Home "ধারাবাহিক গল্প "হৃদয় জানে মনের কথা হৃদয় জানে মনের কথা পর্ব-০৬

হৃদয় জানে মনের কথা পর্ব-০৬

0
571

#হৃদয়_জানে_মনের_কথা
#পর্ব_৬
#লেখনীতে_মারিয়া_আক্তার_মাতিন

দীর্ঘ সময় পর স্রোতকে ছাড়লো অন্বয়। স্রোতের দম আটকে আসছিল, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। অন্বয় ছাড়তেই সে জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘনিষ্ঠতায় স্রোত যতোটা না লজ্জা পেল তার চেয়েও বেশি অনু়ভূতির দোটানায় মত্ত সে। অন্বয় ভাইয়ের হঠাৎ এমন ভালোবাসা পূর্ণ আচরণ সে কেন যেন মেনে নিতে পারছে না। মানবেই বা কীভাবে? ছোট হতে দেখে আসছে, অন্বয় ভাই তাকে পছন্দ করে না, সবমসময় ধমকের উপর রাখতো। তার সামনে পড়লেই পৃথিবীর সকল গাম্ভীর্যতা উনার মাঝে এসে ভর করতো। তার উপর, বাসর রাতে কেমন আচরণটাই না করলো! এসবকিছু যে স্রোত ভুলতে পারে না। বিনা কারণে কেউ তার সাথে খারাপ ব্যবহার করলে সে কিছুতেই মানতে পারে না। ভিতরে ভিতরে অস্থির লাগে, অশান্তি সৃষ্টি হয়। মনে যে ক্ষত সৃষ্টি হয় সেই ক্ষতের দাগটা থেকে যায় চিরকাল। তাহলে আজ হঠাৎ এতো কাছে আসার কারণ কী?

-“এই নেশা বোধহয় আর ছাড়তে পারবো না!”

ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে বলল অন্বয়। এই মুহূর্তে স্রোতের ভীষণ লজ্জা লাগছে। লজ্জায় সে সামনে তাকাতে পর্যন্ত পারছে না। সে দৃষ্টি মেঝেতে রেখেই দৌড়ে রুম হতে বেরিয়ে গেল। ফারজানা বেগম অন্বয়কে দেখতে রুমে আসছিলেন। স্রোতকে ওভাবে দৌড়ে যেতে দেখে ভড়কে গেলেন তিনি। মেয়েটা এভাবে দৌড়ে কোথায় যাচ্ছে? অন্বয়ের কিছু হলো না তো আবার! তিনি ত্রস্ত পায়ে হেঁটে অন্বয়ের কাছে গেলেন। গিয়ে দেখেন, ছেলে তার মুচকি মুচকি হাসছে। সবকিছু কেমন উনার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। এদের কী হয়েছে কে জানে! তিনি এগিয়ে এসে বললেন,
-“ পাগলের মতো একা একা হাসছিস কেন?”

অন্বয় দ্রুত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ফিরল। বলল বানিয়ে বানিয়ে,
-“ আসলে ফ্রেন্ডসদের নিয়ে একটা হাসির ঘটনা মনে পড়লো হঠাৎ। তাই হাসছিলাম।”

ফারজানা বেগম সরু চোখে তাকালেন। যে ছেলেকে হাজারটা জোক্স বললেও মুখে হাসি ফুটে না, সে ছেলে হাসির ঘটনা মনে করে হাসছে? তিনি এ নিয়ে আর মাথা ঘামালেন না। ছেলের পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
-“ ওষুধ লাগিয়েছিস?”

-“ হু। স্রোত লাগিয়ে দিয়েছে।”

-“ ও ভালো কথা, স্রোত ওভাবে দৌড়ে কোথায় গেল রে? যেভাবে ছুটছিল, আমি ভাবলাম কী না কী হলো!”

অন্বয় আগের মতো করেই বলল,
-“ ওটা তুমি স্রোতকেই জিজ্ঞেস করো। আমি কীভাবে জানবো ও কেন দৌড়ে গেল!”

-“ না, মানে আমি ভাবছিলাম তোর আবার কিছু হলো কিনা! আচ্ছা শোন, আমার দিকে তাকা। আমার দিকে তাকিয়ে বল তো, কীভাবে হলো এসব? তোর এমন অবস্থার কারণ কী?”

মায়ের দিকে তাকিয়ে মিথ্যে বলতে পারবে না অন্বয়। কিন্তু সত্যটাও বলা যাবে না এখন। সে শ্বাস ছেড়ে বলল,
-“ মা, বাদ দাও না এসব।”

-“কেন বাদ দিব? তোকে এই অবস্থায় দেখার পর আমার যে ঠিক কেমন লাগছিল সেটা তোকে বলে বুঝাতে পারব না! আমার এখনও হাত-পা কাঁপছে! সন্তানের এমন অবস্থা কোনো মায়ের সহ্য হবে বল?”

অন্বয় একহাতে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
-“এতো টেনশন করো না, মা। আমি ঠিক আছি তো!”

-“ দেখতেই তো পারছি কেমন ঠিক আছিস! সত্যি করে বল, কী হয়েছে?”

-“ সময় হলে সব বলবো, মা।”

ফারজানা বেগম ক্ষেপে গেলেন। রাগ মিশ্রিত কণ্ঠে বললেন,
-“তোর সবকিছুতে শুধু সময় হলে বলবো, সময় হলে বলবো। তোর জীবনে সেই সময়টা আর হয় না!”

-“ধৈর্য ধরো৷ সব জানতে পারবে।”

স্রোত অনেকক্ষণ যাবত ড্রয়িংরুমে পায়চারি করছে। হাতের আঙুলে ওড়না পেঁচিয়ে এপাশ হতে ওপাশ, ওপাশ হতে এপাশ করছে। ফারজানা বেগম তখন নিচে এলেন। স্রোতকে দেখে বললেন,
-“ তোর কী হয়েছে, স্রোত? তখন ওভাবে দৌড়ে গেলি কেন?”

স্রোত ভ্যাবাচ্যাকা খেলো। সে আমতা আমতা করে বলল,
-“ ওই আমার আসলে পানির পিপাসা পেয়েছিল। জগে পানি ছিল না। তাই পানি খেতে এসেছিলাম।”

-“ পানি খাওয়ার জন্য কেউ এভাবে দৌড়ে যায়? তোর বাচ্চামো স্বভাব আর গেল না!”

স্রোত লজ্জা পেয়ে হাসলো একটু। ফারজানা বেগম বললেন,
-“ শোন, অন্বয়ের আর নিচে আসার দরকার নেই। তুই তোর খাবার সহ ওরটা ঘরে নিয়ে যা।”

-“ আচ্ছা ফুফু।”

স্রোত ওদের দুজনের খাবার ঘরে নিয়ে গেল। অন্বয় তখন পরনের শার্ট খুলছিল। স্রোত খাবারটা টেবিলে রেখে চটজলদি রুম হতে চলে যাচ্ছিল। অন্বয়ের ডাকে তার পা দুটো থেমে যায়।

-“ দাঁড়া!”

স্রোত এদিক না ঘুরেই বলল,
-“ বলুন।”

-“ কোথায় যাচ্ছিস?”

-“ আপনি চেঞ্জ করছেন তাই বাইরে যাচ্ছি।”

-“আমি চেঞ্জ করলেই তোর বাইরে যেতে হবে?”

-“ আমি কি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আপনার চেঞ্জ করা দেখব? নিজের মতো সবাইকে অসভ্য ভাবেন নাকি?”

-“ তখন থেকে ওদিক ঘুরে কথা বলছিস কেন? এদিকে তাকা।”

-“আপনার চেঞ্জ করা শেষ হোক। তারপর।”

-“ শেষ।”

স্রোত ধীরে ধীরে অন্বয়ের দিকে ফিরল। দেখল পরনের শার্ট পাল্টে কালো টি-শার্ট পরেছে। অন্বয় স্রোতের কাছে এসে বলল,
-“ ফিলিংস কেমন?”

স্রোত বুঝতে না পেরে বলল,
-“ কীসের ফিলিংস?”

-“ বরের কাছ থেকে প্রথম চুমু পেলি। একটা ফিলিংস আছে না?”

স্রোত থমথমে মুখে বলল,
-“ কোনো ফিলিংস নেই।”

-“ আচ্ছা? বেশ! তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছিলাম৷ ওই অর্ক পরে কতক্ষণ ছিল?”

-“ যতক্ষণ মন চায় থাকুক! তাতে আপনার কী?”

অন্বয় শক্ত কণ্ঠে বলল,
-“ অনেক কিছু৷ বল কতক্ষণ ছিল? অনেক বেশি সময় ছিল? তোর সাথে ও পরে কী কী বলেছে? সব আমায় বল!”

অন্বয় বিছানায় গিয়ে বসলো। স্রোতকে ইশারা করলো তার কাছে বসতে। স্রোত না বসে দাঁড়িয়ে থেকেই বলল,
-“আপনি এতো কৈফিয়ত চাইছেন কেন?”

-“ স্বামী হিসেবে এটা আমার দায়িত্ব।”

স্রোত বিদ্রুপ ভঙ্গিতে হাসলো। ঠোঁটের কোণে হাসি বজায় রেখেই বলল,
-“স্বামী? স্বামী হিসেবে আরও কতো দায়িত্বও তো আছে! সেগুলো আগে পালন করুন। অন্বয় ভাই, আমি ভুলতে পারি না যে, আপনি বাসর রাতে আমায় ঘর হতে বের করে দিচ্ছিলেন, আমার চরিত্রের দিকে আঙুল তুলেছেন, অযথা কারণে আমার ফোন ভেঙেছেন। একজন আদর্শ স্বামী হিসেবে এগুলো করা কতোটা যুক্তিযুক্ত?”

অন্বয় গম্ভীর মুখে বলল,
-“ তুই আবার এসব শুরু করলি?”

-“ কেন করব না? নিজের বেলায় খুব গায়ে লাগে তাই না?”

-“স্টুপিড! একদিন বুঝবি আমি এসব কেন করেছিলাম! এখন এদিকে আয়।”

-“ আপনি বলুন আমি শুনছি।”

-“ তোকে আসতে বলেছি!”

স্রোত বাধ্য হয়েই অন্বয়ের কাছে গেল। অন্বয় একটানে স্রোতকে নিজের কোলে বসিয়ে দেয়৷ স্রোত হকচকিয়ে যায়। আড়ষ্ট হয়ে যায় তার দেহখানি। অন্বয় বলে,
-“ খাবার কার জন্য এনেছিস? আমার জন্য?”

-“ আপনার, আমার দুজনের জন্যই।”

-“ আমার হাতে ব্যথা৷ তুই খাইয়ে দে।”

-“ আমি পারব না।”

সোজাসাপ্টা উত্তর দিল স্রোত। অন্বয় রেগে বলল,
-“ তুই এখন বেশি করছিস কিন্তু!”

-“ আপনি আমায় কোল থেকে নামান। তাহলে খাইয়ে দিব।”

-“না, কোলে বসেই খাওয়াতে হবে।”

-“ সবসময় আপনার কথামতো হবে নাকি? তখনও আপনার কথায় কাছে থেকেই…

-“ কাছে থেকেই কী?”

ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে অন্বয়। স্রোত নিচু স্বরে বলল,
-“ কিছু না!”

অন্বয় হাসলো। বলল,
-“ আমার খুব খিদে পেয়েছে কিন্তু!”

স্রোত বুঝলো কোলে বসেই খাওয়াতে হবে। সে যতোই না করুক, অন্বয় ভাই শুনলে তো! এই একরোখা মানুষটাই কিনা তার স্বামী হতে হলো? সে হাত বাড়িয়ে টেবিল থেকে খাবারের প্লেট নিয়ে এক লোকমা ভাত অন্বয়ের মুখের সামনে ধরলো। অন্বয় ভাত খাওয়ার পর স্রোতের হাত ধরে আঙুলগুলোও চেটেপুটে খেতে লাগলো। এদিকে, লজ্জায় স্রোতের অবস্থা কাহিল। কোনোরকম সে অন্বয়কে খাইয়ে দিয়ে নিজেও খেয়ে নিল। খাবারের প্লেট সব নিচে রেখে রুমে ঢুকতেই দেখল অন্বয় রুমে নেই। তাকিয়ে দেখল লোকটা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। সে আর ওদিক গেল না। বিছানা গুছাতে ব্যস্ত হলো। পাশের টেবিলে অন্বয়ের ফোন রাখা। হঠাৎ টুং করে ম্যাসেজ আসার শব্দ হলো। না চাইতেও স্রোতের চোখ গেল সেদিক। ম্যাসেজটা পড়তেই স্রোত থমকে গেল।
ম্যাসেজটা ছিল-

“তুমি আমার না হলে আর কারও হতে পারবে না, অন্বয়। আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমার তো আমায় বিয়ে করার কথা ছিল! তুমি আমায় ছেড়ে কীভাবে অন্য একজনকে বিয়ে করলে? তবে সমস্যা নেই। তোমার এই সংসার বেশিদিন টিকবে না। আমি টিকতে দিব না।”

চলবে……