Home "ধারাবাহিক গল্প হৃদয় হারানো বিজ্ঞপ্তি হৃদয় হারানো বিজ্ঞপ্তি পর্ব-১০

হৃদয় হারানো বিজ্ঞপ্তি পর্ব-১০

0
69

#হৃদয়_হারানো_বিজ্ঞপ্তি
#পর্ব_১০
#Tahmina_Akhter

বেশ কয়েকদিন পর……

— আমি এই বিয়ের দেনমোহর নির্ধারণ মানি না।

ভরা বিয়ের আসরে বরের মুখ থেকে এমন কথা শুনে কাজিসহ উপস্থিত মেহমানরা বিস্মিত হলো। সাদা পর্দার ওপাশে থাকা কনে নিজেও অবাক হলো। যদি এমন দেনমোহর নির্ধারণ পছন্দ না হয় তাহলে বিয়ের আগেই ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ করলেই হত। বিয়ের আসরে এসে এসব বলার মানে কি?? নাকি বিয়ে ভাঙার জন্য এমন দাবী করছে??

— দেনমোহর নিয়ে গতকাল রাতেই তোমার সাথে কথা হলো আমার। কই তখন তো কিছু বললে না!! এখন মূল আয়োজনে এসে এমন দাবী তোলার কারণ কি?

রুমানা এগিয়ে এসে ফায়েজকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বললো। ফায়েজ রুমানাকে উদ্দেশ্য করে উত্তর দিলো,,

——- কারণটা খুবই সিম্পল ফুপি। দেনমোহর নির্ধারণ আমার পছন্দ হয়নি।

— তাহলে বলো কত টাকার দেনমোহর নির্ধারণ করতে চাও?

রুমানার কথায় ফায়েজ মুচকি হাসলো। তারপর খেয়ার দিকে আঙুল তাক করে রুমানাকে বললো,,

— ফুপি,, বেশি না জাস্ট দশমিনিটের জন্য খেয়ার সঙ্গে কথা বলব। আমার বিয়ের পরবর্তী দিনগুলোর জন্য হলেও ওর সঙ্গে কথা বলে নেয়াটা জরুরি। সেই সঙ্গে দেনমোহরের ব্যাপারটা তো আছেই।

এবার যেন ঘি তে ফোঁড়ন পরলো। বিয়ের আসরে মানুষের কানাকানি শুরু হলো। এক একজনের এক একটা ভবিষ্যত বাণী। রুমানা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। পর্দার ওপাড়ে থাকা খেয়া সবটা শুনলো। ফায়েজ উঠে দাঁড়ালো। ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় খেয়ার কাছে। খেয়ার সামনে এসে হাত বাড়িয়ে দেয়। খেয়া ফায়েজের হাতের দিকে তাকিয়ে রইলো। শুভ্র বর্ণের লোমশ বামহস্তির অনামিকা আঙুলে জ্বলজ্বল করছে k বর্ণ খচিত একটি আংটি। ফায়েজের বাড়িয়ে দেয়া হাতের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো খেয়া। ফায়েজ খেয়ার হাত ধরলো আলতো করে। হাওয়াই মিঠাই যেভাবে ধরে ঠিক সেভাবে। যেন শক্ত করে ধরলে খেয়া ব্যাথা পাবে। খেয়াকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে কনভেনশন সেন্টারের একটি রুমের দিকে। উপস্থিত সবার দৃষ্টি আকর্ষণ কেবল ফায়েজ এবং খেয়ার দিকে।

রুমের ভেতরে ঢুকলো দুজন। খেয়া আলগোছে লেহেঙ্গা দু’হাত দিয়ে একটুখানি উচু করে ধরে দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফায়েজ দরজা পুরোপুরি বন্ধ করলো না।

— আপনি যদি শূন্য অংকের সংখ্যা দেনমোহর নির্ধারণ করতেন তবুও আমি কিছু বলতাম না। দেনমোহরে কি আসে যায়?? সংসার টিকিয়ে রাখতে দুটো মানুষের অসীম ভালোবাসা যথেষ্ট। অঢেল টাকা দিয়ে সম্পত্তি কেনা যায়, সম্পর্ক না।

শেষের কথাগুলো বলার সময় খেয়ার কন্ঠস্বর কাঁপছিল। ফায়েজ বুঝলো কি না কে জানে? খেয়ার খুব কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। খুব কাছে যতটা কাছে দাঁড়ালে একজন আরেকজনের শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যাপারটা টের পায়। খেয়ার অস্বস্তি হচ্ছে ফায়েজের এত কাছে আসাতে। দূরে সরে যেতে চায় কিন্তু ফায়েজ দূরে সরতে দেয় না উল্টো হাত ধরে কাছে টেনে আগের জায়গায় দাঁড় করিয়ে বললো,,

— দেনমোহর হলো একজন স্ত্রী হক। আমি আমার স্ত্রীর হোক আদায় করব। সে যত টাকা চায় আমি দিতে প্রস্তুত। কারণ,, সে আমার অর্ধাঙ্গিনী।

— তাহলে সবার সামনে বললেন যে,, আপনি দশ লক্ষ টাকার দেনমোহর নির্ধারণে খুশি নন।

খেয়ার কথায় হাসলো ফায়েজ। ফায়েজের হাসি দেখে খেয়ার রাগ হচ্ছে কিন্তু রাগের বহিঃপ্রকাশ করতে পারছে না।

— আমি তো তোমার দেনমোহর শোধ করব কিন্তু তুমি আমার জন্য কি করবে??

— আপনি কি আপনার দেনমোহরের কথা বলছেন?? কিন্তু ছেলেরা তো দেনমোহর পায় না।

খেয়ার কথা শুনে ফায়েজ হেসে ফেললো। খেয়া বোকার মতো তাকিয়ে রইলো। কারণ সে হেসে ফেলার মতো কোনো কথা বলেনি। ফায়েজ হাসি থামিয়ে বললো,,

— আমি আমার স্ত্রী হোক আদায় করছি কিনা সেটা একটা কাগজের টুকরোতে প্রমাণ হিসেবে থাকবে। কিন্তু,, আমার স্ত্রী আমার প্রতি তার হক আদায় করলো কিনা সেই ব্যাপারটা কিন্তু কাবিননামার কোথাও উল্লেখ্য থাকবে না। কারণ,, এমন কোনো প্রথা প্রচলিত নেই।

— আপনি সোজাসাপটা বলুন কি বলতে চাইছেন?

ফায়েজকে থামিয়ে দিয়ে উল্টো প্রশ্ন করলো খেয়া। ফায়েজ খেয়ার চোখের দিকে তাকালো। একেবারে গাঢ় দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। খেয়া সেই চোখে তাকালো না। চোখ নামিয়ে ফেললো। ফায়েজ হাত বাড়িয়ে খেয়ার থুতনি উচু করে ধরলো। খেয়া তবুও তাকালো না চোখ দুটো বন্ধ করে রাখলো। কিছু পেতে হলে কিছু দিতে হয়। সেই বিশ্বাস রেখেই আপাতত ফায়েজকে কিছু বলছে না। নয়তো খেয়াকে ছুঁয়ে দেখার আজন্মের শখ ঘুচিয়ে দিত।

— কাবিননামায় যেমন দেনমোহরের অংক উল্লেখ্য থাকবে ঠিক তেমনিভাবে আরও একটি চুক্তি সনদপত্র থাকবে তোমার এবং আমার। সেই চুক্তি সনদপত্রে উল্লেখ্য থাকবে তুমি আমাকে কখনোই ছেড়ে যেতে পারবে না। জীবনে যত বাঁধাই আসুক না কেন?? এবং জীবনের কোনো এক মোড়ে এসে যদি তোমার মনে হয় আমাকে ছেড়ে যেতে হবে তখনও যেন তুমি আমাকে ছেড়ে যেতে না পারো তারজন্য সামান্য ব্যবস্থা করে রাখছি। এটাই হচ্ছে আমাদের বিয়ের দেনমোহরেরে চুক্তিনামা যেটা কিনা আমার পক্ষ থেকে আমি করে রাখতে চাই। তোমার দেনমোহরে তুমি আরও বেশি টাকার অংক তুলে রাখতে পার সমস্যা নেই।

— আপনি কি বিয়ে করছেন নাকি চুক্তি??

— অফকোর্স বিয়ে করছি। কিন্তু তোমার বিশ্বাস নেই। কখন যেন কোন এক সকালে ঘুম থেকে ওঠে বলবে,, ফায়েজ আমি আপনার সংসার ছেড়ে চলে যাচ্ছি।

— আমাকে ধরে রাখার জন্য এত আয়োজন কেন??

“তুমি যদি জানতে তুমি আমার কি? তাহলে পাল্টা প্রশ্ন করতে না। তুমি আমার জীবনের এমনই একজন যাকে আমি দূর থেকে কেবল ভালোবেসেছি। কাছে গিয়ে ভালোবাসার মতো মূহুর্ত আমার জীবনে কখনো আসেনি। কিন্তু,, সেই আমি তোমাকে নিয়ে পুরো জীবন পাড়ি দেয়ার বর পেয়েছি। সেই সুযোগ হারাতে দেই কি করে বলো?? ”

মনের কথা অন্তরালে রয়ে গেলো ফায়েজ প্রকাশ করতে পারল না। কারণ,, কথাগুলো সরাসরি বলার মতো সময় এখনও হয়ে ওঠেনি। তাই ফায়েজ অন্যভাবে খেয়াকে উত্তর দিলো।

— কারনটা না হয় কোনো একদিন বলব?? এখন তুমি বলো তুই রাজি আছো?

— আপনি কি আমার সঙ্গে গেইম খেলতে চাইছেন??

কথাটি বলে খেয়া রেগে গিয়ে ফায়েজের শেরওয়ানির কলার চেপে ধরেছে। ফায়েজ খেয়ার হাত দুটো ধরে সরিয়ে দিয়ে বললো,,

— মোটেও না। আমি জাস্ট আমার বৈবাহিক সম্পর্ক সিকিউর করতে চাইছি। দ্যাটস ইট।

— আপনি ছেলেমানুষ হয়ে বিয়ের মতো একটা ব্যাপারকে সিকিউর করতে চাইছেন। কেন ভয় পাচ্ছেন নাকি এই ভেবে যে আমি আপনার দেয়া টাকা-পয়সা,, স্বর্ণলংকার নিয়ে চলে যাব?

” হ্যা আমি ভয় পাচ্ছি। তবে তোমাকে হারানোর ভয়। টাকা পয়সা কিছুই না আমার জন্য। তুমি তো জানো না তুমি আমার জন্য কি? আমি তোমার জন্য কতবছর ধরে ওয়েট করছি? এগুলো তুমি জানবেও না কোনোদিন? কারণ আমি চাই না তুমি জানো। ”

ফায়েজ খেয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে বুলিগুলো মনে মনে আওরায়। ফায়েজের কাছ থেকে জবাব না পেয়ে খেয়া রুমের মধ্যে পায়চারি করছে। ভাবছে আসলে কি করা যায়? ফায়েজের শর্তে রাজি হবে কি না?? ভাবতে ভাবতে খেয়া ভাবলো,, ফায়েজের শর্তে রাজি হলে সমস্যা কোথায়?? খেয়ার যখন চলে যাবে তখনকার বিষয়ে তখন দেখা যাবে। খেয়া ফায়েজের সামনে গিয়ে বলল,,

— একটা প্রশ্নের উত্তর চাই আমার।

— বলো কি উত্তর চাই তোমার??

— ধরুন আমি আপনাকে বিয়ের পর অনেক জ্বালাতন করলাম তখন আপনি স্বেচ্ছায় আমাকে ছে..

বাকি কথা সম্পূর্ণ করার আগেই ফায়েজ খেয়ার মুখ চেপে ধরে। খেয়া চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে আছে। ফায়েজের চোখ দুটো লাল হয়ে আসে। মেয়েটা এত সহজে কথাগুলো কিভাবে বলে?? ফায়েজকে যদি কেটে দু-টুকরো করে ফেলে তবুও খেয়াকে ছেড়ে কোথাও যাবে না সে।

ফায়েজ খেয়ার ডানহাতের কনিষ্ঠ আঙুলের সঙ্গে নিজের বামহাতের আঙুলে ক্রস লক করে বললো,,

— হাত ছেড়ে দেয়ার জন্য ধরিনি। পারলে পরীক্ষা করে দেখো সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়ে পাশ করব।

খেয়া ফায়েজের দিকে তাকিয়ে রইলো। লোকটার কনফিডেন্ট দেখে মনে হচ্ছে আসলেই সে সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়ে পাশ করবে। তাহলে তার পরীক্ষা নেয়াই যাক। দেখি সে কত নাম্বার পেয়ে পাশ করে?

খেয়া এবং ফায়েজের বিয়ে সম্পন্ন হলো। কাবিননামার সঙ্গে চুক্তিপত্র হলো ফায়েজ এবং খেয়ার। খেয়া কখনোই ফায়েজকে ছেড়ে যেতে পারবে না। এবং খেয়া স্বেচ্ছায় ফায়েজের সঙ্গে বৈবাহিক এই চুক্তিবদ্ধে রাজি হয়েছে।

রুমানা সহ উপস্থিত মেহমানরা প্রথমে ফায়েজকে খারাপ মনে হলেও এখন সে সবার চোখে চমৎকার একজন মানুষ। যেখানে একটা সম্পর্কের শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই। বিয়েতে উপস্থিত সকল মেহমানরা সম্পূর্ণ অন্য এক বিয়ের সাক্ষী হলো।সম্পর্ক শেষ করার কথা মাথায় আনার আগে ব্যাপারটা সামলে ফেলেছে। ফায়েজ এবং খেয়ার অনন্য বিয়ের আয়োজন দেখে উপস্থিত সবার একটাই আফসোস কেন প্রত্যেকটা বিয়েতে এমন একটা চুক্তি হয় না।

এবার বিদায়ের ঘন্টা,,

রুমানা ফায়েজের হাতে খেয়াকে তুলে দিয়ে বললো,,

— আমার দায়িত্ব শেষ। ভাবিকে কথা দিয়েছিলাম যে তার মেয়েকে সবসময় আগলে রাখব। নির্বাণের মতো যোগ্য পাত্র পেলে খেয়াকে তার হাতে তুলে দেব। আলহামদুলিল্লাহ ভাবিকে দেয়া কথাগুলো আমি রাখতে পেরেছি শুধুমাত্র তোমার জন্য ফায়েজ। খেয়াকে আগলে রেখো। ভাঙা জিনিস তোমাকে দিয়েছি পারলে যত্ন দিয়ে নতুন করে আকৃতি দান করো।

খেয়া ওর ফুপির গলা জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো। নিজের মা এবং নির্বাণকে হারানোর পর কেবল ওর জীবনে একজন মানুষ ছিল সে হলো তার রুমানা ফুপি। সেই মানুষটাকে ছেড়ে আজ চলে যেতে হবে। আজ ফুপি আবারও একা হয়ে যাবে। নিঃসঙ্গ বিকেলে এক কাপ চা হাতে একা দাঁড়িয়ে নীল আকাশে চোখ বুলাবে। কেন মানুষের জীবনে একজন সঙ্গীর প্রয়োজন?? সঙ্গী ছাড়া কেন মানুষ এত অসহায় হয়ে পরে??

ফায়েজ খেয়ার হাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছে ফুল দিয়ে সাজানো গাড়ির দিকে। পেছনে এগিয়ে আসছেন অনেকে। কারণ,, খেয়া এবং ফায়েজ চলে যাচ্ছে চট্টগ্রাম। ফায়েজের পৈতৃক নিবাসে। ঢাকার কোলাহল থেকে বেরিয়ে পাহাড়ের দেশে গিয়ে থাকবে বলে মনস্থির করেছে।

গাড়ির দরজা খুলে খেয়াকে বসিয়ে লেহেঙ্গা গুছিয়ে দিলো। তারপর,, রুমানার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফায়েজ গাড়িতে উঠে বসলো। ধীরে ধীরে গাড়ি চলতে শুরু করলো। কনভেনশন সেন্টার থেকে বেরিয়ে এলো গাড়ি।

খেয়া মনে মনে প্রিয় শহর ঢাকাকে বিদায় জানালো। বিদায় জানালো প্রিয় মানুষটাকে। যাকে ভালোবেসে খেয়ার জীবনে একটি সুখের বসন্ত এসেছিল।

খেয়া জানালা দিয়ে ঢাকা শহরকে যখন বিদায় জানাতে ব্যস্ত ঠিক তখনি একটি হাত খেয়াকে টেনে এনে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নেয়। খেয়া চকিত নজরে তাকালো ফায়েজের দিকে। খেয়ার চোখের দৃষ্টি বলছিল,, তাকে ছেড়ে দেয়ার জন্য। কিন্তু,, চোখের সেই ভাষাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ফায়েজ আরও শক্ত করে নিজের সঙ্গে খেয়াকে মিশিয়ে নিয়ে বললো,,

— তোমাকে বিয়ে করেছি বিশ্বাস হচ্ছে না, বুঝলে? তাই নিজেকে বিশ্বাস করানোর জন্য একটুখানি ট্রায়াল দিচ্ছি।

কথাগুলো বলে ফায়েজ হাসলো। ফায়েজের সেই হাসি দেখে খেয়ার পুরো শরীর জ্বলে ওঠল। ফায়েজ যে তাকে ইচ্ছে করে জ্বালাচ্ছে তা খুব ভালো করেই টের পাচ্ছে খেয়া।

— কিছু খাবে??

— আপনাকে খাব??

খেয়ার বিরক্তিকর সুরে বলা কথা শুনে ফায়েজ বিষম খেলো। বেচারার নাকে পানি উঠে বিশ্রি অবস্থা। ফায়েজের অবস্থা বেগতিক দেখে খেয়া ওর ভারি লেহেঙ্গা সামলে ফায়েজের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। পিঠের মধ্যে মালিশ করে দিচ্ছে নয়তো মাথায় হালকা করে চাপড় দিচ্ছে যেন বিষম কেটে যায়। ধীরে ধীরে ফায়েজ স্বাভাবিক হলো। খেয়া হাফ ছেড়ে বাঁচল।

— এখন কেমন লাগছে।

খেয়া নরম সুরে জিজ্ঞেস করলো ফায়েজকে। ফায়েজের মনে হলো এরচেয়ে চমৎকার ভাবে এর আগে কখনো খেয়া ওর সঙ্গে কথা বলেনি। যদি বলেও থাকে তবে এতটা ভালো শোনায়নি ফায়েজের কাছে। ফায়েজ দুটো শুকনো কাশি ঝেরে খেয়ার কানের কাছ মুখ বাড়িয়ে বলল,,

— আমাকে খেতে চাও আই ডোন্ট মাইন্ড। বাট পাব্লিক প্লেসে আমি লজ্জা পাব।

কথাটি বলে ফায়েজ চোখে সানগ্লাস পরলো। খেয়ার ইচ্ছে হলো টেবিলের ওপরে রাখা ধোঁয়া ওঠা কফির মগটা নিয়ে ফায়েজের মাথায় ঢেলে দিতে। কিন্তু সে পারছে না। কারণটা হলো পাব্লিক প্লেস।

খেয়া রাগ করে কিছুই খেলো না। ফায়েজ বেশ কয়েকবাড় রিকুয়েষ্ট করেছে কিন্তু লাভ হয়নি। উল্টো খেয়ার চোখ রাঙানি দেখে প্রেমে ঘায়েল হয়েছে বারংবার ।

রেস্তোরায় উপস্থিত থাকা অনেকের দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু ফায়েজ-খেয়া। সদ্য বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া দুজন মানুষের গায়ে থাকা শেরওয়ানি এবং লাল লেহেঙ্গা বলে দিচ্ছে তাদের পরিচয়। উপস্থিত সবাই যারপরনাই বিস্ময়কর চোখে তাদের দেখছিল। এতগুলো চোখের দৃষ্টি থেকে নিজেদের বাঁচানোর প্রয়োজন দেখছে না ফায়েজ এবং খেয়া। তারা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত।

ফায়েজ কিছু শুকনো খাবার,, দুটো বার্গার এবং কুমিল্লার বিখ্যাত রসমালাইয়ের দুটো বক্স নিলো। অন্যহাত দিয়ে খেয়ার হাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছে গাড়ির দিকে। খেয়া ফায়েজের হাত থেকে মুক্তি পেতে জোরাজোরি করছে কিন্তু ফায়েজ যেন আরও শক্ত করে খেয়ার হাত চেপে ধরে রেখেছে। খেয়া হাল ছেড়ে দেয়। কি দরকার খামোখা লোকটার সাথে নিজের শক্তি অপচয় করার??

চট্টগ্রাম শহরে পৌঁছে গেছে নতুন বর কনে। তখন রাত দশটা বাজে। গাড়ি যখন জাকির হোসেন রোডে তখন ফায়েজ খেয়ার দিকে তাকিয়ে দেখলো খেয়া ঘুমাচ্ছে ওর কাঁধে মাথা রেখে। বিয়ের মতো একটা কঠিন রিচ্যুয়াল কমপ্লিট করে,, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত জার্নি করে আসা চাট্টিখানি কথা না। হাজারটা ফটোশুট,, আত্মীয়দের সঙ্গে ফর্মালিটি বজায় রাখতে হেসে হেসে কথা বলা,, নিজের পরিবারকে ফেলে সম্পূর্ণ নতুন একটা পরিবারের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া। এসব ব্যাপার সামলাতে হিমশিম খেতে হয় মেয়েদের ।

ফায়েজ খেয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। হাতের মাঝে চেপে ধরে রাখা খেয়ার হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরলো। যেন ছেড়ে দিলে দূরে চলে যাবে খেয়া। গাড়ি এবার নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটিতে মেইন ফটক দিয়ে প্রবেশ করলো। ১২নং বিল্ডিংয়ের সামনে এসে গাড়ি থেমে যায়। ড্রাইভার গাড়ি থেকে নেমে ব্যাগগুলো নামিয়ে রাখলো। তারপর,, গাড়ির দরজা খুলে দেয়। ফায়েজ তখন ভাবছিল খেয়াকে ঘুম থেকে ডেকে তুলবে নাকি এভাবে ঘুমন্ত অবস্থায় কোলে তুলে নিয়ে যাবে। যদিও বিয়ের পর প্রথমবার নববধূকে কোলে করে ঘরে নিয়ে যায় তার স্বামী। ফায়েজ আর কিছু ভাবল না। গাড়ি থেকে নেমে ওপাশে গিয়ে দরজা খুলে খেয়াকে কোলে তুলে নিলো। এদিকে ড্রাইভার দেখেও না দেখার ভান করে রইল। ফায়েজের তাতে কি আসে যায়। খেয়াকে কোলে নিয়ে বিল্ডিংয়ের করিডরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। লিফটের সামনে যেতেই খেয়ার ঘুম ভেঙে যায় এবং নিজেকে আবিষ্কার করে ফায়েজের বাহুতে। খেয়া ফায়েজের দিকে চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে বলল,,

— এসবের মানে কি?? আমি ঘুমিয়েছিলাম আর আপনি সেই সুযোগ নিয়ে কি করছেন??

খেয়ার কথা শুনে ফায়েজের হাসি পাচ্ছে কিন্তু খেয়ার সামনে হাসা যাবে না। মুখটা গম্ভীর করে খেয়াকে খানিকটা উঁচুতে তুলে বলল,,

— কেন ডার্লিং আজ আমাদের বাসররাত তোমার মনে নেই??

ফায়েজের কথা শুনে চোখ রাঙিয়ে তাকালো খেয়া। বাট হু ইজ কেয়ার?? ফায়েজ খেয়ার চোখ রাঙানিতে পাত্তা না দিয়ে সোজা লিফটে ঢুকল।

— সিক্স নাম্বার বাটনে প্রেস করো।

— আমি পারব না।

খেয়ার কথা শুনে ফায়েজ কিছু না বলেই খেয়াকে ফেলে দেয়ার ভান করলো। বেচারি খেয়া ভয় পেয়ে ফায়েজের গলা জড়িয়ে ধরে বললো,,

— কষ্ট হচ্ছে আপনার সোজাসুজি বলে দিলেই হলো। কোল থেকে ফেলে মেরে ফেলতে চাইছেন নাকি??

— তিন ফুট হাইট থেকে পরলে অবশ্য কেউ মরে না। তোমাকে কোলে রাখতে আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে তাই রিকুয়েষ্ট করছি প্লিজ বাটনে প্রেস করো। তুমি যেই ভারি আমার তো অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে।

ক্লান্ত ভঙ্গিতে কথাগুলো বলল ফায়েজ। খেয়া তো রেগেমেগে একাকার। খেয়া কি এতটাই ভারি!! সিক্সথ ফ্লোরের বাটনে প্রেস করে খেয়া ফায়েজকে বলল,,

— কোল থেকে এখুনি আমাকে নামিয়ে দিন। আর আপনাকে কে বলেছে আমাকে কোলে নিতে?? আমাকে আল্লাহ দুটো পা দিয়েছে। আমি দুটো দিয়ে হেঁটেছি এতকাল। বিয়ে হয়েছে বলেই যে আপনার কোলে উঠে জগত ঘুরতে হবে এমন তো কোনো কথা নেই।

ফায়েজ হাসছে। মহারানী রেগে গেছে। এখন কিছু না বলাই বেটার। ফায়েজ কিছু না বলেই চুপচাপ খেয়াকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। সিক্সথ ফ্লোরে এসে লিফটের দরজা খুলল। ফায়েজ খেয়াকে নিয়ে বের হতেই ওদের ওপর অসংখ্য ফুলের পাপড়ির বর্ষন হচ্ছে। খেয়া বিস্মিত হলো। ফায়েজ জানে কারা করেছে এই কান্ড।

— ওয়েলকাম হোম ফায়েজ-খেয়া। এবং অভিনন্দন নতুন জীবনের জন্য।

আনুমানিক দশ থেকে পনেরোজন মানুষ ওদের বরণ করে নিয়েছে। ফায়েজ খেয়াকে কোল থেকে নামিয়ে দিলো। একে একে ফায়েজের সব ছেলে বন্ধুরা এসে ওকে হাগ করছে এবং উইশ করছে। ফায়েজের মেয়ে বন্ধু নেই বললেই চলে হাতেগোনা তিনজন শুধু । আর বাকি যারা আছে তারা হলো ফায়েজের বন্ধুুদের ওয়াইফ। এত সব অপরিচিত মুখগুলোর মাঝে একটি মুখ খেয়ার খুব চেনা। “শারমিন” নামের মানুষটা এখানে কেন?? খেয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে শারমিনের দিকে। শারমিন খেয়ার সামনে একটি ফুলের তোড়া দিয়ে বললো,,

— অভিনন্দন খেয়া। আজ কিন্তু তোমার গল্পের প্রকাশক হিসেবে নয় আমি আমার বন্ধুত্বের খাতিরে এসেছি।

খেয়া শারমিনের কথার মানে বুঝল না। ফায়েজ শারমিনের কথার পিঠে কেবল মুচকি হাসলো। তারপর খেয়ার হাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছে ওদের ফ্ল্যাটের দিকে।

ফ্ল্যাটের দরজা সামনে দুজন মানুষ লাল ফিতা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আরেকজন কেঁচি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফায়েজ ওদের দেখে মুচকি হেসে বলল,,

— এতকিছু কখন প্ল্যান করলি তোরা??

ফারাবি নামের একজন ভাইয়া বলে উঠলো,,

— দোস্ত বিয়ে জীবনে একবারই হয় তাই ইনজয় কর। আমাদের কিছু এমাউন্ট দে তারপর ভাবিকে নিয়ে ফিতা কাট,,তারপর সোজা বাসরঘরে চলে যা। বিলিভ মি আমরা তোকে কিছুই বলব না।

ফারাবি কথায় হাসির রোল পরে গেছে। লজ্জায় কারো দিকে তাকাতে পারছে না খেয়া। ফায়েজ তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাসলো। শেরওয়ানীর পকেট থেকে একটা ডেবিট কার্ড বের করে ফারাবি ভাইয়ার হাতে দিয়ে বললো,,

— যত টাকা দরকার খরচ করিস। এখন কেঁচি দে।

— বাব্বাহ ফায়েজের দেখি তর সইছে না।

ফারাবির কথায় আরও একদফা হাসির রোল পরল। ফায়েজ কোনোকিছু না বলে খেয়ার হাত ধরে দরজা সামনে গিয়ে রকির হাতে থাকা থালা থেকে কেঁচি নিয়ে ফিতা কেটে ফেললো। ব্যস,, সবার হাতের করতালিতে মুখরিত হয় যায় পুরো পরিবেশ। ফায়েজ আমাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকতেই যাচ্ছিল ঠিক তখনি শারমিন ফায়েজকে উদ্দেশ্য করে বললো,,

— তোর বৌকে কোলে নিয়ে তারপর ঘরে প্রবেশ কর।

সবাই হাসল। হাসতে পারছে না কেবল খেয়া। ওর অস্বস্তি হচ্ছে। এত ন্যাকামি ওর সহ্য হচ্ছে না। খেয়া যখন এসব ব্যাপারে নিয়ে বিরক্ত হচ্ছিল ঠিক তখনি ফায়েজ খেয়াকে কোলে তুলে নিলো। ব্যস,, কেউ শিস দিচ্ছে,, কেউ হাত তালি আর কেউ কেউ ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পরে।

ফায়েজ খেয়াকে নিয়ে ফ্ল্যাট প্রবেশ করল। পেছনে ওর ফ্রেন্ডসরা। ফায়েজের জন্য বরাদ্দকৃত রুমটায় খেয়াকে নিয়ে ঢুকলো। রুমে ঢুকতেই বেলীফুলের গন্ধে খেয়ার মন জুড়িয়ে যায়। অপলকভাবে তাকিয়ে রইলো। কারণ,, পুরো রুম জুড়ে কেবল বেলি ফুলের অস্তিত্ব।

ফুল দিয়ে সাজানো বিছানায় খেয়াকে বসিয়ে দিলো ফায়েজ। খেয়াকে রেখে ফিরে যাচ্ছিল ফায়েজ কিন্তু কি মনে করেই ফিরে যায় খেয়ার কাছে। খেয়া ফায়েজের দিকে তাকায়। ফায়েজ কিছুসময়ের জন্য খেয়ার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। উপুড় হয়ে খেয়ার কপালে দীর্ঘ চুমু খেয়ে বের হয়ে এলো সেই ঘর থেকে। এতক্ষণ যা কিছু ঘটেছে তা খেয়ার বোধগম্য হবার আগেই ফায়েজ রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। খেয়া কিছু কঠিন কথা ফায়েজকে শোনাতে গিয়েও শোনায় না কারণ তার বন্ধুরা আছে আজ। যা বলার কিছুসময় পর বলবে। পুরুষ মানুষ তো আবার ফুলসজ্জার ব্যাপারে ভীষণ কনসার্ন। দেখা যাবে কিছুক্ষণ পর এই ঘরে এসে হাজির হবে।

এমনসময় দরজা খুলে দুজন মেয়ে এলো। খেয়াকে সাহায্য করার জন্য। খেয়া তাদের বলতে চাইল যে,, আমি পারব। কিন্তু বলতে পারল না। তাদের সাহায্য নিয়ে খেয়া নতুন করে তৈরি হলো। নীল রঙের শাড়ি আর সাদা রঙের ব্লাউজ। চুলগুলো খোপায় বাঁধা। খোঁপায় বেলি ফুলের মালা গুঁজে দিয়েছে। বিয়ের ভারি সাজ তুলে চোখে একটুখানি কাজল আর ঠোঁটে পিংক কালারের লিপস্টিক লাগিয়ে দিয়েছে। খেয়া নিজেকে একবার আয়নায় দেখলো। চমৎকার দেখাচ্ছে। খেয়াকে সাহায্য করা দু’জন মেয়ের মধ্যে একজন ফারাবী স্ত্রী। তার নাম মিতু। মিতু নামের মেয়েটা খেয়াকে বলল,,

— ফায়েজ ভাই আজ আপনাকে দেখে থমকে যাবে। হয়তো পথ হারিয়ে ফেলতে পারে।

কথাটি বলে চমৎকার ভাবে হাসলো। সেই হাসিতে তাল মেলালো পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা। কেবল হাসতে পারল না খেয়া। কারণ,, খেয়া জানে ফায়েজকে বিয়ে করেছে ঠিকই কিন্তু স্বামীর অধিকারটুকু দিতে পারবে না। কারণ,, গভীর অর্থে খেয়াকে কেবল নির্বাণ স্পর্শ করে
ছে। আর কেউ এই দেহে স্পর্শ করতে পারবে না।

মেয়ে দুটো খেয়াকে ফুল দিয়ে সাজানো বাসরে বসিয়ে রেখে চলে যায়। খেয়া অপেক্ষা করে না ফায়েজের জন্য। বসে বসে ভাবছে নির্বাণের কথা। তাদের বিয়ের দিনের কথা। বাসর ঘরে বলা নির্বাণের ছোট ছোট জোকসগুলো সব আজ খেয়ার মনে হানা দিচ্ছে। খেয়া জানে জীবনের পাতায় আজ সেই মূহুর্তগুলো কেবল স্মৃতি নামে পরিচিত । নির্বাণ এই স্মৃতিগুলোতে বেঁচে থাকবে খেয়ার মনে,, হৃদয়ে।

খেয়া নির্বাণের কথা ভাবতে ভাবতে না চাইতেও ফায়েজের জন্য অপেক্ষা করছিল। কারণ,, খেয়া ওর অবচেতন মনে ফায়েজকে এই মূহুর্তে এই রুমে চাইছিল। কিন্তু,, না ফায়েজ আসেনি। রাত বারোটা,, একটা,, দুইটা,, তিনটা,, চারটা,, পাঁচটা ঘড়ির ঘন্টা সময়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু,, ফায়েজ আসেনি এই ঘরে। অপেক্ষা করতে করতে খেয়া চারটার দিকে ঘুমিয়ে যায়।

ঘুমন্ত খেয়া টের পেলো না দরজার ওপারে থাকা একটা প্রেমিক কতটা ছটফট করছিল তার প্রেয়সীকে নিয়ে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাতটাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য। হায় আফসোস সেই ভাগ্য হয়তো তার নেই। খেয়া জানতেও পারবে না কতটা অভিমান নিয়ে ফায়েজ দরজা ওপাড়ে রাত কাটিয়ে দিয়েছে।

চলমান…..