#গল্পঃপ্রিয়তমা
#লেখিকাঃজিন্নাত_চৌধুরী_হাবিবা
#পর্ব_০৬
শেষ বিকেলের ম্লান হওয়া সূর্যের লাল আভা অন্তরিক্ষে ছড়িয়ে পড়েছে।কিয়ৎকাল পরেই সন্ধ্যা নামবে ধরনীর বুকে।এক গাছে থেকে অন্যগাছে উড়ে যাওয়া পাখিদের মৃদু আওয়াজে সাঁই সাঁই করে পাখা ঝাপটানি।চারদিকে মৃদুমন্দ নির্মল হাওয়া বইছে।প্রীতি ছাদে এসে রেলিং এ হাত রেখে দাঁড়ালো।ফারিহা আর মনি রাহাতের সাথেই চলে গেছে ঢাকায়।মনি তার হোস্টেলে চলে যাবে।বাড়িতে এখন মেয়ে মানুষ বলতে হাজেরা বেগম,রুবি আর প্রীতি আছে।রূপক সকালেই বেরিয়ে যায় থানার উদ্দেশ্যে।
বিল্ডিং এর ছাদে আরেকতলা উঠানোর জন্য ভিম তুলে রাখা হয়েছে বেশ বড় করেই।প্রীতি ভিমগুলো দেখে দৌঁড়ে নিচে নামলো।একটা সুতি শাড়ি নিয়ে আবারো দৌঁড়ে ছাদে আসলো।দুই ভিমের মধ্যে শাড়ি বেঁধে দোলনা বানাবে।তারপর প্রতিদিন ঐ দোলনায় চড়বে।কিন্তু একটা ভিম থেকে আরেকটা ভিমের দূরত্ব বেশি হওয়ায় হাজার চেষ্টা করেও প্রীতি দোলনা বানাতে পারলোনা।
ব্যর্থ হয়ে মন খারাপ করে ভিমের সাথে হেলান দিয়ে বসে পড়ে প্রীতি।পাশের ছাদ থেকে আপ্পান প্রীতির কর্মকাণ্ড পরোখ করে হাসছিলো।হাসির শব্দে মাথা ঘুরিয়ে পাশের ছাদে তাকালো প্রীতি।আপ্পানকে হাসতে দেখে ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,ওই হাপপ্যান্ট হাসো কেনো তুমি?
হাপপ্যান্ট বলাতে আপ্পান রেগে গেলো।আপনিতো আচ্ছা বেয়াদব মেয়ে।আমার নাম হাপপ্যান্ট?নামও ঠিক করে বলতে পারেননা।
প্রীতি মুখ ভেঙিয়ে বলে ঠিক করে নামও বলতে পারেনা হুহ।পড়ে থাকো সারাদিন হাপপ্যান্ট।তো তোমাকে হাপপ্যান্ট বলবোনা কি বলবো?
আপ্পান রেগে গিয়ে বলল,চাচির কাছে বিচার দিয়ে আসবো আপনার নামে।
প্রীতি আশেপাশে তাকিয়ে ছোট্ট একটি ইটের টুকরো নিলো আপ্পানকে ছুড়ে মারার জন্য।
ছাদের দিকে তাকিয়ে আচার দেখে প্রীতির চোখ চকচক করে উঠলো।ইটের টুকরো ফেলে দিয়ে আপ্পানকে মধুর সুরে ডাকলো,আপ্পান ভাইয়া আচার খাওয়াবে?
প্রীতিকে মুহূর্তেই রূপ পরিবর্তন করতে দেখে আপ্পান পাশে তাকিয়ে দেখলো আচারের বয়াম।ওর মা রোদে শুকাতে দিয়েছে।রোদ পড়ে গেছে হয়তো নিতে মনে নেই।আপ্পান আচারের বয়াম দুহাতে আগলে সোজা ছাদ থেকে নেমে গেলো।
প্রীতি মন খারাপ করে আবারও ছাদের রেলিং ঘেষে বসে পড়লো।
রুবি ছাদে এসে প্রীতিকে মন খারাপ করে বসে থাকতে দেখে বলল,আরে প্রীতি তুমি এখানে?আর আমি তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে হয়রান।এখানে বসে আছো কেনো?
প্রীতি মন মরা হয়ে বলল,দোলনা বানাতে গেছি হয়না এই শাড়ি দিয়ে।হাপপ্যান্টের কাছে আচার চাইলাম বয়াম নিয়ে চলে গেলো।দিলোনা আমায়।
রুবি প্রীতির সাথে রেলিং ঘেষে বসে পড়লো।সামনের দিকের দৃশ্য দেখতে দেখতেই বলল,রূপকতো তোমায় অনেক ভালোবাসে।সে তোমার দোলনার ব্যবস্থা করে দিবে।তারপর বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল,ভালোবাসেনা রূপক তোমাকে?
প্রীতি চট করে উত্তর দিলো,সব স্বামীরাই তার স্ত্রীকে ভালোবাসে।তো উনিও আমাকে ভালোবাসেন।
রুবি ফোঁড়ন কেটে বলল,তুমি ভুল বলেছো।সব স্বামীরা তার স্ত্রীকে ভালোবাসেনা।স্ত্রীকে ভালোবাসলে তাকে কাছে টেনে নেয়।উষ্ণ আলিঙ্গন আর আদরে ভরিয়ে তোলে।এখন তুমি নিজেই ভেবে দেখো রূপক তোমাকে ভালোবাসে কিনা?
প্রীতি ভাবনায় পড়ে গেলো।আসলেইতো উনি কখনো আমাকে জড়িয়েও ধরেননি।তার মানে কি উনি আমায় ভালোবাসেননা।প্রীতিকে ভাবনায় মত্ত হতে দেখে রুবি ঠোঁট কিঞ্চিৎ বাঁকা করে হাসলো।
তুমি বসবে নাকি নিচে যাবে?আমি যাচ্ছি বলে রুবি চলে গেলো।
প্রীতি তার ভাবনা নিয়েই পড়ে রইলো।ভাবনার সুতো কাটলো সুমধুর আজানের ধ্বনিতে।মাথায় কাপড় দিয়ে দ্রুত ছাদ থেকে নেমে আসলো প্রীতি।মাগরিবের নামায আদায় করে ঘরে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করলো।আজ এখনো রূপক আসছেনা দেখে চিন্তা হচ্ছে।ওর কাছে কোনো মুঠোফোন ও নেই।যার দ্বারা রূপককে কল দিবে।
রাতের খাবারের সময় টেবিলে শশুর শাশুড়ী,রুবি সবাই আছে রূপক ছাড়া।কোনোমতে দুই লোকমা খাবার খেয়ে রুমে চলে আসলো প্রীতি।হাজেরা বেগম প্রীতির অস্থিরতা টের পেয়ে মনে মনে খুশি হলেন।স্বামীর জন্য স্ত্রীর এমন অস্থিরতা শোভা পায়।
অনেক রাত অব্দি প্রীতি অপেক্ষা করেছিলো রূপকের জন্য।শেষমেষ ঘুমের সাথে যুদ্ধ করে ঘুমই বিজয়ী হয়।প্রীতি বালিশে মাথা রেখে এলোমেলো হয়ে শুয়ে পড়ে।
রাত যখন প্রায় বারোটার কাছাকাছি তখন রূপক বাসায় ফিরে।ফ্রেশ হয়ে এসে প্রীতির গায়ে কাঁথা টেনে দিতেই ওর গায়ে হাত লাগে।প্রীতি নড়েচড়ে উঠলো কিন্তু ঘুম ভাঙলোনা।রূপক ও আর জাগায়নি পাশেই শুয়ে পড়ে।
সকাল সকাল ঢাকার উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিলো রূপক।সেখান থেকেই আবার জার্নি করে ফিরেছে।তরুণকে দেখতেই ঢাকায় যাওয়া।তরুণ এখন আগের চেয়ে অনেকটা সুস্থ্য আছে।রূপক ছাড়া বাকি সবাই জানে তরুণ কোমায়।শত্রুরা যদি একবার জানে যে তরুণ কোমায় নেই তবে তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য আবারও তরুণকে মারার চেষ্টা করবে।কেননা তাদের অনেক গোপনীয়তা তরুণ জেনে গেছে।তরুণ সুস্থ থাকলে সবটা জানাজানি হয়ে যাবে।পুলিশের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে।
তরুণ মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করলো,রুবি কেমন আছে?
রূপকের তুখোড় দৃষ্টি দেখে তরুণ মাথানিচু করে ফেলে মিনমিন করে বলে,ভালোবাসিতো তাকে।
তুই আগুন নিয়ে খেলছিস তরুন।ওই মেয়েকে জীবনে রাখলে তুই পুড়ে ছারখার হয়ে যাবি।দাঁতে দাঁত চেপে বলল রূপক।
তরুণ করুণ চোখে তাকিয়ে বলল,কিন্তু ওরতো কোনো দোষ নেই।সবটা ওকে দিয়ে করানো হচ্ছে।রুবি তাদের অপকর্মের কথা কিচ্ছু জানেনা।ওকে অন্যভাবে বুঝিয়ে রাগিয়ে তোলা হয়েছে।ওর ব্রেইন ওয়াশ করা শেষ।এখন রুবিকে যেভাবে বলছে ও ঠিক সেভাবেই সবটা করছে।
রূপক তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলল,তুই এত শিওর কি করে হচ্ছিস যে রুবিকে দিয়ে সব কিছু করানো হচ্ছে,ওর কোনো দোষ নেই।
তরুণ নির্মল দৃষ্টি মেলে বলল,ওর সাথে তিনমাস চলাফেরা করেছি।তিনমাসে এটুকু অন্তত বুঝেছি যে রুবি সম্পূর্ণ সবটা জানেনা।
রুপক চোয়াল শক্ত করে বলল,কিছু শিওর হয়ে না জেনে সামনে আগানো ঠিক নয়।কেসটাকে যতটা সহজভাবে নিচ্ছিস ততটা সহজ নয়।এই কেসটা প্রায় বছরখানেক ধরে ঘুরছে।আমরা আসল অপরাধীকে ধরে শাস্তি দিতে পেরেছি ভেবে বসেছিলাম।কিন্তু আসল মাস্টারমাইন্ডকে এখনো ধরতে পারিনি।সে একটা ধূর্ত প্রকৃতির লোক।তাই আমি আপাতত রুবি কেনো কাউকেই বিশ্বাস করতে পারছিনা।
ডক্টরের সাথে তরুণের সুস্থ হওয়ার ব্যপার নিয়ে কথা বলে পূনরায় বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো রূপক।মাঝপথে গাড়ি থামিয়ে শপিংমলের পাশে রেস্তোরাঁয় ঢুকলো খাবার খাওয়ার জন্য।খাওয়া শেষে বেরিয়ে আসার পথে রূপকের চোখ পড়লো একটা লাল রঙের সাদা সুতার ছোট ছোট কাজ করা শাড়ির উপর।একেবারে নজর কাড়া শাড়ি।রূপক দেরি না করে ওই শাড়ি কিনে নিয়ে মুচকি হাসলো।
প্রীতির ওয়াশরুম পেয়েছে বলে ঘুম থেকে উঠলো।পাশ সুইচ টিপে লাইট অন করলো ওয়াশরুমে যাবে বলে।পাশে রূপককে শুয়ে থাকতে দেখে লাফিয়ে ওঠে।তখনই রূপকের ভাবনার সুতো ছিঁড়ে।এতক্ষণ তরুণকে নিয়েই ভাবছিলো।নড়েচড়ে প্রীতির দিকে তাকিয়ে বলল,উঠে পড়লে যে?
প্রীতি ঢুলুঢুলু চোখ খুলে রাখার চেষ্টা করে বলল,ওয়াশরুমে যাবো।আজকে সারাদিন কোথায় ছিলেন আপনি?কখন বাসায় ফিরেছেন?
রূপক প্রীতিকে ঠেলে দিয়ে বলল,আগে ওয়াশরুমে যাও।ভালো করে চোখেমুখে পানির ঝাপটা দাও তারপর কথা বলিও।প্রীতি দ্রুত ওয়াশরুম সেরে চোখেমুখে পানি দিয়ে বেরিয়ে আসলো।
প্রীতি কন্ঠে অস্থিরতা নিয়ে বলল,আচ্ছা আপনি কি আমায় ভালোবাসেন না?
প্রীতির এহেন প্রশ্নে রূপক ভড়কে গেলো।পরপরই নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,হঠাৎ এই প্রশ্ন কেনো করছো?কে বলেছে তোমাকে এই কথা?
প্রীতি হাত নাড়িয়ে বলল,কে বলবে?কেউ বলেনি।আমার মনে হচ্ছে আপনি আমাকে ভালোবাসেননা।ভালোবাসলে আমাকে সময় দিতেন।এখন কি আপনি আমাকে সময় দিচ্ছেন?সারাদিন আসামিদের পেছনেই সব সময় নষ্ট করছেন।রূপক গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,তোমাকে আমি ভালোবাসবো কোন দুঃখে?তুমি আমার কথা শোনো?
প্রীতি মুখটা একটুখানি করে ফেলেছে।মৃদুস্বরে বলল,এখন থেকে আপনার সবকথা শুনবো আমি।তাহলে ভালোবাসবেনতো?
রুপক গায়ে কাঁথা টেনে বলল,আগে কথা শোনো তারপর দেখা যাবে।তোমারতো কথার ঠিক নেই।এখন বলছো আমার সবকথা শুনবে সকালেই হয়তো সব ভুলে যাবে।সকালে রেডি থাকবা তোমাকে কলেজে ভর্তি করিয়ে আনবো।প্রীতি চুপিচুপি রূপকের দিকে ফিরে শুয়ে পড়লো।রূপক ঘুমিয়ে গেছে কিনা জানা নেই।প্রীতি মৃদুস্বরে বলল,আমাকে একটা দোলনা কিনে দিবেন?
কোনো উত্তর না আসায় প্রীতি ও আর কথা বাড়ালোনা।
—————————————★
পাখির কিচিরমিচির কলধ্বনি নিয়ে আসলো নতুন ভোরের আগমন।ভোরের আলো ছাপিয়ে সূর্য্যিমামা উঁকি দিলো অন্তরিক্ষের বুকে।
আড়মোড় ভেঙে ঘুম থেকে উঠলো রূপক।প্রীতি রান্নাঘরে রুটি বানাচ্ছিলো শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে।অনেক বেলা হয়ে যাওয়ায় বেলনি হাতে নিয়ে রুমে আসলো রূপককে জাগিয়ে দিতে।রূপক আগেই উঠে পরেছে।ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে সামনে লাল শাড়িতে ষোড়শী রমনীকে দেখে থমকালো।ওই রমনীর উপর চোখ আটকে গেলো কিয়ৎক্ষণের জন্য।প্রীতি বেলনি উঁচিয়ে বলল,তাড়াতাড়ি নাস্তা করতে আসুন।
প্রীতি চলে যেতেই রূপকের ঘোর কাটলো।কালরাতে শাড়িটা প্রীতির জন্যই কিনেছিলো।ব্যাগটা সোফার উপরই ছিলো।প্রীতি সকালে উঠে শাড়িটা দেখে খুব খুশি হলো।ও ভেবেই নিয়েছে রূপক শাড়িটা ওর জন্যই এনেছে।তাই ঝটপট পড়ে ফেলেছে।হাজেরা বেগমও কিছুক্ষণ ছেলের পছন্দ করা শাড়িটার প্রশংসা করলেন সাথে ছেলের পছন্দ করা বউটারও।
প্রীতিকে কলেজে ভর্তি করিয়ে বাড়িতে নামিয়ে রূপক ছুটলো থানায়।ইনফরমেশন এসেছে কালকেই নারী পাচার করা হবে।এখন থেকেই সব বন্দোবস্ত করতে হবে।কাল যে করেই হোক মেয়েগুলোকে উদ্ধার করে তাদের পরিবারের কাছে সহিসালামতে ফিরিয়ে দিতে হবে।গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে দিলো রূপক।
#চলবে……
(ভুল ত্রুটিগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।হ্যাপি রিডিং।)