#হৃদয়_জানে_মনের_কথা
#পর্ব_১২
#লেখনীতে_মারিয়া_আক্তার_মাতিন
অন্বয় ও স্রোত ঠিক কতক্ষণ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে তা তারা নিজেরা-ও বলতে পারবে না। দুজনেরই মনের বাসনা এই মুহূর্তটুকু শেষ না হোক, অনন্তকাল তারা এভাবেই একে অপরকে জাপটে ধরে রাখুক। স্রোত পরম যত্নে, আদরে মিশে আছে অন্বয়ের প্রশস্ত বুকে। স্বামীর বুকেই বোধহয় পৃথিবীর সমস্ত সুখ, শান্তি গচ্ছিত আছে। এই শান্তি চিরকাল থাকুক, থাকুক আমরণ। দুজনেরই চোখদুটো বন্ধ। অন্বয় শক্ত করে স্রোতকে দুহাত দিয়ে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে রেখেছে। অশান্তির আগুন এক নিমিষেই নিভে গেছে তার।
অন্বয় স্রোতকে জড়িয়ে ধরেই জিজ্ঞেস করল,
-“শুনলাম, তুই নাকি দুপুরে খাসনি?”
স্রোত বুকে মাথা রেখেই বলল,
-“না। আপনাকে কে বলল? ফুফু বলেছে?”
-“হুম, মা বলেছে। তোর না খাওয়া নিয়ে মা আমায় কতগুলো কথা শোনালো! আমি নাকি দায়িত্বহীন স্বামী, স্ত্রীর প্রতি নাকি আমার কোনো দায়িত্ব নেই, আরও কতো কী! আচ্ছা একটা কথা বল তো, তুই কি মাকে জাদু করেছিস যে মা আমার চেয়েও তোকে বেশি ভালোবাসে? আমাকে নিয়েও মা এতোটা চিন্তা করে না, যতোটা তোকে নিয়ে করে।”
-“এখানে জাদু করার কিছু নেই। ছোট থেকেই তো ফুফু আমায় ভালোবাসতো, আপনি দেখেননি? ওহ! আপনি দেখবেনই বা কীভাবে! আমার প্রতি তো আপনার কোনো নজরই ছিল না।”
অন্বয় মুচকি হেসে বলল,
-“আমার নজর সবসময় তোর উপরই ছিল। শিয়ালের নজর তো সবসময় মুরগির দিকেই থাকে, তাই না?”
স্রোত অন্বয়ের বুক থেকে মাথা তুলে চোখ বড় বড় করে বলল,
-“কী বললেন আপনি!”
-“কিছু না। চল, এখন খাবি।”
-“না, অন্বয় ভাই। আমার এখন খেতে ইচ্ছে করছে না। এখানে আরেকটু থাকি না!”
-“মার খেতে চাস? না খেয়ে খেয়ে অসুস্থ হওয়ার ইচ্ছে হয়েছে নাকি?”
-“আরেকটু পরে….
-“কোনো পরে টরে নেই। এখনই খাবি, চল।”
অগত্যা স্রোতকে খাওয়ার জন্য রুমে যেতে হলো। ফারজানা বেগম ছেলে, ছেলের বউয়ের খাবার রহিমাকে দিয়ে ঘরে পাঠিয়ে দিয়েছেন। উনার শরীরটাও খারাপ লাগছিল। তাই অল্প খেয়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিলেন। অন্বয় এর মাঝে মায়ের সাথে আরেকবার দেখা করে এসেছে। মা তার উপর তখন প্রচণ্ড রেগে ছিলেন। সেই রাগ ভাঙলো কিনা তা-ই মূলত দেখতে এসেছিল সে। রাগ ভাঙাতে গিয়ে উল্টো আরও কতোগুলো কথা শুনতে হলো তার। থমথমে মুখে সে হাত ধুয়ে এসে বিছানায় বসলো। স্রোতকেও ইশারা করলো তার সামনে বসতে। স্রোত বসার পর সে প্লেট হাতে নিয়ে বলল,
-“সেদিন তুই আমায় খাইয়ে দিয়েছিলি, আজ আমি তোকে খাইয়ে দিব।”
স্রোত কোনো দ্বিমত করলো না। বরং সে বেশ খুশি হয়েছে। স্বামীর হাতে খেতে পারা সৌভাগ্যের বিষয়। ক’জন স্বামী যত্ন করে তাদের স্ত্রীকে খাইয়ে দেয়? সে জায়গায় সে এই যত্নটা পাচ্ছে। তার চেয়ে খুশি আর কে হবে? অন্বয় ভাত মাখিয়ে তার মুখের সামনে খাবার তুলে ধরলো। স্রোত আনন্দের সাথে খাবার মুখে পুড়ে নিল। অন্বয় স্রোতকে খাইয়ে দেওয়ার সাথে নিজেও খাচ্ছে। খাওয়ার মাঝেই স্রোত জিজ্ঞেস করল,
-“ফুফুর কথা শুনে মন খারাপ করেছেন?”
অন্বয় অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
-“তুই কীভাবে বুঝলি?”
-“আমিও আসলে তখন ফুফুর কাছেই যাচ্ছিলাম। ফুফুর রুমের সামনে যেতেই দেখি উনি আপনার উপর চেঁচামেচি করছে। আমার মনে হলো, আপনাদের মা-ছেলের মাঝে যাওয়াটা আমার উচিৎ হবে না। তাই আর যাইনি।”
এ পর্যায়ে অন্বয় কিছু বলল না। স্রোত বুঝতে পারলো, অন্বয় ভাই মনে অনেক আঘাত পেয়েছে। তাই সে বলল
-“সরি! আমার জন্য আপনাকে কতগুলো কথা শুনতে হলো!”
অন্বয় বলল,
-“তুই সরি বলছিস কেন? আমি মায়ের কথা শুনে মন খারাপও করিনি, কষ্টও পাইনি। আমার কাছে বরং ভালো লাগছে এই ভেবে যে মা তোকে কতোটা ভালোবাসে, কতোটা স্নেহ করে। তোকে নিয়ে কতোটা চিন্তা করলে আমায় এভাবে বকতে পারে। কিন্তু আমার খারাপ লাগছে এজন্য যে আমার জন্য মা, তুই কতোটা চিন্তায় ছিলি! কতোটা দুশ্চিন্তা করছিলি!”
স্রোত ভীষণ অনুতাপ নিয়ে মিনমিন করে বলল,
-“এসবও তো হয়েছে আমার জন্যই। আমি তখন ও কথাগুলো না বললে তো এমন হতো না!”
-“তুই যে গাধী তাই তখন ওসব বলেছিলি।”
স্রোত কিছু বলল না। অন্বয় তাকে খাইয়ে দিতে দিতে বলল,
-“এখন আবার তুই মন খারাপ করছিস নাকি? খবরদার, মুখ মলিন করলে মাইর দিব। আমি তোকে সবসময় হাসিখুশি দেখতে চাই।”
স্রোতের অন্তরে প্রশান্তির হাওয়া বয়ে গেল। অজান্তেই মুখে হাসি ফুটলো তার। ভাবলো, অন্বয় ভাইয়ের সাথে একটু মজা করা যাক। সে বলল,
-“ফুফু আমায় ভালোবাসে দেখে আপনি খুশি হয়েছেন? আমি তো আরও ভেবেছিলাম, আপনার মনে হয় প্রচুর হিংসা হচ্ছে।”
অন্বয় স্রোতের মজা বুঝতে পারলো। সে ও বলল,
-“হচ্ছে তো। হিংসায় আমার মন পুড়ে যাচ্ছে৷ আমার মা কিনা তোর জন্য এতো চিন্তা করে? এটা আমি কীভাবে সহ্য করবো বল?”
-“আহারে! খুব মন পুড়ছে? আসুন মনে একটু পানি ঢেলে দিই। তাহলে পোড়া বন্ধ হবে।”
-“পানি ঢালতে হবে না। তোকে একটু আদর করতে দে। তাহলেই পুড়ে যাওয়া মনে শান্তি ফিরে পাব।”
এমন কথায় লজ্জায় স্রোতের মুখ লাল হয়ে গেল। অনুভূতির জোয়ারে ফুলে ফেঁপে উঠলো তনুমন। স্রোতের লাল হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে অন্বয় বাঁকা হাসলো। ইচ্ছে করছে, টুপ করে ওই লাল গালদুটি খেয়ে ফেলতে। লজ্জা পেলেও এতোটা কিউট লাগে কেন তার স্রোতকে? এই মেয়ে আর তাকে কীভাবে মারতে চায়?
খাওয়া শেষে হাতমুখ ধুয়ে তারা রুমে আসলো। অন্বয় দরজার ছিটকিনি তুলে দিল। স্রোত বিছানা গোছাচ্ছিল আর ভাবছিল অন্বয় ভাইকে বিছানায় থাকার কথা বলবে কিনা। আর কতদিন সোফায় থাকবে? তারা স্বামী-স্ত্রী। তখন না হয় মান-অভিমানে আলাদা থেকেছে৷ কিন্তু এখন তো,উনি ভালোবাসার কথা স্বীকার করেছেন। তাহলে একসাথে থাকতে অসুবিধা কোথায়?
এসব ভাবনার মাঝেই দুটি বলিষ্ঠ হাত তাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে। স্রোতের কাঁধে মাথা রেখে অন্বয় বলল,
-“আজ একটু আদর করি, বউ?”
স্রোত বরফের মতো জমে গেল। লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে গেল তার দেহখানি। তখনি, অন্বয় তাকে পাঁজা কোলে তুলে নিল। কোলে নিয়েই রুমের লাইট অফ করে ডিম লাইট জ্বালিয়ে দিল। তারপর এগোতে লাগল বিছানার দিকে। এদিকে, স্রোত শক্ত করে অন্বয়ের টি-শার্ট ধরে রেখেছে। কী হবে এখন তার সাথে ভাবতেই লজ্জায় তার জান যায় যায় অবস্থা। উফ! লোকটার এতো তাড়া কেন! পরক্ষণেই ভাবলো, স্বামী তো। উনার তো পূর্ণ অধিকার আছে তার উপর৷ তাহলে কি আজ সেই দিন এসেছে অন্বয় ভাইয়ের কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়ার?
চলবে……..

