Home "ধারাবাহিক গল্প ফিরেছি তোর আঙ্গিনায় ফিরেছি তোর আঙ্গিনায় পর্ব-৫+৬

ফিরেছি তোর আঙ্গিনায় পর্ব-৫+৬

0
887

#ফিরেছি_তোর_আঙ্গিনায়
#মৌমো_তিতলী
পর্ব,,,৫

মৌমিতার জন্য আনন্দের একটা সকাল।
গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছে মৌমিতা।
কারন গতরাতেই তার কাছে এসেছিলো সেই অবিশ্বাস্য ফোনকল টা।
“RK beauty and fashion industry” তে তার জব টা হয়ে গেছে। আজ থেকেই তার জয়েনিং।
এটা জেনে তো মৌমিতা আর নোরা দু’জনেই খুশিতে কিছুক্ষণ উরাধুরা নেচেছিলো। আর আজ সকাল সকাল সুন্দর করে নিজেকে তৈরি করছে। অফিসের প্রথম দিন বলে কথা। সবকিছু স্পেশাল হওয়া চাই!

কচি কলাপাতা রঙের চুড়িদার পরনে মৌমিতার। মাথায় চুল গুলো পনিটেল করে বাঁধা। মার্জিত শালীন ভাবে ওড়না টানা। চোখে কাজল আর ঠোঁটে হালকা করে লিপজেল দিয়ে ঘষে নিলো সে। চোখে সাদা গোল ফ্রেমের চশমা টা পরে নিয়ে নিজের সাজ কমপ্লিট করলো মৌমিতা।
সেই মুহূর্তে নোরা খাবার নিয়ে রুমে ঢুকলো।
কারন মৌমিতা তার অতি এক্সাইটমেন্টে খাবারটা ও খাইনি সকালে।
নোরা খাবারের প্লেট টা টেবিলে রেখে মৌমিতা কে ঘুরে ঘুরে দেখে। তারপর বলে,,,

— একটু বেশিই সিম্পল লাগছে না তোকে?

মৌমিতা আয়নায় তাকিয়ে বললো,,

–,,কই ঠিকঠাকই তো আছে। এর বেশি আর কি সাজবো!

নোরা গালে হাত ঠেকিয়ে বললো,,

–এতো বড় একটা কোম্পানিতে চাকরি করতে যাচ্ছিস! তাও আবার ম্যানেজিং ডিরেক্টরের পিএ হিসেবে ‌। এতোটা সাদামাটা মেয়েটাকে মানাবে?

মৌমিতা শ্বাস ফেলে বলে,,

–আমি কাজের দক্ষতা দেখাতে যাচ্ছি,নিজেকে না।

নোরা ফের দুষ্টুমি করে বলে,,,

— হতেও তো পারে এমডি মহোদয় কাজের চেয়ে বেশি তোকেই দেখলো!

মৌমিতা নোরার পিঠে কিল মেরে বললো,,,,,

–ফাজিল মেয়ে কোথাকার! তুই কি বলছিস কোন আইডিয়া আছে? সবসময় উল্টাপাল্টা কথা ।

নোরা খিলখিল করে হাসতেই থাকলো। মৌমিতা অল্প একটু খেয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেলো।

***************
এদিকে আশাকুঞ্জে।

ড্রইং রুমে বসে আশালতা বেগম। মৌমিতার কথা মনে পড়ছে আজ। মেয়েটা সেই যে গেলো আর কোন খোঁজ পেলো না তার। আদিত্যর ভয়ে নিজেও খোঁজ নিতে পারেননি। কিন্তু আজ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না তিনি। ঠিক করলেন মৌমিতা কে ফোন করবে।

মৌমিতা তখন রাস্তায়। মাত্রই রিকশায় উঠে বসেছে। সেই মুহূর্তেই ব্যাগে বিদ্যামান ফোনটা বেজে উঠলো।ফোনটা বের করে দেখলো ফোনের ওপরে ভাসছে
“মা”!

লম্বা শ্বাস টেনে ফোনটা কানে চেপে ধরে মৌমিতা।,,,

:-আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন মা?

আশালতা বেগম মুখে হাসি টেনে বললেন,,

— হোস্টেলে গিয়ে মা কে তো ভুলেই গেলে? আছি আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তুমি কেমন আছো?

মৌমিতার খারাপ লাগলো ভীষণ! সে তো আসলে সেই মানুষটা কে মনে করতে চাইনা বলেই আশাকঞ্জের কারো সাথে যোগাযোগ রাখেনি। তবুও আশালতা বেগম তাকে মায়ের মতো স্নেহ দিয়েছে‌। লেখাপড়া করিয়েছে‌। এই মানুষটার কাছে মৌমিতা চিরঋণী হয়ে থাকবে।

মৌমিতা আলগোছে চোখের কোনে জমা জলটুকু অবহেলায় মুছে নিয়ে বললো,,,

–একটু ব্যাস্ত ছিলাম মা। নতুন করে জীবনটাকে গুছিয়ে নিতে চেষ্টা করছি। একটা বড় কোম্পানিতে আমার চাকরি হয়েছে মা। দোয়া করবেন যেন কারো ওপর বোঝা না হয়ে বাকি জীবনটা নিজের মতো কাটাতে পারি।

মৌমিতা চাকরি পেয়েছে শুনে বেশ খুশি হলেন আশালতা বেগম। কিন্তু মৌমিতার শেষের কথাটা শুনে মলিন হলো তার মুখটা। অন্তরটা খামচে ধরলো আশালতা বেগমের। এতিম মেয়েটাকে নিজের কাছে রাখতে না পারার অপরাধে কন্ঠস্বর বুজে এলেন তার!

মৌমিতা কে কিছু বলতেই যাবেন, এমন সময় আদিত্য কে রেডি হয়ে নিচে নামতে দেখে তড়িঘড়ি ফোনটা রেখে দিলেন আশালতা বেগম। মেয়েটার সাথে যোগাযোগ করছে দেখলে হয়তো ছেলেটা আবার রাগ করবে সেই ভয়ে।
আচমকা ফোনটা ডিসকানেক্ট হতেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলো মৌমিতা।

এদিকে আদিত্য তো আজ মনে মনে ভীষণ এক্সাইটেড! কারন তার মায়াবতী আজ অফিসে আসবে। প্রথমবার তাকে চোখের সামনে দেখবে। ভাবতেই শরীরে একটা শিহরণ বয়ে যায় আদিত্যর। মা কে বলে গাড়ি নিয়ে বের হয় অফিসের দিকে।

এদিকে গাড়ি নিয়ে যাওয়ায় আদিত্য আগে অফিসে পৌঁছে গেলো। তবে অফিসে ঢুকে মুখটা ভার হলো আদিত্যর। মৌমিতা এখনো আসেনি।
মনে মনে রাগ হলো তার। সে ভেবেছিলো অফিসে ঢুকেই তার মায়াবতী কে দেখবে‌। কিন্তু সে গুড়ে বালি ঢেলে দিলো মেয়েটা!
আদিত্য মনে মনে ভাবে,, আসুক একবার! লেইট করার মজা বের করবে!

এদিকে মৌমিতা পড়েছে আরেক বিপদে। সে হয়তো আদিত্যর আগেই অফিসে পৌঁছে যেতো! কিন্তু অফিসের কাছাকাছি এসেই হুট করে মৌমিতার জুতার ফিতাটা ছিঁড়ে গেলো।
একে তো অফিসের প্রথম দিন! তারওপর এই উটকো ঝামেলা! এতো সকালে কোন জুতার দোকানও খোলা দেখলো না মৌমিতা।
আসেপাশে তাকিয়ে জুতা সেলাই করা কোন কবলারকেও চোখে পড়ছে না । এদিক ওদিক দেখতে দেখতে একজন কবলার কে দেখতে পেলো, ময়লা একটা চাদর টেনে রাস্তার পাশেই চটের ওপর ঘুমাচ্ছে। মৌমিতা জুতাটা খুলে হাতে নিয়ে কোনভাবে এগিয়ে গেলো সেদিকে।
লোকটাকে ডেকে জুতাটা সেলাই করে নিয়ে অফিসে আসতে আসতে ২০ মিনিট লেইট।
ভীষণ নার্ভাস লাগার সাথে সাথে কান্না পাচ্ছে মৌমিতার। প্রথম দিনেই এমন ব্লান্ডার হতে হলো! এখন তার চাকরিটা থাকলে হয়! নিশ্চয় এমডি স্যার ভাববে সে পাঙ্চুয়াল নয়, নিজের কাজের প্রতি সিনসিয়ার নয়।
দোলাচলের মধ্যে অফিসে প্রবেশ করলো মৌমিতা।

এদিকে আদিত্য এর মধ্যে আবির কে দুবার ডেকে মৌমিতা এসেছে কিনা জিজ্ঞাসা করেছে। হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চাপলো আদিত্য। এতোটা সময়জ্ঞানহীন মেয়েটা!
মৌমিতা অফিসে ঢুকতেই আবিরের সাথে দেখা হলো। আবির কে সে ইন্টারভিউয়ের দিন দেখেছিলো। তাই চিনতে অসুবিধা হলো না।
আবিরও মৌমিতা কে দেখে হাফ ছেড়ে বাঁচলো। তাড়াতাড়ি মৌমিতার দিকে এগিয়ে গিয়ে বললো,,,,

— এতো লেইট কেনো তোমার? এমডি স্যার দু’বার তোমার খোঁজ করেছে‌। প্রথম দিনেই এতো কেয়ারলেস হলে হবে?

মৌমিতা সরি স্যার, বলে মাথা নিচু করে নিলো। আবির বললো,,

— ঠিক আছে এসো আমার সাথে।

বলেই আদিত্যর কেবিনের দিকে এগিয়ে গেলো। মৌমিতা অনুসরণ করলো তাকে। অফিসের বাকি ফিমেল এম্পয়রা কেউ কেউ কৌতুহলী হয়ে দেখছে মৌমিতা কে। বিশেষ করে তার সাদামাটা সাজকে। অফিসের মোস্ট হ্যান্ডসাম এমডির কিনা এমন ক্ষ্যাত মার্কা বেহেন জি টাইপের পিএ! এটা নিয়ে কেউ কেউ হাসাহাসি করলো,তো কারো কারো মনে জন্মালো ঈর্ষা।

আদিত্যর কেবিনের সামনে গিয়ে আবির মৌমিতা কে বললো,,

— এইটাই এমডি স্যারের কেবিন। নাউ ইউ গো!

বলে আবির সেখান থেকে চলে গেলো। মৌমিতা ঢোক গিলে দুরুদুরু বুকে দরজায় নক করে আওয়াজ দিলো,,

–মে আই কাম ইন স্যার!

এদিকে আদিত্যর আচমকা মিহি সুরে বলা বাক্য টা কর্ণগোচর হতেই যেন সর্বাঙ্গে শিহরণ বয়ে গেলো যেন। কি মিষ্টি কন্ঠস্বর!

ঢোক গিলে নিজেকে সামলে নিলো সে। গম্ভীর স্বরে বলল,,

–কাম ইন!

মৌমিতা গুটি গুটি পায়ে প্রবেশ করলো কেবিনে। দেখতে পেলো লম্বা চওড়া পেশীবহুল এক পুরুষ পকেটে হাত গুজে কাঁচের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে। বুঝলো, ইনিই এমডি স্যার।
মৌমিতা উদ্বিগ্ন হয়ে গলা ঝেড়ে বললো,,,

–স্যার আমি মৌমিতা চৌধুরী! আপনার পিএ হিসেবে আজই জয়েন করেছি। সরি স্যার প্রথম দিনেই লেইট করার জন্য। যদিও আমি ইচ্ছে করে করিনি। একটা ছোট সমস্যা হয়ে যাওয়াতে…..

মৌমিতার কথাটা তখনও সম্পূর্ণ হয়নি! আদিত্য ঘুরে দাড়াতেই মৌমিতার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো যেন! এটা সে কাকে দেখছে! গলা শুকিয়ে কাঠ হলো মৌমিতার। অদ্ভুত কম্পনে প্রকম্পিত হলো তার সর্বকায়া।

এটা কি সত্যি নাকি কোন দুঃস্বপ্ন দেখছে মৌমিতা! শেহজাদ আদিত্য চৌধুরী! যে কিনা আইনত এখনো তার স্বামী। যে শুধু মাত্র মৌমিতা কে ডিভোর্স দিতে বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছে। আজ নিয়তি তাকে সেই পাষান মানুষটার সামনে নিয়ে এলো, তাও এভাবে! যার থেকে পালিয়ে আসলো বিচ্ছেদের ভয়ে! নিয়তি আজ তার সামনেই খাড়া করে দিলো তার বস হিসেবে। আল্লাহ এ কেমন পরীক্ষা নিচ্ছে মৌমিতার!

একদিকে মৌমিতা দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তাকিয়ে আছে সামনের মানুষটার দিকে। চোখের জল আটকানোর চেষ্টায়।
ওপর দিকে আদিত্য তাকিয়ে আছে মুগ্ধ দৃষ্টিতে। মৌমিতার বিষ্ময়ভরা দুটো চোখের দিকে তাকিয়ে যেন ঘোর লেগে যায় আদিত্যর।
ছবির থেকেও বাস্তবে অপ্সরীর মতো মনে হচ্ছে তার মায়াবতী কে। একটা মেয়ে এতোটা স্নিগ্ধ এতোটা মনোমুগ্ধকর কি করে হয়! দেখার যেন শেষ হবে না তার।
কিন্তু হুট করেই মাথায় এলো মৌমিতার বলা শেষ কথাটা! সমস্যা হয়েছিলো! কি হয়েছিলো মৌমিতার! এনিথিং সিরিয়াস! আদিত্যর ঘোর ভাঙ্গতেই বিচলিত ভঙ্গিতে এগিয়ে আসলো মৌমিতার দিকে। মৌমিতার সামনাসামনি দাঁড়িয়ে বললো,,,!

–মিস মৌমিতা আর ইউ ওকে?

এদিকে আদিত্যর মুখে “মিস মৌমিতা” ডাক শুনেই থরথর করে কেঁপে উঠলো যেন মৌমিতা। চোখ বন্ধ করে নিলো এক মুহুর্ত। নিজেকে দ্রুত সামলেও নিলো!

এই প্রথমবারের মতো তার স্বামী নামক মানুষটার মুখে নিজের নাম টা শুনতে পেলো! তাও মিসেস নয় মিস মৌমিতা!
তাচ্ছিল্যের হাসি পেলো মৌমিতার। তার সামনে দাঁড়ানো মানুষ টা তো তাকে চেনেই না। সে যে তার না মেনে নেয়া বিবাহিত স্ত্রী সে বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত সামনের মানুষ টা। তার থেকে এর বেশি কি আশা করবে মৌমিতা।
নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,,,,

–আই এম ফাইন স্যার। নাথিং সিরিয়াস!

মৌমিতার উত্তরে কুঞ্চিত ভ্রুদয় সোজা হলো আদিত্যর। ধীর অথচ দৃঢ় পায়ে গিয়ে বসলো নিজের চেয়ারে। তারপর বললো,,,,

–প্রথম দিনেই টুয়েন্টি মিনিটস লেইট! এরকম ইরেসপন্সিবল কাজের জন্য আপনার শাস্তি পাওয়া উচিত মিস মৌমিতা!

–জ্বী!!
বিষ্মিত দৃষ্টিতে আদিত্যর দিকে তাকালো মৌমিতা।

–দেখুন মিস মৌমিতা! আপনি প্রথম দিনে লেইট করে অফিসে এসেছেন! কি কারনে That’s none of my business.
এখন আমার কাছে আপনার প্রথম ইমপ্রেশন খারাপ হয়ে গেছে। তো সেটা কাটানো যায় সেই জন্য এখন আপনি নিজ হাতে আমার জন্য এক কাপ কফি বানিয়ে আনবেন। কফিটা অবশ্যই উইদাউট সুগার! গট ইট !!

এতোটা সহজ শাস্তি মৌমিতা আশা করেনি। সে ভেবেছিলো আদিত্য তাকে এক গুচ্ছ ফাইল হাতে ধরিয়ে দিবে! আর বলবে এক ঘন্টার মধ্যে এই পুরো ফাইল কমপ্লিট চায়! অন্তত উপন্যাসে রাগী বস কে এমনি করতে দেখেছে মৌমিতা। কিন্তু তার জীবন তো কোন উপন্যাস নয়। তবে আদিত্য যে তাকে কঠিন কোন শাস্তি দেয়নি তাতেই সে খুশি।

মৌমিতা সাহসা ঠোঁটে হাসি টেনে বললো,,

–ওকে স্যার! নো প্রবলেম। আমি এখনই নিয়ে আসছি। বলেই ফুড়ুৎ করে বেরিয়ে গেলো কেবিন থেকে।

মৌমিতা বেরিয়ে যেতেই অদ্ভুত এক আবেশে হাসি ছড়িয়ে পড়লো আদিত্যর অধরে। মৌমিতার হাসিটা ভাসছে চোখের পাতায়! মেয়েটাকে তার চাই! জীবনে এমন কাউকেই তো সে চাইতো সবসময়। যাকে দেখলেই তার হৃদয় ভরে উঠবে প্রশান্তিতে! যাকে দেখতে দেখতেই এক জন্ম কাটিয়ে ফেলতে পারবে সে।
অথচ তাকে একরকম ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে তার মা এক অচেনা অজানা মেয়ের সাথে জীবনের গাঁটছড়া বেঁধে দিলো! যার প্রতি তার কোন অনুভূতিই নেই!

হঠাৎ সেই মেয়েটার কথা মনে পড়তেই হকচকিয়ে গেল আদিত্য! সে তো ভুলেই গেছিলো তার কথা!
এই কাঁটার মতো বিঁধে থাকা সম্পর্কটাকে এবার শেষ করতেই হবে। আদিত্য চেয়ারে গিয়ে বসলো। ফোনটা হাতে নিয়ে কল লাগালো কাউকে। ওপাশ থেকে রেসপন্স পেতেই বললো,,,

— হ্যালো আয়াত! কোথায় আছিস?

–হেই ব্রো হাউ আর ইউ? এতো দিনে মনে পড়লো ভাইয়ের কথা! ব্যাটা কতদিন হয়েছে তুই দেশে এসেছিস! আজ এসে মনে হলো তোর ভাইয়ের কথা!

আয়াতের কথায় হেসে উঠলো আদিত্য। বললো,,

–এদিকে একটু ব্যাস্ত ছিলাম রে। তুই আসলি না কেনো বাড়িতে?

—আরে ইয়ার!! বসন্ত চলছে গুরু বসন্ত! এই সময়টা কনসার্ট থাকে একের পর এক। বের হওয়ার সময় পাচ্ছি না। তারপর বল কি মনে করে কল করলি!

—ইয়ার তুই তো জানিস সবকিছু! আমার ইমিডিয়েটলি একজন ডিভোর্স লয়ারের প্রয়োজন! তুই একটু ব্যাবস্থা করতে পারবি?

আদিত্যর কথায় কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে আয়াত। পরমুহূর্তেই বলে,,,

:-তুই কি সত্যিই ভাবিকে ডিভোর্স দিতে চাস?

–অফকোর্স ইয়ারর! দেখ মেয়েটাকে আমি কখনো মানতে পারিনি। এতো দিন আমি ছিলাম না। সে আমার স্ত্রীর পরিচয়ে থেকেছে! পড়াশোনা করেছে। এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে। কিন্তু আমার পক্ষে তাকে মেনে নেয়া সম্ভব নয়! প্লিজ বোঝ তোরা একটু। মেয়েটার প্রতি আমার কোন অনুভূতি নেই। শুধু শুধু তাকে একটা মিথ্যা সম্পর্কে কেনো বেঁধে রাখতে যাবো বল!

–আমি বুঝতে পারছি আদি! কিন্তু তুই একবার ভাবির সাথে দেখা করে কথা বলতে পারতিস! আই থিঙ্ক তোর ডিসিশন চেঞ্জ হয়ে যেতো!

আয়াতের কথায় ভ্রু কুঁচকে এলো আদিত্যর! সেদিন মায়ের মুখেও একই কথা শুনেছিলো আদিত্য।

–তোর কেনো মনে হচ্ছে এমনটা?

— আদি দেখ ভাবিকে দেখতে কিন্তু মাশাআল্লাহ পরীর মত। আমি তাকে ভাবি বলে ডাকি কারণ তুই আমার ভাই! কিন্তু ব্যক্তিগত ভাবে তাকে আমার বোনের মতো দেখি। তোর অনুপস্থিতিতে যতবার ওই বাড়িতে গেছি আমি ভাবির ব্যবহারে মুগ্ধ হয়েছি। কত মিষ্টি ভদ্র মার্জিত একটা মেয়ে।
তুই তাকে দেখলি না পর্যন্ত। আমি তো এটাই বুঝাতে পারছি না তোর সমস্যা টা আসলে কোথায়! তুই তাকে না দেখে,না জেনে,তাকে একটা সুযোগ দেয়ার বিন্দুমাত্র চেষ্টাও না করে সরাসরি ডিভোর্স কেনো দিতে চাস! ভেবে দেখ তো! এতো দিনে সে কি তোর থেকে একটা সুযোগ ডিজার্ভ করে না?

আয়াতের কথা মন দিয়ে শুনলো আদিত্য। সত্যিই কি তার উচিত মেয়েটার সাথে কথা বলা? তাকে একটা সুযোগ দেয়া!
কথাটা ভাবতেই মৌমিতার মুখটা ভেসে উঠলো আদিত্যের চোখের সামনে! মৌমিতার কথা মনে পড়তেই আবারও সেই অদেখা মেয়েটার প্রতি কঠিন হলো তার মন। অতঃপর আয়াত কে বললো,,,

— লিসেন আয়াত! আমি ভেবে চিন্তেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। I want to divorce her. তুই লয়ারের ব্যবস্থা কর! আর কাল পারলে সময় করে আমার অফিসে আয়! আমি এড্রেস পাঠিয়ে দিচ্ছি তোকে!
বলেই কল কেটে দিলো আদিত্য।

এদিকে দরজার ওপাশে থমকে দাঁড়িয়ে আছে মৌমিতা! হাতে বিদ্যামান কফির কাপ ট কাঁপছে থরথর করে। চোখ ফেটে অবাধ্য জল বেরিয়ে এলো ফর্সা গাল বেয়ে। নাকের পাটা লাল হয়ে এলো তার। কানে এখনো বেজে চলেছে আদিত্যর বলা শেষ কথাটা! I want to divorce her!
এতোটাই মূল্যহীন সে আদিত্যর কাছে! আদিত্য যদি কখনো জানতে পারে মৌমিতাই সেই মেয়ে যাকে সে পাঁচ বছর আগে বিয়ে করে ফেলে চলে গেছিলো কানাডায়! কি হবে তখন! মৌমিতা কে কি চাকরি থেকে বের করে দিবে মানুষ টা! ঘৃণা করবে তাকে!
ভাবতেই মনে হলো অদৃশ্য কেউ যেন গলাটা চেপে ধরেছে মৌমিতার। এতো কষ্ট কেনো পাচ্ছে সে! যখন পরিনতি তার জানাই ছিলো! তবুও এতো বছর পর মানুষ টাকে চোখের সামনে দেখে মনটা যেন কিছুতেই মানতে চাইছে না যে, মানুষ টা তাকে চায় না।

— মিস মৌমিতা! বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন কেনো? ভেতরে আসুন! ঠান্ডা কফি খাওয়ানোর মতলব করছেন নাকি বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে!

আদিত্যর কটাক্ষে ধ্যান ভাঙ্গে মৌমিতার। আলগোছে চোখ মুছে নিজেকে স্বাভাবিক করে ভেতরে আসে। কফির কাপ টা আদিত্যর সামনে রেখে নরম সুরে বলে,,,

:-একচুয়ালি স্যার আপনি ফোনে কথা বলছিলেন তাই ভাবলাম আপনার প্রাইভেসি দেয়া প্রয়োজন! এই জন্যই আপনার কথা বলা শেষ হওয়ার অপেক্ষা করছিলাম।

আদিত্য কফির ছিপ নিতে নিতে এক নজরে তাকিয়ে আছে মৌমিতার ঠোট নাড়িয়ে কথা বলার দিকে। মৌমিতার কথা বলার ভঙ্গিটা কেনো যেনো কোন শিল্পির আঁকা মনোরম ছবি মনে হলো আদিত্যর কাছে!
কারো কথা বলার ভঙ্গি এতো সুন্দরও হয়!!

#চলবে

#ফিরেছি_তোর_আঙ্গিনায়
#মৌমো_তিতলী
পর্ব,,,৬

অফিসের প্রথমদিন হিসেবে মৌমিতার কাজ আজ কমই ছিলো। আদিত্য তাকে দিয়ে বেশি কাজ করাইনি।
তবে সবকিছু গুছিয়ে উঠতে কিছুটা সময় তো লাগবেই।
মৌমিতা ফাইলপত্র সবকিছু ঠিকঠাক গুছিয়ে বেরোতে নিবে তখনই সামনে এসে দাঁড়ালো আদিত্য।

–মিস মৌমিতা বেরোচ্ছেন নাকি?

–জ্বী.. জ্বী স্যার! অফিস আওয়ার তো শেষ তাই আর কি!

মৌমিতার এমন হকচকিয়ে ওঠা দেখে মনে মনে হাসলো আদিত্য। মেয়েটা কি অল্পতেই ঘাবড়ে যায় নাকি!

–ওকে দ্যান Can I drop you?

বিচলিত হলো মৌমিতা। আদিত্যর কথার পিঠে কি উত্তর দিবে হুট করে বুঝে উঠতে পারলো না। বস হিসেবে তার অ্যাসিস্ট্যান্ট কে ড্রপ করতেই পারে কিন্তু প্রথম দিনেই আদিত্যর তার অ্যাসিস্ট্যান্টের প্রতি এতো কানসার্ন দেখানো টা অন্তরে আঘাত করলো মৌমিতার। কি চাইছে আদিত্য! সে তো ঠিক মতো চেনেও না মৌমিতা কে। শুধু কি অ্যাসিস্ট্যান্ট বলেই তার প্রতি এতোটা বিনয়ী হচ্ছে আদিত্য!
মৌমিতা কে থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মুখের সামনে তুড়ি বাজায় আদিত্য!

–ও হ্যালো! মিস কোন ভাবনায় ডুব দিলেন!

মৌমিতা অপ্রস্তুত হেসে বললো,,,

–ড্রপ করার কোন প্রয়োজন নেই স্যার। আমি চলে যেতে পারবো। ডোন্ট ওয়ারি স্যার! বেশি রাতও হয়নি। সহজেই রিকশা পেয়ে যাবো।

যদিও আদিত্যর ইচ্ছে হলো না মৌমিতা কে রিকশায় যেতে দিতে, কিন্তু জোর করাটাও তার এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে না। সৌজন্যে হেসে জবাব দিল আদিত্য,,,

:-Okay! Whatever you want.!!

বলেই বেরিয়ে গেলো আদিত্য। আদিত্য বেরিয়ে যেতেই মৌমিতাও নিজের ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিলো। এক পা বাড়াতেই দুজন ফিমেল কলিগদের কথপোকথন কানে এসে ধাক্কা খেলো,,,

–ইয়ার! কি জানি এই মৌমিতা বলে গেঁয়ো মেয়েটার মাঝে কি এমন দেখলো আদিত্য স্যার! যে সরাসরি নিজের অ্যাসিস্ট্যান্টর জায়গায় হায়ার করে নিলো!

আরেকজন তাল মিলিয়ে বললো,,,

:-ইন্টারভিউয়ের দিন কত স্টাইলিশ স্মার্ট মেয়েরা এসেছিলো দেখেছিলি তোরা? তারা তো এই মেয়েটার থেকে ওয়েল এডুকেটেড,কোয়ালিফাইড। তাহলে সেসব মেয়েদের কে বাদ দিয়ে এই নমুনা টা কে কেনো জব দিলো গড নৌজ!

–ছাড় না ইয়ার! আমাদের কি! সেই তো সারাদিন কিবোর্ডে টাইপ করে যেতে হবে! প্রমোশনের নামে বছরের পর বছর যাবে! বস দের মনে কখন কি চলে তারাই জানে!

–ঠিকই বলেছিস! দেখ হয়তো গরিব গেঁয়ো মেয়ে। জবের ভীষণ প্রয়োজন! অপরদিকে বসের প্রয়োজন মনোরঞ্জন করা! তাই হয়তো বেচারি লো এডুকেটেড হওয়া সত্ত্বেও চাঞ্চ পেয়েছে! এসব মেয়েদের যোগ্যতা জানা আছে ভাইই! বসের মন কিভাবে ভোলাতে হয় এরা ভালো করে জানে!! হা হা

এমনই বিভিন্ন ধরনের কুৎসিত মন্তব্য চলতে থাকে দু’জনের মধ্যে। আর কিছু শোনার ধৈর্য হলো না মৌমিতার। মেয়ে দুটোর থেকে ঘৃণিত দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো! এদের কাজই অন্যকে নিয়ে গসিপ করা।
এসব কথায় কান দিলে নিজের কাজটা আর শান্তিমতো করতে পারবে না মৌমিতা। আর বেশিক্ষণ না ভেবে বেরিয়ে পড়লো অফিস থেকে।
খালি রিকশা ডেকে উঠে বসলো। ফোন বাজছে। হাতে নিয়ে দেখলো নোরার ফোন। রিসিভ করলো মৌমিতা,,,

–হ্যা নোরা বল!

–এই মৌ তুই কোথায়? অফিস শেষ হয়নি এখনও?

— হ্যাঁ বের হয়ে গেছি আমি। রিকশায় আছি।

— যাক আলহামদুলিল্লাহ। আমার তো টেনশন হচ্ছিলো। প্রথম দিন। না জানি কেমন যাবে! তো বল! প্রথম দিন কেমন কাটলো ম্যাম!

নোরার প্রশ্নে ফসস করে দম ছাড়লো মৌমিতা।

–ইয়ার আর বলিস না! আমার জীবনে ভালো কিছু ঘটবে আশা করাও বৃথা!

মৌমিতার কথায় কপাল কুঞ্চিত হলো নোরার।

–এভাবে বলছিস কেনো মৌ? কি হয়েছে? অফিস পছন্দ হয়নি তোর? বস কি প্রথম দিনেই খারাপ ব্যবহার করেছে? মৌ তুই বল আমার সাথে! দরকার হয় ওই জব তোকে করতে হবে না। আমরা আরো ভালো জব খুঁজে নেবো!

—নোরা নোরা রিল্যাক্স! কি হয়ে যায় তোর! আমার পুরো কথাটা তো শুনবি আগে! আচ্ছা বাদ দে। হোস্টেলে ফিরে সবটা বলবো তোকে। ঠিক আছে?

—ওকে ওকে আয় তাড়াতাড়ি।

ফোন রাখলো মৌমিতা। এই নোরা মেয়েটাও না! একটু বেশিই ভাবে সবসময়। তাকে যে ভীষণ ভালোবাসে মেয়েটা।
হুট করে মনটা উদাস হয় মৌমিতার। আদিত্যর তখনকার কথাটা মনে পড়লো। তাচ্ছিল্য হাসলো সে। খুব শিঘ্রই ডিভোর্সের ব্যবস্থা করবে আদিত্য। কি হবে তারপর!
জীবন কোথায় টেনে নিয়ে যাবে তাকে! আচ্ছা আদিত্য যখন জানতে পারবে অফিসে যাকে সে নিজের অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে জানে ওই মেয়েটাই তার পাঁচ বছরের ঘৃণা জমানো সেই মেয়েটা! তখন কেমন রিয়েকশন হবে আদিত্যর!
দু’চোখ ঝাপসা হয়ে এলো মৌমিতার। কেনো সে ভালোবাসতে গেলো স্বামী নামক পাষান হৃদয়ের মানুষটাকে। তারও তো মনে ঘৃণা জমানো উচিত ছিলো। যে তাকে বিয়ের মতো একটা পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ করে পালিয়ে গেছিলো নিজের দায়িত্ব থেকে। মানছে তাকে জোর বিয়ে করানো হয়েছিলো! কিন্তু তাতে মৌমিতার দোষ কোথায় ছিলো! সে তো আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতোই দুচোখ ভরে স্বপ্ন সাজিয়েছিলো। জন্ম থেকে অনাথ আশ্রমে বড় হওয়া এতিম মেয়েটা এক স্বপ্ন পুরুষের সাথে সংসারের স্বপ্ন দেখেছিলো। ভেবেছিলো এবার আর সে দুনিয়ায় একা থাকবে না। তারও নিজের মানুষ হবে। নিজের ঘর হবে।
তার চাওয়াটা কি খুব বেশি ছিলো? হয়তো ছিলো! তাই তো তার সব স্বপ্ন তাসের ঘরের মতো এক ধাক্কায় ভেঙে চুরমার করে দিয়ে লোকটা পাড়ি জমিয়েছিলো সুদূর কানাডায়। তাকে ছুড়ে দিয়েছিলো এক অনিশ্চিত সম্পর্কের বন্ধনে।
না তাকে ছেড়ে আসতে পেরেছিলো না পুরোপুরি তাকে আকড়ে ধরে বাঁচতে পেরেছিলো। তবে সেই নাফরমান মানুষটার এই অবহেলিত সম্পর্কের বদৌলতে
বাবা মায়ের মত শশুর শাশুড়ি পেয়েছিলো।
তাদের সাথে এই পাঁচটা বছরে আদরে থেকেছে। লেখাপড়া করেছে। অনেক সুখের স্মৃতি জমা হয়েছে। দিনশেষে পাষান পুরুষটার ছবি বুকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে পেরেছে এই তো অনেক।
আর আজ মানুষটার এতো কাছাকাছি থেকেও কতটা দুরে তারা। নিজের জীবনের দূর্ভাগ্যের কাছে নিজেকে বেবাছ অনুভব করে মৌমিতা।

–আম্মা আইসা পড়ছি তো নামেন!

রিকশাওয়ালার ডাকে ধ্যান ভঙ্গ হয় রমনীর। চমকে উঠে তাকায় রিকশাওয়ালার দিকে। লোকটা অবাক নেত্রে তাকিয়ে আছে মৌমিতার দিকে।

–কই হারাইছেন আম্মা! এতো বার ডাকতাছি! হুনতাছেন না! এতো কি ভাবেন আম্মা?

মৌমিতা তড়িঘড়ি রিকশা থেকে নেমে ব্যাগ থেকে টাকা বের করে রিকশাওয়ালার কে দিয়ে বলে,,,

— কোথায় আর হারাবো চাচা! শুধু জীবনের আঁকাবাঁকা রেখাগুলো মেলানোর চেষ্টা করছি!

বলেই হোস্টেলের গেট দিয়ে ঢুকে গেলো মৌমিতা।

রিকশাওয়ালাও কিছুক্ষণ তার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর রিকশায় উঠে টান দেয় জীবিকার তাগিদে!

**************

হোস্টেলের কামরায় একবার এদিকে একবার ওদিকে অস্থির হয়ে পায়চারি করছে নোরা! দন্ত দ্বারা নখ খুঁটে বলে,,,

— ভারি এ কি কথা হলো ভাইই! মানে নিজের বিয়ে করা বউকে চেনে না মানলাম। তাই বলে তার সাথে এখনো ডিভোর্স তো হয়নি! তাকে সেটেল্ড করা ছেড়ে অফিসের ফিমেল স্টাফের সাথে এতো মিঠি মিঠি বিহেবিয়ার!!
আমার তো মনে হয় তোর বরের নিয়ত খারাপ! ব্যাটা তোকে ছেড়ে তোর দিকে কুদৃষ্টি দেয়ার ধান্দা করছে!

নোরার কথায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকিয়ে আছে মৌমিতা। সবকিছু নোরা কে খুলে বলতেই এই অর্থ বের করলো মেয়েটা! তার হাজবেন্ড তাকে ছেড়ে তার দিকেই কুদৃষ্টি দেয়ার ধান্দা করছে! এটা শুনে
হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারলো না মৌমিতা। তাকে এভাবে ভ্যাবলার মত তাকিয়ে থাকতে দেখে নোরা মৌমিতার পাশে গিয়ে বসলো! বললো,,,

–আরে বুঝতে পারছিস না! আমার মনে হয় তোর বরের চরিত্রে সমস্যা আছে বুঝলি! দেশে ফিরেই অফিসের ফিমেল স্টাফের সাথে এতো পিরিতি দেখাচ্ছে, কানাডায় থাকতে না জানি কি কি করতো!

–তুই থাম তো নোরা! কি উল্টাপাল্টা কথা বলে যাচ্ছিস তখন থেকে। আমি তোকে সবটা বললাম। আর তুই এই অর্থ বের করলি? আরে আজকেই তো আমার অফিসে প্রথম দিন গেলো! আর তুই একদিনেই তার চরিত্র বুঝে গেলি? সে হতেই পারে কাইন্ড হার্টেড বস!

— হাহঃ কাইন্ড হার্টেড! তাও আবার তোর বর? কতটা কাইন্ড সে তো দেখতেই পেলি পাঁচটা বছর ধরে! আমার তো মনে হয়, শেহজাদ আদিত্য চৌধুরীর হৃদয়ে দয়ামায়ার “দ” পর্যন্ত নেই!!

— উফফফফ নোরা থামবি তুই! কারো নামে নিন্দা করার সুযোগ পেলে তুই কন্ট্রোল করতে পারিস না তাই না? ক্লান্তও হোসনা।

–হুমম কেউ একজন তার হাজব্যান্ডের নামে নিন্দা শুনে জ্বলছে মনে হচ্ছে!
বলেই মিটিমিটি হাসতে লাগলো নোরা!

–আচ্ছা তবে রে! বলেই নোরার পিঠে কিল মারতে গেলে নোরা উঠে দৌড় দিলো! মৌমিতাও হাসতে হাসতে পিছু ধাওয়া করলো নোরার!

***************

নিজের রুমে বিছানায় বসে আছে আদিত্য। দৃষ্টি তার ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে। সেখানে তার কেবিনের সিসিটিভি ফুটেজ থেকে নেয়া মৌমিতার আজকের বিভিন্ন সময়ে ক্যাপচার করা ছবিগুলো ভাসছে।

গভীর দৃষ্টি তার মৌমিতার সারা মুখ জুড়ে বিচরণ করছে। হাত বাড়িয়ে মৌমিতার চোখদুটো ছুঁয়ে দেয় আদিত্য! ঠোঁটে ফুটে ওঠে তির্যক হাসি‌।

–ব্যাস কিছুদিন আর! তারপরেই নিজের জীবনের জটিল অধ্যায়ের ইতি টানবে আদিত্য! এরপরেই মৌমিতা কে নিজের করে নেয়ার মিশনে নামবে সে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা!

ল্যাপটপ টা পাশে রেখেই বালিশে মাথা এলিয়ে দিলো আদিত্য! মৌমিতার গভীর কাজল কালো চোখের দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেলো আদিত্য!

**************

পরের দিন

সকালে ডাইনিং টেবিলে ব্রেকফাস্ট রেডি করছেন আশালতা বেগম। সাদমান চৌধুরী এসে চেয়ার টেনে বসলেন। ওপরের দিকে তাকিয়ে সহধর্মিণী কে উদ্দেশ্য করে বললেন,,

:- কি ব্যাপার আদি ওঠেনি এখনো? অফিসে যাবে না?

আশালতা বেগম স্বামীর প্লেটে রুটি তুলে দিতে দিতে জবাব দিলেন!

— উঠেছে। বললো ফ্রেশ হয়ে একেবারে রেডি হয়ে নিচে নামবে। নাস্তা করে তারপর অফিসে যাবে।

“ওহ” বলে খাওয়ায় মনোযোগ দিলো সাদমান চৌধুরী। এক টুকরো রুটিতে ভাজি উঠিয়ে মুখে পুরে বললেন,,,

:- মেয়েটার কোন খবর পেলে?

আশালতা বেগম হালকা ঠোঁট টেনে হেসে বললেন,,

:–হ্যা ফোন করেছিলাম কাল সকালে। জানো মেয়েটা বললো কোন বড় কম্পানিতে ভালো জব পেয়েছে। আমার যে কি খুশি লেগেছিলো শুনে! যায় হোক মেয়েটা নিজের পায়ে দাঁড়াতে তো পারলো!

— তাই নাকি! বাহ এটা তো ভালো খবর। আর ঠিকই বলেছো। দোয়া করবো ওর জীবনটা যেন সুন্দর হয়। আমাদের নসিব তো আর এমন হলো না,যে মেয়েটাকে নিজেদের কাছেই সারাজীবন রেখে দিতে পারলাম! এখন বাকি জীবনটা যেন ও ভালো থাকে!

–কার ভালো থাকার কথা হচ্ছে!!
বলতে বলতে নিচে নামলো আদিত্য। ল্যাপটপের ব্যাগটা চেয়ারের হাতলে ঝুলিয়ে রেখে নাস্তা করতে বসে পড়লো সে।

আশালতা বেগম কোন কথা না বলে ছেলের খাবার রেডি করতে শুরু করলেন।

আদিত্য প্লেট টেনে নিতে নিতে আবারো প্রশ্ন করলো,,,

— কি হলো বাবা! কথা বলছো না যে! একটু আগে কার ভালো থাকার কথা হচ্ছিলো?

সাদমান চৌধুরী হাতে পানির গ্লাস নিয়ে ঢকঢক করে পানি খেয়ে বললেন,,,

— কার কথা বলবো আর! তোমার কথায় বলছিলাম। তোমার ভালো থাকাটাই আমাদের একমাত্র চাওয়া। সেটাই বলছিলাম।

আদিত্য “আচ্ছা” বলে খাওয়া শুরু করতেই তার ফোন বেজে উঠলো। আদিত্য ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো আয়াতের কল। রিসিভ করে কানে ধরে বললো,,,

— হ্যাঁ আয়াত বল!

— _________!

— কি নাম বললি? এডভোকেট কামরুল আহসান!

–________!

—আচ্ছা ঠিক আছে। তুই এক কাজ কর! ওনাকে আমার অফিসেই আসতে বল। আর তুইও আয়! তোর সাথে আমার অনেক কথা জমে আছে ইয়ারর!

— __________!

— ওকে ওকে! ফাইন। আয় দ্যান এই বিষয়ে কথা হবে।

আদিত্য ফোন কেটে সামনে তাকাতেই দেখতে পেলো বাবা-মায়ের অবাক দৃষ্টি। সেদিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক স্বরে বলল,,,

:-হুয়াটট! এভাবে তাকিয়ে আছো কেনো তোমরা?

সাদমান চৌধুরী গলা ঝেড়ে বললেন,,,

–লয়ারের কথা বললে শুনলাম! তুমি কি সত্যিই ফাইনাল ডিসিশন নিয়ে ফেলেছো? আর একবার ভালো করে ভেবে দেখতে পারতে। মেয়েটা তোমার….

সাদমান চৌধুরীর কথা শেষ না হতেই বিরক্ত ভঙ্গিতে বলে উঠলো আদিত্য,,,

–ওফফ কাম অন বাবা! এক কথা বার বার বলতে ভালো লাগে না। এই জন্যই আমি কানাডায় থাকতেই বার বার করে বলেছিলাম দেশে ফিরলে যেন এই বেপারে আমাকে আর বেশি কথা না বলতে হয়! আর তোমারা দেখছি মানতেই পারছো না সেটা। ওই মেয়েটা যদি তোমাদের এতোই পছন্দ,সে যদি তোমাদের কাছে এতোই ইমপর্টেন্ট তাহলে আমাকে কেনো আসতে বলেছিলে? থাকতে খুশি তাকে নিয়ে যেমন ছিলে!

লিসেন বাবা! আমি শেষ বারের মত বলছি, জীবন সঙ্গী আমি তাকেই করবো যাকে আমি ভালোবাসবো। যার প্রতি আমার অনুভূতি থাকবে। সো আমি মেয়েটাকে ডিভোর্স দিচ্ছি। তাকে আমি কখনো কোন আশা দিয়ে রাখিনি যে এটা আমার অন্যায় হবে। মায়ের জেদের কাছে হার মেনে আমি বিয়েটা করতে বাধ্য হয়েছিলাম। কানাডায় থাকতে আমি বহুবার ভেবেছি, বিশ্বাস করো! বহুবার আমি বিয়েটা মেনে নিতে চেষ্টা করেছি কিন্তু আমার মন একদমই সায় দেয়নি। যার প্রতি আমার কোন টানই তৈরি হয়নি তাকে আমি কেনো শুধু শুধু সাফার করাবো? কিভাবে তার সাথে ভালোবাসাহীন সম্পর্কে থেকে সারাজীবন কাটাবো? বলো ? এনাফ ইজ এনাফ বাবা!

নিজের মনের সমস্ত বাড়াস বের করে দিয়ে হনহন করে বেরিয়ে গেলো আদিত্য।
আদিত্য বেরিয়ে যেতেই আশালতা বেগমের দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো জল! আজ তার পছন্দ কে জেদ বলে দিলো তার সন্তান! সে কি নিজের সন্তানের খারাপ চেয়েছে কখনো! আদিত্য কেনো বুঝতেই চাইলো না কোন হিরে কে পায়ে ঠেলে দিচ্ছে!
মৌমিতার মুখখানি মনে করে ভীষণ অসহায় বোধ করলেন আশালতা বেগম। সাদমান চৌধুরীও স্ত্রীর মলিন অশ্রুসিক্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে রইলেন বিরস মুখে।

#চলবে