#হৃদয়_জানে_মনের_কথা
#পর্ব_৭
#লেখনীতে_মারিয়া_আক্তার_মাতিন
অবিশ্বাস্য চোখে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে স্রোত। যেখানে জ্বলজ্বল করছে কয়েক বাক্যের ম্যাসেজ। তার মন, মস্তিষ্ক কেমন নিস্তেজ হয়ে আসছে। দুচোখে কেবল বিশ্বাস ভঙ্গের বেদনা। অন্বয়কে সে খারাপ ব্যবহারের জন্য অপছন্দ করলেও একটা দিক থেকে পছন্দ করতো। সেদিন অন্বয় ভাইয়ের দৃঢ়তার সাথে বলা সেই কথাটা, যে উনার জীবনে কোনো মেয়ে ফ্রেন্ড নেই? সে কথা শোনার পর থেকে মনে এক ধরণের অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করেছিল সে। না চাইতেও উনার প্রতি বিশ্বাসের একটা গাঢ় আস্তরণ তৈরি হয়েছিল। উনি আর যাই করুক, কখনো অন্য মেয়ের দিকে নজর দিবে না। কিন্তু আজ? এ কি দেখলো সে? নিশ্চয়ই মেয়েটার সাথে কোনো না কোনো সম্পর্ক তো ছিলই যার রেশ ধরে এতো বড় একটা ম্যাসেজ দিতে পেরেছে!
স্রোত ফোনটা আগের জায়গায় রেখে ধপ করে বিছানায় বসে পড়লো। বিছানায় দুহাতে ভর দিয়ে মাথা নিচু করে সে চারদিকে উদ্ভ্রান্তের ন্যায় নজর বুলাতে থাকে। সে এখন কী করবে? কোথায় যাবে? কিছুই বুঝতে পারছে না। ওই মেয়েটা কে? উনার সাথে অন্বয় ভাইয়ের কী সম্পর্ক ছিল? উনি কি অন্বয় ভাইয়ের প্রাক্তন? কথাটা ভাবতেই স্রোত কেমন হাসফাস করলো। ভিতরটা অস্থিরতায় চৌচির হয়ে যাচ্ছে। এমন কেন লাগছে ওর? অন্বয় ভাইয়ের প্রতি তো তার কোনো অনুভূতি নেই। তাহলে উনার প্রাক্তন আছে এটা কেন সে মানতে পারছে না? হয়তো স্বামী বলে!
সহসা চোখের সামনে কেউ এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিল। স্রোত পানির গ্লাসটার দিকে চেয়ে চেয়ে উপরে তাকালো। অন্বয় হাস্যহীন মুখে তার দিকে গ্লাস এগিয়ে দিয়েছে। কণ্ঠে গাম্ভীর্যতা বজায় রেখে বলল,
-“এমন ছটফট করছিস কেন? পানি খা!”
স্রোত মুখ ঘুরিয়ে নিল। সামনে থাকা মানুষটিকে তার সহ্য হচ্ছে না। বিষের মতো লাগছে। অন্বয় গ্লাস টেবিলে রেখে স্রোতের পাশে বসলো। গাম্ভীর্যতা সরিয়ে কোমল কণ্ঠে বলল,
-“ কী হয়েছে স্রোত? কোনো কারণে মন খারাপ?”
স্রোত হঠাৎ ভীষণ রেগে গেল। রাগে তার গা কাঁপছে। সে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
-“আমার জীবনটাকে কেন নষ্ট করলেন, অন্বয় ভাই? কেন? কী ক্ষতি করেছিলাম আপনার যে আপনি আমায় তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে মারছেন?”
অন্বয় অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। স্রোত এসব কী বলছে? সে কি এখনো আগের ওসব মনে ধরে নিয়ে বসে আছে? অন্বয় বলল,
-“ দেখ স্রোত, তুই আগের কথা ভুলে যা…
-“ আমি আপনার আগের ব্যবহার ভুলার চেষ্টা করছি কিন্তু পারছি না। কেন জানেন? কারণ, যতোই ভুলতে চেষ্টা করি, ততোই নতুন নতুন কাহিনী এসে আমায় ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে।”
-“ নতুন নতুন কাহিনী মানে?”
স্রোত আসল কাহিনী বলতে গিয়েও বলল না। না, এখনই বলা যাবে না। বললে তিনি সতর্ক হয়ে যাবেন। ফলে পরবর্তীতে কী হবে তা সে ঘূর্ণাক্ষরেও টের পাবে না। জল কতদূর এগোয়, তা দেখতে হবে না? ওই মেয়ের সাথে উনার আসলে কীসের সম্পর্ক তা সে নিজে উদঘাটন করবে৷ কারো মুখের কথা সে বিশ্বাস করবে না। সে চটজলদি নিজেকে স্বাভাবিক করে এমন একটা ভাব করলো যেন একটু আগে কিছুই হয়নি। সে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল।
-“ আচ্ছা অন্বয় ভাই, আপনি তো আমায় ভালোবাসেন না। তাহলে তখন কেন এতো কাছে এলেন?”
অন্বয় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে স্রোতের দিকে তাকিয়ে আছে। কিছু যে একটা হয়েছে, তা সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে৷ এটাও বুঝতে পারছে, স্রোত এখন প্রসঙ্গ ঘুরানোর চেষ্টা করছে৷ কিন্তু হয়েছেটা কী! সে ওভাবে তাকিয়ে থেকেই বলল,
-“ তুই আমার কাছ থেকে কী লুকাচ্ছিস?”
-“ লুকানোর মতো কিছু থাকলে তো লুকাবো৷”
-“বলতে যখন চাচ্ছিস না, তাহলে থাক। তোকে আমি জোর করব না।”
-“ আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন না?”
অন্বয় এ পর্যায়ে হাসলো। বলল,
-“ অন্ধকে পথ দেখানো যায় কিন্তু যে দেখেও দেখেনা তাকে পথ দেখানো বড়োই কঠিন ব্যাপার।”
-“ আপনি কী বুঝাতে চাচ্ছেন?”
-“ কিছু না!”
এই বলে অন্বয় সোফার দিকে যাচ্ছিল। যেতে গিয়েও ফের থামে। স্রোতের দিকে চেয়ে বলে,
-“ তুই আমায় কল দিয়েছিলি?”
স্রোত বলল,
-“হ্যাঁ, কারণ আপনি ফুফুর কল ধরছিলেন না। তাই ফুফু এসে আমায় কল করতে বলেছিলেন।”
-“ মা ভেবেছে আমি তোর কল ধরবো!”
-“ কেন ধরতেন না?”
-“ ধরেছি আমি?”
-“ না। বুঝি তো, আপনার জীবনে আমার কোনো জায়গা নেই। আপনি আমায় বিয়েটা কেন করেছেন সেটাই বুঝতে পারছি না!”
অন্বয় এ প্রসঙ্গে কিছু বলল না। সে সোফায় বালিশ রেখে বলল,
-“ তুই না বলেছিলি, আমার কিনে দেওয়া ফোন ব্যবহার করবি না?”
স্রোত থমথমে মুখে জবাব দিল,
-“ বাধ্য হয়ে করতে হয়েছে। আগের ফোনের তো বারোটা বাজিয়েছেন।”
-“ এটারও বাজাবো যদি ওই অর্কের নাম্বার থাকে। এখন বল, অর্কের সাথে তোর পরে কী কী আলাপ হয়েছে।”
স্রোত মনে মনে রাগে ফুঁসছে। নিজের ফোনে অন্য মেয়ের ম্যাসেজ আসে, সে বেলায় কিছু না! এদিকে তার বেলায় কতো সন্দেহ! তা-ও কিনা তার ছোটবেলার বন্ধুকে নিয়ে! এখন সে যদি ওই মেয়ের ম্যাসেজটা নিয়ে তোলপাড় করে? তখন কেমন হবে? কিন্তু সে এখনই সব প্রকাশ করবে না। তাহলে তো খেলাই শেষ। অন্বয় বলল,
-“ চুপ করে আছিস কেন?”
এখন এড়িয়ে গেলে লোকটা প্যাচাল বন্ধ করবে না। তাকে জেরা করতেই থাকবে। এর চেয়ে বরং বলে দেওয়াটাই ভালো। স্রোত সরল মনে সব বলল। সবটা শুনে অন্বয়ের রিয়্যাকশন কেমন তা ঠাহর করা কঠিন। সে সোফায় শুয়ে বলল,
-“তোর কারো প্রয়োজন হলে সেটা আমাকে হবে। তুই তোর সমস্ত প্রয়োজনের কথা আমায় বলবি। ওকে কেন ফোন করতে হবে?”
-“ সেটা সে আমায় বন্ধু হিসেবে বলেছে। বন্ধু হিসেবে বলতেই পারে।”
অন্বয় মনে মনে বলল,
-“ গর্দভ!”
-“লাইট অফ করে ঘুমা।”
স্রোত লাইট নিভিয়ে বিছানায় এসে শুয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর সে হঠাৎ ডেকে উঠলো,
-“ অন্বয় ভাই!”
সাথে সাথে জবাব এলো,
-“ বল।”
স্রোত অবাক হয়ে বলল,
-“ আপনি ঘুমাননি?”
-“ না।”
-“ কী হয়েছিল আজকে? আপনার এমন অবস্থা হলো কীভাবে?”
-“ এতোক্ষণে জিজ্ঞেস করার সময় হলো?”
-“ আমি তখন নিচে গিয়ে প্রথমেই আপনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। কিন্তু আপনি বলেননি।”
-“ এরপরে আরও করেছিলি?”
-“ সুযোগই তো পাইনি করার।”
-“ তেমন কিছু হয়নি।”
-“ তেমন কিছু না হলে আপনার এমন অবস্থা হতো না৷ আপনি মিথ্যে বলছেন।”
-“ আমার মিথ্যে বুঝতে পারলি অথচ আমায় বুঝলি না!”
-“ মানে?”
-“ মানেটা সেদিনই বুঝবি যেদিন তোর মাথায় ঘিলু হবে।”
-“ আপনি কিন্তু আমায় অপমান করছেন!”
-“ এই বেশি বকবক করিস না তো। ঘুমাতে দে আমায়।”
স্রোত ভেংচি কেটে ওপাশ ফিরে নিজেও ঘুমানোর চেষ্টা করলো।
মাঝরাত। হঠাৎ ফোন বাজার শব্দে অন্বয়, স্রোত দুজনেরই ঘুম ভেঙে গেল। স্রোত বুঝতে পারলো, অন্বয় ভাইয়ের ফোন বাজছে। এই মাঝরাতে উনার ফোনে কে কল দেয়! ওই মেয়েটা না তো? সে ধীরে ধীরে ওপাশ হতে এপাশ ফিরে। তারপর ঘুমের ভান ধরে পড়ে থাকে। প্রথমে একবার কল বেজে কেটে যায়। দ্বিতীয়বার ফোন বাজতে থাকলে অন্বয় বিরক্তি নিয়ে ফোন রিসিভ করে একবার স্রোতের দিকে চেয়ে ব্যালকনিতে চলে যায়। স্রোত আধো আধো চোখে চেয়ে দেখলো অন্বয় ফোন নিয়ে ব্যালকনিতে গিয়ে কার সাথে যেন কথা বলছে। তার মনের ভয়টা সত্যি হলো বোধহয়। নিশ্চয়ই অন্বয় ওই মেয়েটার সাথেই কথা বলছে। তার দুচোখের ঘুম হাওয়া গেছে। দুশ্চিন্তা, অস্থিরতার মাঝে ডুবে গেল সে। সে ধীরে ধীরে উঠে ব্যালকনির দিকে গেল। অন্বয় ভাই কী বলে তা শুনতে হবে। হঠাৎ একটা কথা কানে আসতেই সে স্তব্ধ হয়ে গেল। সে স্পষ্ট শুনতে পেল অন্বয় বলছে,
-“ লিসেন মেহের, একসময় আমি তোমার পাশে ছিলাম কিন্তু এখন আর থাকতে পারব না।”
চলবে…….

