#তিমিরবসান(৬)
#তাবাসসুম_তাজ্বওয়ারী
– শরীর খারাপের বাহানায় বসে থাকলে হবে?
স্নিগ্ধা দুইদিন ধরে খুব খারাপ লাগায় রুমে বসে ছিলো ফাহাদের মা আজ সকাল থেকে ওকে যা নয় তা বলছে। স্নিগ্ধা ভাঙা গলায় বললো,
– আমি সত্যিই অসুস্থ..
– হয়েছে হয়েছে। এত কথা বলতে হবে না। আমরাও সংসার করেছি অসুস্থও হয়েছি তাই বলে সংসার ভেসে যায় নি! দিন দিন নবাবজাদীর আল্লাদ শুধু বাড়ছেই!
আরো কিছু কথা বলে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। স্নিগ্ধা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল। যত কষ্টই হোক কেউ মানবে না সেটা সে জানে। তার অসুস্থতা এই বাড়ির মানুষগুলোর চোখে সেটা কেবলই বাহানা। সে অনেক কষ্টে রান্নাঘরে গেল। দুপুরের রান্না শেষ করে রুমে এসে শুয়ে রইলো বেশ কিছুক্ষণ পর হঠাৎ কিছু মনে হওয়ায় উঠে বসলো সে। ফোন ঘাটাঘাটি করে চোখ বড় বড় করে ফেললো। একটা শুকনো ঢোক গিললো।
স্নিগ্ধার ফোন বেজেই চলেছে এদিকে স্নিগ্ধা সেই ফোন রিসিভ করছে না। কি করবে যেন বুঝতে পারছে না। একটু আগেই সে জানতে পেরেছে সে মা হতে চলেছে! সেই সন্তানের বাবা কে? ফাহাদ জামান! যে মানুষটাকে সে তীব্র ঘৃণা করে, যার ছোঁয়া তার কাছে বি’ষের মতো, সেই মানুষেরই অংশ! স্নিগ্ধা মুখ চেপে বিড়বিড় করলো,
– কি হচ্ছে এসব আমার সাথে? আমি তো নিজেই এই খাঁচায় বন্দি, নিজের মুক্তির কোনো পথ আমি খুঁজে পাইনি। তবে কেন এই নিষ্পাপ প্রাণটাকে এখানে পাঠালে মাবুদ? ফাহাদের মতো একটা পশুরূপী মানুষের সন্তানকে আমি কীভাবে এই পৃথিবীতে আনব? সে ও তো তার বাবার মতোই হবে!
তার মা তাকে যখনই সান্ত্বনা দিতো তখনই বলতো, “একটা বাচ্চা হলে ঠিক হয়ে যাবে। এই হবে সেই হবে” কিন্তু স্নিগ্ধা কখনোই চায়নি এই সংসারে ওর কোনো পিছুটান থাকুক! সে চায়নি এমন কেউ আসুক যার কারণে সে ফাহাদের সাথে আরো জোরালো সম্পর্কে বাঁধা পড়বে! তার মায়ের সান্ত্বনা আর উপদেশের কথাগুলো এখন তী’রের মতো তার মগজে বিঁ’ধছে। তার মা কত সহজেই না ভাবেন একটা সন্তানের জন্ম দিলেই বুঝি সব অত্যাচারী পুরুষ সুপুরুষ হয়ে যায়! একটা নিষ্পাপ বাচ্চার নামে সংসারের সব অশান্তি মেটানোর জোয়াল চাপিয়ে দেওয়া কতটা নি’ষ্ঠুর’তা তা কি বোঝে না?
ফোন অনবরত বেজেই চলেছে। শেষমেশ রিসিভ করলো সে। রিসিভ করেই চুপ করে রইল। ওপাশ থেকে ফাহাদই জোর গলায় বললো,
– ফোন তুলতে এতক্ষণ লাগে? কি করছিলে? ফোন তুলছিলে না কেন?
স্নিগ্ধা একটা শুকনো ঢোক গিলে বললো,
– ফোন কাছে ছিলো না।
– কেন কোথায় টো টো করছিলে হ্যাঁ?
এইসব শুনার মতো মানসিক অবস্থা স্নিগ্ধার নেই। সে চুপ হয়ে আছে।
– কিরে তেজ কমে গেল কেন হ্যাঁ? ব্যাপার কি? কি মতলব আঁটছো তুমি? মা বললো তোমার নাকি দিন দিন আল্লাদ বাড়ছে, দুইদিন ধরে ঘরে শুয়ে আছ। সমস্যা কী তোমার?
স্নিগ্ধা প্রশ্নের জবাব না দিয়ে নিজের কথা পাড়লো,
– একটা কথা বলার আছে আমার।
ফাহাদ হেসে বললো,
– বাব্বাহ কোনো কথা বলার আগে পারমিশন নিচ্ছো?
– পারমিশন নিচ্ছি না। যদি শুনতে না চান তাহলে বলছি না!
– না বলো শুনছি।
স্নিগ্ধা সময় নিয়ে বললো,
– আমি প্রেগন্যান্ট। আজই জানতে পারলাম।
ফাহাদ অবাক হলো কি না বুঝা গেল না। একটু চুপ থেকে বললো,
– তুমি সিওর?
– হুম।
– ঠিক আছে। আমি মাকে বলে দিবো কালকে কোনো ভালো গাইনি ডাক্তারের কাছে গিয়ে কনফার্ম হয়ে নিও।
স্নিগ্ধা কিছু বললো না। ফাহাদ আবার বললো,
– মায়ের সব কথা শুনে চলবে। মা আমাদের থেকে ভালো বুঝবে সব। কথাটা মাথায় রাখবে।
স্নিগ্ধা চুপ হয়ে আছে দেখে ফাহাদ কান থেকে ফোন নামিয়ে দেখলো লাইনে আছে কি না। আছে দেখে আবার কানে ফোন ধরে বললো,
– কি হলো কথা বলছো না কেন? আমি যা বলেছি কানে ঢুকেছে?
স্নিগ্ধার সংক্ষিপ্ত উত্তর,
– ঢুকেছে।
– ঠিক আছে। কিন্তু ভাববে না তুমি মুক্ত। নজর আমার সারাক্ষণই থাকবে তাই কোনো মতলব বাদ দিয়ে সংসারে মন দাও।
– ঠিক আছে।
ফাহাদ কল কেটে দিল। স্নিগ্ধাও শান্ত হয়ে বসে রইল। সংসারে মন দিতে হবে এবার! মনকে টু’করো টু.করো করে হলেও ঠিক রাখতে হবে!
পরেরদিন থেকে সকলের আহ্লাদে স্নিগ্ধা এক প্রকার চমকে গেল। সকাল থেকেই যেন বাড়ির চেহারা বদলে গেলো। সকলের চোখের মনি হয়ে গেলো স্নিগ্ধা! কিন্তু এতো কিছুর মধ্যেও স্নিগ্ধার আনন্দ হচ্ছে না বরং আতঙ্ক বিরাজ করছে মনের কোণে। এইসব যে কৃত্রিম সেটা সে ভালোভাবেই বুঝতে পারছে। সকালে প্রতিদিনের মতো সুলতানা জামানের কর্কশ তিরস্কার শোনা গেল না। বরং ঘড়ির কাঁটা যখন সাড়ে আটটা ছুঁইছুঁই তখন সকালের নাস্তা শেষ করে সব গুছিয়ে কেবল রুমে শুয়ে ছিলো স্নিগ্ধা তখন ফাহাদের মা নিজেই বেশ ধীরপায়ে স্নিগ্ধার রুমে এলেন। তার মুখে কৃত্রিম, অতিরিক্ত মাখানো অমায়িক হাসি। সেই হাসিতে কোনো মাতৃত্বের ওম নেই, আছে এক তীব্র লৌকিকতা আর কৃত্রিম আপ্যায়ন। তিনি হাতের ট্রে-টা টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে বললেন,
– কী গো বউমা? এখনো শুয়ে আছ যে? শরীরটা বেশি খারাপ লাগছে? নাও, একটু উঠে এই গরম দুধ আর ফলগুলো খেয়ে নাও তো দেখি। নিজের শরীরের একটু খেয়াল রাখতে হবে না?
স্নিগ্ধা ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল। সুলতানা জামানের এই অতি ভদ্র, নাটকীয় রূপ ওর সহ্য হলো না ঠিক। যে মানুষটা গতকালও ওকে নবাবজাদী বলে কটু কথা শুনিয়ে গেছে, আজ তার এই কৃত্রিম আদর ও বুঝতেই পারছে।
– আপনি এখানে এসব নিয়ে? আমি একটু পরই রান্না চাপাতে যেতাম।
– ওটা পরে যেও সমস্যা নেই। তুমি এগুলো খেয়ে নাও আগে।
– আমি তো একটু আগেই নাস্তা করলাম।
– আরে একটু নাস্তা করলে হবে? আমার নাতিকে পুষ্টি পেতে হবে হবে তো!
অন্যদিন খেয়েছে কি না সেই প্রশ্ন তো দূরে থাক রাখার চিন্তা করে না সেই মানুষ আজ এত ভালো হয়ে গেল। স্নিগ্ধা কিছু বলছে না। সুলতানা জামান আবার বললো,
– আমরা ডাক্তারের কাছে যাবো আজকে ফাহাদ বলেছে ডক্টর দেখিয়ে আনতে। তাছাড়া ফাহাদের সন্তান বলে কথা, এই জামান বাড়ির প্রথম নাতি আসবে বলে কথা! আমার একটা নাতি চাই স্নিগ্ধা, বংশের প্রদীপ। কাল থেকে সারাক্ষণ শুধু খোদার কাছে এই দোয়াই করছি যেন ফাহাদের একটা ছেলেই হয়!
স্নিগ্ধা সকাল থেকে খেয়াল করছে ফাহাদের মা আর দাদি নাতি নাতি করে বুলি আওড়াচ্ছে একটু বেশিই! ও আমলে নিলো না খুব বেশি। সে খুব ভালো করেই জানে, এই কৃত্রিম আদরের কানাকড়িও তার নিজের জন্য নয়। আর তাদের অতিরিক্ত মধু মিশিয়ে নাতি নাতি করার আদিখ্যেতা স্নিগ্ধার মনে আরো বিতৃষ্ণার জন্ম দিলো।
বিকেলে ওরা ডাক্তারের কাছে গিয়ে স্নিগ্ধাকে ডক্টর দেখিয়ে আসলো। হাসপাতাল থেকে ফেরার পর দাদি নিজে ড্রয়িংরুমে এসে ওর পাশে বসলেন। খুব আদর দেখানোর ভঙ্গিতে স্নিগ্ধার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,
– ডাক্তার কী বলল বউমা? সব ঠিক আছে তো? ফাহাদের বাবার এত বড় ব্যবসা, এত সম্পত্তি, এসব তো শেষমেশ একটা নাতিই সামলাবে। তুই নিয়মতান্ত্রিক চলবি, যাতে আমার ফাহাদের একটা ছেলেই হয়। বংশের প্রথম সন্তান ছেলে না হলে কি আর মানায়? তুই সবসময় দোয়া করবি যেন ছেলে হয় বুঝলি?
স্নিগ্ধাকে সকলে এক প্রকার মানসিক চাপে ফেলে দিচ্ছে এই এক দিনেই! এইসব ওর কাছে দমবন্ধ মনে হচ্ছে। এতটা বাড়াবাড়ি?
পরেরদিন ঘুম থেকে উঠে খবর পেল তার বাপের বাড়ির লোকজন আসছে। খুশিতে চোখ চকচক করে উঠলো তার। ভেবে নিয়েছে ওকে নিয়ে যাবে হয়তো। পুরোপুরি না নিক কিছুদিনের জন্য তো নিশ্চয়ই নিয়ে যাবে। সে তো ভেবে রেখেছে ব্যাগ গুছিয়ে রাখবে কি না। কিন্তু স্নিগ্ধার সেই খুশির চকমকি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। ড্রয়িংরুমে বাবা-মা আর ভাই আসতেই স্নিগ্ধা গিয়ে বসল। সুলতানা জামান ড্রয়িংরুমে বসে বেশ রসিয়ে রসিয়ে গল্প করছেন, জামান বাড়ির আভিজাত্য নিয়ে বেশ আলাপ করছেন। নাতি চেয়ে তাদের উন্মা’দনার কথা নিজের মুখে জাহির করছেন। স্নিগ্ধা ছটফট করছিল মায়ের সাথে একটু আলাদা কথা বলার জন্য। সুযোগ বুঝে সে বলল,
– অনেকক্ষণ তো হলো এসেছো মাকে আমার রুমে নিয়ে যাই? আমিও একটু রেস্ট নিবো।
– হ্যাঁ হ্যাঁ যান বেয়ান। স্নিগ্ধা তুমি রেস্ট নাও।
স্নিগ্ধা সায় জানিয়েতার মাকে একটু টেনে নিজের রুমে নিয়ে এলো। দরজাটা হালকা চাপিয়েই সে আকুল হয়ে মায়ের দিকে তাকাল। দুই চোখ উপচে জল আসার উপক্রম হলো তার। সে ব্যাকুল গলায় বলল,
– মা! তোমরা আমায় নিতে এসেছ?
স্নিগ্ধার মা ওর গালে হালকা চপড় দিয়ে হেসে বললেন,
– বোকা মেয়ে! আমরা নিতে আসব কেন হ্যাঁ? আমরা তো তোকে দেখতে এসেছি! আমাদের সবাইকে দাওয়াত করেছে তোর শ্বশুরবাড়ির লোকজন।
স্নিগ্ধার মনের এক চিলতে আশার আলো নিমেষেই নিভে গেল। বুকের ভেতর সদ্য জন্ম নেওয়া খুশির জোয়ারটা আছাড় খেয়ে পড়ল পাথুরে মাটিতে! তবুও মায়ের হাত চেপে জোরপূর্বক হেসে বলল,
– কিছুদিনের জন্য ঘুরে আসি তোমাদের সাথে? আমার অনেক মনে পড়ে ও বাড়ির কথা! তোমরা প্লিজ এবার আমাকে নিয়ে চলো!
তার মা হাত সরিয়ে নিয়ে বিরক্ত মুখে বলল,
– তোর এই এক ঘ্যানঘ্যান আর ভালো লাগে না স্নিগ্ধা! তোর শ্বশুরবাড়ির লোকজন তোকে এত ভালোবাসে, ফাহাদ নিজে ফোন করে আমাদের সম্মান দিয়ে এখানে আনল, আর তুই এইসব পায়ে ঠেলে এখনো বাপের বাড়ি যাওয়ার জন্য বায়না করছিস? জামান বাড়ির প্রথম নাতি আসবে। এই অবস্থায় তোর এত আল্লাদ কিসের? এত বড় বাড়িতে, এত ভালো আছিস তুই! তোকে যদি এখন আমরা আমাদের ওই ছোট মধ্যবিত্ত ঘরে নিয়ে যাই, তোকে কি এইরকম যত্ন করতে পারব আমরা? আমাদের সেই সামর্থ্য আছে? তোর এখন ভালোমন্দ খাওয়ার সময়। ফাহাদ তোকে এত কিছু দিয়েছে, তুই ওখানে গিয়ে আমাদের সম্মান ধুলোয় মেশাতে চাস নাকি? শ্বশুরবাড়িই একটা মেয়ের আসল জায়গা, ওখানেই সহ্য করে মানিয়ে থাকতে হয়। মাথা ঠাণ্ডা কর, এসব উল্টোপাল্টা বায়না ছাড়।
স্নিগ্ধা মায়ের মুখের দিকে চেয়ে পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গেল। মায়ের বিরক্তিমাখা কথাগুলো তার খুব অচেনা লাগলো। তার মানে এই বড় বাড়ির কৃত্রিম আদরের আড়ালে যে চরম মানসিক যন্ত্রণা যে তাকে একটু একটু করে পিষে মা’র’ছে, তার নিজের মায়ের কাছে সেটার কোনো দামই নেই! মায়ের কাছে এই আলিশান বাড়ির জাঁকজমক আর টাকাই শেষ কথা।
– মা একটু বোঝার চেষ্টা করো! শুধু বড় বাড়ি আর টাকা থাকলেই সুখ শান্তি পাওয়া যায়? মনে শান্তি না থাকলে কোথায় থেকে শান্তি পাওয়া যায়?
তার মা এবার মুখটা কিছুটা ঝামটা দেওয়ার মতো করে মুখ ঘুরিয়ে তার রুমে চোখ বুলালো। চারপাশের বিলাসবহুল রুম আসবাবপত্র সব দিকে ভালো চোখ বুলিয়ে নিয়ে নিচুগলায় বললেন,
— এত বড় বাড়িতে, রাজকীয় হালে এত ভালো আছিস তুই! তাও খুঁজছিস মনের শান্তি? তোকে যদি এখন আমরা আমাদের ওই ঘরে নিয়ে যাই, তোকে কি এইরকম যত্ন করতে পারব আমরা? আমাদের সেই সামর্থ্য আছে? তোর এখন ভালোমন্দ খাওয়ার সময়, দামী ডাক্তার দেখানোর সময়। এই জামান বাড়ির টাকা পয়সা আছে বলেই তো তোর আর তোর সন্তানের ভবিষ্যৎ এখানে সুরক্ষিত। আমরা তোকে ওখানে নিয়ে গিয়ে কি অভাবের মধ্যে ফেলব? নিজের ভালোটা অন্তত বোঝার চেষ্টা কর!
মায়ের এই কথায় স্নিগ্ধা আর নিজেকে আটকাতে পারলো না। সে প্রায় কেঁদে ফেলার মতো গলায় বলল,
– মা আমি সত্যি ভালো নেই। তোমরা কেন বুঝছ না? আমি মাত্র কয়েকটা দিন তোমাদের কাছে থাকতে চাই। ও বাড়িতে গেলে আমার মনটা একটু ভালো হবে মা। তুমি শুধু টাকা পয়সা আর আভিজাত্য দেখছো!
ওর মা ধমকে উঠলো।
– বেশি বুঝিস আমার থেকে? ওসব কিছু না! তুই সব ভুলে সংসারে মন দে তাহলেই ঠিক হয়ে যাবে তুই তো নিজেই চেষ্টা করছিস না তাই এমন হচ্ছে। সবাই ঠিকই আছে তুই বেশি বেশি করছিস।
স্নিগ্ধা আর কিছু বলার ভাষা পেল না। তার নিজের মা এমন করছে আর কাকে কি বলবে সে? রোবটের মতো বেরিয়ে আসলো রুম থেকে।
এভাবেই কেটে গেল কয়েক মাস! প্রতিনিয়ত স্নিগ্ধাকে এক অদৃশ্য, দমবন্ধ করা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যেতে হলো। জামান বাড়ির প্রতিটা মানুষের কাছে স্নিগ্ধা কোনো মানুষ নয় স্রেফ তাদের বংশের তথাকথিত রাজপুত্র আগমনের একটা মাধ্যম। দিন নেই, রাত নেই সুলতানা জামান আর ফাহাদের দাদির মুখে শুধু একটাই জপ, “আমাদের নাতি চাই।”
কাজ করতে দিতো না এমনটাও নয়! কাজ করার সময় কৃত্রিম হেসে বলতো,
– আমরা আমাদের সময় খুব কাজ করতাম এইসব কোনো ব্যাপার না! আমার ফাহাদকে দেখো কত সুন্দর হয়েছে। কাজ করো শরীর ভালো থাকবে। বসে বসে ভালো লাগে নাকি?
স্নিগ্ধা হাঁপিয়ে উঠেছে ওদের কাজ কর্মে! এই করো না সেই করো না ওইটা করো ছেলে হবে, এইটা করো ছেলে হবে! বিভিন্ন কুসংস্কার আর ভুল তথ্য! প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই শুরু হতো নিয়মের বেড়াজাল। দাদি এসে বলতেন,
– ডান কাতে ঘুমাতে হবে বাঁ কাতে ঘুমালে কিন্তু মেয়ে হয়। আর এই যে তিতা তরকারি একদম ছোঁবে না, তিতা খেলে নাকি গায়ের রঙ কালো হয়!
সুলতানা জামান আবার এক কাঠি ওপরে। কিসের কি পানিপড়া এনে ওকে জোর করে খাওয়াতো আর বলতো, “এই পানি খেলে ফাহাদের ছেলেই হবে। আমাদের বংশের প্রদীপ জ্বলবেই।” স্নিগ্ধার এত বেশি বিরক্ত লাগে এইসব। এদিকে ভয় হয় ছেলে না হলে এরা কি করবে কে জানে!
ফাহাদ মাসে দু একবার ঢাকা থেকে আসত। কিন্তু তার আসা মানেই স্নিগ্ধার জন্য আরেক দফা আতঙ্ক। কোনো ভালোবাসা বা স্ত্রীর প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে নয় ফাহাদ আসতো তার অনাগত সন্তানের ওপর তার কর্তৃত্ব আর নজরদারি জাহির করতে। স্নিগ্ধাকে সবসময় বলতো,
– ডাক্তারের সব নিয়ম ঠিকঠাক মানছ তো? বাচ্চার যেন কোনো ক্ষ’তি না হয়। মনে রেখো, আমার কিন্তু ছেলে চাই। মায়ের আর দাদির সব কথা শুনে চলবে!
স্নিগ্ধাকে সকলে চাপ দিতেই থাকে। কিন্তু স্নিগ্ধা এখন আর প্রতিবাদ করে না সেদিনের পর বাপের বাড়ির কারও কাছে নিজের কষ্টের কথাও বলে না। সে নিজের ঘরের চার দেওয়ালে এক রোবটের মতো জীবন কাটিয়ে দিতে লাগল।
দেখতে দেখতে ঘনিয়ে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। স্নিগ্ধার সকল কষ্টের অবসান ঘটানোর জন্য হয়তো কিংবা কষ্ট বাড়ানোর জন্য স্নিগ্ধার কোল আলো করে একটা কন্যা সন্তান এলো! একটা জান্নাত এলো স্নিগ্ধার কোলে। হয়তো এই নিষ্পাপ হাত ধরেই এই অন্ধ খাঁচার দেয়াল ভেঙে আমার নতুন জীবনের সূর্যোদয় ঘটবে স্নিগ্ধার। তবে ফাহাদের পরিবারের সকলের মুখে নেমে এলো কালো ছায়া!
#চলবে…?

