হৃদয়াবেগ পর্ব-০৩+০৪

0
913

#হৃদয়াবেগ
#পর্বঃ০৩
#রূপন্তি_রাহমান (ছদ্মনাম)

তাহমিদ কোমল গলায় বলল,

‘নাযীফাহ, কেমন আছিস?’

তাহমিদের এমন কোমল কন্ঠস্বর শুনে দম আটকে আসার উপক্রম নাযীফাহ’র। এপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে তাহমিদ আবার বলল,

‘কি হলো উত্তর দিচ্ছিস না যে।’

নাযীফাহ কাঁপা কাঁপা গলায় উত্তর দিলো,

‘ভ্ভভাল।’ জড়তার জন্য আর জিজ্ঞেস করেনি, ‘আপনি কেমন আছেন তাহমিদ ভাই?’

নাযীফাহ’র এমন কাঁপা কাঁপা কন্ঠস্বর শুনে নৈঃশব্দে হাসলো তাহমিদ। তারপর দুইজনই চুপ। কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পরে দুজনের এই নিরবতাকে বিদায় জানালো তাহমিদ।

‘পরীক্ষার তো আর চারদিন বাকি।পরীক্ষার প্রস্তুতি কেমন?’

‘ভভভাল।’

এবার মৃদু শব্দে হাসলো তাহমিদ।

‘শুধু ভালো?’

কোনো উত্তর দিলো না নাযীফাহ। নাযীফাহ’র উত্তর না পেয়ে তপ্ত শ্বাস ফেলল তাহমিদ।

‘ভালো করে পরীক্ষা দিস। খুব মনযোগ দিয়ে পড়বি। তোর অংক আর ইংরেজি পরীক্ষার আগে এসে আমি তোকে অংক আর ইংরেজি পড়াবো। এখন রাখছি।’

তাহমিদ কল কাটতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল নাযীফাহ। এতোক্ষণ যেন সে দম আটকে রেখেছিল।ফাহিমের দিকে তাকাতেই দেখল ফাহিম ওর দিকে ভ্রুকুটি করে তাকিয়ে আছে। ফাহিমের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে নাযীফাহ বলল,

‘এভাবে তাকিয়ে আছিস ক্যান?’

নাযীফাহ’র হাত থেকে মোবাইল নিয়ে ফাহিম বলল,

‘একটা দস্যি মেয়ের কাঁপা-কাঁপি দেখলাম। ভাগ্যিস ভাইয়ার সাথে তোর বিয়ে হয়েছিলো। নাহলে এই বিরল দৃশ্য আমার দৃষ্টি গোচর হতো না।’

সোফা থেকে একটা কুশন ফাহিমের দিকে ছুড়ে মে’রে নাযীফাহ বলল,

‘শুন ফাহিম্মা তোর ভাইকে আমার সাথে মোবাইলে কথা বলতে নিষেধ করবি। আর একটু হলে আমি দম আটকে ম’রে যেতাম।’

নাযীফাহ’র কথা শুনে ফাহিম শব্দযোগে হাসতে লাগলো।

‘এই চুপ একদম হাসবি না। ঝগরুটে বুড়ি কই গেলো?’

‘দাদি ওয়াশরুমে গেছে।’

দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পরই ফাহিম আর আমেনা বেগম বিদায় নিলো। হাজার বলা সত্বেও থাকেনি।

____________________________________________

যথারীতি নাযীফাহ’র দু’টো পরীক্ষা শেষ হয়ে গিয়েছে। পরশু অংক পরীক্ষা। আজ রাতে তাহমিদ বাড়ি আসবে।

পরদিন সকালে নাযীফাহদের বাড়িতে এসে উপস্থিত হয় তাহমিদ। তাহমিদকে দেখে ফাহমিদা বেগম ব্যস্ত হয়ে পড়ে। একদিন বন্ধ বলে আরামে ঘুম দিয়েছিলো নাযীফাহ। মায়ের মুখে তাহমিদ আসার খবর শুনে একলাফে ঘুম থেকে উঠে। ক্ষনিকের মধ্যে রুম গুছিয়ে ওয়াশরুমে দৌড় দেয়। মেয়ের কান্ড দেখে আহাম্মকের মতো তাকিয়ে থাকেন ফাহমিদা বেগম। তারপর মৃদু হেসে বসার ঘরের দিকে পা বাড়ান তিনি। জামাই আপ্যায়ন করার জন্য নানা পদের রান্না করছেন।খালেদ মোশাররফ একটু পর পর গিয়ে জিজ্ঞেস করছে আর কি লাগবে।

পড়ার টেবিলে বসে আছে তাহমিদ আর নাযীফাহ। তাহমিদ অংক বুঝাচ্ছে আর নাযীফাহ জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। ঘন্টা দুয়েক পড়ার পর তাহমিদ বলল একটু ব্রেক নেওয়ার জন্য। দরজার দিকে এগিয়ে গেলো তাহমিদ। চেয়ারে বসে আছে নাযীফাহ। বহুকষ্টে তাহমিদকে ডাকলে সে।

‘তাহমিদ ভাই?’

পিছন ফিরে তাকালো তাহমিদ। নাযীফাহ এক নিঃশ্বাসে বলল,

‘আপনি আর কখনো আমার সাথে মোবাইলে কথা বলবেন না।’

জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো তাহমিদ। চোখ বন্ধ করে নাযীফাহ বলল,

‘সামনাসামনি থেকে মোবাইলে আপনার কন্ঠস্বর ভয়ংকর লাগে। দম আটকে আসে আমার।’

তাহমিদ নাযীফাহ’র দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, ‘অজ্ঞেয় অনুভূতি।’

____________________________________________
ইংরেজি পরীক্ষা অব্দি থাকার কথা থাকলেও দরকারী কাজে তাহমিদকে ঢাকায় ফিরে যেতে হয় নাযীফাহ অংক পরীক্ষার দিন। পরীক্ষা শেষে যখন নাযীফাহ বাড়ি এলো তখন তাহমিদও এই বাড়িতেই ছিলো। ফাইলপত্র রেখে সোফায় চোখ বন্ধ করে গা এলিয়ে দিয়েছিলো সে। হঠাৎ মাথায় কারো স্পর্শ পেয়ে চোখ মেলে তাকায়। চোখের সামনে তাহমিদকে দেখে সোজা হয়ে বসল সে। তাহমিদ ওর মাথায় হাত রেখে বলল,

‘আমাকে এখনই ঢাকা যেতে হবে। বাকি পরীক্ষা গুলোও একটু মন দিয়ে পড়াশোনা করিস। আর নিজের যত্ন নিবি। ঠিকমতো খাবি।’

ঘর থেকে বের হতে নিলে নাযীফাহ বলল,

‘মা বাবার সাথে দেখা করবেন না?’

‘ওনাদের থেকে বিদায় নিয়ে নিয়েছি। তোর অপেক্ষা করছিলাম। আসি আমি।’ মাথা নাড়লো নাযীফাহ। দরজা অব্দি গিয়ে তাহমিদ আবার ডাকলো,

‘নাযীফাহ?’ তার ডাকে নাযীফাহ তাকালো।

‘মোবাইলে কথা বলতে নিষেধ করে এই আমিটার সাথে কোনো একদিন মোবাইলে কথা বলতে মরিয়া না হয়ে যাস।’ বলেই হনহনিয়ে চলে গেলো সে।’

____________________________________________

ফাইলপত্র হাতে একটা অফিসের নিচে দাঁড়িয়ে আছে তাহমিদ। রিক্সা ধরে বাসস্ট্যান্ড অব্দি যেতে হবে। বার বার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে সে। সামনে কোনো মেয়েকে দেখে চমকিত হয় সে।

‘আসসালামু আলাইকুম স্যার।’

‘ওয়ালাইকুমুস সালাম৷ তুমি এখানে কি করছো সাবিহা?’

‘এটা আমার বাবার অফিস স্যার। ইন্টারভিউ দিতে এসেছেন?’

‘হুম।’

‘আপনি বললে আমি বাবার সাথে কথা বলতে পারি। আমার কথা বাবা ফেলবেন না।’

চোখমুখ কঠিন হয়ে এলো তাহমিদের। পরপর কয়েকটা শ্বাস ফেলে নিজেকে স্বাভাবিক করল সে।

‘দেখো সাবিহা চাকরিটা আমি আমার যোগ্যতায় করতে এসেছি। যদি তারা আমাকে যোগ্য মনে করে তাহলে ডাকবে। তাছাড়াও কর্মক্ষেত্রে অভিজ্ঞতারও প্রয়োজন আছে। কারো দয়া নিয়ে চাকরি করতে আসিনি।’

‘স্যার আমি ওভাবে,,,,’

সাবিহার কথা না শুনে চলে গেলো তাহমিদ। রাগে ফুঁসছে সে।

____________________________________________

পরীক্ষা শেষ নাযীফাহ’র। সে এখন মুক্ত পাখির মতো। তার দস্যিপনা আগের থেকে কয়েকগুণ বেড়েছে। এইতো সেদিন ষাঁড়ের তাড়া খেয়ে বাড়ি এসেছে। সব শুনে ওয়াহিদা মানে তাহমিদের মায়ের কি হাসি। গতকাল বিকেলের দিকে মধ্যপাড়ার হাসেম মিয়ার কলা বাগান থেকে নাযীফাহ আর তার গ্যাং একটা কলা ছড়ি চুরি করে এনেছে। রাত পোহাতেই হাসেম মিয়া এসে হাজির। বিচার দিলো খালেদ মোশাররফের কাছে। মাথা নিচু করে রইলেন তিনি। কারন অজানা নয় এসব কাজ তার মেয়ে ছাড়া আর কেউ করবে না। হাসেম মিয়া শাসিয়ে গিয়েছে এতো বড় ধিঙি মেয়ের বিচার যদি খালেদ মোশাররফ না করে তো এর শেষ দেখে ছাড়বে।

উবু হয়ে শুয়ে আচার খাচ্ছিলো নাযীফাহ। ফাহমিদা বেগম তার ঘরে প্রবেশ করেই নাযীফাহ কে একটানে তুলে দুইগালে সপাটে চড় মা’র’লে’ন। হতভম্ব হয়ে গেলো নাযীফাহ।

‘তুই এখনো ছোট? এখনো তোর বাচ্চামো করার বয়স আছে? নাকি তোকে জন্ম দিয়ে ভুল করেছি? যে মানুষটার দিকে কেউ আঙুল তুলতে পারবে না আজ তোর কারণে সেই মানুষকে পাড়ার লোকেরা বাড়ি বয়ে এসে অপমান করে যাচ্ছে। তোর এমন কার্যকলাপে অতিষ্ঠ হয়ে গেছি আমরা।’

গালে হাত দিয়ে মাথা নিচু করে মায়ের কথা শুনছে নাযীফাহ। নিরবে অশ্রুকণা গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে।

‘চুপ করে না থেকে উত্তর দে কেন তুই কলার ছড়ি চুরি করেছিস?’

হেঁচকি তুলে কাঁদছে নাযীফাহ।

‘হাফিজের বড় বোন কুলসুম আপুর বাবু হবে। আপু কাঁচকলার ভর্তা খেতে চেয়েছে। হাফিজ কোথাও কাঁচকলা না পেয়ে হাসেম চাচার কাছে গিয়ে বলতে উনি বললেন, কলা নাকি এখনো ছোট, পরিপূর্ণ হয়নি। আরো অনেক কিছু বলেছে। তাই আজ পুরো কলাগাছটাই উপড়ে দিয়েছি।’

সব শুনে ফাহমিদা বেগম শাসনের সুরে বললেন,

‘এমন পাগলামো এটাই যেন শেষ বার হয়। আর যদি কেউ বিচার নিয়ে আসে তো সেদিনই আমি তোকে জ’বা’ই করবো। ভুললে চলবে বা তুই বিবাহিত। এসব কথা তোর শ্বশুর বাড়িতে গেলে কি হবে ভেবে দেখেছিস? হাজার হউক সে তোর ফুফু।এখন কিন্তু শ্বাশুড়ি।’

____________________________________________

বাসায় এসে রাগে ফাইল ছুড়ে মা’রে তাহমিদ। অধ্যায়নরত ফাহিম ভাইয়ের এমন রাগ দেখে অবাক হয়ে গেলো। সে সচারাচর ভাইকে রাগতে দেখে না। মাথা ঠান্ডা করার জন্য সোজা ওয়াশরুমে চলে গেলো। ঘন্টা খানিকের মাথায় শাওয়ার নিয়ে বের হলো তাহমিদ। তাহমিদ বের হতে ফাহিম জিজ্ঞেস করলো,

‘কি হয়েছে ভাইয়া?’

কোনো উত্তর করলো না তাহমিদ। কপালে হাত ঠেকিয়ে শুয়ে পড়লো। ভাইয়ের এমন নিরবতা দেখে আর ঘাটলো না ফাহিম।

দুইদিন পর তাহমিদকে ডাকলো সেই কোম্পানি থেকে। কারন সে সিলেক্ট হয়েছে। সেখানে গেলো না তাহমিদ। রাতে আরো দুই জায়গায় এপ্লাই করে ফেসবুক স্ক্রল করতে লাগলো সে। একটা আননোন নাম্বার থেকে কল এলো তাহমিদের মোবাইলে। এতরাতে অচেনা নাম্বার থেকে কল আসায় কপালে ভাজ পড়লো তার। কল রিসিভ করে কানে ধরতেই মেয়েলি কন্ঠস্বর ভেসে এলো।

‘আসসালামু আলাইকুম।’

‘ওয়ালাইকুমুস সালাম। কে বলছেন?’

‘আমি সাবিহা স্যার।’

মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে গেলো তাহমিদের। সাবিহাকে বুঝতে না দিয়ে প্রশ্ন করলো,

‘আজ আপনি অফিসে এলেন না কেন স্যার? আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। বলল আপনি নাকি অফিসের কল পেয়েও আসেননি।’

‘আমার ইচ্ছে হয়নি তাই যায়নি। আমি কোথায় চাকরি করবো এটা তো সম্পূর্ণ আমার ইচ্ছে তাই না। এসব নিয়ে আমি তোমাকে কিছু বলতে চাই না।’

‘আসলে স্যার আমি ভেবেছি আমার সেদিনের কথায় আপনি যাননি।’

‘বুঝতেই যখন পারছো আবার জিজ্ঞেস করছো কেন? তোমার বলা কথাগুলোর পরে আমি যতই নিজের যোগ্যতায় চাকরিটা পাই না কেন আমার কাছে মনে হবে তুমি তোমার বাবার কাছে আমার চাকরির কথা বলেছো। আমার যদি যোগ্যতা ইনশাআল্লাহ কোথাও না কোথাও আবার চাকরি হবে, রাখছি।’

বলেই কল কেটে দিলো তাহমিদ। তাহমিদ কল কাটতেই কান মোবাইল নামায় সাবিহা।তারপর বাঁকা হেসে বিড়বিড় করে বলে,

‘আপনার এই আত্মসম্মান বোধের কারনে আপনাকে আমার এতো ভালো লাগে। নিজের মনের কথা বলার অপেক্ষায় রইলাম স্যার। যেন আমার ভালোবাসাকে আবেগ বলে উড়িয়ে দিতে না পারেন।’

____________________________________________

সারাদিন কোচিংএ ক্লাস নিয়ে একটা ইন্টারভিউ দিয়েছে তাহমিদ। সন্ধ্যার পরে আরো দু’টো টিউশন করে বাসায় এসে মাত্রই গা এলিয়ে দিলো সে। ক্লান্তিভাব টা যেন একেবারে জেঁকে বসেছে। মোবাইলের রিংটোনে চোখ মেলে তাকায় সে। নাযীফাহ’র বাবা কল করেছে। রিসিভ করে কানে ধরতেই শুনতে পেলো খালেদ মোশাররফের আহাজারি। নাযীফাহ কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বিকেলের পর আর কেউ দেখেনি। হৃদস্পন্দন থেমে গেলো তাহমিদের।

#চলবে

#হৃদয়াবেগ
#পর্বঃ০৪
#রূপন্তি_রাহমান (ছদ্মনাম)

এসএসসি পরীক্ষার পরে তিনমাস বন্ধ থাকে।তন্মধ্যে একমাস শেষ। নাযীফাহ’র দিন কাটে পাড়ার বাচ্চাদের সাথে মার্বেল, বউছি, গোল্লাছুট এসব খেলে। এর মাঝে আমেনা বেগম এসে দিন কয়েক এখানে থেকে গেছে। দু’জনের হায়রে ঝগড়া আর খুনসুটি।

আজ বিচার বসবে নাযীফাহ’র বিরুদ্ধে। কারন সে একজন মাতবর গোছের লোকের মাথা ফাটিয়েছে। কেন ফাটিয়েছে কেউ জানে না। ঘটনা তিনদিন আগের। সব শুনে ওয়াহিদা, জামান আর আমেনা বেগমও এসেছে। এসব ঘটনা অজানা তাহমিদ আর ফাহিমের। সবাই হাজার চেষ্টা করেও নাযীফাহ’র মুখ থেকে একটা কথা বের করতে পারিনি। সে যেন মুখে কুলুপ এঁটেছে। ফাহমিদা বেগম ম’রা’র মতো আছে। খালেদ মোশাররফ কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না।

আজ বাজারের সব দোকানপাট বন্ধ কারণ বাজারেই বিচারসভা হবে। মহিলারা এখানে ওখানে লুকিয়ে দেখতে এসেছে। শুরু হলো বিচার কার্য। পাঁচজন মাতবরের একে একে সবাই নাযীফাহকে জিজ্ঞেস করলো কেন সে এই কাজ করেছে। কিন্তু সে নিরুত্তর। কেউ একজন বলে উঠলো,

‘খালেদ ভাইয়ের তো দস্যি। এতো ধিঙি হওয়ার পরও ছোট ছোট বাচ্চাদের সাথে খেলে। দেখেন গিয়ে হয়তো ভালো কথা বলেছে বলে এই ফাজিল মেয়ে তারেক সাহেবের মাথা ফাটিয়েছে।’

যে যা পারছে সব বলছে।অপমানে মাথা হেট হয়ে যাচ্ছে খালেদ মোশাররফের। এখান ওখান থেকে মহিলারাও কানাঘুষা করতে লাগলো। বিচারকরা সবাই আলোচনা করতে লাগলো নাযীফাহকে কি শাস্তি দেওয়া যায়। প্রায় মিনিট তিরিশ আলোচনার একজন বললেন,

‘নাযীফাহ’র আশেপাশের বাচ্চারাও ওর থেকে এসব উগ্র আচরণ শিখবে।সেজন্য নাযীফাহ ঘরবন্দী হয়ে থাকবে।কারে সাথে মিশতে পারবে না। আর খালেদ মোশাররফ সাহেবকে গ্রাম্য সালিশের বিচারক থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলো। যে নিজের মেয়ে সামলাতে পারে না সে পুরো গ্রামের মানুষের বিচার করবে কিভাবে।’

নাযীফাহ’র গৃহবন্দীর ব্যপারটা বুঝলেও সালিসি কার্যক্রম থেকে অব্যাহতির কারন বুঝলো না খালেদ মোশাররফ। হয়তো আগের শত্রুতা। বিচার কাজ শেষ। সবাই উঠে দাঁড়ালো। একজন পঁচিশ কি ছাব্বিশ বছরের নারী ছয় থেকে সাত মাস বয়সী বাচ্চা কোলে এসে সামনে দাঁড়ালো। উপস্থিত সবাই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সেই নারীর দিকে।

‘দোষী কে ভালো সাজিয়ে নিরপরাধীদের শাস্তি দিবেন না।’

কেউ একজন বলে উঠলো, ‘মানে?’

তারেক সাহেবের যেন চেহারার রংই পাল্টে গেলো। নারীটি অশ্রুসিক্ত নয়নে বলল,

‘আপনারা সবাই জানেন আমার স্বামী কয়েকদিন আগে হঠাৎ করে শয্যাশায়ী হয়ে যায়। জমানো টাকা যা ছিলো সব উনার পিছনে খরচা হয়ে গেছে। তাই হাজার তিরিশ টাকা আমি আর আমার শ্বাশুড়ি তারেক চাচার কাছ থেকে হাওলাত আনি সুদের উপর। পাঁচদিন আগে তার ১ মাস পূর্ণ হয়। উনি আসে টাকা নেওয়ার জন্য। আমার শ্বাশুড়ি তখন আমার ননাসের বাড়ি গেছে। উনাকে দেখা মাত্র আমি চেয়ার এনে দিলাম। আর উনি সুযোগ বুঝে আমার হাত চেপে ধরে বলে, ‘আমার বিছানায় গেলে এই টাকা দিতে হবে না। উল্টে আমি তোকে আরো টাকা দিবো।’ উনার কথা শুনে রাগে গা রি রি করে আমার। ইচ্ছে করছিলো উনার মুখের উপর বমি করে দেই। উনি আমার সাথে ধস্তাধস্তি শুরু করে। বলে না রাখে আল্লাহ মারে কে? খেলা শেষে নাযীফাহ আমাদের বাড়িতে গিয়েছিল পানি খাওয়ার জন্য। গিয়ে এই পরিস্থিতি দেখে হাতের কাছে যা ছিলো তা দিয়ে উনার মাথায় আঘাত করে।’

কান্নার প্রকোপে গলায় কথা আটকে এলো সে নারীর। সন্তানকে বুকে জড়িয়ে কাঁদছেন নারী।

‘নাযীফাহ আমার ফেরেশতার রূপে এসেছে। না হলে যে মেয়ে কখনো এইদিকে আসে না সে আসবে কেন? ওই মেয়েটার জন্য আমার সম্ভ্রম রক্ষা পেয়েছে।’

তারেক সাহেব হুঙ্কার দিয়ে বললেন,

‘এই মহিলা মিথ্যে বলছে। টাকা দিতে পারবে না বলে আমাকে ফাঁসাচ্ছে।’

ভরা মজলিস থেকে কেউ কেউ বলছে,

‘এসব কথা তাহলে নাযীফাহ কেন বলে নাই।’

কথাটা ওই নারীর কানে আসা মাত্রই সে বলে,

‘কারণ এই তারেক চাচা আমাকে হুমকি দিয়েছে, আমি যদি এই ঘটনা কাউকে বলি তো আমাকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে গ্রাম ছাড়া করবে। আমার স্বামীকেও দেখে নেবে।তাই আমি নাযীফাহ’র কাছে অনুরোধ করেছি সে যেন কাউকে না বলে। এখন তো দেখছি চুপ করে আছি বলে নিরপরাধ মানুষ শাস্তি পাচ্ছে। আপনারা কেমন বিচারক? কোনোকিছু যাচাই ছাড়া শাস্তি দেওয়ার জন্য পাগল হয়ে গেছেন।’

মাথা নিচু করে বসে রইল সবাই। কারো মুখে কোনো রাঁ নেই। তারেক সাহেব রাগে ফুঁসছেন। টলমল চোখে হাসি ফোটে উঠে খালেদ মোশাররফ সাহেবের। এক পা এক পা করে তিনি মেয়ের কাছে এগিয়ে গেলেন। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে বললেন,

‘আমার দস্যি মেয়েটা যে একজনের সম্ভ্রম বাঁচিয়ে আমার সম্মান বাড়িয়ে দিলো। সে এখন তার বাবার গর্বের কারন।’

উপস্থিত সকল উদ্দেশ্য করে খালেদ মোশাররফ বলেন,

‘যে সালিসে কোনো সত্য উদঘাটন ছাড়া বিচার করা হয় থাকলাম না সেখানে সদস্য হয়ে।’

সেখানে আর উপস্থিত না থেকে খালেদ মোশাররফ তার মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে।

উনি চলে আসার পর তারেক সাহেব সেই নারীর পা ধরে ক্ষমা চায় ভরা মজলিসে। বলা চলে এক প্রকার বাধ্য হয়ে ক্ষমা চায়।

____________________________________________

নাযীফাহ আর তার বাবা বাড়ি আসার পরে, তার বাবা ওয়াহিদা, জামান আর আমেনা বেগম কে উদ্দেশ্য করে বলেন,

‘আপনাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। আমার অবুঝ, বাচ্চা মেয়েটাকে বাড়ির বউ করেছেন। এতো কিছু হওয়ার পরও কিচ্ছু বলেননি। অন্য মানুষ হলে হয়তো এতোক্ষণ সম্পর্ক শেষ করে দিতো।’

খালেদ মোশাররফের কথায় আমেনা বেগম কাছে এলেন। নাযীফাহ’র মাথায় হাত রেখে বলেন,

‘ছোট বেলায় আমিও এই ছুড়ির মতো দস্যি ছিলাম। বলা চলে এর থেকেও বেশি।এলাকার মানুষ আমায় নিয়ে ভয়ে থাকতো। বিয়ের পর আমার খুব শখ ছিলো একটা মেয়ের। আমার এই শখ পূরণ হতে হতে হলো না। পরপর তিনবার মেয়ে জন্ম দিলাম তাও মৃত। শেষে জামান হলো। আমার আর বাচ্চাই হলো না। জামানকে বিয়ে করানোর পর ভাবলাম মেয়ে নাই তো কি হয়েছে ছেলের বউ হয়েছে। আবার নাতনি হবে। এবারও আমার আশা পূরণ হলো না। ওয়াহিদা দুই ছেলের জন্ম দিলো। এরপর জন্ম নিলো নাযীফাহ। নাযীফাহ একটু একটু বড় হওয়ার পরের কাহিনি ওয়াহিদা বলতো আর হাসতো। তখনই ভেবে নিয়েছিলাম এই দস্যি মেয়েকে নাতবউ করবো।কারন ওর মাঝে আমি আমার ছোটবেলাকে দেখি।’

____________________________________________

সেই ঘটনার প্রায় পনেরো থেকে বিশ দিন কে’টে গেছে। যে যার কর্ম নিয়ে ব্যস্ত। সেই ঘটনা বলা হয়নি তাহমিদ কে। কারন ওয়াহিদা ছেলের চোখে নাযীফাহ’র জন্য আতংক দেখেছে। এসব বললে টেনশন করবে সে।

সারাদিনে কোচিং তারপর ইন্টারভিউ আর সন্ধ্যায় টিউশন করিয়ে মাত্রই একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলো তাহমিদ। খালেদ মোশাররফের ফোন রিসিভ করতেই শুনতে পেলো, নাযীফাহকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। হৃদস্পন্দন থেমে গেলো তার। কি জবাব বুঝে উঠতে পারলো না। এই রাতের বেলা ফাহিম কে নিয়ে রওনা দিলো গ্রামের উদ্দেশ্যে।

শেষ রাতের দিকে গ্রামে গিয়ে পোঁছায় দুই ভাই। নিজেদের বাড়ি না গিয়ে সোজা নাযীফাহ’দের বাড়ি গিয়ে উঠে। তখন প্রায় সকাল। সবারই নির্ঘুম রাত কে’টেছে। তাহমিদ বাড়ি আসার পর সব শুনে মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলো।অসহায় চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,

‘তোমাকে বলেছিলাম না মা তোমার ভাইঝিকে সাবধানে থাকতে বলবে। তাকে নিয়ে আমার টেনশন হয়। কোথাও খুঁজবো ওকে? সেই লোকটার বাড়ি গিয়েছিলেন?’

তাহমিদের কথার পিঠে খালেদ মোশাররফ বলেন,

‘গিয়েছিলাম। তারেক সাহেব হাসপাতালে আজ তিনদিন যাবৎ। তাহমিদ বাপ আমার বুকের ধন কই গেলো।আমার একমাত্র সন্তান। এই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে আমি অনেক কিছু বিসর্জন দিয়েছি। আমার বুকের মানিক সুস্থ আছে তো? তোর মামিকে স্যালাইন দিয়ে রেখেছি। মেয়ের চিন্তায় প্রেশার কমে গেছে।’

‘থানায় মিসিং কমপ্লেন করেছো মামা?’

‘চব্বিশ ঘন্টার আগে কিছুই করবে নাকি তারা। আমি আশপাশ সব জায়গায় খুঁজেছি কোথায় নেই।’
____________________________________________

দুইদিন হতে চললো নাযীফাহ’র কোনো খুঁজ নেই। প্রত্যেকটা সদস্যের অবস্থা খারাপ। তাহমিদ নিজেকে যতই শক্ত দেখাক না কেন ভেতরে ভেতরে সেও ভেঙে পড়েছে। পাগলের মতো সাথে ফাহিমকে নিয়ে এখানে সেখানে সব জায়গায় খুঁজেছে। পুলিশও খুঁজছে কিন্তু কোনো হদিস নেই।

মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। এই এখনি বৃষ্টি নামবে বলে। বৃষ্টির অভাবে কৃষকরা এতোদিন ধানগাছ রোপন করতে পারেনি। তাই তাই কেউ জমির দিকে যাচ্ছে যদি বৃষ্টি হয় আশায়। নাযীফাহদের পাশের মকবুল মিয়া ও গেছে জমির কাছে। ওনার জমির কাছে যাওয়ার আগেই বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। তৎক্ষনাৎ নিজেকে বৃষ্টি থেকে বাঁচানোর জন্য আশ্রয় নেয় ডিপ মেশিনের ঘরের ছাউনির নিচে। যেখান থেকে সব জমিতে পানি সেচ দেওয়া হয়। এটা বাইরে থেকে তালা দেওয়া। হঠাৎই গুঙ্গানোর শব্দে এদিক ওদিক তাকায় মকবুল সাহেব। কোনো কিছু না দেখতে পেয়ে সেই ঘরের একটু ফাঁক দিয়ে ঘরের ভেতরে তাকান উনি। যা দেখলেন উনি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন।

____________________________________________

জমির মাঝখানে সেই সেচ মেশিনের ঘরে আছে নাযীফাহ। মকবুল সাহেব সবাইকে ফোন দিয়ে জানালেন। মকবুল সাহেব জমিতে এলে কখনো মোবাইল সাথে আনেন না। কিন্তু আজ কি মনে করে যেন নিয়ে এসেছেন। সেখানে ভীড় করছে অনেকে। নাযীফাহ দীর্ঘ দুইদিন পরে বাবাকে দেখে জ্ঞান হারালো।

হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে নাযীফাহ। পুলিশ এসেছে জিজ্ঞাসাবাদ করতে। অদূরে তাহমিদ বসে আছে। উসকোখুসকো চেহারা। পুলিশ চলে গেলো। খালেদ মোশাররফ মেয়ের কাছে বসলেন। নাযীফাহ বাবাকে দেখে ছোঠ বাচ্চাদের ন্যায় ফুঁপিয়ে কেঁদে ছিলো।

‘জানো বাবা, আমি ভেবেছি আর তোমাদের দেখতে পাবো না। ওই নোংরা লোকটা আমাকে সেখানে বেঁধে রেখে এসেছিলো। দুই রাত শেয়ালের ডাকে ঘুমোতে পারিনি। মনে হয়েছে এই বুঝি আমাকে এসে খেয়ে ফেলবে। এতো ভয় আমি কখনো পাইনি। দুইদিন একটু পানিও পাইনি।’

মেয়ের কথা শুনে নিঃশব্দে কাঁদছেন খালেদ মোশাররফ। ফাহমিদা বেগমেরও অবস্থা খারাপ। উনাকে পাশের কেবিনে রাখা হয়েছে।

____________________________________________

পুলিশ ফোর্স গিয়ে হাজির হয় তারেক সাহেবের বাড়ি। ইন্সপেক্টর উনাকে টেনে বিছানা থেকে তুলে।

‘অনেক অসুস্থ হওয়ার নাটক করেছেন। এবার থানায় চলুন।’

তারেক সাহেব কিছু না জানার ভাব ধরে বলে,

‘আমি কি করেছি অফিসার?’

পুলিশ অট্ট হেসে বলে,

‘ঠাকুর ঘরে কে রে? আমি তো কলা খাইনি।’

‘আমার অপরাধ তো বলবেন।’

‘নাযীফাহ নামক ছোট্ট মেয়েকে কিডন্যাপ করার অপরাধে।’

ফ্যাকাসে হয়ে এলো তারেক সাহেবের মুখ। নাটক করে হাসপাতালে থাকতে সব তার অজানা। আজই বাড়ি এসেছেন। মাথা নুইয়ে ফেলে সে। পুলিশ লোকটা বিদ্রুপের স্বরে বলে,

‘এখন কিছু বলছন না কেন? জবান বন্ধ হয়ে গেছে।’

পুলিশের পীড়াপীড়ি কাছে অবশেষে হার মানে তারেক সাহেব।

‘হ্যা আমিই করেছি। ওই ছোট্ট মেয়েটার জন্য আমার ছেলে মেয়েরা আমার সাথে কথা বলে না। আমার স্ত্রী আমার সাথে কথা বলে। দূরে দূরে থাকে। সমাজের লোক চরিত্রহীন বলে। কোথাও মুখ দেখাতে পারি না। তাই ওকে কিডন্যাপ করেছি। চেয়েছিলাম না খাইয়ে রেখে মে’রে ফেলতে। কই মাছের প্রান সেই মেয়ের।’

উনার পরিবারের সদস্যরা হতভম্ব হয়ে গেলো। পুলিশ উনাকে ঠেলতে ঠেলতে জিপে নিয়ে তুলেছে।

____________________________________________

সবাই নাযীফাহ’র কাছে বসে আছে। ওয়াহিদা গিয়েছে ফাহমিদার কাছে। দূর থেকে তাহমিদ নাযীফাহ’র কাছে এলো। তাহমিদের চেহেরার এই পরিবর্তন দেখে নাযীফাহ বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইলো। তাহমিদ নাযীফাহ’র বিস্মিত দৃষ্টিকে তোয়াক্কা না করে বলল,

#চলবে