Home "ধারাবাহিক গল্প "হৃদয় জানে মনের কথা হৃদয় জানে মনের কথা পর্ব-০৯

হৃদয় জানে মনের কথা পর্ব-০৯

0
430

#হৃদয়_জানে_মনের_কথা
#পর্ব_৯(প্রথমাংশ)

#লেখনীতে_মারিয়া_আক্তার_মাতিন

-“মিসেস মানে বুঝো তুমি? কখন নামের পূর্বে মিসেস যোগ করা হয় জানো তো নাকি?”

কিছুটা ঠাট্টার সুরে জিজ্ঞেস করলো স্রোত। স্রোতের এই দাপটের সাথে জবাব দেওয়া, সাথে ঠাট্টাস্বরূপ প্রশ্নে মেহেরের গা জ্বলে উঠলো। রাগে টগবগ করছে সে। তবে উপরে উপরে স্থির থাকার চেষ্টা করে জোরপূর্বক মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল,

-“জানবো না কেন? আমি কি অশিক্ষিত নাকি?”

-“দেখে তো তাই মনে হচ্ছে!”

আস্তে করে বলল স্রোত। মেহের ভ্রু কুঁচকে বলল,

-“কী বললে তুমি?”

স্রোত কিছু বলতে যাবে তার আগেই ফারজানা বেগমের উপস্থিতিতে তাদের কথায় ভাটা পড়ে।

-“কে এসেছে রে স্রোত?”

এই বলে সামনে তাকাতেই তিনি বললেন,

-“তোমাকে তো চেনা চেনা লাগছে। অন্বয়ের অফিসে মনে হয় দেখেছিলাম। কী নাম জানি তোমার?”

মেহের হাসিমুখ করে বলল,

-“আসসালামু আলাইকুম আন্টি। আমি মেহের। চিনতে পেরেছেন?”

-“ ওয়ালাইকুমুস সালাম। ও, মেহের! জানিস স্রোত, একবার অন্বয়ের অফিসে গিয়েছিলাম। সেখানে অন্বয় তার অফিসে কর্মরত সকলের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। সেই সুবাদে ওকে চেনা চেনা লাগছিল।”

-“ভালো আছেন আন্টি?”

-“এই তো আল্লাহ রেখেছে যেমন। তুমি কেমন আছো? তোমার পরিবারের সবাই ভালো আছে?”

-“হ্যাঁ, আলহামদুলিল্লাহ সবাই ভালো আছে।”

-“আচ্ছা, বসো এসে।”

স্রোত মনে মনে ভাবতে লাগলো, তার মানে এই মেহের অন্বয় ভাইয়ের অফিসের কর্মচারী। একজন কর্মচারী হয়ে বসকে রাত-বিরেতে ডিস্টার্ব করে তার উপর বস যেখানে ম্যারিড। মেয়েটার সাহস কোন পর্যায়ে গেলে এমন জ’ঘ’ন্য কাজ করতে পারে। আবার, তার সাথেও কী ভাবটাই না দেখালো। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। অন্বয় ভাই যদি প্রশ্রয় না দিয়ে থাকে, তাহলে ওর এমন সাহস পাওয়ার কথা না। কারণ, চাকরি হারানোর ভয় সবার মাঝেই থাকে। নিশ্চয়ই অন্বয় ভাইয়ের কাছ থেকে তেমন প্রশ্রয় পেয়েছে বলেই মেয়েটা আজ উনার বাসা অবধি চলে এসেছে৷ না, আর সে চুপ থাকবে না৷ আজই অন্বয় ভাইয়ের সাথে এ নিয়ে একটা বোঝাপড়া হবে।

-“অন্বয় তো অফিসে গেল৷ তাহলে তুমি হঠাৎ এখানে এলে যে? অফিসে যাও নি? অন্বয় কি জানে, তুমি যে তার বাসায় এসেছ?”

ফারজানা বেগমের প্রশ্নে মেহেরের মুখের হাসি মিলিয়ে যায়। চোখমুখ কেমন শুকনো হয়ে উঠে। সে কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করে সে বলল,

-“আমি তো উনার অফিসে কাজ করি না। রিজাইন দিয়ে দিয়েছি।”

ফারজানা বেগম অবাক হয়ে বললেন,

-“সে কী! কবে দিলে?”

-“অনেকদিন হয়ে গেছে।”

-“রিজাইন দিলে কেন? এখন তাহলে কোথায় জব করো?”

-“আন্টি আসলে কী বলবো! অফিসে একটা ঝামেলা হয়েছিল তো তাই রিজাইন দিয়েছি৷ এখন চাকরি খুঁজছি।”

-“কী এমন ঝামেলা হয়েছিল শুনি যে তুমি রিজাইন দিয়ে দিলে?”

-“আন্টি, আমি আর এখন সেসব মনে করতে চাই না। থাক না!”

স্রোতের কেন জানি মনে হচ্ছে, ঝামেলাটা অন্য জায়গায়। নিশ্চয়ই এই মেয়ের চরিত্রের জন্যই অন্বয় ভাই একে অফিস থেকে বের করে দিয়েছে৷ আর এখন বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে বলছে। সে চাইলেই গতরাতের ওর দেওয়া ম্যাসেজ এবং মাঝরাতে অন্বয় ভাইকে কল করার ব্যাপারে ওকে জেরা করতে পারে৷ কিন্তু ফুফুর সামনে সে এসব করবে না। সে শুধু সুযোগের অপেক্ষায় আছে৷ সুযোগ পেলেই ওকে ধরবে সে। স্রোত বলল,

-“কেন মনে করতে চাও না? একটু মনে করো! আমরাও শুনি তোমার রিজাইন দেওয়ার কারণটা।”

মেহের বিরস মুখে বলল,

-“আমি আসলে বলতে চাচ্ছি না।”

ফারজানা বেগম বললেন,

-“আচ্ছা থাক। তা মেহের, ওকে চিনেছো তো? ও স্রোত। আগে ছিল আমার ভাতিজি আর এখন আমার ছেলের বউ। আমার একটা টুকটুকে বউমা, তোমাদের ম্যাডাম।”

মেহের কটমট করে ভাবতে লাগলো,

-“ম্যাডাম, মাই ফুট! এতটুকু একটা মেয়ে নাকি আমার ম্যাডাম! বসের বউ হয়েছে দেখে কী হয়েছে! এই জায়গাটাতে তো আমার থাকার কথা ছিল। কে জানে, কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে এই মেয়েটা! এই মেয়েটার থেকে আমি কোনদিক দিয়ে কম ছিলাম যে বস আমায় পছন্দ করলো না?”

-“মনে মনে এতো কী ভাবছো, মেহের?”

জিজ্ঞেস করলো স্রোত। আকস্মিক প্রশ্ন করায় মেহের থতমত খেল। আমতা আমতা করে বলল,

-“ক..ককই, কিছু না তো!”

-“তুমি হঠাৎ কী মনে করে এখানে এলে?”

তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে জানতে চাইলো স্রোত। মেহের বলল,

-“কেন আমি কি আসতে পারি না? আমি আঙ্কেল, আন্টিকে দেখতে এসেছিলাম। সাথে স্যারকেও। স্যার কেমন আছে, কী অবস্থায় আছে।”

এর মাঝে ফারজানা বেগম বললেন,

-“আচ্ছা, তোমরা গল্প করো। আমি গিয়ে দেখি রহিমা কী করছে। নাস্তার আয়োজন করতে হবে তো।”

মেহের ব্যস্ত হয়ে বলল,

-“না, না আন্টি৷ কোনো নাস্তার প্রয়োজন নেই। আপনি এতো ব্যস্ত হবেন না।”

-“তুমি চুপ করো তো। তুমি স্রোতের সাথে বসে কথা বলো৷ আমি আসছি।”

এই বলে ফারজানা বেগম উঠে রান্নাঘরের দিকে গেলেন। মেহের আশেপাশে চোখ বুলিয়ে নিলো, কেউ আছে কিনা। তারপর তার সামনাসামনি বসা স্রোতের দিকে কিছুটা ঝুঁকে বলল,

-“কেমন চলছে তোমাদের বিবাহিত জীবন?”

-“খুব ভালো!”

-“স্যার অনেক ভালোবাসে তোমায় তাই না?”

স্রোত হেসে বলল,

-“তোমার স্যার আমায় কতোটা ভালোবাসে তা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না।”

মেহেরের মুখটা কালো হয়ে গেল। স্রোতও এবার ঝুঁকে এসে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

-“তোমার সাহস কী করে হয়, আমার স্বামীর ফোনে এসব ম্যাসেজ দেওয়ার? মাঝরাতে কল করার সাহস কে দিল তোমায়?”

মেহের ঘাবড়ে না গিয়ে হাসলো। সোফায় আরাম করে পিঠ ঠেকিয়ে বসে বলল,

-“তুমি কি জানো, অন্বয় স্যার আমায় ভালোবাসতো? উনার আমাকে বিয়ে করার কথা ছিল?”

উপরে উপরে স্বাভাবিক থাকলেও স্রোতের ভিতরটা কেমন নিষ্প্রাণ হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝে আটকে আছে সে৷ কাকে রেখে কাকে বিশ্বাস করবে? প্রথমত, অন্বয় ভাই যে কিনা এখনও ধোঁয়াশার মতো তার কাছে। স্পষ্ট করে কিছুই বলেনি। দ্বিতীয়ত তার ফুফু। যিনি কিনা বলেছেন, অন্বয় ভাই তাকে বিয়ে করার জন্য পাগল হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু এটা কি আসলেই সত্য? ফুফু আবার তাদের সংসার সুন্দর করতে মিথ্যে বলছে না তো? কারণ, অন্বয় ভাইকে দেখে কখনো মনে হয়, তিনি একদমই তাকে পছন্দ করে না। আবার মাঝে মাঝে কিছু কর্মকাণ্ড…..

-“তুমি বিশ্বাস করতে পারছো না তাই না? দাঁড়াও আমার কাছে প্রমাণ আছে৷ তোমাকে আমি কিছু ছবি আর আমাদের দুজনের চ্যাটিংয়ের স্ক্রিনশট দেখাচ্ছি৷ তাহলেই বুঝতে পারবে আমাদের সম্পর্ক কতোটা গভীর ছিল। মাঝখানে তুমি এসে সব শেষ করে দিলে!”

স্রোতের ভিতরটা কেমন জানি লাগছে। অন্বয় ভাই কি সত্যিই এই মেয়েটাকে ভালোবাসতো? স্বামীর প্রাক্তন আছে, এটা কোনো স্ত্রীই মেনে নিতে পারবে না। সে ও পারছে না। মেহের পৈশা’চিক হাসি দিয়ে বলল,

-“আগে তুমি ছবিগুলোই দেখো।”

স্রোত কাঁপা হাতে ফোনটা নিল। দেখলো ছবিতে একটা পাহাড়ি এলাকায় অন্বয় ভাই মেহেরকে একহাতে জড়িয়ে ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে রেখেছে। মেহের বলল,

-“আমরা দুজন একবার পাহাড়ে ঘুরতে গিয়েছিলাম। সেখানে এই ছবিটা তুলা। আরও আছে দেখো।”

আরেক ছবিতে দুজন এতোটা ঘনিষ্ঠ অবস্থায় ছিল যে স্রোত আর দেখতে পারলো না। সে চোখদুটো বন্ধ করে ফেলল। তখনই কানে ভেসে এলো পুরুষালি কণ্ঠস্বর,

-“এডিট করা ছবি আমার বউকে দেখিয়ে আমার সংসার ভাঙতে এসেছো?”

চলবে……….

#হৃদয়_জানে_মনের_কথা
#পর্ব_৯ (শেষাংশ)
#লেখনীতে_মারিয়া_আক্তার_মাতিন

আচানক এমন মুহূর্তে অন্বয়কে দেখে স্রোত, মেহের দুজনেই চমকে উঠে। মেহের বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ে তৎক্ষনাৎ। চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। অস্ফুট স্বরে বলে,
-“স..স্যার, আপনি অফিসে যাননি?”

অন্বয় সোজাসাপ্টা জবাব দিল,
-“পথে মনে পড়লো, একটা গুরুত্বপূর্ণ ফাইল বাসায় রেখে এসেছি৷ তাই গাড়ি ব্যাক করে বাসায় আসতে হয়েছে। কিন্তু বাসায় এসে যে এমন মিথ্যাচারের মুখে পড়বো তা তো ভাবিনি।”

মেহেরের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তখনি ট্রে-তে নাস্তা সাজিয়ে নিয়ে এলেন ফারজানা বেগম। ছেলেকে এই মুহূর্তে দেখে বললেন,
-“তুই অফিসে যাসনি, অন্বয়?”

-“একটা ফাইল নিতে ভুলে গিয়েছিলাম৷ তাই আবার আসতে হলো।”

তিনি ট্রে সোফার সামনে থাকা কাঁচের টেবিলে রেখে বললেন,
-“তুই যা করিসনা অন্বয়! সব দেখেশুনে নিবি তা না, সবকিছুতে শুধু তাড়াহুড়ো।”

অন্বয় স্রোতের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল,
-“ফোনটা দে।”

স্রোত দোটানার মাঝে পড়ে আছে। কী করবে, কী বলবে কিছুই মাথায় আসছে না৷ সে কখনো ভাবতেও পারেনি যে এমন এক পরিস্থিতির শিকার হবে। অন্বয় ধমকে উঠল,
-“তোকে ফোন দিতে বলেছি!”

অন্বয়ের ধমকে স্রোত ভয়ে কেঁপে উঠে। লোকটাকে এমন রাগতে কখনো দেখেনি সে৷ তাদের বাসর রাতেও এমন রেগে ছিলেন না তিনি। স্রোত সাথে সাথে ফোন দিয়ে দিল অন্বয়ের হাতে। ফোনের স্ক্রিনে তখন অন্বয়, মেহেরের খুবই একটি আপত্তিকর ছবি। ছবিটা দেখে অন্বয়ের মাথায় রক্ত উঠে গেল। কপালের রগ ফুলে উঠেছে। সে একহাত মুষ্টিবদ্ধ করে শ্বাস ছাড়লো। অতঃপর মেহেরের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
-“এসব কী মেহের?”

ভয়ে মেহেরের চোখমুখ শুকনো হয়ে গেছে। সে ক্রমাগত ঢোক গিলছে। অন্বয় স্যার যে এই মুহূর্তে বাসায় এসে পড়বে সে ভাবতে পারেনি। সে তো এই সুযোগেই এসেছিল যে স্যারও বাসায় থাকবে না, সে ও স্রোতকে খুব সহজেই স্যারের প্রতি বিষিয়ে তুলবে। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মনোমালিন্য সৃষ্টি করবে৷ কিন্তু হুট করেই উনি কেন যে চলে এলেন!

-“আন্সার মি, মেহের!”

চিৎকার করে উঠলো অন্বয়। ভাগ্যিস মেহের মেয়ে তাই অন্বয় চেয়েও তার গায়ে হাত তুলতে পারছে না। নয়তো এমন অবস্থা করতো সে যে জীবনে এসব কাজ করার সাহস পেতো না! মেহের তোতলাতে লাগলো,
-“ এ..এ..এটা আপনার আর আ..আমার ছবি। কেন দেখতে পারছেন না আপনি?”

-“আমি তোমার সাথে এমন ঘনিষ্ঠ অবস্থায় ছিলাম? সিরিয়াসলি মেহের?”

-“আ..আপনার মনে নেই হয়তো। আমরা ওই পাহাড়ে ঘুরতে গিয়ে…

-“স্টপ! আর একটা কথা বললে আমি তোমার গায়ে হাত তুলতে বাধ্য হবো!”

তারপর অন্বয় তার ফোন বের করে গ্যালারি ঘেটে একটা ছবি বের করলো। ফোনটা সকলের সামনে ধরে বলল,
-“দেখো সবাই, একবার অফিসের একটা ট্যুরে পাহাড়ে গিয়েছিলাম সবাই। এটা একটা গ্রুপ ফটো যেখানে আমি সহ সকল কর্মচারীরা আছে৷ মেয়েদের সাইডে মেহের ছিল। অথচ সে কি সুন্দর করেই না ছবিটা এডিট করে এমন বিশ্রী ছবিতে রূপান্তর করেছে!”

স্রোত অন্বয়ের হাত থেকে ফোন নিয়ে ভালোমতো দেখতে লাগলো৷ সত্যিই তো! এখানে অনেকের ছবি। আবার, মেহের তো অন্বয় ভাইয়ের ধারেকাছেও নেই। তার মানে, ওসব এডিট করা ছবি ছিল! স্রোত একের পর এক ছবিগুলো দেখতে লাগলো। নাহ! কোনোটাতেই মেহের এবং অন্বয় ভাইয়ের পার্সোনাল ছবি নেই। মেয়েটা তাকে কী বোকাটাই না বানাতে চেয়েছিল!

স্রোত অন্বয়কে উদ্দেশ্য করে বলল,
-“কিন্তু আপনি প্রশ্রয় না দিলে সে এমন কাজ করার সাহস পায় কীভাবে? সত্যি করে বলুন তো, আপনি কি এই মেহেরকে ভালোবাসতেন?”

অন্বয় ঠাণ্ডা চোখে স্রোতের দিকে তাকিয়ে রইলো। তার জীবনের বড়ো ব্যর্থতা হলো, সে মেয়েটার বিশ্বাস অর্জন করতে পারেনি এখনও। অবশ্য করবেই বা কীভাবে! তার সাথে কখনো সেভাবে মিশেনি তো। অন্বয় ফোস করে শ্বাস ছেড়ে বলল,
-“শোন তাহলে, মেহের আমার অফিসে কাজ করতো। আকারে-ইঙ্গিতে পছন্দও করতো তা আমি টের পেতাম। কিন্তু কখনো তাকে পাত্তা দেইনি। আমার হৃদয়, মন কেবল একজনের জন্যই বরাদ্দ৷ এখন আসি, প্রশ্রয় দেওয়ার ব্যাপারে। আমি কোন দুঃখে ওকে প্রশ্রয় দিতে যাবো? ওকে একবার সাহায্য করেছিলাম ব্যস। ওর ভাইয়ের একটা অপারেশন হয়েছিল যার জন্য লাখ খানেক টাকা লাগতো। সে অফিসে এসে কেঁদেকেটে সাহায্য চাইছিল। ওর স্যালারি দিয়েও কুলাচ্ছিল না। তাই অপারেশনের সম্পূর্ণ টাকাটা আমি দিয়েছিলাম। একজন মানুষ হিসেবে এতটুকু করা আমার দায়িত্ব। কিন্তু এতে করে যে সে আরও বেশি মাথায় চড়ে বসবে তা কে জানতো? পরবর্তীতে ওর ভাইও আমাদের অফিসে জব করার জন্য সিলেক্ট হয়। কিন্তু ওর ভাই মানে হাসিব যে একটা আস্ত চোর ছিল তা কেউ বুঝতে পারেনি। আমার অফিস থেকে প্রায় দশ লাখ টাকা চুরি করে সে। অবশ্য পরবর্তীতে ধরাও পড়েছে। আমি নিজ দায়িত্বে ওকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলাম। কী তাই না মেহের?”

মেহের মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। শেষে সত্যিটা এভাবে সামনে চলে আসলো? তার সমস্ত পরিকল্পনা কি তাহলে ভেস্তে যাবে? অন্বয় ফের বলল,
-“আর কী যেন বলছিলে? চ্যাটিংয়ের স্ক্রিনশট? আচ্ছা দেখি তো!”

মেহেরের ফোন অন্বয়ের হাতেই ছিল। সে নিজেই খুঁজে খুঁজে স্ক্রিনশটগুলো বের করলো৷ ম্যাসেজগুলো পড়তেই রাগে তার ব্রহ্মতালু অবধি জ্বলে উঠলো৷ কী সুন্দর করে এডিট করেছে সে! কিন্তু এ নিয়ে আর তাকে কিছু বলতে হয়নি তার আগেই চোখ যায় ছবির নিচে একেবারে কোনায় থাকা একটা নামের উপর। যে অ্যাপ দিয়ে এডিট করা, সেই অ্যাপটার নামই নিচে ছোট্ট করে লেখা। মেয়েটা বোধহয় তাড়াহুড়োর চোটে খেয়ালই করেনি। অন্বয় ঠোঁটের কোণ তুলে হেসে বলল,
-“চোর তো দেখি আগেই ধরা পড়ে গেছে!”

অন্বয় স্রোতের কাছ থেকে তার ফোন নিয়ে মেহেরের ফোনটা দিয়ে বলল,
-“দেখ স্রোত, চ্যাটগুলো এডিট করে তৈরি করা। নিচে অ্যাপের নাম লিখা আছে।”

স্রোত দেখলো, সত্যিই তো! মেয়েটা অন্বয় ভাইকে পাওয়ার জন্য এতোটা নিচে নেমেছে? ভাবতেই তার ঘৃণা লাগছে৷ সে নিজেও তো একজন মেয়ে। একজন মেয়ে হয়ে আরেকজন মেয়ের সংসার ভাঙতে এতটুকু বিবেকে বাঁধলো না?

অন্বয়ের চোখেমুখে এখন রাগ নেই তবে কাঠিন্যভাব স্পষ্ট। সে অধিকতর শান্ত কণ্ঠে বলল,
-“তুমি ভালোই খেল খেলেছো মেহের। সংসার ভাঙার খেলায় কেউ জিতে কিনা জানিনা তবে তুমি জিততে পারবে না। আমি তোমায় জিততে দিব না। মাইন্ড ইট।”

মেহের এতোক্ষণে মুখ খুলল,
-“অনেক বলেছেন আপনি! এবার চুপ করুন! আপনি সবসময় নায়ক সাজতে চান বুঝেছেন! আমার ভাইটাকে কেন জেলে দিলেন? চুরি করেছে, আপনি চাইলে বুঝিয়ে সুঝিয়ে মাফ করে দিতে পারতেন। কিন্তু তা না করে কী করলেন? পুলিশের হাতে তুলে দিলেন? এই কষ্টে আমার মা স্ট্রোক করে বিছানায় পড়ে আছে৷ আমার বাবা টেনশনে টেনশনে শেষ হয়ে যাচ্ছে। এসবকিছু আপনি কীভাবে বুঝবেন?”

-“চোরকে মাফ করে দিলেই তার চুরি করার অভ্যাস বদলে যায় না, মেহের। তোমার মা-বাবা তাদের সন্তানকে সুশিক্ষা দিতে পারেনি। না তোমার ভাইকে দিতে পেরেছে, আর না তোমাকে। তুমি নিজেও একটা চরিত্রহীন মেয়ে যার কারণে অফিস থেকে তোমায় বের করেছি।”

মেহেরের দুচোখে অশ্রু টলমল করছে।
অন্বয় এবার রাগী স্বরে বলল,
-“তুমি অর্থের লোভে পড়ে আমাকে পেতে চাইতে। ভাবতে আমাকে বিয়ে করতে পারলে এসবই তো তোমার। তোমাদের দু ভাইবোনেরই লোভ ছিল অর্থের প্রতি। কার মনে কী চলে তা আমি খুব ভালোই বুঝতে পারি, মেহের। ভালোই ভালোই বলছি, এই মুহূর্তে তুমি আমার বাড়ি থেকে বের হয়ে যাও। নয়তো তোমায় ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করতে দুবার ভাবব না।”

ফারজানা বেগম এতোক্ষণ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছিলেন। তিনি এবার মুখ খুললেন,
-“দাঁড়াও মেহের!”

মেহের মাথা তুলে তাকালো। ফারজানা বেগম মেহেরের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। কয়েক সেকেণ্ড তাকিয়ে থেকেই কষে এক চড় বসালেন মেহেরের গালে। মেহের গালে হাত দিয়ে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। ফারজানা বেগম দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
-“প্রথম চড়টা দিলাম আমার ছেলের পিছে ঘুরঘুর করার জন্য।”

এই বলে ফের আরেকটা চড় দিলেন অপর গালে। বললেন,
-“ দ্বিতীয় চড়টা দিলাম আমার ছেলের সংসার ভাঙতে আসার কারণে।”

স্রোত বিস্ময়ে হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ফুফুর পানে। ছোট থেকে সে ফুফুকে দেখে আসছে, কখনো এমন রাগতে দেখেনি। সে তো ভেবেই নিয়েছিল, ফুফু বোধহয় রাগ করতে জানে না। কিন্তু আজকের এ রূপে তার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হলো।
অন্বয় মায়ের এই কর্মকাণ্ডে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। বরং খুশি হলো বেশ।

ফারজানা বেগম চেচিয়ে বললেন,
-“এক্ষুণি আমার বাসা থেকে বের হয়ে যাও!”

এতো অপমানের পরেও এখানে আর নির্লজ্জের মতো থাকার কোনো মানে হয় না। মেহের দ্রুত পায়ে চলে যাচ্ছিল। যেতে গিয়েও থামে সে। অন্বয়ের দিকে একবার দৃষ্টিপাত করে মনে মনে ভাবে,
-“খেলা এখনো শেষ হয়নি, মিস্টার অন্বয়!”

তারপর দ্রুত কদমে বাড়ির বাইরে চলে গেল সে। ফারজানা বেগম অন্বয়ের দিকে চেয়ে বললেন,
-“তুই তো এই মেয়ের কথা কোনোদিন আমাদের বলিসনি!”

অন্বয় নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
-“বললেই কী হতো, মা? তাছাড়া আমার লাইফে যার ন্যূনতম স্থান নেই তার কথা আমি কেন সবাইকে বলতে যাব? সে জাস্ট আমার লাইফের বিরক্তির কারণ ছিল, সরিয়ে দিয়েছি।”

-“কী বেহায়া মেয়ে! মুখে মধু, অন্তরে বিষ। বেশ করেছিস মেয়েটাকে অফিস থেকে তাড়িয়ে দিয়ে।”

-“আচ্ছা, মা৷ আমি অফিসে গেলাম। এসবের চক্করে পড়ে অফিসে লেইট হয়ে গেল।”

-“আচ্ছা যা।”

ফারজানা বেগম বুঝলেন ছেলে এবং ছেলের বউকে একটু একা ছাড়া দরকার। তাই তিনি উপরে চলে গেলেন। স্রোতও চলে যাচ্ছিল, তখনি ডেকে উঠলো অন্বয়।

-“স্রোত!”

স্রোত দাঁড়ালো৷ তবে ফিরলো না তার দিকে। অন্বয়ই গিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
-“আমার উপর রাগ করে আছিস?”

স্রোত স্বাভাবিকভাবেই বলল,
-“রাগ করব কেন? আপনার তো কোনো দোষ নেই।”

-“আমাকে নিয়ে কোনো সংশয় বা অভিযোগ থাকলে ডিরেক্ট আমায় বলবি। এভাবে মনে চেপে কষ্ট পাস না, আমাকেও দূরে সরিয়ে দিস না।”

-“আপনি…

স্রোতকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই অন্বয় বেরিয়ে গেল। পিছে ফেলে গেল বিস্ময়ে ডুবে থাকা স্রোতকে। লোকটার কিছু কিছু কথাবার্তার ধরন দেখে মনে হয়, সত্যি বোধহয় তাকে ভালোবাসে৷ সেই চিরচেনা গম্ভীর অন্বয় ভাই কবে থেকে তাকে ভালোবাসতে শুরু করলো? ভাবতেই লজ্জায় হেসে দৌড়ে উপরে চলে গেল স্রোত।

চলবে……….