মনের আড়ালে পর্ব-০২

0
1599

#মনের_আড়ালে
Part_2
লেখনীতে – #Nusrat_Hossain

ইশমি ঘুমাচ্ছিল ।ঘুমের মধ্যে হঠাৎ করে কেউ ধাক্কা দিকে তাকে ফ্লোরে ফেলে দিল ।ইশমি হুড়মুড়িয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠল ।আচমকা বিছানা থেকে ফ্লোরে পড়ায় সে কমোড়ে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব করল।সে ব্যথায় অস্ফুটভাবে কুঁকিয়ে উঠল ।বিছানায় হাত দিয়ে বর দিয়ে নিজেকে ফ্লোর থেকে উঠাল ।
— নবাবজাদীদের মত বিছানায় এভাবে পরে পরে ঘুমালে বাড়ির বাকি কাজগুলো করবে কে শুনি মুখপুড়ি কোথাকার চোখমুখ গরম করে কথাগুলো বলল হাফসা বেগম ।
ইশমি ছলছল চোখ নিয়ে মায়ের দিকে তাকাল ।কয়েক বছরের দাম্পত্য জীবনে হাফসা বেগম আর আয়নাল হোসেনের কোনো সন্তান হচ্ছিল না ।তারা সন্তান হওয়ার সব আশা ছেড়ে দিয়ে এতিমখানা থেকে দত্তক নিয়ে আসলো ছয় মাসের শিশুকন্যা ইশমিকে ।কিন্তু হায় !ভাগ্য সহায় হলো না ইশমির ।তারা ইশমিকে একবছর অনেক আদর যত্নে , ভালোবেসে মানুষ করে কিন্তু ইশমির কঠিন সময় তার এক বছর পরই শুরু হল ।হাফসা বেগম কন্সিভ করল ।হাফসা বেগম তখন নিজের সন্তান হওয়ার খুশিতে আত্নহারা ।নিজের সন্তান হওয়ার পর থেকেই তিনি ইশমিকে দূরে সরিয়ে দিলেন , পরিবারের বোঝা মনে করতে লাগলেন । সেই ছোট থেকে বাড়ির কাজগুলো তাকে দিয়ে করায় ।বুঝ হওয়ার পর থেকে ইশমি কোনোদিন মায়ের ভালোবাসা পায়নি ।মায়ের আদর স্নেহ কি সেটা সে জানে-ই না ।পেয়েছে শুধু অবহেলা , অনাদর আর খোঁটা উঠতে বসতে।হাফসা বেগম এবার রেগেমেগে চিৎকার করে বলল

—- এভাবে সাড়ের মত তাকিয়ে কি দেখছিস আমার দিকে চেয়ে ? গান্ডেপিন্ডে খালি গিলেই যাচ্ছিস দিনের পর দিন বাড়ির কাজগুলো কে করবে ?বাড়ির কাজ গুলো কি তুই করবি নাকি গাঢ়ধাক্কা দিয়ে বের করে দিব বাড়ি থেকে ।

মায়ের এভাবে চিল্লানোতে ইশমির শরীর কেঁপে উঠল ।সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল ক্ কি করতে হবে আমায় মা ?

হাফসা বেগম মুখ ভেঙ্গিয়ে বললেন এতক্ষণে বলে কি করতে হবে আমায় মা !কেন তোর কি কোনো কাজ চোখে পরছে না ।পরে পরে এভাবে ঘুমিয়ে থাকলে কাজ চোখে পরবে কিভাবে শুনি ?যা গিয়ে পুরো বাড়ি মুছে পরিষ্কার কর আগে ।আর শোন সরুম লাঠি দিয়ে মুছবি না , বসে সুন্দর করে মুছবি যাতে কোনো ময়লা না থাকে ।এখন যা সামনে থেকে ।

ইশমি চোখমুছে অস্ফুট সুরে বলল যাচ্ছি

ইশমি ধীর পায়ে হেঁটে পানি নিয়ে একটা একটা করে রুম মুছতে লাগল ।ইশমি কমোড়ে খুব বেশি-ই ব্যাথা পেয়েছে ।যার কারনে বসে বসে রুম মুছতেও তার খুব কষ্ট হচ্ছে ।ইশমি রুম মুছছিল তখনি জোড়ে কেউ চিৎকার করে বলে উঠল

— ইশমি এই ইশমি আমার খাবার টা দিয়ে যা ।আমার খুব খিদে পেয়েছে ।

ইশমি রুম মুছা রেখে খাবার প্লেটে গুছিয়ে নিয়ে ছোট বোন আহিবার রুমে নিয়ে গেল ।আহিবা তার দেড় বছরের ছোট ।মায়ের আদরের মেয়ে সে একদম মায়ের মত ।ইশমি আহিবাকে খাবার টা দিয়ে আবার বাড়ির সবকটা রুম মুছতে লেগে গেল ।দুপুর আড়াইটা বাজে প্রত্যেকে খাবার খেয়ে নিয়েছে তার এখনো খাওয়া হয়নি ।পুরো বাড়ি মুছে পরিষ্কার করে সে গোসল করে রান্নাঘরে গিয়ে খাবার বাড়তে লাগল তার জন্য ।খুব খুদা পেয়েছে ।বাড়ির প্রত্যেকে এখন ঘুম ভাত দিয়েছে ।খাবারের প্লেট নিয়ে নিজের রুমে গিয়ে বসে খাচ্ছিল ইশমি ।
আয়নাল হোসেন মেয়ের রুমে দরজার সামনে এসে দেখলেন মেয়ে খাবার খাচ্ছে ।একমনে তাকিয়ে রইল ইশমির মুখের দিকে ।তিনি ভাবতে লাগলেন কি মায়া এই চেহারাটায়।চেহারায় কোনো অহংকারের ক্লেশ নেই ।এই মেয়েটাকেই আঠারো বছর আগে এতিম খানা থেকে এনেছিল নিজের মেয়ের করে ।মেয়েটাকে প্রথম কোলে নেওয়ার সময় তার চোখ দিয়ে জল পরছিল ।তার ঘর পরিপূর্ন হয়ে গেল ইশমির কারনে ।কিন্তু ভাগ্য সহায় হলো না মেয়েটার ।সে আর তার স্ত্রী ইশমিকে নিয়ে আসার এক বছর পর-ই মাতৃসম্ভবা হয়ে গেল তার স্ত্রী ।মেয়েটা পরে রইল রুমের এক কোণায় ।এমনকি তার স্ত্রী নিজের মেয়ে জন্ম দেবার পর আবার ইশমিকে এতিমখানায় দিয়ে আসতে চেয়েছিল ।কিন্তু তিনি রাজি হননি ।স্ত্রীর সাথে অনেক জগড়াঝাটি করে ইশমিকে তার কাছে রেখে দিলেন ।কিন্তু প্রতিনিয়ত স্ত্রীর অত্যাচারের হাত থেকে মেয়েটাকে বাঁচাতে পারেন না ।সেই সামর্থ আর শক্তিটা যে তার আর এখন নেই ।স্ত্রীর কারনে মেয়েটার ভালো কোনো জায়গায় বিয়েও দিতে পারছেন না । তিনি চশমার আড়াল থেকে নিজের চোখের পানিটা মুছে ছোট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজার বাহির থেকে চলে গেলেন ।
_______________

রাত বাজে বারোটা । নাইট ক্লাবে অভিক তার বন্ধুদের সাথে বসে ড্রিংক করছে ।অভিক একের পর এক গ্লাস ড্রিংক করেই যাচ্ছে ।অভিক কে মাত্রাতিরিক্ত ড্রিংক করতে দেখে ওর বন্ধু মাহিম বলে উঠল

– অভিক ইয়ার আর ড্রিংক করিস না ।তোকে একদম ঠিক লাগছে না চল বাসায় ফিরে যাই ।

অভিক মাহিমের কথা অগ্রাহ করে মাতালকন্ঠে ড্রিংকের গ্লাস গোড়াতে গোড়াতে বলে উঠল আমার ইশমি চাই ।আমায় ইশমি এনে দে … অভিক বিরবির করে বলতেই থাকল ।

মাহিম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল কালকে সকালে দেখা করিস ওর সাথে ।এখন চল বাড়ি ফিরে যাই অনেক রাত হয়েছে ।

অভিক মাহিমের কথা পাত্তা দিল না ।সে তার ঘোলা ঘোলা চোখ দিয়ে দেখতে পেল একটি মেয়ে তার সামনে দিয়ে হেঁটে সিঁড়ি বেয়ে উপরে যাচ্ছে ।ঘোরলাগা চোখে মেয়েটির দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকল ।তারপর জোড়ে চিৎকার দিয়ে বলে উঠল ইশমিইইইইইইই ।দাঁড়াও বলছি ।আমি আসছি তোমার কাছে তুমি দাঁড়াও । মেয়েটি তার দিকে একবার চেয়ে মুচকি হেঁসে উপরের রুমে চলে গেল ।সে এটা ঘোলা ঘোলা চোখে দেখতে পেল আর বিরবির করে বলতে থাকল ইশমি দাঁড়াও আমি আসছি তোমার কাছে ।সেও হেলেদুলে সিঁড়িবেয়ে উপরে যেতে লাগল ।মাহিম অভিক কে আটকাতে চাইল কিন্তু অভিক তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল ফ্লোরে ।তার কোনো হুশ নেই ।তার এখন ইশমিকে চাই ।সে হেলেদুলে আবারো উপরে যেতে লাগল ।মাহিম অভিক কে আটকাতে ব্যর্থ হয়ে তার পিছ থেকে চিৎকার করে বলে উঠল

অভিক থাম । যাস না ঐ মেয়ের কাছে ।

অভিক থামল না ।

মাহিম এবার আরো চিৎকার করে বলে উঠল অভিক থাম যাস না ঐ মেয়ের কাছে ।
শি ইজ এ প্রস্টিটিউড ইয়ার …..

________________

রাত গভীর ।ইশমি ঘুমের মধ্যে টের পাচ্ছে তার শরীরে কেউ হাত বুলাচ্ছে ।অতিরিক্ত ঘুমের কারনে তার চোখজোড়া খুলতেও কষ্ট হচ্ছে ।তাকে কেউ গভীর নয়নে দেখছে ।কেউ অশুভ দৃষ্টি নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে ।বাহিরে মেঘের গর্জন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে ।মাঝে মাঝে জানালা দিয়ে আলোর জলকানি আর তীব্র বাতাস রুমে প্রবেশ করছে ।বাহিরে মুষলধারে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে ।কেউ তার গলা , সারামুখে হাত মুলাতেই তার ঘুম উভে গেল কিন্তু চোখ মেলল না ।তার মনে খুব ভয় কাজ করছে ।কি করবে সে এখন ? তার কি চোখ খোলা উচিত ? এক বুক সাহস নিয়ে সে চোখ খোলার সিদ্বান্ত নিল সে ।সে পিটপিট করে চোখ খুলে তাকিয়ে দেখল ….

চলবে ,
@Nusrat Hossain