Home "ধারাবাহিক গল্প "হৃদয় জানে মনের কথা হৃদয় জানে মনের কথা পর্ব-০২

হৃদয় জানে মনের কথা পর্ব-০২

0
1699

#হৃদয়_জানে_মনের_কথা
#পর্ব_২
#লেখনীতে_মারিয়া_আক্তার_মাতিন

অন্বয়ের করা এই একটা প্রশ্নে স্রোত যেন অবাক হতেও ভুলে গেলো। সে কেবল অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। মাথায় শুধু ঘুরপাক খাচ্ছে, অন্বয় ভাই তাকে এতোটা অবিশ্বাস করে? এতোটা নিচ ভাবে যে তার চরিত্রের দিকে আঙুল তুলতেও দুবার ভাবলো না?

অন্বয় ফোনটা হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে বলল,
-“ কী হলো কথা বলছিস না কেন? নাকি মুখে কোনো কথা নেই? অবশ্য চোর যখন হাতেনাতে ধরা পড়ে তখন তার মুখে কোনো কথা থাকে না।”

কথাটা শুনে তীব্র রাগে স্রোতের গা কাঁপতে লাগলো। সেই সাথে একরাশ ঘৃণা এসে ভর করলো সামনে থাকা মানুষটার প্রতি। সেই অদম্য রাগ আর ঘৃণাকে সংবরণ করে স্রোত বলল,

-“ মুখ সামলে কথা বলুন!”

-“ কেন গায়ে লাগছে?”

-“ আমি যার সাথে কথা বলছিলাম সে আমার ছোটবেলার বন্ধু, অর্ক। তার সাথে আমার কোনোপ্রকার প্রেমের সম্পর্ক নেই। সে কেবলই আমার বন্ধু।”

অন্বয় তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে বলল,
-“মেয়েদের এই ছেলে বন্ধু থাকাটাই সন্দেহের বিষয়। একজন মেয়ে আর ছেলে কখনো বন্ধু হতে পারে না!”

স্রোত রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
-“ এমন ভাব করছেন যেন আপনার কোনো মেয়ে ফ্রেন্ড ছিল না?”

অন্বয় স্রোতের খুব কাছে এসে তার চিবুক তুলে বলল,
-“ আমার এই জীবনে কোনো মেয়ে ফ্রেন্ড ছিল না, নেই আর ভবিষ্যতেও থাকবে না। চাইলে তুই আমার কলেজ, ভার্সিটিতে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারিস।”

-“ আমার এতো ঠ্যাকা পড়েনি! আপনার মেয়ে বন্ধু থাকলেও আমার কোনো যায় আসে না!”

-“ রিয়েলি? কোনো যায় আসে না?”

অন্বয় এতো কাছে আসায় স্রোতের দমবন্ধ হয়ে আসছে। অন্বয়ের তপ্ত শ্বাস তার চোখেমুখে আছড়ে পড়ছে। হঠাৎ এই সান্নিধ্যে স্রোতের বুকের ভিতরটা কেমন কেঁপে কেঁপে উঠছে। সে চোখদুটো খিঁচে বন্ধ করে বলল,
-“ নাহ!”

অন্বয় সরে গেল, দূরত্ব বাড়ালো। তারপর চোখমুখ শক্ত করে বলল,
-“ কিন্তু আমার যায় আসে! আমার বউয়ের ছেলে বন্ধু থাকবে এটা আমি কোনোভাবেই বরদাস্ত করব না!”

স্রোত চমকে উঠে চোখ মেলে তাকালো। কী বললো? আমার বউ? লোকটা কি আদৌ তাকে বউ হিসেবে গণ্য করে? সে বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
-“ আপনি আমায় বউ হিসেবে মানেন?”

অন্বয় তার হাতে থাকা ফোন দেখতে দেখতে বলল,
-“ বিয়ে যখন করেছি, তখন মানবো না কেন? অফকোর্স তুই আমার বউ!”

হঠাৎ অন্বয় একটা আশ্চর্যজনক কাণ্ড ঘটালো। তার হাতে থাকা ফোনটাকে সজোড়ে এক আছাড় মারলো। মুহূর্তের মাঝেই ফোনটা ভেঙে খণ্ড খণ্ড হয়ে যায়। কিছু বুঝে উঠার আগেই এমন একটা কাণ্ড ঘটে গেল যে স্রোত প্রতিক্রিয়া দেখাতেও ভুলে গেল। সে চোখদুটো বড়ো বড়ো করে বলল,
-“ এটা কী করলেন আপনি?”

অন্বয় চোখদুটো বন্ধ করে সামনে থাকা চুলগুলো পিছনে ঠেলে বলল,
-“ যে ফোনে অন্য ছেলের নাম্বার থাকে সে ফোন আর আমি আস্ত রাখবো না!”

স্রোতের চোখ বেয়ে অশ্রু জড়তে লাগলো। এই ফোনে তার কতো শতো স্মৃতি ছিল। তার জন্মদিনে তার বাবা তাকে এই ফোনটা গিফট করেছিল। আর উনি এটা কী করলেন? স্রোত নিচু হয়ে বসে ফোনের আলাদা হয়ে যাওয়া অংশগুলো জড়ো করতে করতে বলল,
-“ আপনার যতো রাগ আপনি আমার সাথে দেখাতেন! আমায় মারতেন, বকতেন তবুও আমার এতো খারাপ লাগতো না৷ কিন্তু আপনি আমার ফোন ভাঙলেন কেন? কেন করলেন এমন?”

অন্বয়ও স্রোতের মুখোমুখি নিচু হয়ে বসে ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলল,
-“ কেন ওই অর্কের সাথে কথা বলতে পারবি না দেখে খুব খারাপ লাগছে?”

-“ চুপ করুন আপনি! আপনি জানেন, এই ফোনে আমার কতো শতো স্মৃতি ছিল?”

-“ জানি তো! অর্কের নাম্বার ছিল, অর্কের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো ক্যাপচার করা ছিল, তাই না?”

-“ অন্বয় ভাই, আপনার সঙ্গে কথা বলতেও আমার রুচিতে বাঁধছে!”

-“ বলিস না। তোর কথা বলা না বলা দিয়ে আমার কী আসে যায়!

এই বলে অন্বয় উঠে দাঁড়ালো। যেই না রুম হতে বেরিয়ে যাবে, ওমনি স্রোতের আহাজারিতে তার পা দুটো থেমে যায়।

-“ আমার বাবার কষ্টের টাকা দিয়ে কেনা এই ফোনটা উনি কীভাবে ভাঙতে পারলেন? বাবা কতো ভালোবেসে এই ফোনটা আমায় গিফট করেছিলেন! বলেছিলেন এই ফোন সবসময় সাথে রাখতে। কতো ছবি, কতো মিষ্টি মধুর মুহূর্ত এই ফোনে! অন্বয় ভাই এটা কী করলেন! আমি আপনাকে ঘৃণা করি অন্বয় ভাই, প্রচণ্ড ঘৃণা করি!”

অন্বয় নিশ্চুপ হয়ে শুনলো সব। শান্ত দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ দেখলো স্রোতকে। ভিতরটা কেমন অশান্ত লাগছে! সে আর কিছু না বলে দ্রুত পায়ে রুম ত্যাগ করলো। স্রোত ফোন তুলে টেবিলের এককোণে রাখলো। চোখমুখ মুছে নিজেকে শান্ত করার প্রয়াস চালালো। এর মাঝেই রুমে প্রবেশ করে রিয়ানা, অন্বয়ের চাচাতো বোন। সে এসেই স্রোতকে জড়িয়ে ধরে বলল,
-“ কেমন আছো আপু? ওহ সরি! এখন তো আবার ভাবীও!”

স্রোত নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালাচ্ছে। মুখে কোনোরকম হাসি ফুটিয়ে বলল,
-“ এই তো আলহামদুলিল্লাহ। তুমি কেমন আছো?”

-“ আলহামদুলিল্লাহ। কী ব্যাপার ভাবী? তোমার চোখমুখ এমন লাল হয়ে আছে কেন? তুমি কি কান্না করেছো?”

-“আরে না! আসলে রাতে আমার ঘুম হয়নি তেমন। তাই এমন লাগছে আর কি!”

সত্য লুকানোর চেষ্টা করলো স্রোত। তাদের ভিতরকার এই সম্পর্ক কোনোভাবেই বুঝতে দেওয়া যাবে না কাউকে। সে টেবিলে থাকা ভাঙা ফোনকে আড়াল করে দাঁড়ালো যেন রিয়ানার নজরে না আসে।

রিয়ানা দুষ্টু হেসে বলল,
-“ আহারে! আমার ভাইয়াটা বুঝি রাতে তোমায় একটুও ঘুমোতে দেয়নি?”

-“ উফ, তুমিও না! তোমার ভাইয়া তো আমার ধারেকাছেও আসেনি৷ আমার আসলে বাবা-মায়ের কথা খুব মনে পড়ছিল৷ তাই ঘুম ধরেনি তেমন।”

-“ বুঝতে পারছি, ভাবী। সব মেয়েদেরই এমন হয় গো। আচ্ছা শোনো, বড় চাচি আমায় পাঠালেন তোমায় রেডি করে নিচে নিয়ে যেতে। সবাই তোমার অপেক্ষা করছে। তুমি তো আবার শাড়ি পরতে পারো না। আমি পরিয়ে দিচ্ছি।”

রিয়ানা একটা গাঢ় সবুজ রঙের শাড়ি নিয়ে এসেছিল যেটাতে রঙ বেরঙের কারুকাজ করা। শাড়িটা সে বিছানায় রেখেছিল। সে বিছানা হতে শাড়ি নিতে যাচ্ছিল আর তখনই স্রোত দ্রুত টেবিলের ড্রয়ার খুলে ফোন রেখে দিল। স্রোত গতরাতে পোশাক চেঞ্জ করেনি৷ এই ভারী সাজগোজ আর পোশাক পরেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। মনের দুঃখ এতো ভারী হয়ে উঠেছিল যে এসবের প্রতি তার কোনো খেয়ালই ছিল না। সকালে উঠে চেঞ্জ করে সে সুতির থ্রি-পিস পরেছিল। এখন আবার শাড়ি পরতে হবে।

রিয়ানা স্রোতকে শাড়ি পরিয়ে সাজগোজ শেষ করে তার সামনে দাঁড় করালো। মাথা হতে পা পর্যন্ত পরখ করে দুগালে দুহাত রেখে বলল,
-“ মাশাল্লাহ, ভাবী! কী সুন্দর লাগছে তোমাকে! ভাইয়ার তো আজ চোখের পলক পড়বে না।”

স্রোত হাসলো। মনে মনে বলল,
-“আমাকে পরীর মতো সাজালেও তোমার ভাইয়া কখনো আমার দিকে ফিরেও তাকাবে না!”

তবে মুখ ফুটে আর সেটা বলতে পারলো না। রিয়ানা স্রোতকে নিয়ে নিচে যায় যেখানে মেহমানের শোরগোল চলছে। স্রোত গিয়ে সবাইকে সালাম দিলো। স্রোতের ফুফু ফারজানা বেগম স্রোতকে নিজের পাশে বসিয়ে দেয়। অন্বয়ের ফুফু স্রোতকে দেখে হাসিমুখে বললেন,
-“স্রোতকে তো আমরা সেই ছোটবেলা থেকে দেখছি। মিষ্টি একটা মেয়ে। কিন্তু এখন যেন স্রোতকে আরও বেশি মিষ্টি লাগছে! কী রে স্রোত, তোর এই রূপের রহস্য কী, হুম? এই বুড়িটাকেও বল একটু। যদি তোর মতো একটু সুন্দর হতে পারে!”

অন্বয়ের ফুফুর কথায় সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। স্রোত লাজুক হেসে মাথা নিচু করে রাখলো। রিয়ানা বলে,
-“ দেখতে হবে না এখন স্রোত ভাবীকে কে সাজিয়েছে? এইযে এই আমি সাজিয়েছি৷ দেখেছো, আমি কতো সুন্দর সাজাতে পারি?”

ফারজানা বেগম বললেন,
-“আমার স্রোত আম্মু এমনিতেই সুন্দর। সাজালেও সুন্দর, না সাজালেও সুন্দর।”

আরও যারা স্রোতকে দেখতে এসেছিলেন, সবাই স্রোতের প্রশংসা করতে লাগলো৷ কিন্তু এসবে যেন স্রোতের মন টিকছে না। সে তো কেবল নির্দিষ্ট একজনের কাছ থেকে প্রশংসা শুনতে চায়। সেই একজনের থেকে প্রশংসা শুনতে পারলেই তার মন ভালো হবে, মনে শান্তি পাবে। কিন্তু আফসোস! সেটা কখনোই হবে না। সেই একজন তো তার দিকে ভালোমতো তাকাবেও না। প্রশংসা তো দূরের কথা!

এর মাঝেই অন্বয় হন্তদন্ত হয়ে বাড়িতে প্রবেশ করে। ফারজানা বেগম অন্বয়কে দেখে বললেন,
-“ তোকে সকালে দেখলাম তাড়াহুড়ো করে কোথায় বেরিয়ে গেলি। এতো ডাকলাম তবুও শুনলি না। এখন আবার হুড়মুড় করে বাড়িতে ঢুকলি। ব্যাপারটা কী অন্বয়? কোথায় গিয়েছিলি তুই?”

অন্বয় সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে বলল,
-“ একটা দরকারি কাজে।”

এতটুকু বলেই সে উপরে উঠে গেল। ফারজানা বেগম স্রোতকে একবার দেখে বললেন,
-“ এই ছেলের কাজ কোনোদিন শেষ হবে না। বিয়ে হলো গতকাল, এখনও তার শুধু কাজই কাজ। কাজ ছাড়া সে যেন কিছু বুঝে না।”

রিয়ানা বলল,
-“ যা বুঝলাম ভাইয়ার জীবনে কাজের গুরুত্ব অপরিসীম।”

অন্বয়ের ফুফু বললেন,
-“শোনো ভাবী, তোমার ছেলেকে বলো, এখন নতুন বউকে নিয়ে দূরে কোথাও ট্যুর দিতে। এতো কাজের মাঝে আটকে থাকলে চলবে না। জীবনটাকেও উপভোগ করতে হবে। বলো, হানিমুনে যেতে।”

হানিমুনের কথা শোনেই স্রোত কাশতে লাগলো। অন্বয় সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে বলল,
-“ সে নিয়ে তোমায় চিন্তা করতে হবে না, ফুফু। যখন উপযুক্ত সময় হবে, তখন কারও বলতে হবে না, আমিই আমার বউকে নিয়ে হানিমুনে যাবো।”

-“ তোর উপযুক্ত সময় আর এই জীবনে হবে না। তোর জীবনটা কাজ করতে করতেই পার হবে৷”

-“হোক, সমস্যা কী? এর মাঝেই দেখবে তোমাদের নাতি-নাতনি এসে পড়েছে। কারণ, অন্বয় ইজ অলরাউন্ডার।”

অন্বয়ের এমন কথায় স্রোত বিষম খেল। সে ফের কাশতে লাগলো। রিয়ানা দ্রুত স্রোতকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বলল,
-“ নট ফেয়ার, ভাইয়া। বেচারা ভাবীকে এমন লজ্জায় ফেলছো কেন?”

অন্বয় এতোক্ষণে স্রোতের দিকে তাকালো। আর তাকাতেই যেন সে স্তব্ধ হয়ে গেল। আশপাশ সব ভুলে সে কেবল তাকিয়ে রইলো স্রোতের দিকে। চোখের পলক পড়ছে না যেন। দুচোখে তার একরাশ মুগ্ধতা। ফারজানা বেগম বললেন,
-“ অন্বয়, তোর কি লজ্জা-শরম বলতে কিছু নেই? ফুফুর সাথে কীভাবে কথা বলছিস?”

অন্বয় চোখ সরালো। যাক, মেয়েটা টের পায়নি কিছু। ফারজানা বেগম ফের বললেন,
-“ আচ্ছা, অনেক তো গল্পগুজব হলো। এবার চলো সবাই নাস্তা করবে ।”

তখনই অন্বয় স্রোতকে উদ্দেশ্য করে বলল,
-“ এই আমি না ঘরে ফোন রেখে এসে পড়েছি। স্রোত, তুই ফোনটা নিয়ে আয় তো।”

ফারজানা বেগম শাসালেন,
-“ এটা কেমন কথা, অন্বয়? তুই যখন ফোন রেখে এসে পড়েছিস, তখন তুই গিয়ে নিয়ে আসবি। স্রোতকে অর্ডার করছিস কেন? বউকে দিয়ে এখনই কাজ করাচ্ছিস?”

স্রোত নিচু স্বরে বলল,
-“সমস্যা নেই, ফুফু। আমি নিয়ে আসছি।”

স্রোত রুমে এসে অন্বয়ের ফোন খুঁজতে লাগলো। হঠাৎ তার দৃষ্টি যায় বিছানার পাশে থাকা টেবিলের উপর। সেখানে একটা বক্স রাখা, কাছে গিয়ে দেখলো একটা ফোনের বক্স। মনে হচ্ছে, নতুন কেনা এটা। স্রোত ভাবলো, অন্বয় ভাই হয়তো নিজের জন্য নতুন ফোন কিনেছে। বক্সটার পাশে আবার অন্বয়ের ব্যবহৃত ফোন রাখা। বক্সের উপর একটা কাগজ দেখে স্রোত কৌতূহলী হয়ে কাগজটা খুলল। লেখাগুলো পড়তেই তার বিস্ময়ভাব যেন তুঙ্গে।

“একজনকে দেখলাম ফোনের অভাবে কেঁদেকেটে দেবদাস হয়ে যাচ্ছে। তাই তার জন্য এই ফোন৷ তবে, খবরদার! এই ফোনে অর্ক নামের কোনো ছেলের নাম্বার যেন না উঠে!”

চলবে……