Home "ধারাবাহিক গল্প ফিরেছি তোর আঙ্গিনায় ফিরেছি তোর আঙ্গিনায় পর্ব-২৩+২৪

ফিরেছি তোর আঙ্গিনায় পর্ব-২৩+২৪

0
423

#ফিরেছি_তোর_আঙিনায়
পর্ব —২৩
মৌমো তিতলী 🦋

নোরার হোস্টেলের সামনে সর্বদা নিরব থাকতে দেখা যায়। কিন্তু আজ সকাল থেকে সেই নীরবতাকে ছিন্নভিন্ন করে একের পর এক গাড়ি, সাংবাদিক,ক্যামেরা আর আসেপাশের মানুষের কোলাহলে চিরচেনা পরিবেশটাকে বিভৎস রুপ দিয়েছে। হোস্টেল কতৃপক্ষ বার বার নিষেধ করা সত্ত্বেও তাদেরকে একচুল পরিমাণ নড়াতে সক্ষম হয়নি।

হোস্টেলের নির্দিষ্ট ছোট্ট কমরার ভেতরে বিছানার এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছে নোরা। কাঁপা হাতে শক্ত করে চেপে ধরে আছে নিজের মোবাইলটা। রাতভর অসংখ্য অচেনা নম্বর থেকে কল এসেছে। ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ সবখানেই নোটিফিকেশনের বন্যা।
একবার সাহস করে একটি সোশ্যাল মিডিয়া খুলতেই নিজের ছবিটা দেখে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো তার।
সাথে অগণিত তরুণীদের থ্রেট, আক্রোশ ভরা কমেন্ট,মেসেজ দেখে ফোনটা সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দিল নোরা।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে ভেসে এলো কারও চিৎকার..

—এই হোস্টেলেই থাকে ওই মেয়েটা!

আরেকজন বলল….

— ম্যাডাম একটু দরজাটা খুলুন! মাত্র দুই মিনিট কথা বলব! ম্যাডাম মাত্র দু মিনিট!

নোরার মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেলো।
দুই হাত দিয়ে কান চেপে ধরে মেঝেতে বসে পড়লো সে।
চোখ বেয়ে টপটপ করে ঝরে পড়ছে অশ্রু।

নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে বলছে সে….

—আমি তো এসব কিছু চাইনি… আমি শুধু স্বাভাবিক একটা জীবন চেয়েছিলাম…! আয়াত আপনি কোথায়!

এমন সময় বিছানায় পড়ে থাকা ফোনটা বেজে উঠলো।
স্ক্রিনে ভেসে উঠলো..

“কলিং…মৌমিতা”

মৌমিতার কল দেখে যেন জান ফিরে পেলো মেয়েটা। কাঁপতে কাঁপতে ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে মৌমিতার উৎকণ্ঠিত স্বর ভেসে এলো…

— নোরা কোথায় তুই… তুই ঠিক আছিস?

মৌমিতার কণ্ঠ শুনে এতক্ষণ নিজেকে শক্ত করে রাখা নোরা যেন ঝরঝর করে ঝরে পড়লো। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো সে।

— মৌ… আমার খুব ভয় লাগছে…এরা এরা সবাই হোস্টেলের বাইরে..

ওপাশে আদিত্য মৌমিতার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে শান্ত গলায় বললো…

—নোরা, আমি আদিত্য বলছি। ভাইয়ার কথা শোনো! ভয় পেও না। তুমি এখনই কোথাও বের হবে না কেমন। আমি আসছি। তোমাকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসবো। মৌমিতার কাছে থাকবে তুমি। যতক্ষণ আমি তোমার ভাইয়া আছি, তোমার বন্ধু মৌমিতা আছে,কেউ তোমার গায়ে একটা আঁচড়ও দিতে পারবে না।”

আদিত্যর কথায় নোরা কিছুটা নিশ্চিন্ত হলেও বাইরের সাংবাদিকদের চিৎকারে তার বুকের ধুকপুকানি একটুও কমলো না।

ফোন কেটে আদিত্য দ্রুত শেহরোজকে কল করলো।

— শেহরোজ তোমাকে একটা হোস্টেলের এড্রেস দিচ্ছি। দশ মিনিটের মধ্যে কয়েকজন ট্রাস্টেড নিয়ে সেখানে পৌঁছাও। নোরা,আমার পরিচিত। তাকে সেখান থেকে সেফলি বের করে আনবে। মিডিয়ার সঙ্গে কোনো রকম ঝামেলা করবে না। শুধু মেয়েটাকে নিরাপদে বের করে আনতে হবে।”ততক্ষণে আমি আসছি।

ফোন রেখে মৌমিতার দিকে তাকালো আদিত্য। প্রিয় বান্ধবীর চিন্তায় মেয়েটার মুখ শুকিয়ে গেছে। আদিত্য মৌমিতার কাছে এগিয়ে এলো। দু হাতে মৌমিতার মুখটা তুলে ধরে অধর ছোঁয়ালো ললাটে।
আলতো করে বুকে জড়িয়ে ধরে বললো….

—একদম চিন্তা করো না। বললাম তো তোমার বান্ধবীকে এনে দেবো।

মৌমিতা জানে আদিত্য ঠিক তার কথা রাখবে। কিছুটা আশ্বস্ত হলো সে। আদিত্যর বুকের মাঝেই মাথা নাড়লো সে।

আদিত্য আর এক মুহূর্তও দেরি করলো না। গাড়ির চাবিটা হাতে নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে পড়লো।

________

নোরার হোস্টেলের সামনে পৌঁছাতেই পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে অসুবিধা হলো না শেহরোজের।
ছোট্ট গলির মুখজুড়ে Journalist দের ভিড়। ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, লাইভ সম্প্রচারে জগাখিচুড়ী অবস্থা। যেন কোনো অপরাধীর বাড়ি ঘিরে রাখা হয়েছে।

ঠিক তখনই আদিত্যর কয়েকজন নিরাপত্তারক্ষীরা সাংবাদিকদের জোর করে অন্যদিকে সরিয়ে দিলে শেহরোজ দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেলো। হোস্টেল কতৃপক্ষকে সংক্ষেপে সবটা জানিয়ে, নিশ্চিত হওয়া স্বরুপ আদিত্যর সাথে কথা বলিয়ে দিলো। অনুমতি পাওয়ার সাথে সাথে রুম নাম্বার জেনে নিয়ে সেদিকে এগিয়ে গেলো সে।
দরজায় সামনে পৌঁছে টোকা দিতেই ভেতর থেকে কাঁপা গলায় ভেসে এলো…

— কে…?

— ম্যাম আমি শেহরোজ। আদিত্য স্যারের স্টাফ। আদিত্য স্যার আমাকে পাঠিয়েছেন। প্লিজ দরজা খুলুন।

কিছুক্ষণ পরেই দরজা খুলে দিলো নোরা ‌। তার এলোমেলো চুল, লাল হয়ে থাকা চোখ, ফ্যাকাশে মুখ দেখে শেহরোজের বুঝতে বাকি রইলো না কতটা স্ট্রেসে ছিলো মেয়েট। সে নোরাকে উদ্দেশ্য করে বললো…

— ভয় পাবেন না ম্যাম। স্যার আপনাকে নিতে এসেছেন। এতক্ষণে হোস্টেলের নিচে পৌঁছেও গেছেন হয়তো।

কয়েক মিনিটের মধ্যেই নিরাপত্তার বলয়ের মধ্যে নোরাকে নিয়ে বেরিয়ে এলো তারা। নোরা কে দেখা মাত্রই সাংবাদিকরা ছুটে এলো চারদিক থেকে।

— ম্যাম, এক মিনিট!

— আয়াত মাহমুদের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কী?

— ম্যাম কিছু তো বলুন!

কেউ একজন ক্যামেরা প্রায় মুখের সামনে এনে ধরতেই আদিত্যর গাড়ি এসে থামলো সেখানে। আদিত্য দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে এসে অত্যন্ত ঠাণ্ডা অথচ কঠিন কণ্ঠে বললো….

— ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে একজন মেয়েকে এভাবে হয়রানি করা বন্ধ করুন। আপনারা যদি আর এক কদম এগোন, আইনগত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবো।

আদিত্যর বজ্রকণ্ঠে মুহূর্তের জন্য থমকে গেল সবাই। বিখ্যাত বিজনেসম্যান শেহজাদ আদিত্য চৌধুরীকে তারা সকলেই চেনে। এখন আবার তাদের মাথায় নতুন প্রশ্নের জন্ম দিলো।

নোরা কে নিয়ে আদিত্যর গাড়ি প্রস্থান হতেই তাদের মাইক্রোফোন জেগে উঠলো…

—আপনারা দেখলেন বিশিষ্ট বিজনেসম্যান সাহাজাদ আদিত্য চৌধুরী নিজে এখানে এসে মেয়েটিকে রেসকিউ করে নিয়ে গেলেন।

—এই ঘটনার সাথে আর এই মেয়েটার সাথেই বা আদিত্য চৌধুরীর সম্পর্ক কি? কেনো তিনি তাকে প্রটেক্ট করলেন?

—ঘটনাটা কি শুধু বিখ্যাত সিঙ্গার আয়াত মাহমুদ কে ঘিরে নাকি অন্য কোন গল্প আছে! জানতে হলে আমাদের নিউজ চ্যানেলের সাথেই থাকুন!

হাইওয়েতে স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে চলছে আদিত্যর গাড়ি। ড্রাইভিং সিটে শেহরোজ। পেছনে নোরা আর আদিত্য বসেছে। নোরা এখনো থেকে থেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে উঠছে।

আদিত্য একটা মিনারের ওয়াটার বোতল এগিয়ে দিয়ে বললো…

— আর ভয় নেই। তুমি এখন নিজের মানুষের কাছেই যাচ্ছ।

নোরা মাথা নেড়ে পানির বোতল টা নিয়ে পানি পান করলো।

আদিত্যর গাড়ি ঘন্টাখানেকের মধ্যে আশাকুঞ্জে পৌঁছাতেই ছুটে এলো মৌমিতা।
এক মুহূর্তও দেরি না করে নোরাকে জড়িয়ে ধরলো সে।
দুই বান্ধবী একে অপরের সাহারা পেয়ে যেন অনেকদিনের জমে থাকা সব কষ্ট কান্নায় ভাসিয়ে দিলো।
আশালতা বেগম কাছে এসে নোরার মাথায় হাত রাখলেন…

— কেঁদো না মা। এই বাড়িতে তোমার কোন অসুবিধে হবে না। আমরা সবাই তোমার পাশে আছি।

সাদমান চৌধুরীও স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন ..

— আজ থেকে এই বাড়িটাকে নিজের বাড়ি ভাববে।
আজ এতো বড় একটা দুঃসময়ে নোরার মনে হলো, সত্যিই হয়তো সে একা নয়।

___________

এদিকে সকাল গড়াতেই নিজের অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া পেজে একটি ভিডিও প্রকাশ করলো আয়াত মাহমুদ।
মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে গেল।
শান্ত নিঃসংকচ কণ্ঠে আয়াত জানালো….

“আজ বিকেলে আমি একটা Press conference করবো। সেখানে উক্ত ঘটনা নিয়ে যত প্রশ্ন আছে, সব কিছুর উত্তর দেবো।
কিন্তু তার আগে একটা বিষয় পরিষ্কার করতে চাই।
আমার এবং আমার কাছের মানুষের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত মুহূর্ত আমাদের অনুমতি ছাড়া গোপনে ধারণ করে গণমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। একজন সিঙ্গার হওয়ার আগে আমি একজন সাধারন মানুষ। গানের জগত ছাড়াও আমার একটা ব্যক্তিগত জীবন আছে। আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কেউ বিনা অনুমতিতে এ ধরনের অনৈতিক কাজ করে আমাদেরকে হেনস্থা করবে সেটা আমি এলাও করব না।
এটা শুধু অনৈতিক নয়, আইনতও অপরাধ। আমি প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করছি, যে-ই এই কাজ করে থাকুক, তাকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক।
কোনো মানুষের ব্যক্তিগত জীবন কারও বিনোদনের বিষয় হতে পারে না।”

ভিডিওটা ভাইরাল হতেই মানুষের আলোচনার মোড় ঘুরে গেল।
এতক্ষণ যারা আয়াত এবং তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনা করছিল, আয়াতের সাথে মেয়েটা কে সেটা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিলো তারা এবার সবাই জানতে চাইছে,,,

—ছবিগুলো ফাঁস করলো কে?

অনুরাগীরা protest করা শুরু করলো সোশ্যাল মিডিয়ায়।

—আসল অপরাধীকে গ্রেফতার করা হোক। আসল অপরাধীকে খুঁজে বের করা হোক।

পরিস্থিতিও ধীরে ধীরে শান্ত হতে শুরু করলো।
দুপুরের দিকে আদিত্য পৌঁছে গেল আয়াতের বাড়িতে। আদিত্যকে পেয়ে আয়াত সব কিছু খুলে বলল তাকে।
আদিত্য আয়াতকে জানালো নোরা এখন তার বাড়িতে সেফ আছে। এটা জানার পর মুহুর্তেই যেন শীতলতা নেমে এলো আয়াতের হৃদয়ে। কিছুটা শান্তি পেলো ছেলেটা।
পরে আয়াত আর আদিত্য দু’জন মুখোমুখি বসে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করলো।
আয়াত ক্লান্ত কণ্ঠে বললো….

— গতকাল পর্যন্ত সবকিছু ঠিক ছিল আদি। আমি তো নিশ্চিত, ছবিগুলো ক্যাফে থেকেই বের হয়েছে।

আদিত্য কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো….

— তাহলে উত্তরও ক্যাফেতেই আছে। চল সেখানে যায়। ওখানে থেকেই জানা যাবে এই ছবিগুলো বাইরে, মিডিয়ার কাছে কি করে পৌঁছালো।

আয়াতেরও আদিত্য সিদ্ধান্ত পছন্দ হলো। দেরি না করে দু’জনে সরাসরি পৌঁছে গেল সেই ক্যাফেতে।

ম্যানেজার প্রথমে কিছুটা ইতস্তত করলেও আয়াতের সাথে আদিত্য চৌধুরীকে দেখে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে সিসিটিভি ফুটেজ দেখাতে রাজি হলো।

আয়াত এবং আদিত্য তীক্ষ্ণদৃষ্টি সিসিটিভি ফুটেজে নিবদ্ধ।
সেদিনের নির্দিষ্ট সময়ের ফুটেজ ওন করলে প্রথমে দেখা গেলো আয়াত আর নোরা নিজেদের মতো কথা বলছে। আশেপাশের সবকিছুই স্বাভাবিক।
কিছুক্ষণের মধ্যে দরজায় একজনকে দেখা গেলো। সেই ভেতরে নজর রাখছে। কিছুক্ষণ পর সে তার ফোনে ছবি নিতেও দেখা গেল। আদিত্যের ভুরু কুঁচকে এলো ছেলেটাকে দেখে। আয়াতের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,,,

—কে এই ছেলেটা চিনিস তুই?

আয়াত এতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিল। আদিত্যর প্রশ্নে ধান ভঙ্গ হয়ে অস্ফুট স্বরে বলল….

—সোহেল। নোরার ওয়ার্ক শপের সহকর্মী।

আদিত্য তিক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো ফুটেজে।
ছেলেটার মুখ জুম করে ভালো করে অবজার্ভ করলো। ছেলেটার চোখে স্পষ্ট ঈর্ষা।
দেখা গেলো ছেলেটা মোবাইল বের করে আড়াল থেকে একের পর এক ছবি তুলছে আয়াত এবং নোরার।
এরপর দ্রুত ক্যাফে থেকে বেরিয়ে গিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফোনে কারও সঙ্গে কথা বললো।

সবকিছু নিজের চোখে দেখে আয়াতের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। তার বুঝতে বাকি রইল না এই সবকিছুর পেছনে একমাত্র সোহেলের হাত আছে।
আদিত্য শান্ত কন্ঠে প্রশ্ন করলো…

—ছেলেটা কি নোরাকে পছন্দ করতো?

রাগে আয়াতের দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠলো। দাঁতে দাঁত চেপে বলল…

— আমি জানতাম… নোরাকে নিয়ে ওর অসুস্থ আগ্রহ ছিলো। নোরা তাকে কোনদিন পাত্তা দেয়নি।
কিন্তু হিংসা আর ঈর্ষা থেকে ছেলেটা যে এতটা নিচে নামবে, ভাবিনি।

আদিত্য শান্ত গলায় বললো…

— রাগ নয়, শান্ত হ। এবার যা করার আইন করবে। এটাও বললো সে নিজে ওসির সাথে বিশেষ ভাবে কথা বলবে।

সিসিটিভির সম্পূর্ণ ফুটেজ সংগ্রহ করে দু’জনে সরাসরি থানায় গেলো।
আদিত্যর কথামত, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন, মানহানির উদ্দেশ্যে ছবি প্রচার এবং সাইবার অপরাধের অভিযোগে সোহেলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলো আয়াত। এবার শুধু সোহেলের ধরা পড়ার অপেক্ষা। জন্মের মত শিক্ষা দিয়ে দিবে তাকে।

________

বিকেলে প্রেস কনফারেন্স ডেকে আদিত্যকে সাথে নিয়ে আয়াত সম্পূর্ণ ঘটনাটা খোলাসা করলো। এটাও বললো নোরার সাথে আয়াত রিলেশনশিপে আছে এবং খুব দ্রুতই তারা সুসংবাদ দিবে ভক্তদের। এটা নিয়ে যেন কেউ কোন রিউমর না ছড়ায়। সোশ্যাল মিডিয়া বা ব্যক্তিগত জীবনে যেন মেয়েটিকে কেউ বিরক্ত না করে।
পরবর্তিতে এই ধরনের ঘটনা ঘটলে আইনত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবো। সেদিনের মতো পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলো।

সন্ধ্যা নামতেই আয়াত তার মা বিপাশা মাহমুদকে নিয়ে আশাকুঞ্জে উপস্থিত হলো। ড্রইংরুমে তখন সবাই একসঙ্গে বসে।
নোরা মাথা নিচু করে মৌমিতার পাশে বসে আছে।
বিপাশা মাহমুদ উঠে এসে নোরার পাশে বসলেন।
তারপর মেয়েটার থুতনিতে আলতো হাত রেখে মুখটা উপরে তুললেন। চোখ দুটো কান্নায় ফুলে আছে নোরার।

সামনেই দাড়ানো আয়াত দেখলো নোরার সেই ফোলা ফোলা মুখটা‌। বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠলো তার।

বিপাশা মাহমুদ স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন…..

— মা… আজ থেকে নিজেকে আর অনাথ ভাববে না কেমন। আমার ছেলের জীবনে যদি তোমার জায়গা থাকে, তাহলে আমার জীবনেও তোমার জায়গা আছে।

বিপাশা মাহমুদের কথায় নোরার চোখ আবার ভিজে উঠলো।
সে নিঃশব্দে বিপাশা মাহমুদের হাত দুটো আঁকড়ে ধরে বাহুতে মাথা রাখলো।
ঘরজুড়ে নেমে এলো আবেগঘন নীরবতা। মৌমিতার অন্তরেও শান্তি মেলে। একটা সময় এই মেয়েটায় ছিলো তার একমাত্র আপনজন।

কিছুক্ষণ পর আয়াত উঠে দাঁড়ালো। সবার দিকে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বললো…

— আমি অনেক আগেই নোরাকে আমার জীবনসঙ্গিনী হিসেবে বেছে নিয়েছি। শুধু ওর স্বপ্নের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু আজ যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, তার পর আর দেরি করতে চাই না। সে একবার নোরার দিকে তাকালো। তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কন্ঠে বললো…

— মা! তোমার আর এই পরিবারের সকলের দোয়া আর সম্মতি নিয়ে আমি নোরার সঙ্গে আমার বাগদান সম্পন্ন করতে চাই।

বিপাশা মাহমুদ হাসিমুখে সাদমান চৌধুরী আর বোন আশালতা বেগমের দিকে তাকালেন।

সাদমান চৌধুরী বললেন….

— আমাদের কোনো আপত্তি নেই। বরং আমরা চাই, এই সম্পর্কটা সম্মান আর দোয়ার মধ্য দিয়েই এগিয়ে যাক। কি বলো আদিত্য ?

বাবার কথায় মাথা নেড়ে সম্মতি দেয় আদিত্য…

—আমার ভাই বিয়ে করবে তার পছন্দের মেয়েকে। এতে অসম্মতির কি আছে! জীবন ওদের, সিদ্ধান্তও ওদের!

মৌমিতা আনন্দে নোরার কাঁধ জড়িয়ে ধরলো। আজ সে ভীষণ খুশি। সবথেকে বেশি খুশি সে আদিত্যর ওপর। মানুষটা তার পাশে না থাকলে আজ এই খুশির দিনটা সে দেখতে পেত না।
এদিকে লজ্জায় আর অস্বস্তিতে নোরা মাথাটা আরও নিচু করে নিলো।

আর আয়াত…
সে শুধু এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো নিজের ভালোবাসার মানুষটির দিকে।
অবশেষে তার মনে হচ্ছে দীর্ঘ ঝড়ের পর হয়তো তাদের জীবনে এবার একটু শান্তির বাতাস বইছে। নিজের ভালোবাসা কে নিজের করে পাওয়ার এক অদম্য আনন্দ আয়াতের হৃদয়ে মৃদু ছন্দে প্রেম গীত গাইছে যেন।

চলবে……

#ফিরেছি_তোর_আঙিনায়
পর্ব —২৪
মৌমো তিতলী

রাত প্রায় সাড়ে দশটা।
শহরের ব্যস্ততা অনেকটাই স্তিমিত তখন। মেহরাব গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত একটি Raw material storage। একসময় যেখানে সারি সারি কাঁচামালের কন্টেইনার,ট্রাক আর কর্মচারীদের আনাগোনায় সরগরম থাকতো জায়গাটা, আজ সেখানে ধুলো জমেছে। প্রতি বছর বর্ষায় পানি ওঠার কারনে জায়গাটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

মরিচা ধরা বিশাল লোহার গেট। ভাঙাচোরা কংক্রিটের মেঝে। ছাদের বিভিন্ন অংশে মাকড়সার জাল ঝুলে আছে। কোথাও কোথাও বৃষ্টির পানি পড়ে স্যাঁতসেঁতে হয়ে আছে মেঝে। কয়েকটি হলদে ফ্লাডলাইটের ক্ষীণ আলোয় পুরো গোডাউনটাকে ভয়ঙ্কর লাগছে।

গোডাউনের ঠিক মাঝখানে একটা কাঠের চেয়ারে হাত-পা শক্ত দড়ি দিয়ে বাঁধা অবস্থায় বসে আছে রায়হান কাবির।

সেদিনের পার্টিতে পরিধানকৃত ধুসর রঙা পরিপাটি স্যুট এলোমেলো হয়ে গেছে। কপাল ঘামে ভিজে উঠেছে। ঠোঁট শুকিয়ে সাদা হয়ে আছে। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপত্তারক্ষীদের দেখে বারবার ঢোঁক গিলছে সে। আজ দু’দিন ধরে সে এখানে বন্দি।

ঠিক তখনই…

ভারি বুটের আওয়াজে গোডাউনের ভেতরটা গমগম করে উঠলো। গম্ভীর পদাঘাতে সেখানে প্রবেশ করলো শেহজাদ আদিত্য চৌধুরী।

কালো শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। মুখে কঠোরতা ছাড়া কোনো অভিব্যক্তি নেই। কিন্তু সেই থমথমে কঠিন মুখটাই যেন সবচেয়ে ভয়ংকর লাগছে।
তার প্রতিটি পদক্ষেপের শব্দ গোডাউনের নিস্তব্ধ দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে গা ছমছমে ভুতুড়ে একটা আবহ তৈরি করেছে ।

মেহরাব কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিলো। বেচারা পড়েছে মহা বিপদে। মেহরাবের টুকটাক বদ অভ্যাস থাকলেও সে মারাত্মক কোন কাজে নিজেকে কখনো জড়ানোর সাহস করে না। শুধুমাত্র আদিত্যর কম্পানির সাথে দশ কোটিরও অধিক অর্থের ডিল সাইন করেছে বিধায় বাধ্য হয়ে সে নিজের কোম্পনির লোকসানের কথা ভেবে এতবড় একটা কান্ড ঘটিয়ে অবশেষে ভয়ে এখন পস্তাচ্ছে । কোন কুক্ষণে যে আদিত্যর মত একটা ডাকাতের সাথে সে পার্টনারশিপ করেছিলো সেই কথা ভেবে ক্ষণে ক্ষণে নিজেকেই থাপড়াতে ইচ্ছে করছে তার।
এমন সময় আদিত্যকে ভেতরে ঢুকতে দেখেই হন্তদন্ত পায়ে এগিয়ে এলেন তিনি। হড়বড়িয়ে শুধু বললেন,..

— আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।

আদিত্য কোনো উত্তর দিল না। সে ধীরে ধীরে রায়হানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। কয়েক সেকেন্ড শুধু তাকিয়েই রইলো তার দিকে। সেই দৃষ্টিতে এতটাই তীব্র ঘৃণা ছিল যে রায়হান চোখ নামিয়ে নিতে বাধ্য হলো। এমনিতেও দু দিন পানাহারের অভাবে চোখ তুলে তাকিয়ে থাকার মতো শক্তি তার দেহে অবশিষ্ট নেই।

এক সময় আদিত্য ধীর বরফশীতল কণ্ঠে বললো…..,

— ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আমি মেনে নিতে পারি। বিশ্বাসঘাতকতাও একদিন ভুলে যাওয়া সম্ভব হয়। কিন্তু…
বলেই রায়হানের দিকে সে এক ধাপ এগিয়ে এলো। রায়হানের মুখের কাছাকাছি মুখটা এনে হিসহিসিয়ে বললো,,,,

— আমার স্ত্রীর দিকে কুদৃষ্টি দেওয়ার,তাকে তোর এই নোংরা হাতে ছোঁয়ার সাহস কোথা থেকে পেলি? তোর কলিজা কত বড়? কে দিলো তোর এই বুকের পাটা? আজ আমি সেটা দেখবো।

রায়হান কাঁপা গলায় ধীর গতিতে বলল,,,

— আ… আদিত্য… আমার ভুল হয়ে গেছে…আমি আমি জানতাম না মৌমিতা আপনার ওয়া….

কথা শেষ হওয়ার আগেই আদিত্যর মুষ্টি সজোরে আঘাত করল তার মুখের পাশে। চেয়ারসহ কেঁপে উঠল রায়হান। সে কিছু বলার আগেই আদিত্য তার শার্টের কলার শক্ত করে চেপে ধরল।

— “Shut up!”তোর সাহস কি করে হলো মৌমিতার নাম উচ্চারণ করার! ম্যাডাম বল কুত্তার বাচ্চা! বল!
তার কণ্ঠে ক্রোধ। দাঁতে দাঁত চেপে আবার বললো…

— পরিকল্পনা করে নেশাজাতীয় দ্রব্য মিশিয়ে ড্রিংক করিয়ে তারপর অচেতন অবস্থায় আমার স্ত্রীকে জোর করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিস। এটাকে তুই ভুল বলবি? এটা তোর ভুল?

রায়হান ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে মাথা নাড়ল।

— আমি… আমি শুধু…

আদিত্য আরেকটি ঘুষি বসিয়ে দিল ওপর চোয়ালে।
রায়হানের মুখ থেকে অস্ফুট আর্তনাদ বেরিয়ে এলো।
চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই নিশ্চুপ। মেহরাবের কপাল ঘেমে উঠছে বারংবার। হাতের রুমালটা দিয়ে বার বার ঘাম মুছছে সে‌।

আদিত্য নিজের রাগকে কোনোমতে নিয়ন্ত্রণে এনে ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেলো। তারপর পকেট থেকে মোবাইল বের করে রেকর্ডিং চালু করল।
শীতল কণ্ঠে বলল,

— শেষ একটা সুযোগ দিচ্ছি। সত্যিটা নিজের মুখে স্বীকার কর। নাহলে এখানেই তোকে জ্যান্ত পুঁতে দেবো বাস্টার্ড!

রায়হান কিছুক্ষণ ইতস্তত করল। এই স্টেটমেন্ট দিয়ে জেলে যাওয়া মানেই তার ক্যারিয়ার বরাবরের মতো ধ্বংস হয়ে যাওয়া। আর কখনো উঠে দাঁড়ানো পসিবল হবে না। কিন্তু না বললে আদিত্য তাকে মেরে ফেলবে। সে বাঁচতে চাই! মরতে চাই না!

তার ওপর আদিত্যর কঠিন দৃষ্টি আর আশপাশের পরিস্থিতি দেখে অগত্যা সে কাঁপা কণ্ঠে বলতে শুরু করল,

—আমি… আমি ওয়েটারকে টাকা দিয়েছিলাম… জুসে নেশার ওষুধ মিশিয়ে ম্যাডামের কাছে পাঠাতে বলেছিলাম… তাকে অচেতন করে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম… আদিত্য চৌধুরীর ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য…আর..আর নিজের নোংরা যৌন চাহিদা পূরণ করার জন্য। এই পর্যন্ত বলেই প্রচন্ড রকম হাঁপাতে লাগলো রায়হান।

আদিত্য রেকর্ডিং বন্ধ করলো।
মেহরাবের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,

— এবার আইন তার কাজ করবে। পুলিশকে কল করুন।

মেহরাব সাথে সাথে হুকুম তামিল করে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুলিশের গাড়ির সাইরেন শোনা গেল।

দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তারা ভেতরে প্রবেশ করতেই আদিত্য পুরো ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিল।
এরপর নিজের মোবাইলটি এগিয়ে দিয়ে বলল,,,

— এখানে অভিযুক্তের স্বীকারোক্তির সম্পূর্ণ ভিডিও রয়েছে। আর হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজও আপনাদের কাছে পৌঁছে যাবে। আশা করি আইনের সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পুলিশ সদস্যরা রায়হানকে নিজেদের হেফাজতে নিলেন। হাতকড়া পরানোর সময় রায়হান একবার অসহায় চোখে আদিত্যর দিকে তাকালো। জীবনে কোন পাপের জন্য তার ঘড়া পূর্ণ হয়ে গেলো সেটাই দেখলো সে!

কিন্তু আদিত্যর চোখে কোনো দয়া ছিল না। না কোন অভিব্যক্তি। ছিলো শুধুই কঠিন, অবিচল এক দৃষ্টি।

পুলিশ রায়হানকে নিয়ে প্রস্থান করলে আদিত্য নিজেও
গোডাউনের বাইরে বেরিয়ে নিজের গাড়িতে উঠে বসলো।স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে সে গভীর শান্তির নিঃশ্বাস ফেললো।
তার ভালোবাসার অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া শেষ! এখন তার একটাই গন্তব্য!
আশাকুঞ্জ! সেখানে তার স্ত্রী তার জন্য অপেক্ষা করছে।

___________

রাত তখন প্রায় দুইটা ছুঁইছুঁই।

ঢাকার কোলাহল অনেক আগেই নিস্তব্ধতার কাছে হার মেনেছে। শুধু মাঝেমধ্যে রাস্তায় চলাচলকৃত গাড়ির ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসছে, আবার মিলিয়েও যাচ্ছে রাতের গভীরতায়। আকাশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য তারার আলো যেন নিঃশব্দে পাহারা দিচ্ছে ঘুমন্ত শহরকে।
সেই নিস্তব্ধতার মাঝেই ধীরগতিতে আশাকুঞ্জের বিশাল লোহার গেট পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল শেহজাদ আদিত্য চৌধুরীর গাড়ি।
বাগানের দু’পাশে সারিবদ্ধ সাদা বেলি আর রজনীগন্ধার গাছ থেকে ভেসে আসা মিষ্টি সুবাস পুরো পরিবেশটাকে অপর্থিব সৌন্দর্যে আবেশিত করেছে। চারপাশে নিভু নিভু গার্ডেন লাইটের আলো। রাতের শিশিরে ভিজে থাকা সবুজ ঘাসগুলো হালকা আলোয় ঝিকমিক করছে।
গাড়ি থেকে নেমে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে সেথায় দাঁড়িয়ে রইল আদিত্য।
কয়েক ঘণ্টা আগেও তার ভেতরে যে দাবানল জ্বলছিল, বাড়ির সামনে দাঁড়াতেই যেন সেই আগুন ধীরে ধীরে শীতল হতে শুরু করেছে। কারণ এই বাড়ির ভেতরেই আছে তার সমস্ত শান্তি… তার সমস্ত অস্তিত্বের সবচেয়ে প্রিয় মানুষগুলোর উপস্থিতি বিরাজমান। আদিত্য বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলো নিঃশব্দে।
ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে নিজের কক্ষের দরজা খুললো সে।
রুমের প্রধান লাইট নিভিয়ে রাখা। শুধু বেডসাইড ল্যাম্পের মৃদু হলুদ আলোয় ঘরটা কোমল এক সোনালী আভা ছড়িয়ে আছে।
বিছানার একপাশে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে মৌমিতা।
মুখের ওপর এসে পড়া কয়েকটি এলোমেলো চুল। শান্ত, নিষ্পাপ ঘুমন্ত মুখ। নিয়মিত শ্বাস-প্রশ্বাসে ধীরে ধীরে উঠানামা করছে তার বুক।
আদিত্য দরজার কাছেই কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল।
অদ্ভুত এক প্রশান্তি নেমে এলো তার ভেতর।

এই মেয়েটার জন্যই আজ সে নিজের সমস্ত সীমা ভুলে গিয়েছিলো। যে মানুষটা একদিন এই মেয়েটাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতেই চাইনি, এই বিয়েটা নিয়ে কোনরকম আবেগকে প্রকাশ করতে শেখেনি, সেই মানুষটিই আজ বুঝতে পারছে কাউকে হারানোর ভয় কতটা নির্মম হতে পারে।
ধীরে ধীরে বিছানার পাশে গিয়ে বসে পড়লো সে।
খুব যত্ন করে মৌমিতার কপালের ওপর পড়ে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিলো।
কয়েক মুহূর্ত অপলকে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
তারপর খুব আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল মৌমিতার কপালে। মৌমিতার গালে গাল লাগিয়ে
চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড সেভাবেই রইল।
মৃদু স্বরে ফিসফিস করে বলল,,,

— তুমি ফিরেছো আমার আঙিনায়! এটাই আমার সবচেয়ে বড় শান্তি। এভাবেই থেকে যেও মৌমি! অমর আর কিচ্ছু চাই না। শুধু তোমাকে চাই!

আর কোনো শব্দ না করে উঠে ওয়াশরুমে চলে গেলো সে। কিছুক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে বেডসাইড ল্যাম্পটাও নিভিয়ে দিলো। অন্ধকার ঘরে শুধু এসির মৃদু শব্দ ছাড়া কোন শব্দ নেই।
ধীরে ধীরে বিছানায় শুয়ে দুই হাত দিয়ে আলতো করে জড়িয়ে নিল মৌমিতাকে।
ঘুমন্ত অবস্থাতেই পরিচিত উষ্ণ স্পর্শ অনুভব করলো মৌমিতা। এসির শীতল বাতাসে শরীরটা অজান্তেই কেঁপে উঠতেই সে আরও একটু গুটিয়ে গেল আদিত্যর বুকের ভেতর। মুখটা গুঁজে দিল তার বুকে। এক হাত আলতো করে আঁকড়ে ধরলো তার টিশার্ট।
আদিত্যর ঠোঁটের কোণে এক পরম তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠলো তাতে। আরও একটু শক্ত করে আগলে নিলো নিজের পৃথিবীটাকে। অনেকদিন পর তার বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত অস্থিরতা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগলো।
নিশ্চিন্ত ঘুম নেমে এলো তার চোখে।

পরদিন সকালে।

জানালার পর্দা ভেদ করে সোনালি রোদ এসে ছড়িয়ে পড়েছে পুরো আশাকুঞ্জে। বাগানের নানা রঙের ফুলের ওপর বসে প্রজাপতিরা উড়ে বেড়াচ্ছে। গাছে গাছে পাখিদের কিচিরমিচিরে মুখরিত হয়ে উঠেছে চারপাশ।
মৌমিতা অনেক আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। ফজরের নামাজের পর অল্প কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিয়েছে সে। এরপর উঠে ফ্রেশ হয়ে ঘুমের কাপড় ছেড়ে হালকা গোলাপী রঙের একটি সুতির শাড়ি পরে নিচে নেমে এলো মৌমিতা।
কিচেনে তখন আশালতা বেগম নাস্তার বানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। মৌমিতাকে দেখে তিনি মৃদু হেসে বললেন,,

— এত সকাল সকাল চলে এলি নিচে?

মৌমিতা হেসে কিচেন এপ্রোনটা পরে নিলো। হেসে বলল,,,

—তুমি একা একা সব করবে নাকি? আর আমি বসে থাকব? সেটা কি হয়?

আশালতা বেগম স্নেহভরা চোখে তাকিয়ে রইলেন।

— আচ্ছা, তাহলে এই ফলগুলো কেটে দে। আমি পরোটাগুলো ভেজে দিচ্ছি।
দু’জনে গল্প করতে করতেই অল্প সময়ের মধ্যে নাস্তার সব প্রস্তুতি শেষ হয়ে গেলো।
একটু পর সবাই একে একে ডাইনিং টেবিলে এসে বসলো।
সাদমান চৌধুরী, আশালতা বেগম, আদিত্য, মৌমিতা, আয়াত, নোরা এবং বিপাশা মাহমুদ। অনেকদিন পর আশাকুঞ্জে সকালের নাস্তার টেবিল মানুষজনে গমগম করছে।
গত দিনের ক্রাইসিস ভুলে ডাইনিং টেবিলজুড়ে হাসি-আড্ডার উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়লো মুহূর্তেই।

নোরাও আগের দিনের তুলনায় অনেকটাই স্বাভাবিক। মাঝে মাঝেই সবার কথায় লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে ফেলছে।
নাস্তা শেষ আদিত্য সবার উদ্দেশ্যে ঘোষণা দিলো,,,

—এবার তাহলে একটা শুভ কাজের দিনক্ষণ ঠিক করে ফেলি। এত দেরি করারও তো কোনো মানে হয় না।

কথাটা শুনে নোরা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল।
আয়াত মুচকি হেসে একবার তার দিকে তাকালো নোরার আনত মুখের পানে।

সাদমান চৌধুরী ছেলের কথায় সায় দিয়ে বললেন,,

— আজ মঙ্গলবার। তাহলে তিনদিন পর শুক্রবারে বাগদান সম্পন্ন করা যায়। দিনটাও ভালো। আমার মনে হয় ওই দিনই আংটি পরানোর অনুষ্ঠানটা করা যেতে পারে।

আশালতা বেগমও সম্মতি জানালেন,,,

— আমারও তাই মনে হয়।

বিপাশা মাহমুদ হাসিমুখে বললেন,,,

— তাহলে আর দেরি কেন ভাইজান? শুক্রবারই হোক। আমার একমাত্র ছেলের বিশেষ দিনটা কিন্তু ধুমধাম করে উদযাপন করা চাই!

সবাই একবাক্যে সম্মতি দিল।
আদিত্য টেবিলের ওপর আঙ্গুল দিয়ে ছন্দ তুলে বলল,,,,

— তাহলে এই তিনদিনে যা যা কেনাকাটা আর প্রস্তুতির দরকার, সব শেষ করে ফেলতে হবে।

আয়াত হেসে বলল,,,

— আমি তো তৈরি ভাই! শপিংয়ের কাজটা আজ থেকেই শুরু করা যায়।

সাদমান চৌধুরীও মাথা নাড়লেন।

— ঠিক আছে। অতিথিদের তালিকা, ভেন্যুর সাজসজ্জা সবকিছুর দায়িত্ব আমরা তিনজন ভাগ করে নেব। কিন্তু শপিং টা মেয়েদের কাজ। ওটা তোমারা চারজন মিলে সেরে ফেলো। প্রয়োজনে আদিত্য তোমাদের কে সাহায্য করবে।

আদিত্য শান্ত গলায় বলল,,,

— কোনো ত্রুটি যেন না থাকে সেদিকে আমি খেয়াল রাখবো বাবা। এটা আমার ভাইয়ের জীবনের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান বলে কথা! সবকিছু নিখুঁতভাবেই হবে।

কথাটা শুনে সবাই হেসে উঠলো।
আশাকুঞ্জ নতুন করে বিয়ের আমেজে মেতে উঠলো।

চলবে…….