Home "ধারাবাহিক গল্প হৃদয় হারানো বিজ্ঞপ্তি হৃদয় হারানো বিজ্ঞপ্তি পর্ব-০৪

হৃদয় হারানো বিজ্ঞপ্তি পর্ব-০৪

0
133

#হৃদয়_হারানো_বিজ্ঞপ্তি
#পর্ব_৪
#Tahmina_Akhter

সাদা পর্দার ওপাড়ে খেয়া আর এপাড়ে নির্বাণ বসে আছে । ওদের দু’জনকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে মানুষজন। কাজি সাহেব বিয়ে পড়ানো শুরু করলেন। খেয়া কবুল বলার সময় বিনা সংকোচে প্রথমবারই কবুল বলে যার দরুন উপস্থিত সবাই হেসে ওঠে। সবার হাসির সঙ্গে যোগ হয় নির্বাণের হাসি। নির্বাণের কবুল বলার সময় এলে খেয়ার ভাবি ঠাট্টার সুরে নির্বাণকে উদ্দেশ্য করে বললো,,

— খেয়া তো কবুল বলতে অপেক্ষা করলো না। আপনি একটু রয়েসয়ে কবুল বলবেন নয়ত লোকে বলবে খেয়া আর নির্বাণ বিয়েপাগলা।

এবারও হাসির রোল পরে যায় পুরো হলরুম জুড়ে। নির্বাণ মাথা নীচু করে হাসে। খেয়া এবার লজ্জা পেয়ে মাথা নীচু করে রাখে।

খেয়া-নির্বাণের বিয়ে সুসম্পন্ন হলো। বর-কনের এবার মুখ দেখার পালা। সাদা পর্দা সরিয়ে দিতেই খেয়া আর নির্বাণ একে অপরের দৃষ্টি বিনিময় হলো। খেয়া লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলে। নির্বাণ তাকিয়ে ছিল এক মিনিটের মত। সেই এক মিনিটের দেখায় লাল বেনরাসি পরনে তার মিষ্টি বৌকে দেখলো। রোজ রাতে কল্পনায় খেয়াকে যেমন বৌ সাজে দেখতো তারচেয়েও দ্বিগুন সুন্দর দেখাচ্ছে আজ বাস্তবিক বৌ সাজে। হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে নির্বাণের। এতগুলো বছরের অপেক্ষা আজ স্বার্থক হলো বলে।

অপেক্ষায় ভালোবাসা মিলে বলেই হয়তো পৃথিবীতে ভালোবেসে অপেক্ষা করার মতো প্রেমিক-প্রেমিকার সংখ্যা বেশি। তারা জানে না তাদের ভালোবাসা আদৌও পূর্ণতা পাবে কিনা। তবুও তারা অপেক্ষা করে ভালোবাসা পূর্ণতা পাওয়ার আশায়।

নরসিংদী থেকে ঢাকার পথে রওনা হয়েছে নির্বাণদের গাড়িগুলো। খেয়া, নির্বাণ এবং ড্রাইভার একটি গাড়িতে। বাকি সবাই অন্য গাড়িতে করে আসছে।

নির্বাণের ডানহাতের মুঠোয় খেয়ার হাত বন্দি। খেয়ার মেহেদিরাঙা হাতটা খুবই গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে নির্বাণ। খেয়া নির্বাণের চলন্ত দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আছে।

— কি খুঁজিস আমার হাতে?

খেয়ার প্রশ্ন শুনে নির্বাণ ভ্রু কুঞ্চিত করে মন খারাপের সুরে বললো,,

— ভেবেছিলাম তোর হাতের মেহেদীর রঙ হবে টকটকে লাল। বাট মেহেদীর রঙ এত ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে!! তোকে কি আমি কম ভালোবাসিরে খেয়া??

শেষের কথাটি বলতে নির্বাণের গলা ধরে আসে। খেয়া বোকা চোখে তাকিয়ে আছে নির্বাণের দিকে। মানে মানুষ এতটা বোকা কি করে হতে পারে! সামান্য মেহেদীর রঙ দিয়ে কে ভালোবাসার ওজন মাপতে পারে?

নির্বাণ খেয়ার হাত ছেড়ে গাড়ির জানালায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। খেয়া কিছুই বলে না নির্বাণকে। আপাতত নির্বাণকে কিছুসময়ের জন্য একাকী থাকতে দেয়া হোক। বেচারা,, ভালোবাসা মাপছে কি-না মেহেদীর রঙ দিয়ে??

খেয়া মুচকি হেসে বিমর্ষ মনে বসে থাকা নির্বাণের দিকে তাকিয়ে আছে।

রাত দশটা বাজে নির্বাণের গাড়ি ঢুকলো ওদের বাড়িতে। সদর দরজার সামনে অপেক্ষা করছে রোকসানাসহ আরও অনেকে। যারা সম্পর্কে নির্বাণের খালা,, মামি,, ফুপি,, নানি হয়।

সর্বপ্রথম গাড়ি থেকে নামলো নির্বাণ। গাড়ির ওপর পাশে ঘুরে গিয়ে কারের ডোর খুলে খেয়ার উদ্দেশ্য হাত বাড়িয়ে দেয় নির্বাণ। নির্বাণের বাড়িয়ে দেয়ার হাতের দিকে তাকিয়ে খেয়া হাসে। খেয়ার হাসি দেখে নির্বাণ মুচকি হেসে বললো,,

— এতে হাসার মতো কিছুই নেই মিসেস চৌধুরী। এই যে তোর হাত ধরলাম সারাজীবন এভাবে ধরে রাখব। একমিনিটের জন্যেও ছাড়ব না। শুধুমাত্র বাথরুমে এবং অফিসে থাকার সময় এই হাত ছাড়ব।

নির্বাণের কথায় মুগ্ধ হয়ে হাসে খেয়া। আজ কেন যেন খেয়ার নিজেকে ভীষণ সুখি মনে হচ্ছে! নির্বাণ নামের মানুষটা তো ওর জীবনে কেবলই একটা স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্ন আজ সত্যি হয়ে ওর খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে। এই সুখ যেন কখনোই শেষ না হয়।

— কিরে নির্বাণ, তোর বৌ লজ্জা পাচ্ছে নাকি? গাড়ি থেকে নামবে কখন? এদিকে পায়ে মশা কামড় দিয়ে ফুলিয়ে ফেলছে।

নির্বাণের নানি কথায় একদফা হাসির রোল পরে যায়। নির্বাণ খেয়ার দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারা করলো। খেয়া হাত বাড়িয়ে নির্বাণের হাতের ওপর রাখে। নির্বাণ বেশ শক্ত ভাবে চেপে ধরে খেয়ার হাত। খেয়া বের হয়ে আসে গাড়ি থেকে। নির্বাণের হাতে হাত রেখে এগিয়ে যাচ্ছে খেয়া তার নতুন ঠিকানায়। আজকের পর থেকে এটাই যে খেয়ার আসল ঠিকানা। খেয়া হাঁটতে হাঁটতে একবার নির্বাণের মুখের দিকে তাকায়। আজ সুন্দর দেখাচ্ছে নির্বাণকে। সাদা শেরওয়ানিতে পৃথিবীতে বুঝি এই প্রথম কোনো বরকে এতটা সুন্দর দেখাচ্ছে। চাপ দাঁড়িতে নির্বাণকে যে এতটা চমৎকার দেখায় এতটা তো আগে কখনো খেয়াল করেনি খেয়া। নয়তো, আরও একদফা প্রেমে পড়তো নির্বাণের।

— জামাইরে দেখার আরও সময় পাইবা। এখন আমরা তোমারে একটু বরণ কইরা নেই।

খেয়ার সম্বিত ফিরে পায় নির্বাণের নানির কথায়। বেচারি ভীষন লজ্জা পেয়ে সেই যে মাথা নীচু করেছে আর উঠানোর নামই নেই।

দুটো শিলপাটার ওপর দাঁড়িয়ে আছে নির্বাণ এবং খেয়া। ওদের দুজনের সামনে মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়েছে রোকসানা। হাতে একটা কুলো। কুলোয়ে আছে দূর্বাঘাস আর ধান । কুলোটা তিনবার ওদের সামনে ধান ঝাড়ার মতো করে ঝাড়লো তবে খুবই আলতোভাবে। তারপর,, সেই দূর্বাঘাস আর ধান মিলিয়ে তিনবার করে খেয়া এবং নির্বাণের মাথায় ছুঁইয়ে রেখে দেয় রোকসানা। এরপর,, একে একে আসে চারজন। সবাই একই পদ্ধতিতে ওদের দু’জনকে বরণ করে নেয়।

এরপর,, সময় এলো বর-কণের ঘরে যাওয়ার পালা। নির্বাণের মা-সহ বাকি যারা আছেন সবাই চলে গিয়েছেন ভেতরে। বাকি রয়ে গেছে নির্বাণের নানি আর নির্বাণের ফুফাতো বোন ইয়াফি।

— তোর বৌরে কোলে নিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকবি।

— কিহ্????

— আহ এত জোড়ে চিক্কার দেওনের কি আছে?

কানে হাতে কথাটি বলে বিরক্তিকর শ্বাস ছাড়ল নির্বাণের নানি।

— তোর নানায় আমারে এমনে ঘরে উঠায় নায় ঠিকই কিন্তু তোর বাপে তোর মারে এভাবে প্রথমবার কোলে তুইলা নিয়া গেছে। তাও আজ থেইকা পয়ত্রিশ বছর আগে। আর তোরা এই যুগের মানুষ হইয়া এই কথা হুইনা “কিহ্” কইরা মানুষের হার্ড টায়ার্ড কইরা লাইছোস।

—হার্ড টায়ার্ড কি নানু??

নির্বাণের চোখে দুষ্টুমিরা খেলা করছে। শেষমেশ তার নানি কিনা……

— আরে নির্বাণ ভাই বাদ দাও তোমার নানির কথা। কিসব উল্টাপাল্টা ইংলিশ বলে তুমি জানো না!! এই যে হার্ড টায়ার্ড বললো? উনার কাছে এই শব্দের বাংলা অর্থ হচ্ছে হার্ট দূর্বল। উনি ইংরেজিতে ট্রান্সলেট করেছেন হার্ড টায়ার্ড! মানে ভাবা যায় কতটা এক্সট্রাঅরডিনারি ভাবনা উনার। ও মাই গড!!

— হইছে। তোমাগো ইংরেজি কে বুঝে? আর দেখো আমারডা সবাই বুঝে। তাই না গো নির্বাণের বৌ?

অলরেডি খেয়া ঠোঁট টিপে হাসছে। তবুও খেয়া হাসি বহু কষ্ট করে চেপে রাখলো। মাথা নাড়িয়ে বোঝালো যে ,, নানি ইংরেজি ভীষন ভালো। ব্যস,, নির্বাণের নানিকে আর কে পায়! প্রচন্ড খুশি হয়ে খেয়াকে একপাশে জড়িয়ে ধরে কপালে একটা চুমু একে দেয়।

— নির্বাণ দেরি করিস না। জলদি বৌ কোলে নিয়া ঘরে আয়। সোজা তোর ঘরে যাবি। খাবার ওখানেই পাঠাবো ।

খেয়ার মাথার ওড়না ঠিক করতে করতে কথাটি বললো নির্বাণের নানি। নির্বাণের ভীষন নার্ভাস লাগছে। ওদের সম্পর্কের দশবছর হলেও হাত ধরা অব্দি সীমাবদ্ধ ছিল। খেয়ার দিকে একবার করুণ চোখে তাকায় কিন্তু খেয়া ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে আছে। নির্বাণ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

খেয়া তখন ইয়াফির কোনো এক কথার পিঠে জবাব দিতে যাবে এমনসময় শূন্যে ভেসে ওঠে। যার দরুণ ভয়ে ওর মুখ দিয়ে চিৎকার বেরিয়ে আসছিল। কিন্তু,, নির্বাণের কথায় চিৎকার উবে গিয়ে একরাশ লজ্জা ঘিরে ধরে খেয়াকে।

— আমার কোলে ওঠতে তোর ভালো লাগে আগেই বলতি। তোকে গাড়ি থেকে নামিয়ে আমার সোজা ঘরে চলে যেতাম।

নির্বাণ ফিসফিসিয়ে কথাটি বলে খেয়াকে কোলে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আর এদিকে খেয়া নির্বাণের মুখের দিকে না তাকাতে পারছে, না কোল থেকে নামতে পারছে। উপায়ন্তর না পেয়ে সোজা মুখ লুকালো নির্বাণের বুকের মধ্যে। নির্বাণ শক্ত করে খেয়াকে চেপে ধরলো ওর বুকের মাঝে। শূন্য হৃদয়টা হুট করে একছত্র অধিপত্যে পেয়ে গেছে। ধুকধুক করে বেড়েই চলেছে তার গতি। হৃদয়ের এই গতি বেড়েই চলেছে।

কেন ভালোবাসার মানুষের কথা মনে পরলে হৃদয়ের গতি বেড়ে যায়?? কেন ভালোবাসার মানুষের একটুখানি স্পর্শে হৃদয় উদগ্রীব হয়ে ওঠে সেই মানুষটার আর একটুখানি স্পর্শ পেতে? এই “কেন” শব্দের কোনো উত্তর আছে।

নির্বাণ খেয়াকে নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে নিজের ঘরের দিকে। ফুলে সাজানো ঘরটায় এনে কোল থেকে নামিয়ে দেয় খেয়াকে। খেয়া মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। সবটাই যে তার মনমতো সাজানো হয়েছে তাই। পুরো ঘরে কেবল লাল গোলাপ ফুলের অস্তিত্ব,, সুভাসে ছেয়ে গিয়েছে পুরো ঘর।

খেয়া যখন মুগ্ধ হয়ে ফুল দেখছিল তখন নির্বাণ খেয়াকে দেখতে ব্যস্ত। হাজারো গোলাপের মাঝে তার জীবন্ত গোলাপ দাঁড়িয়ে আছে। সেই গোলাপকে দেখছে নির্বাণ। ধীরে ধীরে খেয়ার পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। দুহাত বাড়িয়ে খেয়াকে পেছনে থেকে জড়িয়ে ধরে নির্বাণ। নির্বাণের স্পর্শ পেয়ে খেয়া ফ্রিজড হয়ে যায়। নির্বাণের উত্তপ্ত গাঢ় নিশ্বাস আছড়ে পরছে খেয়ার কাঁধে। খেয়ার হৃৎপিণ্ডের গতি এতই বেড়ে গিয়েছে যে পাজরের হাড় ফুঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে যেন। খেয়ার গলায় নির্বাণ নাক গুঁজে ফিসফিসিয়ে বললো,,

— দশবছর,, তিনমাস,, পনেরো মিনিট,, ছয় সেকেন্ড পর তোকে এতটা গভীর ভাবে স্পর্শ করার অধিকার পেয়েছি আমি। আমার এতদিনের করা অপেক্ষা বিফলে যায়নি খেয়া। ভালোবাসার এত যাতনা কিভাবে সয়ে গেলাম রে ???

— ভালোবাসায় যাতনা সয়ে গিয়েছে বলে আজ তুই আর আমি একই ছাঁদের তলায় একে অপরের আলিঙ্গনে আবদ্ধ হতে পেরেছি ।

******——-*****

“” সখি ভালোবাসা কারে কয়?
হৃদয়ের মন্দিরে আছো বসে তুমি।
এই ব্যাথা প্রাণে নাহি সয়”

—কাকে ভালোবসে শেষ হচ্ছি? যে কিনা আমার ভাইয়ের হৃদয়? কি করে এতবড় ভুল একটা করতে যাচ্ছিলাম আমি!! আমি খেয়াকে পাওয়ার জন্য এতটাই অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম যে আমি নির্বাণের দশ বছরের ভালোবাসাকে ওর কাছে কেড়ে নেয়ার জন্য ওর কাছেই আবদার করছিলাম!!

কানাডার কোনো রেস্টুরেন্টে বসে কথাটি আনমনে বলে ওঠে ফায়েজ। কারো মেসেজ এসেছে ফায়েজের মোবাইলে যা পড়তেই জানতে পারে যে,, নির্বাণ আর খেয়ার ভালোবাসার সম্পর্ক দশবছরের। একে অপরকে নিজের করে পাওয়ার জন্য তাদের থেমে না যাওয়ার গল্প। সবটা পড়ার পর ফায়েজ কেবল একটি বাক্য বললো,,,

— একতরফা ভালোবাসার কোনো নিজস্ব জোর নেই। একেবারে মৃত্যপথযাত্রী আহত সৈনিকের মত। ভালোবাসায় ঘায়েল হয়ে কেবল মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে হয় একতরফা ভালোবেসে যাওয়া প্রেমিক-প্রেমিকাদের। কারণ,, একতরফা ভালোবাসা থেকে মুক্তি পেতে পারে একমাত্র মৃত্যুর মাধ্যমে। দুই তরফা ভালোবাসায় কেবল আছে শক্তি। সেই শক্তির জেরেই একে অপরকে নিজের করতে পারার এক ঐশ্বরিক অমর প্রেমকাব্য তৈরি সম্ভব। যেমনটা : খেয়া আর নির্বাণের প্রেমকাব্য তৈরি হলো।

____________________

পাঁচ বছর পর

— গল্পটার এন্ডিং কি?? তিনবছর ধরে গল্পটা এভাবে ফেলে রেখে তুমি কি বুঝাতে চাইছো আমি বুঝতে পারছি না!! তুমি এত দায়িত্বহীন মানুষ আমি আগে ভাবিনি!! তিনবছরে কটা গল্পের বই পাবলিশ হয়েছে তোমার??

— ছয়টা।

— তাহলে পেন্ডিংয়ে থাকা গল্পের দোষ কি?? শেষ করছো না?? প্রচ্ছদ ছাপা হয়েছিল মনে আছে?? পাঠকরা বারবার জানতে চায় প্রকাশনীর কাছে কেন বইটা এখনো আসছে না ? এখন কি তাদের সত্যিটা বলব যে, আমাদের লেখিকার মাথা গুলিস্তান রেখে এসেছে তাই গল্পটা এখনো জ্যামে আঁটকে আছে। প্রকাশনীর কাছে ঠিকঠাক ভাবে পৌঁছালে আপনারা গল্পটা পড়তে পারবেন?

— এটা কেন বলবেন??

অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে উত্তর দেয় খেয়া। শারমিন ম্যাম ভ্রুকুটি করে টেবিলের ওপর দুহাতে ভর দিয়ে খেয়ার সামনে ঝুঁকে বললো,,

— তাহলে কি বলব???

— বলবেন গল্পটা আমি লিখতে পারিনি ব্যক্তিগত কারণে।

— কিন্তু…

— কোনো কিন্তু না। ম্যাম আমি লিখব না। এই গল্পের বদলে আমি আর দশটা গল্প লিখে দিতে পারব।

— খেয়া-নির্বাণের এবং ফায়েজ-খুশবুর শেষ পরিণতি কি হয়েছিল সেটা জানতেই তো আমার পেট ব্যথা করছে। পাঠক কি চায় সেটা অন্য কথা।

— ম্যাম,, আমি চলি। বাড়িতে ফুপি অপেক্ষা করছে।

কথাটি বলে রঙধনু প্রকাশনীর অফিস থেকে বেরিয়ে যায় খেয়া। শারমিন ম্যাম অবাক হয়ে গেছে। কারণ,, এতটা হেয়ালি হয়ে থাকা মেয়ে খেয়া তো নয়।

রিক্সায় চড়ে বাড়ির পথে রওনা হয়েছে খেয়া। আকাশের বুকে তখন কালো মেঘমালার ছুটাছুটি চলছে। থেকে থেকে বজ্রপাতের গর্জন শোনা যাচ্ছে। শহরের দালান-কোঠা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে শহরের বুকে। গ্রামের ন্যায় গাছপালা যদি এই শহরের থাকত তবে এতক্ষণে হয়তো শখানেক গাছ বাতাসের তোড়ে দুমড়েমুচড়ে পরত রাস্তার ধারে।

ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামলো। শুকনো পিচ ঢালা পথ ভিজে যাচ্ছে। ব্যস্ততম নগরীর ব্যস্ত মানুষগুলো বৃষ্টিকে অগ্রাহ করে এগিয়ে চলছে নিজ গন্তব্যে। খেয়া এতক্ষণ সেই দৃশ্যগুলো দেখছিল হুট করে মনে হলো ওর ব্যাগটা পাটের সুতো দিয়ে তৈরি। বৃষ্টির পানিতে ব্যগটা ভিজে গেলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। দুটো উপন্যাসের ফাইনাল প্রফ জমা দিতে হবে। খেয়া অতিদ্রুত ব্যাগটা নিজের কোলের ওপর চেপে ধরলো এবং রিক্সাওয়ালাক বললো,,

— পর্দাটা টেনে দিন। ভিজে যাচ্ছি।

রিক্সাওয়ালা মামা ক্ষনিকের জন্য পেছনে তাকিয়ে উত্তর দেয়,,

— পর্দা লাগাই নাই। বছরের প্রথম বৃষ্টি তো তাই। লাগাবো নে পরে।

খেয়ার দিশেহারা অবস্থা। মানে কি থেকে কি করবে। হুট করে খেয়াল হলো যে ব্যাগে একটা পলিব্যাগ আছে তাতে না-হয় কাগজগুলো রেখে দেয়া যাক। যেই ভাবা সেই কাজ ব্যাগের ভেতরে রেখে আলগোছে কার্য সম্পন্ন করলো। এবার শান্তি।

দশতলা বিল্ডিংয়ের সামনে রিকশাটা থেমেছে। ততক্ষণে বৃষ্টির পরিমান আরও বেড়েছে। রিকশা থেকে নামা মাত্রই ভিজে যাবে খেয়া। যদি বৃষ্টির ছিটায় পায়ের দিক ভিজে গিয়েছে। তবুও নামতে তো হবেই। ভাড়া মিটিয়ে রিকশা থেকে নেমে ধীরে ধীরে রওনা হলো গেটের দিকে। গেটের কাছাকাছি যেতেই পেছন থেকে কেউ বলে উঠলো,,

— এতটুকু কমনসেন্স থাকার কথা আপনার যে সাদা জামা পরে বৃষ্টিতে ভিজতে নেই।

খেয়া ভীষণ লজ্জা পেয়ে ওড়না দিয়ে নিজেকে ঢেকে রাখার বৃথা চেষ্টা চালিয়ে বাড়ির পথে পা বাড়ায়। ঠিক তখনি একটি কালো রঙের শার্ট এগিয়ে দেয় ছেলেটা। খেয়া শার্টের দিকে তাকিয়ে আছে৷ দ্বিধায় ভুগছে আসলে শার্টটা নেয়া উচিত হবে কি না এই ভেবে!!

— বাসায় গিয়ে আমার শার্টটা ধুয়ে দিলে খুশি হব। বাসায় যাওয়ার আগ পর্যন্ত গায়ে জড়িয়ে নিয়ে যান।

— আমি কেন আপনার শার্ট ধুতে যাব?? খেয়া রেগে গিয়ে প্রশ্ন করে।

— শার্ট নিবেন কিনা বলুন? নয়তো এভাবেই যান। পুরো বিল্ডিংয়ের মানুষ আপনার এই অবস্থা দেখে বাঁকা চোখে তাকিয়ে থাকুক।

কথাটি শেষ হওয়া মাত্র খেয়া শার্টটা টান দিয়ে সেই হাত থেকে নিয়ে হাঁটা শুরু করলো। পেছন ফিরে তাকালে হয়তো দেখতে পেতো। খেয়ার বিরক্তি নিয়ে চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে কেউ মিটমিটিয়ে হাসছে ।

তিনতলার ফ্ল্যাটের সামনে কাক ভেজা হয়ে অনবরত কলিংবেল বাজাচ্ছে খেয়া। গায়ে এখনো কালো শার্টটা জড়িয়ে আছে। শেষবার কলিংবেলে চাপ দেয়ার আগে দরজা খুললো।

— মহারানী একটু দাঁড়িয়ে থাকলে আপনাকে নিশ্চয়ই বাঘ-ভাল্লুক খেয়ে ফেলবে না?? পুরো শহর ঘুরে এসেছেন কিন্তু ঘরের দরজার সামনে এলে এতো অস্থির হয়ে যান কেন?

— তুমি দরজা না খুললে তো মনে হয় এই যা ফুপি বোধহয় আর দরজা খুলবে না৷ তাই তাড়াহুড়ো করে বেল বাজাই তুমি বিরক্ত হয়ে যাতে তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দাও।

কথাটি বলতে বলতে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করলো খেয়া। ভেজা গায়ে না দাঁড়িয়ে থেকে সোজা নিজের রুমে ঢুকে ব্যাগটা খাটের ওপর রেখে ওয়াশরুমে ঢুক পরলো। ওয়াশরুমে থাকা আয়নায় চোখ পরে খেয়ার পিঠের সঙ্গে মিশে আছে কালো শার্টটা। মানুষটা তার জীবনের সঙ্গে খেয়াকে ঠিক এভাবে জড়িয়ে রাখতে চায় কিন্তু খেয়া যে তাকে সহ্য করতে পারে না। তাই তো দূরে সরিয়ে রাখে। খেয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বালতিতে শার্টটা রেখে দিলো। গোসলের পর সব কাপড়চোপড় ধুয়ে ফেলবে। আকাশের যা অবস্থা রুমের ফ্যানের বাতাসেই সব কাপড় মেলে দিতে হবে।

গোসল শেষে কাপড়চোপড় ধুয়ে রুমে সাথে এডজাস্ট করা বারান্দায় ভেজা কাপড় ছড়িয়ে দিলো দড়িতে,, পানি ঝরে গেলে রুমে এনে ছড়িয়ে দিবে।

— খেয়া?? এই খেয়া??

খেয়াকে ডাকতে ডাকতে রুমে ঢুকলো ফায়েজ। রুম ফাঁকা। কেউ নেই। অথচ খেয়ার ফুপি বলেছে খেয়া ওর নিজের ঘরেই আছে। আচ্ছা,, খেয়া কি বারান্দায়??

ফায়েজ বারান্দার দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই একটা আসমানী পরির দেখা পেলো। কালো রঙের পায়জামা ওড়নার সাথে আকাশী রঙের জামায় খেয়াকে সত্যিই আসমানী পরির মতো দেখাচ্ছে। যার মাথায় লাল গামছা পেঁচানো । যার কপালে,, গালে বিন্দু বিন্দু পানি জমে আছে। যে কিনা ভেজা কাপড় নিংড়ে দেওয়ার সময় নাক-মুখ কুচকে ফেলছে।

কাপড় ছড়িয়ে দিয়ে বালতি নিয়ে রুমের দিকে ফিরে আসার সময় বারান্দার দরজার সামনে ফায়েজের সঙ্গে দেখা হলো খেয়ার। খেয়া গায়ের ওড়না আরও ভালো করে গায়ে জড়িয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে যায়। ফায়েজ তখনও একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে খেয়ার দিকে। আচ্ছা,,, খেয়া কি সুন্দর হচ্ছে ঢাকায় এসে?? কই আগে তো এত চোখে লাগেনি?? নাকি তার চোখে ভালোলাগার মতো বসন্ত এর আগে ওর জীবনে কখনো আসেনি!!

— কিছু বলবেন??

খেয়ার কথায় ফায়েজ সম্বিত ফিরে পায়। নিজেকে খেয়ার সামনে খোলা বইয়ের মতো মেলে দিতে চায় না। বন্ধ বইয়ের রহস্যময় চরিত্র ইচ্ছে করে। খেয়া এত দ্রুত তাকে বুঝে ফেলুক এমনটা মোটেও চায় না ফায়েজ। কিন্তু,, ফায়েজ তো জানে না খেয়া তাকে কবে পড়ে ফেলেছে। ফায়েজের ভেতর-বাহির সবটাই জানা এখন।

— কেন কিছু না বললে কি এই ঘরে আসা মানা?? আমার বাবার বিল্ডিং আমি যখনতখন আসতে পারি,, যেতে পারি। কোনো সমস্যা আছে তোমার??

— না সমস্যা নেই। কিন্তু,, একটা যুবতি মেয়ের ঘরে হুটহাট ঢুকে চোরের মতো দাঁড়িয়ে থাকা কোনো ভদ্রলোকের কাজ হতে পারে বলে মনে করি না।

খেয়ার কথা শুনে ফায়েজের মুখ লাল হয়ে যায়। এতটা বিবেকহীন কবে হলো ফায়েজ!! আসলেই তো একটা যুবতি মেয়ের ঘরে হুটহাট চলে আসা মোটেও ভালো ব্যাপার না। ফায়েজ রুম থেকে বেরিয়ে যায়। ফায়েজের পেছনে পেছনে খেয়া বেরিয়ে আসে। ড্রইংরুমের সামনে এসে ফায়েজ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে খেয়ার ফিরে আসা পর্যন্ত৷

কারো পায়ের পদধ্বনি শুনে ফায়েজ ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখলো খেয়া দাঁড়িয়ে আছে ওর পেছনল। ফায়েজ খেয়ার দিকে সরাসরি তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,,

— পিকনিকে যাবে?? বিল্ডিংয়ের ম্যাক্সিমাম সবাই যাবে।

— কোথায় যাবেন সেটা আগে শুনি??

— কক্সবাজার।।

— না আমি যাব না। অলরেডি কক্সবাজার দশবার গিয়েছি।

ফায়েজের মন খারাপ হলো। কিন্তু,, চেহারা দেখে তা বোঝার উপায় নেই।

— আচ্ছা,, আসি তাহলে।

— চা খেয়ে যান।

— না। আজ আর মুড নেই।

কথাটি বলে ফায়েজ চলে গেলো। ফায়েজ চলে যাওয়ার পর খেয়া মাথায় থাকা গামছা খুলে ভেজা চুল ঝাড়া দিচ্ছিল ঠিক সেসময় দরজা খুলে ফায়েজ প্রবেশ করে। খেয়া হতভম্ব হয়ে ফায়েজের দিকে একনজর তাকিয়ে চট করে মাথায় কাপড় দেয়। ফায়েজ ধীরে ধীরে খেয়ার সামনে এসে দাঁড়ায়। খুব কাছাকাছি দাঁড়ায়। তারপর ফিসফিসিয়ে বললো,,

— আমার শার্টটা কি ফেরত দিবে?? নাকি রেখে দিবে??

ফায়েজের কাছ থেকে সরে যাওয়ার এই মোক্ষম সুযোগ। খেয়া এক দৌড়ে ওর রুমে ঢুকে বারান্দার দড়িতে থাকা কালো শার্টটা এনে ফায়েজের হাতে তুলে দিলো। ফায়েজ ওর হাতের দিকে মুচকি হেসে খেয়াকে উদ্দেশ্য করে বললো,,

— চুল বেঁধে রেখো। ছেড়ে রাখলে বরং পেত্নীর মতো দেখায়। ওই যে বটগাছে যে পেত্নীগুলো থাকে ঠিক সেরকম। আর শুনো রেডি থাকবে বুধবার ভোর চারটায়। তুমি এবং তুমির ফুপি আমাদের সঙ্গে পিকনিকে যাবে।

ফায়েজ মুখ থেকে পেত্নি শব্দ শুনেই খেয়ার মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে। তারমধ্যে শেষের বাক্য শুনে খেয়ার নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে না পেরে ফায়েজকে বললো,,

— আমরা কেউই যাব না। এখন আপনি কি আমার দঁড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে যাবেন??

— সেটা সময় হলে দেখা যাবে। দঁড়ি নিয়ে বেঁধে নিয়ে যাব নাকি কোলে নিয়ে সময় এলেই দেখবে। কিন্তু,, পিকনিকে তোমরা যাচ্ছো এটাই কনফার্ম।

কথাগুলো বলে ফায়েজ খেয়াদের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে চলে গেছে। আর খেয়া সেখানে দাঁড়িয়ে রাগে ফোসফাস করছে।

চলমান…..

[প্রিয় পাঠক গল্পের অনেক অজানা ঘটনা বাকি। জানতে হলে অতি আবশ্যক ধৈর্য ধরতে হবে।