Home "ধারাবাহিক গল্প খুঁজেছি তোকে খুঁজেছি তোকে পর্ব-০৬

খুঁজেছি তোকে পর্ব-০৬

0
344

#খুঁজেছি_তোকে (০৬)
#ছনিয়া_তাবাচ্ছুম_অনি

নূরা সারা রুম জুড়ে অস্থির হয়ে পায়চারি করছে। একটু পরেই সবাই চৌধুরী বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হবে। অথচ সে এখনো রেডি হয়নি। স্বপ্না বেগম সেই সকালে তাকে ব্ল্যাক কালারের শাড়ি আর ম্যাচিং কিছু জুয়েলারি দিয়ে গেছেন। এমন নয় যে সে শাড়ি পড়তে পারে না। খুব ভালো না হলেও মোটামুটি ভালোই পড়তে পারে। অন্তত মানুষের সামনে তো যাওয়া যায়। কিন্তু সমস্যা এখানে নয়। সে কিছুতেই চৌধুরী বাড়ি যেতে চাই না। সেখানে গেলেই তাকে নানান প্রবলেম ফেস করতে হবে । নূরা’র এখন হাত পা ছড়িয়ে খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কেন সে বাড়ি ফিরলো। আর দু’দিন পরে ফিরলে তো তাকে সামির দের বাসায় যেতো হতো না। নূরা পায়চারি করে করে খাটে গিয়ে বসল। তখনই নূরা’র রুমে টুকা পরে। দরজার বাইরে থেকে সুলাইমান আহমেদ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

“- নূরা আসবো ?

নূরা বাবা’র গলা পেয়ে চমকে উঠল। ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে বলল,

“- আসো৷

সুলাইমান আহমেদ নূরা’র রুমে ঢুকে নূরা কে দেখলেন। নূরা মাথা নিচু করে বসে আছে। নূরা এখনো তৈরি হয়নি দেখে সুলাইমান আহমেদ রেগে যান। তবে মেয়ের কথা ভেবে নিজের রাগ দমন করে নরম গলায় বললেন,

“- এখনো তৈরি হওনি কেন?

নূরা আড়চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে মিনমিন গলায় বলে,

“- না গেলে হয় না বাবা?

সুলাইমান আহমেদ তীক্ষ্ণ চোখে মেয়ে কে দেখলেন। তারপর বললেন,

“- চৌধুরী বাড়ি যেতে প্রবলেম কোথায় তোমার?

নূরা উত্তর দিলো না। চুপ করে রইল। সুলাইমান আহমেদ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

“- দশমিনিটের মধ্যে তৈরি হবে। কোনো রকম অযুহাত দেখাবে না৷ তোমার আম্মুকে পাঠিয়ে দিচ্ছি তোমাকে তৈরি করে দেওয়ার জন্য। চুপচাপ ভদ্র মেয়ের মতো রেডি হবে।

বলে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন সুলাইমান আহমেদ। তিনি যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে নূরা’র মা আসেন। নূরা কে কাঁদো কাঁদো মুখে বসে থাকতে দেখে তিনি মনে মনে হাসলেন। তারপর বললেন,

“- জলদি ওঠ। সবাই নিচে তোর জন্য অপেক্ষা করছে।

নূরা ঠোঁট উল্টে মা’য়ের দিকে তাকায়। স্বপ্না বেগম হেঁসে বললেন,

“- এভাবে তাকিয়ে কোনো লাভ হবে না মা। বাবা যখন বলেছে তখন তো যেতেই হবে। আর বড়ো কথা চৌধুরী বাড়ির সবাই জানে তুই যাবি। সেখানে এখন না গেলে কি করে হয় বল? আমাদের একটা সম্মান আছে না।

নূরা অবাক হয়ে বলল,

“- আমি যাবো কে বলেছে মা?
“- তোর বাবা।

“- জানিস,তোর শশুর শাশুড়ী সবাই খুশি হয়েছেন। এমনকি সামির তোর জন্য এসব শাড়ি চুড়ি পাঠিয়েছে।

নূরা অবাক হয়ে শাড়ি চুড়ির দিকে তাকালো। সামির স্যার তার জন্য এসব পাঠিয়েছে ভেবে অবাক হলো নূরা। না গেলে হবে না বোঝা হয়ে গেছে নূরা’র। তাই চুপচাপ ভদ্র মেয়ের মতো তৈরি হয়ে নিলো।

,,
,
,

চৌধুরী বাড়ি আজ রঙিন রঙে সেজে উঠেছে। নূরা এই প্রথম চৌধুরী বাড়িতে পা রাখছে। আগে কখনো আসা হয়নি। তার পরিবারের সবাই আসলেও সে কখনো আসেনি। কখনো ইচ্ছে হয়নি আসার। নূরাদের গাড়ি এসে থামে চৌধুরী বাড়ির গেইটে। ড্রাইভার গাড়ি পার্কিং লটে রেখে আসে। সকলে চৌধুরী বাড়ির গেইট দিয়ে প্রবেশ করে।

গেইটের সামনে বড়ো বড়ো অক্ষরে লেখা চৌধুরী ভিলা। নূরা মনে মনে কয়েক বার আওড়ালো। নূরা ভেতরে যত যাচ্ছে তত অবাক হয়ে চারপাশ দেখছে। কত্ত সুন্দর পরি পার্টি সবকিছু। গেইট বরাবর সোজা একটা রাস্তা গেছে। সেটা দিয়েই চৌধুরী বাড়ির ভিতরে প্রবেশ। ছোট্ট চিকন সরু রাস্তার দু’পাশ দিয়ে বিভিন্ন রকমের গাছগাছালি লাগানো। একপাশে হরেক রকম ফুলের গাছে। ফুল গাছের সামনে একটা দোলনা রাখা। দুই তালা বাড়ি টা মিউজিক দিয়ে সাজানো।

আহমেদ বাড়ির সবাই চৌধুরী বাড়ির সদর দরজা পেরিয়ে ভিতরে ঢোকে। নূরা বাবা’র পাশে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে। আহমেদ বাড়ির সবাই কে দেখে এগিয়ে আসেন আলতাফ চৌধুরী আর সামির । সুলাইমান আহমেদ বেয়াই য়ের সাথে হ্যান্ডশেক করে কুশল বিনিময় করলেন। সামির শশুর বাড়ির সবার সাথে হেসে হেসে কথা বলছে।

এসব কিছুর মধ্যে নূরা’র অবস্থা খারাপ। নূরা কে অস্বস্তিতে জেকে বসেছে। নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে বেশ হিমশিম খায়। নূরা ভদ্রতার খাতিরে শশুর কে দেখে বলে,

“- আসসালামু আলাইকুম আঙ্কেল, ভালো আছেন?

আলতাফ চৌধুরী বৌ’মা কে দেখে হাসি মুখে বলেন,

“- ওয়ালাইকুম আসসালাম। আলহামদুলিল্লাহ তোমাকে দেখে আরও বেশি ভালো হয়ে গেছি মা। তুমি কেমন আছো?

নূরা মুচকি হেঁসে বলল,
“- জ্বি আলহামদুলিল্লাহ!

নূরা আর কিছু বলল না। চুপ করে গেলো। নূরা পাশে তাকাতেই সামিরের সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল। নূরা দ্রুত চোখ সরিয়ে নিলো। সামির নূরা’র দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। নূরা বুঝতে পারছে সামির ওর দিকে তাকিয়ে আছে। গভীর দৃষ্টিতে ওকে পরখ করছে। ভেবেই নূরা’র আনইজি ফিল হয়। নূরা আড়চোখে আবার তাকায়। আবারও দু’জনের চোখাচোখি হয়ে যায়। নূরা কিছু টা সরে গিয়ে সায়নের পিছনে গিয়ে দাড়ায়। যা দেখে সামির মনে মনে হাসল। এই ভেবে যে মেয়ে টা লজ্জা পেয়ে তার সামনে থেকেই সরে গেলো। আসলে নূরা কে ব্ল্যাক শাড়িতে অসম্ভব সুন্দর লাগছে। ফর্সা গায়ে কালো শাড়িটা যেন একটু বেশিই মানিয়েছে। সামির মুগ্ধ চোখে নূরা কে দেখছিল। চাইলেও নূরা’র থেকে চোখ সরাতে পারছিল না। তাই লাজলজ্জা রেখে নূরা’র দিকে চেয়ে ছিল। কিন্তু মেয়ে টা সামনে থেকে সরে গিয়ে পিছনে দাঁড়ালো ভেবেই মেজাজ গরম হয়ে গেলো সামিরের।

সামির আজ ব্ল্যাক কালারের শুট বুট পড়েছে। নূরা র সাথে ম্যাচিং। এদিকে বোকা নূরা এখনো কিছু টেরই পায়নি।

সায়ন ভ্রু কুঁচকে নূরা’র দিকে তাকিয়ে আছে। নূরা ইশারায় জানতে চাইল কি হয়েছে? এভাবে তাকিয়ে আছো কেন? সায়ন দুষ্টু হেঁসে বলল,

“- আমি কিন্তু সব দেখেছি নূরা বুড়ি!

সায়ন সবসময় আদর করে নূরা কে নূরা বুড়ি নামেই ডাকে। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। সায়নের কথা শুনে চমকে উঠল নূরা। নিজেকে স্বাভাবিক করল। তবুও কথা বলার সময় কথাগুলো জড়িয়ে গেলো।

“- কি দেখছো?

“- দু’জনের চোখাচোখি। আহ্ কি মুগ্ধ দৃষ্টি!

নূরা ভাইয়ের কথা শুনে লজ্জা পেয়ে গেলো। লজ্জায় মাথা নুইয়ে নিলো। সায়ন হেঁসে বলল,

“- থাক আর লজ্জা পেতে হবে না৷

,

,

নিহাল বন্ধু কে গুতা দিয়ে বলল,
“- সবার সামনে আমার বোনকে এভাবে লজ্জা না ফেললেও পারতি। শালা কোনো দিব মেয়ে মানুষ দেখিসনি। এভাবে হ্যাবলার মতো চেয়েছিলি কেন?

সামির আনমনে বলল,

“- মেয়ে দেখেছি কিন্তু বউ তো দেখিনি।

সামিরের কথা’য় নিহালের মাথায় হাত। বেচারা নিহাল সামিরের থেকে কোনো দিন সোজাসুজি জবাব পায় না। সবসময় এই ব্যাটা তাকে ত্যাাড়া ত্যাড়া জবাব দেয়।

,
,
,

চৌধুরী বাড়ির বড়ো বউ এসেছে। কথাটা যে ঝড়ের গতিতে সবার কাছে পৌঁছে গেলো। সবাই যখন শুনেছে সামিরের বউ এসেছে তখন থেকে শুরু করে এখনো পর্যন্ত নূরা কে সবাই দেখতে আসছে। এত এত মানুষের ভিড়ে নূরা’র যায় যায় অবস্থা৷

কিছুক্ষণ আগেই সামিরের বোন সামিয়ার এনগেজমেন্ট সম্পূর্ণ হয়েছে। নূরা ননদের কাছেই বসে ছিল। নূরা থাকতে চাইনি। সামিয়া জোর করে ভাবি কে নিজের কাছে রেখেছে। তারপর আবার অচেনা মানুষ নিজেকে দেখতে আসায় খুব বিরক্ত হচ্ছে নূরা।কিন্তু শশুর বাড়ি বলে কিছু বলতে পারছে না। মুখ বুজে হাসি মুখে সব সহ্য করে নিতে হচ্ছে।

সামিয়া আর তার উডবি হ্যাজবেন্ড এর ছবি তোলার জন্য ফটোগ্রাফার আসে। ফটোগ্রাফার কে দেখে নূরা সরে আসে। কিন্তু যেতে পারে না। সামিয়া হাত ধরে টেনে নিজের কাছে দাড় করিয়ে বলে,

“- কোথায় যাচ্ছো ভাবি? কোথাও যেতে হবে না। তোমার সাথে ছবি উঠাবো।

নূরা হালকা হেঁসে বলে,

“- এসবের কোনো দরকার নেই সামিয়া। তুমি ভাইয়ার সাথে ছবি তোলো।

সামিয়া হেঁসে বলল,
“- সে তো তুলবোই কিন্তু তোমার সাথেও।

নূরা কি করবে ভেবে পেলো না। নূরা’র ভাবনার মাঝেই অনুভব করল ঠান্ডা একটা হাত তার কোমড় জড়িয়ে ধরেছে। নূরা ভয়ে চমকে তাকালো মানুষটার দিকে।

চলবে~