Home "ধারাবাহিক গল্প ফিরেছি তোর আঙ্গিনায় ফিরেছি তোর আঙ্গিনায় পর্ব-৩+৪

ফিরেছি তোর আঙ্গিনায় পর্ব-৩+৪

0
965

#ফিরেছি_তোর_আঙ্গিনায়
#মৌমো_তিতলী
পর্ব,,,,৩

পড়ন্ত বিকেলের হলদেটে আলোয় ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়েতে ধীরে ধীরে ল্যান্ড করলো কানাডা থেকে আসা বিমানটি।
আকাশে তখন হালকা কমলা আর ছাই রঙের মিশেল। দিনের আলো ফুরিয়ে আসছে, শহরের ব্যস্ততা আবার নতুন করে জেগে উঠছে।
ফ্লাইট থেকে যাত্রী নামার সঙ্গে সঙ্গেই বিমানবন্দরের ভেতরে তৈরি হলো পরিচিত কোলাহল। ট্রলি ঠেলার শব্দ,ঘোষকের ঘোষণা, প্যাসেঞ্জারদের আপনজনের উৎসুক হয়ে অপেক্ষা সবকিছু মিলিয়ে ঢাকা এয়ারপোর্টের চিরচায়িত দৃশ্য।

সেই ভিড়ের মাঝেই ধীর পায়ে বেরিয়ে এলো শেহজাদ আদিত্য চৌধুরী। সাদা শার্টের ওপর ডেনিম জ্যাকেট,চোখে কালো রোদচশমা,কাঁধে ল্যাপটপ ব্যাগ,মুখে একরাশ ট্রিম করা দাড়িতে মাত্রাতিরিক্ত সুদর্শন পুরুষটার চোখে মুখে একটা দৃঢ়তার ছাপ।

পাঁচ বছর পর সে ফিরেছে। এই মাটিতে, এই শহরে।
এয়ারপোর্টের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন সাদমান চৌধুরী। চুলে পাক ধরেছে আগের চেয়ে, চোখের ভাজে গভীরতা বেড়েছে। ছেলেকে দেখেই বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো তার। কতদিন পর নিজ সন্তানকে চোখের সামনে দেখছেন তিনি। পাঁচ বছর… কম সময় তো নয়।

আদিত্য বাইরে বেরোতেই বাবার সাথে চোখাচোখি হলো। সে মুহূর্তে কেউ কিছু বললো না। তারপর সাদমান চৌধুরী এক পা এগিয়ে এসে ছেলেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।

— কেমন আছিস বাবা?
কণ্ঠটা কেমন কেঁপে উঠলো তার।

আদিত্যও বাবার পিঠে হাত রেখে নরম গলায় বললো,,,

— ভালো আছি বাবা।

এই “ভালো আছি” বলার ভেতর কত না বলা কথা, কত দূরত্ব, কত শূন্যতা কেউ হিসেব করলো না।

এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠলো দু’জন। গাড়ি চলতে শুরু করতেই জানালার কাঁচের ওপারে বদলে যাওয়া ঢাকা শহর চোখে পড়লো আদিত্যর। উঁচু উঁচু ফ্লাইওভার, নতুন নতুন বিলবোর্ড, আলোর ঝলকানি, ট্রাফিকের স্রোত সবকিছুই যেন তার বড্ড চেনা অথচ অচেনা।

—ঢাকা শহর আগের চেয়ে অনেক বদলে গেছে। হালকা স্বরে বললো আদিত্য।

সাদমান চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— শহর তো বদলায় বাবা…সাথে সাথে মানুষও বদলে যায়।

আদিত্য কিছু বললো না। চুপচাপ বিবশ নয়নে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলো।
************

আশাকুঞ্জে পৌঁছাতেই দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা আশালতা বেগম ছেলের দিকে ছুটে এলেন। চোখে তার জমেছে জল,,,

—আদি… আমার আদি!

ছেলেকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন তিনি। আদিত্য মাকে শক্ত করে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করলো।

— মা… মা… ঠিক আছি আমি। এই যে আমি তো এসেছি।

সাদমান চৌধুরী পাশে দাঁড়িয়ে বললেন,,,

— ও অনেক দূর থেকে এসেছে আশা। আগে ফ্রেশ হতে দাও। তারপর খাওয়ার ব্যবস্থা করো।

আশালতা বেগম চোখ মুছে মাথা নাড়লেন।

— হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমার ছেলেটার মুখটা কেমন শুকিয়ে গেছে।
চম্পা! চম্পা! হাক ছাড়লেন আশালতা বেগম।

বাড়ির পুরনো কাজের মেয়ে চম্পা দৌড়ে এলো।

— জি আম্মা কন!

আশালতা বেগম আদিত্যর ল্যাগেজ গুলোর দিকে আঙুল তাক করে বললেন,,,

— আদিত্যর সাথে লাগেজ ওর ঘরে নিয়ে যা।

চম্পা আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে আদিত্যর দিকে তাকিয়ে বললো,,,

— আহেন ভাইজান আহেন!
শ্যাষ পর্যন্ত আপনি যে আইছেন! কি যে ভালো লাগতাছে! আম্মা আর চাচাজান বহত খুশি হইছে।

কথার ফুয়ারা ছড়াতে ছড়াতে আদিত্যর সাথে তাল মিলিয়ে লাগেজগুলো টেনে উপরে উঠে এলো চম্পা।
আদিত্যর রুমের সামনে গিয়ে বললো,,,

— আপনার ঘর একদম চকচকা আছে ভাইজান! এদ্দিন ভাবিসাব যে থাকতো আপনার ঘরটায়। একদম ধুলা পড়তে দেয় নাই! খুব লক্ষী আছিল ভাবিসাব!

চম্পার কথায় ভ্রু কুঁচকে তাকালো আদিত্য। ভাবিসাব বলতে চম্পা কাকে বুঝিয়েছে বোধগম্য হতেই আদিত্যর মুখটা মুহূর্তেই শক্ত হয়ে এলো। চম্পার কাছে সে কি জানতে চেয়েছে কিছু? কিন্তু কি বললো চম্পা! তার ঘরে… ওই মেয়েটা থাকতো?

— তোকে এতো কথা কে বলতে বলেছে চম্পা?
কঠিন গলায় বললো আদিত্য।

আদিত্যর বলার ভঙ্গিতে চম্পা থমকে গেল। থতমত খেয়ে আদিত্যর দিকে তাকালে শুনতে পেলো,,,

— এই ঘরে আমার ব্যাগপত্র নিয়ে যাবি না। আমি এই ঘরে থাকবো না। পাশের ঘরটায় ব্যাগগুলো রাখ। এখন থেকে ওখানেই থাকবো আমি।

নিজ কামরা পেরিয়ে পাশের কামরায় ঢুকলো আদিত্য। সাথে সাথে তাকে অনুসরণ করলো চম্পা।

আদিত্য রুমের এক কোনে লাগেজ রেখে চম্পাকে বললো,,,

— আমি শাওয়ার নিয়ে বের হওয়ার আগে এই ঘরটা ঝাড়ু দিয়ে সব পরিষ্কার করবি।
এইটুকু বলেই ওয়াশরুমে ঢুকে গেল আদিত্য।

চম্পা অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো কিছুক্ষণ, তারপর নিঃশব্দে কাজে লেগে পড়লো।

প্রায় ঘন্টাখানেক পর ফ্রেশ হয়ে, একটু বিশ্রাম নিয়ে নিচে নামলো আদিত্য। ডাইনিং টেবিলে ইতিমধ্যেই সাজানো হরেক রকম খাবার। সবই তার পছন্দের।
আশালতা বেগম নিজ হাতে ছেলেকে খাওয়াতে নিজ হাতে সবকিছু রান্না করেছেন। পাতিল থেকে বড় গলদা চিংড়ির পিস তুলে দিলেন ছেলের পাতে।

— এইটা খা আদি, এইটা তো তোর খুব পছন্দ।

আদিত্য মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে খাওয়া শুরু করলো।

সাদমান চৌধুরী খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলেন,
— এরপর কী ভাবছিস? কিভাবে এগোবি?

বাবার প্রশ্নে আদিত্য শান্ত গলায় বললো,,,

— কানাডায় থাকতেই ঢাকায় কোম্পানির একটা ব্রাঞ্চ ওপেন করেছি। দুই এক দিনের মধ্যেই এমডি হিসেবে জয়েন করবো।

একটু থেমে সাদমান চৌধুরী আবার বললেন,,,

— মেয়েটার ব্যাপারে কিছু ভাবলি?

আদিত্যর মুখ শক্ত হয়ে গেল। মুখের খাবারটা গিলে নিয়ে বললো,,,

— কি ভাবার আছে বাবা? অফিসের কাজটা সেটেল্ড করেই ডিভোর্সের জন্য এপ্লাই করবো। যে সম্পর্কটা আমি কখনো মন থেকে মেনে নিতে পারিনি, সেটাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার মানে নেই।

আশালতা বেগম চুপচাপ তাকিয়ে থেকে ধীর স্বরে বললেন,,,

— একবার মেয়েটার সাথে কথা বলতে পারতিস আদি… মেয়েটা খুব ভালো। তুই তো তাকে দেখলি না পর্যন্ত। দেখা হলে,কথা বললে হয়তো তোর সিদ্ধান্ত বদলে যেতো।

মায়ের কথায় আদিত্য হঠাৎ গর্জে উঠলো,,,

— মা! আমি কিন্তু শর্ত দিয়ে সবটা ক্লিয়ার করে তবেই এসেছি। প্লিজ আবার ইমোশনাল ব্লাকমেইল কোরো না। আমি যা বলেছি সেটাই আমার শেষ সিদ্ধান্ত।

বলেই চেয়ার ঠেলে উঠে ওপরে চলে গেলো।

ডাইনিং টেবিলে রয়ে গেল অপ্রতিভ দু’জন মানুষ। মলিন মুখে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলেন সাদমান চৌধুরী আর আশালতা বেগম।
তাদের কেউই বুঝতে পারছেন না এই বিয়েটার বিরুদ্ধে আদিত্যর এত অনমনীয় রাগের আসল কারণটা কী।

*****************

সকালের আলো পুরোপুরি ফোটেনি তখনও। হোস্টেলের ছোট্ট ঘরটায় বসে আয়নার সামনে শেষবারের মতো নিজের চুলের বেণীটা ঠিক করে নিলো মৌমিতা। আজ তার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা দিন।
আর কে বিউটি এন্ড ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি।
ঢাকার নামী-দামী সব ব্র্যান্ডের বিউটি প্রোডাক্ট আর ফ্যাশন ডিজাইনের কাজ হয় এখানে। দেশের বাইরেও তাদের সাপ্লাই যায়। আর আজ সেই কোম্পানির নতুন এমডির পিএ পজিশনের জন্য ইন্টারভিউ দিতে যাবে মৌমিতা।

গত কয়েক মাস ধরে এই দিনের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে সে।
রাত জেগে পড়াশোনা, কোম্পানির প্রোফাইল রিসার্চ, কর্পোরেট কমিউনিকেশন, ইমেইল ড্রাফটিং, অফিস ম্যানেজমেন্ট সবকিছু ঝালিয়ে নিয়েছে।

মৌমিতা আয়নায় নিজেকে একবার দেখে মনে মনে বললো,,

–“আল্লাহ… যদি এই চাকরিটা হয়ে যায়… আর কোনো চিন্তা থাকবে না আমাদের।”

একটা গভীর শ্বাস নিয়ে ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল সে। বেরিয়ে এলো হোস্টেল থেকে। একটা খালি রিকশা ডেকে চড়ে বসলো তাতে। এড্রেস বলে ঠিকঠাক হয়ে বসলো।

প্রায় পঁচিশ মিনিট পর “আর কে বিউটি এন্ড ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি”য়ের বিশাল কাঁচঘেরা বহুতল ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো মৌমিতা। চকচকে সাইনবোর্ডে বড় অক্ষরে লেখা,,

R.K. Beauty & Fashion Industry

ভেতরে ঢোকার আগে আল্লাহর নাম নিয়ে পা বাড়ালো সে।
আজ তার সাজ একদম ভদ্র, মার্জিত আর সাদামাটা।
হালকা গোলাপি আর সাদা মিশেল রঙের চুড়িদার।
এক হাতে কালো ফিতার কমদামি ঘড়ি।
অন্য হাতে দু’গাছি সাদা ক্রিস্টালের চুড়ি।
চুল বরাবরের মতো একপাশে বেণী করে অবহেলায় ফেলে রাখা।
চোখে গোল ফ্রেমের সাদা চশমা।
চশমার আড়ালে তার বড় বড় পাপড়ি যুক্ত ডাগর চোখদুটো ভীষণ আকর্ষণীয় লাগে। ধবধবে ফর্সা গায়ের রং আর স্বাভাবিক রক্তিম অধর জোড়া তাকে আলাদা একটা সৌন্দর্য দিয়েছে সৃষ্টিকর্তা। যেটা তার বাড়তি সাজের জন্য নয়, বরং তার স্বাভাবিক সৌন্দর্যের আভিজাত্যে।

রিসেপশন থেকে নির্দিষ্ট কক্ষের নির্দেশনা পেয়ে সেখানে ঢুকতেই সে থমকে গেল মৌমিতা।
ভেতরে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন মেয়ে বসে আছে।
কারও পরনে ওয়েস্টার্ন ফরমাল স্যুট, কারও স্মার্ট ব্লেজার, কারও হালকা গ্ল্যাম মেকআপ। স্টাইল, আত্মপ্রদর্শন আর আধুনিকতার ছাপ স্পষ্ট।
এতো সুন্দর সুন্দর স্মার্ট মেয়েগুলো কে দেখে নিজের দিকে একবার তাকালো মৌমিতা।
মনে হলো সে যেন এই পরিবেশের জন্য সে একেবারেই আলাদা।
এক মুহূর্তের জন্য বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো মৌমিতার। মনে মনে ভাবলো,,

“আমি কি খুব সিম্পল হয়ে গেলাম?”

কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে শক্ত করলো সে।
সাজ দিয়ে কী আসে যায়? সে কাজ করতে এসেছে। নিজের কাজ দিয়ে যোগ্যতা দিয়ে প্রমাণ করবে সে। লোক দেখানো স্মার্টনেস তার দরকার নেই।

নিজের ভেতরে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতেই খালি একটা চেয়ার দেখে বসে পড়লো।

পাশের দু’জন মেয়ে তাকে লক্ষ্য করে মুখ চাওয়া চাওয়ি করলো। একজন ফিসফিস করে বললো,,,

— এত সিম্পল হয়ে এসেছে? সাজ দেখে তো মনে হচ্ছে স্কুল টিচারের জন্য ইন্টারভিউতে এসেছে!
বলেই হাসতে লাগলো দুজন।

চুপচাপ সবটা শুনেও কিছু বললো না মৌমিতা। চোখ বন্ধ করে মনে মনে দোয়া পড়তে লাগলো।

*ইন্টারভিউ রুম*

ইন্টারভিউ শুরু হয়েছে প্রায় দু ঘন্টা আগে। নির্দিষ্ট সময়ে তার নাম ডাকা হলো।
মিস মৌমিতা রহমান?

একটা গভীর শ্বাস নিয়ে উঠে দাঁড়ালো মৌমিতা। দরজায় নক করে ভেতরে ঢুকলো।
ভেতরে লম্বা টেবিলের ওপারে তিনজন বসে আছে।
একজন মধ্যবয়সী ভদ্রলোক,গম্ভীর চেহারা, সম্ভবত এইচআর হেড।
একজন কম বয়সী সুদর্শন যুবক পরিপাটি স্যুট, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।
আরেকজন স্টাইলিশ স্মার্ট তরুণী । সম্ভবত কর্পোরেট কো-অর্ডিনেটর।

— Please, have a seat.
মধ্যবয়সী লোকটি বললেন।

মৌমিতা চেয়ারে বসার আগে হালকা শ্বাস নিয়ে বললো,
— Thank you, sir.

ইন্টারভিউ শুরু হলো সাধারণ ফরমালিটিজ দিয়ে।
— Introduce yourself.
Why do you want to join R.K. Beauty & Fashion Industry?
What do you know about our company?

মৌমিতা স্পষ্ট, সংযত কণ্ঠে সবটার উত্তর দিল।
কোম্পানির আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড কোলাবোরেশন, তাদের নতুন প্রোডাক্ট লাইন, ফ্যাশন সেক্টরে তাদের রিসার্স সবকিছু নিয়ে প্রস্তুত ছিল সে।
কম বয়সী সুদর্শন যুবকটি এবার সামনে ঝুঁকে বললো,,,

— As an MD’s PA, you’ll need to manage schedules, confidential documents, client communications. How confident are yo?

মৌমিতা বললো,,,

— Sir, I believe confidentiality and time management are the backbone of this position.
আমি গত কয়েক মাস ধরে কর্পোরেট কমিউনিকেশন আর অফিস ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পড়াশোনা করেছি। চাপের মধ্যেও আমি কাজ করতে পারবো। দায়িত্ব পেলে সেটা শেষ না করে উঠবো না।

স্টাইলিশ তরুণী এবার প্রশ্ন করলো,,,

— Beauty and fashion industry সম্পর্কে আপনার ধারণা কী?

মৌমিতা মৃদু হাসলো।বললো,,,

— এই ইন্ডাস্ট্রি শুধু গ্ল্যামার নয় ম্যাম। এটা ব্র্যান্ড ইমেজ, কাস্টমার সাইকোলজি আর প্রেজেন্টেশনের শিল্প। আমি এটুকু বুঝি প্রোডাক্ট যত ভালোই হোক, সঠিক প্রেজেন্টেশন না হলে মার্কেটে টিকে থাকা কঠিন।

মধ্যবয়সী লোকটি আবার বললেন,,,

— If we hire you, what value will you add to this company?

একটু থেমে দৃঢ় কণ্ঠে বললো মৌমিতা,,,

— আমি শুধু একজন পিএ হিসেবে কাজ করবো না, স্যার। আমি চেষ্টা করবো এমডির কাজের চাপ কমাতে, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য গুছিয়ে দিতে। একজন ভালো পিএ কোম্পানির অদৃশ্য শক্তি হিসেবে কাজ করে। আমি সেই শক্তিটাই হতে চাই।

তিনজন একে অপরের দিকে তাকালো।
কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে নিচু স্বরে আলোচনা করলো তারা।
মৌমিতার বুকের ভেতর তখন ঢাকের মতো বাজছে।

শেষে মধ্যবয়সী লোকটি বললেন,,,

— Thank you, Miss Moumita.
You may leave now. We are keeping you on waiting. We’ll inform you about the final decision.

একটা বিনয়ী হাসি দিয়ে উঠে দাঁড়ালো মৌমিতা।
— Thank you, sir.

রুম থেকে বেরিয়ে আসতেই বুকের ভেতরের জমে থাকা শ্বাসটা ছেড়ে দিলো সে।
সে জানে না চাকরিটা হবে কিনা। কিন্তু একটা জিনিস সে জানে, আজ সে নিজের সর্বোচ্চটা দিয়েছে।

#চলবে

#ফিরেছি_তোর_আঙ্গিনায়
#মৌমো_তিতলী
পর্ব,,,,,৪

রাত নেমেছে আশাকুঞ্জে।
দিনের কোলাহল শেষে বাড়িটা যেন গভীর নীরবতায় ডুবে আছে। বারান্দার বাইরে ঝিমিয়ে পড়া আলো, দূরের রাস্তার মৃদু গাড়ির শব্দ আর মাঝে মাঝে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। সব মিলিয়ে একটা শান্ত, নির্জন ভারী রাত।
নিজের ঘরে বিছানার ওপর বসে আছে আদিত্য। ল্যাপটপটা কোলে রেখে একের পর এক ফাইল ওপেন করছে সে। মেইল, মিটিং শিডিউল, আগামী দিনের জয়েনিং সবকিছু নিখুঁতভাবে গুছিয়ে নিচ্ছে।
কাল থেকেই সে অফিসে এমডি হিসেবে জয়েন করবে। পাঁচ বছরের প্রবাসী জীবন শেষে নতুন করে নিজের জায়গা তৈরি করার প্রস্তুতি।
স্ক্রিনের আলোয় তার মুখটা কঠিন দেখাচ্ছে। কাজের মাঝেই একবার থেমে জানালার বাইরে তাকালো আদিত্য।
নক্ষত্রভরা আকাশ, চেনা বাড়ি সবকিছুই ঠিক আছে, তবুও ভেতরের কোথাও একটা অদ্ভুত শূন্যতা রয়ে গেছে যেনো। বাড়িতে আসার পর থেকেই মাঝেমধ্যে এমন অদ্ভুত এক শূন্যতা ঘিরে রেখেছে তাকে! আদিত্য নিজের ব্রেইনকে বেশি ঘাটালো না।
মাথা ঝাঁকিয়ে আবার কাজে ডুব দিলো। এই অদ্ভুত অনুভূতির সঙ্গে এখন হিসেব মেলানোর সময় নেই তার।

একই সময়ে, শহরের আরেক প্রান্তে হোস্টেলের ছোট্ট ঘরটায় জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে মৌমিতা।
খোলা জানালা দিয়ে ঠান্ডা রাতের হাওয়া এসে চুলের উড়িয়ে নিচ্ছে তার। আকাশে অসংখ্য তারা নীরব,স্থির হয়ে মিটিমিটি জ্বলছে।
মৌমিতা চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে আনমনে ভাবলো,,জীবনের এই টানাপোড়েন তাকে শেষ পর্যন্ত কোথায় নিয়ে যাবে? তার চাকরিটা হবে তো? নাকি আবার নতুন করে লড়াই শুরু করতে হবে?
ভাবনার মাঝেই হঠাৎ করে মনে পড়ে যায় এক পাষান পুরুষের কথা।
সে কি এতদিনে দেশে ফিরেছে? নিশ্চয় ফিরেছে! ফিরবেই তো… মৌমিতা যে নিজেই তাদের মুক্তি দিয়ে এসেছে। এটাই তো শর্ত ছি সেই নির্দয় মানুষটার।
মনে প্রশ্ন জাগে তার,
আচ্ছা! কি এমন হতো যদি মানুষটা তাকে স্ত্রী হিসেবে মেনে নিতো?
তার তো একটা সংসার হতে পারতো। আপন মানুষ হতে পারতো।
এতিম মেয়েটার শ্বশুর-শাশুড়ি নামের বাবা-মা হতে পারতো।
একজন মনের মানুষ থাকতো…
মনের মানুষ হাহঃ!
সেই মানুষটা তো তাকে গ্রহণ পর্যন্ত করেনি।
তবুও সে কেন মৌমিতার মন থেকে সরে যায় না? কেন এখনো বুকের গভীরে হৃদয়জুড়ে শুধু তারই দখল?
এই পাঁচটা বছর সে তো তার ছবিটা বুকে জড়িয়ে ঘুমিয়েছে। আশায় থেকেছে, একদিন সে ফিরে আসবে। মৌমিতার হাত ধরে বলবে,,,
“দেখো, আমি ফিরে এসেছি তোমার আঙ্গিনায়।”

সে ফিরেছে ঠিকই। কিন্তু তাকে গ্রহণ করতে নয় বরং তাকে ডিভোর্স দিতে।
ভাবনার ভারে দুচোখ ভিজে আসে মৌমিতার। দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে ফর্সা গাল বেয়ে।

হঠাৎ কাঁধে কারো স্পর্শ পেয়ে চমকে উঠে পেছনে তাকায় মৌমিতা। নোরা দাঁড়িয়ে ঠিক তার পেছনে। মৌমিতার চোখে পানি দেখে বিচলিত হয় নোরা।

— এই মৌ, কী হয়েছে তোর? কাঁদছিস কেন?

মৌমিতা তাড়াতাড়ি আঙুল দিয়ে চোখের পানি মুছে নেয়। ঠোঁটে মিথ্যে হাসি টেনে বলে,,,

— কোথায় কাঁদছি পাগলি! চোখে মনে হয় কিছু পড়েছে।

নোরা ভ্রু কুঁচকে মৌমিতার হাত ছেড়ে দেয়,,

— আমাকে কি তোর বোকা মনে হয় মৌ? তুই বলবি আর আমি বিশ্বাস করবো?
তুই যে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে এখানে চলে এসেছিস, এটা এমনি এমনি নয় আমি জানি। এই দুই বছরে কতবার তোকে বলেছি, আমার সাথে হোস্টেলে এসে থাকতে।তোর শ্বশুর-শাশুড়ি তো কখনো আসতেই দেয়নি। আর এখন হঠাৎ করে তুই তলপি-তলপা গুটিয়ে চলে এলি! আমি কি কিছু বুঝি না ভেবেছিস?
নিশ্চয় তোর হাজব্যান্ড কিছু বলেছে! তোকে ওই বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে তাই না?

নোরার কথায় মৌমিতা আপত্তি করে,,,

–কী বলছিস তুই! উনি আমাকে বের করে দেয়নি। উনি তো আমাকে দেখেইনি কখনো… কথা বলা তো দূরের কথা!

নোরা আর কিছু না বলে মৌমিতার হাত ধরে টেনে নিয়ে বিছানায় বসায়।

— তাহলে বল, কী হয়েছে? আমি তোর বেস্ট ফ্রেন্ড। আমাকে বলবি না?

নিজেকে আর আটকে রাখতে পারে না মৌমিতা। সবটা খুলে বলে। শর্ত, অবহেলা, অপেক্ষা, আর আসন্ন ডিভোর্সের কথা এক এক করে সব কিছু খুলে বলে নোরা কে।
সব শুনে নোরা রীতিমতো রাগে ফেটে পড়ে।

:
–শোন মৌ! তোর ওই হাজব্যান্ডটা আস্ত গাধা! এমন বোকা চন্দ্র দুনিয়ায় আর আছে কিনা আমার জানা নেই! আমার ফুলের মতো বেস্ট ফ্রেন্ডকে রিজেক্ট করে!
যাক সে আর তার ইগো জাহান্নামে! এত সুন্দর বউ পেয়ে দাম দিলো না।
আমি অভিশাপ দিচ্ছি! এরপর ওই ব্যাডা আর বউ পাবে না। বউ কে কাছে পেতে বউয়ের পায়ে ধরে পড়ে থাকতে হবে! বউয়ের বিরহে মাথায় টাক পড়ে যাবে! দেখিস! যত্তসব!

নোরার রাগী মুখ আর উল্টোপাল্টা কথা শুনে মৌমিতা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। সব দুঃখ ভুলে খিলখিল করে হেসে ওঠে।
মৌমিতার হাসিমুখ দেখে নোরাও হেসে ফেলে।
হোস্টেলের ছোট্ট ঘরটায় তখন দু’জন বন্ধুর হাসির শব্দ ছড়িয়ে পড়ে।
বাইরে তারাভরা আকাশ নীরবে তাকিয়ে থাকে দুটো ভাঙ্গুর মনের একটু হালকা হওয়ার সাক্ষী হয়ে।

**************
পরেরদিন।
“আর কে বিউটি এন্ড ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি”
নতুন এমডির আগমন উপলক্ষে পুরো অফিসে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে‌।
কারো মনে ভালোলাগা তো কারো মনে সংশয়। নতুন এমডি কেমন মেজাজের হবে সেটাই তাদের একমাত্র চিন্তা!
অফিসের সব এমপ্লয়রা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে তাদের নতুন এমডির জন্য।
কিছুক্ষণ পরেই অফিসের সামনে একটা দামি রোলস রয়েস এসে থামলো। সবার দৃষ্টি সেদিকে গিয়ে থমকালো।

গাড়ির ডোর খুলে সেখান থেকে বেরিয়ে এলো অফিসের নিউ এমডি শেহজাদ আদিত্য চৌধুরী।
তার ড্যাশিং লুক! ও মাই গড! ব্ল্যাক কালারের প্যান্ট,ব্ল্যাক লোফার স্যু,এ্যাস কালারের শার্টের ওপর ব্লু টাই এন্ড ব্ল্যাক ব্লেজার। মাথার চুল গুলো সুবিন্যাস্ত পরিপাটি। কিছু বড় বড় চুল কপালের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে।
বীরদর্পে হেঁটে আসার ভঙ্গি ফিমেল এম্পয়দের হৃদয়ে ঝড় তুলে দিলো মুহুর্তেই। কেউ কেউ তো হাআআআ করে তাকিয়ে গিলে খাওয়ার উপক্রম করছে। আদিত্য তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতেই একটা ম্যানলি স্মেল আর পারফিউমের সুবাসে তাদের চেতনা যায় যায় অবস্থা!

আদিত্য সেসব তোয়াক্কা না করেই বর্তমান এমডির পিএ আবির হাসানের দেখানো কেবিনে ঢুকে গেলো। পেছনে গেলো আবির হাসান। আদিত্য নিজের চেয়ারে গিয়ে বসতেই আবির একটা ফাইল এগিয়ে দিয়ে বললো,,,,

— স্যার এই ফাইলে আপনার পিএ পজিশনে জবের জন্য যারা এপ্লাই করেছিলো তাদের একটা সর্ট লিস্ট আছে। এরা প্রত্যেকে এই পজিশনের জন্য ক্যাপেবল। আপনি এর মধ্যে যাকে সিলেক্ট করবেন আমরা তাকেই আপনার পিএ হিসেবে হায়ার করবো। প্লিজ একটু দেখে নিবেন স্যার।

সবটা শুনে আদিত্য তাকে সবটা দেখে,সিলেক্ট করে একঘন্টা পরে জানাবে বলে বিদায় করে।

আবির সায় জানিয়ে সালাম দিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে যেতেই আদিত্য ফাইল টা টেনে নিয়ে চেইক করতে শুরু করলো!
সবারই কোয়ালিফিকেশন হাই লেভেলের। সবার রেজিউমের সাথে কর্নারে একটা করে পাসপোর্ট সাইজের ছবি লাগানো। সব মেয়ে গুলোই আধুনিক পোশাকে ফরমাল ড্রেসে ছবি তোলা।
আদিত্য এক এক করে দেখতে দেখতে হুট করে একটা ছবিতে গিয়ে চোখ আটকে গেলো!
সবগুলো মেয়েই ওয়েস্টার্ন ড্রেসে আধুনিক সাজে থাকলেও এই একটা মেয়ে ভিন্ন।
কামিজের সাথে মাথায় ওড়না টেনে দেয়া। ভদ্র, মার্জিত সিম্পল সাজে। চোখ দুটোতে নজর আটকে রইলো আদিত্যর! সাদা গোল ফ্রেমের চশমার আড়ালে জ্বলজ্বল কালো মণির চোখদুটো কি আকর্ষণীয়! ঠোঁটের দিকে নজর পড়তেই গলা শুকিয়ে এলো আদিত্যর! ঠোঁটজোড়ায় কৃত্রিম রঙের ছিটেফোঁটাও নেই! একদম ন্যাচারাল রঙটাও কি মারাত্মক লাগছে।

নিজের ঊনত্রিশ বছর বয়সে সে কখনো কোন মেয়েকে এভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছে কিনা সন্দেহ। নাহ! সে কখনো কোন নারী কে এভাবে দেখেনি। তবে আজ কেনো এই ছবির সাদামাটা মেয়েটাকে এভাবে দেখছে!

একবার এই মায়াবতী মেয়েটাকে বাস্তবে দেখার বড্ড তৃষ্ণা জন্মালো আদিত্যর হৃদয়ে। ইচ্ছে হলো চোখের পলকে ছবির মেয়েটাকে ছবি থেকে টেনে বার করে নিজের সামনে দাঁড় করিয়ে দিতে! তারপর অপলকে তাকে দেখতে দেখতেই জীবন পার হয়ে যাক আদিত্যর!

নিজের এই অদ্ভুত ভাবনায় নিজেই অবাক হয়ে গেলো আদিত্য! সিভি টা চোখের সামনে মেলে ধরে নামের জায়গায় দৃষ্টিপাত করলে দেখতে পেলো সেখানে ছোট্ট করে লেখা মৌমিতা চৌধুরী।
কয়েকবার বিড়বিড় করে নামটা উচ্চারণ করে আদিত্য!
মৌমিতা…মৌমিতা!
অতঃপর জ্বিভ দ্বারা ঠোঁট ভিজিয়ে টেলিফোনটা কানে তুলে নিলো! ওপাশ থেকে রেসপন্স পেতেই বললো,,

–আবির আমার কেবিনে এসো হারিআপ!

দশ সেকেন্ডের মধ্যেই কেবিনে প্রবেশ করলো আবির । আবির আসতেই আদিত্য মৌমিতার সিভি টা আবিরের হাতে দিয়ে বললো,,

–এই মেয়েটাকে হায়ার করো আমার পিএ জন্য।

এবং মোস্ট ইমপর্টেন্ট তাকে বিশেষ করে জানিয়ে দিবে, আগামী কাল থেকেই তার ডিউটি শুরু। কোন হেরফের যেন না হয় গট ইট?

আবির জানে আদিত্য কাজে ভীষণ সিরিয়াস। তাই এতো কিছু না ভেবে সিভি টা নিয়ে বেরিয়ে গেলো।
আবির যেতেই আদিত্যর ঠোঁটে একটা রহস্যময় বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো!

#চলবে