Home "ধারাবাহিক গল্প তিমিরবসান তিমিরবসান পর্ব-০৪

তিমিরবসান পর্ব-০৪

0
366

#তিমিরবসান(৪)
#তাবাসসুম_তাজ্বওয়ারী

– এবার কিছু করো ফাহাদ? বিয়ে করেছো বউ এসেছে এবার দায়িত্ব তো নিতে হবে!

কয়েকমাস কেটে গেছে। একদিন খেতে বসে ফাহাদের বাবা ফাহাদকে কথাটা বলছিল। ফাহাদ খেতে খেতেই উত্তর দিলো,

– কিছু করব মানে? চাকরি? ওসব আমাকে দিয়ে হবে না বাবা। আমি এমনিই বিন্দাস আছি। আর তাছাড়াও তোমার কি কম আছে নাকি যে আমার চাকরি করতে হবে?

ফাহাদের বাবা ঠান্ডা গলায় বললো,

– অবশ্যই কম নেই তোমাকে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ানোর মতো আমার ক্ষমতা আছে কিন্তু আমি চাই না তোমাকে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াতে।

ফাহাদ মজার বশে উড়িয়ে দিয়ে বললো,

– বাবা নিশ্চয়ই মজা করছো আমার সাথে? এত থাকতে আমার চাকরির কি দরকার তাও আবার কারো আন্ডারে! মানুষজনের হয়ে কাজবাজ আমি করতে পারি না।

– আমি মজা করছি না! একটা লিমিট থাকা দরকার ফাহাদ। বয়স তো কম হলো না। এবার একটু দায়িত্বশীল হও। তোমার এখন একটা নিজের সংসার আছে তবুও তুমি এসব কিভাবে বলছো? তোমার জন্য আমি খুলনায় চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছি তুমি কয়েকদিন পরই জয়েন করবে।

ফাহাদ যেন আকাশ থেকে পড়লো। খাওয়া থামিয়ে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে বললো,

– কি! বাবা তুমি আমাকে না জানিয়ে চাকরির ব্যবস্থা করেছো? তাও আবার খুলনায়!!

– কেন তোমার পারমিশন লাগবে বুঝি?

খাবার রেখে উঠে দাঁড়াল ফাহাদ। ঘরের দিকে যেতে যেতে বললো,

– আমি কোনো চাকরি বাকরি করবো না বলে দিলাম। আর খুলনায় ও আমি যাচ্ছি না। যা করার করো তুমি।

ফাহাদ যেতে নিলেই পেছন থেকে ওর বাবা শীতল গলায় বলে উঠলো,

– আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করিনি ফাহাদ, আদেশ দিয়েছি। আর যদি না যাও তবে কাল সকাল দশটার মধ্যে তোমার নামে থাকা সমস্ত ক্রেডিট কার্ড আর জামান গ্রুপের শেয়ার আমি হোল্ড করে দেব। এক টাকাও পকেটমানি পাবে না। এবার সিদ্ধান্ত তোমার নিজের খরচে বিন্দাস থাকবে, নাকি রাস্তায় নামবে?

ফাহাদের পা দুটো থমকে গেল। পেছন ফিরে অবিশ্বাস্য চোখে তাকাল বাবার পানে। সে ভালো করেই জানে তার বাবা মুখে যা বলে তা করে ছাড়ে। ক্রেডিট কার্ড আর পকেটমানি বন্ধ হয়ে গেলে বন্ধুদের আড্ডায় তার রাজকীয় ভাবমূর্তি, রাতের নে’শা আর এই দামি লাইফস্টাইল ধুলোয় মিশে যাবে। রাগে ফাহাদের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল কিন্তু বাবার মুখের ওপর আর কথা বলার সাহস হলো না বলে সে গটগট পায়ে হেঁটে নিজের রুমে চলে গেল।

এদিকে ফাহাদের যাওয়ার কথা শুনে স্নিগ্ধার বুকের ভেতর যেন এক পশলা ঠাণ্ডা বৃষ্টি নেমে এলো। ফাহাদ যদি খুলনায় চলে যায়, তবে অন্তত কিছুদিনের জন্য হলেও সে এই যন্ত্র’ণা আর পাশ’বিক অত্যা’চার থেকে মুক্তি পাবে! একটু শান্তিতে নিঃশ্বাস নিতে পারবে।

একটু পর সব গুছিয়ে রুমে যেতেই স্নিগ্ধা দেখল ফাহাদ রাগে ঘরের ফুলদানিটা দেওয়ালে আ.ছাড় মে’রে ভেঙে ফেলেছে। খাটের চাদর টেনে হিঁচ’ড়ে মেঝেতে ফেলে দিচ্ছে। স্নিগ্ধা ঢুকবে কি ঢুকবে না এই করে দাঁড়িয়ে ছিলো। ফাহাদ ওকে দেখেই হিংস্র বাঘের মতো তেড়ে এলো। দাঁত কিড়মিড় করে বলল,

– কীরে বাইরে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছিস? খুব ভালো লাগছে? খুব খুশি হচ্ছিস, তাই না রে? মনে মনে ভাবছিস আমি দূরে চলে গেলে তুই স্বাধীন হয়ে যাবি? এই ফাহাদ জামানকে এত সহজে দমানো যায় না। আমার থেকে তোর মুক্তি নেই।

স্নিগ্ধা জানতো সে নির্দোষ হলেও স্নিগ্ধার উপরই ফাহাদ রাগ ঝাড়বে, এটাই তো হয়ে আসছে এত গুলো মাস। ফাহাদ ওর হাত খামচে ধরে বলল,

– চুপ করে আছিস কেন? শুনে রাখ আমি যাবো না কোথাও! তুই বাবার কানে এই কথা ঢেলেছিস তাই না? যদি আমি যাই তোর পেছনে লোক লাগিয়ে তবেই যাবো যত যাই কর ভুলে যাবি না আমার ক্ষমতা!

হাতের ব্যথায় চোখ বন্ধ করে ফেলল স্নিগ্ধা। কয়েকমাসের অভিজ্ঞতায় সে ফাহাদের সাইকো মনস্তত্ত্ব খুব ভালো করেই চিনে গেছে। এই লোকটা চরম একগুঁয়ে আর জেদি। স্নিগ্ধা ভালোবেসে কিছু বলুক কিংবা রেগে ফাহাদ কখনোই তার কোনো কথা শুনবে না। উল্টো স্নিগ্ধা যা চাইবে, ফাহাদ সবসময় তার ঠিক বিপরীত কাজটাই করবে যাতে স্নিগ্ধাকে ছোট করা যায়, তার ওপর নিজের আধিপত্য বজায় রাখা যায়। তেমনই ওর দোষ না থাকলেও ওর উপরই অত্যাচার করবে!

– আমি কেন আপনার বাবাকে বলতে যাবো? আপনার বাবা কি আমার কথা শুনবে নাকি? আপনিই যেখানে শুনেন না সেখানে এই বাড়ির কেউই শুনবে না।

– তর্ক করছিস আমার সাথে? তোর এত বড় সাহস! তুই আমার মুখে মুখে কথা বলিস?

স্নিগ্ধা পাথরের মতো চুপ হয়ে গেল। সে জানে, এই সাই’কোর সামনে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করা মানে নিজের ওপর অত্যাচার আরও বাড়িয়ে নেওয়া। ফাহাদ ওকে ছেড়ে দিয়ে খাটের ওপর ছুড়ে ফেলে দিল। বুক ভরে কয়েকবার দম নিয়ে নিজেকে কিছুটা শান্ত করার চেষ্টা করল। কিছুক্ষণ স্নিগ্ধার দিকে তাকিয়ে হম্বিতম্বী করলো তারপর টেবিল থেকে গাড়ির চাবি নিয়ে বেরিয়ে গেল। সম্ভবত বন্ধুদের সাথে আড্ডাটা জমিয়ে তুলতে যাচ্ছে। ও যেতেই স্নিগ্ধা খাটের এক কোণে উঠে বসে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো। ফাহাদ আরও কয়েকটা দিন এই বাড়িতে আছে আরও কয়েকটা দিন তার ওপর এই পাশ’বিকতা চলবে তাতে তার আর ভয় নেই। কয়েকমাস ধরে যা সহ্য করে আসছে, আরও কয়েকদিন তা সহ্য করতে তার বাঁধবে না। তার কাছে এখন সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা আর আশার আলো হলো, ফাহাদ অবশেষে এই শহর ছাড়ছে। পুরোপুরি না হোক কিছুটা হলেও মুক্ত থাকবে সে! সে উঠে দাঁড়ালো। বহুদিন পর স্নিগ্ধার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো। মনে মনে বলল,

– আর মাত্র কয়েকটা দিন ফাহাদ! আপনি এই কটা দিন নিজের ক্ষমতা দেখিয়ে নিন। আপনি ঢাকা ছাড়ার পর এই চার দেওয়ালের বন্দিদশা থেকে আমি কীভাবে নিজেকে মুক্ত করি, তা আপনি দূর খুলনা থেকে বসেও টের পাবেন না।

.

ফাহাদ আর দুদিন পরই খুলনা চলে যাবে। এদিকে স্নিগ্ধার ঝামেলা কমছে না বরং বেড়েই চলেছে! স্নিগ্ধার কপালে শান্তি জিনিসটা বোধহয় নেই! নতুন নতুন মানসিক নির্যা’তন এর শি’কার হচ্ছে সে! এই কয়েকমাসে ফাহাদের মা সুলতানা জামান আর ফাহাদের দাদির কটু কথার ধরন এখন অন্যদিকে মোড় নিয়েছে। এবার তাদের নিশানায় এসেছে স্নিগ্ধার মাতৃত্ব।

সেদিন দুপুরবেলা স্নিগ্ধা ড্রয়িংরুমের মেঝেতে বসে দাদির পায়ের কাছে তেল মালিশ করে দিচ্ছিল। ফাহাদের দাদি বললেন,

– হ্যাঁ রে স্নিগ্ধা, দিন দিন তো শুধু হাভাতে স্বভাবের মতো বসে বসে গিলছিস। নাকি শুধু এ বাড়ির অন্ন ধ্বংস করতেই এসেছিস?

ফাহাদের মা তখন ড্রইং রুমে আসছিলেন। তিনি এসে সোফায় বসে বললেন,

– ওকে বলে কি হবে মা? বিয়ের এতগুলো মাস কেটে গেল, অথচ এখনো একটা সুখবর দিতে পারল না!

ফাহাদের দাদি আহাজারি করে হতাশার সুরে বলে উঠলো,

– আমার নাতির ঘরের পুতি দেখার শখ কি আর মিটবে না? বংশের বাতি আসার নামগন্ধ নেই!

– আমার ফাহাদটার কপালটাই মন্দ! বলেছিলাম এমন মেয়ে বিয়ে না করতে শুনলো না আমার কথা!

স্নিগ্ধা মাথা নিচু করে রইল। যে সংসারে শান্তি নেই ভালোবাসা নেই সেই সংসারে একটা নিষ্পাপ প্রাণকে কেন জড়াবে? সে কোনো প্রতিত্তর করে না এই কথাগুলোর। সে জানে এই কথাগুলো এখন জঘন্য ইঙ্গিতের দিকে যাবে। তাকে বিভিন্ন ট্যাগ দেওয়া হবে, অনেক কটূ কথা শুনানো হবে, চরিত্রের দিকে আঙুল তোলা হবে ইত্যাদি ইত্যাদি! প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হতো, বুক ফেটে তার কান্না পেতো কিন্তু এখন সয়ে গেছে সবই। তাই কেউ কিছু বললে গায়ে মাখে না বোধহয়! সে শুধু পাথরের মতো বসে রইল।

.

– আমার লাগেজ গুছিয়ে দাও। কালকে যে আমি খুলনা যাবো সে খেয়াল আছে?

স্নিগ্ধা ভাবলেশহীন গলায় বলল,

– আমি আপনার ব্যাগই গোছাচ্ছিলাম।

ফাহাদ এগিয়ে এসে বললো,

– কাহিনি কি? তোমাকে এত শান্ত দেখাচ্ছে? আমি চলে যাওয়ায় শোকে ম’রে যাচ্ছো বুঝি?

বলে নিজেই হো হো করে হেসে উঠলো। আবার তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইল তারপর ওর গালে আঙুল ছুঁয়ে বাঁকা হেসে বললো,

– আর যদি আমি যাওয়ার খুশিতে থাকো তাহলে বলব খুশি হওয়ার কিছুই নেই! মনে মনে খুব ফূর্তি হচ্ছে, তাই না? ফাহাদ জামান কালকে এই বাড়ি থেকে বিদায় নিলেই তুমি মুক্ত? কিন্তু মনে রাখবে স্নিগ্ধা, আমি খুলনায় যাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু আমার চোখ এই রুমের ভেতরেই থাকবে। আমার প্রতিটা বিশ্বস্ত লোক এই বাড়ির নিচে পাহারা দেবে। তুমি যদি একটা পা-ও এদিক-সেদিক ফেলার চেষ্টা করো তবে ফিরে এসে তোমাকে আমি কি করবো তুমি ভালো করেই জানো আশা করি? হু?

এমনভাবে বলল যেন সে কত সুন্দর বুলি আওড়াচ্ছে! অথচ আদরের সহিত হু’মকি দিয়ে যাচ্ছে। স্নিগ্ধা মোটেও কানে নিলো না সেসব কথা। সে ব্যাগের চেন টেনে দিয়ে কোনো রকম অভিব্যক্তি ছাড়াই বলল,

– আপনার ব্যাগ গোছানো শেষ। এবার আমি কি ওপাশের বিছানায় গিয়ে শুতে পারি? আমার শরীরটা ভালো লাগছে না।

স্নিগ্ধার এই ভাবলেশহীন জবাব ফাহাদের যেন ইগোতে গিয়ে লাগল। সে স্নিগ্ধাকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে বলল,

– যা! চোখের সামনে থেকে দূর হ! ব্যাগটা ভালো করে গুছিয়ে রেখেছিস কিন্তু একটা জিনিসও যেন কম না পড়ে!

ফাহাদ নিজেই আগে গিয়ে ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়লো। স্নিগ্ধা সেদিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। সে ভালো করেই জানে এখান থেকে বের হওয়া তার পক্ষে এত সহজ নয় বরং অসম্ভবের কাছাকাছি কিন্তু ফাহাদ থাকবে না এই কারণে একটু হলেও শান্তি লাগছে। স্নিগ্ধা গুটিসুটি মে’রে শুয়ে শূন্যে তাকিয়ে রইল।
শহরটা স্তব্ধ হয়ে আছে। মাঝেমধ্যে দূর থেকে দু একটা গাড়ির হর্নের আওয়াজ ভেসে আসছে। ফাহাদ হুমকি দিয়ে গেছে, আদরমাখা গলায় নিজের ক্ষমতার দম্ভ প্রকাশ করে গেছে তবে সেসব কথা এই মুহূর্তে স্নিগ্ধার মগজে বিন্দুমাত্র কোনো ভয়ের সৃষ্টি করতে পারছে না। তার মনে পড়ছে তার বাবা আর ভাই দুটোর কথা। কতদিন হয়ে গেল তার ভাই আর বাবার সাথে দেখা হয় না! মায়ের কথাও মনে পড়ে তবে মা তো দেখা করতে চান না তাই সে ও আর চাই না। তবে বাবার কথা প্রতি মুহূর্তে মনে পড়ে তার। ছোট্ট ভাইটা ওর কাছে কত আবদার করতো কত কিছু বলতো! বড় ভাই মাথায় হাত বুলিয়ে সব সমস্যায় বলতো, “আমি আছি তো এত চিন্তা করছিস কেন?” কিন্তু আজ? ভাবতে ভাবতে চোখের কোণা বেয়ে পানি গড়িয়ে বালিশে পড়লো। এখন কি ভাইয়া পারে না এই অবস্থা থেকে উদ্ধার করতে? স্নিগ্ধা বালিশে মুখ গুঁজে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল। ওদের সহজ সরল জীবনে ফাহাদের মতো এক প্রভাবশালী, ক্ষমতাশালী সাই’কোর কালো ছায়া এসে এমনভাবে তছনছ করেছে যে, চাইলেই কেউ কাউকে টেনে তুলতে পারছে না। ফাহাদের বাবার বিপুল প্রতিপত্তি আর ক্ষমতার দাপটের কাছে তার পরিবারের সরলতা কতটা অসহায়, তা স্নিগ্ধা খুব ভালো করেই টের পাচ্ছে!

#চলবে…?