে দিল। রাগা’ন্বিত ক’ন্ঠে বলল,
“তানিয়া। ওই তানিয়া মেরেছে।
সালমা বেগম অবাক হলেন। সেই সাথে তানিয়ার প্রতি তার রাগটা তড়িৎ গতিতে করে বাড়তে থাকে। গম্ভীর মুখে শুধালেন,
“কেন? কি করেছিস তুই? কি কারণে তোকে মারল?
রনিত দু’চোখ বন্ধ করে বলল,
“তানিয়ার হাত ধরেছিলাম। রাফসান দেখে ফেলে তানিয়াকে বলেছে আমাকে থা’প্পড় মারতে।
সালমা বেগম রনিতের চোখে চোখ রেখে বলল,
“কি আছে ওই মেয়ের মাঝে? তুই ওই মেয়েটার পেছনে পড়ে আছিস কেন? তুই ভুল করছিস রনিত। আমি বারবার সাবধান করে দিচ্ছি তোকে।
রনিত মায়ের কথায় জবাব দিল না। চুপ করে রইল। মনের মধ্যে চলতে লাগল কিছু অ’দ্ভুত অ’দ্ভুত ভাবনা।
________________
তানিয়া রান্নাঘর থেকে ডাইনিং টেবিলে খাবার রাখতে এসেছিল। হাসির শব্দে সোফার দিকে তাকিয়ে দেখে রাফসান, রিমা, রিতা কিছু একটা নিয়ে হাসছে। রিতা রাফসানের বিপরীত দিকের সোফায় বসে আছে। তবে রিমার অবস্থানটা রাফসানের পাশে। ঠিক রাফসানের শরীর ছুঁই ছুঁই অবস্থা।
তানিয়াকে দেখতে পেয়ে রিমা আরেকটু রাফসানের পাশ ঘেঁষে বসল। রাফসান ব্যাপারটা খেয়াল রিমাকে কিছু বলতে নিতেই তানিয়ার উপর চোখ পড়ল। তানিয়াকে এদিক পানে তাকিয়ে থাকতে দেখে কিছু বলতে গিয়েও বলল না। কি ভেবে যেন চুপ করে গেল।
তানিয়ার রাফসানের সাথে চোখাচোখি হতেই তানিয়া চোখ নামিয়ে ফেলল। এক এক করে খাবার গুলো সাজিয়ে রাখতে শুরু করল। সাজানো শেষ করে আবারো এক পলক সোফার দিকে তাকাল। সোফার দিকে তাকিয়ে তানিয়া অবাক হয়ে গেল। রাফসানের চোখ জোড়া এখনো তার দিকেই স্থি’র হয়ে আছে। তানিয়া চোখ নামিয়ে তড়িগড়ি করে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
তানিয়া চলে যেতেই রাফসানের হাসি হাসি মুখটা গ’ম্ভীর হয়ে গেল। মুখের হাসি মিলিয়ে গিয়ে থমথমে হয়ে গেল। রিমার দিকে তাকিয়ে বলল,
“দূরে গিয়ে বস।
রিমা রাফসানের থমথমে মুখ’ভঙ্গি দেখি ভড়কে গেল। মুখটা মলিন করে রাফসানের থেকে কিছুটা দূরে সরে বসল। রিমার মুখটা মলিন হলেও রিতার চোখ দুটো খুশিতে চিকচিক করে উঠল।
_______________
রান্নার কাজ শেষ করে তানিয়া রুমে আসলো। রাফসান বিছানায় শুয়ে আছে। রাফসানের পাশে একটা শপিং ব্যাগ রাখা। তানিয়া শপিং ব্যাগটা দেখল। তবে বিশেষ কোনো প্রতি’ক্রিয়া দেখাল না। দেখেও না দেখার ভান করে ওয়াশরুমে চলে গেল।
রাফসান তানিয়ার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। মিনিট পাঁচেক পর তানিয়া ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো। তোয়ালে দিয়ে মুখ মুখে আয়নার সামনে দাঁড়াল। রাফসান তানিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এই ব্যাগটা নাও।
তানিয়া পেছন ফিরে তাকাল। বিছানায় থাকা ব্যাগটার দিকে আরেকবার একপলক তাকিয়ে রাফসানের দিকে তাকাল। প্রশ্না’তক ক’ন্ঠে বলল,
“কিসের ব্যাগ এটা? কি আছে এটাতে? আমি কেন ব্যাগটা নিব?
তানিয়া পরপর এতো গুলো প্রশ্নে রাফসান মুচকি হাসল। স্বাভাবিক ক’ন্ঠে বলল,
“তুমি খুলে দেখ।
তানিয়া চোরা চোখে রাফসানের দিকে তাকিয়ে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। ব্যাগটা হাতে নিয়ে ব্যাগের ভেতরে থাকা বস্তুটাকে বাহির করল। রাফসান আগ্রহ নিয়ে তানিয়ার প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য তাকিয়ে থাকে। তানিয়া বস্তুটা বের করে দেখল নীল রঙের একটা শাড়ি। শাড়িটা দেখা মাত্রই তানিয়া সাথে সাথে ব্যাগের মধ্যে রেখে দিয়ে বলল,
“এটা আমাকে কেন দিচ্ছেন?
“শাড়ি কেন দেয়? পড়তে দিয়েছি। তুমি এই শাড়িটা আজকে পড়ে আমার সামনে আসবে।
রাফসানের কথায় তানিয়া তাচ্ছি’ল্য করে হাসল। শাড়ির ব্যাগটা উল্টে-পাল্টে দেখে বলল,
“আপনি কি করে ভাবলেন আমি এই শাড়িটা আজকে পড়বো। আমি শাড়িটা পড়বো না।
“কেন?
“আমার ইচ্ছে। তবে এটা ঠিক আমার শরীরের থাকা শাড়িটা আপনার টাকায় কেনা। এমনকি আমি আপনাদের বাড়িতে থাকছি, আপনার টাকায় খাচ্ছি। কিন্তু আমি এই শাড়িটা পড়বো না। এই শাড়িটা পড়ার অর্থ হচ্ছে আপনার জন্য সাজা। আমি আপনার জন্য সাজবো না।
রাফসান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তানিয়া এমনটাই করবে এটা তার জানা ছিল। কিন্তু আর কত? আর কতদিন থাকবে এভাবে? কত দিন কাটাবে? এভাবে কি সংসার করা হয়? এভাবে সুখে থাকা যায়? রাফসান তানিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে,
“কেন সাজতে পারবে না? আমি তো পরপুরুষ না। আমি তোমার স্বামী। তাহলে সাজতে প্রবলেম কোথায়?
তানিয়া আবারো তাচ্ছি’ল্য করে হাসল। রাফসানের দিকে চোখ রেখে বলল,
“এইটাই তো সমস্যা। আপনি আমার স্বামী হলেও আমি আপনাকে স্বামী রূপে চাইনি। অথচ আপনি আমার স্বামী।
“কেন মানতে পারবে না? বিয়ের তিনটা বছর পেরিয়ে গেছে তানিয়া। এভাবে আর কতদিন থাকবে? সমস্যা কি তোমার?
“আপনি জানেন না? আপনি জানেন না আমার সমস্যাটা কি? আপনা….।
তানিয়া কথাটা শেষ করতে পারল না। তার আগেই রিতা দৌড়ে রুমে এসে হাজির হলো। তানিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ভাবী তুমি নিচে আসো।
#চলবে