#_এক_ফালি_রোদ্দুর_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_পর্ব_২_৩
” তোমার বোন কি এবাড়িতে এখন পাকাপোক্ত হয়ে থাকার বন্দোবস্ত করছে নাকি?”
অরশি খানিকটা তীক্ষ্ণ স্বরেই কথাটা বলে উঠলো। রাত প্রায় সাড়ে দশটা। ঘরের সিলিং ফ্যানটা ঘুরছে ধীর গতিতে। বিছানার হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসে আছে ইমন। তার কোলে আট মাসের ছোট্ট মেয়ে অলি। বাবার শার্টের বোতাম ধরে টানাটানি করছে মেয়েটা। কখনো হাত পা ছুঁড়ে খিলখিল করে হাসছে, আবার কখনো বাবার আঙুল কামড়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। ইমন এতোক্ষণ পুরো মনোযোগ মেয়ের দিকেই রেখেছিলো। কিন্তু, অরশির কথায় কপাল কুঁচকে তাকালো সে।
” কি বলছো এইসব?”
অরশি ঠোঁট বাঁকায়।
” ভুল কি বললাম? শ্বশুর বাড়ি তো আর যেতে পারবে না, ডিভোর্স হয়ে যাচ্ছে। বাচ্চা পেটে চলে এসেছে, এবোরশন করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু, সে নাকি করবে না। সে তার মেয়েকে মানুষ করবে। তার মানে তো আর বিয়ে দেওয়া যাবে না। কে বিয়ে করবে তোমার বাচ্চাসহ বোনকে? কেউ করবে না। তাহলে তো সে এই বাড়িতেই থাকবে, তাই না?”
শেষ কথাটা বলার সময় গলায় স্পষ্ট বিরক্তি। ইমন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। অলি তখন বাবার বুকের উপর মাথা রেখে অস্পষ্ট শব্দ করছে। ইমন মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে নিচু স্বরে বললো,
” এই বাড়িতে থাকবে বলেছে?”
” জানি না। কিন্তু, তোমার বোন কি চাকরি করে? নাকি তোমার বোন জামাই খরচা দিবে? শোনো, এইসব উটকো ঝামেলা ঘাড়ে নিতে পারবো না কিন্তু। তোমার আহামরি কিছু নেই। আমার ছেলে মেয়ে বড় হচ্ছে। ছেলেটাকে সামনে মাসে একটা কোচিংয়ে দিতে হবে। মেয়ে বড় হলে খরচা বাড়বে। এইসব ঝামেলা একদম ঘাড়ে নিবে না।”
ইমন চুপচাপ শুনছিলো। একসময় ধীরে বলে উঠলো,
” তাহলে আমি কি করবো? আমি তো আর ওকে ফেলে দিতে পারি না, তাই না?”
অরশি এক পলক তাকালো ইমনের দিকে। সেই চোখে বিরক্তি স্পষ্ট। ইমন একটা ঢোক গিলে মেয়েকে আরেকটু চেপে নিলো নিজের দিকে। অলি বাবার বুকের সাথে লেপ্টে গিয়ে ছোট্ট করে হেসে উঠলো।অরশি একটু কড়া স্বরেই বললো,
” আমি তোমাকে ফেলে দিতে বলেছি?”
ইমন কোনো উত্তর দিলো না। বিছানার হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসে ছোট্ট অলিকে আস্তে আস্তে দোলাচ্ছিলো। মেয়েটার ঘুমে ঢুলু ঢুলু চোখ। মাঝে মাঝে আধো ঘুমে বাবার মুখের দিকে তাকাচ্ছে, আবার চোখ বুজে ফেলছে। হঠাৎ ছোট্ট করে কান্নার শব্দ করতেই অরশি উঠে এলো।
” দাও, আমার কাছে দাও।”
ইমনের কোল থেকে অলিকে সাবধানে তুলে নিলো অরশি। তারপর বিছানার এক পাশে কাত হয়ে শুয়ে মেয়েটাকে বুকের দুধ খাওয়াতে লাগে। ঘরের আলোটা ম্লান। জানালার বাইরে টুপটাপ শব্দে ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছে। ইমন শরীরটা এলিয়ে দিলো বিছানায়। দুই হাত মাথার পেছনে রেখে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। অরশি নিচু স্বরে বললো,
” বোনকে গিয়ে বোঝাও এবোরশনটা করানোর জন্য। এবোরশন হয়ে গেলে অন্য কোথাও বিয়ে দেওয়া যাবে। তখন ওরও জীবনের একটা গতি হবে, আমাদেরও ঝামেলা পোহাতে হবে না।”
ইমন চোখ নামিয়ে তাকালো অরশির দিকে। তার গলায় ক্লান্তি মেশানো দ্বিধা,
” কিন্তু শুনলাম, ও এবোরশন করাবে না।”
অরশি বিরক্ত হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
” সেই জন্যই তো বলছি রাজি করাও। এখন আবেগ দেখিয়ে লাভ কি? পরে তো কষ্টই বাড়বে।”
ইমন আর কোনো কথা বললো না। পাশে পড়ে থাকা ফোনটা হাতে নিয়ে অন্যমনস্কভাবে স্ক্রল করতে লাগে। কিছুক্ষণ পর অলি ঘুমিয়ে পড়লো। ছোট্ট মুখটা শান্ত হয়ে এসেছে। অরশি উঠে বসলো। তারপর আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে জড়ো করে খোঁপা বাঁধে। তারপর কোনো কথা না বলে দরজা খুলে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো সে।
…
রাজ নিজের রুমের বারান্দার পাশে রাখা রকিং চেয়ারে চুপচাপ বসে আছে। ঘরজুড়ে আধো অন্ধকার। জানালার কাঁচ বেয়ে টুপটাপ বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পড়ছে। মেঘ ডাকছে ক্ষীণস্বরে। অথচ, বাইরের এই ঝড়ের চেয়েও ভয়ংকর ঝড় এখন বইছে রাজের ভেতরে। প্রভার বলা কথাগুলো বারবার কানে বাজছে তার। শব্দ গুলো যেন তার মাথার ভেতর বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। রাজ দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেললো। সে বুঝতে পারছে না ঠিক কি অনুভব করছে। বিরক্তি? ভয়? নাকি অস্বস্তি? শুধু মনে হচ্ছে, সবকিছু হঠাৎ এলোমেলো হয়ে গেছে। ঠিক তখনই ফোনটা কেঁপে উঠে। স্ক্রিনে ভেসে উঠে, অনন্যা কলিং। রাজ দ্রুত সোজা হয়ে বসে। কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে কল রিসিভ করলো।
” হ্যালো!”
ওপাশ থেকে অনন্যার গলা ভেসে আসে,
” কি হয়েছে রাজ? এতো ম্যাসেজ করছি, রিপ্লাই কেন দিচ্ছো না?”
” নাহ, কিছু না।”
অনন্যা কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বললো,
” তোমাকে আপসেট মনে হচ্ছে। কিছু হয়েছে?”
রাজ ঠোঁট ভিজিয়ে নেয়। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে নিচু গলায় বলে,
” অনন্যা!”
” হুম!”
রাজ চোখ বন্ধ করলো।
‘ প্রভা দেড় মাসের প্রেগন্যান্ট।”
অনন্যা প্রায় চিৎকার করেই বলে উঠলো,
” হোয়াট? হোয়াট আর ইউ সেয়িং, রাজ? মানে কি?”
রাজ বিরক্তভাবে কপালে হাত বুলালো।
” আমি নিজেও শকড।”
” তাহলে, তাহলে এই মুহূর্তে তো ডিভোর্সও সম্ভব হবে না। আমরা বিয়ে করবো কি করে? আর ও যদি ঝামেলা করে?”
রাজ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো,
” মনে হয় না করবে।”
” তুমি কি করে বুঝলে?”
রাজ মাথাটা চেয়ারের সাথে হেলান দিলো। তারপর প্রভার সাথে হওয়া পুরো কথোপকথনটা বলতে শুরু করলো। অনন্যা ওপাশে চুপচাপ শুনতে থাকে। মাঝে মাঝে শুধু ক্ষীণ নিঃশ্বাসের শব্দ ভেসে আসছে। ওপাশে কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর অনন্যা ধীরে বললো,
” তুমি তো দেখছি আমার সাথে সম্পর্ক থাকাকালীন তার কাছেও গিয়েছো।”
কথাটা শুনে রাজের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো। সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো। তারপর নিচু গলায় বলে,
” আমাকে ভুল বুঝো না, অনন্যা!”
অনন্যা তীক্ষ্ণ স্বরে হেসে উঠলো।
” ভুল বোঝার কি আছে? তুমি আমাকে এসে বলতে ওর দিকে তাকাও না, তোমাদের মধ্যে কিছু নেই। অথচ এখন শুনছি সে প্রেগন্যান্ট। দেড় মাসের। মানে কি দাঁড়াচ্ছে?”
রাজ বিরক্তভাবে চোখ বন্ধ করলো। কপালের দুপাশে চাপ দিতে দিতে বললো,
” অনন্যা প্লিজ, আমাকে একটু বোঝার চেষ্টা করো। ব্যাপারটা এতো সহজ না।”
” তাহলে বুঝাও আমাকে।”
রাজ একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো। তারপর গলা নিচু করে বলতে লাগলো,
” ও আমাকে রাতে সিডিউস করতো। আমি তো একটা পুরুষ, বলো? একটা মেয়ে যদি একই রুমে থেকে বারবার সিডিউস করতে থাকে, তাহলে নিজেকে কতোদিন সামলে রাখা যায়? এটা ওর একটা ট্রাপ ছিলো। আর ও কতো বড় গেমার ভাবো একবার। ইচ্ছে করেই মেডিসিন নেয়নি, যেন আমাকে এই প্রেশারে ফেলতে পারে। আমি তো কয়েকদিন ড্রিংক করে ফিরেছিলাম, আমার মনে হয় প্রভা ওই সুযোগটাই নিয়েছে।”
ওপাশে হঠাৎ নীরবতা নেমে এলো। শুধু ক্ষীণ নিঃশ্বাসের শব্দ ভেসে আসছে। রাজের বুক ধুকপুক করছে। সে বুঝতে পারছে না অনন্যা ঠিক কি ভাবছে। কিছুক্ষণ পর অনন্যা বলে ওঠে,
” ব্যাপারটা সুবিধার লাগছে না। তোমার আর আমার তাড়াতাড়ি বিয়ে করে ফেলা উচিত।”
রাজ বড় একটা নিঃশ্বাস ফেললো। বুকের ভেতর জমে থাকা চাপটা খানিকটা নেমে গেলো। সে ভেবেছিলো অনন্যা হয়তো প্রচণ্ড রিয়্যাক্ট করবে, ঝগড়া করবে। কিন্তু মেয়েটা আশ্চর্যজনকভাবে শান্ত।
” হ্যাঁ! আমিও তাই ভাবছি।”
রাজ নিচু গলায় বললো। অনন্যা আবার বললো,
” আমি আসলে একটা কাজে কল করেছিলাম।”
” হ্যাঁ বলো।”
” আমার এক লাখ টাকা লাগবে।”
রাজ এক মুহূর্তও দেরি করলো না।
” শিওর! আমি এখনই তোমার অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে দিচ্ছি।”
অনন্যার গলায় এবার একটু নরম ভাব ফুটে উঠলো।
” ওকে! আর তাড়াতাড়ি বিয়ের ব্যবস্থা করো।”
রাজ ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টানে।
” হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক বলেছো তুমি।”
” রাখছি।”
কলটা কেটে গেলো। কয়েক সেকেন্ড ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলো রাজ। তারপর বুক ভরে একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিলো। মনে হচ্ছে আপাততো বড় একটা বিপদ সামলে ফেলেছে সে। বাইরে বৃষ্টির শব্দ আরও বেড়েছে। রাজ ফোনের কন্টাক্ট লিস্টে গিয়ে দ্রুত একটা নাম খুঁজে বের করে। তারপর কল দিলো।ওপাশে কল রিসিভ হতেই রাজ শান্ত গলায় বলে,
” অনন্যার অ্যাকাউন্টে এক লাখ টাকা পাঠিয়ে দাও।”
…
ভোর থেকেই টুপটাপ শব্দে বৃষ্টি ঝরছে। অবশ্য ভোর বলা ঠিক হবে না, সারারাত ধরেই আকাশ যেন মাটি ভাসিয়ে দেওয়ার জেদ নিয়ে নেমেছে। চারপাশে কেমন একটা স্যাঁতসেঁতে শান্তি। বারান্দার গ্রিল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে, দূরের গাছগুলো ধোঁয়াটে হয়ে আছে বৃষ্টির চাদরে।
এমন বৃষ্টিমুখর দিনে খিচুড়ির গন্ধ যেন ঘরের ভেতর আলাদা এক উষ্ণতা এনে দেয়। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে ভাজা পেঁয়াজ আর গরম মসলার মিষ্টি গন্ধ। তার সঙ্গে মাছ ভাজার শব্দ। অরশি সকাল থেকেই রান্নাঘরে ব্যস্ত। পিয়াস ঘুম থেকে উঠেই খিচুড়ি খাওয়ার বায়না ধরেছে। ছেলেটার আবদার সে খুব একটা ফেলতে পারে না। তাই এক হাতে কড়াই নাড়ছে, আরেক হাতে বেগুন কেটে রাখছে। মাঝেমধ্যে বিরক্ত গলায় পিয়াসকে ধমকও দিচ্ছে,
” এই রান্নাঘরে বারবার আসবি না তো। তেল ছিটে লাগবে।”
পিয়াস অবশ্য তাতেও দমছে না। ড্রইংরুম থেকে বারবার উঁকি দিয়ে জিজ্ঞেস করছে,
” আম্মু! খিচুড়ি আর কতোক্ষণ?”
ইমন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ দৃশ্যটা দেখলো। তারপর ধীরে ঘুরে নিজের রুমে ঢুকে পড়ে। অলি তখনও ঘুমিয়ে আছে। ছোট্ট মেয়েটার গোলাপি মুখটা কেমন শান্ত হয়ে আছে ঘুমের ভেতর। একদম ভোরে উঠে প্রায় দুই ঘণ্টা জেগে ছিলো। কখনো বাবার আঙুল চেপে ধরেছে, কখনো আধো আধো গলায় শব্দ করেছে। তারপর আবার ঘুমিয়ে পড়েছে।
ইমন বিছানার পাশে বসে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। সে আস্তে করে অলির ছোট্ট নরম কপালে একটা চুমু খেলো। মেয়েটা ঘুমের মধ্যেই সামান্য নড়ে উঠে আবার নিশ্চুপ হয়ে যায়। ইমন রুম থেকে বেরিয়ে আসে। ড্রইংরুমে তার বাবা, মা আর পিয়াস বসে টিভি দেখছে। ছুটির দিনের আলসেমি সবার মাঝেই ছড়িয়ে আছে। টিভিতে ডিসকোভার চ্যানেল চলছে। পিয়াস সোফার উপর আধশোয়া হয়ে চিপস খাচ্ছে।
ইমন একবার সেদিকে তাকিয়ে রান্নাঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। অরশি তখন কড়াইয়ে মাছ ছাড়ছে। গরম তেলে মাছ পড়তেই ঝাঁঝালো শব্দ উঠলো।
” চা খাবা?”
অরশি না তাকিয়েই জিজ্ঞেস করলো।
” হুম!”
” তাহলে পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করো।”
ইমন কিছু বললো না। শুধু হালকা মাথা নেড়ে সেখান থেকে সরে এলো। প্রভার রুমের সামনে এসে দাঁড়ালো সে। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। কয়েকবার আলতো নক করতেই ভেতর থেকে প্রভার শান্ত গলা ভেসে এলো,
” দরজা খোলা আছে।”
ইমন দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে। ঘরের জানালাটা আধখোলা। সেখান দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে। পর্দাগুলো বাতাসে দুলছে হালকা করে। প্রভা বিছানার উপর চুপচাপ বসে জানালার বাইরে বৃষ্টি দেখছিলো। তার মুখটা কেমন ফ্যাকাশে লাগছে। চোখের নিচে হালকা কালচে ছাপ। ইমনকে ঢুকতে দেখে সে একটু সোজা হয়ে বসলো।
” ভাইয়া তুমি? আমাকে ডাকতে আমি যেতাম।”
ইমন বিছানার এক কোণায় বসতে বসতে নরম গলায় বললো,
” নাহ! সমস্যা নেই। তোর এই সময় হাঁটাচলা কম করাই ভালো।”
প্রভা হালকা করে হাসে। ইমনও তাকিয়ে রইলো বোনটার দিকে। সেই ছোট্ট প্রভা, কতো দ্রুত বড় হয়ে গেলো। একটা সময় ছিলো, সে স্কুল থেকে ফিরলেই প্রভা দৌড়ে এসে কোলে উঠতো। ছোট্ট ছোট্ট হাতে গলা জড়িয়ে ধরতো। কখনো ভাইয়ের শার্টে লালা মেখে দিতো, কখনো জেদ করে আইসক্রিম খেতে চাইতো। আর আজ? আজ সেই ছোট্ট মেয়েটাই মা হতে চলেছে। সত্যিই, সময় বড় অদ্ভুতভাবে বদলে যায়। মানুষ টের পাওয়ার আগেই জীবন অন্য এক জায়গায় এসে দাঁড়ায়। ইমন গলা পরিষ্কার করলো। তারপর নিচু স্বরে বললো,
” শরীর কেমন লাগছে এখন?”
প্রভা হালকা মাথা নাড়লো।
” ভালো ভাইয়া।”
এরপর আবার নীরবতা। ইমন যেন কিছু বলতে চেয়েও থেমে যাচ্ছে বারবার। আঙুলগুলো অস্থিরভাবে একটার সাথে আরেকটা ঘষছে সে। মুখে স্পষ্ট অস্বস্তি। প্রভা ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
” কিছু বলবে, ভাইয়া?”
” হ্যা! আসলে।”
ইমন থেমে যায়। যেন শব্দগুলো মুখে এসে আটকে যাচ্ছে। প্রভা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হালকা স্বরে বলে ওঠে,
” এতো আমতা আমতা করার কি আছে, ভাইয়া? বলো কি বলতে চাও।”
ইমন একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে। বুকের ভেতরটা ভারী লাগছে তার। তারপর ধীরে ধীরে বললো,
” প্রভা! এই বাচ্চাটা…”
কথাটা শেষ করার আগেই প্রভা শান্ত গলায় বলে উঠলো,
” মেরে ফেলতে বলবে, তাই তো?”
মুহূর্তেই শরীর কেঁপে উঠলো ইমনের। গলাটা শুকিয়ে এলো। সে হতভম্ব চোখে তাকিয়ে রইলো বোনটার দিকে। যেন এমন সরাসরি উত্তর আশা করেনি। প্রভা হালকা করে হাসলো। সেই হাসিতে আনন্দ নেই, আছে কেমন একটা ক্লান্ত ব্যথা।
” আমার সন্তান কি পৃথিবীর বুকে এতো বড় বোঝা হয়ে গেলো, ভাইয়া? সবাই তাকে মেরে ফেলতে চাচ্ছে।”
” প্রভা, আমি আসলে…”
ইমন কথাটা শেষ করতে পারলো না। প্রভা এবার জানালার বাইরে তাকায়। বৃষ্টির পানি গ্রিল বেয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ছে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে খুব শান্ত স্বরে বললো,
” ভয় পাচ্ছো, ভাইয়া? যদি আমি আর আমার সন্তান তোমার ঘাড়ে বোঝা হয়ে যাই, এই ভয় পাচ্ছো?”
ইমন নিঃশব্দে মাথা নিচু করে ফেললো। কোনো উত্তর খুঁজে পেলো না সে। বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠছে। ছোটবেলা থেকে যে বোনটার চোখে সে সবসময় নিরাপদ আশ্রয় ছিলো, আজ সেই বোনটাই এমনভাবে কথা বলছে যেন পৃথিবীতে তার নিজের বলে কেউ নেই। প্রভা আবার বললো,
” ভয় পেয়ো না, ভাইয়া। আমি এখানে থাকবো না। শুধু আমার বাচ্চাটা হওয়া পর্যন্ত থাকবো। হঠাৎ যদি অসুস্থ হয়ে পড়ি, তাহলে তো একটু পাশে পাবো তোমাদের, এই আশায় থাকতে চাচ্ছি। এইটুকু সময় আমাকে দাও। আমি খুব দ্রুত একটা কিছু করার চেষ্টা করবো। খরচ আমি নিজেই চালাবো। আপাততো আমার কাছে যা আছে, তাতে মাস দুয়েক চলে যাবে। তার মাঝেই টাকা ইনকামের কিছু একটা ব্যবস্থা করে ফেলবো আমি।”
কথাগুলো বলে প্রভা মুখ নামিয়ে ফেললো। তার দুই হাত শক্ত করে জড়িয়ে আছে একসাথে। যেন নিজের ভেতরের ভয়গুলো লুকানোর চেষ্টা করছে। ইমন নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলো বোনটার দিকে। এই মেয়েটা কি সত্যিই সেই আগের ছোট্ট প্রভা? যে সামান্য ভয় পেলেই দৌড়ে এসে ভাইয়ের হাত আঁকড়ে ধরতো? জীবন কতো দ্রুত মানুষকে বদলে দেয়। ইমন নিচু গলায় বলে উঠলো,
” আজকাল চাকরি খুব কঠিন, প্রভা! তুই এই অবস্থায় কিসের চাকরি খুঁজবি?”
প্রভা মুখ তুলে তাকায় ভাইয়ের দিকে।
” আমি জানি চাকরি পাওয়া কঠিন। কিন্তু, অসম্ভব না।”
ইমন ঠোঁট কামড়ে চুপ করে থাকে কয়েক সেকেন্ড। তারপর বলে,
” তুই মনে হয় আমাকে ভুল বুঝছিস।”
প্রভা হালকা মাথা নাড়ে। ঠোঁটের কোণে ফ্যাকাশে একটা হাসি ফুটে উঠে।
” তোমাকে ভুল বুঝছি না, ভাইয়া। তোমার পেছনের প্রেশারটা আমি বুঝি। আমি তো তোমার বোন বলো। আমাকে তুমি হাতে পিঠে করে মানুষ করেছো। তোমার ব্যাপারটা কি আমি বুঝবো না? সোর্সটা আমি জানি। তুমি বলে দিও, আমি থাকবো না এখানে।”
কথাটা শুনে ইমনের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। মুখটা কেমন শক্ত হয়ে গেলো তার। কিছুক্ষণ চুপ থেকে খুব নিচু স্বরে বললো,
” আমি খুব দুর্বল, না রে?”
প্রভা কিছুক্ষণ ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর ধীরে চোখ নামিয়ে বললো,
” হয়তোবা!”
ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এলো। দূরে কোথাও মেঘ ডাকছে ক্ষীণস্বরে। ইমন বিছানার চাদরের উপর হাত বুলাতে বুলাতে অন্যমনস্ক হয়ে যায়। তার মাথার ভেতর যেন হাজারটা চিন্তা একসাথে ঘুরছে। কিছুক্ষণ পর সে নিজেকে সামলে নিয়ে জোর করে হালকা হাসে।
” সব ঠিক হয়ে যাবে।”
” আমার সন্তানকে দিয়ে আমি আমার দুনিয়া ঠিক করে নেবো।”
কথাটা শুনে ইমন বোনটার দিকে তাকিয়ে রইলো। এই মেয়েটা কবে এতোটা বদলে গেলো? একটা সময় সামান্য সমস্যায় কেঁদে ফেলতো, আর আজ পৃথিবীর বিরুদ্ধে একা দাঁড়িয়ে থাকার কথা বলছে। ইমন উঠে দাঁড়ায়।
” চল, খাবার খাবি। এইসময় ঠিকঠাক খাওয়া উচিত।”
” তুমি যাও, আমি আসছি।”
ইমন আর কিছু বললো না। দরজার কাছে গিয়ে একবার ফিরে তাকালো বোনটার দিকে। তারপর নিঃশব্দে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। দরজাটা বন্ধ হতেই প্রভা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বুকের ভেতর জমে থাকা ভারটা যেন একটু বেরিয়ে এলো সেই নিঃশ্বাসের সাথে। তারপর মুখ ঘুরিয়ে আবার জানালার বাইরে তাকায়।
ঝরঝর করে অবিরাম বৃষ্টি ঝরছে। আকাশ যেন থামতেই ভুলে গেছে। দূরের গাছগুলো বৃষ্টির চাদরে ঝাপসা হয়ে আছে। ঠান্ডা বাতাস এসে পর্দাগুলো দুলিয়ে দিচ্ছে। প্রভা চুপচাপ সেই বৃষ্টি দেখতে থাকে। তার এক হাত পেটের উপর রাখা। যেন পৃথিবীতে এই মুহূর্তে একমাত্র এই ছোট্ট অস্তিত্বটাই তাকে বাঁচিয়ে রাখার শক্তি দিচ্ছে।
#_চলবে_ইনশাআল্লাহ_🌹
#_এক_ফালি_রোদ্দুর_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_পর্ব_৩_
” আর ইউ ওকে? আপনাকে দেখে অসুস্থ মনে হচ্ছে।”
কোম্পানির উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা মাহাবুব সাহেব কপাল কুঁচকে কথাটা বললেন। তার সামনে রাখা ফাইলের উপর চোখ থাকলেও দৃষ্টি আটকে আছে প্রভার ফ্যাকাশে মুখে। প্রভা এক পলক তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে ফেললো। ঠোঁট শুকিয়ে এসেছে। মাথাটাও কেমন ঝিমঝিম করছে। সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি বললেই চলে। বাসা থেকে বের হওয়ার আগে দুই বার বমি হয়েছে। তারপরও নিজেকে সামলে ইন্টারভিউ দিতে এসেছে সে। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে নিচু স্বরে বললো,
” একচুয়ালি, আমি প্রেগন্যান্ট। টু মান্থস।”
মাহাবুব সাহেব স্পষ্টই অবাক হয়ে গেলেন। ভ্রু উঁচু করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন প্রভার দিকে। কথাটা ঠিক বিশ্বাস করতে পারছেন না। তারপর চেয়ারটায় হেলান দিয়ে ধীরে বললেন,
” আপনি এই সময় জব ইন্টারভিউ দিচ্ছেন?”
প্রভা ঠোঁট ভিজিয়ে নিলো।
” চাকরিটা আমার প্রয়োজন।”
ঘরের ভেতর কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এলো। এসির ঠান্ডা বাতাসেও প্রভার কপালে হালকা ঘাম জমেছে। হাতের আঙুলগুলো শক্ত হয়ে জড়িয়ে আছে একসাথে। মাহাবুব সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
” আপনার কথাটা বুঝতে পারছি। অবশ্যই খুব প্রয়োজন না হলে এমন অবস্থায় কেউ জব খুঁজে বেড়ায় না। কিন্তু এইটা তো অফিস, কাজের জায়গা। এখানে আবেগের কোনো স্থান নেই।”
মাহাবুব সাহেব সামনে রাখা ফাইলটা আলতো করে বন্ধ করলেন।
” আমাদের কিছু ইমার্জেন্সি এমপ্লয়ি প্রয়োজন। আপনিও এমনিতেই এখন সিক। তার উপর দুই তিন মাস পর থেকে কয়েক মাস আপনার পক্ষে অফিস করা সম্ভব হবে না। এই অবস্থায় কোম্পানির স্বার্থে আপনাকে চাকরি দেওয়া সম্ভব না। সরি, আপনার পেপারস গুলো আমি এক্সেপ্ট করতে পারছি না।”
কথাগুলো খুব শান্ত স্বরেই বলা হলো। কিন্তু প্রতিটা শব্দ যেন ধীরে ধীরে এসে প্রভার বুকের ভেতর আঘাত করলো। প্রভা একটা চাপা শ্বাস ফেলে। তারপর খুব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বললো,
” নো প্রবলেম। ধন্যবাদ, স্যার!”
মাহাবুব সাহেব আর কিছু বললেন না। শুধু সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন মেয়েটার দিকে। সেই দৃষ্টিটা প্রভার কাছে আরও বেশি অস্বস্তিকর লাগলো। করুণা সে সহ্য করতে পারে না। ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায় প্রভা। তারপর ফাইলটা বুকে চেপে ধরে ইন্টারভিউ রুম থেকে বেরিয়ে এলো।বাইরের করিডোরটা বেশিই ঠান্ডা লাগছে। অথচ প্রভার শরীর জ্বলছে। মাথার ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে আছে। মনে হচ্ছে চারপাশের সব শব্দ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ বমি বমি ভাবটা আবার চেপে ধরলো তাকে। দ্রুত ওয়াশরুমের দিকে চলে গেলো প্রভা। বেসিন আঁকড়ে ধরে কয়েক মিনিট মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো সে। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠছে বারবার। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। বমির জন্য, নাকি অপমানের জন্য, সেটা বুঝতে পারলো না।
এখানে আসার আগেও বাসায় দুই বার বমি হয়েছে। এখানে এসে আরেকবার। গত পনেরো দিন ধরে এক অফিস থেকে আরেক অফিসে ঘুরছে সে। কোথাও সিভি জমা দিচ্ছে, কোথাও ইন্টারভিউ দিচ্ছে। কিন্তু শেষটা একই। প্রতিটা জায়গা থেকেই শেষ পর্যন্ত ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে তাকে। প্রভা মুখে পানি দিলো। আয়নায় নিজের দিকে তাকাতেই বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। মুখটা শুকিয়ে গেছে অনেকটা। এই মেয়েটা কি সত্যিই সেই প্রভা? যে একসময় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা চুল বাঁধতো? হঠাৎ খুব ক্লান্ত লাগলো তার। অসম্ভব ক্লান্ত। ওয়াশরুম থেকে ধীর পায়ে বাইরে এলো প্রভা। মাথাটা এখনও ভার লাগছে। বুকের ভেতর একটা শূন্যতা জমে আছে। মনে হচ্ছে শরীরের সমস্ত শক্তি যেন ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। করিডোরের সাদা আলো চোখে লাগছে। চারপাশে মানুষের কথাবার্তা, কিবোর্ডের শব্দ, ফোনকল সবকিছুই ভেসে আসছে। প্রভা শুধু দ্রুত বেরিয়ে যেতে চাইছে। এই জায়গাটায় আর এক মুহূর্তও থাকতে ইচ্ছে করছে না তার। ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা ভরাট পুরুষালী কণ্ঠ ভেসে এলো,
” প্রভা!”
প্রভা থমকে দাঁড়ায়। ঘুরে তাকাতেই চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেলো তার। সামনে দাঁড়িয়ে আছে লম্বা, চওড়া কাঁধের এক সুদর্শন যুবক। ফর্সা গায়ের রঙ, পরিপাটি ফরমাল ড্রেস, হাতে দামি ঘড়ি। চোখে মুখে আত্মবিশ্বাসের ছাপ স্পষ্ট। প্রভা কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলো। তারপর অবিশ্বাস মেশানো স্বরে বললো,
” ফারহান! তুই?”
যুবকটা হেসে মাথা নাড়লো।
” ইয়েস! আমি।”
তার ঠোঁটের কোণে সেই আগের মতোই হালকা দুষ্টু হাসি। কলেজ জীবনে এই হাসিটার জন্যই মেয়েরা পাগল ছিল। প্রভাও অজান্তেই একটু হেসে ফেললো। অনেকদিন পর পরিচিত কাউকে দেখে বুকের ভেতর জমে থাকা চাপাটা যেন সামান্য হলেও হালকা লাগলো।
” তুই এখানে?”
ফারহান ভ্রু তুলে প্রশ্ন করলো। প্রভা হাতে ধরা ফাইলটার দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে বলে,
” জব ইন্টারভিউ দিতে এসেছিলাম। কিন্তু, তুই এখানে কেন?”
ফারহান গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,
” একচুয়ালি, ম্যাম! আমি এই অফিসের মালিক।”
কথাটা শুনে প্রভা পুরোপুরি অবাক হয়ে গেলো। চোখ বড় বড় করে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলো সে। তারপর হঠাৎ অপ্রস্তুত হয়ে বলে ওঠে,
” ওহ, আচ্ছা! সরি! আমি বুঝতে পারিনি।”
ফারহান সাথে সাথে হাত তুলে থামিয়ে দিলো তাকে।
” এই এই, ওয়েট! বস হওয়ার জন্য আমার সাথে এতো প্রফেশনাল হয়ে কথা বলার কোনো প্রয়োজন নেই।”
তার কথার ভঙ্গিতে আগের সেই চেনা ফারহানকেই খুঁজে পেলো প্রভা। ফিক করে হেসে ফেলে সে।ফারহান কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো প্রভার দিকে। কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার চোখ আটকে গেল প্রভার হাতে ধরা ফাইল আর ক্লান্ত মুখটার দিকে। হালকা কুঁচকে যায় তার ভ্রু।
” যাই হোক, তোর হাতে এইসব পেপারস কেন? পেপারস এক্সেপ্ট হয়নি?”
কথাটা শুনতেই প্রভার ঠোঁটের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। সে নিচের ঠোঁটটা আলতো করে চেপে ধরলো। চোখ নামিয়ে নিলো মেঝের দিকে। কিছু উত্তর দিলো না। প্রভার চুপ করে থাকা দেখেই ফারহানের মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। সে কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো প্রভার দিকে। তারপর শান্ত স্বরে বললো,
” কি হলো? পেপারস এক্সেপ্ট করেনি?”
প্রভা চোখ নামিয়েই ছোট্ট করে বললো,
” না।”
ফারহান ভ্রু কুঁচকে ফেললো।
” কেন? দেখি তো কাগজগুলো।”
কথা শেষ করেই সে আলতো করে প্রভার হাত থেকে ফাইলটা নিয়ে নিলো। প্রভা বাধা দিতে গিয়েও পারেনা। শুধু নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলো। ফারহান ফাইল খুলে একটার পর একটা কাগজ দেখতে লাগলো। সার্টিফিকেট, মার্কশিট, সিভি, সবকিছু খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে সে। দেখতে দেখতেই তার চোখে স্পষ্ট বিস্ময়ের ছাপ ফুটে উঠলো। কলেজ লাইফে প্রভা বরাবরই মেধাবী ছিল। পড়াশোনায় সবসময় সবার থেকে এগিয়ে। ইউনিভার্সিটিতেও দারুণ রেজাল্ট করেছে। সেই একই ধারাবাহিকতা এখনও স্পষ্ট তার কাগজপত্রে। কোথাও কোনো ঘাটতি নেই। ফারহান ফাইল থেকে চোখ না সরিয়েই বলে,
” সব তো ঠিকঠাক। তাহলে এক্সেপ্ট করেনি কেন?”
প্রভা ঠোঁট কামড়ে ধরলো। এই প্রশ্নের উত্তর দিতে তার ভীষণ অস্বস্তি লাগছে। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে ধীরে বললো,
” বাদ দে এইসব।”
ফারহান এবার ফাইল বন্ধ করে সরাসরি তাকায় তার দিকে।
” কি বাদ দিবো?”
ফারহানের কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি। হঠাৎ কী যেন ভেবে চারপাশে তাকায় সে। করিডোরের একটু দূরে অফিস স্টাফদের মধ্যে ম্যানেজারকে দেখতে পেয়েই গম্ভীর স্বরে ডাক দিলো,
” রামিম!”
ডাক শুনে মাঝারি গড়নের একটা ছেলে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলো।
” জি স্যার?”
ফারহান কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠে বললো,
” আজ ইন্টারভিউ বোর্ডে কারা আছে?”
রামিম সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলো,
” স্যার, মাহাবুব সাহেব আর মি. অয়ন!”
ফারহানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো।
” ওনাদের ইমার্জেন্সি আমার কেবিনে পাঠান।”
রামিম এক মুহূর্তও দেরি করে না।
” ওকে, স্যার!”
কথা শেষ করেই দ্রুত পায়ে সেখান থেকে চলে গেল সে। সবকিছু এত দ্রুত ঘটলো যে প্রভা কয়েক সেকেন্ড কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না। সে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে ফারহানের দিকে। বুকের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি কাজ করছে। ফারহান আবার তার দিকে ফিরে তাকায়। করিডোরজুড়ে তখন হালকা চাপা গুঞ্জন। অফিস স্টাফদের কৌতূহলী চোখ বারবার ঘুরে আসছে তাদের দিকে। কিন্তু, সেদিকে যেন কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই ফারহানের। তার মুখটা শক্ত হয়ে আছে। চোখে মুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ। প্রভা অস্বস্তিতে কুঁকড়ে যাচ্ছে। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা আরও বেড়ে গেছে। ধীরে ধীরে বললো,
” এইসবের কি দরকার ছিলো, ফারহান?”
ফারহান একবার তার দিকে তাকিয়ে আবার সামনে তাকালো। তারপর শান্ত গলায় বললো,
” এতো কথা তোকে বলতে হবে না। চল, আমার কেবিনে।”
প্রভা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ায়।
” কোনো প্রয়োজন নেই। আমার ফাইল দে, আমি চলে যাই।”
ফারহান ভ্রু তুলে তাকায় তার দিকে।
” বুঝেছি। তুই আগের মতোই ত্যাড়া আছিস। সরি, তোর হাতটা ধরলাম।”
কথা শেষ করেই প্রভার হাত আলতো করে ধরে ফেললো সে। প্রভা হকচকিয়ে উঠলো।
” ফারহান! এইসবের কোনো দরকার নেই। সবাই তাকিয়ে দেখছে। ফারহান! আমার কথাটা শোন, প্লিজ!”
কিন্তু ফারহান যেন কিছুই শুনছে না। একরকম জোর করেই প্রভাকে নিয়ে হাঁটতে শুরু করলো করিডোর ধরে। আশেপাশের স্টাফরা বিস্মিত চোখে তাকিয়ে আছে। কেউ চাপা স্বরে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে, কেউ আবার দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। প্রভার ভীষণ অস্বস্তি লাগছে। এমনিতেই মাথাটা ঝিমঝিম করছে। তার উপর সবার সামনে এই পরিস্থিতি তাকে আরও অপ্রস্তুত করে তুলেছে। কিন্তু ফারহানের হাতের দৃঢ়তা দেখে বুঝলো, এখন কিছু বলেও লাভ নেই।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তারা পৌঁছে গেল ফারহানের কেবিনে। বড় কাঁচঘেরা আধুনিক কেবিন। দেয়ালে ঝোলানো বড় ঘড়িটার টিকটিক শব্দ পর্যন্ত স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। ফারহান দরজা বন্ধ করে প্রভাকে সামনে রাখা চেয়ারে বসতে ইশারা করলো। প্রভা বিরক্ত মুখে বসে পড়লো। ফারহান নিজের চেয়ারটায় গিয়ে বসল। তারপর টাইটা সামান্য ঢিলা করে গভীর দৃষ্টিতে তাকায় তার দিকে। প্রভা ঠোঁট কামড়ে বলে ওঠে,
” এইসব একদম ঠিক হচ্ছে না।”
ফারহান ভ্রু কুঁচকে হালকা হেসে ফেলে।
” আমি জানি কি হচ্ছে আর না হচ্ছে। আগে বল, কি খাবি?”
” কিছু খাবো না।”
” আদা দেওয়া রং চা তোর ফেভারিট। ওটাই বলছি।”
কথাটা শুনেই প্রভা থমকে যায়। চোখের ভেতর স্পষ্ট বিস্ময় ফুটে উঠলো তার। এতোদিন পরও ফারহান তার পছন্দ মনে রেখেছে? একসময় তাদের বন্ধুত্বটা কতোটা গভীর ছিলো। কলেজ ক্যান্টিনে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প, ক্লাস ফাঁকি দিয়ে একসাথে ঘুরে বেড়ানো, পরীক্ষার আগের রাতে নোট নিয়ে ঝগড়া, সবকিছু যেন হঠাৎ করেই চোখের সামনে ভেসে উঠলো প্রভার। অথচ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবন কতোটা বদলে গেছে। কেউ কারও খোঁজও রাখেনি বছরের পর বছর। ফারহান টেবিলের উপর রাখা ফোনটা হাতে তুলে নিলো। তারপর কিচেনে কল করে বললো,
” দুই কাপ আদা দেওয়া রং চা পাঠান। একটাতে দুই চামচ চিনি আর হালকা কিছু স্ন্যাকসও দিবেন।”
ফোন রেখে আবার তাকালো প্রভার দিকে। প্রভা তখনও চুপচাপ বসে আছে। ফারহান তার চিনি খাওয়ার পরিমানও মাথায় রেখেছে, ভাবতেই প্রভার মুখে হাসি ফুটে উঠে। ফারহান কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই দরজায় হালকা নক পড়লো। শব্দটা শুনে সে মুখ তুলে তাকায় দরজার দিকে। তারপর গম্ভীর স্বরে বললো,
” কাম ইন!”
পরের মুহূর্তেই দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলেন মাহাবুব সাহেব আর মি.অয়ন। দুজনেই ভেতরে ঢুকেই খানিকটা থমকে গেলেন। ফারহানের কেবিনে প্রভাকে বসে থাকতে দেখে তাদের চোখেমুখে স্পষ্ট বিস্ময় ফুটে উঠলো। বিশেষ করে মাহাবুব সাহেবের দৃষ্টি কয়েক সেকেন্ডের জন্য আটকে রইলো প্রভার উপর। তিনি এখনো পুরো ব্যাপারটা বুঝে উঠতে পারছেন না।
অন্যদিকে প্রভা ভীষণ অস্বস্তি নিয়ে বসে আছে।মাথাটা নিচু। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা আরও বেড়ে গেছে। সে বুঝতে পারছে, এখন যা হতে যাচ্ছে সেটা মোটেও স্বাভাবিক কিছু না। ফারহান চেয়ারটায় সোজা হয়ে বসলো। তার মুখের আগের হালকা হাসিটা পুরোপুরি মিলিয়ে গেছে। চোখেমুখে এখন কেবল কঠোরতা।
” মিসেস প্রভার পেপারস এক্সেপ্ট করা হয়নি কেন?”
ফারহানের কণ্ঠটা শান্ত কিন্তু সেই শান্ত স্বরের ভেতরেও চাপা তীক্ষ্ণতা স্পষ্ট। মাহাবুব সাহেব একবার প্রভার দিকে তাকিয়ে আবার দৃষ্টি ফেরালেন ফারহানের দিকে।
” স্যার! উনি সিক।”
ফারহানের ভ্রু সঙ্গে সঙ্গে কুঁচকে যায়। সে টেবিলের উপর রাখা কলমটা আঙুলের ফাঁকে ঘুরাতে ঘুরাতে বললো,
” সিক মানে?”
প্রভা আরও শক্ত হয়ে বসে রইলো। নিজের দুই হাত একসাথে চেপে ধরে রেখেছে। আঙুলের গাঁটগুলো সাদা হয়ে উঠেছে চাপের কারণে। এই মুহূর্তে তার ভীষণ অস্বস্তি লাগছে। মনে হচ্ছে মাটির সাথে মিশে যেতে পারলেই বাঁচে। মাহাবুব সাহেব খানিকটা ইতস্তত করলেন। তারপর বললেন,
” মিসেস প্রভা প্রেগন্যান্ট। টু মান্থস।”
কথাটা শুনেই ফারহানের চোখ হঠাৎ স্থির হয়ে যায়। কয়েক সেকেন্ড সে কোনো কথা বললো না। শুধু চট করে তাকালো প্রভার দিকে। প্রভা তখনও মাথা নিচু করে বসে আছে। চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। এই কথাটা সে আজ কতবার বলেছে? আর প্রতিবারই যেন নিজের ভেতরের একটা অংশ একটু একটু করে ভেঙে গেছে। কেবিনের ভেতর মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এলো। মাহাবুব সাহেব গলা পরিষ্কার করে আবার বললেন,
” আমাদের ইমার্জেন্সি ফিট লোক প্রয়োজন, স্যার! যার জন্য এক্সেপ্ট করিনি।”
ফারহানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো। চোখের দৃষ্টি আরও গভীর হয়ে এলো। কিন্তু সে সঙ্গে সঙ্গে কিছু বললো না। কয়েক মুহূর্ত নীরবে বসে রইলো। তারপর খুব নিয়ন্ত্রিত স্বরে বললো,
” ওকে! আপনারা গিয়ে ইন্টারভিউয়ের কাজ স্টার্ট করুন।”
” ওকে, স্যার!”
মাহাবুব সাহেব আর মি. অয়ন আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালেন না। দ্রুত কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলেন তারা। দরজাটা বন্ধ হতেই পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শুধু এসির মৃদু শব্দ ভেসে আসছে চারপাশে। ফারহান নিজের চেয়ারটায় হেলান দেয়। তারপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো প্রভার দিকে। ফারহান বললো,
” প্রভা! লুক এট মি।”
প্রভা চোখ এখনও নিচের দিকেই স্থির। কাঁধ দুটো কেমন শক্ত হয়ে আছে। ফারহান এবার একটু গম্ভীর স্বরে বললো,
” প্রভা! লুক এট মি।”
প্রভা চোখ তুলে তাকায় তার দিকে। ক্লান্ত, ভাঙা চোখ। চোখের নিচে স্পষ্ট কালচে দাগ। মনে হচ্ছে অনেক দিন ধরে ঠিকমতো ঘুম হয়নি। ফারহানের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। এই মেয়েটাকে সে শেষবার দেখেছিল প্রাণভরে হাসতে। চঞ্চল, আত্মবিশ্বাসী একটা মেয়ে। আর আজ যেন সেই মানুষটার ছায়া বসে আছে তার সামনে। ফারহান গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
” কি হয়েছে, প্রভা? এই অবস্থায় তুই জব কেন খুঁজছিস? তোর হাসবেন্ড কোথায়?”
প্রভা সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নিলো। ঠোঁট শুকিয়ে এসেছে। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে নিচু স্বরে বললো, ” বাদ দে এইসব। আমি চলে যাই। আমার জবের প্রয়োজন নেই।”
ফারহানের ভ্রু কুঁচকে যায়।
” আমি তোকে একটা প্রশ্ন করেছি, প্রভা! তুই উত্তর দে।”
প্রভার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠে। সে নিচের ঠোঁটটা আলতো কামড়ে ধরলো। তারপর খুব ধীরে বললো,
” আমার বেবি হওয়ার পর আমার হাসবেন্ডের সাথে ডিভোর্স হয়ে যাবে।”
কথাটা শুনেই ফারহান যেন জমে যায়। চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই বদলে গেল তার। কয়েক সেকেন্ড সে শুধু তাকিয়ে রইলো প্রভার দিকে। ঠিক শুনেছে কিনা সেটাই বুঝতে পারছে না। তারপর সামনের দিকে ঝুঁকে এলো সে।
” কিহ? কেন?”
প্রভা চোখ নামিয়ে ফেলে। বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টগুলো যেন একসাথে গলায় এসে আটকে যাচ্ছে। এতোদিন কাউকে কিছু বলেনি সে। সবকিছু একা সহ্য করেছে। কিন্তু, আজ আর নিজেকে আটকে রাখতে পারলো না। ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলো। রাজের সাথে বিয়ে, সবকিছু প্রথমদিকে স্বপ্নের মতো ছিলো। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে রাজ বদলে যেতে শুরু করে। রাত করে বাসায় ফেরা, অকারণে রাগারাগি, অবহেলা, সবকিছু ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। প্রথমে প্রভা ভেবেছিল অফিসের চাপ। কিন্তু, একদিন হঠাৎ করেই সত্যিটা জানতে পারে সে। রাজ অন্য একটা মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে গেছে। কথাটা বলতে গিয়ে প্রভার গলা কেঁপে উঠে। চোখ ঝাপসা হয়ে এলো ধীরে ধীরে। সে সব বলে কিভাবে রাজ দিনের পর দিন তাকে অপমান করেছে। রাজ খুব দ্রুত ওই মেয়েটাকে বিয়ে করতে চায়। শুধু বাচ্চার জন্য এখনো ডিভোর্সটা আটকে আছে।
কথা গুলো বলেই মাথা নিচু করে থাকে প্রভা। চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। এতোদিন ধরে বুকের ভেতর জমে থাকা অপমান, কষ্ট, ভয়, সব যেন আজ বেরিয়ে আসছে। আর ফারহান, সে নিঃশব্দে বসে আছে। চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ। তার বুকের ভেতরটা জ্বলছে। শরীরের প্রতিটা রগ যেন টান টান হয়ে আছে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। হাতের আঙুলগুলো এতোটাই শক্ত হয়ে মুঠো হয়ে আছে যে গাঁটগুলো সাদা হয়ে উঠেছে। এই মুহূর্তে রাজকে সামনে পেলে হয়তো সত্যিই নিজেকে সামলাতে পারতো না সে, হয়তো খুনই করে ফেলতো। মনে হচ্ছে বুকের ভেতর জমে থাকা রাগ তাকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। যে মেয়েটা একসময় সবার আগে অন্যের কথা ভাবতো, সবসময় হাসিখুশি থাকতো, আজ সে এভাবে ভেঙে পড়েছে? আর একজন মানুষ এতোটা নিচে নামতে পারে? ফারহান ধীরে ধীরে চোখ খুললো। তার দৃষ্টি এবার ভয়ংকর শান্ত। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর হঠাৎই ফারহান বলে ওঠে,
” তোর ফাইলগুলো আমার কাছে রেখে যা। রাতেই তোর ফোনে জয়েনিং ইমেইল চলে যাবে।”
কথাটা শুনে প্রভা যেন চমকে উঠে। সে দ্রুত মুখ তুলে তাকায় ফারহানের দিকে। চোখেমুখে স্পষ্ট অস্বস্তি।
” আমি কারোর…”
প্রভা কথাটা শেষ করার আগেই ফারহান তাকে থামিয়ে দেয়।
” করুণা করছি না তোকে। এই সাহস আমার জীবনেও হবে না।”
” কিন্তু…”
“কোনো কিন্তু না, প্রভা! বন্ধু হিসাবে তো পাশে দাঁড়াতেই পারি, পারি না?”
প্রভা নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। অনেকদিন পর কেউ তাকে এভাবে নির্ভরতার অনুভূতি দিলো। অথচ সেই অনুভূতিটাই এখন তার সবচেয়ে বেশি ভয় লাগে। চোখ নামিয়ে বললো,
” তোর কোম্পানির জন্য প্রবলেম হবে।”
ফারহান হালকা ভ্রু তুললো।
” সেইটা আমি বুঝবো। তোকে এতো বুঝতে হবে না।”
তারপর চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে টাইটা ঠিক করতে করতে আবার বললো,
” যাই হোক, চল। তোকে ড্রপ করে দিই।”
” তার কোনো দরকার হবে না। আমি চলে যেতে পারবো।”
ফারহান এবার সরাসরি তাকায় তার দিকে।
” বন্ধু হিসাবে অধিকার নিয়ে বলছি, আমার সাথেই যাবি। আমি ড্রপ করে দিবো। চল।”
প্রভা এবার আর কিছু বললো না। কেন যেন আর তর্ক করার শক্তিটুকুও অবশিষ্ট নেই তার। শুধু নিঃশব্দে বসে রইলো কয়েক সেকেন্ড। ফারহান টেবিলের উপর প্রভার ফাইলগুলো রেখে দিলো। তারপর নিজের গাড়ির চাবিটা হাতে তুলে নিলো। কেবিনের দরজা খুলে একপাশে দাঁড়িয়ে প্রভার বের হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে লাগে। প্রভা উঠে দাঁড়ায়। মাথাটা এখনও কেমন ভার লাগছে। কিন্তু, অদ্ভুতভাবে বুকের ভেতরের সেই অসহ্য চাপাটা যেন সামান্য হলেও হালকা হয়েছে।
দুজন একসাথে কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো। অফিস স্টাফদের কৌতূহলী চোখ আবারও ঘুরে এলো তাদের দিকে। কিন্তু, এবার প্রভা মাথা নিচু করলো না। শুধু নিঃশব্দে হাঁটতে লাগলো ফারহানের পাশে। আর ফারহান? সে একবারও আশেপাশের কারও দিকে তাকালো না। যেন এই মুহূর্তে তার সম্পূর্ণ মনোযোগ কেবল একটাই মানুষের দিকে, প্রভা!
#_চলবে_ইনশাআল্লাহ_🌹

