#সূচনা_পর্ব
#হৃদয়_জানে_মনের_কথা
#লেখনীতে_মারিয়া_আক্তার_মাতিন
যে পুরুষটা কোনোদিন আমায় সহ্য করতে পারতো না, আজ তারই বউ হয়ে বসে আছি এই সুসজ্জিত বিছানায়। বিষয়টা ভাবতেই মলিন হাসলো স্রোত। নিজের ভাগ্যের প্রতি তার একরাশ অভিমান। তার ভাগ্য এতো মন্দ কেন? কেন সে সৌভাগ্যের অধিকারী হতে পারলো না? এখন আর এসব ভেবে কী লাভ! তবে ভয় একটাই, লোকটার সাথে সে কি আদৌ সারাজীবন সংসার করতে পারবে?
এসব ভাবনার মাঝেই খট করে দরজা লাগানোর আওয়াজ ভেসে আসলো। স্রোত ঘোমটার আড়াল হতে দেখলো লোকটা তার দিকে এগিয়ে আসছে।
সম্পর্কে লোকটা তার ফুফাতো ভাই তাসজিদ শাহরিয়ার অন্বয়। বর্তমানে স্বামীও বটে। ছোটবেলা থেকেই সে দেখে আসছে অন্বয় ভাই তাকে তেমন একটা পছন্দ করতো না। অন্যসব ভাইবোনদের প্রতি যে স্নেহ ছিল, তার প্রতি সে স্নেহের ছিটেফোঁটাও ছিল না। তার সামনে আসলেই কেমন গম্ভীর হয়ে থাকতো। এমন একটা লোকের সাথেই তার বিয়ে হতে হলো!
-“ উঠ!”
গুরুগম্ভীর আওয়াজে স্রোত হালকা কেঁপে উঠলো। তাকে উঠতে বলছে কেন? লোকটা কি এখন ঘর থেকে বের করে দিবে?
-“ উঠতে বলেছি তোকে!”
অন্বয় ধমকের সুরে বলায় স্রোত ভয়ে ভয়ে উঠে দাঁড়ালো। স্রোত উঠে দাঁড়াতেই অন্বয় তার হাত খপ করে ধরে দরজার দিকে যেতে লাগলো। দরজার ছিটকিনি খুলে রাগান্বিত কণ্ঠে বলল,
-“ গেট আউট!”
স্রোত হতবাক, হতভম্ব। তার ভাবনাই যে সত্যি হয়ে যাবে সে ভাবতে পারেনি। সে এখন কী করবে?
-“ তোকে আজ প্রত্যেকটা কথা দুবার কেন বলতে হচ্ছে, স্রোত?”
স্রোত মেঝেতে দৃষ্টি রেখে বলল,
-“ আমি কোথাও যাবো না, অন্বয় ভাই।”
-“ হোয়াট!”
-“ হ্যাঁ! আমি বুঝতে পারছি আপনি আমায় বউ হিসেবে মানতে পারছেন না। কিন্তু আজ অন্য কোথাও থাকলে সবাই সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখবে। কারণ, কেউ তো আর আসল খবর জানে না।”
-“ আমি এতোকিছু শুনতে চাই না। তুই আমার রুম হতে বেরিয়ে যা।”
-“ বললাম তো যাবো না! আমি এখানে এই রুমেই থাকবো।”
বলেই স্রোত বিছানায় গিয়ে বসলো। বউ হিসেবে যখন মানতেই পারবে না তাহলে বিয়ে কেন করেছে? উনি যদি একটাবার বলতো যে এই বিয়ে তিনি করবেন না, তাহলেই তো হতো! এদিকে স্রোত কতো আকুতি মিনতি করেছিল এই বিয়ে না করতে কিন্তু কেউ শুনলে তো! অন্বয় ভাই ফুফুর একমাত্র ছেলে। একমাত্র ছেলের কথা তিনি নিশ্চয়ই ফেলতেন না? এখন বিয়ে করে নাটক হচ্ছে!
-“ তোর সাহস দেখে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি!”
-“ শুনুন, অন্বয় ভাই..
-“ খবরদার আমাকে তুই ভাই বলে ডাকবি না! তুই আমায় ভাই ডাকার যোগ্যও নস!”
-“ কেন আমার অপরাধটা কী? আমি কী এমন করেছি যে আপনি আমায় দেখতে পারেন না?”
অন্বয় কিছুক্ষণ স্রোতের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। তারপর বিছানা হতে বালিশ নিতে নিতে বলল,
-“ তুই মারাত্মক অপরাধ করেছিস যার কোনো ক্ষমা নেই।”
অন্বয় সোফায় বালিশ রেখে বলল,
-“ খবরদার, আমার কাছে বউয়ের অধিকার চাইতে আসবি না! আমার ধারেকাছেও আসার চেষ্টা করবি না। তোর সাথে এক বিছানায় থাকা তো সম্ভবই নয়। তুই তো আবার নতুন বউ৷ তাই তোকে একটু সম্মানের খাতিরে বিছানায় থাকতে দিলাম।”
কথাটা স্রোতের আত্মসম্মানে আঘাত হানলো। রাগে তার শরীর চিড়বিড় করছে। হুহ! ঠ্যাকা পড়েছে এই বিছানায় থাকতে! কী বিছানাটা! পারলে সে সব আবর্জনা এসে জমা করতো এই বিছানায়। অন্বয় বালিশ ঠিক করে সোফায় শুতে যাবে তখনি দৃষ্টি পড়লো স্রোতের উপর যে কিনা বালিশ হাতে তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। অন্বয় ভ্রু কুঁচকে বললো,
-“ এভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
-“ দেখুন অন্বয় ভাই, এটা বিয়ে। কোনো ছেলেখেলা নয়। আপনার যখন আমায় এতোই অপছন্দ তাহলে বিয়ে কেন করলেন, বলুন? আপনি একবার যদি ফুফুকে বলতেন যে এই বিয়ে আপনি করবেন না তাহলে ফুফু জীবনেও এই বিয়ের জন্য আমায় এতো জোর করতেন না। আপনি মেয়েদের কষ্ট কীভাবে বুঝবেন? আপনি তো ছেলে। আজ যদি আপনি আমায় ডিভোর্সও দিয়ে দেন, তাতেও আপনার কোনো সমস্যা হবে না। সমস্যা হবে আমার। সমাজে সবাই আমাকে একজন ডিভোর্সি মেয়ে হিসেবে আখ্যায়িত করবে। তখন এই তকমা গায়ে লাগিয়েই আমায় ঘুরতে হবে।”
অন্বয় দাঁত কটমট করে বলল,
-“ এখানে ডিভোর্সের কথা আসছে কোথা থেকে?”
-“আমাদের সম্পর্কের যা অবস্থা তাতে আমি আমার ভবিষ্যৎ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি!”
-“ তোর সাথে কোনোপ্রকার ফা’ল’তু আলাপ করে টাইম ওয়েস্ট করতে চাই না। সর এখান থেকে!”
-“ আপনি বিছানায় গিয়ে ঘুমান৷ আমি সোফায় শুবো।”
-“ তোকে আমি সোফায় শুতে বলেছি?”
-“ না বললেও আমি এখানেই ঘুমাবো৷ কারণ, এই রুম আপনার, এই বিছানা আপনার৷ আপনি কেন আপনার বিছানা ছেড়ে সোফায় শুবেন? আমার তো এই রুমে থাকার কোনো অধিকার নেই। তবুও থাকছি আজ রাতটার জন্য। তাই আমি সোফায় ঘুমাবো।”
অন্বয় শান্ত চোখে স্রোতের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“ বেশ! তোর যখন কোনো অধিকারই নেই তাহলে থাক এখানে!”
অন্বয় বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো। স্রোত অন্বয়ের দিকে একবার দৃষ্টিপাত করে সোফায় শুয়ে পড়ে৷ তার বাঁধভাঙা কান্না পাচ্ছে। এই বিয়ে নিয়ে তার কতো স্বপ্ন ছিল, কতো আশা ছিল! এভাবে তার সব স্বপ্ন, আশা ভেঙে যাবে সে কি কখনো কল্পনা করেছে? এজন্যই কোনোকিছু নিয়ে বেশি আশা করতে নেই। বেশি আশায় গুড়ে বালি।
মাঝরাত। স্রোতের হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম ভাঙতেই সে চারদিক অবলোকন করে নিজেকে বিছানায় আবিষ্কার করে। এ কি! সে না সোফায় ঘুমিয়েছিল? সে তড়িঘড়ি করে উঠে বসতেই তার চক্ষু চড়কগাছ। সোফায় অন্বয় ঘুমিয়ে আছে আর সে বিছানায়। তার গায়ে আবার পাতলা কম্বল। একটু ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগছে বটে৷ কিন্তু সে যখন সোফায় ঘুমিয়েছিল তখন তো এই কম্বলও ছিল না? তার মানে অন্বয় ভাই কি…
সে আর ভাবতে পারলো না। তার মাথা ঘুরছে। এই লোক বহুরূপী। জুতা মেরে এখন গরু দান করা হচ্ছে। তার খুব ঘুম পাচ্ছিল। তাই আর কিছু না ভেবে ফের ঘুমের দেশে তলিয়ে গেল।
সকালবেলা স্রোতের যখন ঘুম ভাঙলো তখন অন্বয় ছিল না। সে খোঁজার চেষ্টাও করলো না। যেখানে মন চায় থাকুক! তার কী? সে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিল৷ তখনই তার ফোন বাজতে থাকে৷ ফোন হাতে নিয়ে দেখে অর্কের কল। স্রোত ফোন রিসিভ করে বলল,
-“ কেন কল করেছিস তুই? তোর সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই!”
ওপাশ হতে ভেসে আসলো মলিন কণ্ঠস্বর,
-“ রাগ করিস না, স্রোত। আসলে আমি একটা বড়ো ঝামেলায় আটকে গেছিলাম তাই তোর বিয়েতে আসতে পারিনি৷”
-“ রাখ তোর ঝামেলা! এজন্য তুই আমার বিয়েতে আসবি না?”
-“ সরি রে! আসলে আমার মন মস্তিষ্ক জুড়ে যে ছিল সে তো আর নেই। আমায় ছেড়ে চলে গেছে৷ এই ভাঙা মন নিয়ে কী করে আসি বল তো!”
-“তুই যে একটা মেয়েকে ভালোবাসতি ওই মেয়েটা তোকে ছেড়ে চলে গেছে?”
-“ হ্যাঁ। আসলে মেয়েটার কোনো দোষ নেই। সবই কপাল!”
-“তাই বলে তোর মতো একটা ছেলেকে ছেড়ে কে চলে যায়, ভাই? তোর তো কোন দিক দিয়ে কোনো খামতি নেই।”
-“আমার যদি কোনো খামতি না থাকে তাহলে তুই চলে গেলি কেন?”
-“ কী বললি?”
অর্ক হেসে বলল,
-“ মজা করেছি, দোস্ত। আসলে মেয়েটাও জানতো না যে আমি ওকে ভালোবাসি।”
-“ তুই কী রে ভাই? একটা মেয়েকে ভালোবাসিস আর সেটা তাকে বলবি না?”
-“ বলার আগেই সে অন্যকারো হয়ে গেছে।”
হঠাৎ একটা গুরুগম্ভীর কণ্ঠ ভেসে আসলো।
-“ কীসের এতো ভালোবাসার কথা হচ্ছে?”
স্রোত ফোন কানে নিয়েই পিছন ঘুরে দেখলো অন্বয় ঠিক তার পিছনেই দাঁড়িয়ে আছে৷ মুখমণ্ডল শক্ত, দৃষ্টি তার দিকেই স্থির। স্রোত কিছু বলতে যাবে তার আগেই অন্বয় ফোন টান মেরে নিয়ে আসে। অতঃপর কানে ধরতেই ওপাশ হতে অর্ক বলে উঠে,
-“ তোর বর এসেছে মনে হয়? আচ্ছা, পরে কল দিবো নে তোকে। ভালো থাকিস।”
কল কেটে গেল। অন্বয় ফোনের দিকে একবার চেয়ে বলল,
-“ বাহ! বিয়ে হতে না হতেই পরকীয়া শুরু করে দিয়েছিস?”
চলবে……

