প্রেমদ্বন্দ্ব পর্ব-০১

0
488

#প্রেমদ্বন্দ্ব_১
#প্রিমা_ফারনাজ_চৌধুরী

ফরেনসিক এনালিস্ট ডক্টর অনন্যা ইয়াসমিন আর এসপি মীর্জা আহাদ আলভীর বিয়ের ঠিক মাসখানেক আগে একটা মর্মান্তিক দূর্ঘটনা ঘটে গেল। আহাদ আলভীর জমজ ভাই মীর্জা মেহযেব আর্ভিনের হত্যাকান্ড সারাদেশে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল।
তিনি জেলা পুলিশের সবচেয়ে সিনিয়র অফিসার হলেও মেহযেব আর্ভিন ছিলেন সেনাবাহিনীর একজন সাহসী জবরদস্ত সেনাসদস্য। অপারেশন ক্র্যাকপট চলাকালীন পাহাড়ি একদল দস্যুদের হাতে নির্মমভাবে খুন হয়ে শহীদী মৃত্যু লাভ করেন উনি। দস্যুরা সেই ভিডিও ধারণ করে পাঠিয়েছিলো আহাদের কাছে। আপন ভাইয়ের এমন নির্মমভাবে খুন হওয়ার দৃশ্য স্বচক্ষে দেখার পর আহাদ আর স্বাভাবিক থাকতে পারেনি। আর্ভিনের লাশটাও আর পাওয়া যায়নি। দস্যুরা বলেছিল, – পারলে খুঁজে নে।
এই সমস্ত লড়ালড়ি, ভাইয়ের শোক সবকিছু মিলিয়ে তিনি ঢলে পড়েছেন মানসিক অসুস্থতায়। হাসপাতালের বেডে কাটিয়েছেন প্রায় মাসখানেক সময়। এইসময় অনন্যা ও তার পরিবার ওই ভঙ্গুর পরিবারটার পাশে দাঁড়িয়েছিলো। কিন্তু এই ব্যাথা কি কখনো লাঘব হওয়ার কথা? তারা ভাই কম বন্ধু বেশি ছিল। একে অপরকে জানপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসতো। জগতে ভাই ভাইয়ের মধ্যে এমন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক খুব কমই দেখেছে অনন্যা।

আহাদের সাথে পারিবারিক ভাবে তার সাথে বিয়ের সম্বন্ধ ঠিক হয়েছে। এর আগে আহাদের সাথে তার দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে তবে তা কাজের প্রেক্ষিতে। কাজের প্রতি একনিষ্ঠ দুজন পেশাদার মানুষের মধ্যে যতটুকু কথাবার্তার প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই হয়েছিলো। এমনকি বিয়ের সম্বন্ধ চলাকালীনও কোনো কাজের প্রেক্ষিতে তারা মুখোমুখি হলেও যথেষ্ট প্রফেশনালিজম বজায় রেখে চলেছে দুজন।
দুই ভাইয়ের চেহারা অবিকল এক হওয়ায় তাদের চিনতে অসুবিধে হতো ঠিকই কিন্তু দুজনের স্বভাব চরিত্র বেশ ভিন্ন ছিল। এনগেজমেন্টের দিন সেনা কর্মকর্তা মেহযেব আর্ভিন স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন তাদের বাড়িতে। আহাদের মুখে হাসিটা দুর্লভ হলেও একজন জবরদস্ত আর্মির ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা হাসিটা বেশ সহজলভ্য দেখে অনন্যা অবাক হয়েছিলো।
শ্বাশুড়ি উনার সেই ছেলের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেছিল,
– আহাদের ভাই। তোমারও ভাই। অনার সাথে পরিচিত হয়ে নে। ওর কথাই তোকে সবসময় বলি। ভীষণ ভালো মেয়ে।
অনন্যার সাথে অল্প হেসে তিনি ” অভিনন্দন” বলার পর পাশ থেকে একটা মহিলা যখন বলে উঠলো,
– আর্ভিন তুমি কবে করছো বিয়েশাদি? আপা তোমার উচিত দুজনের জন্য একইদিনে বউ নিয়ে আসা।
উনি হেসে বললেন,
– আহাদের এক্সপেরিয়েন্স পজিটিভ আসুক। তারপর ভেবে দেখবো। এইসব জটিল কেস কিনা।
অনন্যা হেসে ফেলেছিলো সে কথায়। খাওয়াদাওয়ার পর উনি চলে গিয়েছিলেন সবার আগে। যাওয়ার আগে পাশাপাশি বসা তাকে আর আহাদ মীর্জার মুখে একটুখানি মিষ্টি বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন,
– এই লেডি কিন্তু মানুষ কাঁটাছেড়া করে, সাবধান এসপি সাহেব।
আহাদ হেসে বলেছিলো,
– মায়ের অন্য পুত্রবধূ কি তবে ভীতুর ডিম হতে চলেছে?
তিনি তীব্র প্রতিবাদ করে বললেন,
– নোপ। আমি অনন্যার মতো মেয়েদেরকেই এপ্রিশিয়েট করি। এটলিস্ট মেরুদণ্ড থাকা চাই।
অনন্যা চমৎকার হেসেছিলো তখন। নারীদের সম্মান দিতে জানা মানুষ গুলোকে তার ভীষণ শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছে করে। অথচ সেই মানুষটা এভাবে সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেল।
আহাদ তার মাসখানেকের মধ্যে খানিকটা সুস্থ বোধ করলেও আন্টি সর্বস্ব হারিয়ে নাওয়াখাওয়া ভুলে গেলেন, আর আঙ্কেল হারালেন পা। উনি আগেও স্ক্র্যাচ ব্যবহার করতেন হাঁটার সময় এখন হুইল চেয়ার ছাড়া গতি নেই। ওই পরিবারে অনাকে ভীষণ দরকার। কিন্তু না করে দিল আহাদ। অনন্যাকে সে জানালো তাদের বিয়েটা আপাতত স্থগিত থাক। সে এখন কোনো বিয়েশাদি নিয়ে ভাবতে পারছেনা। অনন্যা ঠিক ধরেছিলো। উনার মাথায় এখন ভাইহত্যার প্রতিশোধের আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে। এই আগুন যতক্ষণ না নিভে যাবে ততক্ষণ পর্যন্ত উনি পুরোপুরি সুস্থও হবেন না। যদি লাশটা অন্তত পাওয়া যেত!
তারপর থেকে মীর্জা বাড়িতে অনন্যার যাতায়াত বেড়েছে। বৃদ্ধ মানুষ দুটোর জন্য তাকে যেতে হতো। তাছাড়া সেই বাড়িতে আহাদের চাচা চাচী আর আর চাচাতো বোন জিহাও আছে। তারা আছে বলেই হয়ত অনন্যাও একটু ভরসা পেয়েছে।
বাড়ির দেয়ালে টাঙানো দুই ভাইয়ের হাস্যজ্জ্বল ছবি দেখে অনন্যা বুকটা ভার হয়ে এসেছিলো। সুনিপুণ ষড়যন্ত্রের জাল বুনে উনাকে হত্যাটা করা হয়েছিলো নইলে একজন সুদক্ষ রণকৌশলী সেনাকে এমনভাবে খুন করাটা চাট্টিখানি কথা নয়।

হাসপাতালের বেড থেকে নিস্তার পাওয়ার মাসখানেক পর হঠাৎ করে একদিন আবারও অসুস্থ হয়ে পড়ে আহাদ। অনন্যা ছুটে এসেছিলো সে খবর শুনে। ছেলের অসুস্থতা দেখে আমেনা বেগম আচমকা শক্ত হয়ে গেলেন। উনাকে বাঁচতে হবে ছেলেটার জন্য। এই ছেলেকে উনি হারাতে পারবেন না। অনন্যাকে দেখামাত্র উনি কান্নায় ভেঙে পড়লেন। বললেন,
– ও উল্টাপাল্টা কথা বলা শুরু করেছে অনা। পাগল হয়ে গেছে। আমার এই ছেলেটাও মরে যাবে। আমি কি নিয়ে বেঁচে থাকবো? আর্ভিন ওকেও নিয়ে যাবে।
অনন্যা বলল,
– আহাদের কিছু হবে না আন্টি। ও ট্রমায় আছে তাই এমন করছে। আপনি ওর সামনে স্বাভাবিক আচরণ করবেন। এভাবে কাঁদবেন না প্লিজ।
আন্টি তবুও কাঁদতে লাগলেন। তিনদিন পর হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলো আহাদ। সম্পূর্ণ স্বাভাবিক একজন মানুষ। খাওয়ার টেবিলে বসে অনন্যাকে বলল,
– তোমার মত থাকলে বিয়েটা করে ফেলি। মা আমাকে শান্তি দিচ্ছে না।
অনন্যা বলল,
– আন্টি আপনার চিন্তায় অস্থির হয়ে আছেন। আপনি কেন এত চাপ নিচ্ছেন । রিপোর্ট কিন্তু ভালো কিছু বলছে না। আপনাকে সুস্থ থাকতে হবে আর আপনার ভাইয়ের খুনীদেরকে শাস্তি দিতে হবে। না হলে তো সব শেষ।
– তোমার কি মনে হয়? ওর লাশটা আমি আর খুঁজে পাব?
– না পান। কিন্তু শাস্তি তো দিতেই হবে।
– তা তো দেব। মরব নয়ত মারবো। ওঁরা আমার কলিজায় টান মেরেছে এবার ওদের সাথে আমি কি করি তুমি দেখো। সে যাইহোক বিয়েটা কবে হচ্ছে?
– বাবার সাথে কথা বলি? আগামী মাসের দিকে?
আহাদ খেতে খেতে মাথা নাড়লো। বলল,
– ঠিক আছে। মা তুমি খুশি?
আমেনা বেগম মাথা দুলিয়ে বললেন,
– খুব।

বিয়ের কথাবার্তা পাকাপোক্ত হয়েছে। আহাদের চাচা আনোয়ার মীর্জা সবকিছুর দায়িত্ব নিয়েছেন। বিয়েতে কোনো বিশেষ আয়োজন হবে না এ ছিল আহাদের নির্দেশ। শুধুমাত্র ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রা বরের সাথে গিয়ে কনেকে নিয়ে আসবে। অনন্যা তার বিয়ের শাড়ি গহনা গুলো মা বাবার সাথে বসে দেখছিলো। তারা দুই ভাইবোন। তার ভাই অস্ট্রেলিয়ায় থাকে বউ বাচ্চা নিয়ে। অনন্যার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর বাবা মা ওখানে চলে যাবেন। ভাইয়া ভাবীর সাথে ফোনকলে কথাবলার ফাঁকে হঠাৎ তার কাছে ফোন এল। জিহার ফোন!
মীর্জা বাড়িতে আহাদের চাচা চাচী আর চাচাতো বোন জিহাও থাকে। জিহা তার দুই ভাইকে ভীষণ ভালোবাসে। এক ভাইকে হারানোর শোক, আরেক ভাইয়ের অসুস্থতা নিয়ে ভয় দুটোই তাকে কাবু করে রেখেছে ইদানীং। অনন্যার সাথে তার ফোনে কথাবার্তা হয় রোজ। ফোন রিসিভ করে কানে তুলতেই জিহা জানালো,
– মেঝ ভাইয়া কেমন যেন করছে আপু। আমি কি করব বুঝতে পারছিনা।
অনন্যা আতঙ্কিত হয়ে বলল,
– আবার কি হলো? সকালে তো ঠিকঠাক কথা হলো আমার সাথে।
– সন্ধ্যায়ও ঠিক ছিল। কিছুক্ষণ আগে কোর্ট থেকে ফিরলো। জানিনা হঠাৎ করে কি হলো? তুমি তাড়াতাড়ি আসো প্লিজ।
অনন্যা আর অপেক্ষা করেনি। বাবার সাথে বেরিয়ে পড়েছে সোজা। মীর্জা বাড়িতে যেতেই আমেনা বেগমের কান্নাকাটি আর জিহার সংকুচিত মুখকে উপেক্ষা করে সোজা আহাদের ঘরে চলে গেল। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ। কোনো আওয়াজ নেই। জিহা পেছনে এসে বলল,
– এতক্ষণ জিনিস ভাঙচুর করছিলো। এখন চুপ হয়ে গেল। ভেতরে কি হয়েছে বুঝতে পারছিনা।
জিহার মা জাকিয়া বেগম বললেন,
– পাগলের মতো কথা বলছে। ও যেন নিজের মধ্যেই নেই। কোন শকুনের নজর পড়লো ছেলেদুটোর উপর আল্লাহ মালুম।
অনন্যা দরজা ধাক্কা দিয়ে বলল,
– আহাদ দরজা খুলুন। শুনতে পাচ্ছেন?
কোনো সাড়াশব্দ নেই। শুধু কতকগুলো কাপড় ঝাড়া, আর দেয়ালের সুইট টিপার শব্দ শোনা যাচ্ছে। অনন্যা আবারও ডাকলো।
– আহাদ দরজা খুলুন। আমি এসেছি। কথা আছে। শুনতে পাচ্ছেন?
তাদেরকে ভড়কে দিয়ে সাথে সাথেই জলদগম্ভীর স্বরে উত্তর এল।
– কল মি স্যার।
অনন্যা চমকে উঠে জিহার দিকে তাকালো। জিহাও চমকে উঠেছিলো। ছুটে এসে অনার পেছনে দাঁড়ালো সে। অনন্যা সাহস সঞ্চয় করে বলল,
– আমি অনন্যা। দরজা খুলুন না। একটা জরুরি খবর দিতে এসেছি।
– জরুরি খবর? আবার কিসের জরুরি খবর? আমি দরজা খুলতে পারব না এখন। আহাদ কোথায়? ওকে ডাকো। সব ওর জিনিসপত্র রাখা। আমার জিনিসপত্র কোথায়? জিহা? জিহাকে ডাকো।
জিহা কান্নায় ভেঙে পড়লো। অনন্যার বুকের ভেতর তীব্র নিনাদ। সে রুদ্ধকন্ঠে বলল,
– আপনি কে?
ওপাশ থেকে উচ্চস্বরে হাসির ফোয়ারা ভেসে এল।
– আমাকে চিনতে না পারলে কথা বলতে আসছো কেন? তুমি কে?
অনন্যা কান্না চেপে বলল,
– আমি অনন্যা।
তারপর কিছুক্ষণ পিনপতন নীরবতা। বলে উঠলো,
– ওহহ, মনে পড়েছে। তুমি আহাদের বউ। না হওয়া বউ। অ্যাম আই রাইট?
অনন্যা বলল,
– জ্বি। দরজাটা একটু খুলবেন? কিছু কথা বলব।
আবারও অট্টহাসি।
– আহাদ রাগ করবে না?
– না করবে না।
দরজাটা ফট করে খুলে গেল তারপর। ঘরের ভেতর অন্ধকার। একটা ছোটখাটো টর্চলাইট জ্বলছে। তার আলো কম।
ঘরের সমস্ত জিনিস এলোমেলো, ছড়ানো ছিটানো, ভাঙাচোরা। অনা স্বল্প আলোয় চোখ তুলে তাকিয়ে দেখলো সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা মানুষ। চুলের সিঁথিটা, চাহনি, শার্টের হাতা ভাঁজ করার ধরণ, চেয়ারে বসার ধরণ সবটা পাল্টে গেছে। অন্ধকারের মধ্যে চেয়ারে বসে তার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইলো দ্বৈত স্বত্বার অধিকারী মীর্জা আহাদ আলভী।
সেদিনের পর থেকে রাতের বেলা আহাদকে আর কেউ খুঁজে পাইনি। সন্ধ্যার পর থেকে আচমকা পাগলামি আর তারপর হুট করে নিজেকে মেহযেব আর্ভীন দাবি করে বসা। হুবহু তার মতোই আচরণ, কথাবার্তা, আহাদের বাগদত্তা ভেবে তাকে এড়িয়ে চলা সবকিছু দেখে কারোরই ভুল হবে না বলতে এটাই মেজর মেহযেব আর্ভিন । অনন্যার বাবা শহরের নামকরা সাইক্রিয়াটিস্টটের একজন। তিনি জানালেন, আহাদ Dissociative identity disorder (DID) রোগে ভুগছে। সহজ ভাষায় যাকে বলা হয় ডুয়েল পার্সোনালিটি।
অনন্যা বলল,
– ও কি পুরোপুরি পাল্টে যাবে বাবা? ও যখন মেহযেব আর্ভিন হয়ে কথা বলে তখন আমার ওকে আহাদ বলে মনে হয় না। আমি মানসিক ট্রমার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। ওকে এভাবে দেখতে ভালো লাগছে না আমার।
বাবা রশীদুল হাসান মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। বললেন,
– ওর নাম, বয়স, মুডস, মেমোরিস, ভোকাবুলারি সবকিছুতে চেঞ্জেস আসবে। এর কোনো স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা এখনো আবিষ্কার হয়নি অনু। তুই নিজেকে শক্ত রাখ। আহাদের এসময় তোকে ভীষণ দরকার।
অনন্যা বলল,
– ও দিনের বেলায় স্বাভাবিক আচরণ করছে। কাল যখন জিজ্ঞেস করলাম রাতে আপনি কোথায় গিয়েছেন। বললো, আমি হয়ত ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এভাবে চলতে থাকলে তো ওর চাকরিটাও চলে যাবে। আমার মনে হয় সবচেয়ে বড় আঘাতটা ও তখন বেশি পাবে।
বাবা বললেন,
– হ্যা চাকরি চলে যাবে। যদি তা সবাই জানতে পারে। রাতে ওকে একা না রাখতে পারলে হয়ত বিষয়টা খানিকটা হলেও বুঝা যেত যে কিভাবে ওর মধ্যে পরিবর্তনটা আসছে। এমনও হতে পারে কর্মস্থলেও ওর মধ্যে উপসর্গটা দেখা যাচ্ছে। তখন কি হবে?
অনন্যা মুখে হাত চেপে বসে থাকলো। জানেনা কি হবে। কি হতে চলেছে সামনে।
এদিকে তার মা আর ভাই কিছুতেই বিয়ের সম্বন্ধটা আর এগোতে চাইলো না। আহাদের মা রাজী থাকলেও অনন্যা ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনিও না করে দিলেন। উনি চান না মেয়েটার জীবনটা নষ্ট হয়ে যাক। বিরূপ পরিস্থিতি, দিনকে দিন আহাদের অবস্থার অবনতি, তারমধ্য অনন্যার ভাইয়ের জোরাজোরি তাকেও অস্ট্রেলিয়া নিয়ে যাওয়ার জন্য সবকিছুর মধ্যে নিজেকে পাগল পাগল লাগছিলো অনন্যা। আহাদকে এমন অবস্থায় ফেলে চলে যাওয়া যেমন মানানসই না ঠিক তেমন তার সাথে নিজেকে জড়ানোটাও ভয়ংকর। হয়ত কিছুদিনের মধ্যে মেধা, গুন, দক্ষতা দিয়ে অর্জিত তার মাথার টুপিটা খুলে নেয়া হবে, বুকের কাছের ব্যাজটাও। যারা এসপি বলে সম্মান করতো সবাই তাকে দেখে হেসে উড়িয়ে দেবে পাগল বলে অথচ সে সম্পূর্ণ সুস্থ শুধু অন্য স্বত্বা ধারণ করে নিজেকে মেহযেব আর্ভিন দাবি করা ছাড়া।
সেদিন মর্গের কাজ শেষ করে সোজা কোর্টে চলে গিয়েছিলো অনন্যা। জিহা জানিয়েছে ভাইয়া কোর্টের আশেপাশে থাকবে। জিহার কথা সত্যি হলো। আহাদ তাকে দেখে এসে সামনে দাঁড়ালো। বলল,
– এতদিন পর মায়ের সুবুদ্ধি হলো। তুমি অস্ট্রেলিয়া কবে যাচ্ছ?
অনা জবাব দিল না। আহাদ উত্তর না পেয়ে বলল,
– তুমি কি অসুস্থ?
– না। আপনি ভালো আছেন তো?
– কেন? আমাকে কি অসুস্থ মনে হচ্ছে? হ্যা আজকাল শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। ঘুমঘুম পাচ্ছে সারাক্ষণ। কেমন অস্থির অস্থির লাগে। কিন্তু আমার তো এত সহজে হার মানার উপায় নেই। ওর খুনের বদলা না নেয়া অব্দি.. সে যাহোক সেসব কথা তোমাকে কেন বলছি। তুমি কবে যাচ্ছ? ফিরবেই বা কবে? নাকি আর ফিরবে না?
অনন্যা বলল,
– আমি না ফিরলে আপনার কষ্ট হবে?
– না হবে না। আমি কত কষ্ট বুকে পুষে রেখেছি জানো না। তাই এই কষ্ট কোনো কষ্টই না। তাছাড়া আমারও মনে হয় তুমি আমার সাথে ভালো থাকবে না। হতেও তো পারে আর্ভিনের মতো আমাকেও কেউ মেরে গুম করে ফেললো তখন তোমার কি দশা হবে? এ কি তোমার চোখে জল?
বলেই বৃদ্ধাঙ্গুলি চেপে তার গাল থেকে জল মুছে দিল। বলল,
– আরেহ তুমি কি আমাকে ভালোটালো বেসে ফেলেছ নাকি? তাহলে যেওনা। থেকে যাও। মরলে একসাথে মরব।
অনন্যা আর যাবে না বলে সিদ্ধান্ত পাকাপোক্ত করে নিয়েছিলো। মায়ের সাথে কথা কাটাকাটি হয়েছে বেশ। নিজের ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিয়ে বাবাকে বললো, আমি ওই বাড়িতে চলে যাচ্ছি। আহাদের পাশে থাকা উচিত আমার। একজন মানুষ হিসেবে চলে যাওয়াটা আমাকে শোভা পাচ্ছে না। মা মুখের উপর বললেন,
– অতিশিক্ষিত হওয়ার কুফল।
বাবা বললেন,
– তুই একা যাবি কেন? আমিও যাব। তোদের বিয়ের বন্দোবস্ত করব। চাকরি গেলে যাক, ওর কাউন্সিলিং প্রয়োজন। চেষ্টায় ত্রুটি রাখতে নেই। বিয়েটা হয়ে যাক তারপর আমি দেখছি। ভাইয়ের শোক ও কাটিয়ে উঠতে পারছেনা। আমরা ওর ভেতরটা দেখতে পাচ্ছি না। কতটা পোড়াচ্ছে ওর ভেতরে।
বাবার কথা শুনে মা আরও জোরে কান্নাকাটি জুড়ে দিয়েছেন। ওইরকম একটা ছেলের সাথে কি করে মেয়েটার জীবন কাটবে, কিভাবে কি হবে, এই ভেবে তিনি কেঁদে সারা হলেন। মায়ের আহাজারি সইতে না পেরে টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলো অনন্যা। যখন তার চোখ ছুটলো তখন দেখলো সামনে বাবা দাঁড়িয়ে আছে। ঘড়ির দিকে তাকাতেই দেখলো অলরেডি সাতটা। বাবা বললেন,
– এভাবে কেউ ঘুমায়?
– সরি বাবা। তুমি আমাকে ডেকে দাওনি কেন?
– জিহা ফোন করেছে। আগে কথা বল।
ফোন রিসিভ করার সাথে সাথে জিহা বলল,
– আপু মেঝ ভাইয়া চলে গিয়েছে।
অনন্যা চট করে দাঁড়িয়ে পড়লো। বলল,
– কি বলো। কোথায়?
– তোমাদের বাড়িতে। ও এখন স্বাভাবিক নেই।
অনন্যা কিছু বুঝতে উঠতে পারলো না। জিহা জানালো, সে মজা করে বলেছে অনা আপু অস্ট্রেলিয়া চলে যাচ্ছে তোমার জন্য। তুমি এরকম পাগলামি করছো তাই। তুমি এরকম না করলে অনা আপু থেকে যেত। অনন্যা বলল,
– তারপর?
জিহা বলল,
– তারপর দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। মাকে বললো, আহাদের জন্য অনাকে ফিরিয়ে আনতে যাচ্ছি। ও টলছিলো। তারপরও বেরিয়ে গেল।
অনন্যা কপালে হাত দিয়ে বলল,
– তোমরা ওকে ঘর থেকে বেরোতে দিলে কেন?
– আমরা বুঝতে পারিনি আপু ও বেরিয়ে যাবে। তুমি কিছু একটা করো।
অনন্যা কুলকুল করে ঘামতে লাগলো।
তারপর আধঘন্টার মধ্যে বাড়ির উঠোনে গাড়ির হর্নের শব্দ শুনে হাত পা অসার হয়ে এল তার। কলিং বেল বাজলো অনবরত। অনন্যা ছুটে গিয়ে দরজা খুলে দিল। দরজা খোলার পর আহাদকে যেরূপে দেখলো তাতে ঠান্ডা একটা স্রোত নেমে গেল তার শিরদাঁড়া বেয়ে। শুকনো ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করলো,
– আপনি কে?
প্রথমেই ভুরু কুঞ্চন, তারপর সন্দেহজনক চোখে তাকানো। এরপর উত্তর,
– মীর্জা মেহযেব আর্ভিন। তোমার ভাসুর।
– এখানে কি চান?
– তোমাকে তোমাকে। তোমার নামটা কি যেন?
কপাল চুলকালো সে। অনন্যার মনে হলো এ আহাদ নয়, সম্পূর্ণ মেহযেব আর্ভিন। কোনো ত্রুটি নেই। আহাদ কথা বলার সময় কপাল কুঁচকায় না।
ঠোঁট কামড়ায় না। আঙুল দিয়ে কপাল চুলকায় না।
অনন্যার বাবা পেছন থেকে বললেন,
– কে এল রে অনু?
অনন্যার সামনে সাহেবি ভঙ্গিতে দাঁড়ানো লোকটা এবার হাসলো।
– ওহ ইয়েস তোমার নাম অনু। যাও ব্যাগপত্র গুছিয়ে নাও। তোমাকে নিয়ে যাব আমি। তুমি না গেলে আহাদ আমার উপর ভীষণ ক্ষেপে যাবে।
এই চরম পরিস্থিতিতেও হাসি পেল অনন্যার। তবে সেই হাসি বেশিক্ষণ স্থির থাকেনি। বাড়ির গেইট ঠেলে একদল লোক হৈ হৈ করে ঢুকে পড়লো। তারপর গাড়ি ভাংচুর করতে লাগলো যেটাতে করে আহাদ এসেছে। আহাদ তখন চোখবুঁজে সোফায় বসে আছে ঘরটা অন্ধকার করে। দারোয়ানরা লোকগুলোকে আটকানোর পর রশীদ সাহেব জানতে পারলো, এই গাড়ির মালিক এখানে আসার পথে তাদের মিষ্টির ভ্যানগাড়ি উল্টে দিয়ে এসেছে। অনন্যা ব্যাগ নিয়ে নেমে আসার পর আহাদকে জিজ্ঞেস করলো,
– ওই লোকগুলো যা বলছে তা কি সত্যি?
আর্ভিন রূপী আহাদ চোখবুঁজে রাখা অবস্থায় জবাব দিল।
– হ্যা। ডিসিপ্লিন মেইনটেইন না করলে ওইরকমই হবে।

চলমান…