শিকড়
পর্ব-৩
জমির আলী অবাক হওয়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেন যখন ছেলেটি তার পা ছুঁয়ে সালাম করে।
-কেমন আছেন?
-আপনে,,,,আপনে কেডা?
-আমি আবিদ।আমার আব্বু আপনাকে ফোন করেছিলেন।
-হ, হ তাইতো।আসেন,ভিতরে আসেন।
-আমাকে তুমি করে বললে ভালো হয়।
ড্রাইভার গাড়ি থেকে ইয়া বড় বড় দুই লাগেজ, ফলের ঝুড়ি,আর খাবার দাবার নামিয়ে দিয়ে চলে যায়। মনে মনে ভাবেন জমির আলী
-তিনদিনের লেইগ্যা এতো কি লইয়া আইছে,আর এতো খাওন আনছে আসমা যে আয়োজন করলো, ওহন হেয় না খাইলে তো কষ্ট পাইবো।
ইতিমধ্যেই বৈঠকখানায় অনেকে এসে মেহমানের সাথে পরিচিত হচ্ছেন। ডাক্তার শুনে অনেকে আবার নিজেদের অসুখ বিসুখ নিয়েও জানতে চান। বৈঠকখানায় দেয়া হলো ডাবের পানি। আবিদ বলে উঠল
-ডাবের শাস নেই? আমার খুব পছন্দ।
চমকে তাকান জমির আলী। তিনি নিজেও তো পানির থেকে শাস বেশি পছন্দ করেন।
-আছে, আমি আইন্যা দেই।
ওদিকে দরজার একপাশে দাড়িয়ে আছে আসাদ।তার ইচ্ছা, এই ডাক্তারকে বলবে একবার যেনো তার বউকে দেখেন।এখনো তো ছেলেমেয়ের মুখ দেখলো না ও।
-ও আসাদ,ওইহানে ক্যান।এইদিকে আয়।ডাক্তার সাব,ও আসাদ,এই বাড়ির পোলা।আপনের যখন যা লাগবো ওরে কইবেন।
-হ ডাক্তার সাব,আমারে সবসময় পাইবেন।
আসাদের সাথে পরিচিত হয় আবিদ।তার সাথে নিয়ে আসা সব খাবার আর ফল ভিতরে নিয়ে যেতে বলে আসাদকে।
-এইগুলান আপনে খাইবেন না?
-কেন,আপনারা আমাকে খেতে দিবেন না?
লজ্জা পেয়ে আসাদ বলে
-আমি ভাবছি আপনে আমাগো খাওন খাইবেন না।হের লাইগ্যা এইসব নিয়া আসছেন।
-এসব আপনাদের জন্য এনেছি। সবাই খেলে আমার ভালো লাগবে।
-তয় এতো বড় দুইটা লেদার,থাকবেন তো মোটে তিনদিন।
জবাব না দিয়ে আবিদ বলে,হাতমুখ ধুয়ে নেই,চলো।
ওদিকে জমির আলীর অস্থিরভাব চোখ এরায় না আসমার।
-কি হইছে আপনের?এমন অস্থির করতাছেন ক্যান।সারাডা দিন কতো খুশি করলেন আর ওহন এমন করতাছেন।কি ঘটনা।
-কোন ঘটনা নাই,পোলাডারে দেইখা মনডা কেমন কইরা উঠল।
-বুঝছি।
-কি বুঝছো?
-যা বুঝনের তাই বুঝছি।
-কিচ্ছু বুঝ নাই বউ।কিচ্ছু না।
-তয় বুঝান।।।
-পোলাডা দেখতে….
-কি??
-দেখতে একদম আব্বার লাহান।
-বাপের মনতো,তাই নিজের পোলার কথা মনে কইরা এমন লাগতাছে। মেহমানের পিঠা আর চা খাওয়া অইছে নি দেইখা আসেন।
জমির আলী চলে গেলে আসমা ভাবেন,
-কোনদিনতো মানুষডা এমন করে নাই আইজ কি হইলো।
না চাইতেও সেদিনটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মাগরিবের নামজের পরপরই প্রচন্ড ব্যাথা উঠে আসমার।সবার কথা অমান্য করে জমির আলী আসমাকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটেন।সারারাত ব্যাথায় কাতরাতে থাকেন আসমা।শেষরাতের দিকে জন্ম হয় এক ফুটফুটে ছেলের।ছেলের মুখ দেখে এতোসময়ের সব কষ্ট ভূলে যায় আসমা। ছেলের কানে আজান শুনিয়ে কোলে নেন জমির আলী।
-কই গো,পোলাডা কতো দূর থাইকা আইছে,খাওনের জোগাড় করো।খাইয়া দাইয়া ঘুমাক।
-হুনেন,,
-কি কও।
-আমি তার লগে দেখা করুম না?
-নিশ্চয়ই করবা,খাওন দাওন শেষ হউক আগে। আসাদের বউ আইলো না?
-নাহ।
-বাদ দাও,না আইলে নাই।
দেশের আরেক প্রান্তে এক বিলাসবহুল হোটেলের রুমে আবিদকে নিয়ে চিন্তিত আরো দুজন মানুষ। শাহেদ চৌধুরী আর রেহনুমা চৌধুরী। আবিদের আব্বু-আম্মু।পাঁচ বছরের আবিদকে নিয়ে তারা সেই যে অস্ট্রেলিয়া পাড়ি জমান আর আসা হয়নি দেশে।পঁচিশ বছর পর এলেন।ঢাকায় নিজের ভাই-বোন,আত্নীয় অনেকেই আছেন, তবুও কারো সাথে যোগাযোগ করে আসেননি।ইচ্ছে করেই উঠেছেন হোটেলে।তারা যে এবার বিশেষ কাজে এসেছেন, তা কাউকে জানানোর ইচ্ছে নেই।
-আবিদকে একটা কল দাও না।
-না রেনু,ও নিজে থেকেই দিবে।অপেক্ষা করো।
-ছেলেটা ফিরবে কবে বলতো?
-আজইতো মাত্র গেলো, কাজ শেষ করেই ফিরবে।
-সত্যি ফিরবে তো?
দুচোখ ভরা জল নিয়ে স্বামীর কাছে জানতে চান রেহনুমা।স্ত্রীকে দেবার মতো কোন উত্তর খুঁজে পান না শাহেদ চৌধুরী। জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকেন তিনি।
(চলবে)