#হৃদয়_হারানো_বিজ্ঞপ্তি
#পর্ব_২
#Tahmina_Akhter
— মনে কর আমার থেকে তোকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসার মানুষ তোর জীবনে চলে এসেছে। তখন, তোর প্রতিক্রিয়া কেমন হবে খেয়া?? আই মিন মানুষ তো ভালোবাসার কাঙাল।
—নির্বাণ,, মজা করার একটা লিমিট থাকা দরকার!! তুই যে একটা অদ্ভুত মানব তুই জানিস?? কাল বাদে পরশু আমাদের বিয়ে আর তুই কিনা আমাকে মনে করতে বলছিস,, আমার লাইফে তোর থেকে বেশি আমাকে ভালোবাসার মত মানুষ এসেছে!!! শোন,, নির্বাণ আমি তোকে ভালোবাসি। তোর চেয়েও কেউ যদি আমাকে দ্বিগুণ ভালোবাসে তবুও আমার তাকে চাই না। কারণ,, আমার নির্বাণকে চাই। কতগুলো বছর অপেক্ষা করলাম এই তোকে পাওয়ার জন্য ; আর তুই কিনা??
খেয়ার চোখ দুটো টলমল করছে। নির্বাণ জানে খেয়া তাকে প্রচন্ড ভালোবাসে। কলেজ লাইফে দু’জনের মাঝে বন্ধুত্বের সৃষ্টি,, বন্ধু থেকে কবে যে তারা আত্মার আত্মীয় হয়ে গেছে বুঝতেই পারেনি। “ভালোবাসি” কখনো মুখ ফুটে বলতে হয়নি দু’জনের। কিভাবেই যেন দুজনে বুঝতে পারে নিজেদের মনের কোণে থাকা অফুরন্ত ভালোবাসাটুকু । সেই ভালোবাসার রেশ ধরেই দু’জনের সিদ্ধান্ত চিরজীবন একসঙ্গে কাটাবে। বাড়ির প্রত্যেকটি মানুষ জানে নির্বাণ এবং খেয়ার বিয়ে হচ্ছে বাড়ির বড়দের সিদ্ধান্তে। কিন্তু,, তারা তো জানে না দুজনে কতকাল থেকে চেনা পরিচয়ের গন্ডি পেরিয়ে ভালোবাসাময় এক গদ্য রচিত করেছে ।।
— বাদ দে। এখন গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা শোন খেয়া??
খেয়া তখনও টিস্যু দিয়ে চোখের জল মুছতে ব্যস্ত। নির্বাণের কথায় তেমন পাত্তা দিচ্ছে না। খেয়ার অভিমান বুঝতে পারে নির্বাণ। তাই তো মিষ্টি সুরে বলে,,
— খেয়া?? এই খেয়া?? শুনবি আমার কথা নাকি চলে যাব আমি??
—বলতে পারিস না! কান আছে শুনতে পারছি আমি।
অভিমানী খেয়ার উত্তর শুনে নির্বাণ মুচকি হাসি দিয়ে বললো,,
— অবশ্যই শুনতে তো পারিস। আমি তো তোকে বয়ড়া বলে আখ্যা দেইনি।
— নির্বাণ আমি কিন্তু চলে যাব এখন।
খেয়াকে রেগে যেতে দেখে নির্বাণ হাসে। নির্বাণের হাসি দেখে খেয়াও হাসে। ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে কতক্ষণ অভিমান করে থাকা যায়।
এদিকে ওদের দুষ্ট মিষ্ট ভালোবাসাময় খুনসুটি কেউ দেখছে। চোখের কোণে তার জলের উপস্থিতি। ভালোবাসা না পাওয়ার হাহাকার ওই দুই চোখে। জীবনটা এত বৈচিত্র্যময় আয়োজনে ঘেরা কেন?? যে জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছিল সে কেন এসে আবার চোখের সামনে ধরা দিল?? খেয়া তো তার নয়, খেয়া অন্য কারো। সেই অন্য কেউই হচ্ছে তারই আপন ভাই। না আর থাকা যাবে না। চলে যাবে এই দেশ থেকে। যদি চোখের আড়াল হতে পারে তবে মনের আড়াল হতে সময় লাগবে না। কারণ,, এবার খেয়াকে ভুলে যাওয়ার শক্তপোক্ত কারণ আছে। কারণ,, খেয়া যে তার ভাইয়ের অর্ধাঙ্গিণী হতে চলেছে।
ফায়েজ বাড়িতে ফিরে যায়। কাপড়চোপড় গুছিয়ে ট্রলিব্যাগে রাখে,, দরকারি কাগজপত্র ড্রয়ারে রাখে। যেন হাত বাড়ালেই সবকিছু খুব সহজেই পেয়ে যায়। এদেশে থাকার আর কোনো মানে নেই। নির্বাণ আর খেয়ার মাঝে তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে ঢুকে পরেছে সে। তাছাড়া,, দুজনের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। হয়ত,, মস্তিষ্কের কোণে দুজনের ভবিষ্যতে গড়ে উঠা সংসারের দৃশ্য তৈরি হ’য়ে গেছে তাদের।
এরইমাঝে বেশ কয়েকবার এসে ফায়েজের ঘরের দরজায় নক করে রোকসানা। কিন্তু,, ফায়েজ দরজা খুলে না মাথা ব্যথার অজুহাত দেখিয়ে। রোকসানা হাল ছেড়ে চলে যায়।
মিনিট দশেক পরে নির্বাণ বাড়িতে ফিরে আসে। সঙ্গে নিয়ে আসে বাড়ির সদস্যদের জন্য নতুন কিছু জামা-কাপড়। রোকসানার হাতে সেগুলো বুঝিয়ে দিয়ে ঘরের দিকে যাচ্ছিল নির্বাণ কিন্তু রোকসানার ডাকে নির্বাণ থমকে দাঁড়ায়। ফিরে যায় ওর মায়ের কাছে। রোকসানা নির্বাণের মুখের দিকে তাকায়। কিছু দেখার আপ্রাণ চেষ্টা করে কিন্তু কি দেখার চেষ্টা করে কে জানে?
— কি দেখো মা??
— তোকে দেখি নির্বাণ। কতটা সহজভাবে ব্যাপারটাকে ডিল করছিস! যদি তোর জায়গায় আমার ফায়েজ হত তবে এই বিয়েটা করত না। কারণ,, ফায়েজ তার ছোট ভাইকে ভালোবাসে।
নির্বাণ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ওর মায়ের দিকে। এতটা অচেনা কখনো মনে হয়নি ওর মাকে যতটা আজ মনে হচ্ছে! এক সন্তানের সুখের জন্য আজ ওর মা এতটাই স্বার্থপর হয়ে গিয়েছে যে অন্য সন্তানের সুখের কথা ভাবছে না! নির্বাণ হাসে। সুখের হাসি নয় কারণ সুখের হাসিতে চোখ হাসে আর এই হাসি তো কেবল লোকে চোখে দেখে।
— আমি বিয়েটা করছি বলে ভালো নই, তাই না মা??
— তুই অবশ্যই ভালো নির্বাণ। কিন্তু একটিবার আমাকে খেয়ার পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে দে না বাপ। বলে তো দেখি। অন্তত মনটাকে বুঝাতে তো পারব যে তারা রাজি হয়নি।
— যদি খেয়া রাজি না হয় তখন কি করবে? এমনও তো হতে পারে তোমার কাছ থেকে তারা এমন প্রস্তাব শুনে আমার সঙ্গে খেয়ার বিয়েটাই না ভেঙে দেয়।
— ভেঙে দিলে তো আরও ভালো। তুই কি ভাবছিস খেয়া এই বাড়িতে তোর বৌ হয়ে এলে সুখি হবি। কখনো না। বরং মনে মনে অনুতাপের আগুনে পুড়ে ছাই হবি। ভাইয়ের মলিন মুখখানা দেখতি পারবি নির্বাণ??
— মা আবেগ দিয়ে বিচার না করে বিবেক দিয়ে বিচার করে দেখো। খেয়া কেন পৃথিবীর কোনো মেয়েই কখনোই এমন প্রস্তাবে রাজি হবে না।
—তুই বিষয়টাকে জটিল করে তুলেছিস নির্বাণ।
— ব্যাপারটাকে তোমরা জটিল করে তৈরি করছো আমি না। আমি, খেয়া কিংবা ভাই কেউই জানতাম না আমাদের জীবন কোনো একসময় একই সুতোয় গাঁথা থাকবে। যদি সেই সুতোয় গাঁথা থাকতে না চাই তবে সুতো ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে হবে।
— নির্বাণ,, কিন্তু আমার ফায়েজ…..
রোকসানার চোখ এবার জল টলমল করছে। নির্বাণ আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। দ্রুত গতিতে কদম বাড়িয়ে চলে যায় নিজের ঘরে। শূন্য ঘরে ঢুকে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর, নিজের মা’কে উদ্দেশ্য করে বলল,,
—আমার যেকোনো একজনকে বেছে নিতে হবে মা। খেয়া নয়তো ভাইকে। কিন্তু,, তুমি কি জানো মা ওরা দুজন আমার জীবনে কি মাইনে রাখে?? তুমি কিছু জানো না,, তুমি কিছু জানো না। তোমাকে আমি কখনো সামনাসামনি বলতেও পারব না। খেয়াকে চাইলে ভাইকে হারাতে হবে,, আর যদি ভাইয়ের খুশি চাই তবে আমার ভালোবাসার উপন্যাসের শেষে পাতায় কেবল ধোঁকার ব্যাখা রচিত হবে আর সেই পাতার রচয়িতা হবে খেয়া। আমি চাই না খেয়াকে ধোঁকা দিতে। মেয়েটা আমাকে বিশ্বাস করেছে। আমার হাত ধরে জীবনের বাকি দিনগুলো কাটাতে চায়। আমাকে ভালোবাসে। ওর ভালোবাসা আমি কি করে উপেক্ষা করব মা ???
নির্বাণ পাগলের ন্যায় প্রলাপ বকছে। সে জীবনের এমন একটা পয়েন্টে এসেছে যে হয়তো হারতে হবে নয়তো জিততে হবে। কিন্তু নির্বাণ কাকে হারিয়ে জিতবে?? যে কিনা তার আপন বড়ো ভাই!!!
************************
শ্রাবণের দশ তারিখ,,,
নির্বাণ এবং খেয়ার বিয়ের দিন আজ। দুইজনের কত আকাঙ্ক্ষার দিন আজ!! খেয়া আজ বৌ সেজেছে নির্বাণের জন্য। মেহেদি দেয়া দু’হাতে মুঠো ভর্তি চুড়ি। গলায় নেকলস,, কানে দুল,, মাথায় টিকলি,, নাকে জ্বলজ্বল করছে সুন্দর একখান নাকফুল। নাকফুলটা স্পেশাল ভাবে খেয়ার জন্য তৈরি করিয়েছে নির্বাণ তাও বেশ কিছু বছর আগে। যখন ওদের রিলেশনের কেবল দুবছর পেরিয়েছিল। নির্বাণের কর্মজীবনের প্রথম বেতনের টাকা দিয়ে এই নাক ফুলটা গিফট করে খেয়াকে। খেয়ার কাছে নাক ফুলটা বেশ স্পেশাল। তাই তো এতগুলো বছর ধরে যত্ন করে রেখেছে নিজের কাছে। বিয়ে উপলক্ষে অন্য নাকফুল দিয়েছে নির্বাণের পরিবার। কিন্তু খেয়ার ইচ্ছে নির্বাণের দেয়া নাকফুল পরার।
আয়নায় নিজেকে দেখছে খেয়া। আজ নির্বাণ তাকে দেখলে কেমন রিয়াকশন দিবে!! আচ্ছা,, আজকের এই দিনটা খেয়ার জীবনে স্বপ্নের মতো এসেছে নাকি?? কতগুলো বছর অপেক্ষার পর সেই কাঙ্ক্ষিত সময় এসেছে। মনে কত ভয় কাজ করত। এই বুঝি তাদের সম্পর্ক কেউ জেনে গেলো? কিংবা তাদের সম্পর্ক কেউ মানবে না। কিন্তু,, সবটা ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে যেমনটা ওরা দুজনে ভেবেছিল।
খেয়া যখন বধু বেশে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আকাশ-পাতাল ভাবতে ব্যস্ত ঠিক তখনি কেউ দরজার সামনে এসে খেয়াকে উদ্দেশ্য করে বললো,,
— নির্বাণ এসেছে; কিন্তু….
—কিন্তু,, কি??
— নির্বাণ বৌ নিয়ে এসেছে।
— ধ্যাত মজা করিস না নিধি। এদিকে আয় ; দেখ তো আমার ওড়নার সেটিংটা ঠিক আছে তো।
খেয়া নিধির কথায় পাত্তা না দিয়ে আয়নায় তাকিয়ে নিজের ওড়না ঠিক করছে। নিধি তখন দরজার সামনে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। খেয়া নিধিকে ডাক দেয় কিন্তু নিধি সাড়া দেয় না কেবল চোখের ইশারায় বললো,, “আমার কথা বিশ্বাস কর দোস্ত।”
এবার খেয়া বুঝতে পারে বিষয়টা মোটেও মজার নয়। কিন্তু,, নির্বাণ…
মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের সাথে মনের যু্ক্তির যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে খেয়ার। ভারি শাড়িটার কুঁচি আলগোছে ধরে ঘর থেকে বের হয়ে আসে। নিধি যা বলছে তা যেন সত্যি না হয় মনে মনে প্রার্থনা খেয়ার। নয়তো খেয়া মরে যাবে। ঘর থেকে বের হতেই হট্টগোল শোনা গেলো। খেয়া সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। এরইমাঝে যারাই খেয়াকে দেখছে সবাই করুণার পাত্রী হিসেবেই দেখছে ওকে। খেয়া যেন গা পালিয়ে বাঁচতে পারছে না এসব মানুষের দৃষ্টি থেকে।
খেয়া হলরুমে আসতেই কেউ একজন বলে উঠলো,,
— খেয়া এসেছে।
নির্বাণ ঘাড় ফিরিয়ে তাকায়। দুই পলকের জন্য তাকায়। ব্যস অতটুকুই চাহনি ছিল তার। নির্বাণের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লাল শাড়ি পরিহিত মেয়েটা জানে না নির্বাণ নামক মানুষটার জন্য কি ছিল খেয়া নামক মানুষটা। কিন্তু,, এতটুকু বুঝতে পারলো,, নির্বাণের কাছে খেয়া খুবই স্পেশাল একজন মানুষ।
খেয়া ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে নির্বাণের সামনে। নির্বাণ হাসছে। সেই হাসির মানে কেউ বুঝতে না পারলেও নির্বাণের মা ঠিকই বুঝতে পারল ছেলের সেই হাসির মানে।
চলমান…..

