Home "ধারাবাহিক গল্প ফিরেছি তোর আঙ্গিনায় ফিরেছি তোর আঙ্গিনায় পর্ব-১৩+১৪

ফিরেছি তোর আঙ্গিনায় পর্ব-১৩+১৪

0
573

#ফিরেছি_তোর_আঙ্গিনায়
#মৌমো_তিতলী
পর্ব,,,,১৩

বিছানার ওপর ঝিম মেরে বসে আছে মৌমিতা। হৃদয়ের টানাপোড়েনে কাহিল হয়েছে অন্তরস্থল।
এরই মাঝে বেশ কয়েকবার ফোন করেছে আদিত্য।
তাকে এন অ্যাসিস্ট্যান্ট সবার আগে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দিয়েছে।
সিদ্ধান্ত নিতে হীনমন্যতায় ভুগছে মেয়েটা। যাবে নাকি কোন অজুহাত দেখিয়ে মানা করে দিবে! মানা করলে আদিত্য কি মানবে সেটা?
আর যদি সেখানে যায়,তবে! তবে তো তার জীবনের লুকায়িত সত্যি আদিত্যর সামনে এসে যাবে।
তার সেই পরিচয় আদিত্য কিভাবে গ্রহণ করবে! মৌমিতা কে কি ঘৃণা করবে? অপমান করবে সকলের সামনে!

মৌমিতার কোন হেলদোল না দেখে এবার যারপরনাই বিরক্ত হলো নোরা। বর্তমান সে নাক মুখ কুঁচকে তাকিয়ে আছে মৌমিতার দিকে। মৌমিতা কে এভাবে থম মেরে বসে থাকতে দেখে এবার উঠে এলো মেয়েটা।
হাত ধরে টেনে তুলতে তুলতে বললো,,,

:-অনেক হয়েছে মৌ! তুই এখনি যাবি,গিয়ে রেডি হবি‌। আমি বলছি তো কিছু হবে না। তুই যা।

মৌমিতা নাক ফুলিয়ে তাকালো নোরার পানে!
কিছু একটা ভেবে দুষ্টু হেসে বললো,,,

:-যাবো, এরপর যদি মিস্টার আদিত্য সবটা জেনে আমাকে চাকরি থেকে বের করে দেয় তাহলে কিন্তু তোকেই আমাকে পালতে হবে! আমি আর নতুন করে চাকরি টাকরি করতে পারবো না। বল রাজি?

এরকম সিচুয়েশনেও মৌমিতা কে ঠাট্টা করতে দেখে
অবাক হয় নোরা। তবে দমে না গিয়ে বলে,,,

:-আচ্ছা তাই হবে। তোকে চাকরি করতে হবে না। তুই শুধু আমার জন্য রান্না করবি,কাপড় ধুয়ে দিবি,ঘর পরিষ্কার করবি। তোর মাইনে বাবদ আমি তোকে পলবো। অখে?

বলেই মিটিমিটি হাসতে লাগলো। মৌমিতা কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থেকে হুট করে খিলখিল করে হেসে উঠলো। নোরার মনটাও কিছুটা হালকা হলো মৌমিতার সেই প্রাণখোলা হাসি দেখে।

মৌমিতা উঠে আলমারির পাল্লা খুলতে খুলতে বলে,,,

:-আমি যাচ্ছি কিন্তু একটা শর্ত আছে!

নোরা হাত পা ছড়িয়ে বিছানায় বসে হাই ছুড়তে ছুড়তে বললো,,,

:-কি শর্ত?

:- শর্ত এটাই যে তুইও যাচ্ছিস আমার সাথে।

নোরা মাত্রই গা এলিয়ে দিয়েছিলো বিছানায়। মৌমিতার কথায় তড়াক করে উঠে বসলো। অবাক হয়ে বললো,,,

:-কিহ? আমি? মানে আমি কেনো? আমি ওখানে গিয়ে কি করবো? তোর অফিসের বসের বার্থডে! তুই যা‌‌।

:–হ্যা ভেবে দেখ! গেলে কিন্তু তোরই ফায়দা! আমি তো তোর কথা ভেবেই বলছিলাম!

নোরা ভ্রু কুঁচকে তাকালো মৌমিতার দিকে।

:-মানে! ওখানে গিয়ে আমার আবার কিসের ফায়দা?

:-কারন সেখানে আপনার প্রিয় একজন মানুষ উপস্থিত থাকবেন। যদি চান অন্য কোন সুন্দরী ললনা তাকে কব্জা না করুক,তাহলে এখনি রেডি হন,আর আমার সাথে চলুন। তা ছাড়া তুই সাথে থাকলে আমি একটু ভরসা পাবো।

মৌমিতার কথায় চোখ বড় বড় করে তাকালো নোরা।

:-মানে আয়াত আসবে? মানে কেনো?

:-আরে আয়াত হলো আদিত্যর কাজিন। খালাতো ভাই। ওদের মধ্যে বন্ডিংও ভালো। তো ভাইয়ের বার্থডে পার্টিতে সে থাকবে এটাই স্বাভাবিক।

নোরা টাস্কি খেয়ে তাকিয়ে আছে মৌমিতার দিকে। মুখ ফুলিয়ে বললো,,,

:-তুই তো আগে কখনো বলিসনি যে,আয়াত তোর দেবর হয়! তাহলে তো আগেই আমার লাইন ক্লিয়ার হয়ে যেত!

মৌমিতা তাড়া দিয়ে বললো,,,

:-আচ্ছা ঠিক আছে,আগে বলিনি কিন্তু এখন তো জানলি,যা এবার রেডি হয়ে নে।

নোরাও আর বেশি কিছু না ভেবে তৈরি হতে নেমে পড়লো‌।

আদিত্যর বার্থডে পার্টিতে মেয়েদের ড্রেসকোড দিয়েছে শাড়ি। মৌমিতা বেবি পিংক কালারের একটা জামদানী গায়ে জড়িয়েছে। চুলগুলো বরাবরের মতো বেণী করে নিলো। হাতে, কানে ,গলায় সিম্পল গোল্ডের জুয়েলারি পরে নিলো। চোখে গাঢ় কাজল টেনে দিলো। ঠোঁটে হালকা লিপজেল লাগিয়ে সাজ কমপ্লিট করলো সে। খুবই সাদামাটা সাজ।

নোরাও নীল রঙের জামদানী পরেছে। ওয়াশ রুম থেকে শাড়ির কুচি ঠিক করতে করতে বেরিয়ে এলো নোরা। মৌমিতা কে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তৈরি হতে দেখে তাকালো মৌমিতার কায়ায়!
নাক কুঁচকে বললো,,,

:-আজকেও তুই এইরকম বেহেনজি সেজে যাবি মৌ?

মৌমিতা নোরার মুখের দিকে তাকিয়ে আবার আয়নায় নিজের দিকে তাকালো। ভারিই তো সেজেছে। বেহেনজি লাগছে নাকি তাকে!

নোরা এগিয়ে এসে মৌমিতা কে টেনে চেয়ারে বসায়। মুখে মানানসই মেকআপ সাথে চুলের বেণী খুলে হালকা স্টাইল করে খোঁপা করে দেয়। গোল্ডেন জুয়েলারি গুলো খুলে সাদা স্টোন ডিজাইনের চমৎকার কিছু জুয়েলারি পরিয়ে দেয়। ঠোঁটেও লেপ্টে দেয় গাঢ় গোলাপি লিপস্টিক।

সাজ কমপ্লিট করে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে নিজেই হাঃ করে তাকিয়ে আছে মৌমিতা। পাশেই নোরা মিটিমিটি হাসছে। মৌমিতা অবাক হয়ে বললো,,,

:-এটা কি করেছিস নোরা? আমি নিজেই তো নিজেকে চিনতে পারছি না। আমাকে সাজলে এমন দেখায়? আমি তো ভাবতেই পারিনি।

নোরা দু হাতে মৌমিতার কাঁধ চেপে ঘাড়ে থুতনি রেখে আয়নায় মৌমিতার মুখের দিকে তাকালো। বললো,,,

:-তুই তো কখনো সাজিস’ইনা মৌ! জানবি কি করে সাজলে তোকে কতটা মোহনীয় দেখায়। দেখবি আজ তোকে দেখে তোর ওই লুইচ্চা বর চোখ ফেরাতে পারবে না। সত্যি টা জানলে জানুক! তুই কি কম যে ভয় পাচ্ছিস। সত্যি থেকে আর কত পালিয়ে বেড়াবি? একদিন না একদিন তো সামনা করতেই হতো! হোক সেটা আজ বা কাল। তাই এতো কিছু না ভেবে তুই বরং নিজের দিকে খেয়াল দে। বুঝেছিস কি বললাম?

নোরার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনলো মৌমিতা। নোরা ভুল তো কিছু বলেনি। সত্যি থেকে সেই বা আর কত পালাবে! তার থেকে যা হওয়ার আজ ফয়সালা হয়েই যাক! সেও আর এই মিথ্যা সম্পর্কের ভার টানতে পারছে না ।
ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে তাকালো মৌমিতা। নোরার নাক টেনে দিয়ে বললো,,,

:-বুঝেছি পাকা বুড়ি! নে এবার তুই তৈরি হ। জলদি কর,স্যার কিন্তু কয়েকবার ফোন করেছে।

নোরাও চটজলদি তৈরি হয়ে নিলো। দুই বান্ধবী পাশাপাশি বেরিয়ে এলো হোস্টেল ছেড়ে। রাস্তার পাশেই খালি রিকশা দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি। ওদেরকে দেখে একটা রিকশাওয়ালা নিজেই এগিয়ে এলো। জিজ্ঞাসা করলো,,,

:–কই যাবেন আম্মা রা? আহেন দিয়া আসি।

মৌমিতা হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,,,

:-বসুন্ধরা দুই’য়ে যাবো মামা!

:-আইচ্ছা উডেন আম্মা রা।

মৌমিতা আর নোরা শাড়ির আঁচল ঠিক করে রিকশায় উঠে বসলো। যাওয়ার পথে ফুলের দোকান দেখে রিকশা দাড় করিয়ে একটা রজনীগন্ধা, হলুদ গোলাপ,জারবেরা ফুলের কম্বিনেশনে একটা বুকে নিয়ে নিলো মৌমিতা। আদিত্যর হলুদ গোলাপ পছন্দ! জানে মৌমিতা। নোরাও চটজলদি দুটো বেলি ফুলের গাজরা কিনে নিলো। একটা নিজে আর একটা মৌমিতার খোঁপায় জড়িয়ে নিলো।

ফুলের দোকান থেকে বেরিয়ে ফের রিকশায় উঠে বসলো। ধীরে ধীরে চলতে লাগলো কাঙ্খিত গন্তব্যের দিকে। রিকশাটা যতই এগিয়ে যেতে লাগলো, মৌমিতার বুকের মাঝে ধুকপুকানি বাড়তে লাগলো আসন্ন ঝড়ের ভাবনায়!

**********

আশাকুঞ্জে এসে পর্যন্ত ১৩ ঘন্টা হতে চললো, এখনও পর্যন্ত আদিত্য কে চোখেই দেখতে পারলো না ঈশিতা। যতটা উচ্ছাস নিয়ে সে আশাকুঞ্জে প্রবেশ করেছিলো, আদিত্যর ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখে ততটাই আশাভঙ্গ হয়েছে সে। তারওপর জানতে পেরেছে আদিত্য সাফ মানা করে দিয়েছে কেউ যেন তাকে ডিস্টার্ব না করে। কেউ না মানে কেউ না। সময় হলে সে নিজেই তৈরি হয়ে নিচে আসবে।

বাড়ির সকলেই আদিত্যর রাগ সম্পর্কে জানে। তাই মানা করার দরুন কেউ আর ডিস্টার্ব করার সাহস দেখাইনি। ঈশিতা তো এটাই বুঝতে পারছে না পুরুষ মানুষ হয়েই আদিত্য এতো ঘন্টা ধরে ঘরের দরজা বন্ধ করে কি এমন করছে! কোথায় ভেবেছিলো এ বাড়িতে এসে আদিত্যর সাথে একান্তে কিছু সময় কাটাবে, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তার ইচ্ছে টা আর পূরণ হওয়ার নয়।
বিরস বদনে ড্রইং রুমের সোফায় বসে আছে সে। মিনিটে কয়েকবার করে ওপরে আদিত্যর রুমের দিকে তাকাচ্ছে ঈশিতা।
_____

আশালতা বেগম আজ ভীষণ খুশি। তার মন বলছে আজ ভালো কিছু ঘটতে চলেছে। আজ তার পূত্র এবং পূত্রবধু দুজনেই তার বাড়িতে উপস্থিত থাকবে। এতো দিনের একটা জটিল সম্পর্কের ভাগ্যরেখা সরল হবে। আশালতা বেগমের মনে অফুরন্ত ইচ্ছে তার ছেলে যেন মৌমিতা কে মেনে নিয়ে একটা সুখি, সম্পূর্ণ সংসার গড়ে। চোখের সামনে ছেলে মেয়ে দুটোর সুন্দর সংসার দেখার ইচ্ছে যে তার পাঁচ বছরের স্বপ্ন।
মনে মনে আল্লাহকে স্মরণ করছেন তিনি। সবটা যেন আজ সমাধান হয়।

নিজের রুমে কাউচের ওপর আরামসে পা ছড়িয়ে বসে ফোনে গেইম খেলছে আদিত্য। তার পাশেই নাক মুখ কুঁচকে বসে আছে আয়াত‌। আদিত্যর ভাব সাব দেখে বড্ড বিরক্ত সে। না নিজে ঘর থেকে বের হচ্ছে আর না তাকে বেরোতে দিচ্ছে। পাক্কা পনেরো ঘন্টা ধরে সে এই ঘরে বন্দি রয়েছে। আয়াতের এখন মনে হচ্ছে গিটারে টুংটাং আওয়াজ তুলে গলা ছেড়ে গাইতে,,,

আমি ফাইসা গেছি…
আমি ফাইসা গেছি….
ওও আমি ফাইসা গেছি মাইনকার চিপায়!!!🤧

শেষে ধৈর্য হারিয়ে বললো,,,

:-তুই কি করতে চাইছিস বলতো!

আদিত্য মনোযোগ গেইমের দিকে রেখেই আলগোছে জবাব দিলো,,,

:-কোথায় কি করলাম?

:-কিছু যে করছিস না সেটাই জানতে চাইছি! ভাই তুই এলিয়েনের মতো সারাদিন ঘরবন্দি থাকতে চাইছিস থাক,আমার কোন আপত্তি নেই কিন্তু আমাকে প্লিজ বেরোতে দে!
তারপর নাক টেনে গন্ধ নিতে নিতে আবারো বললো,,,

:-নিচ থেকে কত ডেলিসিয়াস সব খাবারের গন্ধ আসছে দেখছিস? ক্ষুধায় আমার পেটে অলরেডি ইদূরের রেস শুরু হয়ে গেছে! ভাইই মাফ কর আমায়! এইবার অন্তত বেরোতে দে! ভাবি তো বললো দশ মিনিটে পৌঁছে যাবে। তখন গিয়ে তুই ভাবির আঁচল ধরে বসে থাকিস! কিন্তু আমাকে মার্ডার করিস না ভাই!!
জনগণের জন্য আমার জীবনের দাম আছে! আমার কিছু হলে আমার ফ্যান ফলোয়ার রা বিক্ষোভ মিছিল করবে! তাই আমাকে ছাড়! আমি গিয়ে পেটপুজো করি!

আদিত্য নাক কুঁচকে তাকালো আয়াতের দিকে। আয়াত কে টার্গেট করে কুশন ছুড়ে মেরে বললো,,,

:-হ্লা কতকাল খাসনি? এমন ভাব করছিস যেনো দুনিয়ায় চরম অনাহারী তুই! এতক্ষণ বাইরে যাসনি,এখন যা! গেলেই দেখবি চিপকু ঈশু তোকে কিভাবে চিপকে ধরে! এতক্ষণ ধরে ঘরে বসে আমরা কি করছিলাম জিজ্ঞাসা করতে করতে তোর কানের পোকা নাড়িয়ে দিবে।

কথাটা আদিত্য ভুল বলেনি। তাদের একমাত্র মামাতো বোন টা যে কি পরিমান তার ছিঁড়া সেটা আয়াতের চেয়ে ভালো আর কে জানে! আদিত্য কনাডা থাকা কালীন জ্বালিয়ে মেরেছে আয়াত কে। আদিত্য কবে আসবে, আদিত্যর ফোন নাম্বার দাও, আদিত্য কবে ফিরবে ব্লা ব্লা ব্লা!!
ঈশিতা যে আদিত্য বলতে পাগল সেটা আয়াত, আদিত্য দুজনেই জানে। আদিত্য কখনোই ঈশিতা কে সেভাবে প্রশ্রয় না দিলেও শক্ত আচরণ করেনি। কিন্তু এখন বিষয়টা ভিন্ন। ঈশিতা তার থেকে যেটা আশা করছে তা সাত জনমেও সম্ভব নয়। তাই খামাখা বিষয়টাকে আরও জটিল করতে চাইছে না। তা ছাড়া মৌমিতা এ বাড়িতে আসলে ঈশিতা আর তার মামা-মামি যে নাটক শুরু করবে সেটা আদিত্য বেশ বুঝতে পারছে! তাই তো সে এখনো পর্যন্ত অপেক্ষা করছে তার বউটা আসার! মৌমিতা আসলে তবেই সে নিচে নামবে!
বাড়িতে উপস্থিত রাক্ষসী-খোক্ষসীদের হাত থেকে তার পুঁচকে বউটাকে তো বাঁচাতে হবে নাকি 😁

অগত্যা আদিত্যর কথায় আয়াতও মৌমিতার আসার অপেক্ষা করতে লাগলো।

#চলবে
#হ্যাপি_রিডিং🤗

#ফিরেছি_তোর_আঙ্গিনায়
#মৌমো_তিতলী
পর্ব ১৪

সন্ধ্যা নামার ঠিক আগমুহূর্ত।
আকাশের পশ্চিম দিকটা রঙিন ক্যানভাসের মতো লালচে কমলা আভায় রাঙা। সূর্যটা ধীরে ধীরে ডুবছে মাগরিব অম্বরে।
তবুও গোধূলির শেষ আলোয় চারপাশে এক শীতল কোমলতা ছড়িয়ে আছে। বাতাসে ফুরফুরে শীতল ছোঁয়া, সাথে কাঁচা ফুলের গন্ধ মিশে এক অন্যরকম আবেশ তৈরি করেছে চারদিকে। দূরে মসজিদের মিনার থেকে মাগরিবের আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। স্বর্ণ করিয়ে দিচ্ছে সৃষ্টিকর্তার দিকে মাথা নোয়াবার সময় হয়েছে।

এই সন্ধ্যাতেই রিকশাটা এসে থামলো “আশাকুঞ্জ”-এর সামনে।
রিকশা থেকে নামতেই বুকের ভেতরটা ধকধক করে উঠলো মৌমিতার। হাতের বুকে ফুলের তোড়াটাও যেন ভারী লাগছে ধরে রাখতে । নোরাও তখন পাশে দাঁড়িয়ে। বান্ধবীর মনের অবস্থাটা হয়তো অনুভব করতে পারলো। কাঁধে হাত রেখে ফিসফিস করে বললো,,,

:- নার্ভাস হচ্ছিস?

মৌমিতা কষ্ট করে হাসলো অধর টেনে।

:-একটু…

আশাকুঞ্জে ঢোকার আগেই মৌমিতা ফোন বের করলো। প্রথমে আদিত্যকে কল দিলো। কয়েকবার রিং হতেই ওপাশ থেকে কল রিসিভ হলো।

মৌমিতা জানিয়ে দিলো সে পৌঁছে গেছে। ফোনের
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতার পর খুব শান্ত গলার আওয়াজ পেলো,,

:- ওকে। ওয়েল কাম হোম!

সাথে সাথে কল কেটে গেলো। মৌমিতা কয়েক সেকেন্ড ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকলো,, আদিত্যর গলা কেমন যেন রহস্যময় মনে হলো তার! তবে বেশি কিছু না ভেবে
ফোন করলো আশালতা বেগমকে।

:- মা আমি গেটের সামনে।

ওপাশ থেকে মায়ামাখা কণ্ঠে আশালতা বেগমের গলা শুনতে পেলো মৌমিতা,,,

:- এসো ভেতরে। ভয় পেয়ো না। মা আমি আছি।

ফোন নামাতেই মৌমিতার মনে ভেসে উঠলো গত রাতের কথা।
আদিত্য যখন কনফরম করলো তাকে আসতেই হবে তখন উপায় না দেখে সে নিজেই ফোন করেছিলো শাশুড়িকে।
সে যে এখন আদিত্যর অফিসেই চাকরি করছে।
তাও আবার আদিত্যর অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে। সেসব কিছুই খুলে বলেছিলো শাশুড়ি কে। এটাও বলেছিলো
আদিত্য এখনো কিছুই জানে না। সে তাকে একজন অ্যাসিস্ট্যান্টই হিসেবেই চেনে। আদিত্য জানে না মৌমিতাই তার স্ত্রী।
আর বার্থডে পার্টিতে হয়তো একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে তাকে বাড়িতে আসতে হতে পারে সেটাও জানিয়েছিলো।

সব শুনে আশালতা বেগম শুধু বলেছিলেন,,,

:-তোমার বাড়িতে তুমি আসবে তাতে সমস্যা কি? কোন চিন্তা করোনা মা। শুধু এসো। বাকিটা আমি সামলে নেবো।

তিনি একবারও বলেননি যে আদিত্য সব জানে।
সেই কথাতেই ভরসা পেয়েছিলো মৌমিতা।
ভেতরে ঢুকতেই সামনে পড়লো আশালতা বেগম। শাড়ির আঁচল কোমরে গুজে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। দেখেই বোঝা যাচ্ছে কিচেনে ব্যস্ত ছিলেন এতক্ষণ। মহিলার চোখে-মুখে অপার স্নেহ স্পষ্ট।

মৌমিতা এগিয়ে গিয়ে সালাম দিলো।

:-আসসালামু আলাইকুম মা।

আশালতা বেগম দুহাতে মৌমিতাকে টেনে বুকে জড়িয়ে নিলেন।

:-ওয়ালাইকুম আসসালাম মা। এতো দিনে এলে তবে।

নোরার দিকে তাকাতেই মৌমিতা বললো,,

:-মা, ও আমার ফ্রেন্ড নোরা আফরিন। আমার রুমমেট।

নোরাও সালাম দিলো। আশালতা বেগম সালাম গ্রহণ করে বললেন,,,

:-ওয়ালাইকুম আসসালাম মা, এসো এসো দু’জনেই ভেতরে এসো।

আশালতা বেগম এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে মৌমিতার হাত ধরে ভেতরে নিয়ে গেলেন।
বাড়ির পেছনের লনে পার্টির আয়োজন করা হয়েছে ‌ রঙিন লাইট জ্বলছে চারদিকে,সারি সারি টেবিল সাজানো, দূর থেকে সফট মিউজিকের শব্দ ভেসে আসছে। তবে বাড়ির ভেতরে শুধু বাড়ির লোকজন আর কাছের আত্মীয়রা আছে। সেখানে বাইরের আওয়াজ ক্ষীণ।

কিচেনের দিকে নিয়ে গিয়ে আশালতা বেগম ডাকলেন তার বোন বিপাশা মাহমুদ কে।

:-আপা দেখো তো কে এসেছে!

রান্নার কাজে ব্যস্ত ছিলেন আদিত্যর খালা, আয়াতের মা। ঘুরে তাকাতেই চোখদুটো চকচক করে উঠলো বিপাশা মাহমুদের। মৌমিতা কে তিনিও স্নেহ করেন বেশ।

মৌমিতা এগিয়ে এসে সালাম করলো,,,

:- আসসালামু আলাইকুম খালামণি।

:- ওয়ালাইকুম আসসালাম মা।
মৌমিতার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন তিনি।

:- তোমার শাশুড়ি সব বলেছে আমাকে। কোন চিন্তা করবে না। আমরা সবাই তোমার পাশে আছি।

নোরা ভদ্রমহিলার দিকে একঝলক তাকিয়ে বুঝে ফেললো এটাই আয়াতের মা। মুখের মিল স্পষ্ট। সেও তাড়াতাড়ি সালাম দিলো।

শাশুড়ি আর খালা শাশুড়ির কথায় বুকের ভেতর জমে থাকা একটা পাথর যেন একটু সরলো মৌমিতার। সকলের সাথে ড্রইং রুমে ঢুকতেই সে থমকে গেলো।
সাদমান চৌধুরী। নানি শাশুড়ি শাহিদা খানম।
মামা শ্বশুর মোজাম্মেল খান। মামি শাশুড়ি রুমানা খান। সাথে ঈশিতা। সবাই একসাথে বসে আছে।

বিশেষ করে মামা–মামী আর ঈশিতাকে দেখে বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেলো মৌমিতার। ওরা তো জানে সে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। খুব তাড়াতাড়ি ডিভোর্স হয়ে যাবে আদিত্যর সাথে ‌এমনটাই ভাবছে সবাই।

ভয়ে ভয়ে এগিয়ে গিয়ে সাদমান চৌধুরীর কে সালাম করলো মৌমিতা।

:- কেমন আছেন বাবা?

সাদমান চৌধুরী মুখে প্রশস্ত হাসি এনে পাশে বসালেন।

:-এতো দিনে বাবার কথা মনে পড়লো?

শাহিদা খানমও পাশ থেকে বললেন,,

— কি রে ছুড়ি! শুনলাম বাড়ি ছেড়ে চলে গেছিলি? তোদের আজকালকার ছেলেমেয়েরা কি মনে করে? ছেড়ে যাওয়া কি এতো সোজা নাকি?

মৌমিতা মৃদু হেসে সে কথার জবাব না দিয়ে বললো,,

:-কেমন আছেন নানু?

এই দিনে মৌমিতা কে দেখে ঈশিতার মাথায় যেন বাজ পড়লো। নিজের ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে জীবন কাটানোর যে সাজানো স্বপ্ন তা যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে চুরমার হলো! ক্রোধে জ্বলে উঠলো মস্তিষ্ক।

সে হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে ঝড়ের গতিতে এগিয়ে এলো মৌমিতার দিকে।

:-এই মেয়ে! তোমাকে না আদি বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলেছিলো? এখানে আবার নির্লজ্জের মতো কেনো এসেছো তুমি?

মৌমিতা চমকে উঠে ভয়ে ভয়ে উপরে আদিত্যর রুমের দিকে তাকালো। ঈশিতা যেভাবে চিল্লাচ্ছে, আদিত্য এখনি টের পেয়ে যাবে।

রুমানা খানও চোখ রাঙিয়ে আশালতাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন,,

:-এই মেয়েটা আবার এ বাড়িতে কি করছে আশা আপা? নিশ্চয় তুমি ডেকেছো! তুমি জানো না আদিত্য এই মেয়েকে বউ বলে মানে না? তাহলে কেন এনেছো? এখনি বের করে দাও। ছেলেটার আনন্দের দিনটা মাটি করে দিও না।

ঈশিতা আর অপেক্ষা না করে মৌমিতার হাত শক্ত করে খামচে ধরে টেনে গেটের দিকে নিয়ে যেতে লাগলো। মৌমিতা কে দেখে স্বপ্নভঙ্গের ভয়,আর ঈর্ষান্বিত হয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে মেয়েটা। দাঁত কিড়মিড় করে বলতে লাগলো,,,

:-তোমার সাহস তো কম নয়! আবার এসেছো আমার আর আদির মাঝখানে কাঁটা হতে! বেরিয়ে যাও বলছি!

মৌমিতা হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বললো,,,

:-কি করছেন ঈশিতা আপু! ছাড়ুন আমার লাগছে! হাত ছাড়ুন আমার।

মৌমিতার কোন কথায় কানে তুললো না ঈশিতা। টেনে নিয়ে যেতে লাগলো গেটের দিকে।

সবাই স্তব্ধ।
আশালতা বেগম, সাদমান চৌধুরী, নানু কেউ যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না এ দৃশ্য।
নোরা হাঁ করে তাকিয়ে আছে। এই মেয়েটার চোখে কী ভয়ানক হিংসা! মৌমিতা তো তার থেকে বয়সে অনেক ছোট। তবু এত বিষ তার প্রতি! কি বজ্জাত মেয়ে রে বাবা!

নোরা কিছু বলতেই যাচ্ছিলো,
ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতেই বজ্রগম্ভীর কণ্ঠে হুঙ্কার ভেসে এলো। সেই এক হুঙ্কারে থমথমে হলো ড্রইং রুম,,,

:- আমার বউ আমার বাড়িতে আসবে তাতে তোর এত সমস্যা কোথায় ঈশু?

মৌমিতা, ঈশিতা সহ থমকে গেলো সকলেই।
আদিত্য সিঁড়ির মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে। চোখে যেন আগুন ঝরছে। ঠিক তার পেছনে নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আয়াত। ভাবটা এমন যেন কোন সিনেমা দেখতে এঁটে সেটে দাঁড়িয়েছে।

আবারো ভেসে এলো আদিত্যর গমগমে স্বর,,,

:-তোর তো সাহস দেখছি আকাশ ফুঁড়ে আরও ওপরে চলে গেছে রে ঈশু! আমার বউ, এই শেহজাদ আদিত্য চৌধুরীর বউকে তুই তার বাড়ি থেকেই বের করে দিচ্ছিস? কে দিয়েছে তোর এই রাইট?

বলতে বলতে নেমে এসে দাঁড়ালো মৌমিতার সামনে।
মৌমিতা স্তব্ধ। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। মাথা যেন কাজ করছে না।
সে কি ঠিক শুনলো? কি বললো আদিত্য!
“আমার বউ”

মোজাম্মেল খান আর রুমানা খানও হতভম্ব।
আর সাদমান চৌধুরী, শাহিদা খানম মুখ চাপা দিয়ে মিটিমিটি হাসছেন। আশালতা বেগম গর্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ছেলের পানে।
আজকের সন্ধ্যা যে এমন বিস্ফোরণ নিয়ে আসবে তা আন্দাজ করেছিলেন তিনি।

আদিত্য মৌমিতার স্তব্ধ হওয়া মুখের দিকে শীতল চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবারও তাকালো ঈশিতার দিকে। পরমুহূর্তেই মৌমিতার হাত শক্ত করে ধরে রাখা ঈশিতার হাতের দিকে নজর পড়তেই পূর্বের রাগ টা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। রক্তচোক্ষু নিয়ে তাকালো ঈশিতার দিকে। বজ্রকণ্ঠে ধমকে উঠলো,,,

:-ওর হাত ছাড়!

ঈশিতা অবাক নয়নে তাকিয়ে আছে আদিত্যর মুখের দিকে। এই আদিত্য কে যেন সে চিনতেই পারছে না। এর আগে ঈশিতার সাথে কখনো এমন কঠিন স্বরে কথা বলেনি আদিত্য। দু চোখ ভরে এলো ঈশিতার! অস্ফুট স্বরে বলল,,,

:-আদি তুই এই মেয়েটার জন্য আমার সাথে এভাবে কথা বললি? আমি তোর ছোটবেলার সঙ্গি,বন্ধু। আমি আমার জীবনে একমাত্র তোকেই সবথেকে ভালোবেসেছি! আর তুই এই সাধারণ একটা মেয়ের জন্য আমার সাথে এরকম করে কথা বলছিস! তুই তো ওকে ডিভোর্স দিবি! তাহলে কেনো এখন এই কথা বলছিস?

আদিত্য সেসব কথার জবাব না দিয়ে ঈশিতার হাত থেকে এক প্রকার ছিনিয়ে নিলো মৌমিতার হাতখানা।
চোয়াল শক্ত করে বললো,,,

:-Ishita, don’t cross your limit. আমি আমার বউয়ের সাথে কি করবো না করবো সেটা একান্ত আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। সেখানে কারো নাক গলানোর অধিকার আমি দিইনি।

আদিত্যর কথা শুনে রুমানা খান তেড়ে এলেন আদিত্যর দিকে। তারস্বরে চেঁচিয়ে বললেন,,,

:-এসব তুমি কার বলছো আদি? তুমি নিজেই এই মেয়েকে বউ বলে মেনে নাওনি। এতো দিন বাড়ি ছেড়ে বিদেশে ছিলে। তাকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার শর্ত দিয়ে ফিরে এসেছো! তাকে জলদিই ডিভোর্স দিবে বলেছো! তাহলে এখন এতো নাটক করার মানে কি?

রুমানা খানের তিক্ত কথাগুলো কানে আসতেই মৌমিতা আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। দুচোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো গাল বেয়ে।
আদিত্য মৌমিতার অশ্রুসিক্ত চোখের দিকে তাকিয়ে ফের তার মামির দিকে তাকালো। বললো,,,

:- কে বলেছে আপনাকে আমি আমার বউকে বের করে দিতে বলেছি?
আমার বউয়ের শখ হয়েছিলো তাই সে বাড়ি ছেড়ে হোস্টেলে গিয়ে থাকছে! তাতে আপনার কোন সমস্যা?

মৌমিতা অশ্রুভেজা চোখেই অবাক হয়ে তাকালো আদিত্যর মুখপানে! কি মিথ্যাবাদী লোক!

আদিত্য আবারও বললো,,

:-আর এসব ভুলভাল ইনফরমেশন আপনাদের কে দিয়েছে? আমি কেনো আমার বউকে ডিভোর্স দিতে যাবো? এখনো তো সংসারই করতে পারলাম না। বিদেশে গেছিলাম যেনো এই সুযোগে আমার বাচ্চা বউটা একটু বড় হয়! তার মাঝেই তোমাদের দেখছি ভুল ধারণা জন্মে গেছে! দিস ইজ নট ফেয়ার মামি!

আদিত্যর কথায় কিছুটা দমে গেলেন রুমানা খান। আশালতা বেগম হাসি আটকাতে মুখে আঁচল চাপা দিলেন। বাকিরা নাটক দেখতে ব্যস্ত।

ঈশিতা মরিয়া হয়ে ছুটে এলো আদিত্যর দিকে। আদিত্যর এক হাত ধরে বললো,,

:-আদি তুই আমার সাথে এরকম টা কিভাবে করতে পারিস! You know how much I love you. প্লিজ আমাকে এভাবে ভেঙ্গে দিস না। আমার এক জীবনে তোকে ছাড়া কাউকে চাইনি আমি বিশ্বাস কর! এই মেয়ে টাকে প্লিজ ডিস্টার্ব দিয়ে দে! তারপর আমরা বিয়ে করে দেবো। প্লিজ আদি! I love you So much.

আদিত্য ঈশিতার হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বললো,,,

:-তুই আমাকে কোন চোখে দেখিস আমি ডোন্ট কেয়ার!
আমি কি তোকে কখনো বলেছি আমি তোকে ভালবাসি? বা এমন কোন হিন্ট দিয়েছি? কোন প্রকার প্রশ্রয় দিয়েছি? দেখ ঈশু! আমার কোন বোন নেই। আয়াতেরও নেই। আমরা দুজনেই তোকে, আমাদের নিজের বোন মনে করি। তাই এই অহেতুক কথা গুলো বলে আমাদের সম্পর্কটাকে নষ্ট করিস না।

আদিত্যর কথায় হু হু করে কেঁদে উঠলো ঈশিতা। মেয়ের কান্না দেখে সহ্য হলো না রুমানা খানের। তেড়ে এলো মৌমিতার দিকে। মুহূর্তেই কষে একটা চড় বসিয়ে দিল মৌমিতার নরম গাল জুড়ে। মুহুর্তে পাঁচ আঙুলের ছাপ বসে গেলো মৌমিতার ফর্সা নরম কোমল গালে।

মৌমিতাকে চড় মেরেছে বোধগম্য হতেই আদিত্যর মাথায় রক্ত চড়ে গেল। মৌমিতার হাত ধরে টেনে বুকের মাঝে ঝাপটে ধরে হুঙ্কার দিয়ে উঠলো রুমানা খানের উদ্দেশ্য,,,

:-মামি! আপনার সাহস তো কম নয়! আমারই বাড়িতে, আমারই সামনে দাঁড়িয়ে আমার বউয়ের গায়ে হাত তোলার স্পর্ধা দেখান! আজ আপনি আমার মায়ের বয়সী না হতেন না মামি! আই স্যুয়ার আপনার গাল আমি আদিত্য আস্ত রাখতাম না।

রুমানা খান ঢোক গিলতে লাগলেন আদিত্যর ক্রোধ দেখে। তবুও কন্ঠে জোর এনে বললেন,,,

:- আমার মেয়েটার দিকে একবার দেখেছো? এতোটা বয়স হয়েছে তবুও বিয়ে করতে রাজি হয়নি। শুধু মাত্র তোমার আশায়! আর তুমি কিনা শেষে এই অনাথ মেয়েটার জন্য আমার মেয়েকে রিজেক্ট করছো?

:-উফফ মামি! কানের মাথা খাবেন না। কে বলেছে আপনার মেয়েকে বিয়ে না করে বুড়ি হতে? আমি বলেছি?
সিঁড়িতে দাঁড়ানো আয়াতের দিকে তাকিয়ে ফের বললো,,,

:-কিরে আয়াত তুই বলেছিস?

আয়াত দ্রুত দুপাশে মাথা নেড়ে অসম্মতি জানালো।

:-তবে! কিসের জন্য বিয়ে না করে বসে আছে? আজকেই গিয়ে পাত্র দেখা শুরু করবেন। এক সপ্তাহের মধ্যে আমাদের ঈশু বিয়ে বসবে। কেমন!

ঈশিতা শব্দ করে কেঁদে উঠলো আদিত্যর কথায়। ঈশিতা কে এভাবে কাঁদতে দেখে রুমানা খান দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,,,

:- এই মেয়ে কোথাকার কোন মায়ের কু কর্মের ফল তার ঠিক নেই! নয়তো কেউ নিজের সদ্যজাত বাচ্চা কে কোন অনাথ আশ্রমের দরজায় ফেলে দিয়ে যায়? এই মেয়ের কোন বংশ পরিচয় আছে? কোন খানদান আছে? ওর জন্ম কোন ধর্মের পরিবারের তাও তো জানা নেই! বেজন্মা মেয়ে একটা!

মৌমিতা আদিত্যর বুকের মাঝে থেকেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। জীবনে প্রথম বার নিজের জন্ম পরিচয় নিয়ে এতো কুৎসিত কথাগুলো শুনতে হলো তাকে। বাবা-মা হারা এতিম মেয়েটাকে যে এতোটা জঘন্য দিনও দেখতে হবে ভাবেনি মৌমিতা।
মৌমিতার শরীর কেঁপে কেঁপে উঠলো কান্নার তোড়ে। আদিত্য রুমানা খানের মুখের সামনে হাত উঁচিয়ে চিৎকার করে বললো,,,

:-ব্যাস মামি! আমার বউয়ের সম্পর্কে আর একটা বাজে কথা বললে আমি মান, সম্পর্ক ভুলে যাবো। মৌমিতা আমার স্ত্রী! আমিই ওর বংশ আর আমিই ওর খানদান। ওর অস্তিত্ব আমার ধর্মে বিলং করে! বুঝেছেন আপনি? আমার বউ সম্পর্কে আর একটা উল্টাপাল্টা কথা যদি আমি শুনেছি তাহলে তার ঘাড় ধাক্কা দিয়ে এই বাড়ি থেকে বের করে দিবো! গট ইট???

আদিত্যর ধমকে থমকে গেলো আশাকুঞ্জের প্রত্যেকে। সাদমান চৌধুরী, শাহিদা খানম,বিপাশা মাহমুদ, আয়াত আর আশালতা বেগম প্রত্যেকের মনে অফুরন্ত খুশি উপচে পড়ছে। নোরাও এতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে ছিলো। কিন্তু আদিত্যর প্রটেক্টিভ আচরণ দেখে শান্তি পেলো মৌমিতার জন্য।

বাকি মামী আর ঈশিতা থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে রইলো। আদিত্যর মামা মোজাম্মেল খান এতোক্ষণ চুপ করে থাকলেও এবার উঠে দাঁড়ালেন। সাদমান চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বললেন,,,

:-অনেক হয়েছে ভাইজান। আমার মেয়েটার জন্য এতক্ষণ চুপ থেকেছি। কিন্তু আর না। যে বাড়িতে আমার বউ,মেয়ের এত অপমান হয়! সেখানে আমার আর থাকা উচিত হবে না। আশা করি বুঝবেন।

নিজের বোনের দিকে তাকিয়ে বললেন,,,

:-মা বাড়ি যেতে চাইলে বলিস,গাড়ি পাঠিয়ে দেবো। কিন্তু আজ আমারা এখানে থাকছি না। বলেই রুমানা খান কে ইশারা করে ঈশিতার হাত ধরে টেনে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।

মৌমিতা এখনো স্তব্ধ, বিধ্বস্ত হয়ে আদিত্যর বাহুডোরেই বন্দি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পুরো তুফান টা যেন ওর ভেতরটা এলোমেলো করে দিয়ে গেলো!

#চলবে
#হ্যাপি_রিডিং 🤗