Home "ধারাবাহিক গল্প ফিরেছি তোর আঙ্গিনায় ফিরেছি তোর আঙ্গিনায় পর্ব-১+২

ফিরেছি তোর আঙ্গিনায় পর্ব-১+২

0
1474

#ফিরেছি_তোর_আঙ্গিনায়
#মৌমো_তিতলী
পর্ব,,,১

থমথমে মুখে নিজের কাপড়চোপড় একটা ল্যাগেজে ভাঁজ করে রাখছে মৌমিতা।
কারন নাম মাত্র শশুর বাড়িতে আজ তার শেষ দিন। পাঁচ বছর আগে কোন এক গোধূলি বেলায় বিয়ে করে বধুরুপে সে এই আশা কুঞ্জে পা রেখেছিলো। সেদিনও তার স্বামী নামক মানুষটা তার পাশে বর বেশে অনুপস্থিত ছিলো। আজ পাঁচ বছর পর সে একই ভাবে আশাকুঞ্জ থেকে বেরিয়ে যাবে। আজও সেই মানুষটা অনুপস্থিত।
মাঝখানে মানুষ টার সাথে তার বিয়ে বিয়ে খেলা হলো পাঁচ টা বছর,না সেই মানুষটা তাকে কখনো দেখলো,আর না কোনদিন তার সত্যিকার অর্থে তার সাথে সংসার হলো।
কারন যার সাথে তার বিয়ে হয়েছিলো ,শেহজাদ আদিত্য চৌধুরী,সে বিয়ের রেজিস্ট্রি পেপারে সাইন করেই সেখান থেকে বেরিয়ে গেছিলো। এবং সেই রাতের মধ্যেই দেশ ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছিলো সুদূর কানাডায়।
তারপর পাঁচ বছর সে না কখনো তার খোঁজ নিয়েছে,না বাড়ির কারো সাথে যোগাযোগ করেছে,না কখনো বাড়িতে ফিরেছে।
পাঁচ বছর পর বহু চেষ্টায় মৌমিতার শাশুড়ি আশালতা বেগম তার একমাত্র পূত্রের সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়। এবং ছেলেকে দেশে ফিরতে অনুরোধ করলে আদিত্য শর্ত রাখে, সে দেশে ফিরবে কিন্তু বিয়েটা সে মেনে নিতে পারবে না। মেয়েটা ওই বাড়ি থেকে একেবারের জন্য বেরিয়ে গেলে তবেই সে বাড়িতে ফিরবে। আর এসেই সে ডিভোর্সের ব্যবস্থা করবে।
আর এখানেই মাতৃ স্নেহের কাছে আশালতা বেগমের পূত্রবধুর প্রতি দায়িত্ব, ভালোবাসা,দায়বদ্ধতা হেরে যায়।

আশালতা বেগমের শশুর, মানে আদিত্যর দাদু বেঁচে থাকা কালীন একটা এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এবং তার মৃত্যুর পর তার সেই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নেন আদিত্যর বাবা সাদমান চৌধুরী।
মৌমিতা অনাথ। পাঁচ বছর আগে আশালতা বেগম তার শশুরের এতিমখানায় ডোনেশন দিতে গিয়ে সেখানেই মৌমিতা কে দেখে তার ভীষণ পছন্দ হয়।
পুতুলের মতো সুন্দর দেখতে মেয়েটার আর কিছুদিন পরেই ১৮ বছর পূর্ন হবে। এরপর তাকে নিয়ম অনুযায়ী এতিমখানা ছেড়ে দিতে হবে। মৌমিতা মাত্র কলেজে পড়াশোনা করছে। এমতাবস্থায় তার অন্য কোথাও থাকা,বা চাকরি করাও সম্ভব নয়। এতো সুন্দর ফুলের মতো মেয়েটার সেইফটির কথা চিন্তা করে তিনি নিজের একমাত্র ছেলে আদিত্যর সাথে মৌমিতার বিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
এবং ছেলেকে এই ব্যাপারে অবগত করলে আদিত্য এক কথায় না করে দেয়। সে পড়াশোনা শেষ করে মাত্রই তার ক্যারিয়ারে ফোকাস করেছে। এই মুহূর্তে সে কিছুতেই বিয়ে নামক কোন বেড়াজালে আবদ্ধ হতে নারাজ। তা ছাড়া একটা অচেনা অজানা এতিম মেয়ে তার সেইফটির জন্য তাকে বিয়ে করতে হবে এটা জাস্ট বুলশীট আইডিয়া মনে হয় আদিত্যর কাছে।
সে রেগেমেগে আশালতা বেগম কে বলে,,,

:- মা! ১৮ বছর হলে নিয়ম অনুযায়ী সব মেয়েদের কেই এতিমখানা ছেড়ে দিতে হয়! এমন হাজারো মেয়ে আছে! এখন কি তাদের সবাইকে তুমি তোমার ছেলের ঘাড়ে চাপাতে চাও? কার কার সেইফটির দায়িত্ব নিবে তুমি? এসব বিয়ে ফিয়ের আইডিয়া মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে কোন কাজের ব্যস্ততা করে দাও মেয়েটাকে। অযথা আমাকে জোর করো না।
মায়ের অনাকাঙ্ক্ষিত আবদারে আদিত্যর ক্রোধ বৃদ্ধি পায়। ঘাড়ের রগ ফুলে ওঠে ক্ষোভে।

আশালতা বোঝাতে চেষ্টা করলেও আদিত্য বিয়ের জন্য রাজিই হয় না। কিন্তু আশালতা বেগমের মৌমিতা কে এতোই পছন্দ হয়ে গেছে যে, তিনি জেদ ধরে বসেন মৌমিতা কে তিনি পূত্রবধু করবেনই।
এভাবে নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে আদিত্য কে একরকম ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে বিয়েতে রাজি করিয়েছিলেন। সেই রাগে ক্ষোভে আদিত্য বিয়ের দিনেই বউয়ের মুখ না দেখেই বিদেশ পাড়ি জমিয়েছিলো।
আজ সে মা কে শর্ত দিয়েছে যদি আশালতা বেগম ছেলেকে ফিরে পেতে চায় তাহলে তার পুতুল খেলার বিয়েটা ভাঙ্গতে হবে। মেয়েটাকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে হবে। সে দেশে ফিরেই মেয়েটাকে ডিভোর্স দিবে।

ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আশায় বুকে একরাশ হতাশা, কষ্ট আর চক্ষুলজ্জা নিয়েই তিনি মৌমিতা কে ডেকে আনেন একান্তে নিজের কাছে। তারপর লজ্জিত কন্ঠে কোনমতে ছেলের শর্তের কথা জানায় তিনি। হাত জোড় করে ক্ষমা চাইলেন মৌমিতার কাছে। মাতৃস্নেহের কাছে হেরে গিয়ে তিনি স্বার্থপর হতে বাধ্য হলেন। সবকিছু শুনে মৌমিতার ঠোঁটে একটা তাচ্ছিল্যর হাসি ফুটে ওঠে। সে আশালতা বেগমের হাত ধরে বলে,,

:- ছিঃ মা! আপনি কেন কষ্ট পাচ্ছেন? এভাবে আপনি আমার কাছে ক্ষমা চাইবেন না দয়া করে। এই পাঁচ বছর আপনি আমাকে মায়ের মতো আগলে রেখেছেন। পড়াশোনা করিয়েছেন। মাথার ওপর একটা নিশ্চিন্ত ছাদ দিয়েছেন। সম্মান,আদর, ভালোবাসা দিয়েছেন। এতো কিছু দিয়েছেন যে আমার আর কিছু চাওয়ার নেই। আপনার ছেলের সাথে আমার বিয়েটা নিছক দুর্ঘটনা ভেবে ভুলে যাবেন মা। তার সাথে আমার কখনও সংসার হয়নি। তিনি আমার মুখটা পর্যন্ত দেখেননি। আমার কোন অভিযোগ নেই মা। আপনি চিন্তা করবেন না। আপনার ছেলেকে ফিরে আসতে বলুন। আমি কালই হোস্টেলে শিফট করবো। একটা চাকরির ব্যবস্থা হয়ে যাবে চিন্তা করবেন না। ঠিক কখন কোন কাগজে সই করতে হবে শুধু আমাকে একবার ফোন করবেন আমি সই করে দিবো। আমার আর কোন দাবি নেই মা।

মৌমিতার কথায় আশালতা বেগম আরও কষ্ট পেলেন। ছেলেটার জেদের কাছে আজ তার আদর্শ কে হার মানতে হলো। কিন্তু কি বা করবেন তিনি। ছেলেকে যে তার বুকে ফিরিয়ে আনতে হলে এই অন্যয়টা তাকে করতেই হবে।

কাপড়চোপড় গুছাতে গুছাতে পুরনো কথাগুলো ভাবছিলো মৌমিতা। ল্যাগেজে শেষ কাপড়টা ভাঁজ করে রেখে জিপলক করে সোজা হয়ে দাঁড়ালো মেয়েটা। শুধুমাত্র নিজের বইখাতা, জামাকাপড় আর পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করে জমানো কিছু টাকা ছাড়া এ বাড়ি থেকে পাওয়া কিছুই নেইনি সে।

এখনো পর্যন্ত গলায় আশালতা বেগমের দেয়া একটা স্বর্নের চেইন শোভা পাচ্ছে! যাওয়ার সময় সেটাও আশালতা বেগমের হাতে বুঝিয়ে দিয়ে যাবে। ভাবলো মৌমিতা।

ভালো করে চার দেয়ালের ঘরটাকে মায়াভরা দৃষ্টিতে একবার পরখ করলো সে। ঘরটা একসময় এই বাড়ির একমাত্র পূত্র,তার নামমাত্র স্বামী শেহজাদ আদিত্য চৌধুরীর ঘর ছিলো। পাঁচটা বছর,,,, পাঁচটা বছর সে এই ঘরটাতে থেকেছে। এক একটা দেয়াল, আসবাবপত্র বিছানা,ওয়াশরুম,ব্যালকনি তার প্রিয় হয়ে ওঠেছিলো এই পাঁচবছরে। আরও একটা জিনিস মৌমিতার ভীষণ প্রিয় হয়ে উঠেছিলো। দিনের পর দিন,মাসের পর মাস, বছরের পর বছর সেই প্রিয় জিনিসটা সে মনের কোণে হাজারো স্বপ্ন,হাজারো ইচ্ছে,আশা নিয়ে সাজিয়েছিলো,আসন গেড়ে বসেছিলো তার মন মস্তিষ্কে। আজ সে সব মিথ্যা বালির প্রাসাদের মতো এক ঢেউয়ের ধাক্কায় ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
মৌমিতা ছলছল চোখে তাকালো বিছানার মাথার পাশে দেয়ালে টাঙ্গানো একটা বড় ফোটোফ্রেমের দিকে। সেথায় সাদা শার্ট কালো প্যান্টে স্টাইলিশ এবং মাত্রাতিরিক্ত সুদর্শন একজন পুরুষের ছবি জ্বলজ্বল করছে।
হ্যাঁ এটাই সে! যার সাথে তার না হওয়া সংসার আজ ভেঙ্গে গেল। তার নামমাত্র স্বামী শেহজাদ আদিত্য চৌধুরী। যাকে সে অতি গোপনে হৃদয়ের গভীরে একটু একটু করে লালন করেছিলো এই পাঁচটা বছরে। ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কয়েক ফোঁটা অবাধ্য জল গড়িয়ে পড়লো মৌমিতার গাল বেয়ে। অপলকে কিছুক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে থেকে চোখের পানি মুছে নিলো মৌমিতা। এ বাড়ির কাউকে সে নিজের দূর্বলতাটা দেখাতে চাই না। আশালতা বেগম জানতে পারলে হয়তো মরমে মরে যাবেন। ভীষণ ভালো মনের মানুষ ভদ্রমহিলা। মৌমিতার জীবনে তিনি আশির্বাদ হয়ে এসেছিলেন। আজ তার বুকের ধন কে তার কাছে ফিরিয়ে দিতে সে নাহয় পেলো একটু কষ্ট। যাকে কখনো পাইনি,তার জন্য এই কষ্ট হয়তো বেশিদিন স্থায়ী হবে না। নিজেকে শক্ত করে ল্যাগেজটা নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো মৌমিতা।

ড্রইং রুমে দাড়িয়ে আছেন সাদমান চৌধুরী এবং আশালতা বেগম। দু’জনেই আজ সীমাহীন লজ্জায় মাথানত হয়ে আছে।
সাদমান চৌধুরী পাঁচ বছর আগে ছেলের ইচ্ছের বিরুদ্ধে হওয়া বিয়েটাতে খুশি হননি ঠিকই। কিন্তু পরে ছেলে রাগ করে বাড়ি ছেড়ে গেলেও ফুলের মতো মিষ্টি মেয়েটাকে দুরে ঠেলে দিতে পারেননি। বরং দিনের পর দিন মৌমিতার সুমিষ্ট আচরণ আর সরলতায় মুগ্ধ হয়েছেন বারংবার। পাঁচবছরে নিজের মেয়ের জায়গা দখল করে নিয়েছিলো মেয়েটা। আজ ছেলেটাকে ফিরে পেতে স্বার্থপরের মতো মেয়েটাকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

মৌমিতা শশুর-শাশুড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। গলা থেকে চেইনটা খুলে আশালতা বেগমের কাছে এগিয়ে এসে তার হাত টেনে নিয়ে হাতের তালুতে চেইনটা রাখলো।
আশালতা বেগম স্তব্ধ নয়নে মৌমিতার দিকে তাকালে ঠোঁট এলিয়ে হাসলো মৌমিতা। বললো,,

:-এবাড়িতে আসার পর আপনারা আমাকে অনেক কিছু দিয়েছেন মা। কিন্তু আজ যাওয়ার সময় আমাকে প্লিজ কিছু সাথে নিতে বলবেন না। কিছু মনে করবেন না কিন্তু এবাড়িতে কিছুই আমি আমার সাথে রাখতে চাইনা মা। আশা করি আপনি বুঝবেন!

আশালতা বেগমের চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো!
মৌমিতার মাথায় হাত বুলিয়ে ধরা গলায় বললেন,,

:-মা কিন্তু যখন তখন আসবো হোস্টেলে তোমার সাথে দেখা করতে! এ বাড়ি ছেড়ে গেলেও তুমি আমার মেয়ে হয়ে থাকবে কথা দাও।

মৌমিতার কাছে বড় হাস্যকর লাগলো আশালতা বেগমের এই বাচ্চাদের মতো আবদার খানা। মৌমিতা তার হৃদয় পিষ্ট করে কি চরম হাহাকার নিয়ে এই বাড়ি ছাড়ছে তা হয়তো কারোরই জানা হবে না। কিন্তু সত্যি বলতে এখান থেকে বেরিয়ে সে আর এ বাড়ির কারো সাথেই কোন সম্পর্ক রাখতে চাই না। তাহলে যে ওই মানুষটাকে কিছুতেই ভুলতে পারবে না। যার শুধু ছবির সাথেই পাঁচ বছরের একটা কাল্পনিক সংসার সাজিয়েছিলো মৌমিতা। সেই নিষ্ঠুর পুরুষটাকে ভুলতে হলেও তার এই বাড়ির সবকিছু থেকে নিজেকে বন্ধন ছিন্ন করতে হবে তার।
মৌমিতা কথা না বাড়িয়ে তাদের নিজেদের খেয়াল রাখতে বলে ল্যাগেজটা টেনে নিয়ে ধীর পায়ে বেরিয়ে এলো আশাকুঞ্জ থেকে। সাদমান চৌধুরী নিজে তাকে গাড়িতে হোস্টেলে ছেড়ে দিতে চাইলে তা নাকচ করলো মৌমিতা। জীবনের বাকি দিন গুলো যখন তাকে একাই সবকিছু সামলাতে হবে তখন আজ এই মুহূর্ত থেকেই না হয় শুরু হোক তার বাকি পথচলা!

#চলবে

#ফিরেছি_তোর_আঙ্গিনায়
#মৌমো_তিতলী
পর্ব,,,,২

কানাডা।
নগরীর আকাশ তখন গভীর নীল থেকে ধীরে ধীরে কালোর দিকে ঢলে পড়েছে। চারদিকে অন্ধকার ছড়িয়ে রাতের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার শুরু হয়েছে।
সুউচ্চ ভবনের সারি সারি আলো গুলো আকাশ থেকে ছিটকে পড়া তারার টুকরোর মতো দেখাচ্ছে।
এমনই এক আটচল্লিশ তলা সুউচ্চ ভবনের ত্রিশতম ফ্লোরের কাঁচের দেয়ালে ঘেরা এক ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে শেহজাদ আদিত্য চৌধুরী।

হাতে গরম কফির মগ। ধোঁয়া ওঠা কফির ছিপে ঠোঁট ছুঁইয়ে সে চোখ মেলে তাকিয়ে আছে নিচের দিকে।
চওড়া রাস্তা, চলন্ত গাড়ির হেডলাইট, দূরে ঝলমলে স্কাইস্ক্র্যাপার, আলোয় ভেজা কানাডিয়ান রাত।
এ শহর তাকে সব দিয়েছে,স্বাধীনতা, ক্যারিয়ার, পরিচিতি।
তবু আজ এই রাতটায় কোথাও যেন অদ্ভুত ফাঁকা লাগছে আদিত্যর। ঠিক কি কারণে তা বুঝলো না আদিত্য। আগামী ভোর চারটায় তার ফ্লাইট। অবশেষে সে ফিরছে বাংলাদেশে।

সকালেই সে মায়ের ফোন পেয়ে জানতে পেরেছে
“মেয়েটা বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে।”

এই প্রথমবার কথাটা শুনে আদিত্য কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলো। না আনন্দ, না স্বস্তি কিছুই অনুভব করতে পারেনি। এটাকে শুধু তার দেয়া শর্তের একটা তথ্য হিসেবেই নিয়েছিলো।

এবার ফিরে গিয়েই প্রথম কাজ ডিভোর্সের ব্যবস্থা করা।
কফির শেষ ছিপটা নিয়ে আদিত্য চোখ বন্ধ করলো। হঠাৎ করেই মনে পড়ে গেল পাঁচ বছর আগের সেই দিনটার কথা।
সেদিন মায়ের জেদের কাছে হেরে সে একটা অচেনা মেয়েকে নিজের নামে রেজিষ্ট্রি করেছিলো। পরমুহূর্তেই কিছু না বলেই শুধু মাত্র সই করে দিয়েই বেরিয়ে এসেছিলো সেখান থেকে। সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত…
সে কখনো ওই মেয়ের মুখটাও দেখেনি। এমনকি
নামটা পর্যন্ত তার জানা নেই।
“এই মেয়ে”, “ওই মেয়ে” এই দুই শব্দেই সীমাবদ্ধ ছিল তার অস্তিত্ব।
মাও সবসময় “বউমা” বলে উল্লেখ করেছে তাকে।
তাই নামটা আর জানা হয়নি তার।

হঠাৎ বুকের ভেতরে কোথাও খুব সূক্ষ্ম একটা টানাপোড়েন শুরু হলো আদিত্যর।
একটা অস্বস্তিকর প্রশ্ন মাথা তুললো হৃদয়ে।
সে কি ঠিক করছে?
তার কি অন্তত একবার সামনাসামনি কথা বলা উচিত ছিল না মেয়েটার সাথে?
মেয়েটা পাঁচটা বছর তার স্ত্রীর অধিকারে থেকেছে।
তার বিরুদ্ধে কি একফোঁটাও অভিযোগ জমেনি?
নাকি সে তাকে কাপুরুষ ভাবছে! একজন মানুষ যে তাকে বিয়ে করে পালিয়ে গেছে!
এই দ্বন্দ্বগুলো মুহূর্তের মধ্যেই মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে শুরু করলো।
কিন্তু পরমুহূর্তেই আদিত্য নিজেই সেই ভাবনাগুলো কে ঠেলে দুরে সরিয়ে দিলো।
যার প্রতি তার কোনো অনুভূতি নেই, যাকে সে কোনোদিন স্ত্রী বলে মেনে নেয়নি তার বিষয়ে ভাবারই বা দরকার কী?
মেয়েটা এখন যথেষ্ট ম্যাচিউর। নিশ্চয় নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে। এতো দিনে তো তার পরিবার মেয়েটার কোন দায়িত্ব অবহেলা করেনি।
আর সবচেয়ে বড় কথা,
আদিত্য কখনোই তাকে কোনো আশার আলো দেখায়নি। তাই অপরাধবোধের কোনো জায়গা নেই।
ইচ্ছাকৃতভাবেই সে চিন্তাগুলোকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দিলো।
ব্যালকনির কাঁচের দরজা বন্ধ করে ভেতরে ঢুকে পড়লো। ব্যাগ গোছানো আগেই হয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নেয়া দরকার।

________________

এদিকে, বাংলাদেশে।

হোস্টেলের ঘরটায় হলুদ রঙের বাল্ব জ্বলছে। নিয়ন আলো ছড়িয়ে পড়েছে ছোটখাটো রুমটার চার দেয়ালের মাঝে। একই রুমে দু’টা বিছানা।

একটাতে বসে বই পড়ছে মৌমিতা, আর অন্যটাতে পা ভাঁজ করে বসে আছে নোরা। নোরা মৌমিতার ক্লাসমেট সাথে একমাত্র প্রাণপ্রিয় বান্ধবী।
মৌমিতা একেবারের জন্য হোস্টেলে এসেছে এতে নোরা সত্যিই ভীষণ খুশি।
মৌমিতার ব্যাপারে ও সব জানে। সবকিছু।
তাই একটাও অহেতুক প্রশ্ন করেনি আশাকুঞ্জ ছেড়ে আসার বিষয়ে।
দু’জনে ঠিক করেছে এখন থেকে একসাথেই থাকবে।
চাকরির জন্য দু’জনেই চেষ্টা করছে।
যে কোনো একজনের ভালো একটা চাকরি হয়ে গেলেই হোস্টেল ছেড়ে বাসা নেবে।

নোরা নিজের বিছানা ছেড়ে ধীর পায়ে মৌমিতার পাশে এসে বসলো। উঁকি দিয়ে দেখলো মৌমিতা পরবর্তী চাকরির ইন্টারভিউয়ের প্রস্তুতি নিতে পড়াশোনা করছে।

নোরা আঙ্গুল দিয়ে মৌমিতার বাহুতে খোঁচা দিয়ে বললো,,,

:- এই মৌ শোন না!

:- হুম!
ছোট করে জবাব দেয় মৌমিতা।

– হুম কি? তোকে বলেছিলাম না আজকে সন্ধ্যায় একটা কনসার্ট আছে! চল না ইয়াররর! আমার ফেবারিট সিঙ্গার আয়াত মাহমুদের কনসার্ট বেবি!! অনেক কষ্টে দুটো টিকিট জোগাড় করেছি। প্লিজ বনু না করিস না প্লিজ প্লিজ!!

নোরা দুহাত জড়ো করে বাচ্চা বাচ্চা ফেইস করে তাকিয়ে রইলো মৌমিতার দিকে।

মৌমিতা ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে তাকালো নোরার দিকে। মেয়েটা বর্তমান ট্রেন্ডে থাকা মেয়েদের হার্টথ্রব গায়ক,আয়াত মাহমুদের একজন তার ছেঁড়া পাগল ভক্ত। নোরার ফোনের ওয়াল পেপারে আয়াত মাহমুদের ছবি! তার ফোনে আয়াতের গান দিয়ে ঠাসা! সিঙ্গার আয়াত মাহমুদ কে নিয়ে নোরার এসব পাগলামী সম্পর্কে অবগত মৌমিতা।

তবে আয়াত কে মৌমিতা চেনে অন্য ভাবে। আয়াত মাহমুদ আশালতা বেগমের বোনের ছেলে। শেহজাদ আদিত্য চৌধুরীর একমাত্র খালাতো ভাই। পাঁচবছরে বেশ কয়েকবার সে আয়াত কে আশাকুঞ্জে আসতে দেখেছে। টুকটাক সৌজন্যমূলক কথা ছাড়া সেভাবে আলাপ হয়নি তার সাথে।
পুরনো স্মৃতি থেকে বেরিয়ে নোরার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো মৌমিতা।

মৌমিতার হাসিতেই সম্মতি পেয়ে খুশিতে জড়িয়ে ধরলো নোরা,,,

–থ্যাঙ্ক ইউ! থ্যাঙ্ক ইউ! থ্যাঙ্ক ইউ সুইটি! আমার জান তুই মৌ। আমি জানতাম যাবি। আমার কথায় তুই না করতেই পারিস না 😁

মৌমিতা নোরার বাচ্চামিতে এবার শব্দ করে হেসে উঠলো। বললো,,

-আচ্ছা ঠিক আছে। যাবো। এবার তো আমাকে একটু পড়তে দে। আগামী শুক্রবারে বেশ বড় একটা কোম্পানিতে ইন্টারভিউ আছে। শুনেছি কোম্পানিটা নতুন। তবে বেশ হাই প্রোফাইলের। স্যালারি অ্যামাউন্টও ভালো। ভাগ্য ভালো হলে যদি চাকরিটা হয়ে যায় তাহলে আমাদের কষ্টের দিন শেষ হবে নোরা।

নোরা মৌমিতা কে জড়িয়ে ধরে বলে,,

–তুই চিন্তা করিসনা মৌ। দেখবি তোর চাকরিটা ঠিক হয়ে যাবে। আমিও তো চেষ্টা করছি। আমাদের মধ্যে একজনের তো হবে চাকরি নাকি!! আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে আমাদের অবস্থা।

দু’জনে মিলে টুকটাক কথা,হাসি, খুনসুটির মধ্যে দিয়ে বিকেলটা পার করে দিলো। সন্ধ্যায় কনসার্ট। নোরা মুখে ফেসপ্যাক লাগিয়ে বসে আছে। ক্রাশের শো দেখতে যাবে বলে কথা! যদি আয়াত তাকে নোটিশ করে! তাহলে সুন্দর তো দেখাতে হবে নাকি!!!

নোরার হাল দেখে মৌমিতা হেসে কুটি কুটি। সন্ধ্যার আগে দিয়ে দুজনে তৈরি হয়ে নিলো। নোরা হাল্কা গোলাপী রঙের হাঁটুর নিচে পর্যন্ত গাউন পরেছে। মৌমিতা মেরুন কালারের একটা সুতি শাড়ি জড়িয়েছে গায়ে। চুলগুলো একপাশে টেনে অতি সাধারণ এক বেণী করে নিলো। চোখে সাদা গোল ফ্রেমের চশমা। পার্স ব্যাগটা হাতে নিয়ে নোরার দিকে তাকালো।

মেয়েটা বেশ সেজেছে। সুন্দর দেখতে লাগছে নোংরা কে। উজ্জ্বল ফর্সা ত্বকের মেয়েটা ভীষণ ছটফটে। আচরণের দিক থেকে মৌমিতার সম্পূর্ণ বিপরীত নোরা।
দারুন প্রাণচ্ছল মেয়েটার জীবনের ট্রাজেডি কিছু কম নয়। ছোটবেলায় মা কে হারিয়েছে নোরা। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করলে প্রথম প্রথম সৎ মা ভালো ব্যবহার করলেও যখন তার নিজের সন্তানের জন্ম হয়, তারপর থেকে নোরা কে একদম সহ্য করতে পারতো না নোরার সৎ মা। নোরার বাবা কাজের সুত্রে বেশিরভাগ সময়টাই বাইরে থাকতেন। আর এদিকে বাবার অবর্তমানে বাড়িতে নোরার ওপরে চলতো সৎ মায়ের স্টিম রোলার।
কথায় কথায় মারধর করা,বাড়ির সমস্ত কাজকর্ম ওকে নিয়েই করাতো। পড়াশোনা করতে দিতো না। এমনকি নোরার বাবা বাড়িতে আসলেই নোরার নামে মিথ্যা কান ভারি করতেন তিনি। এসব নিত্য অশান্তিতে পাল্টে গেলেন নোরার বাবাও। স্ত্রীর কথায় বিশ্বাস করে প্রচুর মারধর করতো নোরার ওপরে।
এসব কিছু সহ্য করতে করতে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে পড়েছিলো মেয়েটার। তাই তো একদিন সুযোগ বুঝে কিছু জমানো টাকা আর মায়ের শেষ স্মৃতি হিসেবে মায়ের একটা ছবি আর মায়ের দেয়া একজোড়া নূপুর নিয়ে পালিয়ে এসেছিলো এই ঢাকা শহরে।

কোনমতে সেলস গার্ল, ডেলিভারি গার্লের কাজ করে ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলো নোরা। এভাবেই ভার্সিটিতেই তার মৌমিতার সাথে বন্ধুত্ব হয়। জীবনে এতো কষ্ট সহ্য করে টিকে থেকেও মেয়েটার মাঝে দুরন্তপনার শেষ নেই। জীবনকে যে কোন পরিস্থিতিতে উপভোগ করার দারুন ক্ষমতা আছে নোরার মাঝে। যেটা সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে মৌমিতার কাছে।
দেখতে গেলে নোরার চেয়ে শতগুণ ভালো ছিলো মৌমিতার পরিস্থিতি। নিজ বাবা মায়ের পরিচয় না জানা আর একাকিত্বের কষ্ট ছাড়া কোন অভাব, কষ্ট অনুভব করেনি সে। শশুর-শাশুড়ি নামক বাবা-মা সে পেয়েছিলো এই পাঁচটা বছরে। এই সুখের স্মৃতিটুকু নিয়েই সে বাকি জীবন পার করে দিতে পারবে।

এতো কিছু ভাবনার মাঝেই হোস্টেল ছেড়ে বেরিয়ে এলো মৌমিতা আর নোরা। একটা রিকশা ডেকে উঠে বসলো দুজনে। কনসার্ট হচ্ছে বনানীতে। রিকশা চলতে শুরু করলে তার সাথে সাথে চলতে থাকে নোরার কথার ফুয়ারা। মেয়েটা কথা বলতে ভীষণ পটু। মৌমিতা মন দিয়ে শোনে তা।

পনের মিনিট পর কনসার্টের গেইটে এসে রিকশা থামে। চারদিকে মানুষ থৈ থৈ করছে। বর্তমানে নাম্বার ওয়ান সিঙ্গারের কনসার্ট বলে কথা!

রিকশার ভাঁড়া মিটিয়ে দু’জন ভেতরের দিকে পা বাড়ায়। সিকিউরিটির সামনে টিকেট দেখিয়ে ভেতরে এসে খালি চেয়ার দেখে বসে পড়লো নোরা আর মৌমিতা।

প্রায় আধাঘণ্টা পর কনসার্ট শুরু হলো! চারদিকে মানুষের কন্ঠে একটাই নাম! আয়াত! আয়াত!

একসময় কাঁধে গিটার ঝুলিয়ে মঞ্চে প্রবেশ করলো কাঙ্খিত সেই মানুষটা। নোরা হাঃ করে তাকিয়ে আছে চোখের সামনে মাইক্রো ফোন হাতে পজিশন ঠিক করতে থাকা আয়াত মাহমুদের দিকে। নোরার চোখদুটো উত্তেজনায় চকচক করছে। এই প্রথম সে তার ক্রাশকে সরাসরি দেখছে। ফিলিংসটাই অন্যরকম।

মৌমিতা নোরার এমন হাঃ করে তাকিয়ে থাকতে দেখে কনুই দিয়ে গুঁতা মারে নোরার কমোরে। ধড়ফড়িয়ে সোজা হয়ে বসে নোরা। দাঁত কপাটি বের করে হাসতে থাকে নোরা। মৌমিতা তপ্ত শ্বাস ফেলে নোরা কে তার হালে ছেড়ে দিয়ে কপালে করাঘাত করে চুপচাপ বসে থাকে!

কিছুক্ষণ পর মঞ্চে শুরু হয় আয়াতের গলায় জাদুকরী সুরের মূর্ছনা!

ওওওওও ভ্রমর রেএএএএ
কইয়ো কইয়ো কইয়ো রে ভ্রমর
কৃষ্ণরে বুঝাইয়া…..

মুই রাঁধা মইরা যামুউউউউ
কৃষ্ণহারা হইয়া রেখেছে
ভ্রমর কইয়ো গিয়া!

নোরা গালে হাত দিয়ে অপলকে তাকিয়ে আছে আয়াতের দিকে। সুরের মূর্ছনায় হারিয়ে গেছে মেয়েটা!
নোরার দু চোখজুড়ে আয়াতের প্রতিচ্ছবি ছাড়া কিছুই দেখা গেলো না আর!

#চলবে