#ফিরেছি_তোর_আঙিনায়
পর্ব —১৯
মৌমো তিতলী
সকাল থেকেই এ.সি. গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ এর হেড অফিসে ব্যস্ততা যেন অন্য দিনের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি।
রিসেপশন থেকে শুরু করে কনফারেন্স ফ্লোর পর্যন্ত প্রতিটি বিভাগে কর্মচারীরা ছুটে বেড়াচ্ছে যার যার নিজ দায়িত্ব নিয়ে। কেউ শেষ মুহূর্তের প্রেজেন্টেশনের স্লাইড মিলিয়ে নিচ্ছে, তো কেউ গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টের ফাইল সাজিয়ে বোর্ডরুমে পৌঁছে দিচ্ছে।
আইটি টিম বড় স্ক্রিনে প্রেজেন্টেশন টেস্ট করছে, আর হসপিটালিটি টিম অতিথিদের জন্য কফি, রিফ্রেশমেন্ট এবং কনফারেন্স কিট প্রস্তুত করতে ব্যস্ত।
আজকের দিনটা কোম্পানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দেশের অন্যতম শীর্ষ নির্মাণ ও অবকাঠামো প্রতিষ্ঠান মেহরাব গ্লোবাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার-এর সঙ্গে বহু দিনের আলোচনার পর আজ অনুষ্ঠিত হবে চূড়ান্ত বিজনেস নেগোশিয়েশন।
ডিলটি সম্পন্ন হলে দুই প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন জেলায় একাধিক স্মার্ট কমার্শিয়াল প্রজেক্ট নির্মাণ করা হবে।
বোর্ডরুমের কাঁচঘেরা বিশাল জানালা দিয়ে সকালের রোদ এসে পড়েছে টাইলস বাঁধানো ফ্লোরের ওপর। উক্ত স্থানে অবস্থিত কাঁচের টেবিলের মাঝখানে দুই প্রতিষ্ঠানের লোগো বসানো।
প্রতিটি আসনের সামনে নাম লেখা প্ল্যাকার্ড, মিনারেল ওয়াটার, নোটপ্যাড ও কোম্পানির তথ্যসংবলিত ফোল্ডার সুন্দরভাবে সাজানো।
ঠিক দশটা বাজার কয়েক মিনিট আগে আদিত্য নিজের কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো।
গাঢ় নেভি ব্লু থ্রি-পিস স্যুট, সাদা শার্ট, সিলভার টাই আর হাতে কালো ডায়ালের ঘড়ি। ব্যক্তিত্ব যেন আরও কয়েকগুণ গম্ভীর হয়ে উঠেছে। সাথে অফিসের সুন্দরী তরুণীদের মুগ্ধ দৃষ্টি তার ওপর।
আদিত্যর কয়েক কদম পেছনেই হাঁটছে মৌমিতা।
হালকা অফ-হোয়াইট ফরমাল শাড়ি, পরিপাটি করে খোঁপা করা চুল, গলায় ছোট্ট মুক্তোর মালা আর হাতে প্রয়োজনীয় সব ফাইল। যদিও সে অফিসে কখনো এমন শাড়ি পরে ফরমাল গেটআপে আসেনি,পরন্তু আজ বিষয়টা ভিন্ন। কোম্পানির জন্য আজকের ডিলটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোন রকম নন ডিসিপ্লিনে সেটা অপজিশনের চোখে গুরুত্ব কমাতে চায় না। আদিত্যর পিছে পা চালাতে চালাতেই মৌমিতা দক্ষ পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্টের মতো শেষবার প্রতিটি ডকুমেন্ট মিলিয়ে নিলো।
বোর্ডরুমে ঢুকতেই অতিথিদের উদ্দেশে ভদ্র হাসি উপহার দিল আদিত্য।
— “গুড মর্নিং, জেন্টলমেন।”
অপরপক্ষের চেয়ারম্যানও উঠে দাঁড়িয়ে করমর্দন করলেন।
—”গুড মর্নিং, মিস্টার আদিত্য চৌধুরী। আশা করি আজকের আলোচনাটা সাকসেস হবে।”
আদিত্য সৌজন্য হাসলো।
— “I hope so too.”
সকলেই নির্ধারিত আসনে বসে পড়লেন।
মৌমিতা আদিত্যর ডান পাশে সামান্য পেছনে নিজের জায়গায় বসে ল্যাপটপ খুলে নোট নেওয়া শুরু করলো।
মিটিং শুরু হতেই বড় স্ক্রিনে একে একে উঠে এলো ভবিষ্যৎ প্রকল্পের নকশা, সম্ভাব্য বিনিয়োগ, বাজেট, ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি লাভের পরিসংখ্যান।
আদিত্য প্রতিটি বিষয় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ব্যাখ্যা করতে লাগলো।
মাঝেমধ্যে অপরপক্ষের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছিলেন।
আদিত্য একটুও বিচলিত না হয়ে প্রতিটি প্রশ্নের পরিষ্কার ও যুক্তিসংগত উত্তর দিল।
এক পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি প্রয়োজন পড়তেই আদিত্য শুধু একবার মৌমিতার দিকে তাকালো।
একটিও কথা না বলেও আদিত্যর দৃষ্টির ভাষা বুঝে গেল মৌমিতা।
মুহূর্তের তার সামনে বিদ্যামান নীলরঙা ফাইলটি খুলে তার সামনে এগিয়ে দিল।
আদিত্য কোমল দৃষ্টিতে তাকালো মৌমিতার মুখের দিকে। মাত্র কয়েক সেকেন্ড।
দুই ঘণ্টার দীর্ঘ আলোচনা শেষে শেষবারের মতো চুক্তিপত্রটি সামনে আনা হলো।
অপরপক্ষের চেয়ারম্যান কয়েক মুহূর্ত নীরবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভাবলেন।
তারপর কলম হাতে নিয়ে মৃদু হেসে বললেন,,,
—”আমি মনে করি… আমরা একসঙ্গে অসাধারণ কিছু করতে পারবো মিঃ আদিত্য।”
কথাটা বলেই তিনি চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করে দিলেন।
পরক্ষণেই আদিত্যও নিজের স্বাক্ষর সম্পন্ন করলো।
মুহূর্তের মধ্যেই বোর্ডরুম জুড়ে করতালির শব্দে গমগম করে উঠলো।
উপস্থিত সবাই একে অপরকে কংগ্রাচুলেট করতে লাগলো।
মেহরাব গ্লোবালের চেয়ারম্যান হাসিমুখে বললেন,,,
—অভিনন্দন, মিঃ আদিত্য। আজ থেকে আমরা শুধু বিজনেস পার্টনার নই, বরং দীর্ঘমেয়াদি সহযোগী হতে চলেছি।
আদিত্যও হাসিমুখে উত্তর দিল,,
— Thank you Mr. Mehrab। আমি বিশ্বাস করি, এই যাত্রা আমাদের দুই প্রতিষ্ঠানের জন্যই নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।”
মিটিং শেষ হওয়ার পর অতিথিরা একে একে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন।
ঠিক তখনই মেহরাব গ্লোবালের চেয়ারম্যান মিঃ মেহরাব আবার আদিত্যর দিকে ফিরে বললেন,,,
— আ মিঃ আদিত্য আজকের সফল চুক্তি উপলক্ষে আজ রাত আটটায় আমাদের পক্ষ থেকে একটি ছোট্ট সেলিব্রেশন পার্টির আয়োজন করা হয়েছে। শহরের ‘রয়্যাল ক্রেস্ট গ্র্যান্ড বলরুম’-এ। আশা করছি, আপনি অবশ্যই উপস্থিত থাকবেন।”
আদিত্য সৌজন্য হাসি দিয়ে বললো,,,
— “ইট’স মাই প্লেজার।
ভদ্রলোক এবার মৌমিতার দিকে তাকিয়ে বললেন,,,
— আর আপনার দক্ষ সহকারীকে নিয়েও আসবেন। আজকের মিটিংয়ে উনিও দারুণ পারফর্মেন্স দেখিয়েছেন।”
কথাটা শুনে মৌমিতা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
আদিত্য এক ঝটকায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো মেহরাবের দিকে। পরমুহূর্তেই হালকা হাসলো। মৌমিতার অপ্রস্তুত হয়ে যাওয়া মুখের দিকে দৃষ্টি রেখে বললো,,,
—”নিশ্চয়ই। We will both come.
বোর্ডরুম ফাঁকা হয়ে গেলে, মৌমিতা সবটা গুছিয়ে একবার আদিত্যর দিকে তাকিয়ে ত্রয় পায়ে বেরিয়ে গেলো।
আদিত্য ধীরে ধীরে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। বুক ভরা তপ্ত শ্বাস টেনে নিলো নিজের ভেতরে। আজ কোনভাবেই মাথা গরম করা চলবে না। কোম্পানির উন্নয়নের কথা মাথায় রেখে কিছুটা ক্ষান্ত হলো আদিত্য। আজকের ডিলটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোন ভুল পদক্ষেপ নেয়া উচিত হবে না।
________________
অফিসের সব কাজ শেষ করে আদিত্য আর মৌমিতা পাশাপাশি বেরিয়ে এলো।
দুজনেই ভীষণ ক্লান্ত। গাড়িতে সারাটা পথই দু’জনের মধ্যে তেমন কোনো কথা হলো না।
গাড়ির ভেতরে হালকা সুরে বাজছিল মৌমিতার পছন্দের একটি গান।
মৌমিতা জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। আদিত্য তার পছন্দের কথা কিভাবে জানলো প্রশ্ন টা তার মাথায় ঘুরলেও কোন প্রশ্ন করলো না সে।
এদিকে গাড়ি চালাতে চালাতে বারবার আড়চোখে তার দিকেই তাকাচ্ছে আদিত্য। হাত বিদ্যামান স্টিয়ারিং হুইলে।
সকালের নিজের আচরণটা বারবার মনে পড়ছে তার। আজ সারাদিন মেয়েটা প্রফেশনাল থাকলেও এই মুহূর্তে মুখে অভিমানের ছাপটা স্পষ্ট। মাঝে একবার গাড়ি থামিয়ে নেমে গেলো আদিত্য। প্রায় বিশ মিনিট পর একটা সাদা রঙের শপিং ব্যাগ হাতে ফিরে এলো।
আধাঘণ্টার মধ্যেই গাড়ি এসে থামলো আশাকুঞ্জের সামনে।
বাড়ির ভেতরে ঢুকেই আদিত্য কোনো কথা না বলে সোজা নিজের রুমে চলে গেলো।
মৌমিতাও ধীর পায়ে রুমে ঢুকতেই দেখলো বিছানার ওপর রাখা শপিং ব্যাগটা।
মৌমিতা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো সেদিকে।
ঠিক তখনই ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো আদিত্য।
মৌমিতার কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে মৃদু হাসি ফুটে উঠলো আদিত্যর অধর জুড়ে।
মৌমিতা তবুও আদিত্য কে কিছুই জিজ্ঞাসা করলো না। কাঁধের ব্যাগটা নামিয়ে রেখে ওয়াশ রুমে ঢুকলো। বের হলো লম্বা শাওয়ার নিয়ে। বেরিয়ে এসে আর আদিত্যকে দেখতে পেলো না। এক পা দু পা করে বিছানার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো মৌমিতা। শপিং ব্যাগটা এখনো সেখানেই রাখা। মৌমিতা হাত বাড়িয়ে ব্যাগটা হাতে নিলো। খুলে দেখার আগেই নাস্তার ট্রে হাতে রুমে ঢুকলো আদিত্য। রুমে ঢুকেই মৌমিতার হাতে ব্যাগটা দেখে স্বাভাবিক ভাবেই বললো,,,
— “ওটা তোমার জন্য।”
মৌমিতা ভ্রু কুঁচকে তাকালো আদিত্যর দিকে।
— “আমার জন্য?”
— “হুম। খুলে দেখো।”
ধীর হস্তে ব্যাগটা খুলতেই নরম টিস্যু পেপারের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো অপূর্ব সুন্দর একটা শাড়ি।
গাঢ় ওয়াইন কালারের।
পুরো শাড়িজুড়ে সূক্ষ্ম জরির সুতাই করা নকশা।
আলোর ঝলকে শাড়িটা যেন আরও ঝলমলে হয়ে উঠেছে।
মুহূর্তের জন্য সত্যিই মুগ্ধ হয়ে গেল মৌমিতা।
তবুও পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল।
শাড়িটা ভাঁজ করে আবার ব্যাগে রাখতে রাখতে বললো,,,
— “হঠাৎ এসব কেন কিনতে গেলেন?”
আদিত্য ধীরে ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়ালো। আদিত্যর দৃষ্টি মৌমিতার চোখের দিকে। আলতো করে মৌমিতার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের কাছে টেনে নিলো আদিত্য। মৌমিতার সদ্য স্নানে ভেজা কিছু চুল মুখের ওপরে এসে হুটোপুটি করছে। সেগুলো আঙ্গুলের সাহায্য কানের পাশে গুঁজে দিলো। অদ্ভুত এক অনুভূতির আবেশে চোখ বন্ধ করে নিলো মৌমিতা।
আদিত্য মৌমিতার বন্ধ চোখের দিকে তাকিয়ে কিছুটা ঝুঁকে এলো। কানের কাছে মুখ নিয়ে হাস্কি স্বরে ফিসফিস করে বলল বললো,,
— “আজ রাতের পার্টিতে… আমি চাই তুমি এটা পরো।”
ফট করে চোখ মেলে তাকালো মৌমিতা। অবাক নয়নে তাকালো আদিত্যর নেশাক্ত মোহগ্রস্ত দৃষ্টির পানে। মুহুর্তেই চোখ সরিয়ে নিলো সে। শান্ত গলায় বললো,,
— “আমার তো শাড়ি আছে। নতুন কেন? এটার কোন প্রয়োজন ছিলো না।
— তোমার ১০০০ টা শাড়ি থাক! সেটা ম্যাটার করে না। এটা আমার কাছে বেশি ইম্পরট্যান্ট কারণ এটা আমি নিজে তোমাকে দিতে চেয়েছি।”
মৌমিতা এবার পূর্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালো।
কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে মৃদু অভিমানী স্বরে বললো,,,
— “সকালে অফিসে যেভাবে কথা বললেন… আমি কিন্তু ভুলিনি। এখন আবার গিফট দিয়ে ভোলাতে চাইছেন? ভাবছেন সব ঠিক হয়ে যাবে?”
কথাটা শুনে আদিত্যর মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেলো।
সে কিছুটা নিচু স্বরে বললো,,,
—সরি বউ! আমি জানি… সকালে আমার করা ব্যবহারটা ঠিক হয়নি।
মৌমিতাকে চুপ থাকতে দেখে আবার বললো,,,
— কিন্তু আমি ছাড়া অন্য কারো চোখে তোমার জন্য মুগ্ধ দৃষ্টি দেখে আমি রেগে গিয়েছিলাম। তোমার দিকে কেউ তাকালে আমার মাথায় আগুন ধরে যায়। You don’t know how possessive I am about you.
মৌমিতা অবাক হয়ে তাকালো আদিত্যর দিকে,,
— তাই বলে আমার ওপর অযথা রাগ ঝাড়বেন?
— সরি বললাম তো রে বাবা! বলছি তো আমার উচিত হয়নি তোমাকে ওভাবে বলাটা।
মেয়েটা কোনো উত্তর দিল না। শুধু অন্যদিকে তাকিয়ে রইলো।
আদিত্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে বললো,,,
— “সরি, মৌমি,,আই রিয়েলি ভেরি সরি।” দেখো কান ধরছি।
মৌমিতা বিস্মিত হয়ে তাকালো। আদিত্য যে এভাবে ক্ষমা চাইবে, সেটা সে ভাবেনি।
মৌমিতার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠলো।
……..
সন্ধ্যায় ঘড়িতে তখন সাড়ে ছটা।
আদিত্যর গাড়ি নিয়ে ঢুকলো আশাকুঞ্জে। জরুরী কাজে বাইরে গেছিলো সে। এখন আবার মিঃ মেহরাবের পার্টিতে যেতে হবে। ভাবনার মাঝেই নিজ কামরায় প্রবেশ করলো আদিত্য। রুমে ঢুকেই ঘুরে তাকিয়েই কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে গেলো সে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শাড়ির কুচি ঠিক করছে মৌমিতা। নেশাগ্রস্ত চোখে সেদিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আদিত্য। মাথা হ্যাং হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে বেচারার।
তার মনে হলো ওয়াইন কালারের শাড়িটা যেন মৌমিতার জন্যই তৈরি।
তার খোলা চুলের ঢেউ কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এসেছে কোমর পর্যন্ত। কানে মুক্তো আর পাথরের ছোট্ট দুল।
হাতে ডায়মন্ডের চিকন চুড়ি। হালকা মেকআপে মুখটা অপ্সরীর ন্যায় লাগছে।
আদিত্যর চোখে স্পষ্ট মুগ্ধতা। আদিত্য মৃদু স্বরে বললো,
–মাশাআল্লাহ!
আচমকা আদিত্যের কন্ঠে চমকে উঠলো মৌমিতা। ঘুরে দাঁড়ানোর সাথে সাথে আদিত্যর নেশাক্ত দৃষ্টি নজরে এলো। আদিত্যর তার দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে মৌমিতা লজ্জা পেয়ে অন্যদিকে তাকালো,,
— “এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?”
আদিত্য এক পা এক পা করে এগিয়ে এলো মৌমিতার ঠিক সামনে। নিভু নিভু দৃষ্টিতে তাকালো মৌমিতার মুখের দিকে। মোহগ্রস্তের ন্যায় বললো,,,
— “কারণ… কারণ তোমার থেকে চোখ সরাতে ইচ্ছে করছে না।”
মৌমিতা সঙ্গে সঙ্গে নড়েচড়ে দাঁড়ালো। আমতা আমতা করে বললো,,,
—আ…আপনি রেডি হয়ে নিন। নয়তো পার্টির জন্য দেরি হয়ে যাবে।” বলেই দ্রুত পদক্ষেপে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো মৌমিতা।
সেদিকে খেয়াল করে আদিত্য হেসে মাথা নাড়লো। বিড়বিড় করে বললো কিছু। যা ঘরের চার দেওয়ালে ছাড়া কারো কর্ণকুহরে প্রবেশ করলো না।
আদিত্য নিজেও কালো টাক্সেডো, সাদা শার্ট আর কালো বো-টাই পরে একেবারে পরিপাটি ভাবে নিজেকে সজ্জিত করলো। চুল সেট করে, পারফিউম স্প্রে করে,ওয়ালেট টা নিয়ে বেরিয়ে এলো রুম থেকে । মৌমিতা বাইরেই অপেক্ষা করছিলো এতক্ষণ। আদিত্য বেরিয়ে আসতেই দু’জন পাশাপাশি নিচে নামলো।
দুজনকে একসাথে দেখে আশালতা বেগম কিছুক্ষণ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর মুচকি হেসে মনে মনে বললেন,
“আল্লাহ তোমাদের দু’জনকেই সবসময় এভাবেই সুখে রাখুক।”
মা কে বলে দু’জন একসঙ্গে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে বসল।
চলবে….
#ফিরেছি_তোর_আঙিনায়
পর্ব —২০
মৌমো তিতলী
আদিত্যর গাড়িটা ধীরগতিতে এসে থামলো শহরের অভিজাত পাঁচতারকা হোটেল রয়্যাল ক্রেস্ট গ্র্যান্ড বলরুম-এর প্রবেশদ্বারের সামনে।
রাত তখন ঠিক আটটা।
পুরো ভবনটা যেন আলোর রাজ্যে পরিণত হয়েছে। সাদা আর সোনালি ফেয়ারি লাইটে মোড়ানো বিশাল প্রবেশপথ, দুই পাশে তাজা সাদা লিলি, অর্কিড আর গোলাপের মনোমুগ্ধকর ফুলের সাজ। প্রবেশমুখে লাল কার্পেট বিছানো। অতিথিদের স্বাগত জানানোর জন্য সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে হোটেলের ইউনিফর্ম পরিহিত স্টাফরা।
একজন ভ্যালেট দ্রুত এগিয়ে এসে ভদ্রতার সঙ্গে গাড়ির দরজা খুলে দিল।
প্রথমে নেমে এলো আদিত্য।
কালো টাক্সেডোয় সুঠাম সুদর্শন ব্যক্তিত্ব শেহজাদ আদিত্য চৌধুরী। চকচকে কালো জুতা, হাতে রুপালি ডায়ালের ঘড়ি, পরিপাটি করে সেট করা চুল,সব মিলিয়ে যেন গম্ভীর রেসপেক্টেবল ব্যক্তিত্বের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। গাড়ি থেকে নামতেই আশপাশের কয়েকজন অতিথির দৃষ্টি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তার দিকে আঁটকে গেছে।
পরক্ষণেই অন্য পাশের দরজা খুলে ধীরে ধীরে নামলো মৌমিতা।
গাঢ় ওয়াইন রঙের শাড়িটা ঝাড়বাতির আলোয় যেন আরও সৌন্দর্য্য ছড়াচ্ছিল। সূক্ষ্ম জরির নকশাগুলো প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে চিকচিক করে উঠছিল। খোলা চুলের ঢেউ কোমর ছুঁয়ে নেমে এসেছে। মুখে হালকা মেকআপ, ঠোঁটে গোলাপি আভা, কানে ছোট্ট মুক্তো আর পাথরের দুল। মৌমিতার সাজটা ছিল মার্জিত, অথচ অপূর্ব আকর্ষণীয় সে।
গাড়ির দরজা বন্ধ করেই আদিত্য একবার তাকালো মৌমিতার দিকে। তারপর নিজের কোটের কলার ঠিক করে শান্ত গলায় বললো,,,
— “চলো।”
মৌমিতা মৃদু মাথা নেড়ে নেমে এলো গাড়ি থেকে। দু’জনে পাশাপাশি এগিয়ে গেল ভেন্যুর দিকে।
বিশাল বলরুমে প্রবেশ করতেই বিশাল চোখ ধাঁধানো পরিবেশ তাদের স্বাগত জানালো।
ছাদের সাথে ঝুলতে থাকা বিশাল ক্রিস্টালের ঝাড়বাতিগুলো সোনালি আলো ছড়িয়ে পুরো হলঘর ঝলমল করছে। একপাশে লাইভ স্ট্রিং ব্যান্ড ধীরলয়ের ওয়েস্টার্ন ক্লাসিক্যাল সুর বাজাচ্ছে। অন্য পাশে বিভিন্ন দেশের খাবারে সাজানো বুফে কাউন্টার। মাঝখানে ছোট ছোট গোল টেবিল, প্রতিটিতে কাঁচের ফুলদানিতে তাজা গোলাপ আর সুগন্ধি মোমবাতি জ্বলছে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, বিনিয়োগকারী, করপোরেট ব্যক্তিত্ব এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে পুরো হলঘর সরগরম হয়ে উঠেছে।
আদিত্য আর মৌমিতা ভেতরে ঢুকতেই অনেকগুলো দৃষ্টি একসঙ্গে তাদের দিকে নিবদ্ধ হলো। কেউ বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলো। কেউ আবার নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে বলতে লাগলো।
—ওই যে… আর.কে গ্রুপের এমডি, মিস্টার আদিত্য চৌধুরী।
—এত অল্প বয়সে এমন সাফল্য… সত্যিই অবিশ্বাস্য!
—তার সঙ্গে যে লেডিটা আছেন, উনিই কি তার পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট?
— ওয়াও অসাধারণ গ্রেসফুল! হোয়াট আ বিউটি!
চারপাশের সেই চাপা গুঞ্জন স্বল্প বিস্তরে আদিত্যর কানে গেলেও তার মুখে কোনো পরিবর্তন এলো না। মুখ শক্ত করে সোজা হয়ে হেঁটে চলেছে সে।আসেপাশে নজর ঘোরালে অনেকের মুগ্ধ দৃষ্টি নজরে আসে আদিত্যর। ভেতরটা তেতো হয়ে গেলো নিমিষেই।
আদিত্যর প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল আত্মবিশ্বাস আর দৃঢ়তা।
যেখান দিয়েই যাচ্ছিলো, পরিচিত ব্যবসায়ীরা এগিয়ে এসে করমর্দন করছিলেন।
— “ষকংগ্র্যাচুলেশনস, মিস্টার আদিত্য। আজকের সাকসেস ডিলের জন্য শুভ কামনা
প্রতিবারই আদিত্য ভদ্র হাসি দিয়ে সবার শুভেচ্ছা গ্রহণ করছিলো।
—Thank you.It’s very kind of you.
হলের বিভিন্ন প্রান্তে উপস্থিত করপোরেট পরিবারের তরুণীরা আড়চোখে বারবার দেখছিলো আদিত্যর দিকে। কারও হাতে জুসের গ্লাস, কেউ আবার বন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে বলতেই থমকে তাকিয়ে আছে।
একজন মৃদু হেসে ফিসফিস করে বললো,
— “He looks incredibly handsome.”
আরেকজন চাপা স্বরে উত্তর দিলো,
— Handsome তো বটেই… কিন্তু তার ব্যক্তিত্বটাই সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়।
আরেকজন তরুণী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,,,
— “ইশ! যদি একবার পরিচয় হতো!”একবার যদি তাকাতো এদিকে।
এসব কথার কিছুই যেন আদিত্যর কাছে গুরুত্ব পেলো না। তার দৃষ্টি বারংবার এক জায়গাতেই আটকে আছে।
মৌমিতা। তার ওয়াইফ,তার ভালোবাসার দিকে।
মৌমিতা অবশ্য এসবের কিছুই খেয়াল করছিলো না। নতুন পরিবেশ, এত বড় আয়োজন আর চারপাশের অভিজাত মানুষের ভিড়ে মৌমিতা একটু অস্বস্তি বোধ করছিলো। তবে সে যথাসম্ভব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছিলো।
ঠিক তখনই দূর থেকে আদিত্যর দিকে হাসিমুখে এগিয়ে এলেন মিস্টার মেহরাব।
দু’হাত বাড়িয়ে উষ্ণ কণ্ঠে বললেন,,
—Welcome, Mr. Aditya! আমি জানতাম আপনি কথা রাখবেন। আফটার অল আপনাকে ছাড়া আজকের পার্টি অসম্পূর্ণ।
আদিত্য সৌজন্য হাসি দিয়ে করমর্দন করলো।
—Thank you for inviting us.
মিস্টার মেহরাব এবার হাসিমুখে মৌমিতার দিকে তাকালেন।
— Welcome, Miss Moumita. আজ আপনাকে সত্যিই অসাধারণ লাগছে।
মেহরাবের স্বতঃস্ফূর্ত প্রশংসায় মৌমিতা কিছুটা বিব্রত বোধ করলেও সৌজন্য হাসলো,,,
— Thank you, Sir.
মিস্টার মেহরাব দু’জনের দিকে তাকিয়ে সন্তুষ্ট গলায় বললেন,
— “চলুন, আজকের সন্ধ্যাটা শুধু ব্যবসার সাফল্য উদযাপনের নয়, আমাদের পার্টনারশিপের নতুন সম্পর্কেরও সূচনা। আশা করি, আপনারা সন্ধ্যাটা উপভোগ করবেন।”
আদিত্য ভদ্রভাবে মাথা নাড়লেও, মেহরাবের দৃষ্টি কয়েক সেকেন্ডের জন্য মৌমিতার মুখে স্থির হয়ে থাকতে দেখে তার চোয়ালের পেশি অদৃশ্যভাবে শক্ত হয়ে উঠলো। শুধু মাত্র প্রফেশনাল হিসেবে মৌমিতা কে সে এখানে নিয়ে এসেছে,বিয়ের নিউজটা এখনো খোলসা করা হয়নি বলেই দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করলো আদিত্য। এবারও সে নিজের অভিব্যক্তি নিখুঁতভাবে আড়াল করে রাখলো।
কারণ আদিত্য চৌধুরী খুব ভালো করেই জানে সব অনুভূতি প্রকাশ করার সময় সব জায়গায় হয় না।
___________
ঠিক একই সময় হলরুমের এক কোণে, হাতে ক্রিস্টালের জুসের গ্লাস নিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল আরেকজন মানুষ।
জারিনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ-এর অনার মি. রায়হান কাবির।
পরিপাটি ধূসর রঙের স্যুট, চোখে পাতলা ফ্রেমের চশমা, ঠোঁটের কোণে ম্লান এক হাসি লেগে আছে। বাইরে থেকে তাকে স্বাভাবিক মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে বহুদিনের জমে থাকা ক্ষোভ যেন এখনও তার চোখে দাউদাউ করে জ্বলছে।
তার দৃষ্টি থেমে আছে বলরুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা আদিত্য আর মৌমিতার ওপর। মৌমিতা কে দেখে চোয়াল শক্ত হয়ে এলো তার।
মুহূর্তেই মনে পড়ে গেল কয়েক মাস আগের সেই বিশ্রি ঘটনাটা।
আর.কে. গ্রুপের সঙ্গে যৌথ ব্যবসায়িক চুক্তির আলোচনা করতে গিয়েছিলো সে আর তার পার্টনার নাফিস।
সেদিন প্রথমবার কাছ থেকে দেখেছিল মৌমিতাকে।
সেই এক দেখাতেই মেয়েটার প্রতি এক অপ্রিতিকর আকর্ষণ জন্মেছিল তার মনে। করপোরেট দুনিয়ায় এগুলো নরমাল তার কাছে। ফলে সৌজন্যের সীমা অতিক্রম করে সে যেভাবে মৌমিতার প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছিল, সেটা আদিত্যর চোখ এড়ায়নি।
এবং তার ফলাফল ঘটেছিল কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই।
সবার সামনে আদিত্যর সজোরে বসিয়ে দেওয়া সেই থাপ্পড়…
আর তার পরেই এক মুহূর্ত দেরি না করে বাতিল করে দেওয়া বহু কোটি টাকার ব্যবসায়িক চুক্তি।
সেদিনের সেই অপমান এখনও রায়হানের আত্মসম্মানে গভীর দাগ কেটে আছে। রায়হানের মতে,করপোরেট দুনিয়ায় টাকার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু প্রকাশ্যে এমন ইনসাল্ট…সেটা ভুলে যাওয়া তার পক্ষে এত সহজ নয়।
দীর্ঘদিন ধরে সুযোগের অপেক্ষায় ছিল সে। কোনো না কোনোদিন আদিত্য চৌধুরীকে সেই অপমানের মূল্য দিতেই হবে এই ক্ষোভ টা সে কখনো মন থেকে মুছে দেয়নি।
চিন্তার জাল ছিঁড়ে আবার বর্তমানের দিকে ফিরে এলো রায়হান।
তার লোলুপ দৃষ্টি আবারও স্থির হলো মৌমিতার ওপর।
আজ যেন মেয়েটাকে আরও বেশি সুন্দর লাগছে। একেবারে চোখ ধাঁধানো।
গাঢ় ওয়াইন রঙের শাড়ি, খোলা চুল, পরিমিত সাজ আর মার্জিত ব্যক্তিত্ব সব মিলিয়ে চারপাশের আলো-ঝলমলেও তাকে আলাদা করে চোখে পড়ছে।
রায়হান কয়েক সেকেন্ড নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।
তার চোখের দৃষ্টি শিকারী হায়েনার মতো মৌমিতার সর্বাঙ্গে ঘুরতে লাগলো।
ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো কুৎসিত লালসা পূর্ণ এক হাসি। মনে মনে বিড়বিড় করে বললো,
—সেদিন তোমাকে ছুঁতেও দিল না, আদিত্য চৌধুরী… কিন্তু খেলা এখনও শেষ হয়নি। সময় সবার জন্য একরকম থাকে না। জাস্ট ওয়েট এন্ড সি বেইবি।
গ্লাসে থাকা জুসে ধীরে ধীরে চুমুক দিল সে। তার চোখের তখনও একই কামুক দৃষ্টি। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মৌমিতার ওপর নিবদ্ধ।
এই কর্পোরেট আলোচনা আর বহু পুরুষের সমাগমে ভীষণ অস্থিরতা কাজ করছিলো মৌমিতার। এদিকে আদিত্য কে জানিয়ে এখান থেকে সরবে তারও উপায় নেই। এতো এতো কুশল বিনিময়ের মাঝে আদিত্য কে একা পাওয়াও দূরহ ব্যাপার।
অগত্যা মৌমিতা আদিত্য কে বলে যাওয়ার কথা ছেড়েই দিলো। ধীর গতিতে সেখান থেকে সরে এসে কর্ণারে একটা ফাঁকা টেবিল দেখে বসে পড়লো সে। কিছুটা স্বস্তি বোধ করছে এখন। দুর থেকে আদিত্য কে দেখা যাচ্ছে এখান থেকে। তাই নিশ্চিন্তে বসে রইলো সে।
এদিকে মৌমিতা কে একা বসে থাকাটা রায়হানের জন্য যেন মোক্ষম সুযোগ হয়ে এলো। পাশ দিয়ে একজন ওয়েটার কে হেঁটে যেতে দেখে তাকে থামিয়ে দিলো রায়হান। ওয়েটারের হাতে একটা ভীন্ন গ্লাস ধরিয়ে দিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো কিছু। ওয়েটার তার কথায় অসম্মতি প্রকাশ করলো হয়তো! ফলে একটা মোটা টাকার বান্ডিল বের করে ওয়েটারের হাতে বিদ্যামান জুসের ট্রের ওপরে রাখলো নিঃশব্দে। ঠোঁটে তার ক্রুড় হাসি। এবার রাজি হলো ওয়েটার। টাকার কাছে তার সততা হেরে গেলো।
রায়হানের নির্দেশনা অনুযায়ী ওয়েটার ছেলেটা এগিয়ে এলো মৌমিতার দিকে।
অত্যান্ত বিনয়ের সাথে মাথা নিচু করে সম্মান প্রদর্শন করে হাতের জুসের গ্লাসটা এগিয়ে দিলো,,
__Please accept this juice, ma’am. It is fresh fruit juice.
মৌমিতা সৌজন্য হেসে জুসের গ্লাসটা হাতে নিলো। ওয়েটার স্বাভাবিক ভাবে সেখান থেকে সরে এলো। মৌমিতার দৃষ্টি আদিত্যর ওপরে। আশেপাশে তাকিয়ে বহু তরুণীকে তার দিকে তাকিয়ে গোগ্রাসে গিলতে দেখে মেজাজ খারাপ হতে লাগলো তার। সেই বা কি করবে! তার স্বামী যে একটু বেশিই সুদর্শন পুরুষ! এসব দেখে মুখ কুঁচকে নির্লিপ্ত ভাবে জুসের গ্লাসে চুমুক দিতে লাগলো মৌমিতা।
মৌমিতা কে জুসটা গলার্ধকরন করতে দেখে বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো রায়হানের ঠোঁটে।
এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। কিছুক্ষণ পরেই সে তার উদ্দেশ্য চরিতার্থ করে ফেলবে। পার্টির ব্যস্ততায় কিচ্ছু টের পাবে না কেউই। সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে আবদ্ধ করে রাখলো সে মৌমিতা কে।
____________
এদিকে কয়েক মিনিট ধরে একের পর এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে সৌজন্য বিনিময়, নতুন পার্টনারদের সঙ্গে পরিচয় আর আনুষ্ঠানিক আলোচনায় ব্যস্ত ছিল আদিত্য।
হঠাৎ করেই যেন ভেতর থেকে একটা অস্বস্তি তাকে ছুঁয়ে গেল তার।
স্বভাবগতভাবেই চোখ চলে গেল ঠিক সেই জায়গাটায়, যেখানে কিছুক্ষণ আগেও মৌমিতা দাঁড়িয়ে ছিলো।
কি জায়গাটা ফাঁকা দেখে ভ্রু কুঁচকে উঠলো আদিত্যর।
আরও একবার ভালো করে আসেপাশে তাকালো।
না… সত্যিই নেই।
তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো। আবারো চারপাশে দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিলো। কোথাও দেখা যাচ্ছে না।
“Excuse me…”
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অতিথিদের উদ্দেশে সংক্ষিপ্তভাবে বলে এক মুহূর্তও দেরি করলো না সে। দ্রুত পায়ে সেখান থেকে বেরিয়ে এলো।
টেবিল সেকশন,বুফে সেকশন,লাউঞ্জ সবখানে দেখলো। মৌমিতা কোথাও নেই।
যত সময় যাচ্ছে, ততই আদিত্যর বুকের ভেতরের অস্থিরতা বেড়ে চলেছে।
ঠিক তখনই মিস্টার মেহরাব এগিয়ে এলেন।
— “মিস্টার আদিত্য? আপনি কাউকে খুঁজছেন?
আদিত্য চারদিকে তাকিয়েই গম্ভীর অথচ উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললো,,,
—মৌমিতাকে কোথাও দেখতে পাচ্ছি না।
মেহরাব বিস্মিত হয়ে বললেন,,,
— সে কী? একটু আগেও তো এখানেই ছিলেন!
উত্তরে আর কিছু বললো না আদিত্য। কিন্তু তার মুখের রং মুহূর্তেই বদলে গেছে। চোয়াল শক্ত,চোখ দুটো লালচে হয়ে উঠছে। মৌমিতা চোখের আড়াল হতেই আদিত্যর যেন সমস্ত সংযম ভেঙে গেলো।
মিঃ মেহরাব বাকি স্টাফদের উদ্দেশ্যে বললো,,
— সবাই আলাদা হয়ে খুঁজুন! পুরো ফ্লোরটা চেক করুন… এখনই!
এরই মধ্যে হুঙ্কার দিয়ে উঠলো আদিত্য।
_I want to see Moumita right now.!
তার বজ্রকঠিন নির্দেশে আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন পরিচিত শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা পর্যন্ত চমকে উঠলেন।
মেহরাবও আর এক মুহূর্ত দেরি করলেন না।
কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী ও পরিচিত অতিথিকে নিয়ে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়লেন।
পুরো বলরুমে চাপা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লো।
কী হয়েছে,মিস্টার আদিত্য এতটা উত্তেজিত কেন?
শুধুমাত্র তার একজন পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্টের জন্য!
আদিত্য প্রায় পাগলের মতো উদ্ভ্রান্ত হয়ে খুঁজছে মৌমিতা কে। তার এতো অস্থিরতা, পাগলামি দেখে কারও চোখে বিস্ময় তো কারও চোখে কৌতূহল…
কিন্তু আদিত্যর সামনে দাঁড়িয়ে এসব প্রশ্ন করার সাহস কারও হলো না।
এই মুহূর্তে তার চোখের আগুনই বলে দিচ্ছিলো, ভুল সময়ে একটি শব্দও বিপদ ডেকে আনতে পারে।
দ্রুত পায়ে একের পর এক করিডোর পার হতে হতে হঠাৎই আদিত্যর দৃষ্টি গিয়ে থামলো বলরুমের পাশের আধো-অন্ধকার করিডোরে।
দূর থেকে অস্পষ্টভাবে দেখা গেল একজন পুরুষ জোর করে একজন নারীকে ধরে টেনে একটি কক্ষের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
মেয়েটি ঠিকমতো দাঁড়াতেই পারছে না। মাথা বারবার কাত হয়ে যাচ্ছে। শরীর ঢলে পড়ছে।
পরের মুহূর্তেই আদিত্যর বুক কেঁপে উঠলো।
ওই ওয়াইন রঙের শাড়ি,খোলা চুল, মৌমিতা!
— মৌমি…!”
বজ্রগতিতে ছুটে গেল সে।
পেছন পেছন ছুটলেন মেহরাবসহ আরও কয়েকজন।
কাছে পৌঁছাতেই দৃশ্যটা স্পষ্ট হয়ে উঠলো।
মৌমিতা সম্পূর্ণ নেশাগ্রস্ত মানুষের মতো ঢুলছে।
চোখ আধবোজা,নিজের শরীরের ভারও ধরে রাখতে পারছে না। বিড়বিড় করে কিছু বলার চেষ্টা করছে মেয়েটা।
আর তার বাহু শক্ত করে আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে
রায়হান কাবির। আদিত্য চিনলো তাকে,জারিনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের কর্ণধার।
সেই দৃশ্যটা দেখার সঙ্গে সঙ্গেই যেন আদিত্যর মাথার ভেতর সমস্ত রক্ত টগবগ করে ফুটে উঠলো।
এক সেকেন্ডও ভাবলো না সে।
ধাম!
প্রচণ্ড শক্তিতে বুক বরাবর একটা লাথি বসিয়ে দিল রায়হানের। আচমকা আঘাতে রায়হান কয়েক হাত দূরে ছিটকে পড়লো মেঝেতে।
তার হাত থেকে মৌমিতার শরীর ছিটকে যেতেই ভারসাম্য হারিয়ে সামনে পড়ে যেতে লাগলো সে।
— মৌমি!
এক ঝটকায় তাকে নিজের বুকের মধ্যে আগলে নিল আদিত্য। দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।
মৌমিতার মাথাটা নিস্তেজ হয়ে তার কাঁধে হেলে পড়েছে। চোখ দুটো তখনও আধখোলা।
অস্বাভাবিক ভারী শ্বাস।
অস্পষ্ট কণ্ঠে কী যেন বিড়বিড় করছে। আদিত্য কান পেতে শুনে বোঝার চেষ্টা করলো তার কথা!
__দেখুন না আদিত্য! এই লোকটা আমাকে টানছে! আমার হাতে ব্যাথা পাচ্ছি। আপনি কোথায় আদিত্য! এই লোকটা ভালো না! মাথা ঘুরছে কেনো! আদি…
আর কিছু বলতে পারলো না মৌমিতা। এক মুহূর্তেই আদিত্য বুঝে গেলো কেউ ওকে নেশাজাতীয় কিছু খাইয়েছে।
তার চোখ দুটো রক্তিম হয়ে উঠলো।
রায়হানের দিকে এমনভাবে তাকালো, যেন এই মুহূর্তেই তাকে ছিঁড়ে ফেলবে। রায়হান এখনো বুক চেপে ধরে পড়ে আছে। তা দেখে ভয়ে ভয়ে ঢোঁক গিলতে লাগলো মিঃ মেহরাব।
গর্জে উঠলো আদিত্য।
—এখানেই সব শেষ নয়, মিস্টার রায়হান! আজ যা করার চেষ্টা করেছিস, তার হিসাব তোকে দিতেই হবে।
মেহরাবের দিকে তাকিয়ে নির্দেশ দিলো,,
__এই বাস্টার্ড কে আঁটকে রাখা আপনার দায়িত্বে রেখে যাচ্ছি। মাইন্ড ইট! মিঃ মেহরাব।
মেহরাব দ্রুত মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো।
আদিত্যর কণ্ঠের প্রতিটি শব্দে এমন তীব্র ক্রোধ ছিল যে উপস্থিত সবাই নিঃশ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে রইলো।
কেউ একটি শব্দও উচ্চারণ করলো না।
আদিত্য এবার নিজের সমস্ত মনোযোগ ফিরিয়ে আনলো মৌমিতার দিকে।
এই মুহূর্তও দেরি নয়…সবার আগে দরকার মৌমিতাকে নিরাপদে নিয়ে যাওয়া। আর কোনো কথা না বলে আদিত্য দু’হাতে মৌমিতাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল।
মৌমিতার নিস্তেজ শরীরটা শক্ত করে নিজের বুকের সঙ্গে চেপে ধরে দ্রুত পায়ে বলরুমের দিকে এগিয়ে গেল।
পুরো হলরুম নিস্তব্ধ।
চলবে……

