Home "ধারাবাহিক গল্প হৃদয় হারানো বিজ্ঞপ্তি হৃদয় হারানো বিজ্ঞপ্তি পর্ব-০৩

হৃদয় হারানো বিজ্ঞপ্তি পর্ব-০৩

0
832

#হৃদয়_হারানো_বিজ্ঞপ্তি
#পর্ব_৩
#Tahmina_Akhter

৩.

— কে কি বললো তাতে আমার কিছুই যায় আসে না। আমি শুধুই তোর কাছ থেকে সত্যিটা শুনতে চাই নির্বাণ।

— চোখের সামনে যা দেখতে পাচ্ছিস সেটাই সত্যি। আমি বললে নিশ্চয়ই কিছু বদলে যাবে না?

ভীষণ হেয়ালি হয়ে খেয়ার উত্তর দেয় নির্বাণ। খেয়া নিজের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারছে না। ধুপ করে খাটে বসে পরলো। কথায় আছে মানুষ অল্প শোকে কাতর,, অধিক শোকে পাথর হয়। খেয়ার বেলায় ঠিক তাই হলো। খেয়া যেন এই পৃথিবীতে থেকেও নেই। এতবছরের ভালোবাসা এভাবে…

দুইচোখে এক আকাশ সমান অভিযোগ নিয়ে খেয়া নির্বাণকে প্রশ্ন করলো,,,

— আমাকে ভালোবাসিস না নির্বাণ?

খেয়ার প্রশ্ন শুনতে পাচ্ছে নির্বাণ। কিন্তু,, ভান ধরলো যেন সে শুনতেই পায়নি। কিন্তু,, নির্বাণের মন তো জানে খেয়ার এই একটিমাত্র প্রশ্ন শুনে নির্বাণ ভেতর থেকে কতটা ভেঙে পরেছে! মনে হচ্ছে যেন কারো সুখের দিকে না তাকিয়ে কেবল নিজের ভালোবাসার দিকে তাকিয়ে থাকুক। বুকের মাঝে আগলে ধরুক নিজের ভালোবাসাকে। যেই ভালোবাসাকে নিজের বুকের মধ্যে নেয়ার জন্য কত রাত কেবল নির্ঘুম কাটিয়ে দিয়েছে সেই ভালোবাসাকে এভাবে হারিয়ে যেতে দেয়া যায়?

— হাহ্,, সব বুঝতে পেরেছি রে আমি নির্বাণ। তুই আমাকে ভালোবাসিসনি। যদি ভালোবাসতি না তাহলে আমাকে অপদস্ত হেয় করতি না। তোর বৌ হওয়ার জন্য আমি লাল শাড়ি পরে বৌ সেজে অপেক্ষা করছিলাম। আমি ভেবেছিলাম পৃথিবীর সব বর যেমন করে শেরওয়ানি পরে, মাথায় পাগড়ি পরে নববধূকে নিতে আসে ঠিক সেভাবে বুঝি তুইও আমাকে নিতে আসবি। সেই তুই এলি। কিন্তু,, তুই আমাকে নিতে আসিসনি। তোকে এতটা ভালোবাসার পুরুষ্কার আজ আমাকে এভাবে দান করলি নির্বাণ!

এরপর,, খেয়ার আর কোনো কথাই শোনা গেলো না৷ মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকা নির্বাণ তখনও অপেক্ষা করছিল এই বুঝি খেয়া কিছু বলবে। কিন্তু, না মিনিট পাঁচেক অতিক্রম হবার পরও যখন খেয়ার কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। তখন নির্বাণ মাথা উঁচু করে তাকিয়ে দেখলো খেয়া খাটের ওপর শুয়ে আছে। কিন্তু,, আট দশটা স্বাভাবিক মানুষের মতো নয়। নির্বাণ দৌঁড়ে যায়। খেয়ার গালে একহাত রাখে ওকে ডাকে কিন্তু খেয়া সাড়া দেয় না। নির্বাণ এবার ভয় পাচ্ছে। খেয়াকে হারানোর ভয়। তড়িঘড়ি করে রুমের দরজা খুলে। দরজা খুলতেই দেখতে পেলো বাড়ির সব সদস্যই বন্ধ দরজার ওপারে অবস্থান করছিলো। আপাতত সেদিকে খেয়াল নেই নির্বাণ। এমনসময় ভেতর থেকে খেয়ার আওয়াজ পাওয়া যায়। নির্বাণ দৌঁড়ে যায়। নির্বাণের পিছে পুরো পরিবার।

খাটের কিনারায় দাঁড়িয়ে খেয়ার মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে আছে নির্বাণ। কি থেকে কি হয়ে গেলো?? আজকের দিনটা অন্যরকম হতে পারত ওদের দুজনের কিন্তু…

—- নির্বাণ???

খেয়ার ডাক শুনে নির্বাণ খেয়ার দিকে তাকায়। খেয়া চোখের ইশারায় নির্বাণকে পাশে এসে বসতে বললো। খেয়ার মা-বোন কাঁদছে। পুরো পরিবারের মাঝে যেন শোকের ছায়া পড়েছে। রোকসানা রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দেখছে সবকিছু। নির্বাণ ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। খেয়ার শিয়রের কাছে গিয়ে বসে। খেয়া মুচকি হাসি দেয়। নির্বাণের হাতের ওপর ডানহাতটি রাখলো। নির্বাণ খেয়ার হাতের দিকে তাকাতে পারে না কারণ ওর চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। শার্টের হাতায় চোখের পানি মুছে ফেলে।

— খুব শখ ছিল রে তোর বৌ হবার নির্বাণ। সেই শখ বুঝি আর পূর্ণ হবে না। আমি চেয়েছিলাম তোকে নিয়ে বাঁচতে কিন্তু তুই দিলি না। আমি কিন্তু তোকে অভিশাপ দেব না। কিন্তু তোকে না ভালোবেসে থাকতেও পারব না। আমি মরে গেলেও তোর,, যতক্ষণ বেঁচে থাকব ততক্ষণ অব্দি শুধুই তোর। আমি তোকেই ভালোবাস…

কথাটি পূর্ণতা পাওয়ার আগে খেয়া চুপ হয়ে যায়। নির্বাণ ঝাপসা নয়নে তাকায় খেয়ার দিকে খেয়া পলকহীন চোখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ঠিক যেমন করে সবসময় তাকিয়ে থাকত। এমন সময় কান্নার শব্দ ছাপিয়ে গেছে পুরো বাড়ি জুড়ে। সবার মুখে এখন একটাই কথা,,

“আহারে খেয়া অকালে মরে গেল! ”

না আর সহ্য করতে পারছে না নির্বাণ। চিৎকার করে কেঁদে উঠে।

— খেয়া রে আমি তোকে ছাড়া কি করে বাঁচব?? তুই ফিরে আয় না দোস্ত। ট্রাস্ট মি আমি তোকেই বিয়ে করব।

বিলাপের সুরে কাঁদছে নির্বাণ।

— নির্বাণ দরজা খোল। কি হয়েছে কাঁদছিস কেন?? এই নির্বাণ কি হয়েছে বাপ? খারাপ স্বপ্ন দেখেছিস?

কারো ডাক শুনে নির্বাণের স্বপ্ন জগত থেকে ফিরে আসে। চোখ খুলে তাকাতেই চোখের সামনে সাদা রঙের সিলিংফ্যানটাকে ঘুরতে দেখে। ঘেমে জবজব হয়ে উঠেছে নির্বাণের শরীর। গা থেকে একঝটকায় চাদর সরিয়ে দেয়। বেডসাইড টেবিল থেকে পানির গ্লাসটি নিয়ে পানিটুকু খেয়ে নেয় নির্বাণ।

— নির্বাণ ঠিক আছিস তুই??

রোকসানা ছেলেকে অনবরত ডেকেই চলেছেন।

— মা, আমি ঠিক আছি। তুমি চলে যাও।

নির্বাণ এতটুকু কথা বলে মোবাইলটা হাতে নেয়। রাত দু’টো বাজে । এতক্ষণ যা কিছু ঘটেছে সবটুকু তবে নিছক স্বপ্ন ছিল! নির্বাণের দাদি বলতো গভীর স্বপ্ন নাকি বাস্তবে ঘটে। তারমানে এখন গভীর রাত। এখন যে স্বপ্নটা দেখলো তা যদি বাস্তব জীবনে ঘটে তাহলে নির্বাণ স্রেফ মরে যাবে। যে যা যতই বলুক খেয়াকে ছাড়া নির্বাণের অস্তিত্ব নেই। টিশার্টের হাতায় কপালের ঘাম মুছে খেয়ার নাম্বারে কল দিলো নির্বাণ।

— হ্যালো…

— কেমন আছিস খেয়া??

— তুই এত রাতে কল করেছিস এটা জিজ্ঞেস করার জন্য যে আমি কেমন আছি? আমাদের না বারোটা বাজে কথা হলো তখনি তো বললাম,, আমি ভালো আছি।

খেয়ার ঘুম ঘুম ভাবে বলা কথাগুলো মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় শুনছে নির্বাণ। খেয়াকে হারানো যাবে না তা যে যেকোনো মূল্য হোক না কেন?? এমন গভীর রাতে খেয়ার সঙ্গে কথা বলার জন্য হলেও ওকে প্রয়োজন নির্বাণের।

কি মনে করে নির্বাণ আজ খেয়াকে বলেই ফেললো,,,

— I Love You kheya ❤️। তোকে আমি ভালোবাসি। নিজের চাইতে অনেকগুণ বেশী।

মোবাইলের ওপাশে থাকা খেয়া ভীষণ লজ্জা পেয়ে কাঁথার নিচে মুখ লুকিয়ে রাখে। প্রতিউত্তরে যে “নির্বাণকে ভালোবাসি” বলতে হবে তা ভেবেই খেয়া লজ্জায় লাল হয়ে কল কেটে দেয়। নির্বাণ হেসে ফেললো। কারণ,, খেয়া ভীষন লজ্জা পেয়ে যায় যখন নির্বাণ তাকে ” ভালোবাসি” শব্দটি বলে। বিয়েটা খালি একবার হোক তখন হাত পা বেঁধে চোখের সামনে বসিয়ে ইচ্ছমতো “ভালোবাসি” বলবে। তখন দেখা যাবে খেয়ার ওত লজ্জা কই লুকিয়ে রাখে?

*****—**-*****–*-******

ভোরের আলো কেবল ফুটেছে তখন। ফায়েজ কালো শার্ট,, ব্লু জিন্স প্যান্ট পরে তৈরি হয়ে হাতে ট্রলি ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। ড্রইংরুমে বসে অপেক্ষা করছিলেন রোকসানা কারণ ফায়েজকে যে বিদায় জানাতে হবে। ফায়েজ নেমে আসে নীচে। রোকসানা এগিয়ে যায় সিঁড়ির দিকে ছেলেকে দেখে। ফায়েজ ট্রলি ব্যাগ এক সাইডে রেখে ওর মায়ের হাত ধরে বললো,,,

— কবে ফিরবি??

— যেদিন সব ভুলে যাব।

— দোয়া করি সব ভুলে যেন তুই আমার সেই আগের ফায়েজ হয়ে যাস। যাকে নিয়ে আমার কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না।

ফায়েজ হাসে। মা তো জানে না ফায়েজ চাইলেও খেয়াকে ভুলতে পারে না। যখনি খেয়াকে ভুলতে চায় ঠিক তখনি মস্তিষ্ক তার সাথে গেম খেলে। মস্তিষ্কের সাথে আর পেরে উঠতে পারে না ফায়েজ। সেই খেয়ার ভাবনায় আবারও তলিয়ে যায়।

ফায়েজ ধীরে ধীরে বের হয়ে আসে বাড়ি থেকে। হয়তো আর কখনোই ফেরা হবে না এই বাড়িতে।।।।

সকাল আটটা,,,

—- ভাই নিশ্চয়ই আমার ওপর অভিমান করে চলে গেছে তাই না মা??

— বেশি বুঝিস। ওর ছুটি শেষ তাই চলে গেছে। তুই তোর কথা ভাব একটুপর বরযাত্রী রওনা হতে হবে জানিস তো??

— সবই জানি মা। কিন্তু ভাই??

— তুই কি চেয়েছিলি তোর ভাইকে কষ্ট দিতি??

— এসব তুমি কি বলছো মা??

অবাক হয়ে প্রশ্ন করে নির্বাণ। রোকসানা কেটলি হাতে নিয়ে চায়ের কাপে চা ঢালতে ঢালতে নির্বাণকে উদ্দেশ্য বললো,,

— ফায়েজ চায়নি তুই কোনোরকম অস্বস্তিতে পরিস তাই চলে গেছে। তাছাড়া,, ফায়েজ এখানে থাকলে বিষয়টা মোটেও ভালো হতো না। আমার ছেলেটা কেবল কষ্ট পেয়ে যাচ্ছে। সুখ নেই রে ওর কপালে।

কথাগুলো বলতে বলতে কেঁদে ফেললেন রোকসানা। নির্বাণ চুপ করে আছে। এমন সময় নির্বাণের মোবাইল একটা মেসেজ আসে ফায়েজের নাম্বার থেকে। নির্বাণ মেসেজটি পড়ার জন্য ক্লিক করে,,

চলমান…..