Home "ধারাবাহিক গল্প "হৃদয় জানে মনের কথা হৃদয় জানে মনের কথা পর্ব-১৩

হৃদয় জানে মনের কথা পর্ব-১৩

0
408

#হৃদয়_জানে_মনের_কথা
#পর্ব_১৩
#লেখনীতে_মারিয়া_আক্তার_মাতিন

স্রোত চোখদুটো খিঁচে বন্ধ করে দুহাতে অন্বয়ের গলা জড়িয়ে ধরে রেখেছে। ভিতর ভিতর কেমন যেন লাগছে তার। অন্বয় আলতো করে স্রোতকে বিছানায় বসিয়ে দিল। স্রোতের পাশ থেকে বালিশ নিয়ে সোফার দিকে যেতে লাগলো। স্রোত যেন আহাম্মক বনে গেল। সে বোকার মতো তাকিয়ে অন্বয়ের কার্যবিধি লক্ষ্য করছে। অন্বয় সোফায় বালিশ রেখে ফের স্রোতের কাছে এসে তার পাশে বসলো। স্রোতের চোখদুটোতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বলল,
-“আমি তোকে ভালোবাসি, স্রোত। জানিস, ভালোবাসার সাথে মিশে আছে বিশ্বাস ও সম্মান। তুই আমায় কতটুকু বিশ্বাস করিস তা বলতে পারব না, কিন্তু আমি তোকে বিশ্বাস করি। তোর যেকোনো বিপদে তুই আমায় পাশে পাবি। তোকে অস্বস্তিতে ফেলে আমি অধিকার আদায় করতে চাই না। আমি জানি, তোর মনে এখনো প্রশ্ন আছে, বাসর রাতে কেন আমি তোর সাথে খারাপ ব্যবহার করেছিলাম। সে প্রশ্নের উত্তর আমি এখন দিব না। সেটা তুই যেদিন নিজে অনুভব করতে পারবি, সেদিন উত্তর পাবি। যেদিন তুই আমায় পূর্ণ বিশ্বাস করতে পারবি, নিজ থেকে আমায় পেতে চাইবি, সেদিনই আমি আমার অধিকার বুঝে নিব। তুই যে পথে অস্বস্তি অনুভব করিস, সে পথে আমি কোনোদিন পা বাড়াব না।”

স্রোত ভীষণ মনোযোগী শ্রোতা হয়ে অন্বয়ের কথাগুলো শুনেছে। অন্বয়ের প্রতি তার মনে সম্মান যেন বেড় গেল বহুগুণ। অন্বয় ভাই তাকে এতো ভালোবাসে? তার মনের কথা কীভাবে বুঝে ফেলল! সত্যি বলতে, সে নিজেও প্রস্তুত ছিল না এই ঘনিষ্ঠতার জন্য। তার আরও সময়ের প্রয়োজন। আর ঠিক এই বিষয়টাই তার অন্বয় ভাই একদম অক্ষরে অক্ষরে বুঝে ফেলেছে। স্রোত আবেগে আপ্লুত হয়ে অন্বয়কে জড়িয়ে ধরল। নিজের মাথা রাখলো তার বুকে। অন্বয়ও মুচকি হেসে স্রোতকে পরম যত্নে আগলে ধরলো। স্রোত নিজের আবেগ প্রকাশ করলো কথায়,
-“আমার মন বুঝার জন্য থ্যাংক ইউ, অন্বয় ভাই! থ্যাংক ইউ!”

হঠাৎ অন্বয় স্রোতকে নিজের থেকে সরিয়ে দিয়ে বলল,
-“কী বললি তুই?”

স্রোত কেমন হকচকিয়ে গেল। সে কী বলেছে! খারাপ তো কিছু বলেনি। তার মন বুঝার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছে। এতে করে উনি রাগ করছেন কেন? অন্বয় বলল,
-“আমি তোর স্বামী, তোর সবচেয়ে আপনজন। আমার সাথে এতো কীসের ফর্মালিটি? থ্যাংক ইউ বলে মানুষ ফর্মালিটির জন্য। আমার সাথে কোনোপ্রকার ফর্মালিটি চলবে না।”

-“আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চেয়েছিলাম৷”

-“তাহলে অন্যভাবে কর।”

স্রোত জিজ্ঞেস করল,
-“কীভাবে করব?”

অন্বয় কিছুক্ষণ চিন্তা করার ভান ধরে বলল,
-“উমম, কীভাবে প্রকাশ করবি, তাই তো! কীভাবে করা যায়, কীভাবে করা যায়…
উপায় পেয়েছি, আমায় আই লাভ ইউ বল। তাহলেই তোর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হবে।”

স্রোত লোকটার ধান্দাবাজি খুব ভালো করেই বুঝতে পারলো। এই লোকটা জীবনে শুধরাবে না। সুযোগ পেলেই কীভাবে তাকে লজ্জায় ফেলা যায়, তার উপায় খুঁজে। সে ফোস করে শ্বাস ছেড়ে বলল,
-“সেটা শুরুতে বললেই পারতেন। এতো চিন্তা ভাবনার নাটক করার কী দরকার ছিল? কী ভেবেছেন, আপনার মতলব আমি বুঝি না? আপনি হচ্ছেন একটা মিচকে শয়’তান।”

অন্বয় ভ্রু কুঁচকে বলল,
-“এসব কেমন ভাষা স্রোত? মামা, মামি তোকে এসব শিখিয়েছে?”

-“ মিচকে শয়’তান তো আজকাল সবাই বলে।”

-“সবাই বললেই তোর কেন বলতে হবে? সবার সাথে কি তোর তুলনা? আর একদিনও যেন তোর মুখে এসব কথা না শুনি। আমি চাই না, ভবিষ্যতে আমার সন্তান তার মায়ের মুখে এসব কথা শুনে বড়ো হোক।”

স্রোত বিড়বিড় করে বলল,
-“এখনই সন্তান পর্যন্ত চলে গেছে!”

বিড়বিড় করে বললেও অন্বয় স্পষ্ট শুনতে পেল। সে বলল,
-“এখন ছাড় দিয়েছি দেখে কি পরেও দেব নাকি?এতোটা ভদ্র আমি নই।”

-“আপনি এক নাম্বারের অসভ্য।”

-“জানি। এখন কি তাহলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবি না? করলে কর, নাহলে আমি এখন ঘুমাতে যাব।”

স্রোত লজ্জা পাচ্ছে। তিন শব্দের একটা বাক্য অথচ জিভ খসে সে বলতে পারছে না। স্রোতের দোনামোনা দেখে অন্বয়ের বুকের ভিতরটা কেমন কামড়ে ধরলো। একটা সূক্ষ্ম ব্যথা অনুভব করলো সে। তার মানে, স্রোত এখনো তাকে পরিপূর্ণভাবে ভালোবাসতে পারেনি। নয়তো সে যেখানে ভালোবাসার কথা স্বীকার করেছে সেখানে তার স্রোত কেন বলতে পারছে না? সে স্রোতের উপর থেকে নজর সরিয়ে উঠে দাঁড়ালো। এক পা এগোতেই স্রোত বলল,
-“আই লাভ ইউ, আমার জীবনের প্রথম এবং শেষ ভালোবাসার মানুষ। আপনাকে আপনার স্রোত অনেক ভালোবাসে।”

অন্বয় চমকে স্রোতের দিকে তাকালো। তার বিশ্বাস হচ্ছে না, স্রোত এ কথা বলেছে। সে স্রোতের সামনে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে বলল,
-“কী বললি? আরেকবার বল!”

-“আই লাভ ইউ!”

-“আরেকবার!”

-“আই লাভ ইউ, আই লাভ ইউ, আই লাভ ইউ!”

বলার সাথে সাথেই অন্বয় স্রোতকে পাঁজা কোলে নিয়ে চারপাশে ঘুরাতে লাগলো। সে আজ কতোটা খুশি হয়েছে তা সে বোঝাতে পারবে না। জীবনে এতো খুশি সে কখনো হয়নি। তার স্রোত, তার হৃদয়হরণী তাকে ভালোবাসি বলেছে! এর চেয়ে বড়ো প্রাপ্তি আর কী হতে পারে? স্রোত কোনোরকম বলার চেষ্টা করলো,
-“থামুন, অন্বয় ভাই৷ পড়ে যাবো তো!”

অন্বয় স্রোতকে নামিয়ে দিল। তার দুচোখে প্রাপ্তির আনন্দ। হঠাৎ তার মনে পড়লো সে যে কারণে অফিস থেকে দ্রুত চলে আসলো, এতো গুরুত্বপূর্ণ একটা মিটিং ক্যান্সেল করলো, সে কাজটাই তো বাকি পড়ে আছে। সে স্রোতকে বলল,
-“ব্যালকনিতে আয়।”

স্রোত বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল,
-“হঠাৎ ব্যালকনিতে কেন? আপনি না ঘুমাবেন?”

-“আমার চোখের ঘুম উড়ে গেছে, স্রোত। তোর মুখের ভালোবাসি শব্দটা আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছে।”

স্রোত লাজুক ভঙ্গিতে হাসলো। অন্বয় সেদিক চেয়ে বলল,
-“এভাবে হাসিস না। তোকে এভাবে হাসতে দেখলে আমার কিছু করে ফেলতে ইচ্ছে করে।”

-“উফ! আপনিও না!”

স্রোতকে লজ্জা পেতে দেখে অন্বয় শব্দ করে হাসলো। স্রোত আকাশসম বিস্ময় নিয়ে সে হাসি দেখছে। কখনো এভাবে মন খুলে তার অন্বয় ভাইকে হাসতে দেখেনি সে। আজই প্রথম দেখলো । বুঝাই যাচ্ছে, তার ওই একটা স্বীকারোক্তিতে লোকটা কতখানি খুশি হয়েছে।

স্রোত ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো। তার পিছে পিছেই আসলো অন্বয়। গভীর স্বরে ডাকলো,
-“স্রোওওওত!”

অন্বয়ের এমন গভীর স্বর স্রোতের শরীরে শিহরণ জাগায়। সে অন্বয়ের দিকে ফিরে বলল,
-“জ..জি?”

অন্বয়ের একহাত পিছনে ছিল। সে হাত সামনে এনে স্রোতের সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো। তার হাতে সকালে আনা সেই ফুলগুলো। সে ফুলগুলো স্রোতের সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
-“আমার স্রোত, আমার হৃদয়হরণী, আমার প্রণয়িনীর জন্য একগুচ্ছ গোলাপ ফুল। আমি আমার এই ব্যক্তিগত নারীকে নিয়েই সারাজীবন পাড়ি দিতে চাই, একটা লম্বা সফর শেষ করতে চাই। আমার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমি শুধু তোকে চাই, আমার প্রতিটা নিঃশ্বাসে আমি শুধু তোকে চাই, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি শুধু তোকেই চাই। তুই কি থাকবি সারাজীবন এই পুরুষটার বুকে বন্দি হয়ে?”

স্রোতের চোখদুটো ছলছল করছে। হৃদয় মাঝে প্রেমের বন্যা বইছে তার। ভালো লাগায়, ভালোবাসায় সে কেমন খেই হারিয়ে ফেলল। মুখ ফুটে কথা বলতে গিয়েও বলতে পারছে না। গলায় আটকে আসছে। অন্বয় ব্যাকুল হয়ে স্রোতের জবাবের আশায় বসে আছে। লোকটাকে হতাশ করা যাবে না। সে হাত বাড়িয়ে ফুলগুলো নিয়ে বলল,
-“আমি থাকবো, অন্বয় ভাই। আমি সারাজীবন আপনার বুকে বন্দি হয়ে থাকবো। আপনাকে ছেড়ে কখনো কোথাও যাবো না। আমি শুধু আপনার হয়েই থাকবো।”

অন্বয় খুশি হয়ে স্রোতকে জড়িয়ে ধরলো। আচমকা স্রোতের বুকের ভিতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। মনটা কেমন অস্থির হয়ে গেল নিমিষেই। নিজের এই অনুভূতি, অস্থিরতা সম্পর্কে সে বেশ ভালোভাবেই অবগত। যখনই সামনে খারাপ কিছু হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তখনই তার এমন লাগে, এমন অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। বাবা মারা যাওয়ার এক মাস আগে থেকেই তার মনে এমন অশান্তি সৃষ্টি হয়েছিল, বারবার মনে হচ্ছিল সামনে খারাপ কিছু হবে। তাহলে হঠাৎ এমন লাগছে কেন তার? তার মানে কি সামনে খারাপ কিছু অপেক্ষা করছে? সে কি তার অন্বয় ভাইকে হারিয়ে ফেলবে? না, না, এমন ভাবনা ভাবলেই তো দম বন্ধ হয়ে আসে। সে বেশ শক্ত করে অন্বয়কে জড়িয়ে ধরলো। মনে মনে বলল,
-“আমি আপনাকে হারাতে দিব না, অন্বয় ভাই!”

চলবে……..