Home "ধারাবাহিক গল্প ফিরেছি তোর আঙ্গিনায় ফিরেছি তোর আঙ্গিনায় পর্ব-১৫+১৬

ফিরেছি তোর আঙ্গিনায় পর্ব-১৫+১৬

0
634

#ফিরেছি_তোর_আঙ্গিনায়
#মৌমো_তিতলী
পর্ব,,,,১৫

ধামম করে দরজা খুলে আদিত্যর রুমে ঢুকলো মৌমিতা। রুমে ঢুকতেই চোখে পড়লো আদিত্য বেডের ওপর আরামসে বসে ফোন গুঁতাগুঁতি করছে। দরজা খোলার শব্দে চোখ তুলে একবার তাকালো মৌমিতার দিকে। ফের ফোনে মনোযোগ দিলো! ভাবখানা তার এমন যেন কিছুই হয়নি।

মৌমিতা গিয়ে দাঁড়ালো আদিত্যর সামনে। দাঁতে দাঁত চেপে বললো,,,,

:-আপনি আগে থেকেই জানতেন সবটা? কবে থেকে জানতেন?

আদিত্য চোখ ফোনের দিকে রেখেই আলগোছে জবাব দিলো,,

:-কি বিষয়ে?

মৌমিতা ফোঁস করে দম ছাড়লো। আদিত্য কেনো এমন
হেঁয়ালি করছে! জিহ্বা দ্বারা ঠোঁট ভিজিয়ে ফের বললো,,,

:- আপনি জানতেন আমিই আপনার মানতে না চাওয়া নামমাত্র স্ত্রী মেয়েটা। আপনি তো আমাকে ডিভোর্স দিতে চাইছিলেন। অফিসের প্রথমদিন লয়ার এর সাথে কথাও বলেছিলেন! তাহলে আজ এসব নাটক করলেন কেনো? দুদিন পর তো ঠিকই ডিভোর্স দিবেন।

:-তোমাকে কে বলেছে আমি দুদিন পর ডিভোর্স দেবো?

:-আপনি বলেছেন!

:-আমি বলিনি। মিথ্যা কেনো বলছো মৌমিতা? আমি তোমাকে কখন গিয়ে বললাম যে দুদিন পর তোমাকে ডিভোর্স দিবো? বরং তার উল্টো! আমি আজীবনেও তোমাকে ডিভোর্স দিবো না।

প্রচন্ড রাগে দুচোখ ভরে এলো মৌমিতার। গাল বেয়ে দু ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো মুক্তের ন্যায়। বা হাতের উল্টো পাঠে তা মুছেও নিলো তাৎক্ষণাক। ঢোক গিলে বললো,,

:-আমাকে কি আপনার খেলার পুতুল মনে হয় স্যার? আপনার মা আমাদের বিয়েটা আপনার অমতে দিয়েছিলেন। এখানে আমার কি দোষ ছিলো বলবেন একটু? আমার তো কোন অভিভাবক ছিলো না। আশ্রমের মালিক হিসেবে আপনার মা-বাবা’ই আমাদের আশ্রমের সব এতিম ছেলেমেয়েদের অভিভাবক। আপনার মা যখন আমাকে তার ছেলের বউ করার প্রস্তাব রেখেছিলেন মাদারের কাছে তখন সেটাই আপত্তি জানানোর মতো অবস্থা, যোগ্যতা,সাহস কোনটাই আমার ছিলো না।
কিন্তু আপনার তো আমার মতো কোন বাধ্যবাধকতা ছিলো না। আমি জানি না কিভাবে আপনার পরিবার আপনাকে বিয়ের জন্য রাজি করিয়েছিলো। তাহলে আপনি কেনো করেছিলেন বিয়েটা?
আর করলেনই যখন তাহলে ফেলে পালালেন কেনো? একটা বার আমার মুখটা পর্যন্ত দেখেননি। কেনো? কেনো বঞ্চিত করেছিলেন আমাকে আমার স্বপ্নগুলো থেকে? পাঁচটা বছর আপনার আত্মীয়-স্বজন থেকে কত কটু কথা শুনতে হয়েছে সেসব কিছুই জানার চেষ্টা করেছেন কখনো? আপনার কখনো কি মনে হয়নি আপনি একটা অসহায়,এতিম মেয়ের ওপর অন্যায় করছেন! আপনি……..

মৌমিতা আর কিছুই বলতে পারলো না। ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো। কথাগুলো গলায় আঁটকে গেলো তার। এতো দিনের জমানো রাগ, ক্ষোভ,অভিমান উগলে দিতে চাইলো যেন!

আদিত্য তাকালো মৌমিতার ক্রোন্দনরত আদলে। ফোন রেখে উঠে দাঁড়ালো। পাশের টেবিলের ওপর থেকে পানির গ্লাস হাতে নিয়ে এগিয়ে এলো মৌমিতার দিকে। পানির গ্লাস টা মৌমিতার দিকে বাড়িয়ে দিতেই তা বিনা বাক্যব্যয়ে গ্রহণ করলো মৌমিতা। ঢকঢক করে পুরোটা গলার্ধকরণ করলো। গ্লাসটা খালি হতেই আদিত্য তা আবার টেবিলের ওপর রাখলো নিজ দায়িত্বে। ফের ফিরে এলো মৌমিতার মুখোমুখি।

মৌমিতার কান্নারত মুখশ্রী দু হাতের আদলে তুলে ধরে তাকালো একে অপরের চোখের দিকে। একজনের চোখে বিষ্ময়কর দৃষ্টি তো আরেকজনের চোখে ঝরে পড়ছে মুগ্ধতা।

মৌমিতার কান্না ভেজা চোখের পাঁপড়িগুলো লেপ্টে আছে একটার সাথে আরেকটা। অপরুপ লাগছে তার লাল হয়ে যাওয়া নাকের ডগা। কান্নার তোড়ে গোলাপী ঠোঁট জোড়া কাঁপছে তিরতির করে।
আদিত্য সময় নিয়ে দেখলো বউয়ের সেই অপরুপ সৌন্দর্য্যে ভরপুর মুখখানা।
সাহসা মৌমিতার অশ্রুসিক্ত ডান চোখের ওপর নিজ অধর জোড়া চেপে ধরলো।

আদিত্যর অনাকাঙ্ক্ষিত ছোঁয়ায় কেঁপে উঠলো মৌমিতা। কান্না ভুলে চোখ বড়বড় করে তাকালো আদিত্যর মুখপানে!
মুখ খুলে কিছু বলতে চাইলে অধরে আঙ্গুল চেপে ধরলো আদিত্য।

:-শশশ! একটাও কথা নয়! আগে আমার কথা শুনবে তুমি! যা যা বলবো মনযোগ দিয়ে শুনবে। একটাও কথা বলবে না ওকে!!

মৌমিতা চুপ করতেই আদিত্য তাকে টেনে বিছানায় বসালো। নিজে মৌমিতার পায়ের কাছে হাঁটু মুড়ে বসলো। মৌমিতার দুহাত নিজ হাতের মুঠোয় নিয়ে নরম সুরে বললো,,,

:- আমি জানি মৌমি! তোমার কাছে ক্ষমা চাওয়ার মুখ নেই আমার। তবুও চাইবো তুমি আমাকে ক্ষমা করো!
কিন্তু আমার দিকটাও তুমি একবার ভেবে দেখো তো! যখন আমাদের বিয়ে হলো,তার আগেও আমি কানাডাতেই থাকতাম। আমার পড়াশোনা সেখানেই। পড়াশোনা শেষ করে যখন মাত্রই নিজের ক্যারিয়ারে ফোকাস করেছি এমন সময় আমার সম্পূর্ণ অ্যাফোর্ড যেখানে ক্যারিয়ারের দিকে দেয়ার কথা ছিলো, কিন্তু বাংলাদেশ থেকে বাবা ফোন করে বললো মা নাকি ভীষণ অসুস্থ!
সেদিন আমার ক্যারিয়ারের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ দিন ছিলো। আমার জীবনের সমস্ত সেভিংস একটা বড় কোম্পানিতে পার্টনারশিপের জন্য ইনভেস্টমেন্ট করেছিলাম। ঠিক সেই সময় মায়ের অসুস্থতার খবর শুনে সবকিছু ছেড়েছুড়ে চলে এসেছিলাম দেশে।
আর বাড়ি ফিরে কি দেখেছিলাম জানো? কিছুই হয়নি মায়ের। বরং তারা আমার বিয়ে ঠিক করেছিলো, এক অজানা অচেনা মেয়ের সাথে। মেয়েটা কে,তার পরিচয় কি,তার বাবা মা আছে নাকি নেই, এসবের কিছুই তখন আমার জানা নেই। বাড়িতে ঢুকতেই বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দেয়া হলো!
আমি বোঝানোর চেষ্টা করলাম, মা কে বললাম। বাবা কে জানালাম যে কানাডায় আমার জীবনের কতটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আমি ফেলে এসেছি। তার ওপরেই আমার সমস্ত ক্যারিয়ার ডিপেন্ড করে আছে। কিন্তু তারা কেউ আমার কথার গুরুত্ব দেয়নি সেদিন। মা বাচ্চাদের মতো জেদ করে ইমোশনাল ব্লাকমেইল করে আমাকে বিয়েটা করতে বাধ্য করেছিলো।
মায়ের ওই একটা ভুল,একটা বোকামির কারনে আমার তিলতিল করে গোড়ে তোলা সকল মেহনত এক নিমিষেই শেষ হয়ে গেছিলো।
তুমি ভাবতে পারছো মৌমি তখন আমার অবস্থা কেমন ছিলো?
এমন নয় যে,আমি বাবা মায়ের ইচ্ছেই তাদের পছন্দ করা মেয়েকে বিয়ে করতাম না,আমি শুধু হাতজোড় করে তাদের কাছে কয়েকমাস সময় চেয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে সেটাও দেয়া হয়নি। আর এই সম্পর্কের কারনে আমার জীবন যে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হলো তার জন্য আমার সমস্ত রাগ ক্ষোভ গিয়ে পড়েছিলো সেই মেয়েটার ওপর,যার সাথে আমার বিয়ে দেয়া হয়েছিলো। তার মুখটা পর্যন্ত আমার দেখার ইচ্ছে হয়নি। সেই সময় আমার মনকে আমার ক্রোধ নিয়ন্ত্রন করছিলো। তাই তো ঘরে বিয়ে করা নতুন বউকে না দেখে তার বিষয়ে কোনকিছু না জেনেই সেই রাতেই ফিরে গেছিলাম কানাডায়। ভেবেছিলাম মেয়েটা যখন বাবা-মায়ের কাছে আমার ক্যারিয়ারের থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ তাহলে থাকুক ওই মেয়েকে নিয়ে। আমি আর দেশেই ফিরবো না।
সেদিন কানাডায় ফিরে গিয়েও আমার কাঙ্খিত কোন লাভ হয়নি। সেই কোম্পানি অন্য একজনকে পার্টনারশিপে হায়ার করে নিয়েছিল। প্রটোকল অনুযায়ী তারা আমার ইনভেস্টমেন্ট এর অর্ধেক অর্থ রিটার্ন প্রেমেন্ট করেছিলো। কিন্তু ফিরে পাওয়া অর্থে আমার আবার নতুন করে কিছু করার জন্য যথেষ্ট ছিলো না। তবুও আমি ভেঙে না পড়ে নতুন করে শুরু করেছিলাম।
দেড় বছর,দেড় বছর কঠোর পরিশ্রমের পর আমি আবার সমপরিমাণ অর্থ উপার্জন করতে সক্ষম হয়েছিলাম‌। তারপর নিজের মেধা, পরিশ্রম, ধৈর্য আর সংযম দিয়ে নিজের এম্পায়ার দাঁড় করিয়েছি। এতেই প্রায় সাড়ে চার বছর পার হয়ে গেছে।
হ্যাঁ আমি স্বীকার করছি এই সাড়ে চার বছরে আমি একটা বারও সেই ফেলে আসা মেয়েটার কথা চিন্তাও করিনি। ফুরসতই পাইনি।
কিন্তু সবকিছু উল্টাপাল্টা হয়ে গেলো একদিন। একটা বড় কনসার্টের ইনভিটিশনে সেবার আয়াত কানাডায় গিয়েছিলো। কনসার্ট শেষ হলে আয়াত আমার এপার্টমেন্টে এসেছিল দেখা করতে। তখনই আমি সবকিছু জানতে পারি যে,যে মেয়েটার সাথে আমার বিয়ে দেয়া হয়েছিলো,সে একচুয়ালি আমার দাদুর এতিমখানায় বড় হওয়া অনাথ একটা মেয়ে। মেয়েটা আমাদের বাড়িতে আমার স্ত্রীর পরিচয়ে আছে, লেখাপড়া করছে ব্যাস এইটুকুই জানতে পেরেছিলাম।
তখনও তার নাম,সে দেখতে কেমন কিছুই জানা ছিলো না আমার‌।

আয়াত দেশে ফিরে গেলে তারও প্রায় ছয় মাস পর বাড়িতে আমার যোগাযোগ হলো। আয়াতের থেকেই আমার ফোন নম্বর নিয়েছিলো মা। পাঁচটা বছর পর মায়ের গলা শুনতে পেয়ে আমারও বুকটা তখন মরুভূমির ন্যায় মনে হয়েছিলো। কিন্তু পুরনো অভিমান আমাকে বার বার বাধা দিচ্ছিলো দেশে ফিরতে।
তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম দেশে ফিরেই মেয়েটাকে ডিভোর্স দেবো। যার সাথে আমার কখনো কথা হয়নি,দেখা হয়নি, আমার মতো তার মনেও নিশ্চয় এই সম্পর্ক নিয়ে,আমাকে নিয়ে কোন প্রকার অনুভূতি তৈরি হয়নি! তা ছাড়া মেয়েটা এতো দিনে লেখাপড়া করে ঠিক নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে‌।
এটা ভেবেই এক প্রকার নিশ্চিত হয়েই দেশে ফিরেছিলাম আমি। মা কে শর্ত দিয়েছিলাম যতদিন আমাদের ডিভোর্স না হয়ে যায়,যেন মেয়েটাকে অন্য কোথাও থাকার ব্যবস্থা করে।
কারন আমার মনে হয়েছিলো,আমাকে দেখে মেয়েটার মনে আশা জাগাতে পারে,তাকে কোনরকম সুযোগ দিতে চাইছিলাম না আমি। এই কারনেই তাকে বাড়ি থেকে বের করার পর আমি বাড়িতে ফিরেছিলাম।
বাড়িতে ফিরে জানতে পারলাম এই পাঁচটা বছর মেয়েটা আমার রুমে কাটিয়েছে। এটা শুনে সেই রুমেও আমি থাকিনি,শেষে না আবার মেয়েটার উপস্থিতি,তার শরীরের মেহেক আমাকে আমার সিদ্ধান্ত নিতে হীনমন্যতায় ভোগায় সেই ভয়ে!

এরপর যখন আমি আমাদের আর কে বিউটি এন্ড ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে এজ এ এমডি হিসেবে জয়েন করলাম। আমাকেই আমার পিএ চুজ করে নেয়ার কথা বলা হলো। দশ বারো টা সিভি দেখার পর যেই মেয়েটার ছবিতে আমার নজর আটকেছিলো সেটা তুমি ছিলে মৌমি।
তোমার ছবিটায় আমি তোমাকে দেখে এতোটাই মুগ্ধ হয়েছিলাম যে আগপাছ না ভেবে তোমাকেই হায়ার করতে নির্দেশ দিয়েছিলাম। এর পরদিন তোমাকে সরাসরি দেখতে পেলাম।
সেদিন প্রথম দেখাতেই তোমার থমকে যাওয়া মুখটা দেখে আমি এতোটা আসক্ত হয়ে গেছিলাম তুমি ভাবতে পারবে না।
তোমাকে প্রথম দেখেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমার নাম মাত্র স্ত্রী মেয়েটাকে ডিভোর্স দিয়েই তোমাকে আমার মনের কথা জানিয়ে দিবো। আমার জীবনে তোমাকে নিয়ে আসবো।
আমি স্বীকার করছি মৌমি,তখন এই চিন্তাটুকু এই অনুভূতি টুকুর জন্য আমার একটুও অনুশোচনা কাজ করেনি। একটা বারও মনে হয়নি সেই মেয়েটার সাথে হয়তো অন্যায় করা হচ্ছে। আমার তার সাথে দেখা করে সামনাসামনি কথা বলা উচিত।
কিন্তু আমার সব অনুভূতি,সব সিদ্ধান্ত এক নিমিষেই মিথ্যা প্রমাণিত হলো সেদিন,যেদিন অফিসে এডভোকেট কামরুল আহসান এসেছিলেন। সেদিন হয়তো তুমি কেবিনের বাইরে থেকে ভেতরের সব কথা শুনেছিলে। ওইদিন এডভোকেট আহসান চলে যাওয়ার পর পরই তুমি কেমন অস্বাভাবিক আচরণ করছিলে, তোমাকে ভালো লাগতো, পছন্দ করতাম আমি‌। তাই তোমার সব আচরণের সাথে আমি পরিচিত ছিলাম‌। তোমার সেদিন ওরকম অস্বাভাবিক আচরণ দেখে অবাক হয়েছিলাম। তোমার খোঁজ নিতাম,তার আগেই আয়াত এসেছিলো অফিসে আমার সাথে দেখা করতে। অফিসে ঢোকার আগে ও তোমাকে দেখেছিলো অফিস থেকে বেরোতে। মেবি তুমি কেঁদেছিলে। আয়াত তোমাকে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে যেতে দেখে ভেবেছিলো হয়তো আমি তোমাকে জেনে বুঝে ডেকে কষ্ট দিয়েছি। তাই আমাকে অনেক কথা শুনিয়ে ছিলো। বিশ্বাস করো মৌমিতা! আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেছিলো,যখন আমি জানতে পারলাম যাকে আমি প্রথম দেখাতেই ভালোবেসে ফেলেছি,ত্রিশ বছরে প্রথম যাকে ঘিরে আমার মনে অনুভূতি তৈরি হয়েছিলো,সেই মেয়েটাই আমার না দেখা স্ত্রী।
তুমিই আমার পাচ বছর আগে বিয়ে করা বউ এটা জেনে প্রচন্ড খুশি হওয়ার সাথে সাথে ভীষণ ভয়ও পেয়েছিলাম। তুমি হয়তো আমাকে ভুল বুঝবে সেটা ভেবে। ওইদিনের পর প্রতি রাতে আমি আমার পুরনো ঘরে কাটিয়েছি ‌। সে ঘরে প্রত্যেকটা জিনিসে ছুঁয়ে ছুঁয়ে তোমাকে অনুভব করার চেষ্টা করেছি। তোমার ব্যবহৃত বিছানায় তোমার শরীরের গন্ধ অনুভব করতে চেয়েছি, যেখানে গোটা তোমারই থাকার কথা ছিলো ‌। যেখানে তোমার সবথেকে বেশি অধিকার ছিলো।

আমি ভুল ছিলাম মৌমিতা! আমার প্রতি সেই মেয়েটার মনে অনুভূতি ছিলো। একটু না,অনেক বেশি ছিলো। সে আমাকে সরাসরি না হলেও ছবি দেখে চিনতো। সে জানতো সেই শেহজাদ আদিত্য চৌধুরীর স্ত্রী। তার চোখে আমার সাথে সংসার করার স্বপ্ন ছিলো। আমি ভুল করেছি মৌমিতা। আমার তোমার সাথে কথা বলা উচিত ছিলো। আমার তোমাকে দেখা উচিত ছিলো। তাহলে এসব কিছু হতোই না। পাঁচটা বছর আমাদের জীবন থেকে অবহেলায় হারিয়ে যেতো না। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও মৌমিতা। কিন্তু প্লিজ আমাকে ছেড়ে চলে যেওনা। প্লিজ! ভালোবাসি আমি তোমাকে। আমিতো সকল ভুল স্বীকার করে #ফিরেছি_তোমার_আঙ্গিনায়। প্লিজ আমাকে ফিরিয়ে দিও না মৌমিতা। আর তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না আমি‌।

হিচকি তুলে কাঁদছে মৌমিতা। আদিত্য অসহায়ের মতো চেয়ে আছে তার মুখ পানে। না পেরে ফ্লোর ছেড়ে উঠে মৌমিতার পাশে গিয়ে বসলো। দুহাতে মৌমিতাকে টেনে বুকে জড়িয়ে ধরলো আদিত্য। বুকের মাঝে লেপ্টে থেকেই ফুলে ফুলে কাঁদছে মৌমিতা। কিছুক্ষণ পর আদিত্য তাকে জড়িয়ে ধরেছে বোধগম্য হতেই দুহাতে ঠেলে সরিয়ে দিলো আদিত্য কে।
বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। নাক টেনে বললো,,,

:- আমাকে ছুঁবেন না আপনি। পাঁচ বছর পর আজকে আসছেন সবকিছু ক্লিয়ার করতে! এই পাঁচটা বছর আমাকে কি কি সহ্য করতে হয়েছে তার কোন ধারণা আছে আপনার? আসছেন নিজেকে নির্দোষ দাবি করতে! আপনি একটা ফাজিল,বদ লোক । এতো সহজে আমি আপনাকে ক্ষমা করবো না। থাকবো না আমি আপনার সাথে। আমাকে ডিভোর্স দিতে এসেছিলেন না? এবার আমিই দিবো আপনাকে ডিভোর্স। থাকুন আপনি আপনার নির্দোষ ভাবনা নিয়ে।

মৌমিতা ঘর থেকে বেরোতে নিলে আদিত্য দ্রুত এগিয়ে গিয়ে দরজা লক করে দিলো। মৌমিতা অবাক নয়নে তাকাতেই ফের আবদ্ধ হলো আদিত্যর বাহুডোরে।
মৌমিতার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের সাথে চেপে ধরলো আদিত্য। মৌমিতা ছটফটিয়ে নিজেকে ছাড়াতে লাগলো। তা দেখে আদিত্য ফিচেল হেসে বলল,,,

:- সিরিয়াসলি মৌমি! তোমার মনে হয় এই এক রত্তি শরীর নিয়ে তুমি আমার থেকে নিজেকে ছাড়াতে পারবে?

মৌমিতা সত্যিই হাল ছেড়ে দিয়ে নাকমুখ ফুলিয়ে বললো,,,

:-ছাড়ুন বলছি! এভাবে চেপে ধরে আমাকে আটকাবেন ভাবছেন? থাকবো না আমি। ছাড়ুন বলছি আমাকে।

আদিত্য শব্দ করে হেসে উঠলো মৌমিতার কথায়। এক হাতে মৌমিতার মুখটা উঁচু করে তুলে ধরে বললো,,,

:-এখান থেকে এক পা এগিয়ে দেখাও দেখি তোমার কত সাহস! পা ভেঙ্গে রেখে দিবো। চুপচাপ লক্ষি বউয়ের মতো আমার কথা শুনবে। হোস্টেলে আর ফিরছো না তুই। কাল সকালে ড্রাইভার গিয়ে তোমার সব জামাকাপড়, বইপত্র নিয়ে আসবে। নোরা সবকিছু গুছিয়ে রাখবে। এখন থেকে এই বাড়িতে,আমার সাথে,আমার ঘরেই থাকবে তুমি।

মৌমিতা চোখ রাঙিয়ে তাকালো আদিত্যর দিকে।

:- বললেই হলো? মামা বাড়ির আবদার নাকি! আপনি বললেই আমাকে শুনতে হবে?

:-সে কি তুমি জানো না! স্বামীর প্রত্যেকটা আদেশ পালন করা স্ত্রীর জন্য ফরজ! তারওপর তোমার বস আমি। আমার স্ত্রী এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট দুদিক থেকেই আমার সবকথা শুনতে,পালন করতে তুমি বাধ্য ম্যাডাম! ইনকার করার সুযোগ নেই।

:- তারমানে আপনি এখন আমাকে বস হওয়ার ধামকি দিবেন? করবো না আপনার চাকরি,এই মুহূর্তে আমি রিজাইন করলাম। আর এখান থেকে গিয়ে বাকি, ডিভোর্সটাও দিয়ে দিবো!

:-আচ্ছা!! আমার জানা মতে তুমি চাকরিতে জয়েন করার সময় একটা এগ্রিমেন্ট পেপারে সাইন করেছিলে!
নিশ্চয় মনে আছে!

:–হ্যা তো!

:- তো পেপারে সাইন করার আগে একবার পড়ে দেখেছিলে? সেখানে স্পষ্ট লেখা ছিলো,দু বছরের মধ্যে স্ট্রং কোন কারণ ছাড়া যদি তুমি চাকরি ছেড়ে যাও,তাহলে তোমার স্যালারি অনুযায়ী এক বছরের সমান অ্যামাউন্ট তোমাকে কোম্পানি কে পেনাল্টি দিতে হবে।

আদিত্যর কথায় চোখ বড় বড় করে তাকালো মৌমিতা। এরকম কোন শর্ত পেপারে ছিলো বলে তো জানা ছিলো না তার। সে তো সম্পূর্ণ পড়ে তবেই সাইন করেছিলো। তাহলে একথা বলছে কেনো আদিত্য!

আদিত্য মৌমিতার ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাওয়া মুখটা দেখে বাঁকা হেসে বলল,,,

:- ঠিকই ভাবছো! এরকম কোন শর্ত পেপারে ছিলো না, কিন্তু শর্তটা আমি এড করবো! তাও এমন ভাবে যে সেটা আসল পেপার নাকি নকল কারো বোঝা অসম্ভব হবে‌।

মৌমিতা জানে আদিত্যর দ্বারা এটা করা কঠিন কিছু না। তাকে আটকাতে যে আদিত্য এমন কিছু করতেই পারে তাতে কোন ডাউট করতে পারছে না মৌমিতা।
তবুও নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বললো,,,

:-আপনি যা ইচ্ছা করুন। আমি থাকবো না আপনার সাথে। এই বাড়ি থেকে যেতে না পারলেও এই ঘর থেকে তো যেতে পারবো। আমি আমার ব্যাবহৃত রুমেই থাকবো। আপনার সাথে একরুমে থাকবো না আমি।

মৌমিতা অন্তত বাড়িতে যে থাকতে রাজি হয়েছে সেটা শুনেই আদিত্য ছেড়ে দিলো মৌমিতা কে। আদিত্যর থেকে ছাড়া পেতেই এক দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো মৌমিতা। পেছনে আদিত্যর খিলখিল করে হাসির শব্দ শুনতে পেলো সে‌। দ্রুত নিজের ঘরে গিয়ে দরজা আটকে দিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলো মৌমিতা। এতক্ষণ আদিত্যর আলিঙ্গনে দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিলো তার। জীবনে প্রথম প্রণয় পুরুষের ছোঁয়ায় অদ্ভুত অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়ে ছিলো মেয়েটা।

জোরে জোরে নিশ্বাস নিয়ে নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে পেছনে ঘুরে তাকাতেই চমকে উঠলো মৌমিতা। বিছানার ওপর বসে আছে নোরা। নোরার বিষ্ময়কর দৃষ্টি তার দিকেই নিবদ্ধ।

নোরা হাঁ করে তাকিয়ে আছে মৌমিতার দিকে। সেই যে হাঙ্গামার পর মৌমিতা আদিত্যর সাথে কথা বলতে গেলো! আর এখন হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরে আসা দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো মৌমিতার দিকে। কি হলো এর মাঝে!

নোরা মৌমিতা কে বসিয়ে দিলো পাশে। বললো,,

:- কি কথা হলো তোর বরের সাথে? কি বললেন উনি?

মৌমিতা ঢোক গিলে আস্তে আস্তে সবটা বললো নোরা কে। সবটা শুনে খুশি হওয়ার সাথে রাগ আর মন খারাপও হলো মেয়েটার। মৌমিতা তার ভালোবাসা, স্বামী,সংসার ফিরে পাবে জেনে খুশি হলো তো,এবার থেকে তাকে মৌমিতা কে ছাড়া একা থাকতে হবে ভেবে মন খারাপ হলো। তবে কিছু বললো না নোরা। মৌমিতা কে একপাশ থেকে জড়িয়ে ধরে বসে রইলো কিছুক্ষণ।

#চলবে
#হ্যাপি_রিডিং 🤗

#ফিরেছি_তোর_আঙ্গিনায়
পর্ব,,,১৬
মৌমো তিতলী

পরিবেশ স্বাভাবিক। আশিকুঞ্জের প্রত্যেক সদস্যের চোখে মুখে খুশি উপচে পড়ছে। বিশেষ করে আশালতা বেগমের। তার ছেলেটার যে সুবুদ্ধি উদয় হয়েছে তাতেই তিনি খুশি। তার ছেলেটার এবার একটা সুখের সংসার হবে। এতো দিনে অনাথ মেয়েটা তার স্বামীর ঘর পাবে। আর কি চাই!
সবকিছু স্বাভাবিক পর্যায়ে আসলে আদিত্য তার পুরো পরিবারের সাথে লনে এসে হাজির হয়। সেখানে গেস্টরা আগেই উপস্থিত ছিলো। মিষ্টি সুরে সফট মিউজিক চলছে। গেস্টরা মিউজিকের তালে তালে পার্টি এনজয় করেছে। সবার হাতেই শোভা পাচ্ছে লাল, নীল, হলুদ, সবুজ হরেক রকমের বাহারি সফট ড্রিংকসের গ্লাস। এতক্ষনে বাড়ির ভেতরে ঘটে যাওয়া ঘটনার কিছুই আঁচ পায়নি তারা।

আদিত্য মাইক্রোফোন হাতে স্টেজে উঠে এলো। টুকটুক করে শব্দ তুলে গেস্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। একটু লেইটে অনুষ্ঠান শুরু করার জন্য সরি বললো সবাইকে ‌ তারপর ধন্যবাদ জানিয়ে কেক কাটার ঘোষণা দিলো

করতালিতে মুখরিত হলো চারপাশ। পরবর্তি অনুষ্ঠান নিরাপদে শান্তিপূর্ণ ভাবে শেষ করলো আদিত্য। এই মুহূর্তে তার সাথে মৌমিতার বিবাহিত সম্পর্কের কথা প্রকাশ্যে ঘোষিত করলো না। অবশ্য মৌমিতার অনুরোধেই বিষয়টা গোপন রাখলো আদিত্য।

অনুষ্ঠান শেষে অতিথিরা ডিনার সেরে একে একে প্রস্থান করতে শুরু করেছে। নোরা মৌমিতার কাছে এগিয়ে এলো। তারও ফিরে যাওয়ার সময় হয়েছে। এসেছিলো মৌমিতার হাত ধরে কিন্তু যা পরিস্থিতি তাতে মৌমিতার যে আর হোস্টেলে ফেরা হবে না তা ঢের বুঝতে পারছে সে।
মৌমিতার থেকে তাই বিদায় নিতে এগিয়ে এলো নোরা।

–দোস্ত আমাকে এবার যেতে হবে। চিন্তা করিস না। আমি তোর জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখবো‌। তোর তো আর ফেরা হবে না হোস্টেলে।

মৌমিতা বাঁধ সাধলো নোরার ফিরে যাওয়ার কথা শুনে। এতো রাতে সে কিছুতেই যেতে দিবে না তাকে। আশালতা বেগমও এগিয়ে এলেন। নোরা কে আজকের রাতটা থাকার জন্য বিশেষ ভাবে অনুরোধ করলেন।
প্রিয় বান্ধবীর মুখের দিকে তাকিয়ে তাই নোরাও রাজি হলো বাকি রাতটুকু আশাকুঞ্জে কাটানোর জন্য।

গেস্ট আর মিডিয়ার প্রস্থান হতেই আয়াত এগিয়ে এলো নোরার দিকে। এতোক্ষণ ছেলেটা মিডিয়া আর পাপারাজ্জিদের কারনে কথা বলতে পারেনি মেয়েটার সাথে। নোরা যে মৌমিতার ফ্রেন্ড সেটাও আয়াত আজই জানতে পারলো। নয়তো নোরা কে মৌমিতার সাথে এখানে দেখে বেশ অবাকই হয়েছিলো আয়াত।

আয়াতকে তার দিকে আসতে দেখে নড়েচড়ে দাঁড়ালো নোরা। মুখে তার অকৃত্রিম হাসি লেপ্টে।

–কেমন আছেন মিস?

–ভালো আছি আলহামদুলিল্লাহ। আপনি কেমন আছেন?

–দেখতেই পারছেন বেশি ভালো আছি। আপনি মৌমিতা ভাবির ফ্রেন্ড জানতাম না। এখানে আপনাকে দেখতে পাবো ভাবতেই পারিনি। আয়াতের কথায় হালকা হাসলো নোরা।
সুইমিং পুলের পানিতে পা ডুবিয়ে পাশাপাশি বসে আয়াত আর নোরা। দুজনে বেশ টুকটাক গল্পে সময়টা জমিয়ে ফেললো। আয়াতের প্রাণবন্ত হাসি,কথা বলার ভঙ্গি সবকিছু নিয়ন আলোর সোনালী আভায় প্রত্যক্ষ করছিলো নোরা। তার স্বপ্নের পুরুষটা যে কোনদিন এভাবে নিঝুম রাতে খোলা আকাশের নিচে তার সাথে বসে গল্প করবে তা সে কখনো কল্পনাও করেনি। সময় আর ভাগ্যে মানুষের জীবন কোথা থেকে কোথায় নিয়ে যায় আসলে কেউ বলতে পারে না। একটা সময় ছিলো যখন,সোশ্যাল মিডিয়ায় আয়াতের কনসার্ট আর ফেসবুক আইডি থেকে আয়াতের ছবি দেখেই কল্প পুরুষ টাকে নিয়ে স্বপ্নে বিভোর থাকতো সে‌। সবসময় চাইতো, কোন একদিন সে আয়াতের সাথে দেখা অবশ্যই করবে। আর আজ দেখো! ভাগ্য তার স্বপ্ন কে,তার কল্প পুরুষ কে কত কাছে এনে দিয়েছে।
আয়াত যে এতোটা প্রাণবন্ত আর খোলা মনের মানুষ তা এতো দিন জানতো না সে।
মুগ্ধ চোখে দেখছে সে বিখ্যাত গায়ক আয়াত মাহমুদ কে।

____________

দীর্ঘ কয়েক মাস পর নিজের বরাদ্দকৃত ঘরটায় পা রাখলো মৌমিতা। বিছানা,বালিশ, ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা জিনিসগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখলো মৌমিতা। ঠিক যেভাবে রেখে গেছিলো সে, সবটা সেভাবেই আছে। বেড সাইডে দেওয়ালে ঝুলতে থাকা আদিত্যর ছবিটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ভাবলো মনে মনে…

–কেনো করছেন আপনি এসব? এসেছিলেন তো আমাদের মধ্যকার সম্পর্কের সুতো টা ছিঁড়ে ফেলতে। তাহলে এখন কেনো এমন করছেন বলুন না! আদিত্য কি করতে চাইছে সেই ভাবনায় মৌন হয়ে রইলো মৌমিতা।
দরজার ঠকঠক নক করার শব্দে ধ্যান ভঙ্গ হলো মেয়েটার। ত্রয় পায়ে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলতেই আশালতা বেগমের হাসিমুখ টা দৃষ্টিগোচর হলো। খাবারের ট্রে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। মৌমিতার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসলেন। ভেতরে ঢুকে বিছানার এক কোনে খাবারের প্লেটটা নামিয়ে রাখলেন। মৌমিতার হাত ধরে পাশে বসিয়ে দিয়ে খেতে ইশারা করলেন তিনি।
মৌমিতা এতক্ষণ চুপচাপ শাশুড়ির কান্ড দেখছিলো। আশালতা বেগম যে তার জন্য খাবার নিয়ে এসেছে বুঝে বুকের মধ্যে মুচড়ে উঠলো। কতদিন পর মায়ের এই ভালোবাসাটুকু অনুভব করলো মৌমিতা। আগেও যখন সে এবাড়িতে ছিলো,রাতে পড়াশোনা করতে খেতে প্রায়ই লেইট হতো তার। তখনও আশালতা এভাবেই তাকে খাবার এনে দিতো ঘরে। মানুষ টা যে তাকে মায়ের স্নেহ দিয়ে পাঁচটা বছর বড় করেছেন তার আঁচলের নিচে রেখে। সুখের জোয়ারে আঁখি ভরে আসে মৌমিতার। তার মত একটা এতিম,অনাথ মেয়ের জীবনে আশালতা বেগমের মতো একজন মা দান করার জন্য মনে মনে আল্লাহকে শুকরিয়া জানায় সে।

মৌমিতাকে মৌন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাত ধরে টেনে বসিয়ে দিলেন তিনি। খেতে বললে মৌমিতা সুধায়..

–সবার খাওয়া হয়েছে মা?

আশালতা বেগম চেয়ার টেনে বসতে বসতে জানালেন সবাইকেই খেতে দেওয়া হয়েছে। নোরাকেও খাইয়ে দিয়েছেন। আজকের রাতটা গেস্ট রুমে থাকছে মেয়েটা । বাকিরাও যে যার মতো বিশ্রাম নিচ্ছে। বাকি শুধু আদিত্য।
আদিত্য এখনো অভুক্ত জেনে খাবারের দিকে বাড়ানো হাত থেমে গেলো মৌমিতার। শাশুড়ির দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালে তিনি জানান আয়াত কে ড্রপ করতে গেছে আদিত্য। কাল তার জরুরি কাজ আছে তাই থাকতে বললেও রাজি হয়নি ছেলেটা।

আদিত্যর কথা ভেবে দোনামোনা করেই খাওয়া শেষ করলো মৌমিতা। বেশিরভাগ খাবারই পড়ে রইলো প্লেটে। মৌমিতার মনের অবস্থা বুঝে খাওয়ার জন্য বেশি জোর করলেন না আশালতা বেগম। মৌমিতার খাওয়া হলে প্লেট গ্লাস গুছিয়ে ট্রে তুলে নিয়ে প্রস্থান করলেন তিনি। মৌমিতা ধীর পায়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালো। এখান থেকে সদর দরজাটা দৃশ্যমান। বাতি জ্বলছে সেথায়। দারোয়ান চেয়ারে বসে ঢুলছে।
মৃদু হাওয়া বইছে। মৌমিতা রেলিং ঠেস দিয়ে চোখ বন্ধ করে অনুভব করলো কিছুক্ষণ। আপাতত আর কিছু ভাবতে চাইছে না মন। ভবিতব্যে যা আছে তা সময়ের ওপর ছেড়ে দিলো সে।
ভাবনার মাঝেই গেট দিয়ে আদিত্যর গাড়ি ঢুকতে দেখলো মৌমিতা। আবছায়া ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সেদিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সে।

আদিত্য পার্কিং লটে গাড়ি পার্ক করে আঙ্গুলে চাবি ঘুরাতে ঘুরাতে বাসায় ঢুকলো। আশালতা বেগম ছেলেকে ফিরতে দেখে টেবিলে খাবার রেডি করলেন। আদিত্য ফ্রেশ হয়ে খেতে বসলো। আশালতা বেগম পাশেই দাঁড়িয়ে রইলে আদিত্য মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,,

:-তুমি খেয়েছো আম্মু?

আশালতা বেগম ছেলের মাথায় পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিয়ে জানালেন সবাই খেয়েছে। আদিত্য আড়চোখে ওপরে মৌমিতার রুমের দিকে তাকালে তা নজরে আসেন আশালতার। মুচকি হেসে বলেন,,

:-সেও খেয়েছে। চিন্তা করিস না। তারপর আবার উৎফুল্ল হয়ে বললেন,,

:-আমি ভীষণ খুশি হয়েছি বাবা। তুই মৌমিতা কে মেনে নিয়েছিস। আমার আর কিছুই চাই না। মেয়েটা একটু অভিমান করে আছে ঠিকই কিন্তু তাকে তুই ঠিক মানিয়ে নিবি আমি জানি।

মায়ের কথায় অপূর্ব ভঙ্গিতে হাসে আদিত্য। মাথা নেড়ে সায় দেয়। দ্রুত খাওয়া শেষ করে উঠে। দ্রুত পদক্ষেপে ওপরে চলে যায়। মাথায় চলছে তার নানা পরিকল্পনা। এই মুহূর্তে বউটাকে একটু জ্বালাতে না পারলে তার পেটের ভাত হজম হবে না।

মৌমিতা ড্রেসিং টেবিলের সামনে চুল আঁচড়ে বেণী করতে ব্যস্ত। পরনে মোলায়েম সুতির থ্রি পিস। ভাগ্যিস এবাড়িতে কিছু কাপড় সে রেখে গেছিলো। শাড়ি পাল্টে শান্তি পাচ্ছে এখন মেয়েটা।
হঠাৎ দরজা বন্ধ করার শব্দে চমকে উঠলো মৌমিতা। পেছনে তাকাতেই চোখ কপালে উঠলো তার। আদিত্য মৌমিতার দৃষ্টি উপেক্ষা করে বিছানায় গিয়ে ঢিপ করে টানটান হয়ে শুয়ে পড়লো।
আদিত্য কে তার ঘরে ঢুকে এভাবে বিছানায় শুয়ে পড়তে দেখে রেগে এগিয়ে এলো মৌমিতা…

:-এই আপনি এখানে এখানে কেনো এসেছেন? এই বিছানায় এসে শুয়েছেন কেনো? যান এখান থেকে,উঠুন!

মৌমিতার অগ্নাশর্মা মুর্তি দেখে উঠে বসলো আদিত্য। লম্বা হাই তুলে বললো,,,

:-এটা কি বলছো মৌমি, তোমার কি মেমোরি লস হয়েছে? চেয়ে দেখো এটা আমার ঘর! আর আমি এখানেই থাকবো। তুমিও আমার সাথেই এই ঘরে থাকবে।

মৌমিতা আদিত্যর কথার ছল ধরতে পেরে তেড়ে এলো আদিত্যর দিকে।

:-একদম ফালতু কথা বলবেন না। আমি বলেছি না থাকবো না আপনার সাথে !
এটা আপনার ঘর ছিলো,এখন নেই। দেশে ফিরেও আপনি এই ঘর ব্যবহার করেননি। যে ঘরটা ব্যবহার করেন সেখানে চলে যান। এই ঘরে আমি থাকতাম এতো দিন। তাই এখানে আমি থাকবো।

:-বেশ! তুমি আমার ঘরে থাকবে না মানলাম। কিন্তু আমি কোথায় থাকবো সেটা তো বলিনি। তো আমিও এখন থেকে এই ঘরেই থাকবো। যদিও কয়েকদিন ধরে শুধু রাতে আমি এঘরে থেকেছি, কিন্তু এখন থেকে পার্মানেন্টলি শিফট করবো ভাবছি।

–দেখুন স্যার আপনি কিন্তু এবার বাড়াবাড়ি করছেন। আমি কিন্তু চলে যাবো,থাকবো না এবা…..

মৌমিতার কথা শেষ না হতেই আদিত্য আচমকা মৌমিতার হাত ধরে টান দিতেই মৌমিতা সোজা গিয়ে পড়লো আদিত্যর বক্ষে। আদিত্য মৌমিতা কে দুহাতে জড়িয়ে ধরলো নিজের সাথে। এদিকে আদিত্যর থেকে ছাড়া পেতে হাত পা ছুটাছুটি করতে লাগলো মৌমিতা।

–দেখুন আপনি কিন্তু বেশি করছেন এবার। ছাড়ুন আমাকে! ভালো হবে না বলে দিচ্ছি। সব সময় আপনার মর্জি চলবে নাকি! মগের মুল্লুক পেয়েছেন! ছাড়ুন আমাকে!

আদিত্য মৌমিতার কোন কথায় গ্রাহ্য করলো না। ছটফটাতে থাকা মৌমিতাকে টেনে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে তার বুকে মাথা গুঁজে দিলো আদিত্য!

এদিকে আদিত্যর অভাবনীয় কাজে হতভম্ব হয়ে স্থির হয়ে গেল মৌমিতা। হৃদপিন্ড ধকধক করে উঠলো। এতক্ষণে বলা তার সমস্ত অভিযোগ পায়ে ঠেলে দিয়ে আদিত্য আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে তাকে। তার বুকের মাঝে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে আছে আদিত্য। হাত দুটো তার কোমরে বন্দি। পরম মুগ্ধতায় আদিত্যর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল মৌমিতা। আদিত্যর এমন বেপরোয়াভাবে দু’চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো অশ্রু ফোঁটা। জানে আদিত্য ইচ্ছে করে ঘুমের ভান ধরে আছে।

মৌমিতা হতাশ হয়ে আসা কন্ঠে অস্ফুট স্বরে বলল…

:-কেনো করছেন এমন? কেনো এভাবে আমাকে পুতুলের মতো নাচিয়ে একটু একটু করে নিঃশেষ করে দিচ্ছেন! আপনি আসলে কি চান বলুন তো?

ফট করে চোখ মেলে তাকালো আদিত্য! মৌমিতার ভেজা চোখের দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে নেশাক্ত কন্ঠ বলে,,,

:-আপাতত বউয়ের বুকে শান্তিতে ঘুমাতে চাই! এর চেয়ে বেশি কিছু জানতে চাইলে কিন্তু তোমারই বিপদ মৌমি। আমি কি চাই তার সবটা আমি প্রাকটিকালি বোঝাতে পারবো। ভেবে দেখো মৌমি!

আদিত্যর কথার ফাঁদ ধরতে পেরে চোখ গরম করে তাকালো মৌমিতা। আদিত্যর ঠোঁট জুড়ে তখন দুষ্টু হাসি লেপ্টে।
ফটাফট চোখ বন্ধ করলো আবার। মৌমিতা ঠোঁট গোল করে শ্বাস নিলো। এতো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে আদিত্য যে ঠিকমতো নড়াচড়া করাও কঠিন।
এই নাছোড়বান্দা পুরুষ যে তাকে আজ ছাড়বে না তা সে ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে। কিছুক্ষণ পরেই আদিত্যর গভীর শ্বাসে তার ঘুমের গভীরতা ঠাহর করতে পারলো সে। একদৃষ্টে কিছুক্ষণ দেখলো সেই জেদি পুরুষ টাকে। অহেতুক ছোটাছুটির চেষ্টা না করে দুচোখ বন্ধ করলো মৌমিতা। হাত দুটো তখন তার আদিত্যর চুলের ভাঁজে।

চলবে…..