রঙতুলির ক্যানভাস পর্ব-০১

0
918

#রঙতুলির_ক্যানভাস
#লেখনীতে_সাবরিন_জাহান
#সুচনা_পর্ব

হাতে থাকা র’ক্ত লাল রঙের কৌটার রঙগুলো ক্যানভাস এ ছুড়ে মারলো রোদেলা।একে একে আরো কিছু রঙ ছুড়ে আঁকিবুঁকি করতে লাগলো। আঁকিবুঁকি বললে ভুল হবে,নিজের রাগগুলো ঝাড়ছে এই আঁকিবুঁকির মাঝে।তখনই পিছন থেকে নোভা ডাকলো।

নোভাঃ রোদ!

রোদেলা জবাব দিলো না।

নোভাঃ রোদ!

রোদেলা নিশ্চুপ

নোভাঃ রোদ আমি ডাকছি তোকে।

রোদেলা এবার বেশ রেগেই জবাব দিলো,” কি? হ্যাঁ…কি বলতে চাও?”

নোভাঃ তুই রেগে যাচ্ছিস কেনো? আমি তো মজা করে বলেছি রোদ্দুর এই বাড়ির প্রাণ।

রোদেলাঃ সে তুমি মজা করেই বলো আর যাই বলো না কেনো,আমি মানতে বাধ্য নই। ইহ ওরে আমার প্রাণ প্রিয় রে।যেই না মান,সে আবার প্রাণ!

“বুঝলে নোভাপু,আমার প্রশংসা শুনে ওর জ্বলছে।”
বলতে বলতে রোদ্দুর ভিতরে ঢুকলো।

রোদেলাঃ নোভাপি ওকে যেতে বলো।

রোদ্দুরঃএহ,মামার বাড়ির আবদার।তোর রুম নাকি?

রোদেলাঃ এটা আমারই রুম।

রোদ্দুরঃনাম লিখা আছে?

রোদেলাঃ নোভাপি!

নোভাঃ আহ, রোদ্দুর!

রোদ্দুরঃ আচ্ছা যাচ্ছি।

বলে বেড়িয়ে যেতে নিলেই আবারো ঘুরে আসলো।ক্যানভাসের কাছে গিয়ে দাড়ালো।সব রঙের মিশ্রণের মাধ্যমে এক দুর্দান্ত ছবি এঁকেছে রোদেলা।

রোদ্দুরকে ক্যানভাসের কাছে যেতে দেখতেই রোদেলা বলে উঠলো ,” হাত লাগাবি না ওটায়।”

রোদ্দুর বাঁকা হেসে তুলি হাতে নিলো।রোদেলার আঁকিবুঁকির মাঝেই কিছু কারসাজি করা শুরু করলো।

রোদেলাঃ নোভাপি,আমার আঁকা জিনিস যদি নষ্ট হয় ওকে কিন্তু ছাড়বো না।

নোভাঃ রোদ্দুর কি করছিস?

রোদ্দুরঃ তেমন কিছু না,একটু মিলিয়ে দিলাম।

রোদ্দুর সরে যেতেই রোদেলা অবাক হয়ে ক্যানভাসে তাকিয়ে রইলো,রঙ তুলির আঁকিবুঁকিতে বরাবরি হলুদ রঙকে স্কিপ করে,কারণ ওর হলুদ রং বড্ড অপ্রিয়।কিন্তু সেই হলুদ রঙটার মাধ্যমে ক্যানভাসে আঁকা দৃশ্যটি যেনো পূর্ণ হলো।রোদেলার হাতে তুলি গুঁজে দিয়ে বললো,
রোদ্দুরঃরঙ তুলির ক্যানভাসে সব রঙকেই প্রাধান্য দিতে হয়,কেননা সব রঙ মিলেই তৈরি করা সম্ভব নজরকাড়া সৌন্দর্য। তোর সাথে আর কিছু না মিললেও,রঙতুলির এই ক্যানভাসে ঠিকই সব মিলে যায়।

রোদেলা কিছু বললো না।বেড়িয়ে গেলো রোদ্দুর।

নোভাঃ মাঝে মাঝে ভাবি।

রোদেলাঃ কি?

নোভাঃ এই রঙতুলির ক্যানভাসের কারণে না জানি তোদের নিজস্ব আঁকিবুঁকির সূচনা ঘটে।

রোদেলাঃ মানে?

নোভাঃ পড়ে বুঝাবো।খেতে আয়!

নোভা চলে গেলো,রোদেলা আরেকবার ক্যানভাসটায় তাকালো।আসলেই দারুন লাগছে ছবিটা।ছবিটার কোণায় নিজের নাম লিখতে গিয়ে থমকে গেলো।কিছুক্ষণ ভেবে ছোট্ট করে লিখলো “রোদ”।

নোভাঃ কম্বিনেশনটা দারুন।
রোদেলা থতমত খেয়ে পিছে তাকালো।

রোদেলাঃ তুমি যাওনি?

নোভাঃ ফোন ফেলে গেছিলাম।সেটা নিতেই এলাম।আর কম্বিনেশনের আরেক জিনিস দেখলাম।যাই বলিস, দারুন হয়েছে। ছবিতেও আর নামেও।ছবিতে দুজনের মিলিত আঁকিবুঁকি আর নামে ” রোদ”

রোদেলাঃ বেশি ভাবছো। এখানে রোদ্দুরের ও শ্রম আছে।তাই…

নোভাঃ খেতে চল।আজকে তো আবার তোরা এনজিওতে যাবি।

রোদেলাঃ হুমম।

নোভাঃ ভার্সিটির ফাইনাল পরীক্ষার প্রস্তুতি কেমন?

রোদেলাঃ ভালোই।

নোভাঃ পরীক্ষা শেষেই পাবি ঝাটকা।

রোদেলাঃ মানে?

নোভাঃ কিছু না,চল।

রোদেলাঃ তুমি সবসময় এমন অর্ধেক কথা বলো কেনো? খোলাসা করে বলতে পারো না?

নোভাঃ না।

রোদেলাঃ ধ্যাত!

নোভা মুচকি হাসলো।

খাবার টেবিলে বসে আছে রোদ্দুর, গত দশ মিনিট যাবৎ চায়ের অপেক্ষা করছে,কিন্তু খবর নেই।

রোদ্দুরঃ আব্বে ওই ময়দা আর্টিস্ট,কই তুই?আমার চা কই?

চম্পাঃজে সাহেব আইতাছি!

রোদ্দুরঃ আসার জন্য কি প্লেন পাঠাবো?

রোদেলাঃ এতই যখন অধৈর্য্য নিজে গিয়ে নিতে পারিস না।

বলতে বলতে টেবিলে বসলো রোদেলা।

রোদ্দুরঃ আসছে আরেক মহারাণী।

রোদেলাঃ মিষ্টার উগান্ডার মহারাজ,অনুগ্রহ পূর্বক নিজের থোতা মুখ সামলে রাখবেন।

রোদ্দুরঃহুহ..

রোদেলাঃ ফুহ..

রোদ্দুরঃছুহ..

রোদেলাঃ থুহ..

রোদ্দুরঃছিহ.

নোভাঃ তোরা থামবি?

রোদ্দুরঃ ওকে বল আপু।

রোদেলাঃ ইহহহ, এখন যত দোষ নন্দ ঘোষের তাই না?

করিমঃ রোদ্দুর।

বাবার কন্ঠ শুনে সোজা হয়ে বসলো রোদ্দুর।

রোদ্দুরঃ জি বাবা?

করিমঃ ভার্সিটির এক্সামের পর বিজনেস এ যোগ দেওয়ার কথা মনে আছে।

রোদেলাঃ মনে তো হয় না আছে বলে।

রোদ্দুর ওর হাতে চিমটি কাটলো।

রোদেলাঃ চিমটি দেস কেন?

রোদ্দুরঃ বেশি পকর পকর করিস,তাই মুখ বন্ধ রাখার উপায়।

রোদেলাঃ চাচ্চু,দেখলে।

রহিমাঃ তোদের দেখি সাপ নেউলের থেকেও বাজে সম্পর্ক।বলি, একটু মিলেমিশে থাকা যায় না?

রোদ্দুর ও রোদেলাঃ না।

নোভাঃ বাহ কি সোজা উত্তর।

রোদ্দুর: এই চুন্নির সাথে ভালো ব্যবহার করা আর পানিতে তেল মিশানো, একই কথা।

রোদেলা: আর এই গোবরের মিনিস্টার এর সাথে ভদ্র ব্যাবহার আর গোবর এ ফুল ফোটানো একই কথা।

রোদ্দুর: আই সুয়ার আমি ওকে খুন করবো নোভাপু।

রোদেলা:আমি কি ছেড়ে দিবো?

নোভা: থামবি তোরা?

রোদ্দুর ,রোদেলা চুপ করে গেল।রোদ্দুর খাওয়া শেষে উঠে বললো,

রোদ্দুর: এনজিওতে আজ অনেক কাজ।কেও যদি আমার সাথে যেতে চায় যেতে পারে।

রোদেলা: নোভাপি কাওকে বলে দিও স্কুটি আছে বাড়িতে,তাহার সাথে পদার্পণ করিবার বিন্দু মাত্র ইচ্ছেটি আমার নাই।

রোদ্দুর: নোভাপু কাওকে বলে দেও স্কুটিটা তোমার,তার নিজস্ব না।

রোদেলা: নোভাপি বলে দেও,গাড়িটাও চাচ্চুর ,তার নিজস্ব না।

নোভা: তোরা থামবি, নাকি আমি ঝাঁটা আনবো বেয়া’দবের দল।আর এক মুহুর্ত আমার সামনে থাকলে দুইটাকে চান্দের পুর ঘুরিয়ে আনবো!

রোদেলা ও রোদ্দুর: সত্যি ঘুরিয়ে আনতে পারবে?

নোভা: তোরা যাবি?নাহলে সত্যি চান্দে পাঠাবো তোদের।

রোদ্দুর আর রোদেলা দাত কেলিয়ে বললো,”তাহলে পাঠাও”

নোভা:তোদের আমি..

নোভা তেড়ে আসতে নিলেই দুইজন এক দৌড়ে বাইরে চলে যায়।

রোদ্দুর: গাড়িতে উঠ, নোভা আপুকে আজ ফুফুর বাড়ীতে যেতে হবে।স্কুটি লাগবে।

রোদেলা ভেংচি কেটে বললো,

রোদেলা:না বললেও জানি, হাহ!

রোদ্দুর: এত ভেংচি দিস না।মুখ বেঁকে যাবে।

রোদেলা কথা না বাড়িয়ে গাড়িতে উঠলো।কারণ কথা বাড়ানো মানেই লেট করা।এনজিওর কাজ শেষে দুইজন ভার্সিটিতে চলে গেলো।ক্লাসে এসে বসা মাত্রই নিহা ঝাঁপিয়ে পড়লো।

নিহা: জানিস কি হইছে?

রোদেলা ভ্রু কুচকে তাকালো,ভার্সিটি এসে ক্লাসে ঢুকতে না ঢুকতেই নিহার এমন উদ্ভট প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হলো। বিরক্তিভাব বজায় রেখেই বললো, না বললে জানবো কিভাবে?

নিহা: সানি কে ভার্সিটি থেকে ওয়ার্নিং দেওয়া হয়েছে।

রোদেলাকিছুটা সিরিয়াস ভঙ্গিমায় জিজ্ঞেস করলো,”কিসের জন্য?”

নিহা: মেয়েদের দিকে খারাপ নজর দেয় তাই বলা হয়েছে এমন কাজ দ্বিতীয়বার করলে ডাইরেক্ট টিসি।

রোদেলা: রোদ্দুর বিচার দিয়েছে তাই না?

নিহা: হুমম

রোদেলা রেগে উঠে দাড়ালো।

রোদেলা: আরে মিথ্যে অভিযোগ। ও সানিকে সহ্য করতে পারে না বলে এমন বলেছে,দাড়া আজ ওর খবর হচ্ছে।

রোদেলা রেগে বেরিয়ে গেলো,তার সাথে নিহা ও।

রোদ্দুররা বাইকে বসে আড্ডা দিচ্ছে তখনই রোদেলা আসলো।

রোদেলা: তোর প্রবলেম কি?

রোদ্দুর:মানে?

রোদেলা:জানি তুই সানিকে সহ্য করতে পারিস না তাই বলে এভাবে মিথ্যে অপবাদে ওয়ার্নিং দিস।

রোদ্দুর: না জেনে কথা বলবি না রোদ।

রোদেলা: আমি না জেনে কথা বলছি না।

রোদ্দুর: বাহ, সানির জন্য এত দরদ!

রোদেলা: ও আমার ফ্রেন্ড রোদ্দুর।

রোদ্দুর: আর তুলি?

রোদেলা:এখানে তুলির ব্যাপার কেনো উঠছে?

রোদ্দুর চোখের ইশারায় পাশে তাকাতে বলবো,রোদেলা পাশে তাকিয়ে দেখলো তুলি দাড়ানো।

রোদেলা: তুই এখানে?

রোদ্দুর সোজা হয়ে পকেটে হাত গুজে দাড়িয়ে বললো,
রোদ্দুর: আগে নিজের ছোট বেলার বন্ধুর কথা ভেবে দেখুন।

রোদেলা:বলতে কি চাস?

তুলি:আমি বলছি!গত দুইদিন তুই আসিস নাই,এর মাঝে সানি বড্ড অসভ্য রকমের আচরণ করতো।কখনো ওড়না ধরে টানতো বা কখনো বাজে ভাবে তাকাতো ।কালকে ও অত্যন্ত বাজে ভাবে আমায় স্পর্শ করে,তাই রোদ্দুর ভাইয়াকে সব বলি।

ওর কথা শুনে রোদেলা কি বলবে বুঝছে না।রোদ্দুর রোদেলার কিছুটা কাছে গিয়ে বললো,

রোদ্দুর: বিশ্বাস ভালো,তবে এতটাও না।আর কি যেনো বললি?আমি ওকে মিথ্যে অপবাদ দিয়েছি।আর কারণ কি?কারণ আমি ওকে সহ্য করতে পারি না?আচ্ছা সত্যি বলতো,ছোট থেকেই তো আমরা একসাথে।কখনো বিনা কারণে কাওকে শাস্তি দিতে দেখেছিস?নাকি কখনো দেখেছিস নিজের শত্রুতার জন্য কাওকে মিথ্যা দোষে দোষী করতে?সানি দুইদিনের লোক হওয়া সত্বেও তোর ওর প্রতি অগাধ বিশ্বাস।আর আমাকে তো ছোটো থেকে দেখছিস, এত গুলো বছরেও আমায় বিশ্বাস করতে পারিস নাই?

রোদেলা রোদ্দুরের দিকে এক পলক তাকিয়ে কিছু না বলেই তুলিকে নিয়ে অন্য পাশে চলে গেলো।

#চলবে…