Home "ধারাবাহিক গল্প "হৃদয় জানে মনের কথা হৃদয় জানে মনের কথা পর্ব-০৫

হৃদয় জানে মনের কথা পর্ব-০৫

0
559

#হৃদয়_জানে_মনের_কথা
#পর্ব_৫
#লেখনীতে_মারিয়া_আক্তার_মাতিন

অন্বয়ের এমন অবস্থা দেখে স্রোত কেমন আঁতকে উঠে। পুরো দেহ তার অবশ হয়ে যায়। সে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে দৌড়ে চলে যায় নিচে। অন্বয় গাড়ির দরজায় একহাতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অবস্থা বেগতিক দেখে গাড়ির ড্রাইভার এসে নমনীয় স্বরে বলল,
-“ স্যার, আমি আপনাকে নিয়ে যেতে হেল্প করব?”

অন্বয়ের শরীর টলছে। তবুও সে বলল,
“ইট’স ওকে। আমি যেতে পারব।”

তখনই ঝড়ের বেগে ছুটে এলো স্রোত। চোখেমুখে প্রবল অস্থিরতা ও বিশদ চিন্তার ছাপ নিয়ে বলল,
-“ আপনার এমন অবস্থা হলো কীভাবে অন্বয় ভাই?”

অন্বয় চোখ তুলে স্রোতের দিকে চাইলো। মেয়েটা খেয়াল করলো অন্বয়ের ঠোঁটও কেটে গেছে। সে অন্বয়ের এক হাত ধরে বলল,
-“ আপনার অবস্থা ভালো না। দ্রুত ঘরে চলুন।”

হঠাৎ কী হলো কে জানে! অন্বয় শক্ত করে স্রোতকে জড়িয়ে ধরলো। একদম বুকের সাথে মিশিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা। পারলে সে স্রোতকে বুকের ভিতরই রেখে দেয়। আচমকা জড়িয়ে ধরায় স্রোত হতবিহ্বল হয়ে গেল। তবে, সে অনুভব করলো তার খুব শান্তি লাগছে। এই যে অন্বয় ভাই তাকে জড়িয়ে ধরেছে, মনে হচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত সুখ বোধহয় সে পেয়ে গেছে। স্বামীর বুকে বুঝি এতো প্রশান্তি? সে ওভাবে বুকে লেপ্টে থেকেই বলল,
-“ছাড়ুন আমায়। দেখছে তো!”

তখন ওখানে শুধু গাড়ির ড্রাইভারই ছিল। তিনি মন ভরে এই দৃশ্যটা অনুভব করছেন। তিনি নিজেও বিবাহিত। কিন্তু বৈবাহিক জীবনে শান্তি জিনিসটা উনার একদমই নেই। তাই তো সহসা এমন দৃশ্যে তিনি মুগ্ধতা খুঁজে পেলেন। তিনি চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলেন।

অন্বয় স্রোতকে জড়িয়ে ধরে গাঢ় কণ্ঠে বলল,
-“ দেখুক। আই ডোন্ট কেয়ার।”

স্রোত বিচলিত কণ্ঠে বলল,
-“ আপনি ঠিক নেই, অন্বয় ভাই। ঘরে চলুন, প্লিজ।”

-“ আমি ঠিক আছি তো! তুই কাছে থাকলে আমি সবসময় ঠিক থাকি।”

এরূপ কথায় স্রোত থমকে গেল। কী বললো অন্বয় ভাই? উনি তো তাকে সহ্যই করতে পারে না, তাহলে? তবে কথাটা যেন একদম তার মনের গহীনে পৌঁছালো। কিন্তু এখন এসব কথায় কিছু হবে না। উনাকে জলদি ঘরে নিতে হবে। স্রোত বলল,
-“ এই বুঝি আপনার ঠিক থাকার নমুনা? কপাল কে’টে কী অবস্থা হয়েছে! ঠোঁট ও তো কেঁটে গেছে। আপনার তো খুব কষ্ট হচ্ছে!”

অন্বয় মুচকি হেসে বলল,
-“ তোকে বুকে জড়িয়ে ধরার পর সব কষ্ট উধাও হয়ে গেছে।”

-“আপনি কি আমার কথা শুনবেন না?”

স্রোত বেশ রাগ হয়েই কথাটা বলল। অন্বয় এবার স্রোতকে ছাড়লো। তারপর অসহায় ফেইস করে বলল,
-“আমি না হাঁটতে পারছি না, স্রোত। তুই কি আমায় ঘরে যেতে সাহায্য করবি?”

-“ আমি তো তার জন্যই এলাম। তাড়াতাড়ি চলুন।”

অন্বয় তার ভর স্রোতের উপর ছেড়ে দেয়। একহাতে স্রোতের কাঁধ জড়িয়ে ধরে। এমন শক্ত, পিটানো দেহের ভর সামলাতে স্রোতের বেশ বেগ পোহাতে হচ্ছে। তবুও কষ্ট করে অন্বয়কে ধরে বাড়ির দিকে এগোলো। ড্রাইভার মনে মনে ভাবতে লাগলেন,
-“ তখন আমি বললাম, না করলো। আর এখন ম্যাডামকে স্বেচ্ছায় নিয়ে যেতে বলছে। একেই বলে ভালোবাসা!”

তারপর আপনমনেই বিড়বিড় করতে লাগলেন,
-“ কপালে যদি থাকে সুখ,
দৌড়ে পালায় সকল রোগ।”

স্রোত অন্বয়কে ধরে ধরে ড্রয়িং রুমের সোফায় এনে বসালো। তখনই ছুটে এলেন ফারজানা বেগম। ছেলের এমন অবস্থা দেখে তিনি চিৎকার করে উঠেন। অন্বয়ের পাশে বসে ছেলেকে পরখ করে বলতে লাগলেন,
-“ বাবা, তোর এ কি অবস্থা! কী করে হলো এমন?”

অন্বয় মাকে শান্ত করতে বলল,
-“ রিল্যাক্স, মা। তেমন কিছুই না।”

-“ চোখের সামনে ছেলের এমন বিধ্বস্ত রূপ দেখার পরও আমায় রিল্যাক্স থাকতে বলছিস?”

-“ বললাম তো তেমন গুরুতর কিছু হয়নি। স্রোত, আমায় ধরে একটু ঘরে নিয়ে যা। আমার এখন বিশ্রামের প্রয়োজন।”

ফারজানা বেগমও বললেন,
-“ হ্যাঁ, স্রোত ঘরে নিয়ে যা। তাড়াতাড়ি ফার্স্ট এইড বক্স বের করে ক্ষত স্থানগুলোতে ওষুধ লাগিয়ে দিস। তুই না পারলে আমায় ডাক দিস।”

স্রোত হালকা হেসে বলল,
-“ ফুফু, তুমি এতো চিন্তা করো না। আমি সব সামলে নিব।”

স্রোত অন্বয়কে ধরে ঘরে নিয়ে এলো। চটজলদি ফার্স্ট এইড বক্স বের করে অন্বয়ের সামনে বসলো। অন্বয় তখন একদৃষ্টিতে স্রোতের দিকে তাকিয়ে আছে। স্রোত তুলো বের করতে করতে বলল,
-“এভাবে তাকিয়ে থাকবেন না৷ আমার কাজ করতে অসুবিধা হবে।”

-“ আমি আমার বউয়ের দিকে তাকিয়ে আছি। তাতে তোর অসুবিধা হবে কেন? তুই কে?”

স্রোতও ফট করে বলে ফেলল,
-“ আমি আপনার বউ।”

কথাটা বলতেই তার ধ্যান ফিরলো যে সে আসলে কী বলেছে। একটা সহজ সরল তবে চিরন্তন সত্য স্বীকারোক্তি। অন্বয় হাসলো। ঠোঁটে হাসি বজায় রেখেই বলল,
-“ যাক, স্বীকার করলি।”

-“ আমি কখনো অস্বীকার করিনি। বরং আপনিই শুরু থেকে আমায় বউ হিসেবে মানতে পারছেন না।”

অন্বয়ের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। এ পর্যায়ে সে কিছু বলল না। আগেকার মতো গম্ভীর রূপ ধারণ করলো। স্রোত কপালের ক্ষত স্থানটাতে তুলো চেপে ধরলো। ব্যথা লাগলেও টু শব্দ করলো না সে। হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো,
-“ তুই আমার জন্য চিন্তা করছিলি, স্রোত?”

-“ ফুফু অনেক চিন্তা করছিল আপনার জন্য।”

-“ তুই করিসনি?”

স্রোত চুপ করে রইলো৷ স্রোতের নীরবতা অন্বয়ের পছন্দ হচ্ছে না। সে অধৈর্য হয়ে বলল,
-“ তোকে কিছু জিজ্ঞেস করেছি!”

স্রোত কয়েক সেকেণ্ড চুপ থেকে মজা করে বলল,
-“ নাহ! আপনার জন্য চিন্তা করতে আমার বয়েই গেছে! আমার তো আর খেয়েদেয়ে কোনো কাজ নেই যে আপনার জন্য চিন্তা করবো।”

অন্বয় কিছু বলল না। সে স্রোতের মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। স্রোত আড়চোখে খেয়াল করে বলল,
-“ এই আপনি হাসছেন কেন?”

-“ তুই একদমই মিথ্যা বলতে পারিস না, স্রোত।”

স্রোত থতমত খেয়ে বলল,
-“ মানে?”

অন্বয় শ্বাস ছেড়ে বলল,
-“ কে জানি ঝড়ের বেগে ছুটে এসে আমায় বলছিল, আমি নাকি একদমই ঠিক নেই, আমার নাকি খুব কষ্ট হচ্ছে, আমার এখন ঘরে যাওয়া প্রয়োজন!”

-“ ওটা তো আমি ওই ইয়ে মানে…

স্রোত কথা শেষ করতে পারলো না তার আগেই অন্বয় স্রোতের ঠোঁটের উপর এক আঙুল রেখে চুপ করিয়ে দিল। মুখটা স্রোতের মুখের খুব কাছে এনে ঠোঁটের চারপাশ স্লাইড করতে করতে লো ভয়েজে বলল,
-“ আমি তোর চোখের ভাষা বুঝতে পারি স্রোত। তোর চোখ তখন অশ্রুসিক্ত ছিল৷ আর সেটা কার জন্য জানিস? আমার জন্য। তাহলে ভাব, তুই আমার জন্য কতোটা চিন্তা করছিলি!”

স্রোত চোখদুটো খিচে বন্ধ করে রেখেছে। অন্বয় এতো কাছে আসায় তার শ্বাসপ্রশ্বাস স্রোতের চোখেমুখে আছড়ে পড়ছে ঠিক সেদিনকার মতো। তার শ্বাস রোধ হয়ে আসছে। অন্বয় সেভাবেই বলল,
-“ চোখ খুল, স্রোত!”

-“ আ..আপনি দূরে সরুন।”

-“ দূরে সরার জন্য তো কাছে আসিনি!”

-“ তাহলে কেন এসেছেন?”

-“ কিছু একটা করার জন্য।”

-“ মা..মানে?”

অন্বয়ের পূর্ণদৃষ্টি তখন স্রোতের গোলাপি ঠোঁটের উপর। একটা অদম্য নেশা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। কিছুতেই সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। সে হঠাৎ ডাকলো,
-“ স্রোওওত!”

-“ ব..বলুন!”

-“ তুই এখন কোথায় ওষুধ লাগাচ্ছিলি?”

-“ আপনার ঠোঁটে। কারণ, আপনার ঠোঁট কে’টে গেছে।”

-“ একটা কাজ করবি?”

-“ আপনি দূরে সরলে করবো।”

-“ না, কাছে থেকেই করতে হবে।”

-“ পারব না।”

-“ ঠিক আছে। আমিও তাহলে ওষুধ লাগাবো না। আমার কষ্ট হবে, ব্যথা হবে। তাতে কার কী!”

স্রোত এবার হার মানলো। বলল,
-“ বলুন, কী করতে হবে।”

অন্বয় হেসে বলল,
-“ আমার ঠোঁটের কা’টা জায়গাটাতে একটা চুমু দিবি?”

স্রোত যেন আকাশ থেকে পড়লো। হতবাক হয়ে বলল,
-“ কীইইই!”

-“ আস্তে! এমন চেচাচ্ছিস কেন?”

-“আমি, আমি পারব না।”

-“ বেশ, তাহলে আমার কথাই থাকলো।”

-“ আপনি এমন করছেন কেন, অন্বয় ভাই?”

-“ আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল। আর কোনো কথা শুনতে চাই না।”

এই বলে অন্বয় দূরে সরে গেল। স্রোত পড়লো বিপদে৷ দুনিয়ার সবচেয়ে কঠিন কাজটা দিয়েছে তাকে করার জন্য! সে কী করবে এখন! চুমু না দিলে অন্বয় ভাই আবার ওষুধও লাগাবে না। কী এক জ্বালা! অন্বয় কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বলল,
-“ ঠিক আছে। তোকে জোর করব না৷ উঠলাম আমি।”

অন্বয় বসা থেকে উঠতে যাবে, এমন সময়ই দূর হতে কিছু উড়ে আসার মতো অন্বয়ের ঠোঁটে চুমু খেল স্রোত। অন্বয় যেন এই মুহূর্তটারই অপেক্ষা করছিল। স্রোত সরে যাবে তার আগেই অন্বয় একহাত স্রোতের চুল গলিয়ে ঘাড়ে রেখে স্রোতের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট মিলিয়ে দেয়। বিয়ের পর এই প্রথম তাদের কাছে আসা, ভালোবাসার স্পর্শ অনুভব করা। দুটো হৃদয়ই অনুভব করছে তাদের মনের কথা।

চলবে……