Home "ধারাবাহিক গল্প ঝরা শিউলির দিনে ঝরা শিউলির দিনে পর্ব-০৪

ঝরা শিউলির দিনে পর্ব-০৪

0
592

#ঝরা_শিউলির_দিনে
#পর্ব ৪
#তামান্না_ইসলাম_শিমলা

_______________________

সময় গতিশীল। দেখতে দেখতে কেটেছে আরো পাঁচটা মাস। ছোট্ট পিহু এখন গুটি গুটি পায়ে হাঁটতে শেখেছে। সে দেখতে পুরোটাই সৈকতের মত। এই জিনিসটা বড্ড পীড়া দেয় অপরূপাকে। শুনেছে সৈকতের নাকি চাকরি চলে হিয়েছে কোনো এক কারণে। খবরটা পেয়ে না চাইতেও বড্ড হেসেছে অপরূপা। অন্যের কষ্টে মানুষ যখন হাসে তখন বুঝে নিতে হয় সে বড্ড খারাপ পর্যায়ে পৌছে গিয়েছে। তবে কি অপরূপার সাথেও তা হলো? সে যে পৈশাচিক আনন্দ পেয়েছিল। এদিকে লুপা দু মাসের গর্ভবতী। বাড়ির সবাই বেশ খুশি। এতগুলো মাসে লুপা বেশ ভালোই ছিল। তবে যবে থেকে বাচ্চা হবে কথাটা জেনেছে তবে থেকে তার মুখ ভার।

এই ভারাক্রান্ত মনের খবর সবার জানা থাকলেও কারণটা অজানা। দুদিন আগে পলাশ কোনো এক কারণে বেশ ধমকাধমকি করছিল। অবশ্য স্বামী স্ত্রীর মাঝে অপরূপা এবং আমেনা বেগম কেউই ঢোকেননি। আমেনা বেগমও হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। হার্টের সমস্যা বেড়েছে তার। অপরূপা আর লুপা দুজনেই এখন সংসারের কাজবাজ করছে। অবশ্য লুপার দায়িত্বটাই বেশি। এতদিনে অপরূপা বেশ ভালো ভাবেই চিনেছে লুপাকে। মেয়েটা আসলে ভালোই। আসল সমস্যা হচ্ছে লুপার মা। মেয়েটা বাপের বাড়ি যায় হাসি মুখে, ফিরে আসে থমথমে মুখে। নানা রকম কু বুদ্ধিতে মস্তিষ্ক দখল হয় তখন। তবে অপরূপা ছোট বোনের মত আগলে নেয় লুপাকে।

অপরূপা যখন বোঝায় তখন ঠিকই বুঝে যায়। তৎক্ষনাৎ ভালো ব্যবহার করে, সংসারে মন দেয়। কী সুন্দর হাসি খুশি একটা পরিবারে পরিণত হয় তখন। অথচ এই সুন্দর সংসারেই কিছু মা নামক মানুষরা আগুন লাগায়। তারা ভাবে মেয়ের আলাদা সংসার মানেই মেয়ে সুখি। অথচ সুখ এনে দিতে গিয়ে তারা আনে কেবল অশান্তি। এত কিছুর মাঝে পলাশ ও লুপার এখন কার ঝামেলার বিষয়বস্তু ঠিক জানা নেই অপরূপার। অপরূপা আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেসও করছে না। মেয়েটা আজ হাসপাতালে গিয়েছে চেকআপ করাতে। সাথে গিয়েছে আমেনা বেগম।

পিহুকে রান্না ঘরের মেজেতে বসিয়ে দুপুরের রান্না চড়িয়েছে অপরূপা। ঘেমে নেয়ে একাকার অবস্থা। এমন সময় রান্নাঘরের সামনে এলো পলাশ। পিহুকে দেখেই কোলে তুলে নিল। অপরূপা এক পলক পালাশের দিকে তাকিয়ে ফের মনোযোগ দেয় রান্নায়। পলাশ এসে বসে অপরূপার পাশে।

“কী রাঁধছিস?”

অপরূপা তরকারিতে ঝোল দিয়ে ঢেকে দিল। জবাব দিল,

“ডিম আলুর তরকারি আর মাছ ভাজা।”

পলাশ চুমু খেল পিহুর গালে। অপরূপাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“লুপার কী হয়েছে কিছু জানিস? কিছু বলেছে তোকে?”

অপরূপার কপালে ভাজ পড়ল। আঁড়চোখে তাকিয়ে শুধালো,

“কী বলবে?”

পলাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলল,

“জানি না, কয়েকদিন ধরে শুধু শুধু মন খারাপ করে বসে থাকে। যখন দেখি তখনই এই অবস্থা। মন মরা হয়ে বসে থাকে, এসব কি ভালো লাগে বল?”

অপরূপা বুঝল না বিষয়টা। নিজের বউয়ের কী হয়েছে সেই কথা কি-না সে তার বোনকে জিজ্ঞেস করছে? তবে মেয়েটা মন খারাপ করে থাকবে কেন? শরীর খারাপ লাগে নাকি?

“কেন? তুমি ওর স্বামী, তুমি জানো না? জিজ্ঞেস করো না?”

পলাশ আবারো দীর্ঘশ্বাস ফেলল। জবাব দিল,

“কিছুই বলে না, উল্টো কেমন অন্যমনষ্ক থাকে। কী যে হয়েছে ওর।”

অপরূপা হাসে। গর্ভকালীন সময় কতরকমের অনুভূতি যে হয়। এসব সামলানো মুখের কথা নয়।

“এ সময়ে এমন অনেক কিছুই হয়। ধমকাধমকি করো না।”

বুঝল পলাশ। তাই কথা ঘুরিয়ে পলাশ অন্য প্রসঙ্গে গেল,

“তা তোর চাকরির কী খবর? ইন্টারভিউ না দিলি?”

অপরূপা তরকারি বাটিতে নামাতে নামাতে জবাব দিল,

“এখনো তো কিছু বলেনি। দেখি কী হয়।”

পলাশ হাত রাখল অপরূপার মাথায়। হেসে বলল,

“দেখিস, তুই অনেক সুখী হবি।”

অপরূপা নিশ্চুপ। সে সুখেই আছে। হ্যাঁ, সে সুখেই আছে। পলাশ পিহুকে রেখে চলে গেল বাজারের দিকে। অপরূপা কাজ গুছিয়ে ঘরে এলো। পিহুকে ঘুম পারিয়ে গোসল করে বাইরে আসতেই দেখল বিছানায় পিহুর পাশে বসে আছে লুপা। অপরূপা চুল মুছতে মুছতে এগিয়ে এলো,

“কখন এলে? ডাক্তার কী বলল?”

লুপা চোখ সরিয়ে ফিরে তাকাল অপরূপার দিকে। চটজলদি উঠে দাঁড়াল। এগিয়ে এলো অপরূপার কাছে। হাতে তার হাজার টাকার অনেক গুলো নোট। অপরূপা একপলক টাকাগুলোর দিকে তাকিয়ে লুপার মুখের দিকে তাকাল। লুপা মাথা নিচু করে টাকা গুলো এগিয়ে দিল অপরূপার দিকে। মিনমিন করে বলল,

“আ আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন আপা। আসলে আমি….”

বলতে গিয়েও থেমে গেল লুপা। কী বলবে সে? সে যে মিথ্যা বলে টাকা নিয়েছিল সেটা বলবে? নাকি সে তার মায়ের বুদ্ধিতে এইসব কাজ করেছে সেটা বলবে? কোনটা? অপরূপা নির্লিপ্ত। কারণ এসব বিষয়ে সে আগে থেকেই অবগত। সেইযে চেনের কাহিনী থেকর শুরু করে টাকা, প্রতিটি বিষয় অপরূপার জানা।

মা মেয়ের কথোপকথন সে শুনেছে। তবে সে চেয়েছিল লুপাকে লুপার কাজে সফল হতে দিতে। একটা মানুষের সবচেয়ে সুন্দর পরিবর্তন হয় অনুশোচনার মধ্য দিয়ে। আর অপরূপা জানত লুপা আজ হোক বা কাল অনুতপ্ত হবে। তবে এত সহজে আর এত জলদি হবে এটা ভাবে নি। লুপা চোখ পিটপিট করে তাকাল অনুপমার দিকে,

“আমি আপনাকে মিথ্যা বলেছিলাম আপা। টাকার কোনো প্রয়োজন নেই আমার, বোনের জন্য উনিই ফোন কিনে দিয়েছিলেন। আ আমি দুঃখিত। আসলে…”

অপরূপা লম্বা শ্বাস টানল। লুপা টাকা গুলো অপেূপার হাতে দিয়ে নিচু স্বরে বলল,

“আমি আসলে বুঝিনি আপা। তবে এখন বড্ড খারাপ লাগে, ভয় লাগে সব। আমি কত কষ্ট দিয়েছি আপনাদের, কত মিথ্যা বলেছি। এসবের কর্মফল যদি আমার বাচ্চার উপর পড়ে তখন?”

অপরূপা মৃদু হাসল। টাকা গুলো আলমারিতে রেখে এগিয়ে এলো। লুপার হাত ধরে বলল,

“শোনো লুপা, সংসারটা তোমার। এই বাড়ি, এই সংসার সব তোমার। তোমার স্বাসী, সন্তান, শ্বাশুড়ি সব মিলিয়ে তোমার নিজের পরিবার।৷ আর দিন শেষে এই পরিবারটাই তোমার আপন, মানুষ গুলো তোমার আপন। তাই প্ররোচিত হয়ে ভুল কাজ করো না। আশা করছি কী বলছি তুমি বুঝতে পারছো।”

লুপা উপর নিচ মাথা নাড়ল। চোখ তুলে তাকাল অপরূপার মুখপানে। বলল,

“হ্যাঁ আপা, বুঝেছি। কিন্তু আমার মা যে কেন এমন করত আমি বুঝিনা। তবে সত্যি বলতে আমার নিজের মায়ের থেকে আপনার মা অনেক বেশি ভালো।”

অপরূপা কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে প্রশ্ন করল,

“আমার মা কী, হ্যাঁ?”

লুপা হেসে ফেলল। জ্বিভ কেটে জবাব দিল,

“আমাদের মা। আসলে আমার মা কখনো আমাকে তেমন ভালোবাসেনি। বড় ভাইয়াকে নিয়েই তার পুরো জগৎ দুনিয়া ছিল। আমার ছোট বোনটাকেও তেমন গুরুত্ব দেননি। আমার বিয়ের পর হুট করেই আম্মা আমার প্রতি কেমন যত্নবান হলেন। আমিও গলে গিয়ে আম্মা যা বললেন তাই করলাম। অথচ সবই ছিল ভুল। আপা মাফ করে দিয়েন দয়া করে।”

অপরূপা খুশি হলো। যাক,মেয়েটা নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে এই অনেক। অপরূপা লুপার পিঠে হাত বুলিয়ে দিল। বলল,

“ধ্যাত বোকা মেয়ে। ছাড়ো সেসব। শরীর ঠিক আছে তো?”

“হ্যাঁ, আপা। একদম ঠিক আছে। জানেন আপা ডাক্তার বলেছে আমার দুটো বেবি হবে।”

অপরূপার হাসি গাঢ় হলো। শুভ্র মুখটা খুশিতে উজ্জ্বল হলো।

“আলহামদুলিল্লাহ। সুখী হও।”

ঠিক এমন সময় বাইরে থেকে অপরূপাকে ডেকে উঠলেন আমেনা বেগম। অপরূপা বাইরে এলো। আমেনা বেগমের হাতে তার ফোন, সেটাই আওয়াজ তুলে বাজছে। ফোনটা রান্না ঘরেই রেখে এসেছিল অপরূপা। আসতে আসতে জিজ্ঞেস করল,

“কে? কে কল করেছে?”

আমেনা বেগম এক পলক স্ক্রিনে তাকিয়ে ফোনটা এগিয়ে দিল অপরূপার দিকে। বলল,

“তোর মামা।”

আর কিছু না বলে ফোনটা রিসিভ করল অপরূপা। ফোনটা হাতে নিয়েই বড় আমগাছটার নিচে দাঁড়াল। কয়েক মিনিট কথোপকথন চলল অপরূপা ও ফোনের অপাশে থাকা ব্যক্তিটির সাথে। রান্নাঘরের দরজার সামনে বসে লুপা আর আমেনা বেগম তাকিয়ে রইল অপরূপার দিকে। কথা শেষ করে হাসি মুখে এগিয়ে এলো অপরূপা। চোখে মুখে তার একরাশ উচ্ছ্বাস। মেয়ের এমন হাস্যজ্জ্বল মুখ আমেনা বেগম অনেকদিন পর দেখলেন। অপরূপা এগিয়ে এলো। জড়িয়ে ধরল নিজের মাকে।

“আম্মু, চাকরিটা আমার হয়ে গেছে আম্মু।”

তৎক্ষনাৎ আমেনা বেগমও খুশিতে জড়িয়ে ধরলেন মেয়েকে। ঝটপট আওড়ালেন,

“আলহামদুলিল্লাহ।”

অপরূপা নিজেও বার কয়েক আলহামদুলিল্লাহ বলল। আমেনা বেগম মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন,

“দেখছিস, আল্লাহ তোকে কত ভালোবাসে?”

অপরূপা হাসে। উপর নিচ মাথা দুলিয়ে বল,

“হুঁ, সামনের মাস থেকেই জয়েন। এখন বেতন পনেরো হাজার। সামনে আরো বাড়বে।”

আমেনা বেগম মেয়ের মাথায় চুমু খেলেন। হঠাৎ করেই কেঁদে উঠলেন তিনি। কেন যে তার ফুলের মত মেয়েটার সাথে আল্লাহ এমন করল। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। হয়তো তার মেয়ের কপালর আরো ভালো কিছুই লেখা আছে। হয়তো সব সুখ তার মেয়েরই হবে। সে সুখের নেশায় কেউ একজন তার মেয়েকে ঠকিয়েছে দিন শেষে তার সুখটাও তার মেয়েরই হবে। আর মায়ের দোয়া কখনো বিফলে যায় না। একদিন সব হবে, সব।

____

দেখতে দেখতে কেটেছে অনেকগুলো মাস-বছর। সময়ের গতিধারায় তাল মিলিয়ে চলছে অপরূপা। বেশ চলছে তার জীবন। নিজের মেয়েই তার জীবন। পিহুর বয়স এখন তিন বছর। কী সুন্দর করে কথা বলে, তা অবশ্য ভেঙে ভেঙে। লুপারও দুটো জমজ সন্তান হয়েছে। একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। বেশ চাপ পড়েছে আমেনা বেগমের উপর। সেই চাপটা কমে এসেছে লুপার বোনের কারণে। পলাশের কথা মতোই লুপার ছোট বোন লিতিকে এ বাড়ি থেকেই পড়াশোনা করানো হচ্ছে। পলাশ এখন দেশের বাইরে। সামনেই ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফিরবে।

আর অপরূপা? তার জীবনটা সত্যি ভালো চলছে। মাস গেলে এখন বাইস হাজার টাকা বেতন পাচ্ছে, তা দিয়ে মা মেয়ের ভালো মতোই চলছে। পিহুর নামে মাসে মাসে দশহাজার করে টাকাও জমাচ্ছে। মেয়ের তো একটা ভবিষ্যত আছে। সেটার চিন্তা তো তারই করতে হবে। এদিকে এই দুবছরে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে আমেনা বেগম বেশ কয়েকবার অপরূপাকে বিয়ের কথা বলেছিলেন। যতই হোক, তার মেয়ের তো সুন্দর একটা সংসার প্রাপ্য। সে কেন একা থাকবে? নতুন করে জীবনটা শুরু করা উচিত। তবে অপরূপা এসব নিয়ে কিচ্ছুটি বলে না। সে চায় না আর কাউকে। নিজের মেয়েটাই এখন তার গোটা দুনিয়া।

প্রতি দিনকার মতো আজও অপরূপার ফিরতে ফিরতে রাত বাজল নয়টা। সবাই তখন আমেনা বেগমের রুমে বসে টিভি দেখছে। অপরূপা রুমে ঢুকল। হাতে তার মিষ্টির বাক্স। হাসি মুখে সে এগিয়ে গেল আমেনা বেগমের কোলে বসে থাকা পিহুর দিকে। অপরূপাকে দেখেই ছোট্ট পিহু খুশিতে উঠর দাঁড়াল। সবাইকে ডেঙিয়ে এলো অপরূপার কাছে।

“মাম্মা, তুমি এসেছ? জানো আমি অনেক ওয়েত করছিলাম।”

অপরূপা হেসে ওঠে মেয়ের কথায়। কোলে তুলে নেয় পিহুকে। তা দেখে লুপার ছেলে পিয়াস কান্না জুড়ে দেয়। ছেলেটা অপরূপার জন্য পাগল। বাধ্য হয়ে দুজনকেই কোলে নিতে হলো অপরূপার। চুমু খেল দুজনেরই গালে। ওদিকে গাল ফুলিয়ে বসে আছে নিধি। লুপার মেয়ে। অপরূপা পিয়াসকে নামিয়ে দিয়ে এবার নিধিকেও কোলে নিল। চুমু খেল কয়েকটা। দুজনকে নামিয়ে দিয়ে ব্যাগ থেকে চকলেট বের করে দিল দুজনের হাতে। ব্যস দুজনেই ব্যস্ত হলো সেদিকে। এদিকে চকলেট না পেয়ে পিহু গাল ফোলাল। ফর্সা ফোলা ফোলা গাল দুটো লাল হলো টমেটোর মত। বুকে হাত বেধে রাগ দেখিয়ে বলল,

“মাম্মা, পিহু রাগ করেছে।”

অপরূপা চোখজোড়া ছোট ছোট করে প্রশ্ন করল,

“কেন? কেন পিহু রাগ করেছে?”

“পিহু রাগ করেছে, কারণ পিহুর মাম্মা তাকে ক্যান্ডি দেয়নি।”

অপরূপা অপরাধী স্বরে বলল,

“তাহলে তে পিহুর মাম্মার শাস্তি হওয়া দরকার। তাই না?”

পিহু ঠোঁট উল্টাল। ঝটপট গলা জড়িয়ে ধরল অপরূপার। গালে চুমু খেয়ে বলল,

“না, পিহুর মাম্মা ভালো। কুব কুব ভালো।”

অপরূপা শব্দ করে হাসল। প্রশ্ন করল,

“কুব কুব ভালো?”

পিহু উপর নিচ মাথা দুলিয়ে বলল,

“হুঁ, কুব কুব ভালো।”

পিহুর কথা শুনে লুপা, লিতি দুজনেই হেসে উঠল। অপরূপা চুমু খেল পিহুর গালে। জড়িয়ে ধরে বলল,

“হ্যাঁ, পিহুর মতোই কুব কুব ভালো।”

মুহূর্তেই খিলখিল শব্দে হেসে উঠল পিহু। এতটা সময় আমেনা বেগমের মনোযোগ ছিল টিভির দিকে। টিভিতে এড শুরু হতেই তিনি মেয়ের দিকে তাকালেন। খিটখিটে স্বরে উচ্চারণ করলেন,

“এই, তুই ফ্রেশ না হয়ে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ফ্রেশ হয়ে খেতে বস আয়।”

অপরূপা উপর নিচ মাথা দুলায়। লুপার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,

“তোমরা খেয়েছ?”

তার জবাবটাও প্রতিদিনের মতোই না বোধক হয়।

“না আপা। লিতি আর বাচ্চাদের খাওয়ালাম। ফ্রেশ হয়ে আসুন, সবাই একসাথে বসি।”

অপরূপা লম্বা শ্বাস টানল। সম্মতি জানিয়ে পিহুকে আমেনা বেগমের কোলে দিয়ে সে নিজের রুমে চলে গেল। দীর্ঘ একটা শাওয়ার নিয়ে নীল রঙের একটি সুতি শাড়ি পরে বের হলো। নীল রঙটা অপরূপার বেশ পছন্দ। আর এই পছন্দ হওয়ার কারণটা ঠিক জানা নেই তার। নীল হলো বিষাদের রঙ, তাই বলেই হয়তো তার প্রিয় রঙটা তার জীবনেও লেগে গিয়েছিল। অপরূপা সোজা খাবার রুমে এলো। পিয়াস আর নিধিকে ঘুম পারিয়ে শুইয়ে দিয়ে এসেছে লুপা। লিতিও শুয়ে পড়েছে। পিহুকে অপরূপাই ঘুম পারাবে। সে বর্তমানে কলম খাতা নিয়ে আঁকিবুঁকি করছে মেঝেতে বসে। অপরূপা, লুপা ও আমেনা বেগম একসাথে খেতে বসলেন। খাওয়ার মাঝ পথে অপরূপা ভারি স্বরে আমেনা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আম্মু, কিছু কথা আছে।”

আমেনা বেগমও খাওয়া রেখে চোখ তুলে তাকাল। মনোযোগ দিল মেয়ের দিকে। প্রশ্ন করল,

“হ্যাঁ, বল।”

অপরূপার মুখটা কেমন শুঁকনো। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“আমার কুমিল্লা পোস্টিং হয়েছে।”

মুহূর্তেই চোয়াল ঝুলে পড়ে আমেনা বেগমের। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

“কুমিল্লা মানে?”

অপরূপা নড়ে চড়ে বসল। খাবার মুখে দিল। অতঃপর প্লেটের দিকে মনোযোগ দিয়ে বলল,

“কোম্পানির মেইন অফিসটা কুমিল্লাতে। এখানকার হেড আবার বসের মামাতো ভাই। ওনার ভাষ্যমতে আমার পারফরম্যান্স অন্যদের তুলনায় ভালো, তাই আসাকে মেইন সেক্টরে পোস্টিং দিয়েছে।”

আমেনা বেগমের চোখ মুখ উজ্জ্বল হলো। লুপাও খাওয়া থামিয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,

“আলহামদুলিল্লাহ, এটা তো ভালো খবর আপা।”

অপরূপা স্মিত হাসলো। আমেনা বেগমও খুশি হয়ে প্রশ্ন করলেন, “হ্যাঁ, ভালোই তো। ওখানেও কি একই কাজ?”
অপরূপা দুদিকে মাথা দুলিয়ে বলল,

“না আম্মু, হেড অফিস যেহেতু কাজ তো ভিন্ন হবেই। ওখানেই তো ক্লাইন্টদের সাথে ডিল হয়। আর সেই অনুযায়ী কাজ হয় প্রতিটি শাখায়। স্যার বলল ভালো পোস্টেই দেবে, বেতনও বাড়বে। কিন্তু….”

পুরোটা বলার আগেই আমেনা বেগম ভ্রু জোড়া কুঁচকে নিলেন। প্রশ্ন করলেন,

“আবার কিন্তু কীসের? কত বড় সুযোগ, আলহামদুলিল্লাহ।”

“কুমিল্লা থাকবে হবে আম্মু। পিহুকে কে দেখে রাখবে?”

অপরূপার কিন্তুর কারণ বুঝতে পারলেন আমেনা বেগম। লুপা হাসি মুখেই বলল,

“সমস্যা কী আপা? পিহু আমাদের সাথেই থাকবে।”

অপরূপার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে কখনোই মেয়েকে ছেড়ে থাকতে পারবে না। যেখানে সে অফিস টাইমেই কয়েকবার ফোন করে পিহুর সাথে কথা বলে, সেখানে দূরে থাকবে? দরকার পড়লে পোস্টিং নেবে না, তবুও মেয়ের থেকে সে দূরে যাবে না।

“অসম্ভব। পিহুকে ছাড়া আমার থাকা সম্ভব না। বাদ দাও তো, পোস্টিং নেব না।”

“এই পাগল তুই?”

তৎক্ষনাৎ আমেনা বেগমের ধমক পড়ল। তিনি ফের বললেন,

“এত চিন্তার কী আছে? আমি কি মরে গেছি? আমি যাব তোর সাথে। আমিই তো এতকাল রাখলাম পিহুকে।”

অপরূপা অবাক হলো। বিস্ময় নিয়ে আওড়াল,

“তুমি যাবে?”

“হ্যাঁ, আমিই যাব।’

অপরূপা খানিক সময় চুপ রইল। ভাবল কিছু একটা। অতঃপর বলল,

“লুপার দুটো বাচ্চা, ওদের একা রেখে তুমি আমার সাথে যাবে? একদম না।”

আমেনা বেগম কিছু বলার আগেই লুপা বলে উঠল,

“সমস্যা নেই আপা। লিতি তো আছেই। আপনি আর মা বরং যান।”

আমেনা বেগম লুপার কথায় সায় জানালেও অপরূপা বিরোধ করল। খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়াল সে। মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমি যাব কুমিল্লা। তবে তোমার যাওয়ার দরকার নেই। তুমি এমনিতেই অসুস্থ। আর আমি স্যারের সাথে কথা বলে দেখি অফিসে বাচ্চা নিয়ে যাওয়া এলাউ করে নাকি।”

আমেনা বেগম আরো কিছু বলতে নিলে অপরূপা থামিয়ে দেয়।

“উঁহু, আর কথা না। খেয়ে মেডিসিন গুলো নাও।”

বলেই হাত ধুয়ে রুমে এলো অপরূপা। কাল বরং স্যারের সাথে কথা বলবে। যদি পারমিশন পাওয়া যায় তবেই যাবে। কারণ আমেনা বেগম অসুস্থ মানুষ। এখানে তো কিছু হলে লুপা আছে। নতুন শহরে কে আছে তাদের? পিহু এখনো নিচে বসে বসে আকিঁবুকিঁ করছে খাতায়। অপরূপা কোমরে আঁচল বেঁধে বিছানা ঝাড়ল। বিছানা ঠিক করতে করতে ডাকল পিহুকে,

“পিহু, ঘুমাতে আসো সোনা।”

পিহু খাটা কলম টেবিলে রেখে উঠে এলো বিছানায়। পিঠ পর্যন্ত চুলগুলো দুটো বেনি করা। সামনে বার্বিডলের মতো চুল কাটা। বেশ সুন্দর লাগে পিহুকে। অপরূপা পিহুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করল,

“তুমি নানুমনিকে বেশি জ্বালাও না তো?”

পিহু গোল গোল চোখ করে তাকাল অপরূপার দিকে। দুদিকে মাথা দুলিয়ে আধোভাঙা গলায় বলল,

“না তো, পিহু তো ভালো। সে জ্বালায় না।”

“পিহু তো ভালো। তবে মাঝে মাঝে তুমি নাকি নানুমনিকে জ্বালাও?”

“এত্তু এত্তু।”

“একটু একটুও জ্বালাবে না। নানুমনি অসুস্থ না?”

পিহু ঘাড় বাঁকিয়ে ছোট্ট করে বলল,

“আচ্চা। পিহু আর দুত্তুমি করবে না।”

অপরূপা লাইটটা অফ করে ড্রিম লাইট জ্বালিয়ে দিল। শুয়ে পড়ল পিহুর পাশে। চুমু খেল পিহুর কপালে। জড়িয়ে নিল নিজের বুকে। চোখ জোড়া বন্ধ করে বলল,

“গুডগার্ল।”

পিহু খুশি হলো। সে নিজেও অপরূপাকে জড়িয়ে ধরল। মায়ের বুকে যে সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ স্থান। পিহু চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করল,

“পিহু গুডগাল, মাম্মাও গুডগাল।”

______

#চলবে