Home "ধারাবাহিক গল্প ঝরা শিউলির দিনে ঝরা শিউলির দিনে পর্ব-৩৬+৩৭

ঝরা শিউলির দিনে পর্ব-৩৬+৩৭

0
426

#ঝরা_শিউলির_দিনে
#পর্ব ৩৬
#তামান্না_ইসলাম_শিমলা

_______________________

ভোর পেরিয়ে সকাল। সময় অগ্রসর হয়েছে অনেকটা। জানালার ভারী পর্দার সংকীর্ণ ফাঁক ভেদ করে সূর্যের সোনালি কিরণরেখা এসে পড়েছে বিশাল কক্ষটির মেঝেজুড়ে। আলো আর ছায়ার মিশ্রণে সৃষ্টি হয়েছে এক নিঃশব্দ আবহ। বাইরে কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ হলেও ঘরের ভেতরে সেই প্রাণোচ্ছলতার কোনো প্রতিফলন নেই।

বরং এখানে বিরাজ করছে ক্লান্ত, অবসন্ন বিশৃঙ্খলা।মেঝের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে কয়েকটি টি-শার্ট, জিম গ্লাভস, খালি পানির বোতল। বিছানার পাশের টেবিলের উপর এলোমেলোভাবে পড়ে রয়েছে ওষুধের ফাঁকা স্ট্রিপ। গত কয়েকদিনের অস্থিরতা আর অনিদ্রার নির্বাক সাক্ষী হয়ে আছে সেগুলো। কিং সাইজের বিছানার মাঝখানে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে আভিয়ান।

পরনে কেবল ধূসর রঙের ট্রাউজার। প্রশস্ত খালি পিঠের উপর এসে পড়েছে সকালের আলো। ঘুমন্ত অবস্থাতেও কপালের মাঝখানে স্পষ্ট হয়ে আছে গভীর ভাঁজ, যেন অবচেতন মনও তার শান্তির স্পর্শ পায়নি।

বিছানার এককোনায় পড়ে আছে আভিয়ানের ফোনটা। বেজে চলেছে অনেকটা সময় ধরে। এমনটা নয় যে আভিয়ানের কর্ণকুহরে প্রবেশ করছে না সেই শব্দ, তবে সে ইচ্ছে করেই অলস ভাবে এড়িয়ে যাচ্ছে। তবে এ পর্যায়ে সে কিছুটা হাল ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো। ফোনটা আবার বেজে উঠল।

রিংটোনের শব্দটা ক্রমশ মাথার ভেতর ধাক্কা দিচ্ছে আভিয়ানের। বিরক্তিতে চোখ না খুলেই হাত বাড়াল সে।
ফোনটা কোথায় রাখা আছে, সেটাও মুহূর্তের জন্য মনে করতে পারছে না সে। আধো ঘুম, ক্লান্তি আর অবসাদের ঘোরে বিছানার উপর হাতড়াতে লাগল কিছুক্ষণ। অবশেষে আঙুলের ডগায় ঠেকল ঠান্ডা ধাতব ফোনের শরীরটা।

ক্লান্ত শরীর নিয়ে সেটি তুলে নিল আভিয়ান। চোখ তখনও বন্ধ। এলোমেলো চুলগুলো কপালে লেপ্টে আছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। মাথার ভেতর ধুকধুক করছে এক অদৃশ্য ভার। ফোনটা কানের কাছে তুলতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো এক পরিচিত অথচ আজ অস্বাভাবিক কঠোর কণ্ঠস্বর,

“তুমি কোথায় আছো, আভিয়ান?”

ওপাশে আর কেউ নয়, বরং ইরফান এহসান। আভিয়ান চোখ না খুলেই সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল,

“বাসায় আছি।”

“কোন বাসায়?”

“জানি না।”

আভিয়ানের ভাব ও জবাবে স্পষ্টই অসন্তুষ্ট ইরফান এহসান। ওপাশে কয়েক মুহূর্তের নীরবতা। সেই নীরবতা যেন ঝড়ের পূর্বাভাস। ইরফান এহসানের কণ্ঠ আরও গম্ভীর হয়ে উঠল।

“তিনদিন পর ঈদ, আভিয়ান। সে খেয়াল কি আছে তোমার? কাল সারাদিন তোমার ফোন বন্ধ ছিল। বাড়িতে কেউ জানে না তুমি কোথায়। এটাকে কি দায়িত্বশীল আচরণ বলা যায়?”

আভিয়ান ধীরে কপালে হাত রাখল। মাথার ভেতরটা যেন ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছে। ব্যথায় টনটন করছে। চোখ খোলার শক্তিটাও পাচ্ছে না। কেবল মৃদু স্বরে বলল,

“স্যরি।”

“স্যরি?”

ইরফান এহসান হেসে উঠলেন বটে, তবে সেই হাসিতে উষ্ণতার চেয়ে অভিমান আর কষ্টই বেশি।

“তুমি জানো, গতকাল রাত দুইটা পর্যন্ত আমি জেগে ছিলাম? তুমি জানো, সায়েদ আমাকে তিনবার এসে ঘুমাতে বলেছে? তুমি জানো, তোমার জন্য চিন্তা করতে করতে আমি নিজের শরীরটাই খারাপ করে ফেলছি? অথচ তুমি প্রতিবারই আমাকে এভাবে চিন্তায় রেখে উধাও হয়ে যাও।”

এ পর্যায়ে ধীরে চোখ মেলে আভিয়ান তাকাল সিলিংয়ের দিকে। একটা দীর্ঘশ্বাস নিঃশব্দে বেরিয়ে এলো বুকের গভীর থেকে। সে জানে। সবই জানে। এই বৃদ্ধ মানুষটা তাকে কতটা ভালোবাসেন, কতটা আগলে রাখেন, সেটাও জানে। তবুও কখনো কখনো নিজের ভেতরের বিশৃঙ্খলা মানুষকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে সে নিজের কাছেও অপরিচিত হয়ে ওঠে। সে এটাও জানে সে একটা খারাপ মানুষ। গলা ধরে এলো আভিয়ানের। তবে চেয়েও সে কিছু বলতে পারছে না। বোঝাতে পারছে না। সে স্বাভাবিক কণ্ঠেই বলল,

“আমি ঠিক আছি, চিন্তা করো না।”

“তাহলে ফোন বন্ধ কেন?”

“চার্জ ছিল না বোধ-হয়।”

“তারপর?”

আবারো দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার বুক চিড়ে। বুঁজে নিল চোখ জোড়া। জবাব দিল,

“আমার একটু শান্তি প্রয়োজন, দাদু।”

“শান্তি?”

ইরফান এহসানের কণ্ঠে তীক্ষ্ণ ব্যথার সুর স্পষ্ট। তিনি খুব করে অভিমান করেছেন আজ। কদিন বাদে ঈদ, এই ছেলেটা এমন সময়েও এভাবে হুটহাট না বলে কয়ে চলে যাবে? ছেলেটা কি বুঝতে পারে না তার দাদুর বয়স হচ্ছে, সে এখন আগের মতো এত দুশ্চিন্তার ভার বহন করতে পারে না। না, বোঝে না। বুঝলে কি আর এমন করত? অভিমান তার আকাশ ছুঁলো। কণ্ঠস্বরেও প্রকাশ পেল তা,

“তোমার শান্তির জন্য যদি একটা বৃদ্ধ মানুষকে রাতভর অস্থির হয়ে বসে থাকতে হয়, তাহলে সেটা শান্তি নয়, আভিয়ান। তুমি যে শান্তির খোঁজে এমন ছন্নছাড়া হয়েছে সেই শান্তি কি মিলছে তোমার?”

আভিয়ান নিশ্চুপ। তার নীরবতা সমস্ত উত্তরকে গ্রাস করে ফেলেছে। জবাব আসলে নেই তার কাছে। শান্তি তো মিলছে না, কিচ্ছুটি মিলছে না। তবে কী আর জবাব দেবে? আভিয়ান চুপ করে রইল ঠিকই তবে ওপাশ থেকে আবারও ভেসে এলো ভারী কণ্ঠস্বর,

“তুমি কি বুঝতেই পারছো না আমি কতটা চিন্তায় আছি? বয়স হয়েছে আমার। আগের মতো আর শক্তি পাই না। একটা ফোন করলে কি খুব ক্ষতি হয়ে যেত?”

আভিয়ান এবারো নিরুত্তর। মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে তার। সবকিছু যেন গোলগোল ঘুরছে চারপাশে। সে অত্যন্ত নিচু স্বরে বলে উঠল,

“ভালো লাগছে না।”

মাত্র তিনটি শব্দ। কিন্তু সেই তিনটি শব্দ যেন মুহূর্তেই ইরফান এহসানের সমস্ত রাগ স্তব্ধ করে দিল। ওপাশে নেমে এলো দীর্ঘ নীরবতা। নাতির প্রতি তার দুর্বলতা চিরকালই সীমাহীন। কিছুক্ষণ পর অনেক নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,

“তোমার শরীর খারাপ?”

“না।”

“জ্বর?”

“না।”

“তাহলে?”

আভিয়ান ঠোঁট চেপে ধরল। কী বলবে? বলবে যে বুকের ভেতরটা অকারণে শূন্য হয়ে আছে তার? বলবে যে নিজেকেই নিজের কাছে খুব বেশি অচেনা মনে হচ্ছে?
বলবে যে একজন মানুষের অবহেলা, নীরবতা কিংবা অনুপস্থিতি তাকে অস্বাভাবিকভাবে প্রভাবিত করছে? এসব কথা কি মুখে আনা যায়? না। কিছু অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার আগেই মানুষ সেগুলো গিলে ফেলে। সেখানে সে তো ছোট থেকেই চাপা স্বভাবের। নাতির নীরবতা অস্থির করে তুলল ইরফান এহসানকে। তিনি ফের শুধালেন,

“আভিয়ান, কী হয়েছে বলো?”

এ পর্যায়ে আভিয়ান ছোট্ট করে জবাব দিল,

“কিছু না, এমনি।”

ইরফান এহসান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। সেই দীর্ঘশ্বাসে ছিল বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা স্নেহ আর অসহায়তা। তিনি তার নাতির, তার আভিয়ানের আপন হতে পারেননি বোধ-হয়। তিনি ব্যর্থ, তাই তো এই বাপ মা হারা ছেলেটা কোনো কথায় তাকে বলেনি। সব দুঃখ কষ্ট পুষে রেখেছে নিজের মাঝে।

“তুমি ছোটবেলা থেকেই এই একটা কাজ করো। কষ্ট পেলে মুখ বন্ধ করে ফেলো। সব নিজের মধ্যে রাখো। কিন্তু মানুষ তো পাথর না, আভিয়ান। সবকিছু একা বহন করা যায় না।”

এসব কথায় আভিয়ান প্রভাবিত হয় না। সেই অনুভূতিও নেই তার। এ নিয়ে তার নিজেরই অনেক অভিযোগ।অথচ সে তো পারছে না নিজেকে বদলাতে। আভিয়ান কোনো জবাব দিল না। চোখ বন্ধ রেখেই শুয়ে রইল সে। অন্যদিন হলে হয়তো সে মুচকি হেসে মানুষটাকে শান্ত করার চেষ্টা করত। আজ পারল না। আজ শরীরটা অদ্ভুত রকম অবসন্ন।

হাড়ভাঙা ক্লান্তি যেন প্রতিটি শিরায় শিরায় জমে আছে।
অনেকক্ষণ পর ধীরে ধীরে চোখ খুলল সে। সিলিংয়ের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর অত্যন্ত নিচু, অসহায় কণ্ঠে ডাকল,

“দাদু?”

“বলো, শুনছি।”

ইরফান এহসানের ধীর গম্ভীর কণ্ঠস্বর। তবে আভিয়ান অত্যন্ত শীতল স্বরেই উচ্চারণ করল,

“আমার একটু ঘুমানো প্রয়োজন, পরে ফোন দেই?”

কয়েক সেকেন্ডের বিরতি। এরপর ইরফান এহসানের কণ্ঠ আবার শক্ত হয়ে উঠল। রাগ হলো তার। আর কোনো বাক্য বিনিময় করলেন না তিনি। বরং তৎক্ষনাৎ কেটে দিলেন কলটা। ঘরজুড়ে আবার নেমে এলো নিস্তব্ধতা। আভিয়ান কিছুক্ষণ ফোনটা কানের কাছেই ধরে রইল। ওপাশের মানুষটার উপস্থিতি এখনও অনুভব করতে চাইছে বোধ-হয়। অতঃপর ধীরে ধীরে ফোনটা নামিয়ে আনল সে।

চোখের কোণে ভেসে উঠল অদ্ভুত এক দৃশ্য। স্ক্রিন তখনো আলোকিত। হোম স্ক্রিন। আর সেখানে স্থির হয়ে আছে একটি ছবি। একটি সাধারণ ছবি। তবুও তার কাছে অসাধারণ। সেদিন রাতের তোলা সেই ছবিটা, পিহুর জন্মদিনের ছবিটা। মাঝখানে অপরূপা। পাশে সে। আর পেছন থেকে দুজনের গলা জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট পিহু।

ছবিটার দিকে তাকাতেই আভিয়ানের ঠোঁটের কোণে অচেতনভাবেই ফুটে উঠল ক্ষীণ এক হাসি। সেই হাসিতে আনন্দের চেয়ে বিষণ্নতাই বেশি। বহু ক্লান্তির মাঝেও এই ছবিটুকু তাকে সামান্য আশ্রয় এনে দিল। তার আঙুলের ডগা ছুঁয়ে গেল স্ক্রিন। প্রথমে পিহুর মুখ। তারপর অপরূপার।

সময়ের হিসাব হারাল। আভিয়ানের অধরে লেপ্টে থাকা হাসিটা মুছে গেল। তার স্থানে জমা হলো অসহনীয় শূন্যতা। বুকের গভীর কোথাও অদৃশ্য এক ভার নেমে এসেছে তার। নিজেকে নিঃশেষ করে দেওয়ার মতো ব্যস্ততায় ডুবতে চাচ্ছে সে। এভাবে আর কতদিন? তার মত অধম এই দুনিয়ার কোনো কাজেরই না। সে পালাতে চায়, সব কিছু থেকে পালাতে চায়। হারাতে চায়। কিন্তু মানুষ যত বেশি কোনো কিছু থেকে পালাতে চায়, অনেক সময় সেই জিনিসটাই তাকে তত বেশি তাড়া করে।

অপরূপাও ঠিক সেভাবেই তার সমস্ত চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছে। নামটা মনে পড়তেই বুকের ভেতর হালকা মোচড় অনুভব করল আভিয়ান। ঈদ চলে এসেছে প্রায়। আর কয়েকটা দিন। তার স্নো হোয়াইটের সাথে তার দেখা হবে না। কথা হবে না। হয়তো কোনো বার্তাও না।

অথচ মেয়েটা তার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছে।অভ্যাস। কী ভয়ংকর একটা শব্দ। যতদিন থাকে, মানুষ তার গুরুত্ব বোঝে না। কিন্তু হঠাৎ অনুপস্থিত হয়ে গেলে বুঝতে পারে জীবনের কতখানি জায়গা নিঃশব্দে দখল করে নিয়েছিল সেটি। আবারো চোখ জোড়া বন্ধ করে নিল আভিয়ান। নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করল সে।অস্থিরতাকে যুক্তির কাছে সমর্পণ করতে চাইল। তবে হৃদয়ের নিজস্ব যুক্তি তো কোনো নিয়ম মানে না। বুকের ভেতরের অকারণ হাহাকার ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছে আভিয়ানের।

সে দ্রুত ফোনটা উল্টে রেখে দিল বিছানার পাশে। হয়তো ছবিটা চোখের আড়াল হলেই অনুভূতিগুলোও আড়াল হয়ে যাবে। হয়তো স্মৃতিকে না দেখলে স্মৃতির প্রভাবও কমে যাবে। কিন্তু কিছু স্মৃতি চোখে নয়, বাসা বাঁধে মনের গভীরে। সেখান থেকে তাদের সরানো যায় না। এক হাত কপালের উপর রেখে নিঃশব্দে শুয়ে রইল আভিয়ান।

কক্ষজুড়ে কেবল তার ভারী নিশ্বাসের শব্দ। অদৃশ্য এক ক্লান্তি। অব্যক্ত এক আকুলতা। অনুচ্চারিত অসংখ্য বাক্য।আর হৃদয়ের অন্তঃস্থলে প্রতিধ্বনিত হতে থাকা একটিমাত্র নাম, অপরূপা। নামটি তার সমস্ত চিন্তার অলিন্দে অলিন্দে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। প্রতিটি শ্বাসে। প্রতিটি নিঃশ্বাসে। প্রতিটি নিঃসঙ্গ মুহূর্তে। আভিয়ান চোখ বন্ধ করেই পড়ে রইল। বিড়বিড় করে আওড়াল,

“আপনি আমাকে সত্যিই খুব কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছেন, স্নো হোয়াইট।”

বাক্যটি উচ্চারণের পরও দীর্ঘক্ষণ নীরব হয়ে রইল সে। কখনো কখনো মানুষের সবচেয়ে গভীর। স্বীকারোক্তিগুলো উচ্চস্বরে বলা হয় না। সেগুলো নিঃশব্দে জন্ম নেয় একটি দীর্ঘশ্বাসে, একটি অপূর্ণ অপেক্ষায়, অথবা এমন কোনো মানুষের স্মৃতিতে, যাকে ভুলে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত চেষ্টা করেও ভুলে থাকা যায় না।

____________

সকাল সাড়ে দশটার প্রহর পেরিয়ে সময় এগোচ্ছে ধীরে ধীরে দুপুরের দিকে। ঈদের পূর্ববর্তী শেষ কর্মদিবস হওয়ায় শহরের অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকাটি উপচে পড়ছে মানুষের ঢলে। ব্যাংকের সামনের প্রশস্ত সড়কজুড়ে অবিরাম যানবাহনের আনাগোনা। কোথাও হর্নের কর্কশ শব্দ, কোথাও রিকশার ঘণ্টা, কোথাও আবার তাড়াহুড়ো করে ছুটে চলা মানুষের পদধ্বনি। সব মিলিয়ে এক অস্থির, কর্মব্যস্ত পরিবেশ।

ব্যাংকের বিশাল কাচঘেরা ভবনের ভেতরেও একই দৃশ্য।
সাদা আলোয় আলোকিত প্রশস্ত হলরুম। সারি সারি কাউন্টার। ডিজিটাল ডিসপ্লেতে একের পর এক টোকেন নম্বর ভেসে উঠছে। এই বিশৃঙ্খল ব্যস্ততার মাঝেই পাশাপাশি বসে আছে অপরূপা ও পলাশ। পলাশ মনোযোগ সহকারে প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই করছে।

কখনো ব্যাংক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলছে, কখনো কাগজপত্রের পৃষ্ঠা উল্টে দেখছে। অন্যদিকে অপরূপা নিঃশব্দে প্রয়োজনীয় ফর্মগুলোতে স্বাক্ষর করে যাচ্ছে। কলমের নিব কাগজের উপর ছুটে চলছে অস্থির ভঙ্গিতে।তাদের সঙ্গে এসেছিল পিহুও।প্রথম দিকে মায়ের পাশেই শান্ত হয়ে বসেছিল সে। কিন্তু পাঁচ বছরের একটি শিশুর কাছে ব্যাংকের পরিবেশ পৃথিবীর সবচেয়ে বিরক্তিকর জায়গাগুলোর একটি বলেই মনে হতে পারে।

কিছুক্ষণ পর থেকেই পিহুর অস্থিরতা বাড়তে শুরু করল।
ছোট্ট পা দুটো দোলাতে দোলাতে কখন যে চুপিসারে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েছে, তা অপরূপা কিংবা পলাশ কেউই খেয়াল করেনি। ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে সে পৌঁছে গেল ব্যাংকের মূল প্রবেশপথের কাছে। বড় কাচের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ চোখে বাইরের পৃথিবী দেখছিল সে।

দ্রুতগামী মোটরসাইকেল, মালবোঝাই ভ্যান, রঙিন রিকশা, মানুষের ভিড় সবটাই চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে পিহু। শিশুসুলভ বিস্ময়ে তার চোখ দুটো বারবার বড় হয়ে উঠছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই তার সামনে এসে থামল একটি অবয়ব। সূর্যের আলো কিছুটা আড়াল হয়ে গেল। পিহু বিস্মিত হয়ে চোখ পিটপিট করল।

সামনে দাঁড়িয়ে আছে মাঝবয়সী একজন ব্যক্তি। শরীরে সাধারণ পোশাক। মাথায় গাঢ় রঙের ক্যাপ। চোখদুটো গভীর। মুখে হালকা দাঁড়ি। লোকটির চেহারায় এমন কিছু ছিল না যা প্রথম দেখায় অস্বাভাবিক মনে হয়। হুট করেই
লোকটি ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসল। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল পিহুর মুখের দিকে। যেন দীর্ঘদিন ধরে হারিয়ে যাওয়া কোনো পরিচিত মুখ হঠাৎ খুঁজে পেয়েছে। পিহু প্রথমে কৌতূহলী হলো বটে।

তবে পরমুহূর্তেই আবার নিজের কাজে মন দিল। ঘুরে চলে যেতে উদ্যত হলো সে। ঠিক তখনই নরম, মোলায়েম স্বরে লোকটি ডাকল তাকে,

“দাঁড়াও।”

শিশুসুলভ কৌতূহলে থেমে গেল পিহু। ঘুরে দাঁড়িয়ে তাকাল সে লোকটির মুখপানে। মুহূর্তেই ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল লোকটির। জবাব নিল,

“হুম?”

লোকটার চোখদুটো কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল শিশুটার মুখে। সেই দৃষ্টিতে অদ্ভুত এক অনুসন্ধিৎসা। পরপর মৃদু হাসল সে। শুধালো,

“তোমার নাম কী?”

“পিহু।”

“পিহু?”

“জি।”

“বাহ, খুব সুন্দর নাম তো।”

প্রশংসা শুনে পিহুর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। শিশুসুলভ গর্বে মাথা দুলিয়ে বলল,

“আমার মাম্মা রেকেচে।”

“তাই নাকি?”

ভ্রু উঁচিয়ে হাসলো লোকটি। পিহু সরল ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল,

“হুম।”

কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে লোকটি আবার জিজ্ঞেস করল,

“তোমার মাম্মার নাম কী?”

“অপরূপা।”

নামটা শুনেই লোকটার ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরো বেশি গাঢ় হলো। সে তো সব জেনেই এসেছে। তবুও প্রশ্ন করতে ভালোই লাগছে। ফের শুধালো,

“আর বাবার নাম?”

প্রশ্নটা শুনে খানিকটা ম্লান হলো পিহুর মুখের উচ্ছ্বাস।
সে ছোট্ট করে ঠোঁট কামড়ে আকাশের দিকে তাকাল। সে বহুবার বলা কোনো উত্তর আবারও বলার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছে। তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,

“আমার পাপা স্টার হয়ে গিয়েচে।”

লোকটা হাসলো। কৃত্রিম দুঃখী ভাব দেখিয়ে চু চু শব্দ করল,

“চু চু চু, তাই নাকি?”

“হুম।”

মাথা দুলাল পিহু। লোকটা ঠোঁট কামড়ে জিজ্ঞেস করল,

“খুব দূরে?”

“অনেক দূলে।”

কথাটা বলতে বলতে পিহু আঙুল তুলে আকাশের দিকে দেখাল। তার বাবার ঠিকানাটা দেখাল। লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা ললিপপ বের করল। রঙিন মোড়কে মোড়ানো ছোট্ট মিষ্টিটা পিহুর দিকে এগিয়ে দিল। উচ্চারণ করল,

“সো স্যাড।”

পিহু ললিপপটা হাতে নিয়ে অবাক চোখে তাকাল।

“আমার জন্য?”

“হুম।”

“থ্যাংক ইউ।”

লোকটার ঠোঁটে আবারও হাসি ফুটল। তবে সেই হাসিতে নেই কোমলতা, আর না আছে স্নিগ্ধতা। আছে বলবে কুটিল কোনো ভাবনা। সে একটু ঝুঁকে এসে নিচু স্বরে বলল,

“একটা কথা জানো?”

পিহুর গোল গোল চোখ করে কিছু সময় তাকিয়ে রইল। তারপর জিজ্ঞেস করল,

“কী?”

“স্টারটা তার সোনার হাঁসের খোঁজ পেয়ে আবার পৃথিবীর বুকে নেমে এসেছে।”

পিহু একবার ললিপপের দিকে তাকাল। একবার লোকটার দিকে। তারপর কপাল কুঁচকে ভেবে বলল,

“সোনার আবার হাঁস হয় নাকি?”

“হয় হয়,এই তেমন তুমি।”

চোখ মুখ কুঁচকে নিল পিহু। এ পর্যায়ে লোকটাকে একদমই ভালো লাগছে না তার। পিহুর এমন মুখ দেখে শব্দ করেই হেসে উঠল লোকটি। এমন সময় তার দৃষ্টি গিয়ে আটকে গেল ব্যাংকের কাচের দরজার ওপারে।
অপরূপা বেরিয়ে আসছে। হাতে কাগজপত্র। চোখেমুখে ব্যস্ততার ছাপ। এক ঝলক তাকিয়েই লোকটার মুখের সমস্ত হাসি মিলিয়ে গেল।

চোখদুটো স্থির হয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। পরক্ষণেই সোজা হয়ে দাঁড়াল সে। আর কোনো কথা বলল না। কেবল দ্রুত পায়ে মানুষের ভিড়ের মধ্যে হাঁটা শুরু করল। শত শত মানুষের ভিড়ে মিশে যেতে তার সময় লাগল মাত্র কয়েক সেকেন্ড। তারপর আর তাকে আলাদা করে চেনার উপায় রইল না। যেন সে কখনো ছিলই না এখানে।

এদিকে ব্যাংক থেকে বের হয়েই গেটের কাছে পিহুকে দেখতে পেল অপরূপা।এক মুহূর্তে বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। এত ভিড়ের মধ্যে মেয়েটা একা কেন? দ্রুত এগিয়ে এল সে।

“পিহু!”

পিহু খুশিতে ঘুরে দাঁড়াল।

“মাম্মা!”

অপরূপা হাঁটু গেড়ে বসে মেয়ের কাঁধ দুটো আগলে ধরল।

“তুমি এখানে কেন? তোমাকে মামুর কাছে থাকতে বলেছিলাম না? আমি কতবার বলেছি একা একা দূরে যাবে না?”

“আমি দূলে যাইনি তো।”

“এখানে কেন এসেছিলে?”

“এমনি।”

অপরূপা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখ গিয়ে পড়ল পিহুর হাতে ধরা ললিপপটার দিকে। ভ্রু কুঁচকে গেল মুহূর্তেই।

“এটা কোথা থেকে পেয়েছ?”

পিহু নির্বিকার গলায় বলল,

“এত্তা আন্তেল দিয়েচে।”

কপালের ভাজ গাঢ় আকার ধারণ করল অপরূপার। কৌতুহলী চিত্তে শুধালো,

“কোন আঙ্কেল?”

“এইতো।”

পিহু ঘুরে চারপাশে তাকাল। তারপর আঙুল তুলতে গিয়ে থেমে গেল। লোকটা নেই। চোখ পিটপিট করে বলল,

“ওকানেই তো চিল।”

“কোথায়?”

“নেই তো ”

গম্ভীর হয়ে উঠল অপরূপার মুখ। কিছুটা কর্কশ স্বরেই উচ্চারণ করল,

“আঙ্কেল তোমার সাথে কথা বলেছে?”

“হুম।”

“কী বলেছে?”

পিহু এক নিঃশ্বাসে বলতে শুরু করল,

“নাম জিজ্ঞেস করেচে।”

“তারপর?”

“মাম্মার নাম জিজ্ঞেস করেচে।”

অপরূপার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। বুক ধুকপুক করছে তার। অস্থিরতা দমাতে ফের শুধালো,

“আর?”

“পাপার নাম জিজ্ঞেস করেচ। আর এতা দিয়েচে।”

ললিপপটা তুলে দেখাল পিহু। অপরূপা নিঃশব্দে সেটি নিজের হাতে নিয়ে নিল। তার মাথার ভেতরে একসাথে অনেকগুলো চিন্তা ভিড় করছে। একজন অচেনা মানুষ।
সে পিহুর নাম জেনেছে। তার মায়ের নাম জেনেছে। এমনকি বাবার কথাও জিজ্ঞেস করেছে। কেন? স্রেফ কৌতূহল?

নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে? অকারণেই সৈকতের কথা মনে পড়ে গেল তার। যদিও বা সৈকতের আর কোনো ফোন কল আসেনি সেদিনের পর। তবে এই নীরবতায় কি ঝড়ের লক্ষ্মণ? পুরোনো ভয়গুলো হঠাৎ করেই ফিরে এলো অপরূপার মাঝে। অপরূপার আঙুলগুলো অজান্তেই শক্ত হয়ে উঠল। সে দ্রুত পিহুকে কোলে তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। না, সে আর নিতে পারছে না। একটু শান্তি কি মিলবে না তার? ইতোমধ্যে টাকা তুলে চলে এসেছে পলাশ। সব মিলিয়ে পনেরো লাখ।

“কিরে এখানে কেন?”

অপরূপা ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাল। পলাশ ব্যস্ত ভঙ্গিতে এসে থামল তার সামনে। অপরূপা ছোট্ট শ্বাস ফেলে বলল,

“তোমাকে বলেছিলাম না ওকে দেখে রেখো। ও একা একা এখানে চলে এসেছে।”

পলাশ চটজলদি তাকাল পিহুর দিকে। অপরাধী স্বরে বলে উঠল,

“আল্লাহ! একদমই খেয়াল করিনি। সোনা, তুমি না বলে চলে এসেছ কেন? স্যরি রে অপু।”

“আচ্ছা ছাড়ো। চলো ফিরি।”

অপরূপার বিষন্ন কণ্ঠস্বন। মনটা তার কু ডাকছে খুব করে। খারাপ কিছু যেন না হয়। সে হুট করেই বলল,

“টাকা গুলো ঘরে রাখা মানে বিপদ, যখন দরকার তখনই উঠাতে।”

পলাশ ছোট্ট শ্বাস ফেলে জবাব দিল,

“ঈদের পরেরদিনই কুমিল্লা যাব। ব্যাংক খুলতে খুলতে তো আরো সাতদিন। তিনটা চারটা দিনেরই তো বিষয়।”

অপরূপা আর কিছু বলল না। কোনো কিছুই ঠিক লাগছে না তার। একদমই না। পিহুর দিকে একপলক তাকিয়ে চোখ নামাল নিজের হাতে থাকা ললিপপটার দিকে। বেরিয়ে এসে রাস্তার পাশে বিনাবাক্য ছুঁড়ে মারল সে। পলাশও বেরিয়ে এসে রিকশা থামাল। পরপর উঠে বসল অপরূপা ও পলাশ। মুহূর্তেই রিকশক ছুটল নিজ গতিতে নিজ পথে। সে পানে একদৃষ্টিতে চেয়ে রইল অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিটি। সে আর কেউ নয়, সে সৈকত। ঠোঁটে তার জ্বলন্ত সিগারেট, ধোঁয়ার কুন্ডলি উঠছে আকাশের পানে। চোখ দুটো ঘোলাটে, চোখে মুখে এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতা। সেই উজ্জ্বলতার কারণ আপাতত অপরূপা। আঙুলের ভাজে সিগারেট চেপে নামিয়ে নিল সৈকত। ঠোঁট কামড়ে হেসে বিড়বিড় করল,

“এ তো মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। কাঠখড় আর পোড়াতে হবে না।”

কুটিল চিন্তায় গিজগিজ করছে সৈকতের মস্তিষ্ক। সে পকেট হাতরে ফোনটা বের করল। কল লাগাল কাউকে একটা। অতঃপর পা বাড়াল উল্টো পথে। যেতে যেতে কেবল শোনা গেল তার শেষ কণ্ঠস্বরে উচ্চরিত বাক্যখানা,

“ভাই, দুই তিনজন লোক দিতে পারবেন?”

___________

#চলবে

#ঝরা_শিউলির_দিনে
#পর্ব ৩৭
#তামান্না_ইসলাম_শিমলা

_______________________

দেখতে দেখতে চলে এসেছে ঈদ। ভোর থেকেই উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে পুরো শহর। চারদিক থেকে ভেসে আসছে তাকবিরের ধ্বনি। হৈহল্লা, মানুষের ব্যস্ত পদচারণা সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত আনন্দময় পরিবেশ। গ্রামের বাড়িটাও তার ব্যতিক্রম নয়। উঠোন ধুয়ে-মুছে ঝকঝকে করা হয়েছে।

সকাল সকাল গোসল করে নতুন জামা পরে নিয়েছে পিহু। হালকা গোলাপি রঙের ফ্রক। মাথায় ছোট্ট ফিতা। হাতে কাঁচের চুড়ি। এখন সে লুপার কাছে গিয়ে আরও একটু সাজগোজ করে এসেছে। এদিকে পলাশ ঈদের নামাজে গেছে। আমেনা বেগম আত্মীয়-স্বজনদের ফোন করছেন। আর অপরূপা? সকাল থেকে রান্নাঘরেই কাটিয়েছে সে। আজ প্রায় সব রান্না নিজে করেছে। শেষ হাঁড়িটার ঢাকনা বসিয়ে রান্নাঘর গুছিয়ে বাইরে বের হতেই ডাক পড়ল পিহুর।

“মাম্মাআআ!”

চিৎকার করে দৌড়ে এলো পিহু। দড়াম করে এসে জড়িয়ে ধরল মায়ের পা।

“চালামি দাও!”

অপরূপা হেসে ফেলল।

“ওমা! এত তাড়া?”

“হুম!”

ঠিক তখনই পেছন থেকে দৌড়ে এলো লুপার জমজ দুই ছেলে। একজন জড়িয়ে ধরল অপরূপার ডান পা। আরেকজন বাম পা।

“আমাল চালামি!”

“আমাল চালামি!”

অপরূপা মাথা নাড়ল। ঈদ মানেই এই ছোট্ট ছোট্ট মুহূর্ত গুলো। সে তিনজনকেই ছাড়াতে ছাড়াতে বলল,

“আচ্ছা আচ্ছা, ছাড়ো আগে। দিচ্ছি।”

পিহু সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দিল। কিন্তু বাকি দুজন ছাড়ল না। বয়সে ওরা পিহুর চাইতে ছোট্ট, সে অনুযায়ী বোঝেও কম।

“আগে তাতা! তাপ্পর চাব্ব!”

অপরূপা হেসে মাথায় হাত দিল।

“একদম ব্যবসায়ী হয়ে গেছো তোমরা। না ছাড়লে কী করে দেব?”

বাচ্চা দুটো বুঝল। তাই ছেড়ে দিল অপরূপার পা। ঘরে গিয়ে কিছুক্ষণ পর নতুন নোট নিয়ে বের হলো সে। তিন বাচ্চার হাতে একটা করে নোট ধরিয়ে দিল। দুই যমজ টাকা পেয়ে চিৎকার করতে করতে আবার দৌড়ে গেল লুপার কাছে। শুধু পিহু দাঁড়িয়ে রইল স্থির। দুই হাত তার কোমড়ে। মুখে ভীষণ ভাব। সে ডাকল এ পর্যায়ে,

“মাম্মা?”

“হুম?”

“আমাকে কেমন লাগচে?”

অপরূপা কয়েক সেকেন্ড মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর হাঁটু গেড়ে বসে গাল টিপে দিল পিহুর। চুমু খেল গালে। জবাব দিল,

“আমার রাজকুমারীকে যেমন লাগে।”

পিহু গর্বে গদগদ। নিজেও খুশি হয়ে মায়ের গালে দুটো চুমু বসালো। জিজ্ঞেস করল,

“তাহলে কুব সুন্দল?”

“খুব।”

“এত্তা?”

দুই হাত যতটা পারে ছড়িয়ে দিল পিহু। তার শিশুসুলভ আচরণে অপরূপা হেসে বলল,

“এর চেয়েও বেশি।”

পিহু খুশিতে খিলখিল করে উঠল।

“তাহলে ছবি তোলো।”

“এখনই?”

“হুম!”

অগত্যা ফোন বের করল অপরূপা। নানা ভঙ্গিতে ছবি তুলল পিহুর। মেয়েটা ছবি তুলতে ওস্তাদ। নিজে নিজেই নানারকম ভঙ্গিমা করছে। একসময় পিহু দৌড়ে এলো অপরূপার কাছে। বলল,

“এবার তোমার সাতে তুলব।”

“আমার সাথে?”

“হুম।”

অপরূপা মুচকি হাসল। মেয়েকে কোলে তুলে নিল মুহূর্তে।
অপঃপর গালে গাল লাগিয়ে দুজনেই হাসল। হঠাৎ করেই পিহুর হাসিটা একটু ফিকে হয়ে গেল।

“মাম্মা…”

“হুম?”

“ইয়ান থাকলে কত্তো ভালো হত।”

থেমে গেল অপরূপার হাত। পিহু নিচু স্বরে বলল,

“পিহু তো ইয়ানকে ঈদ মোবালকও বলতে পারেনি।”

মুখটা কেমন ছোট হয়ে এলো মেয়েটার। অপরূপার বুকটা নরম হয়ে গেল। ঈদের দিনে এই মুখটা সে দেখতে চায় না। মেয়ের চুলে হাত বুলিয়ে বলল,

“মন খারাপ করে না।”

“কিন্তু পিহু ইয়ানকে কুব কুব মিস করচে।”

নিশ্চুপ অপরূপা। সে ঠিক কী বলবে সে নিজেও বুঝে উঠবে পারছে না। পিহ তাকাল তার মুখের দিকে। আবদার করল,

“এত্তা কল দাও না মাম্মা।”

অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো অপরূপার বুক চিড়ে। সে জানত তার মেয়ে এমন কিছুই বলবে। আজ আর মেয়েটার আনন্দ নষ্ট করতে চাইল না সে। তাই পিহুকে নামিয়ে দিয়ে কল করল আভিয়ানের নাম্বারে। কয়েকবার রিং হলো ঠিকই তবে রিসিভ হলো না। কেটে গেল কল।পিহুর মুখ আরও ছোট হয়ে গেল। অপরূপা দ্বিতীয়বার কল দিল। এবার কয়েক সেকেন্ড পরই কল রিসিভ হলো।ওপাশে নিঃশ্বাসের শব্দ ব্যতিত কিচ্ছুটি শোনা যাচ্ছে না।
আভিয়ানকে কিছু বলতে না দেখে অপরূপাও কিছু বলল না। শুধু ফোনটা পিহুর হাতে দিয়ে ইশারা করল কথা বলতে। পরপর প্রস্থান করল সে। পিহু খুশিতে গদগদ হয়ে ডেকে উঠল,

“ইয়ান!”

সঙ্গে সঙ্গে ওপাশ থেকে ভেসে এলো ক্ষীণ হাসির শব্দ। সাথে আভিয়ানের কণ্ঠস্বর,

“লিটেল কিটেন?”

উজ্জ্বল হলো পিহু মুখশ্রী। বলে উঠল,

“ঈদ মোবালক!”

“ঈদ মোবারক, লিটেল কিটেন। কেমন আছো তুমি?”

“পিহু ভালো, তুমি কেমন আচো? কী করচো?”

পিহুর প্রশ্নের জবাবে আভিয়ান ছোট্ট করে জবাব দিল,

“ভালো, নামাজ শেষ করে বাড়ি ফিরছি।”

পিহু কিছুসময় চুপ রইল। তারপর বলল,

“তোমাকে দাওয়াত, ইয়ান।”

পিহুর মুখে এমন কথা শুনে হেসে ফেলল আভিয়ান।
শুধালো,

“দাওয়াত? তো কী খাওয়াবে?”

“মাম্মা অনেক কিচু রান্না করেচে।”

“আচ্ছা?”

“হুম।

থামল পিহু। তারপর আবারো ডাকল,

“ইয়ান?”

সাড়া দিল আভিয়ান,

“হুম?”

“পিহু ইয়ানকে মিস করছে।”

থেমে গেল আভিয়ান নিজেও। সেও তো মিস করছে। শুধু তার লিটেল কিটেনকে নয়, সাথে তার স্নো হোয়াইটকেও। সে কথা তো সে চাইলেও এত সহজে বলতে পারছে না। ছোট্ট শ্বাস ফেলল সে। বলল,

“ফিরে আসো জলদি।”

পিহু সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল। জবাব দিল,

“আচ্চা।”

কে জানে কী হলো আভিয়ানের, থেমে গেল তার পা জোড়া। চলে এসেছে সে তার বাড়ির সামনে। বাড়ি ফিরেছেই গতকাল রাতে। ফেরার পর থেকে ইরফান এহসান একটি কথাও বলেনি তার সাথে। এমনকি আজও না। অথচ তার ছন্নছাড়া মনটা যে এখন আবারো উড়ে যেতে চাইছে কোথাও একটা। এটা জানলে তার দাদু এ জীবনে কি আর কখনো কথা বলবে? বলবে না বোধ-হয়।

“ইয়ান।”

খেয়াল ফিরল আভিয়ানের। গাঢ় শ্বাস টেনে বলল,

“তোমার মাম্মাকে আমার তরফ থেকে ঈদ মোবারক জানিয়ে দিও। আর বলে দিও…..”

বাক্য সম্পূর্ণ করল পারল না আভিয়ান। কৌতুহলী পিহু তাই জিজ্ঞেস করল,

“আর কী বলব?”

“বলে দিও তার অবর্তমানে কেউ একজন ভালো নেই, জ্বলে পুড়ে ছাই হওয়ার আগেই একটু সদয় হতে।”

ছোট্ট পিহু বুঝে না বুঝেই মাথা দুলাল। আচ্ছা বলে কেটে দিল ফোন। ছুটে চলে গেল নিজের মায়ের কাছে। কান থেকে ফোনটা নামিয়ে আনল আভিয়ান। পা বাড়াল বাড়ির ভেতর।

সদর দরজার কাছে আসতেই তার চোখে পড়ল অভাবনীয়, অকল্পনীয় এক দৃশ্য। মলিন মুখে বসে আছে নিদ্রা, পাশেই জাওভান। এমন সময় এরা এখানে কেন? আসার তো কথা ছিল বিকেলে আসবে। তার উপর সব কটার মুখের অবস্থা এমন কেন? সাইদ, ইরফান এহসান মাঠেই রয়ে গেছেন গরু নিয়ে। আভিয়ান এসেছে পাঞ্জাবি পাল্টে যেতে। তবে এরা এখানে এভাবে কেন? আভিয়ানকে প্রথমে নজর পড়ল জাওভানেরই। সে লাফিয়ে উঠল। সাথে সাথে নিদ্রাও। এগিয়ে এলো আভিয়ান। দুজনের দিকে তাকিয়ে শুধালো,

“কী ব্যপার? এনিথিং রং?”

“এনিথিং না, পুরোটাই রং।”

জাওভানের গমগমে কণ্ঠস্বরে। কপালে ভাজ পড়ল আভিয়ানের। দৃষ্টি ঘুরিয়ে জাওভানের গম্ভীর মুখের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল,

“মানে? কী হয়েছে?”

জাওভান জবাব দিল না। বরং তাকাল নিদ্রার দিকে। নিদ্রা নিজেও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। সে চোখ তুলল। বলল,

“কোথাও বসে কথা বলি?”

আভিয়ান কিছু বলল না। সিঁড়ির দিকে হাঁটা ধরল। বলল,

“ছাঁদে আয়।”

পরপর ছাঁদে এলো সবাই। বসল সকলেই গোল হয়ে। সবাই চুপচাপ, তা দেখে আভিয়ানের কৌতুহল বাড়ল। জাওভান একদম নামাজ শেষেই হাজির হয়েছে। নিদ্রাও পুরোদস্তুর সেজেগুজে এসেছে।

“কী হয়েছে?”

নিদ্রা আর জাওভান তাকাল একে অপরের দিকে। পরপর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল মেয়েটা। বলল,

“ড্যাড অসুস্থ, তাই এখন আমার বিয়ে নিয়ে পাগল হয়েছে। আমি জাওভানকে বলেছি ড্যাডকে একটু বোঝাতে, ও বোঝানো তো দূর আমান উপরই রাগারাগি করছে। আভি তুই জানিস তো আমার বিষয়? তাহলে…”

নিদ্রার পুরো কথা শেষ হতে দিল না জাওভান। কর্কশ কণ্ঠে উচ্চারণ করল,

“কেন করবি না বিয়ে? কী সমস্যা তোর? সেই কতবছর আগে মারা গেছে তোর প্রেমিক, তার জন্য এখনো নিজেকে লুপের মাঝে আঁটকে রাখছিস। এত প্রেম মরা মানুষের জন্য?”

এ পর্যায়ে রেগে গেল নিদ্রা নিজেও। উঠে দাঁড়িয়ে ধমকে উঠল সে,

“জাওভান, মুখ সামলে কথা বল।”

“কী মুখ সামলে কথা বলব হ্যাঁ? যা বলছি ভুল তো বলছি না। এক রিদম রিদম করে করে নিজের জীবনটা নষ্ট করছিস।”

“জাওভান স্টপ।”

নিদ্রা আবারো ধমকাল। জাওভান থামল না। বরং নিজেও উঠে দাঁড়াল। আজ তার কী হয়েছে সে নিজেও জানে না। আর না জানে নিদ্রা।

“তুই একটা সেলফিশ নিদ্রা, তুই নিজেকে ছাড়া আর কাউকে নিয়ে ভাবিস না। কাউকে বুঝিস না, বোঝার চেষ্টাও করিস না। কে তোকে ভালোবাসল, কে তোকে গুরুত্ব দিল সেসব কখনোই তোর কাছে মেটার করে না। মেটার করে শুধু এক রিদম। শালা মরে গিয়েছে তবুও তার প্রতি তোর আবেগ শেষ হয় না।”

নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাল নিদ্রা। চড় বসিয়ে দিল জাওভানের গালে। ছেলেটা কাঁপছে রাগে। গালে হাত দিয়ে সে তাকাল নিদ্রার মুখপানে। মেয়েটার চোখ দুটো অশ্রুজলে টইটম্বুর। জাওভানের গালে চড়টা পড়ার শব্দে কয়েক সেকেন্ডের জন্য চারপাশটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল।নিদ্রা নিজেও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না সে কী করেছে। তার হাতটা এখনো মাঝ আকাশে কাঁপছে।

আর জাওভান? সে স্থির দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দুটো অস্বাভাবিক লাল হয়ে আছে তার। চোয়াল শক্ত। এমন জাওভানকে কেউ কখনো দেখেনি। না নিদ্রা। না অন্য কেউ। আভিয়ান একটু দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছে। কিন্তু এগোল না সো। একটুও না। বরং দুই হাত পকেটে গুঁজে নির্বিকার মুখে দাঁড়িয়ে আছে। কারণ সে জানে। আজকের এই বিস্ফোরণটা বহু বছরের জমে থাকা আগুন।

এটা থামানো উচিত নয়। জাওভান ধীরে ধীরে মুখ তুলল। ফ্যাকাসে হাসল সে। অদ্ভুত সেই হাসি। যে হাসিতে ব্যথা আছে, অসহায়ত্ব আছে,নিজের উপর ঘৃণা আছে।

“বাহ! ভালোই করেছিস, এটা আমার পাওনা ছিল। আসলেই পাওনা ছিল।”

নিদ্রার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে পানি। সে কী করল। এত বছরের বন্ধত্ব, এই প্রথম এমন ঘটনা ঘটল। বহুবার রাগারাগি, মান অভিমান হলেও জল এ পর্যন্ত গড়ায়নি।

“জাওভান…”

“না।”

কর্কশ স্বরে থামিয়ে দিল সে।

“একটা কথাও বলবি না।”

কয়েক সেকেন্ড চুপ রইল জাওভান। পরপর নিজের চুলে হাত চালিয়ে হঠাৎ গালি দিল নিজেকেই।

“ধুর শালা! কী দরকার ছিল এসব বলার? কী দরকার ছিল? আমি আসলেই একটা বেহায়া, মাদা***।”

মাথা নত করে হাসছে জাওভান। নিজের গাল থেকে হাত সড়িয়ে বলে উঠল,

“আমি নিজেই একটা ইডিয়ট।”

নিদ্রা হতভম্ব। জাওভান তাকাল তার দিকে। বহু বছরের জমে থাকা ক্লান্তি প্রকাশ পেল তার চোখে।

“জানিস নিদ্রা? মানুষের সবচেয়ে বড় বোকামিটা কী?”

নিদ্রা কিছু বলল না। জাওভান নিজেই উত্তর দিল।

“অপেক্ষা। যে জিনিসটার কোনো নিশ্চয়তা নেই, সেটার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করা। কিন্তু সমস্যা হলো আমি অপেক্ষা করতে খুব পছন্দ করি।”

জাওভানের গলার স্বরটা ভেঙে গেল শেষের দিকে। সে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিল। হয়তো চাইছে না কেউ তার চোখের ভাষা পড়ে ফেলুক। সে তাকাল আভিয়ানের দিকে।

“চললাম।”

আভিয়ান শান্ত স্বরে ডাকল,

“জাওভান।”

“হুম?”

“বাইক আস্তে চালাবি।”

জাওভান তিক্ত হেসে মাথা নাড়ল।

“কই মাছের জান আমার, বেহায়াপনা করার জন্য হলেও বেঁচে থাকব।”

বলেই ঘুরে দাঁড়াল সে। দ্রুত হাঁটতে লাগল। কেউ তাকে আটকানোর চেষ্টা পর্যন্ত করল না। নিদ্রা স্থির দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে তার। কী হলো একটু আগে? কেন হলো? মাথার ভেতর কিছুই কাজ করছে না। সে ধীরে ধীরে আভিয়ানের দিকে ফিরল।
কাঁপা গলায় বলল,

“আভি…”

“হুম?”

“দেখলি? জাওভান আমার সাথে এমন আচরণ করল।আমি… আমি কখনো ভাবিনি।”

কিছুক্ষণ চুপ করে রইল আভিয়ান। দৃষ্টি জোড়া ফিরিয়ে নিলো অদূরে। সময় নিয়ে বলল,

“আমিও ভাবিনি।”

নিদ্রা ভেজা চোখে তাকাল।

“তুই কি ওর পক্ষ নিচ্ছিস?”

“না।”

“তাহলে?”

আভিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। জবাব দিল,

“আমি শুধু ওকে বুঝতে পারছি।”

নিদ্রা ভ্রু কুঁচকাল।

“মানে?”

আভিয়ান মাটির দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর শান্ত স্বরে বলল,

“ধর একটা মানুষ, যে কোনোদিন কিছু চায়নি। কিছু দাবি করেনি। কিছু কাড়তে যায়নি। শুধু দূর থেকে দেখেছে। অপেক্ষা করেছে বছরের পর বছর। তবে মানুষতো, কে আর কতটা অপেক্ষা করে যেতে পারে? একসময় অপেক্ষাটাও ক্লান্ত হয়ে যায়, নিদ্রা।”

নীরবতা নেমে এলো দুজনের মাঝে। নিদ্রার বুকের ভেতরে হুট করেই বাসা বাঁধল অস্বস্তি।

“তুই কী বলতে চাচ্ছিস?”

আভিয়ান ঘুরে তাকাল নিদ্রার দিকে। অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,

“রিদমকে ভালোবাসাটা ভুল ছিল না। আজও তাকে মনে রাখাটাও ভুল না। কিন্তু কবরের মানুষ কখনো ফিরে আসে না।”

নিদ্রার চোখ ভিজে উঠল আবার। আভিয়ান নরম গলায় বলল,

“আর না জীবন থেমে থাকে। আমরা থেমে থাকলেও জীবন কখনোই থেমে থাকে না। সময়ও না। তুই কি জানিস সবচেয়ে কষ্টের কী?”

ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাল নিদ্রা। শুধালো,

“কী?”

“যখন কেউ তোর জন্য থেকে যায়। আর তুই সেটা বুঝতেই পারিস না।”

বুকটা ধক করে উঠল নিদ্রার। আভিয়ান মৃদু হাসল। হাত রাখল নিদ্রার কাঁধে,

“সবাই জাওভানের মতো হয় না, সবাই তোর কঠিন সময়ে তোর পাশে থাকেনি। কেউ কারণে অকারণে তোর এক ডাকে ছুটে আসেনি জাওভানের মত। এমনকি আমিও না। তুই নিজেও জানিস জাওভান কোন প্রকৃতির মানুষ। বাইরে থেকে ও রঙিন হলেও ভেতর ভেতর ও ঠিক কতটা বেরঙিন। সবচেয়ে বড় কথা তুই কখনোই ওর না বলা অনুভূতি বুঝিসনি, আর না জাওভান কাউকে বুঝতে দিয়েছে। কেউ কেউ ভালোবাসার কথা বলে। কেউ আবার বছরের পর বছর কিছু না বলেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। কারণ তারা ভয় পায়। হারানোর ভয়।”

নিদ্রা আর কিছু বলতে পারল না। চোখের জল গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। আজ হঠাৎ করেই অনেকগুলো ঘটনার মানে বদলে যাচ্ছে। অনেকগুলো স্মৃতি নতুন অর্থ পাচ্ছে।
জাওভানের অকারণ খোঁজ নেওয়া। তার রাগ। তার অধিকারবোধ। তার অপেক্ষা। সবকিছু। জাওভানের মত করে তো তাকে কেউ বোঝেনি। তাই তো সবার আগেই নির্দ্বিধায় সে নিজেও ছুটে যেত জাওভানের কাছে। আভিয়ান পকেট থেকে সিগারেট বের করল। তবে জ্বালাল না। আঙুলে ঘুরাতে লাগল আপন মনে। বলল,

“মুভ অন করা মানে অতীতকে ভুলে যাওয়া না। মুভ অন করা মানে জীবিত মানুষদের একটা সুযোগ দেওয়া। আর
নিজেকেও।”

চোখ বন্ধ করে নিল মেয়েটা। তার ভালো লাগছে না কিছু। বুকের ভেতর ব্যথা করছে, বড্ড বেশি অস্থির লাগছে। ধপ বসে পড়ল নিদ্রা।

“আমি কি এতটাই অন্ধ ছিলাম, আভি?”

আভিয়ান আকাশের দিকে তাকাল। মেঘের ফাঁক দিয়ে আলো পড়ছে নিচে। সে শান্ত গলায় বলল,

“না। তুই শুধু তাকিয়ে ছিলি পেছনে। তাই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে কখনো দেখতেই পারিসনি।”

“আমি এত বোকা! কবে? কীভাবে? জাওভান….”

এলোমেলো তার বাক্য, কিছুই বলতে পারছে না গুছিয়ে। তবে বুঝে নিল আভিয়ান। হেসে বলল,

“সে ছিল তোর শুরু থেকেই, শুধু তুই বুঝিসনি। যাইহোক , নিজেকে এবার সব কিছু থেকে বের কর। আমি বলব না তুই জাওভানকে বোঝ, তবে আমি চাই তুই আগে নিজেকে সুযোগ দে। আর জানি তুই পারবি।”

নিদ্রা কিচ্ছুটি বলল না। দীর্ঘক্ষণ কাটল ওভাবেই। অতঃপর উঠে দাঁড়াল নিদ্রা। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,

“আমি বাড়ি যাচ্ছি।”

আটকাল না আভিয়ান। নিদ্রা প্রস্থান করল। সিগারেটটা অবশেষে ঠাঁয় পেল আভিয়ানের ঠোঁটে। হাসি ফুটল অধরজুড়ে। বিড়বিড় করে আওড়াল,

“ভাঙাচোরা হৃদয় আবারো যাক জুড়ে, মিঠা রোদ হাতছানি দেক ঝরা শিউলির দিনে।”

___

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ঈদের দিনের সেই চিরচেনা অলস বিকেল। রোদটা আর তেমন তেজি নেই। পশ্চিম আকাশে সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়েছে।নিজের ঘরের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে অপরূপা।
আজ সে পরেছে গাঢ় বেগুনি রঙের একটি শাড়ি। খুব বেশি জাঁকজমক নয়, তবুও অদ্ভুত সুন্দর। হালকা কাজ করা পাড়। চুলগুলো খোলা রেখে একপাশে টেনে দিয়েছে।

চোখে সামান্য কাজল। ঠোঁটে হালকা রঙ। এর বেশি কিছু নয়। তবুও আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেরই কেমন অচেনা লাগছে। দাওয়াতে যাবে সে। বান্ধুবীর বিয়ের দাওয়াত। যদিও বা ঈদের দিন হওয়ায় যেতে ইচ্ছে করছিল না একদমই। আজ পরিবারের সাথে সময় কাটানোর দিন। তবে গতকাল গায়ে হলুদে যেতে পারেনি বলে এমন অভিমান করেছে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপরাধ করে ফেলেছে অপরূপা। কমপক্ষে বিশবার ফোন করেছে। তার মা বাবাকে দিয়েও ফোন করিয়েছে।

শেষ পর্যন্ত আর না করার উপায় ছিল না। না গেলে বিষয়টা খারাপ দেখায়। যাওয়া, দেখা করা, কিছুক্ষণ থাকা তারপর ফিরে আসা। এই পরিকল্পনাই করেছে সে। তবে হিন্দুদের বিয়ে তো রাতেও হয়। কে জানে আবার থেকে যেতে হয় কি-না । সব গুছিয়ে নিয়ে পিহুর হাত ধরল অপরূপা। বলল,

“চলো।”

পিহু ঘুরে দাঁড়াল। দুজনেই বেরিয়ে এলো। আমেনা বেগমের ঘরে ঢুকতেই তিনি তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন,

“যাচ্ছিস?”

“হ্যাঁ মা।”

“রাতে থাকবি নাকি?”

অপরূপা মাথা নাড়ল।

“ফিরে আসার চেষ্টা করব। দেখি গিয়ে।”

ঠিক তখনই লুপা ভেতরে ঢুকল। হাতে ট্রে। অপরূপা তাকিয়ে বলল,

“তুমি বাপের বাড়ি যাবে না?”

লুপা হাসল। বলল,

“দুদিন পর যাব আপা। কাল তো আপনার ভাই কুমিল্লা কাজে যাবে।”

“আজই গেলে তো পারো। ঈদের দিন মা-বাবার সাথে দেখা করে এসো।”

লুপা মাথা নেড়ে বলল,

“না না, থাকুক। আপনি সাবধানে যান।”

অপরূপা মৃদু হাসল।

“আচ্ছা।”

আর কথা বাড়াল না অপরূপা। বেরিয়ে এলো সে ঘর থেকে। ঠিক তখনই দরজার সাথে বেঁধে হোঁচট খেতে নিল সে। পেছন থেকে আমেনা বেগম আওয়াজ তুললেন,

“এই সাবধানে দেখে হাঁট।”

নিজেকে সামলে নিল অপরূপা। এক পলক তাকাল মায়ের দিকে। বুকটা কেমন ধুকপুক করছে। যাওয়ার সময়ই হতে হলো এমনটা। মনটা কেমন কু ডাকল। অস্থির লাগছে হুট করেই। পিহু চোখ পিটপিট করে ডাকল,

“মাম্মা চলো।”

অপরূপা মাথা দুলাল। শেষ বারের মত মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমি না আসতে পারলে কল করবনি। চিন্তা করো না। ভাইয়াকেও বলে দিও চিন্তা না করতে।”

আমেনা বেগম হেসে মাথা দুলালেন। অপরূপা লম্বা শ্বাস নিয়ে অবশেষে পা বাড়াল বাইরে। মেয়েটার হাতটা ধরে হাঁটা ধরল। পিহু হাসি মুখে পেছনে তাকিয়ে লুপা ও আমেনা বেগমকে হাত নেড়ে বিদায় জানাল। অতঃপর কিছু মুহূর্তের মাঝেই তারা মিলিয়ে গেল দৃষ্টিসীমানা ছেড়ে।

_________

#চলবে