শিকড় পর্ব-০৫

0
270

শিকড়
পর্ব -৫

ধক্ করে উঠে আসমার বুক।
-চইলা যাইবেন।
-জি।
-আপনে না কয়দিন থাকার কথা।
-থাকতেই তো এসেছিলাম।কিন্তু আপনারা যা করছেন, তাতে মনে হয় না থাকাই ভালো।
উতলা হয়ে জমির আলী জানতে চান
-আমরা কি ভূল করছি, যদি কইরা থাকি তাইলে মনের অজান্তে করছি।আপনে কষ্ট নিয়েন না।খালি কন, কিসে আপনের খারাপ লাগছে?
-আপনারা দুজন মুরব্বি। আমাকে আপনি আপনি করছেন। আবার আমার থাকা নিয়েও পর পর ভাব করছেন। এভাবে কি থাকা যায়?
হাসি ফুটে দুজনের মুখে। আসমা বলেন
-যা ভয় পাইছিলাম।
-আপনি খাওয়া দাওয়া করেছেন।
-না গো বাবা।আপনেরে মানে তোমার লগে দেখা হই নাই তো,ভাবলাম যদি ঘুমায় পর।
-যান,খেয়ে আসুন।ঘুমাবো না এখন। আপনাদের সাথে গল্প করবো অবশ্য আপনারা যদি চান।
-ক্যান চাইমু না।আমাদের তো গল্প করার কেউই নাই।আচ্ছা আমি সব গুছাইয়া আসি।
অল্প একটু খাবার নিয়ে তাড়াহুড়ো করে খাচ্ছেন তিনি।মনটা যেন বৈঠকখানায় আটকে আছে।

আবিদের মনটা এতো অশান্ত হয়ে আছে কেন বুঝতে পারছে না ও।আব্বু আম্মুর থেকে বয়সে বেশ অনেকটা ছোটই হবেন উনারা, অথচ চোখমুখে কি ক্লান্তি,কি বেদনা।কিন্তু এসব ছাপিয়ে ওনাদের মায়া নজর এরায় নি আবিদের।উনাদের কোন সন্তানের সাথে এখনো দেখা হয়নি ওর।নিজে থেকে জানতেও মন সায় দেয়না। সে নিজের সাথে নিজে যে বাজি ধরেছিল, তাতে কতোটা অটল থাকতে পারবে, সে জানেনা।

নির্ঘুম রাত কাটছে শাহেদ -রেহনুমার।দুজনেরই একই অবস্থা, তাও একে অন্যকে সাহস যুগিয়ে চলেছেন।
-ঘুমাও নি রেনু?
-তুমিও তো জেগে আছ।
-ঘুম আসছে না কিছুতেই।
-আচ্ছা, আমি খুব স্বার্থপর, তাই না?
-এভাবে ভাবছো কেন?
-তুমি কতোবার চেয়েছিলে ওদের খবর নিতে কিন্তু আমার জন্য পারোনি।
-আচ্ছা, বাদ দাও।আমি তো তোমাকে বুঝি বলো।আমি ঠিকই তোমার ভয় বুঝতে পারতাম।
-ভয়,হ্যাঁ ঠিকই বলেছ।ভয়কে আর জয় করা হলোনা আমার।
-কি বলছ তুমি? ভয়কে জয় করে তুমিই তো সিদ্ধান্ত নিলে ছেলেকে সবটা জানাবার।
-ভূল করছো তুমি,এ সিদ্ধান্তও আমি ভয় থেকেই নিয়েছি।আমার শারীরিক অবস্থা তো আমার থেকে ভালো আর কেউ জানবে না,তাই না?তখন যদি আবিদ কোনভাবে কিছু জানতে পারে,তাহলে তুমি একা সামলাতে পারবে না।আর সবথেকে বড় ভয় তো আল্লাহকে।আমার কাছে তো কোন জবাব থাকবে না তখন। এখন অনেকটা নির্ভার।
-হাসালে রেনু,তুমি যদি নির্ভার হতে, তাহলে খাওয়া-ঘুমের এ অবস্থা কেন তোমার?
-সেটা তো মায়া,আবেগ,ভালোবাসা।
-এতো চিন্তা করোনাতো,ছেলে মায়ের কোলে ঠিকই ফিরবে।
-এখনোতো মায়ের কোলেই ফিরে গেছে ও।আমারও উচিৎ একবার গিয়ে ওদের কাছে ক্ষমা চাওয়া,তাই না?
-তুমি একা নও,আমার ও।আগে ওর বোঝাপড়া শেষ হোক,পরে না হয় আমরা যাব।

আসমা বেগম রান্নাঘরের সব গুছাতে গুছাতে জমির আলীকে বলছেন
-আচ্ছা পোলাডারে তো বাড়ির অনেকেই দেখলো,কেউতো কইলো না দেখতে আব্বার লাহান।খালি আপনের আর আমারই মনে হইলো?
-কার কি লাগলো হেইডা দিয়া আমাগোর কাম নাই।আমরা দুইজন মানুষ তো আর একলগে ভূল করি নাই।
-আমার মনে অন্য কথা কয়।
-খবরদার বউ,এসব কথা মুখেও আনবা না।এতোগুলা বছর ধইরা, এতো মাইনষের এতো কথা হুইনাও যে কথাগুলান আমরা মাটিচাপা দিয়া রাখছি,হেই কথাগুলান আর কইও না,কোনদিনও না।
-হ ঠিকই কইছেন।আপনের মনে আছে তো কালকের দিনডা খালি মাঝখানে। সবাইরে কইছেন?
-কইছি না আবার, এই দিনডা কখনো ভূল অইছে।
-এইবার মেহমান পোলাডাও আছে, বেশ ভালা অইবো।দেখুমনে আমাগোর সাথে আর কারও মিল হয় কি না।
-আবার ঔ কথাতেই যাইতেছো তুমি।
-আচ্ছা পোলাডার বয়স কতো?
-আমি কেমনে কমু কও।আমি কি জানি।
-জিকামু?
-কি কাম লাগছে তোমার।
-চলেন,হের ধারে যাই।
-চলো যাই।
-খারান,কিছু ফল-মিষ্টি লই।রাইতে খাইবোনে।

-আমি এসে আপনাদের অনেক ঝামেলায় ফেললাম।
-এহন পর পর কথা কেডায় কয়।
-আচ্ছা আপনাদের ঘরে আর কেউ নেই?
-না গো বাবা,খালি আমরা দুই বুড়া-বুড়ি।
-আপনাদের বুড়ো হতে এখনো অনেক বাকি।মনে মনে আগেই বুড়ো হয়ে যাচ্ছেন?
-কি যে কও।
-আপনাদের ছেলেমেয়েরা কি বাড়ির বাইরে থাকে?

জমির আলী আসমার দিকে তাকিয়ে সাথে সাথে উত্তর দেন
-আমাগোর পরিবার বলতে আমরা দুইজনই,আর কেউ নাই।
ভীষণ কষ্ট পায় আবিদ।উনাদের তাহলে আর কোন সন্তান নেই? সেই সন্তানের কথাও তো উল্লেখ করলেন না তারা।না বললে তো সমস্যা। কিভাবে জানবে সে ওই ছেলেটার জায়গা তাদের কাছে কতোটুকু। যে বাজি সে ধরেছে, তার সিদ্ধান্তওতো নিতে পারবে না তাহলে।
-আমি দুঃখিত।না বুঝে আপনাদের কষ্ট দিয়ে ফেলেছি।আপনারা ডাক্তার দেখাননি?
-ডাক্তার দেহামু ক্যান?
-এই যে কখনো সন্তান পেলেন না।
আনমনা আসমা মুখ ফসকে বলে ফেলেন
-পাইমু না ক্যান,পাইছি তো একডা।
-সে তাহলে কোথায়?
নিশ্চুপ দুজন
-আপনাদের সাথে থাকে না?
উত্তর নেই
-ওহ,আমি আবারও দুঃখিত।বুঝতে পারিনি সে মারা গেছে।
-নাআআআআআ।আর্তনাদ করে উঠেন জমির আলী।
-তাহলে সে কোথায়।
-হে যেহানে আছে, আল্লাহর রহমতে ভালা আছে।
-আপনাদের একজন সন্তান থাকা স্বত্তেও আপনারা একা,গ্রামের অনেকেই হয়তো আপনাদের নিঃসন্তান বলে।খারাপ লাগে না।
-খারাপ লাগার চাইতে জবানের দাম অনেক বেশি গো বাবা।
-জবানের দাম মানে?
-তুমি বুঝবা না।
-বুঝালে নিশ্চয়ই বুঝবো।
সন্দেহ নিয়ে জমির আলীর তাকানো দেখে আবিদ বলে উঠে
-না মানে,অনেক বছর পর দেশে আসলাম তো।দেশের মানুষের সম্পর্কে জানার আগ্রহ থেকেই বললাম।
-তুমি বিদেশি??
-না না,বিদেশি না।ছোটবেলায় বিদেশ চলে গিয়েছিলাম, আর আসা হয়নি।গতকালই আসলাম।
-বুঝছি,গেরামে কি কাজে আইছো।
-একদম নিজের একটা কাজে।কাজ হলে বলবো।
মনে মনে বলে,এসেছি তো তোমাদের কাছেই। কিন্তু তোমরা যে দরজায় তালা দিয়ে বসে আছ।তালা না খুললে ওপাশটা কিভাবে দেখবো?
-তোমার মা-বাপ কই?বিদেশে?
-জি না,উনারাও আমার সাথে এসেছেন। ঢাকায় আছেন।
এবার সচেতনভাবেই আবিদ বলে উঠে
-সদর হাসপাতাল এখান থেকে কতো দূরে?
-আছে, দূরে আছে। ওইহানে কি কাম।
-ডাক্তারের কাজ তো হাসপাতালেই হবে,তাই না?
-হুম।
-আপনাদের হাসপাতাল থেকে নাকি বাচ্চা অদল-বদল,চুরি এসব হয় সত্যি?
-না না।কোনদিন তো হুনি নাই।
-কিন্তু আমার কাছে যে খবর আছে।
-কি খবর?
-ত্রিশ বছর আগে নাকি এখানে এমন ঘটনা ঘটেছিলো।

ঘামতে থাকেন জমির আলী। আসমাও অসুস্থবোধ করছেন। এর সামনে থাকলে কখন কি বলে বসেন। জমির আলী বলেন,-ঘুমায় পর বাবা।রাইত অইছে।
আসমাকে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে ভিতরে চলে যান তিনি।
আবিদ হাসে।কাজ হবে মনে হয়।বাজিতে জিতবে না হারবে সেটা অবশ্য জানে না।

(চলবে)