হলদে প্রজাপতি পর্ব-১৪+১৫

0
315

#হলদে_প্রজাপতি
(প্রাপ্তমনস্কদের জন্য )
— অমৃতা শংকর ব্যানার্জি ©®

চোদ্দো

উপমারা চলে যাওয়ার পর ফিরে এসে আবার লনে পাতা চেয়ারে বসে পড়লাম। হুস্ করে সন্ধ্যা হয়ে গেল। দুরে কোনো গ্রাম্য বসতি অঞ্চল থেকে শাঁখের আওয়াজ আসছে। আমি পুজো করি না। সন্ধ্যা দিই না । মা আমাকে বকাবকি করে সেজন্য । ছোটবেলায় জোর করে অভ্যাস করানোর চেষ্টা করেছিল । কিন্তু, মনের তাগিদ কখনো সেভাবে অনুভব করিনি । তাই ঠাকুর দেবতার সামনে নিয়ম করে গিয়ে দাঁড়ানো , প্রদীপ জ্বালানো, শাঁখ বাজানো, এসব আসে না আমার । আমি কি তবে নাস্তিক ? বোধহয় না । ঠাকুরের সামনে আমি গিয়ে বসি মাঝে মধ্যে। মনখারাপ হলে বসে থাকি। মনের কথা বলি সব মনে মনে । তবে মনখারাপ হলে আমি শুধু ঠাকুরের কাছেই যাই না, প্রকৃতির কাছে বেশি যাই। মন খুব অশান্ত হলে আমাকে পাহাড় টানে তার অসীম সৌন্দর্যের মাঝে । মাঝের এই এতগুলো বছরে কখনো নর্থবেঙ্গলে না এলেও আমি কুমায়ুন হিমালয় গেছি , গাড়োয়াল হিমালয় গেছি , নাগাল্যান্ডের সবুজ ঘেরা পাহাড়ে ট্রেক করেছি। দূরে, ওই দূরে ভেসে ওঠা তুষারশৃঙ্গ একা একা বসে যখন দেখেছি, অনুভব করেছি, দুচোখ ভরে উঠেছে জলে । আমার মনের সমস্ত ব্যথা আমি হিমালয়ের কাছে উজাড় করে দিয়েছি। সব কিছু বলেছি । আমার কাছে ঈশ্বরও যা, প্রকৃতিও তাই । দুজনের গঠন ভিন্ন, অস্তিত্ব এক। আমার বাংলোতেও ঠাকুর আছেন । মা যশোদার কোলে চড়ে দুষ্টু গোপাল – অনিন্দ্যসুন্দর একখানি মূর্তি । মায়াপুরে গিয়ে একবার কিনে এনেছিলাম । পিতলের মূর্তি। নিয়ে এসেছি সেটা আমি আসার সময়। ঠাকুরঘর রয়েছে একটা ছোট্ট মতো। ছাদে ওঠার সিঁড়ির বাঁ পাশে । সেখানে পিঁড়ির ওপরে বসে আছেন আমার গোপাল ঠাকুর। তবে, আমি সন্ধ্যা না দিলেও, টগর প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা উঠে একটা করে প্রদীপ জ্বেলে আসে সেখানে। না কোনো আড়ম্বর নেই ঠাকুরঘরে। ঠাকুরের আধিক্য নেই । ফলমূল, সিঁদুর, বেলপাতা নেই । সিংহাসন , কাঁসর , ঘন্টা , কিছুই নেই। তবে সন্ধ্যাবেলা প্রতিদিন একবার করে যখন ছাদে উঠি আমি, ঘরের মধ্যে ক্ষীণ নীলচে আলোর আভায় আমার গোপাল ঠাকুরকে এক বার করে দেখে নিই। তিনি ভাল আছেন কিনা । এই আমার ঠাকুর পুজো ।

উপমা-ইন্দ্রাশিষ বাবু-চা বাগান-টগর-আমি-ঝিঁঝিঁর ডাক-ফুলের গন্ধ-ঠান্ডা হাওয়া .. মিলে মিশে যাচ্ছে সবকিছু আমার মনের আঙিনায় । কিছু শুনছি, কিছু ভাবছি, কিছু দেখছি । আমার আমি সবটুকুর সাথে দ্রবীভূত হয়ে মিলেমিশে যাচ্ছে । কতক্ষণ ওভাবে ওখানে বসে থাকলাম খেয়াল নেই । টগর বেশ কয়েকবার ইতিমধ্যে ডেকেছে আমায় – মেম ঘরে চলে আসুন । আর কতক্ষণ বসে থাকবেন ওখানে ?
ওর কথাটা আমার কানে ঢুকলেও, মাথা পর্যন্ত পৌঁছায়নি । আমি ওখানেই বসে ছিলাম । এক মাস পার করে ফেললাম এখানে । এই চা বাগানে । ঠিক এক মাস আর দিন কয়েক আগে যখন এসেছিলাম, তখনো শুক্লপক্ষ ছিল । আজকেও শুক্লপক্ষ । কোন তিথি আমার জানা নেই। তবে আর দিন দুই তিনের মধ্যেই পূর্ণিমা হবে। চাঁদের আকার এবং আকৃতি তাই বলছে। লনে বসে বসে যতদূর চোখ যায় চাঁদের আলোয় মায়াবী চা বাগানে চোখ রেখে বসে রইলাম । এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা পেয়ে বসল আমায় । যেন বহু যুগ ধরে চলে আসা অনন্ত কোন সময় এই ভাবেই থমকে রয়েছে । যেন জগৎ সৃষ্টির আদি থেকে সবকিছু ঠিক এমনটাই ছিল । ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত চিন্তা আমার মাথায় চেপে বসলো । এই মায়াবী চাঁদের আলোয় ওই চা বাগানের বুক চিরে যে সরু রাস্তা এঁকেবেঁকে চলে গেছে, সেই রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে দুরে ঐ বহুদূরে দিগন্তরেখার কাছে গিয়ে দাঁড়ালে কেমন হয় ? কেমন যেন নিশির ডাকের মতো আমাকে সেই রূপোলী ‘চাঁদের বাগান’ হাতছানি দিতে লাগলো। আনমনে লন পেরিয়ে কয়েক পা চলে এসেছি ।
হঠাৎ করে পেছন থেকে টগরের উত্তেজিত গলা ভেসে এলো, মেম কোতা যান ?
আমি থমকে দাঁড়ালাম । বললাম, এই একটু আশেপাশে ঘুরবো।
— এখন এই সাঁজের আঁধারে ?
— হ্যাঁ ।
— কি বলছেন মেম ! একেনে এই জংলার মধ্যে সাঁজের বেলা আপনি ঘুরে বেড়াবেন?
— জঙ্গল কোথায় ?
— মেম আপনি জানেন না , একেনে সব সাঁজের বেলা নানারকম পোকামাকড়, নতা, এসব বেরোয় কিনা ।
— লতা ?
— হ্যাঁ মেম , নতা । কখন এই এ্যাত্তো বড় ফণা তুলবে নিঃসারে, জানতেও পারবেন না ।
সে হাত তুলে সাপের ফণার ভঙ্গি করে দেখালো।
— সাপ ? সাপের কথা বলছো?
টগর ছুটে এসে আমার সামনে দাঁড়ালো । জিভের প্রায় অর্ধেকটা বাইরে বার করে দাঁতে করে কেটে বলল , সাঁজের বেলা তেনাদের ওই নামে কবেন না, মেম ! নতা বলুন গো , নতা !
হেসে বললাম, আচ্ছা তাই না হয় হল । তা, তোমার লতারা হঠাৎ করে সবাই সন্ধ্যাবেলায় বেরিয়ে পড়বেন কেন শুনি ? সারাদিন তো কাটে আমার এই মাঠে-ঘাটেই। তখন কই বেরোন না তো ?
টগর খুব ভয়ে ভয়ে চারিদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দেখে নিয়ে আমার কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল, মেম আর তেনারাও তো আচেন । এভাবে একন ঘুরে বেড়াবেন না মেম। এই সাঁজের বেলায় তেনারা কিন্তু-
— তেনারা কি আমার ঘাড়ে চেপে বসবেন? তা বসুন। তোমার ঘাড়ে তো আর চাপতে আসছেন না ।
ঠোঁটের ওপর তর্জনী রেখে সসস্ করে শব্দ করে সে বললো , কি সব বলছেন মেম? চুপ করুন । তেনারা শুনতে পাবেন যে!
সশব্দে হেসে ফেললাম । বললাম, ঠিক আছে । কেউ আমার ঘাড়ে চাপবে না। তুমি যাও । নিজের কাজ করো গিয়ে। আমি কাছাকাছি কিছুটা ঘুরে আসি।
মিয়োনো গলায় সে বলল , আপনি মুট্টে কোন কতা শুনেন না। দাঁড়ান, ওই যদুকে বলি আপনার সাথে যাক ।

‘না’ বলতে গিয়েও বললাম না । ভাবলাম , ভালোই তো বলেছে টগর । একজন যদি সাথে থাকে , থাকুক না। অসুবিধা কোথায়?
বললাম , ঠিক আছে । আমি দাঁড়াচ্ছি। তুমি আসতে বল।
সম্পূর্ণ এক মিনিট হওয়ার আগেই যদু চলে এলো। তার ডান হাতে একটা বেশ শক্তপোক্ত বাঁশের লাঠি , লম্বা গোছের । আর বাঁহাতে বড় একটা ব্যাটারি-টর্চ । আমার কাছে এসেই ফটাস্ করে টর্চটা অন করতেই চারিদিকে সেই কৃত্রিম আলো ছড়িয়ে পড়ল। প্রাকৃতিক যে দৃশ্যপট আমাকে চুম্বকের মতো টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, তার মাদকতা এক নিমেষেই হাওয়া !
আমি বললাম, টর্চটা অফ করে দাও , যদু । এখন কোন দরকার নেই । বেশি অন্ধকার দেখলে তখন জ্বালিয়ো । আমি বলে দেবো । তা ছাড়া চাঁদের আলো তো রয়েছে ।

যদু , ‘আজ্ঞে দিদিমনি’ বলে টর্চটা অফ করে দিলো ।

এগিয়ে চললাম । সরু যে রাস্তাটা চা বাগানকে দু’ভাগে ভাগ করেছে , সেই রাস্তাটা বেয়ে এগিয়ে চললাম । শুধু আমাদের দুজনের পায়ের খসখস্ শব্দ, যদুর মাঝে মাঝে লাঠি ঠোকার আওয়াজ , তার সাথে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক – এছাড়া এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। বেশ কিছুটা দূরের চা পাতার রুপোলী ফোঁটাগুলোর ওপরে ইতস্তত কয়েকটা ছোট ছোট আলোর বিন্দু ঘুরে বেড়াচ্ছে । আরো কিছুটা এগোতে দেখলাম, কয়েকটা নয়, বেশ অনেকগুলো । ছোট ছোট সবুজ বিন্দুগুলো জ্বলছে, নিভছে, জ্বলছে, নিভছে। বুঝলাম জোনাকিরা বাসা বেঁধেছে বাতাসে । যেন ওই দূরের আকাশের মিটিমিটি তারাগুলো ‘সবুজ সবুজ’ বিন্দুতে খানিক উড়ে বেড়াচ্ছে আমাদের সামনে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখলাম । তারপর, জোনাক-রঙা প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে এগিয়ে গেলাম । আরো কিছুটা দূরে এগিয়ে যেতে সেখানে বেশ অন্ধকার। দু’তিনটে শেড-ট্রির ছায়া এসে পড়েছে ।
এতক্ষণ নিঃশব্দে আমার আগে আগে চললেও যদু এবার কথা বলল, দিদিমনি টর্চটা জ্বালাবো?
— কেন? ভয় করছে নাকি তোমার ?
— না মানে এইসব চা গাছের মধ্যে অনেক কিছু ঢুকে থাকে, জানেন তো?
— কিসের কথা বলছো , সাপ?
অন্ধকারেও বুঝতে পারলাম যদু একটু শিউরে উঠলো । তারপর বললো , শুধু কি তাই দিদিমণি ? এমনকি এই সন্ধ্যার পরে চা বাগানের মধ্যে জঙ্গল থেকে কত জন্তু-জানোয়ার, চিতা পর্যন্ত এসে পড়ে । এভাবে এখান দিয়ে ভর সন্ধ্যেবেলা না ঘোরাই ভালো।
আমি হাসলাম । বুঝলাম, ওর প্রাকৃত কিছুর থেকে অতিপ্রাকৃত কিছুর উপস্থিতির কথা কল্পনা করে ভয় করছে বেশি ।
বললাম, জ্বালো, জ্বালো-
আমার কথাটা শেষ হওয়ার আগেই টর্চটা জ্বলে উঠলো । ঠিক যেন একটা ড্রাগন আগুনের মতো হাঁ করে সমস্ত সৌন্দর্য এক নিমেষে গিলে খেয়ে নিল।
এক মিনিট পর আমি বললাম, যদু, এবার অফ করে দাও লাইফটা । কোথাও কিছু নেই, দেখে নিলে তো?
সে অনিচ্ছা সত্বেও লাইটটা অফ করল বটে, তবে বলল , আশেপাশে নেই বটে দিদিমণি। তবে হুট করে আসতে কতক্ষণ ? এখানে এইসব চা-বাগানে এমনকি পাশের জঙ্গল থেকে হাতির পাল পর্যন্ত চলে আসে ।
আমি বললাম , তা আসে বটে । ওই চা গাছের নিচের দিকে একরকমের ঘাস খায় ওরা- ‘বনসুম’।
নিদারুণ বিস্মিত গলায় ও বলল , আপনি জানেন ?
— হ্যাঁ জানব না কেন ? চা-গাছ নিয়েই তো আমার কারবার।
— তবু এভাবে সন্ধ্যেবেলা ঘুরে বেড়াচ্ছেন দিদিমণি, অন্ধকারের মধ্যে ?
আমি ওর কথার কোন উত্তর দিলাম না । এই ক্ষণিক পাওয়া সুন্দর আমেজটা কথা বলে বলে ভঙ্গ করতে আমার ইচ্ছে করছিলো না । কল্পনায় দেখলাম ওই দূরে হঠাৎ করে চা বাগানের ফাঁকে হালকা রূপালী আলোয় দৃশ্যমান হয়ে উঠলো একটি সবল মাংসাশী প্রাণীর বলিষ্ঠ পিঠ !
কি হবে?
কি হয় এমন হলে?
কি করব আমি তখন?
খুব যে কিছু সাহসিকতার পরিচয় দিতে পারবো না , সেটা আমাকে জাস্ট কয়েকটা দিন আগেই উপমা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেছে । সত্যি কথা বলতে কি , একটু গা ছমছম্ করল । এই গা ছমছমে অনুভূতিটা না হলে সৌন্দর্য আস্বাদনের প্রকৃত স্বাদ পাওয়া যায় না । সেটাও ঠিক ।
যদু বলল, মাকড়া বাড়ি চা বাগানে এই তো দুদিন আগে একটা বড় দাঁতাল হাতী তার দল নিয়ে ঢুকে পড়েছিল । সে একদম কেলেংকারী কান্ড দিদিমণি !
— হ্যাঁ জানি ।
যদু আর কিছু বললো না। তবে ভাবল নিশ্চয়ই- সবই যদি জানেন, তবে আর এখানে এভাবে অন্ধকারে কি হাতড়ে বেড়াচ্ছেন?
কি যে আমি হাতড়ে বেড়াচ্ছি তা যে আমি কাউকে বোঝাতে পারিনা। প্রকৃতিকে জড়িয়ে থাকা যে রোমান্টিসিজম , তার স্বাদ এত মধুর, এত সুতীক্ষ্ণ , যে আকর্ষণ অমান্য করা যায় না। আস্বাদনের পরে শূন্য হাতে, পূর্ণ হৃদয়ে ফিরতে হয় ।

ফিরে এলাম মিনিট পনেরো কুড়ি পরে । বাংলোয় ফিরে এসো টগরকে এক কাপ র’চা দিতে বলে নিজের ঘরে এসে কিছুটা গড়িয়ে নিচ্ছিলাম। আবার কাল সকাল থেকে ছোটাছুটি পুরো সপ্তাহটা। রবিবার সন্ধ্যের পর থেকে অদ্ভুত একটা শ্রান্তি মনটাকে ঘিরে ধরে । মোবাইলটা হাতে নিতে দেখলাম জিমেইলে নতুন ইনবক্স এর নোটিফিকেশন এসেছে । জিমেইল একাউন্ট ওপেন করলাম। মান্থলি প্রগ্রেসের যে রিপোর্টটা পাঠিয়েছিলাম, তার রিপ্লাই এসেছে । দেখলাম বেশ কড়া ভাষা । আমি জয়েন করার পর থেকে নাকি প্রোডাকশন একটু কমতে পারে- একমাসের রিপোর্ট সেইরকমই ইঙ্গিত দিচ্ছে । কিন্তু , সেটা কিভাবে সম্ভব ? মাথাটা ঝিমঝিম করতে লাগলো। ঠিক বুঝতে পারলাম না এরকম রিপ্লাই কেন ওনারা আমাকে পাঠালেন । সত্যি কি প্রোডাকশন কমতে পারে? আর সেরকমটা হলে আমার ইনক্রিমেন্ট তো সম্ভবই নয় । চাকরিটাই থাকবে কিনা সন্দেহ । প্রাইভেটে চাকরি তো , সবসময় বুকে দুরুদুরু ভাবটা নিয়েই ঘুরতে হয় । আমি নতুন কাজে জয়েন করে অনেকটা উৎসাহ নিয়ে কাজ করেছি এবং সেই সন্তুষ্টি নিয়েই রিপোর্টটা পাঠিয়েছিলাম। ভাবতে পারিনি এরকম নেগেটিভ রিপ্লাই আসতে পারে। মাথাটা ইন্যাক্টিভ হয়ে এলো । ভালো লাগলো না নিজের বদ্ধ ঘরটায় ।

টগর চা এনে দিলো । অশান্ত হৃদয়ে চায়ের কাপটা নিয়ে ছাদে উঠে এলাম । টগর আসার চেষ্টা করেছিল আমার পেছন পেছন।
কিন্তু, আমি তাকে কড়া গলায় বললাম, একদম এখন ছাদে উঠে আসবে না আমার সঙ্গে ।
সে আমার গলা শুনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল । আর কিছু প্রত্যুত্তর করার চেষ্টা করলো না । উঠে এলাম ছাদে । একা একা। এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না । আমি তো প্রিভিয়াস কয়েকটা মাসের রিপোর্ট চেক করেছি । আমি যে রিপোর্টটা পাঠিয়েছি, তাতে তো সেরকম কিছু ইন্ডিকেশন মালিকপক্ষের পাওয়া উচিত নয় । অন্ততপক্ষে এত তাড়াতাড়ি। জয়েন করার এক মাসের মধ্যেই । অস্থিরভাবে পায়চারী করতে করতে ভাবতে লাগলাম । হঠাৎ করে মাথায় একটা পয়েন্ট ক্লিক করলো । এমন কি হতে পারে , ওনারা আমাকে উল্টো চাপ দিয়ে প্রোডাকশন আরো বাড়ানোর চেষ্টা করছেন? যাতে করে আমি একটু চাপে পড়ে যাই এবং প্রোডাকশন ঊর্ধ্বমুখী করার আপ্রাণ চেষ্টা করি ? হ্যাঁ , হতে পারে । এমনটা হতে পারে। মালিকপক্ষ বেশিরভাগ সময়ই এইরকম জঘন্য স্ট্র্যাটেজি নিয়ে থাকে । যাইবা হোক, যে কারণেই বা হোক , কাজ শুরুর একমাস পরেই এরকম একটা নেগেটিভ রিপোর্ট আমাকে বেশ হতাশাগ্রস্ত করে দিল। কলকাতার চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে এখানে এত দূরে এসেছি বেটার কিছুর আশাতেই তো । আমাকে এরা আবার ম্যানেজারের পোস্টে রাখবে তো ? চাকরীটা আমার থাকবে তো ? এই সমস্ত চিন্তা বেশ পেয়ে বসলো । মনটা খারাপ হয়ে গেল । ছাদের কার্নিশের ওপর বসে স্থির হয়ে ভাবতে লাগলাম ।

চাঁদের রুপোলি আলো নীলচে হয়ে যেন গাঢ় অন্ধকারে ডুবে যেতে লাগলো । কি কারণ হতে পারে ? ইমেলের পরে আমার নিজস্ব কাজে কি কি পরিবর্তন আনা দরকার? প্রোডাকশন তো অবশ্যই কিছুটা বাড়াতে হবে । কি করা যায়? কিছুক্ষণ ভাবলাম । একটা স্ট্র্যাটেজি এল মাথায় । মনটা কিছুটা শান্ত হল । কিন্তু, অদ্ভুত এক হতাশার ভারে ডুবে গেল। চাঁদনী রাত .. সেই চা বাগান .. সেই.. সেই সন্ধ্যাবেলার কথা মনে পড়ল । আজ থেকে প্রায় কুড়ি বছর আগেকার এক রুপোলি চাঁদের রাত। ছাদে আমি ছিলাম, আকাশের চাঁদ ছিল , আর ‘সে’ ছিল। আমার সোনুদা –

যেদিন অজিত কাকুর বাংলোয় ডিনার করতে এসে সোনুদা আমার ঘরে গিয়ে আমাকে বলে এসেছিল , পরের দিন থেকে যেন আমি বিকেলবেলায় বান্টির সঙ্গে অবশ্যই বেরোই, তারপর থেকে সে আদেশ লঙ্ঘন করার সাধ্য আমার তখন ছিল না। পরের দিন থেকেই দুরুদুরু বুকে আবার বান্টির সঙ্গে বিকেল বেলা বেরোতে আরম্ভ করলাম। টুকটাক কথা হতো সোনুদার সঙ্গে । বান্টি অনর্গল বকে যেত । আমি দু-একটা কথা বলতাম । তবে , জড়তাটা কিছুটা কেটেছিল । মাসখানেক এভাবে কাটার পর বান্টির হঠাৎ করে খুব শরীর খারাপ হলো । টাইফয়েড জ্বর। ভীষণ বাড়াবাড়ি হয়ে গেল । প্রায় যমে মানুষে টানাটানির অবস্থায় গিয়ে পৌঁছলো । যাইহোক , শেষ পর্যন্ত জ্বর সারলেও ডক্টর বান্টিকে বাড়িতে রেস্টে থাকতে বললেন । মাসখানেক খাওয়া-দাওয়ার ওপরেও প্রচুর রেস্ট্রিকশনস হলো। স্কুলে যাওয়া বন্ধ হলো। ভামিনী কাকিমার সবকিছুতেই বেশ বাড়াবাড়ি ছিল । বান্টির এই শরীর খারাপ, তার শুশ্রূষা এবং পথ্য , ইত্যাদি সমস্ত কিছুতেই সেই একই রকমের বাড়াবাড়ি আরম্ভ হল । স্কুলের সাথে কথা বলে প্রায় মাস পাঁচ-ছয় স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল । বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ । সেদ্ধ-পক্ক খায় । আমি একাই গাড়িতে করে কলেজে যেতাম, আসতাম । বিকেলবেলা ঘুরতে বের হতাম । আর এই সময়টাতেই আমার সঙ্গে সোনুদার আলাদাভাবে মেলামেশার সুযোগ ঘটলো । প্রতিদিন বিকেলে প্রায় কোন এক অদৃশ্য চুম্বকের টানে আমি কলেজ থেকে ফিরেই বাইরে বের হতাম । সোনুদা’ও নির্দিষ্ট সময়ে চলে আসতো। ধীরে ধীরে জড়তা অনেকটাই কেটে গেল আমার । লজ্জা পেতাম খুব । যেন এক পৃথিবী লজ্জা ভর করত আমার চোখের পাতায় সোনুদা’কে দেখলেই । তবে অতোটা ভয় আর পেতাম না । কিছুটা বন্ধুত্ব হল । সহজ হয়ে এলো সম্পর্কটা।
তারপরেই এলো সেই রুপোলী চাঁদের রাত । রাত নয় , সন্ধ্যে। ঠিক আজকেরই মতো । আমি ছাদের কার্নিশে কনুই রেখে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিলাম । কি যে ভাবছিলাম , মনের কোন্ অতলে ডুব দিয়েছিলাম জানিনা । সেই সেদিন .. যেদিন প্রথম ওর আঙুল ছুঁয়েছিল আমার আঙ্গুল –
নাকি অন্যকিছু কে জানে…

ক্রমশ..

#হলদে_প্রজাপতি
(প্রাপ্তমনস্কদের জন্য )
— অমৃতা শংকর ব্যানার্জি ©®

পনেরো

ছাদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মনের মধ্যে কত কি যে রঙিন আলপনা বুনে চলেছিলাম, তার ঠিক ঠিকানা নেই । সদ্য টিনেজ পেরিয়ে যৌবনে আসা , স্কুল ছেড়ে কলেজে পড়া , রঙিন প্রজাপতির পাখনা-মেলা-মন তখন আমার । আনমনে যখনই থাকতাম , তখনই সেই সোনুদার কথাই ভাবতাম । এমনকি, কাজের মধ্যেও যখন থাকতাম , কলেজে ক্লাস করতাম, বাড়িতে পড়াশোনা করতাম, তখনও সেই একটা হাসি-হাসি মুখ আমাকে তাড়া করে বেড়াতো । লম্বা ঘণ্টাখানেকের লেকচার দিয়ে চলেছেন জেনেটিক্সের স্যার , জেনেটিক্সের মাথামুন্ডু কিছুই কি তখন আমার মাথায় ঢোকে? চোখের সামনে ভাসে সেই হাসি-হাসি মুখটা । সেই দুষ্টুমি ভরা তাকানো -! বিভিন্ন সময়ে বলা বিভিন্ন কথা, আমার দেওয়া উত্তর, কোনটা ঠিক কোনটা ভুল, কোনটা কেমন হলে ভালো হতো। ওই সময় ওইরকম বলে ফেলেছিলাম! ইসস্! এমনটা বললে না জানি কি ভালো হতো ! এই ভাবনাই আমাকে তখন মশগুল করে রাখত সব সময়। আশেপাশে যেন কার উপস্থিতি অনুভব করতে পারতাম আমি। ও সবসময় আমার সঙ্গেই আছে যেন । আমি সর্বক্ষণ একটা স্টেজে দাঁড়িয়ে রয়েছি, আমার জীবনের চিত্রনাট্যের অভিনয় চলছে সেখানে। আমি নায়িকা, সোনু দা নায়ক। সর্বক্ষণ । সারাদিন-রাত চলছে সেই নাটিকা ।

সেই সব আজগুবি কিছুই ভাবছিলাম। ঠিক তখন যে সোনুদা আমার কল্পনায় কোন অবতারের রূপে ধরা দিয়েছিল, সেটা আজ আর মনে নেই। হঠাৎ করে মনে হল কেউ যেন আমার ঠিক পেছনে একেবারে কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে । পেছন দিকে মুখ ঘুরিয়ে দেখতে পেলাম – সোনু দা ! সোনুদা এখন এই ভর সন্ধ্যেবেলা আমাদের বাংলোয় ছাদের ওপর কখন এলো?
কেন এলো?
সত্যিই কি এলো ?
আমি যে তার কথাই ভাবছিলাম । এরকমটাও সম্ভব হয় বুঝি? ভাবতে ভাবতে বুঝি এতখানি নিবিরভাবে ভাবা যায়, যে সেই মানুষটা সেই আহ্বান উপেক্ষা না করতে পেরে সশরীরে চলে আসে? কয়েক সেকেন্ড যেন ঠিক বিশ্বাস করতে পারলাম না। তারপর বিশ্বাস করতেই হল।
দেখলাম, সেই মিটিমিটি হাসিটা যে শুধু ওর চোখে মুখে লেগে আছে, তাই নয় , সেই হাসিটা মেখেই ও আমায় জিজ্ঞাসা করল,
— কি, তরু ম্যাডাম কি করছে এখানে এখন সন্ধ্যাবেলা ছাদে, একা একা? কি ব্যাপার ? বইগুলো কান্নাকাটি করবে তো!
কেমন যেন একটা শিহরণ খেলে গেল শরীর জুড়ে অকারণে। না , একেবারে অকারণে নয় । ও কথা বলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলাম ও যে সত্যিই এসেছে! তার ওপরে আমাকে সেদিন ও প্রথম ‘তরু’ বলে ডাকল । তরু বলে আমায় বাবা ডাকে। আমায় ওই নামে মা ডাকে , এখানে বান্টি ডাকে, কলেজে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড অরুনিমা আমায় ওই নামেই ডাকে। যারা আমায় ভালবাসে, আমি যাদেরকে ভালোবাসি, সকলেই আমায় ‘তরু’ বলে ডাকে। সোনুদাও আজ আমায় ওই নামে ডাকলো । তাহলে কি , ও? ও কি আমায়.. ? তার সাথে ‘ম্যাডাম’ বললো। অরুনিমার সঙ্গে আমার এখন কলেজে খুব বন্ধুত্ব হয়েছে । ওর বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে ওর অনেক ইন্টিমেসি । ওরা দুজনে অনেক রাত পর্যন্ত ফিসফিসিয়ে ল্যান্ড ফোনে কথা বলে । দুজনেই বাড়ির কাউকে জানতে দেয় না । পার্কে দেখা করে । ঠোঁটে ঠোঁট ডুবোয়। ওর বয়ফ্রেন্ড নাকি খুব রোমান্টিকভাবে ওর কানের কাছে এসে ওকে ডাকে ‘ম্যাডাম’। সোনুদা আজকে আমায় ম্যাডাম বলল ?
তবে কি ?
তবে কি..
মুখ নীচু করে বললাম, না এই একটু-
— একটু কি ? আকাশ দেখছিলে ?
— হ্যাঁ ।
আমার নিজের কোনো উত্তর রেডি ছিলনা । তাই ও যখন একটা কিছু বলেই দিল, তখন সেটাকে সমর্থন জানানোই ভালো ।
— আকাশে কি দেখছিলে শুনি, গ্যালাক্সি? মিল্কিওয়ে?
— না ।
— তবে কি?
— ঐ দুরের মিটিমিটি তারাগুলো দেখতে আমার খুব ভালোলাগে ।
ঠোঁট আর দুটো ভুরু তুলে অ্যাপ্রিসিয়েশনের ভঙ্গি করে ও বলল, ডু ইউ ফিল ইন্টারেস্ট ইন অ্যাস্ট্রোনমি ?
— না এমনি-
— তারা চেনো তুমি ? কন্স্টেলেশনস্?
‘তারা’ পর্যন্ত তো ঠিকই ছিল। ‘কন্স্টেলেশন’ বস্তুটা কী বুঝতে পারলাম না। ‘কন্স্টিপেশন’ জানি, কিন্তু, কন্স্টেলেশন’ .. ? এত ইংরেজি যে কেন বলে না ? আমাদের মাতৃভাষায় কোন শব্দটার অভাব আছে? তবে তারা শব্দটা তো একেবারে সাদামাটা বাংলা শব্দ ।
তার ওপর ভর করে আমতা আমতা করে বললাম, না তা ঠিক-
ও বলে উঠলো , কি কি চেনো তুমি ? সপ্তর্ষিমণ্ডল ? ক্যাসিওপিয়া ? পার্সিয়াস ? দেখাতে পারবে সব ?

সপ্তর্ষিমণ্ডল তো খুব ভাল করেই চিনি । ক্যাসিওপিয়াটাও জানাশোনাই , ঠিকঠাক আছে । তবে পার্সিয়াস.. ? হঠাৎ করে কমন সেন্স সজাগ হয়ে উঠল ।
সেটা আ্যপ্লাই করে বলে ফেললাম,
— সবগুলো তো সব সময় দেখা যায় না ।
আমার মুখের কাছে মুখ ঝুঁকিয়ে এনে ও বলল, কি দেখাতে পারবে তাই দেখাও । আমি দেখব।

আবার প্রশ্নোত্তর পর্ব । আমি সেখান থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য প্রসঙ্গ অন্যদিকে সরাতে চাইলাম ।
বললাম , আপনি এখন এখানে, আমাদের বাংলোয়?
— হ্যাঁ , বান্টি কেমন আছে, তাই দেখতে এসেছিলাম । তবে শুধু বান্টিকে দেখে কি আর ফিরে যেতে পারি? তার দিদির সঙ্গে দেখা না করে –
বলেই সে এক অদ্ভুত প্রশ্ন করে বসলো । বলল , আচ্ছা তুমি আমাকে এখনো এত ভয় পাও কেন বলো তো ? আর তো আমি তেমন প্রশ্ন করি না ? করি কি?
— না মানে ভয় কেন.. ভয় কিসের ?
হাত উল্টে সে মুখের এক ধরনের ভঙ্গিমা করে বলল, সেটাই তো জানিনা । ভয় কিসের ? তুমি জানো ?

বলে আবার মিটিমিটি করে হাসতে লাগল । তারপর ঠিক আমি যেমন ভঙ্গিমায় কার্নিশের ওপর কনুই রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলাম , তেমন ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে বলল , নাও দেখাও কি দেখছিলে ? কি খুঁজছিলে তুমি আকাশে –
— খুঁজবো কেন ? এমনি দেখছিলাম ।
— উঁহু, কিছু একটা খুঁজছিলে তুমি । কি বলতো ?
— না কিছু খুঁজিনি ।
— কই তুমি দাঁড়াও তো এখানে, যেভাবে দাঁড়িয়েছিলে । আমার পাশে এসে দাঁড়াও ।
ওর প্রতিটা কথাই কেমন একটু ব্যাঙ্গার্থক , বোঝাতে পারবো না । তবে বুঝতে পারতাম। কিন্তু, অমান্য করার সাধ্য ছিল না আমার। ও যাই বলতো , সেটাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো করতাম । ওর পাশে এসে কার্নিশের ওপর কনুই রেখে দাঁড়ালাম ।
ও বলল, এবার বলতো কি দেখছিলে তুমি ?
বললাম , ওই যে , ওই দূরের মিটিমিটি তারাগুলো আমার দেখতে ভারী ভালোলাগে ।
— কিন্তু আজকে তো আকাশ জুড়ে চাঁদের আলো । এত চাঁদের আলোয় কি ভালো করে তারা দেখতে পাও ?
আমি বললাম , যা দেখতে পাই , সেটাই খুব ভালোলাগে ।
ও বলল , তাকাও তো আমার দিকে ।
এই একটা কাজ যখন ও করতে বলে, তখন ভারী বিপদে পড়ে যাই। ওর দিকে সরাসরি চোখ তুলে তাকাতে আমার যে কি হয়, আমি ঠিক বলে বোঝাতে পারবো না । পেটের মধ্যে কেমন যেন গুড়গুড় করে , বুক দুরুদুরু করে । ও আমাকে ওর দিকে তাকাতে বলে কেন ? যদি বা অন্যদিকে তাকিয়ে একটু সহজ স্বাভাবিক থাকতে পারি, ওর দিকে তাকালে আমি একেবারেই ভ্যাবলাকান্ত’টি । তবুও কি আর করা ? এক আকাশ লজ্জা নিয়ে ওর দিকে ফিরে চোখ তুলে তাকালাম ।
ও আমার দিকে দুষ্টুমি ভরা চোখে তাকিয়ে বলল , এখন কি দেখছ ?
আমি যদিবা অনেকটা লজ্জা অতিক্রম করে তাকিয়েছিলাম ওর দিকে , এমন প্রশ্ন শুনে সঙ্গে সঙ্গে চোখ ফিরিয়ে নিলাম ।
ও ঝুঁকে পড়ে আমার মুখটা সামনাসামনি দেখার চেষ্টা করে বললো , চোখ সরালে যে? কি হলো ? তাকাতে বললাম না, আমার দিকে ?
আমি ছাদের কার্নিশের ওপর চোখ নামিয়ে আঙ্গুল দিয়ে কারিকুরি করতে করতে বললাম, আপনার দিকে তাকানোর কি আছে ?
— কি আছে সেটা না তাকালে বুঝবে কি করে?
কিছু একটা বলব বলব ভাবলাম । কিন্তু শেষমেশ বলে উঠতে পারলাম না।
— কি হলো, তাকাবে না তো ?
আমি কিছু বললাম না । শুধু একটা ঢোঁক গিললাম।
— কার মধ্যে কি আছে সেটা কি ওমনি দূর থেকে বোঝা যায়? দেখতে হয়, বুঝতে হয়, জানতে হয়।
আমি ওর দিকে না তাকিয়েও বুঝতে পারলাম ও কথা বলতে বলতে মিটিমিটি হাসছে ।
বললাম, আপনি তো জানেন নিজের মধ্যে কি রয়েছে । বলে দিন তাহলে সেটা ।
ফিক করে হাসল ও । বলল, সেটা আমি বলতে পারি। কিন্তু, আমার দিকে তাকিয়েই সেটা শুনতে হবে ।
— বা রে ! মানুষ বুঝি চোখ দিয়ে শোনে ? আমার কান খোলা আছে । আপনি বলুন ।
— উঁহু, আমার দিকে না তাকালে আমি বলবো না ।
ছাদের কার্নিশ থেকে কনুই দুটো তুলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বুকের উপর দু’হাত ক্রস করে রাখল ও। দাঁড়ানোর এই ভঙ্গিমাটার মধ্যে কি আছে ঠিক জানি না , তবে কেমন যেন মনে হয় মানুষটা একটু দূরে চলে গেল । ভয়ে ভয়ে তাকালাম । ও যদি এখনই ছাদ থেকে নেমে চলে যায়, এই সমস্ত বিরল মুহূর্ত, এমন সব মুহূর্ত , যা আমি সর্বক্ষণ মনে মনে কল্পনা করি- আমি নিজের ঘরে রয়েছি, হঠাৎ করে ও সেখানে চলে এলে কেমন হয় ? এই আমি ছাদে ঘুরছি, যদি এখন ও চলে আসে? কলেজের ক্লাসরুমে বসে রয়েছি , ও ঠিক আমার পাশে বসে থাকলে কি হত ? বা , যদি প্রফেসরের জায়গায় ও দাঁড়িয়ে লেকচারটা দিত , আমি অবাক হয়ে শুনতাম ? আর এই সমস্ত স্বর্ণ-মুহূর্ত এসে পড়লেই, আমি কেমন যেন ভেবড়ে যাই ।
তরু, না ! এখন কিছুতেই ওকে ছাদ থেকে চলে যেতে দেওয়া যাবে না। জোর করে নিজের চোখ দুটোকে শাসন করলাম , লজ্জাকে শাসন করলাম। তারপর এক পৃথিবী ভার দুটো চোখের পাতায় উত্তোলন করে আমি জোর করে তাকালাম ওর দিকে ।
বললাম , তাকিয়েছি বলুন এবার ।
ও একটু সরে এলো আমার কাছে । নিচু হয়ে মাথাটাকে ঝুঁকিয়ে সরাসরি আমার চোখের মধ্যে তাকালো ।
বলল, ‘ফিলোসফার্স স্টোন’ জানা আছে , কাকে বলে ?
দ্বন্দ্বে পড়লাম । ফিলোজফার কাকে বলে তা জানি, স্টোন কি তাও জানি । তবে ‘ফিলোসফার্স স্টোন’টা কি পদার্থ কে জানে । আবার প্রশ্নের উত্তর না দিতে পারার লজ্জা ।
চোখ নামিয়ে নিতে যাচ্ছিলাম , ও বলল, উঁহু! চোখ নামালে হবে না । বল জানা আছে কিনা ।
মুখে সেই মিটিমিটি হাসি ।
আমি বললাম না কিছু । নিঃশব্দে ঘাড় নাড়লাম দুদিকে।
ও বলল , এলিক্সির অফ লাইফ ?
অসহায় লাগছিল ! মনে হচ্ছিল যেন ও সম্পূর্ণ অজানা কোন একটা ভাষায় কথা বলছে । আরো জোরে দুদিকে ঘাড় নাড়লাম । যেন বিদ্রোহ ঘোষণা করলাম ওর প্রশ্নগুলোর বিরুদ্ধে । এমন অনুচিত প্রশ্ন এখনই বন্ধ করা উচিত! উচিত , উচিত !
ও বাঁ হাতটাকে কপালের পাশে নিয়ে গিয়ে তর্জনীটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বলল, হুম ! কি করে যে বোঝাই তোমায়-
তারপর হঠাৎ করে খুশি খুশি গলায় বলে উঠল, হ্যাঁ মনে পড়েছে – পরশ পাথর । পরশ পাথর কি নিশ্চয়ই জানো ?
এবার ডানদিকে ঘাড় কাত করে বললাম, হ্যাঁ ।
— বেশ , কি বলতো ? উঁহু , চোখ একদম সরাবে না । আমার দিকে তাকিয়েই বল।
মিনমিনে গলায় বললাম, পরশ পাথর ! ঐতো এমন একটা পাথর , যেটা দিয়ে যে কোনো কিছুকে টাচ করলে সেটা সোনা হয়ে যায় ।
— গুড , তার মানে ম্যাজিকাল কিছু তাইতো?
— হ্যাঁ ।
— এই ম্যাজিক্যাল কিছু যে কারোর মধ্যে রয়েছে কি না , তা কি অমনি অমনি বোঝা যায়? তাকে দেখতে হয়, বুঝতে হয়, জানতে হয় ।
— হুম !
— কী , হুম? কী বুঝলে বলো ।
— না মানে-
— হ্যাঁ বলো-
— মানে , আপনি কি বলতে চাইছেন ? আপনার মধ্যে ম্যাজিকাল কিছু রয়েছে ?
এক নিঃশ্বাসে বলে ফেললাম কথাগুলো ।
হাত উল্টে ও বলল, কি জানি থাকতেও পারে । সে কি আর নিজে নিজে বোঝা যায় ? অন্য কেউ বললে এক বুঝতে পারি।
— মানে ?
— মানে , পিসি সরকারের ম্যাজিক দেখে এত এত অডিয়েন্স ম্যাজিকাল কিছু দেখতে পায় বলেই না পিসি সরকার, পিসি সরকার হয়েছেন?
— মানে আপনি কি বলতে চাইছেন , আপনি পিসি সরকার ?
জোরে হেসে উঠল ও । বলল , পিসি সরকার না হলেও ছোটখাটো ম্যাজিশিয়ান তো হতে পারি ।
অবিশ্বাস ভরা চোখে বললাম , আপনি ম্যাজিক দেখাতে পারেন ?
— ইয়েস , চেষ্টা তো করতে পারি ।
বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝখানে দুলতে লাগলাম । অবাক চোখে ওর দিকে তাকিয়ে সত্যিই খুঁজতে লাগলাম ওর মধ্যে কি কিছু একটা ম্যাজিকাল রয়েছে? ও কি সত্যিই ম্যাজিশিয়ান ?
ও ঠোঁট টিপে হেসে বলল, ম্যাজিক দেখতে গেলে চোখ বন্ধ করতে হবে । এইরকম করে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকলে তো ম্যাজিক দেখানো যাবে না ।
আমি বললাম, চোখ বন্ধই করে ফেললে আর ম্যাজিক কোথায় হল? পিসি সরকারের ম্যাজিক বুঝি আমরা চোখ বন্ধ করে দেখি?
— সব ম্যাজিক কি একরকম হয় নাকি ? আমি যে ম্যাজিকটা দেখাবো সেটা চোখ বন্ধ করে দেখতে হবে ।
— চোখ বন্ধ করে ফেললে আর দেখবোটা কি ?
— সেটা চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাবে।
আমি কি করব বুঝতে না পেরে সেইভাবেই দাঁড়িয়ে রইলাম । ও ওর বাঁ হাতটা আমার মুখের কাছে নিয়ে এসে আমার চোখের পাতায় স্পর্শ করল । কেঁপে উঠলাম আমি ! ইস্, কি লজ্জা ! ও বুঝতে পারেনি তো , আমি কেঁপে উঠেছি? ওকে আর কিছুই করতে হলো না , আপনি আপনিই আমার দুটো চোখের পাতা সমস্ত লজ্জার ভার গায়ে মেখে বন্ধ হয়ে পড়লো টুপ্ করে ।

কিছুক্ষণ সবকিছু অন্ধকার । তারপর হঠাৎ করে যেন হাজার-মুখী একটা লাইট জ্বলে উঠলো আমার মনের মধ্যে। নাকি হাতে ? কোথায় কি হলো কে জানে । আমি বুঝতে পারলাম, ও আমার ডানহাতটা নিজের বাঁহাতে তুলে নিয়েছে । তারপরে আমার অবশ হয়ে যাওয়া হাতের আলগা মুঠোটা খুলে ফেলে, ডানহাতের ওর আঙুলগুলো দিয়ে আমার আঙুলগুলো স্পর্শ করেছে । তর্জনী, মধ্যমা , অনামিকা, কনিষ্ঠা , প্রতিটা আঙ্গুলের ডগা ওর আঙ্গুলের স্পর্শ পাচ্ছে। এক এক করে আমার আঙুলগুলো ভিজে যাচ্ছে , গলে যাচ্ছে । আমি দ্রবীভূত হয়ে যাচ্ছি । বিন্দুতে বিন্দুতে মিশে যাচ্ছি সান্ধ্য-হাওয়ার স্রোতে। এ কি অদ্ভুত কান্ড ! শুধু আমার আঙ্গুলের ডগাগুলো ও স্পর্শ করে দিল, তাতেই আমি এভাবে গলে যাচ্ছি ? আস্তে আস্তে ও আমার আঙ্গুলের ডগা ছেড়ে, আঙুলগুলো বরাবর প্রতিটা খাঁজে ওর তর্জনী বুলিয়ে দিতে লাগল। তারপরে দুটো হাতই ওর হাতের মধ্যে তুলে নিয়ে আমার আঙ্গুলের খাঁজে খাঁজে ওর আঙুলগুলো ডুবিয়ে দিয়ে আমাকে কার্নিশের গায়ে চেপে ধরল । আমার আঙ্গুলের প্রতিটা ভাঁজ তখন ওর আঙ্গুলের প্রতিটা ভাঁজের সাথে মিলেমিশে একাকার । আমার মনের মধ্যে মেঘ চমকাচ্ছে, বৃষ্টি হচ্ছে । আমি ভিজে যাচ্ছি । চমকে উঠছি । কেঁপে কেঁপে উঠছি। চোখ খুলতে ভয় পাচ্ছি । চোখ খুললেই যেন এই স্বপ্ন থেকে জেগে উঠে পড়বো । আর কোনদিন এই স্বপ্ন আমি দেখতে পাবো না ।
কি যেন বলছিল ও?
পরশ পাথর ?
ও ম্যাজিশিয়ান ? ওর কাছে পরশপাথর আছে ? পরশ পাথর দিয়ে ছুঁয়ে দিলে আমি সোনা হয়ে যাব ?
মনের প্রতিটা কোণ তখন আমার তরল হলুদ ধাতুর বর্ণ ধরে গলে গলে পড়ছে । ছাদের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে সেই তরল স্বর্ণাভ করে দিয়েছে প্রতিটা চা গাছের পাতা । আশেপাশের বিশাল চা বাগান হলুদ আলোয় হাসছে। ঝিকমিক করছে । আমার শরীর-মনের তরল সোনা নিজের বর্ণে রাঙিয়ে দিয়েছে সমগ্র পৃথিবীকে । সোনালী তারাগুলোর থেকে সোনালী মিটিমিটি আলোর বিকিরণ হচ্ছে । গোটা পৃথিবীটা এমন করে এক নিমেষে সোনায় বাঁধানো হয়ে গেল কি করে ?
পরশ পাথর !
কতক্ষণ এভাবে ছিলাম জানিনা । হয়তো সময়ের হিসেব করলে দাঁড়াবে দু তিন মিনিট । তবুও আমি জানি দু তিন যুগের কম তা ছিল না ।

হঠাৎ করে , হঠাৎ করেই, চোখ খুলে আমি ওর আঙুলগুলো ছাড়িয়ে নিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে সিঁড়ির পথ ধরলাম । সিঁড়ি বেয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে দোতলায় নেমে সটান চলে গেলাম আমার ঘরে । দরজায় আগল দিলাম । সেদিন সন্ধ্যাবেলা সেই আগল আর খুললাম না । কি করেছিলাম সেদিন ঘরের মধ্যে নিজেই জানিনা । কোনো খেয়ালই ছিলনা । কখনো মনে হচ্ছিল হয়তো পাতালে ডুবে যাচ্ছি । কখনো মনে হচ্ছিল, মেঘের রাজ্যে সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছি। কখন যে কি হচ্ছে ! বইয়ের পাতা খুলে বসলে তার রং হলদে হয়ে যাচ্ছে। পৃথিবী জুড়ে সর্বত্র তরল সোনা ! শুধু এটুকু মনে আছে , মাঝে একবার দেওয়াল আলমারিটা খুলে নিজের চুড়িদারগুলোর মধ্যে থেকে বেছে বেছে হলুদ চুড়িদারগুলো বার করে সব ওপরে সাজিয়ে রেখেছিলাম । হলুদ রং বড় প্রিয় হল আমার সেদিন থেকে । পরশ পাথর যে সব কিছুকে হলুদ সোনায় রূপান্তর ঘটায় !

হুঁশ ফিরেছিল যখন বাড়ির একজন কেয়ারটেকার রাজীব কাকা আমার বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে আমাকে নক করে বলেছিল , দিদি খাবেন আসুন । সাড়ে নটা বাজে । সবাই টেবিলে ওয়েট করছেন আপনার জন্য ।

ধড়মড়্ করে উঠে বসে ছুটেছিলাম একতলায় ডাইনিং স্পেসে। নটা পঁয়ত্রিশ বাজছে । সকলেই রয়েছে সেখানে। ভামিনী কাকিমার মুখ গম্ভীর, থমথমে। টেবিলে আমার নিজের জন্য নির্দিষ্ট চেয়ারটায় ধপ্ করে বসে পড়ে চামচ আর কাঁটাচামচ হাতে তুলে নিয়েছিলাম । সেইদিন প্রথম ভামিনী কাকিমার লাগু করা একটা নিয়মের চেয়ে উৎকৃষ্ট কোন নিয়ম আর পৃথিবীতে বলবৎ হতে পারে বলে আমার মনে হয় নি । সেই প্রথম ভামিনী কাকিমার করা শ্বাসরুদ্ধকর নিয়মের জাল আমাকে এক পশলা বৃষ্টি এনে দিয়েছিল । কাঁটাচামচ , চামচ ! আমাকে না তো হাতে করে মেখে খেতে হবে, না তো খেয়ে উঠে হাত ধুতে হবে। সারাটা রাত আমি আমার সোনুদার স্পর্শ মেখে ঘুমোতে পারব।

ক্রমশ..