মায়ার বাঁধন পর্ব-০২

0
422

মায়ার বাঁধন-২য় পর্ব

©শাহরিয়ার

সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলাম। মাথায় বড় করে ঘোমটা থাকায় এখনো মানুষটার মুখ দেখতে পাইনি। আচ্ছা উনার কি আমাকে দেখার ইচ্ছে করছে না? খুব ইচ্ছে থাকার পরেও মানুষটাকে দেখতে পাচ্ছি না। অপর দিকে মা বাবা ভাই বোনদের ছেড়ে নতুন জায়গায় যাচ্ছি সে কথা চিন্তা করতেই দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পরছে। জীবন কতই না বিচিত্র এতোদিন যারা আপন মানুষ ছিলো আজ তাদের

সবাইকে পর করে, অচেনা অজানা একজন মানুষকে সারা জীবনের জন্য আপন ভেবে তার সাথে ছুটে চলছি। শুনেছি বিয়ের পর স্বামীই নাকি মেয়েদের সব কিছু। আচ্ছা আমি মানুষটার এতো কাছে বসে রয়েছি তবুও মানুষটা একটা কথাও বলছে না কেন? তার কি আমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না? নাকি সেও আমার মত লজ্জা পাচ্ছে কোন কিছু জিজ্ঞাসা করতে?

নানান রকম জল্পনা কল্পনা করতে করতে একটা সময় গাড়ি এসে দাঁড়ালো শ্বশুড় বাড়ির সামনে। শাশুড়ি এসে আমাকে বরণ করে বাড়ির ভিতর একটা রুমের ভিতর নিয়ে এসে বসালো। দারুণ ভাবে সাজানো হয়েছে ঘরটা। সমস্ত বিছানা জুড়ে নানান রকম ফুলের পাপড়ি সরিয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তার শুভাসে মন প্রাণ জুড়িয়ে এলো মুহুর্তেই।

শাশুড়ি মা: তোমার কি ক্ষুধা লেগেছে কিছু খাবে?

উপমা: শাশুড়ির কথায় বাস্তবতায় ফিরে এসে মাথা নাড়িয়ে না মা।

মা: আচ্ছা তুমি তাহলে রেস্ট করো একটু পরেই জয় চলে আসবে।

বলেই উনি আস্তে আস্তে যেয়ে ঘরের দরজাটা লাগিয়ে চলে গেলেন।

রাত আনুমানিক কয়টা বাজে বলতে পারবো না। তবে সারা দিনের ক্লান্ত শরীরটা যেন আর চোখ মেলে তাকিয়ে থাকতে পারছিলো না। তবুও সমস্ত দিয়ে প্রায় পনের বিশ মিনিট চেয়ে থাকার চেষ্টা করলাম। একটা সময় আর পরলাম না দু’চোখের পাতা এক হয়ে আসলো।

ঠিক কতটা সময় ঘুমাতে পেরেছিলাম বলতে পারবো না। ফজরের আজান কানে আসতেই ঘুম।থেকে লাফিয়ে উঠলাম। আমার পাশেই আমার বর শুয়ে রয়েছে। কখন এসেছে জানি না কি মনে করেছে আমাকে ঘুমাতে দেখে এসব ভেবে ভীষণ লজ্জা লাগছিলো। আমি ঠিক জানি না কোন মেয়ের জীবনে এমনটা ঘটেছে কিনা, বাসর রাতে স্বামীর সাথে কোন কথা না বলে এভাবে ঘুমিয়েছে কিনা। মানুষটা না জানি কি মনে করেছে। এসব ভাবতে ভাবতে একটা সময় বিছানা থেকে নেমে ওয়াশ রুমে যেয়ে ওযু করে এসে নামায পড়তে বসে গেলাম। নামায শেষ করে জানালার পর্দা গুলো সরিয়ে দিতেই বাহির থেকে ঘরের ভিতর বাতাস আসতে শুরু করে দিলো।

আমি একটা জানালার গ্রীল ধরে দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে বাহিরে তাকিয়ে রয়েছি। বেশ সুন্দর করে সাজানো বাড়িটা গত রাতে যখন এসেছি তখন দেখতে পাইনি কিছুই আসলে ঘোমটা দিয়ে থাকার কারণে কোন কিছুই দেখা হয়নি। কত সুন্দর একটা বাগান। নানান রকম ফুলের গাছে সজ্জিত পুরো বাগানটা। গাছ গুলো ঘেঁষে ঘেঁষে বেশ কয়েকটি কয়েকটি পাথরে খুদাই করা টেবিল আর চেয়ার। বাগানের ঠিক মাঝ বরাবর খুব সুন্দর একটি ঝর্ণা। যা থেকে পানি বের হচ্ছে। এতো কিছু ভাবতে ভাবতে এক নজর মানুষটাকে ভালো করে দেখার জন্য তার দিকে তাকালাম। সত্যিই মানুষটা অনেক সুন্দর, আপু যতটা বলেছিলো তার চেয়ে অনেক বেশীই সুন্দর। মানুষ এখনো ঘুমাচ্ছে ইচ্ছে করছে তার পাশে যেয়ে তাকে ছুঁয়ে দিতে। কিন্তু তা পারছি না। উনি যদি জেগে যায় তখন কি না কি ভাববে।

বাগানে নানান রকম পাখির কিচিরমিচির করছে সে শব্দে আমি আবার ও বাহিরের দিকে তাকালাম। এমন সময় খাটে শুয়ে থাকা অবস্থায় জয় বলে উঠলো কি করছেন জানালটা লাগান অসহ্য লাগছে কিচিরমিচির শব্দ। আমি ঘুমাবো আপনার ইচ্ছে হলে আপনি বাহিরে যেয়ে দেখুন আলো আমার সহ্য হচ্ছে না।

আমি খুব অবাক হলাম মানুষটা আমাকে আপনি আপনি করে বলছে কেন? আর আমি বাড়ির নতুন বউ চাইলেই কি এতো সকালে বাহিরে যেতে পারি? তবে মানুষটার কণ্ঠ বেশ সুন্দর। ইচ্ছে করছিলো তার মুখ থেকে আরও কিছু শুনি। কিন্তু ভয় ও লাগছে তাই দ্রুত জানালার পর্দা লাগিয়ে দিলাম। আমি ঠিক এই মুহুর্তে কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ঘরের বাহিরর যাবো নাকি উনার পাশে শুয়ে পরবো। নাকি সোফার উপর বসে থাকবো?

নিজের মনের সাথে দীর্ঘ সময় যুদ্ধ করে অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলাম সোফার উপর বসে থাকবো, এছাড়া আর কোন উপায় ও নেই আমার কাছে। হেঁটে এসে সোফায় বসে পরলাম। তারপর একটু একটু করে চোখ তুলে নিজের বরের দিকে তাকাতে থাকলাম। সত্যিই মানুষটা খুব সুন্দর। একটা সময় পর আমি এক দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে রইলাম, অন্যদিকে আর চোখ সরাতে পারছিলাম না।

সকাল সাড়ে সাতটার দিকে দরজায় টোকা পরতে চমকে উঠে দাঁড়ালাম। দ্রুত যেয়ে দরজা খুলতেই শাশুড়ি মা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। আমি তাকে সালাম জানালাম।

মা: কি তুমি কি জেগেই ছিলে নাকি?

উপমা: ইয়ে হ্যাঁ মা আসলে ফজরের নামাযের পর আমার ঘুমানোর অভ্যাস নেই, বাসায়তো কুরআন তেলোয়াত করতাম নামাযের পর, কিন্তু এখানেতো আসার সময় কুরআন শরীফ নিয়ে আসা হয়নি। তাই পাঠ করতে পারছিলাম না।

মা: আচ্ছা আমি জয়কে বলবো সে তোমাকে কুরআন শরীফ কিনে এনে দিবে। আমি আসলে আসলাম তোমাদের কোন রকম সমস্যা হচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য। আসলে জয় একটু রাগী কিন্তু মনটা খুবই ভালো। অনেক রাত পর্যন্ত তোমাকে জাগিয়ে রেখেছে ঘরে আসতে চায়নি। আসলে দোষটা ওর না, দোষটা আমাদের ছেলে কখনো আমাদের কথার বাহিরে কিছু করেনি এতো বছরেও। তাই বিয়েতেও তোমাকে আমরা পছন্দ করে নিয়ে আসি। এ নিয়ে হয়তো ওর মন খারাপ একটু। আচ্ছা তোমরা উঠে ফ্রেশ হয়ে নাস্তার টেবিলে আসো, আমি যেয়ে নাস্তা বানাচ্ছি।

মা ঘর থেকে বের হয়ে গেলো, আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পরার অবস্থা এটা উনি কি বললেন? আমার বর আমাকে পছন্দ করেনি এটা উনার কথায় কিছুটা হলেও বুঝা যাচ্ছে। সব চেয়ে বড় কথা আমি কখনোই এমনটা চাইনি, যার সাথে সারা জীবন থাকবো, তার আমাকে পছন্দ না হলে কি করে থাকবো আমি?

দীর্ঘ সময় সোফায় বসে আছি চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পরেই চলেছে। একটা সময় সোফা থেকে উঠে ওয়াশ রুমে চলে এসে একটু ফ্রেশ হয়ে নিলাম। বুঝতে পারছি প্রচণ্ড রকম ক্ষুধা লেগেছে। তাই ওয়াশ রুম থেকে বের হয়ে বিছানার কাছে যেয়ে সাহস করে জয়ের পিঠে হাত দিয়ে ডাক দিলাম। এই যে শুনছেন সকাল হয়েছে উঠে পরুণ। তিন চার বার ডাক দেবার পর সে বিরক্তি কর নিয়ে আর বড় বড় চোখ করে আমার দিকে তাকালো। আমি কিছুটা ভয় পেয়ে দূরে সরে আসলাম।

জয়: আপনার সমস্যা কি বলুনতো? এতো সকাল সকাল ডাকাডাকি কেন করছেন? এমনিতেই সারা রাত ঘুমাতে পারিনি।

উপমা: না আসলে সকাল হয়েছে অনেক আগেই, হয়তো সবাই উঠে পরেছে এখনো যদি ঘুমিয়ে থাকেন তাহলে কেমন দেখায়?

জয়: কি আশ্চর্য্যের কথা আমার বাড়ি আমার ঘর আমি ঘুমাবো তাতে কিসের কি কেমন দেখায়?

উপমা: আসলে কাল রাতেও তেমন কিছু খাইনি, আমার প্রচণ্ড ক্ষুধা লেগেছে। আর আমি এ বাড়িতে নতুন কি করে একা যাবো বলেন আপনাকে ছাড়া।

জয়: চুপ একদম চুপ একটা কথাও বলবেন না। অসহ্য কোথাকার, যেমনি জানলেন ছেলে সুন্দর, শিক্ষিত ভালো পরিবারের আর অমনি বিয়েতে রাজী হয়ে গেলেন? একবারও নিজের চেহারা আয়নাতে দেখেছেন? আমার সাথে আপনাকে কি মানায়?

উপমা: দেখুন আমিতো জোর করে আপনাকে বিয়ে করিনি। আপনার পরিবার আমাকে পছন্দ করেই এ বাড়িতে নিয়ে এসেছে। তাছাড়া আজ সকালের আগে আমি আপনাকে দেখিনি। আর আপনিও চাইলে বিয়েটা ভেঙ্গে দিতে পারতেন।

জয়: পারলেতো আর আপনার মত একটা মেয়েকে বিয়ে করতাম না। প্লিজ আপনি আমার চেয়ে যতটুকু সম্ভব দূরে থাকার চেষ্টা করবেন।

উপমা: ঠিক আছে তাই করবো। কিন্তু আপনার বাবা মাকে কি বলবো আমি? যদি তারা আমাকে প্রশ্ন করে?

জয়: আপনাকে কিছু করতে হবে না। শুধু তিনটা মাস একটু কষ্ট করে থাকেন। তারপর আমিই আপনাকে ডিভোর্স দিয়ে দিবো।

হৃদয়টা কেঁপে উঠলো ডিভোর্সের কথাটা শুনে। মুখ দিয়ে আর কোন কথা বের হচ্ছে না বরং চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পরতে শুরু করলো। যাকে নিয়ে এতো স্বপ্ন দেখা, তার মুখ থেকে ডিভোর্সের কথা শুনতে হবে বিয়ের পর দিন এমনটা কোন দিন কল্পনাও করা হয়নি।

জয় আরও কিছু বলতে যাবে ঠিক সে সময় দরজায় কড়া নড়ার শব্দ হলো। দ্রুত চোখের পানি মুছে যেয়ে দরজা খুলতেই শাশুড়িকে দেখতে পেলো উপমা।

মা: ঘরে ঢুকে জয়ের দিকে তাকিয়ে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নে নাস্তা খেতে যাবি। মেয়েটার নিশ্চই ক্ষুধা লেগেছে।

উপমা: মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে না মা আমার ক্ষুধা লাগেনি।

মা: শোন মেয়ের কথা, মানুষের ক্ষুধা চোখের দিকে তাকালেই বুঝা যায়। তোমার যে ক্ষুধা লেগেছে তা আমি বুঝতেই পারছি। আচ্ছা তাড়াতাড়ি আসো আমি যাচ্ছি। কথাটা বলেই মা চলে গেলো।

জয়: এই তিনটা মাস অনুগ্রহ করে সবার সাথে একটু অভিনয় করে চলবেন তাদের বুঝাবেন আমরা ভালো আছি।

উপমা: জ্বি ঠিক আছে, কিন্তু আপনিও আমাকে আপনি করে বলবেন না। তাহলে সবাই সন্দেহ করবে। ফ্রেশ হয়ে আসুন নাস্তা করতে যাবো।

জয় আর কথা না বলে ওয়াশ রুমে চলে গেলো।

উপমা: আল্লাহ আপনি আমাকে এ কেমন পরীক্ষার মাঝে ফেললেন? আমি কি করে এ পরীক্ষায় উর্ত্তীন হবো? আমাকে আপনি রাস্তা দেখান। আমি যে আপনার উপরই ভরসা রেখেছি।

চলবে…