Home "ধারাবাহিক গল্প "দৃষ্টির অন্তরালে নিস্তব্ধতা দৃষ্টির অন্তরালে নিস্তব্ধতা পর্ব-৬+৭

দৃষ্টির অন্তরালে নিস্তব্ধতা পর্ব-৬+৭

0
12

#দৃষ্টির_অন্তরালে_নিস্তব্ধতা
#লেখনী_মায়মুনা_আক্তার_মারিয়া
#পর্ব:৬

ডাইনিং টেবিলে সাজানো কয়েক রকমের পিঠা।শীতকাল মানেই হচ্ছে পিঠা খাওয়ার আমেজ। আজ সকালের নাস্তায় পিঠা রেখেছে বাড়ির বউরা। চৌধুরী বাড়ির সকল সদস্য খুব আয়েশ করে খাচ্ছে সেগুলো।মালিহার পিঠা বানানোর হাত ভালো।তিনি পিঠা বানায় এবং তার কাজে সাহায্য করে সুফিয়া ও নাফিসা।এরিদ একটা পাটিসাপটা পিঠা নিয়েই বসে আছে সেটাই একটু একটু করে কামড় দিয়ে খাচ্ছে।কেউ তেলের পিঠা কেউ ভাপা পিঠা যে যা পারছে নিয়ে খাচ্ছে।খাওয়ার মাঝেই শাহাদাত চৌধুরী উৎসকে উদ্দেশ্য করে বললো,
-“আজ অফিসে যাচ্ছো তাহলে?”

-“হ্যা কিন্তু আমার একটা কাজ আছে এগারো’টার দিকে যাবো।”

-“আচ্ছা”
শাহাদাত চৌধুরী এবার ফারাজকে বললো,
-“তোমার নির্বাচনের খবর কী?কতোটা এগিয়েছো?”

-“তোমাদের দোয়া সাথে থাকলে ইনশাআল্লাহ আমি এবার জয়ী হবো।”
ফারাজের উওর পেয়ে শাহাদাত চৌধুরী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।দুই ছেলের কাজ কর্ম নিয়ে তিনি সব সময় চিন্তায় থাকে।ওদের ভবিষ্যৎ কেমন হবে?জীবনের পথা চলা অনেক কঠিন অসংখ্য ঝামেলা, বিপদে পড়তে হয় এসব নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগে।কীভাবে সুখে থাকবে এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে? শুধু যে দুই ছেলেকে নিয়ে এমন নয় বাকি ছেলেমেয়েদের নিয়েও চিন্তায় ভোগে। ভাই-বোনদের ছেলেমেয়ে এটা কখনো শাহাদাত মনে করেন না ওরাও তার ছেলেমেয়ে।পিতা সাইদ চৌধুরী মারা যাওয়ার সময় তাকে দায়িত্ব দিয়ে যায় এ পরিবারকে আগলে রাখার জন্য।শাহাদাত নিজের সর্বস্ব দিয়ে সবাইকে ভালোবাসায় আগলে রেখেছে।এই আধুনিক যুগে কোথায়ই বা দেখা যায় চৌধুরী বাড়ির মতো যৌথ পরিবার!যেখানে ভাইয়ে ভাইয়ে ধন-দৌলত নিয়ে খুন করতেও বিবেকে বাঁধে না সেখানে তাদের পরিবারে রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।
নাস্তার পর্ব শেষ হলে একে একে সবাই সবার কাজে বেরিয়ে যায়।উৎস এগারো’টা বাজে অফিসে যাবে বললেও সেও বেরিয়ে যায় তাকে সিজান প্রশ্ন করলে উৎস কাজ আছে বলে।কী কাজ জানতে চাইলে উৎস সিক্রট বলে বেরিয়ে যায়। চৌধুরী বাড়িতে তিনটে গাড়ি একটা শাহাদাত চৌধুরী আরেকটা সাফওয়ান চৌধুরী নিয়ে বের হয় আর একটি বাড়িতেই থাকে যদি কারো কোনো প্রয়োজন হয় কিন্তু বাড়ির কেউ তো গাড়ি চালাতে পারে না তাই সেটা ফারাজ নিয়ে যায়।বাড়ির থেকে তার পার্টি অফিস বেশি দূরে না তাই পরিবারের কারো প্রয়োজন হলে তাকে ফোন করে সে নিয়ে যায়। কিন্তু এখন তো উৎস এসেছে তাই ওর কথা ভেবে ফারাজ আজ গাড়ি নিয়ে যায়নি রিকশায় চলে গেছে।চৌধুরী নিবাসে এখন মালিহা,সুফিয়া,নাফিসা,সিজান,নিশাত,রোদসী, মেহেক ও এরিদ রয়েছে। ড্রয়িং রুমে বসে তিন বোন মিলে সবজি কাটছে।তিন বউকে জা বললে তারা রেগে যায় তাই তাদেরকে সবাই তিন বোন বলে।সিজান সোফায় বসে ফোন স্কল করছে।নিশাত তার রুমে পড়তে বসেছে।তার স্বপ্ন সে তার বাবার মতো সৎ উকিল হবে।পড়াশোনায় যেমন এগিয়ে আছে তেমনি বাড়ির কাজে তিন মা’কেও সাহায্য করে।পাক্কা গৃহিণী হবে মেয়েটা! মেয়েটার গুন, ব্যবহার দেখে সুফিয়ার গর্ব হয় কিন্তু তার সকল চিন্তা উড়নচণ্ডী ওই মেহেক’কে নিয়ে।

-“আম্মু তোমার ফোনটা দাও তো”

-“তোর ফোন কী হয়েছে?”

মেহেক চিন্তায় পড়ে যায় কী বলবে?এখন যদি বলে ফোনে চার্জ নেই তাহলে তো ওর মা আলু না কেটে হাতের ছুড়িটা দিয়ে তাকেই কুঁচিকুঁচি করবে।
মেহেক কিছুভেবে তারপর আফসোসের স্বরে বললো,
-“কলেজ বন্ধ দেওয়ার পর থেকে ইয়াফার সাথে আর কথা হয়নি রাগ করেছে আমার উপর তাই আমার ফোন ধরছে না তাই তোমার ফোন দিয়ে দিলে যদি ধরে।”

-“মেয়েটা কতো ভদ্র, লক্ষী,শান্ত মেয়ে ওর সাথে থেকে তো ভালো কিছু শিখতে পারিস। ”

-“আরে মেজো মা মেহেক আপুই তো ইয়াফা আপুকে উল্টো তার কুবুদ্ধি শিখাচ্ছে মেহেক আপু কী শিখবে!”
মেহেক দুম করে এরিদের পিঠে কিল বসায়।এরিদ “মেজো মা”বলে ডাক দেয়।
সুফিয়া মেহেকের দিকে চোখ রাঙিয়ে তার ফোনটা দিলো ওকে।মেহেক ফোন নিয়ে এরিদকে ভেংচি কেটে চলে গেলো।

ইয়াফা ও মেহেক বেস্ট ফ্রেন্ড। স্কুল লাইফ থেকে ওদের বন্ধুত্ব।কলেজ বন্ধ দেওয়ার পর তাদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ হয় নাই। একদিন ইয়াফা ফোন দিয়েছিল কিন্তু মেহেক গোসলে গিয়েছিল তাই ধরতে পারেনি সে ভেবেছিলো পরে দিবে কিন্তু তার ভোলা মন ভুলে গেছে।মেহেক কল লাগায় তার রাগীণি বান্ধবী’কে।মেহেক ইয়াফার নাম রাগীণি রেখেছে কথায় কথায় এই মেয়ে রেগে যায়।রেগে যাওয়ার জন্যই এই নাম দেওয়া ওর।

মেহেকের মা ফোন দিয়েছে! তার মেয়ের খবর নেই সে খবর নিচ্ছে!ইয়াফা এই ভেবে কল রিসিভ করলো তার সালাম দেওয়ার আগেই মেহেকের গলার আওয়াজ ভেসে এলো
-“বান্ধবী কেমন আছিস?”

-“তাই তো বলি যার বিয়ে তার খবর নেই পাড়া প্রতিবেশীর ঘুম নেই তা তো হতে পারে না।”

মেহেক দুঃখী দুঃখী ভাব নিয়ে বললো,
-“জানটুস অপমান করিস না।এতো কষ্ট কোথায় রাখবো আমি?”

-“আমার সামনে ডং করবি না।”

-“সামনে কই করলাম!”

-“নাটক করতে ফোন দিয়েছিস!”

-“আমার রাগীণি রাগ করিস না।তোর সাথে সিক্রেট কথা আছে।”

-“জানতাম আমি তোর পেট তো পাতলা কিছু বলবি কিন্তু বলার মতো কাউকে পাচ্ছিস না তাই আমাকে মনে পড়েছে তোর।”

-“এভাবে বলিস না জানটুস কলিজায় লাগে।”

-“সিরিয়াল করবি নাকি? সেই অভিনয় করতে পারিস।এখন বল কি সিক্রেট?”

-“বিকালে বাসায় আয়।”

-“তুই আয়। আমি পারবো না যেতে।”

-“আয় না রে পাখি।”

-“ওকে।এখন বল আসল ব্যাপার’টা কী?”

-“I’m in love.”
মেহেক কথাটা বলেই হাত পা মেলে খাঁটে শুয়ে পড়লো।

-“ক.কী?কে?কী বলছিস তুই?দেখতে কেমন?বাসায় জানে?”

-“আরে থাম এতো প্রশ্ন একসাথে না করে আসতে আসতে কর।”
মেহেক থেমে একটা বালিশ নিয়ে তার বুকের নিচে রেখে উপুর হয়ে শুয়ে বললো,
-“তুই তো জানিস আমার এক কাজিন বাহিরে ছিলো।”

-“হুম জানি তো!”
-“সে এসেছে।”

-“তাতে তোর কী!”
-“আমারি তো সব।”
-“মানে?”
-“তার উপর আমি ফিদা হয়ে গেছিরে বান্ধবী। সব কথা ফোনে বলা যায় না তুই বিকালে আয় সব বলবো।”

-“ওকে আসবো।”
-“আচ্ছা রাখি জানটুস।”
-“বায় জানটুস টু।”

-“স্যার,অফিসের গেইটের ভিতর একটা গাড়ি ধুঁকতে দেখলাম।মনে হয় উৎস স্যার এসেছে।”
ম্যানেজার মুরাদ শাহাদাত চৌধুরীর অফিস রুমে এসে খবরটা তাকে দিলো।মুরাদ বিবাহিত। উৎসের বয়সের সে।তার বাবা মিজান এই কোম্পানির ম্যানাজার ছিলো তিনি মারা যাওয়ার পর তার পদে তার ছেলে মুরাদকে বসান শাহাদাত চৌধুরী। কিন্তু তার দক্ষতা আছে দেখেই এই পদ তাকে দেয়।দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে কাজ করছে শাহাদাত চৌধুরীর সাথে।কাজে কর্মে বাবার মতোই দায়িত্বশীল ও ন্যায়বান।
-“সব কিছু রেডি করে রেখেছিলে?”

-“জ্বি স্যার।চলুন যাই।”

শাহাদাত চৌধুরী মুরাদের কাঁধ চাপড়িয়ে বললো,
-“হুম চলো ওয়েলকাম পর্ব শেষ করে আসি।”
শাহাদাত চৌধুরী কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলো তার পিছু পিছু মুরাদও গেলো।
অফিসের সকল কর্মচারীরা অফিসের ধোঁকার সদর দরজায় শাড়ি বদ্ধভাবে দাঁড়ালো।একপাশে মেয়েরা তাদের হাতে ফুলের থালা আরেকপাশে ছেলেরা তাদের হাতে একটি করে গোলাপ।
উৎস এক হাত পকেটে গুজে ভিতরে প্রবেশ করলো সাথে সাথে তার গায়ে ঝড়ে পড়লো অসংখ্য গোলাপের পাপড়ি এবং তার প্রতি কদমে এগোনোর সাথে সাথে সবাই গোলাপ এগিয়ে দিচ্ছে আর উৎস সেগুলো হাতে নিয়ে জমাচ্ছে। সে বাকরুদ্ধ তার বাবার কান্ড দেখে!প্রথম দিন অফিসে আসায় তার বাবা ঘটা করে তাকে শুভেচ্ছা জানালো।উৎসকে দেখে কয়েকটা মেয়ের চোখ গোলগোল হয়ে আসলো।উৎসর গায়ে নীল রঙের টি-শার্ট, জিন্সের প্যান্ট, হাতে শীতের পোশাক নিয়ে বড় বড় কদমে বাবার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সুঠাম,বলিষ্ঠবান দেহ ও শক্তপোক্ত শরীর,উচ্চতা,গায়ের রং,চাপ দাঁড়ি, হাতে হোয়াইট কালারের ঘড়ি সব মিলিয়ে উৎসকে যা লাগছে না!
উৎস বাবার সামনে দাঁড়িয়ে সবার উদ্দেশ্য সালাম দিলো।
-“এসব কোনো মানে হয়!এগুলো কি করেছো!”

-“স্যার আপনি এই প্রথম পা দিলেন অফিসে আর আপনার জন্য আমরা এতটুকু করবে না!”
উৎস মিরাদের দিকে তাকালো।মুরাদকে চিনতে না পেরে তার বাবাকে জিজ্ঞেস করলো
-“উনি কে?”

-“তোমার মিজান আঙ্কেলের ছেলে মুরাদ।”

-“মুরাদ!”
উৎস মুরাদকে গিয়ে ঝাপটে ধরে।অনেক বছর পর তাদের দেখা হলো।ছোট বেলায় এক সাথে খেলতো কিন্তু মিজান তার স্এী ও মুরাদকে গ্রামে পাঠিয়ে দেয় তারপর থেকে তাদের আর দেখা হয়নি বাবা মারা যাওয়ার পর শহরে আসে মুরাদ। এসে শুনে উৎস চলে গেছে বাহিরে।
-“তুই আমাকে স্যার বলবি না।”

-“এটা হয় না আমি এখন ম্যানেজার পদে আছি আর আপনি আমার স্যার।”

-“আগেও কী তুই আমাকে স্যার বলতি? তো এখন কেনো বলছিস!ভাই বলবি এন্ড তুমি করে।”
ছেলের ব্যবহার দেখে শাহাদাত চৌধুরী হেসে দিলো।
-“উৎস একদম ঠিক বলেছে বন্ধুত্বের মাঝখানে আপনি, স্যার মানায় না।”

-“আচ্ছা, ভাই যা বলেছে তাই হবে।”
———–
পার্টি অফিসে গিয়ে ফারাজ তার লোকদের ভালো করে বুঝিয়ে দিয়ে এসেছে আগামীকাল কোন কোন এলাকায় নির্বাচনের প্রচারে যাবে এবং তার সাথে তারা যেনো কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করে।শান্তিপূর্নভাবে প্রচারণা চালায়।বিরোধী পক্ষ উঠে পরে লেগেছে কিভাবে ফারাজকে সড়ানো যায়। তাই তারা একের পর এক জাল বিছিয়ে যাচ্ছে ফারাজকে সড়ানোর জন্য।কিন্তু ফারাজ বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান হওয়ায় তাকে এখনো সড়াতে পারেনি আর না তার নামে কোনো খারাপ খবর রটাতে পেরেছে।তার বিরোধী পক্ষ মফিজ। কিছুদিন আগে সে কিছু লোককে টাকা খাইয়ে বলিয়েছে ফারাজ নাকি তাদের পরিবারের বাচ্চাদের তুলে নিয়ে বন্ধি করে রেখেছে নির্বাচনে জয়ী হলে ছাড়বে এর ব্যতীত নয়।কিন্তু ফারাজের কানে এ খবর পৌঁছালেই সে লোক লাগিয়ে মফিজের গোপন আড্ডায় সিসি ক্যামেরা লাগায়।মফিজ যখন তার সঙ্গীদের নিয়ে আলোচনা করছিলো এবার রাস্তা থেকে ফারাজকে চিরতরের জন্য সড়িয়ে দেওয়ার মতো কী করেছে। তারপর সেই সিসিটিভি ফুটেজ দ্বারা নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করে ফারাজ।নাম খারাপ হয় মফিজের।তারপরও দমে থাকেনি মফিজ ফারাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেই যাচ্ছে। ফারাজ চাইলেও কিছু করতে পারছে না তার বাবার জন্য।শাহাদাত চৌধুরী কঠোর ভাবে নিষেধ করে দিয়েছেন বিরোধী পক্ষ ব্যতিত নির্বাচন হলে তার কোনো দাম থাকে না।যদি রাজনীতিতে জয়ী হতে চাও তাহলে ধৈর্য ধরে তোমার রাস্তায় যারা কাঁটা ফেলবে তাদেরকে না সড়িয়ে কাঁটাকে সড়াও দেখবে একদিন হাঁপিয়ে গিয়ে তোমার পিছু আর নিবে না তারা।বাবার এই একটি কথার জন্যই ফারাজ কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
ফারাজ সদর দরজা দিয়ে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো তখনি তার চোখে ধরা দিলো এক কালো বোরকা পরিহিত কাউকে।মেয়ে নাকি ছেলে বুঝতে পারছে না সে কারণ ছেলেরাও বোরকা পরে চুরি করতে ধুঁকে!মেয়ে চোরও হতে পারে।ফারাজ চোরের পায়ের দিকে তাকালো পায়ে নুপুর পড়া তাই ভাবলো এটা মেয়ে চোর!চৌধুরী নিবাসে চুরি করতে ধুঁকেছে! কলিজা তো অনেক বড়!চোরের ব্যবস্থা নিতে হবে।
সিঁড়ি দিয়ে চোর উপরে যাচ্ছে ফারাজও পা টিপেটিপে তার পিছু পিছু উপরে যাচ্ছে।চোরের কাছে গিয়ে ফারাজ পিছন থেকে ঝাপটে উঁচু করে ফেললো।মেয়েটা ছটফট করতে লাগলো কিন্তু ফারাজ ছাড়লো না সে রাগী স্বরে বললো,
-“দিন দুপুরে এসেছো চুরি করতে চৌধুরী নিবাসে!যদি এই জুবায়ের ফারাজ চৌধুরীর মন চুরি করতে আসতি দিয়ে দিতাম কিন্তু তুই এসেছিস পুরো নিবাসকে চুরি করতে তোর জায়গা থানায় হবে না হবে নরকে।”

-“আ..আরে….মশাই আমি চোর না!আমি চুরি করতে আসিনি!আমি মেহেকের বান্ধবী।”

মেহেকের বান্ধবী!মেহেকের বান্ধবীকে এভাবে ঝাপটে ধরে রেখেছে কেউ দেখলে তো সর্বনাশ।ফারাজ মেয়েটাকে ছেড়ে দিলো।ইয়াফা নিচে পড়ে গেলো।
-“আহ”করে শব্দ করলো।কমড়ে হাত দিয়ে বসে আছে ব্যাথায় কুঁকড়িয়ে যাচ্ছে।ইয়াফা নেকাপ খুলে ফারাজের দিকে রাগী চোখে তাকালো।
ফারাজ শুকনে ঢোক গিলে বললো,
-“সরি আমি বুঝতে পারিনি।যেভাবে চোরের মতো ঠুকছিলে।”

-“আমি চোরের মতো ঠুকছিলাম!”

-“তা নয়তো কী?জীবনে তো দেখলাম না পর্দা করতে কে জানতো বাড়ির ভিতরে পর্দা করে ঘুরে বেড়াও!”

-“তাতে আপনার কী?”

ফারাজ হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
-“আমার কিছু না তবে আমার হতে কতক্ষণই বা লাগবে।ধরে উঠে দাঁড়াও।”

ইয়াফা ফারাজের হাত শক্ত করে ধরে উঠে দাঁড়ালো।
-“তোমার নাম’টা জেনো কী?”

-“ইয়াফা”

-“এসব ইঁদুর ফিদুর নাম রেখেছে কে?মনে থাকে না!”

-“আপনার মনে থাকা দিয়ে আমি কী করবো!”

-“এই আল্লাহর বান্দী তুমি কী জানো না মনের মিল হওয়ার আগে মনে থাকা প্রয়োজন।”

-“গুছিয়ে তো ভালোই কথা বলতে পারেন তো রাজনীতি বাদ দিয়ে কবি টবি হবেন নাকি!”

-“কবি কবি ভাব হচ্ছে কিন্তু ইয়াফা.. থুক্কু কবিতার অভাব।”

-“কিরে তুই এখানে দাঁড়িয়ে কেনো?কখন এসেছিস? রুমে আয়।”

-“মাই সিস্টার তোর ফ্রেন্ডকে মনে হয় কোলে করে নিয়ে যেতে হবে।”
কথাটা বলেই ফারাজ তার রুমে চলে গেলো।
মেহেক চিন্তিত স্বরে ইয়াফাকে বললো,
-“কেনো কী হয়েছে তোর?”

-“মন্ডু হয়েছে!চল তো।”

-“তুই যা আমি কিছু নিয়ে আসি খাবো আর গল্প করবো।”

******
ইয়াফা মেহেককে বললো ফারাজ তার সাথে কী করেছে।মেহেক দুঃখ প্রকাশ করে মলম লাগাতে বললো।ইয়াফা তার কমড়ে মলম লাগিয়ে নেয়।
মেহেককে উৎস চকলেট, ঘড়ি,শাড়ি দিয়েছে এগুলো মেহেক ইয়াফাকে বললো এবং দেখালো।
উৎস মেহেককে বলেছিলো ওর ছবি দেখতে ভালো করে তাই মেহেকও বাধ্য মেয়ের মতো উৎসের ছবি মন ভরে দেখেছে।উৎসকে সে তার জীবনসঙ্গী হিসেবে ভাবেনি আর ভাববে এটাও তার কল্পনায় কখনো আসেনি।কিন্তু উৎসের মুখে কিছু রয়েছে যা অজানা!মন মাতানো চাহনি!সুঠাম দেহের পুরুষ,চারিএিক বৈশিষ্ট্য কোনো অংশে কম না উৎসর।মেহেক কখনো কোনো ছেলের প্রেমে পরেনি তবে উৎসকে দেখে তার প্রেম করতে ইচ্ছে করলো তবে সেটা ওর সাথে এমনটা না তার মনের মতো কাউকে পেলে।সে প্রেম করবে এটা বাড়ির কেউ জানলে তার মেরুদণ্ড আর সোজা থাকবে না।বাড়িতেও জায়গা হবে না তার এই ভেবে প্রেমের চিন্তা মাথা থেকে বাদ দিয়েছে।পরেরদিন ভোরে উৎস যখন মেহেককে নিয়ে গেলো তার সাথে ছবি তুললো,তার সাথে হাটঁলো তখন উৎসের প্রতি আরো ভালো লাগা কাজ করলো।উৎসের স্পর্শ করা,ভালোবাসা ভরা ওই দুটো চোখ যেনো মেহেকের হৃদয়ে তুফান বয়ে আনে।বাসায় আসার পর থেকে কতো বার যে তাদের ছবি গুলো দেখেছে আর মিটিমিটি করে হেঁসেছে।এমনি সকালে নাস্তা করার সময়ও আড়চোখে মেহেক সবার অগোচরে উৎসর দিকে তাকিয়েছিলো।এতো সুদর্শন একটা যুবক না তাকিয়ে কী পারা যায়!নিজের প্রতি নিজের এখন দয়া হচ্ছে,ইশ!আগে কেনো যে এভাবে দেখেনি?মেহেকের মাথায় এখন উৎসের কথাই ঘুরছে।

#চলবে

#দৃষ্টির_অন্তরালে_নিস্তব্ধতা
#লেখনী_মায়মুনা_আক্তার_মারিয়া
#পর্ব:৭

-“তুই কী সিউর তোকে তোর উৎস ভাই পছন্দ করে?”

মেহেক চিন্তত স্বরে বললো,
-“সেটা তো সিউর না।কিন্তু আমার মনে হয় উনি একটু হলেও আমাকে পছন্দ করে।দুই একটা আইডিয়া দে না কী করা যায়!”

-“এক কাজ কর তোকে যেই নীল শাড়িটা দিয়েছে ওইটা পরে ছবি তুলে পাঠা।”

-“পাঠালে কী হবে?”

-“তোর ছবি দেখে কিছু তো বলবেই তাই না।”

-“আমি তো শাড়ি পড়তে পারি না।”

-“আমি একটু একটু পারি বাকিটা ফোন থেকে দেখে নিবো।”
মেহেক উঠে গিয়ে দরজাটা লাগিয়ে দিলো।ইউটিউব থেকে একটা ভিডিও অন করে ইয়াফা মেহেককে শাড়ি পড়িয়ে দেয়।বড়দের মতো সুন্দর হয়নি পড়া তবে খারাপও হয়নি।চুলগুলো ছাড়া এবং ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক দিয়েছে।বেশ লাগছে মেহেককে!নীল শাড়িতে মেহেককে নীলপরী লাগছে।মেহেক কয়েকটা পোস নিলো আর ইয়াফা ফটাফট কয়েকটা ছবি তুলে ফেললো।বাহিরে তুললে ছবিগুলো সুন্দর হতো কিন্তু বাহিরে বের হলে সবার হাজারটা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে তাই রুমেই তুললো। মেহেক সেগুলো দেখে কয়েকটা ছবি উৎসর হোয়াটসঅ্যাপে পাঠালো।উৎস অফিসের কিছু ফাইল দেখছিলো ফোনে টুং করে শব্দ হতেই ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো অনাকাঙ্ক্ষিত সময়ে অপ্রত্যাশিত ব্যাক্তি থেকে ছবি এসেছে!মেহেক কী ছবি পাঠিয়েছে তা দেখার জন্য উৎস ফোনের লগ খুলে ছবি দেখে।তার দেওয়া নীল কাঞ্জিভরম শাড়ি পড়ে তাকে ছবি পাঠিয়েছে!কী অপরূপ সুন্দরী লাগছে তার রোজকে।উৎস মন ভরে দেখলো তার নিজস্ব পরী’টাকে।শাড়ি পড়লে তার রোজকে এতো সুন্দর লাগে সে তো জানতো না!ইশ কাছ থেকে দেখলে হয়তো কিছু একটা হয়ে যেতো।খোলা চুলে প্রসাধনি সারাই জ্বলজ্বল করছে তার নীল পরীটা। উৎস ছবি দেখেছে কিন্তু কোনো রিপ্লাই দেয়নি তাই মেহেক মেসেজ পাঠালো
-“আমাকে কেমন লাগছে?”

উৎস মেহেকের মেসেজ দেখে মুচকি হাসি দিয়ে সেও একটা মেসেজ পাঠালো
~”যখন খোলা চুলে
হয়তো মনের ভুলে
তাকাতো সে অবহেলে
দু’চোখ মেলে..
হাজার কবিতা,বেকার সব’ই তা..
হাজার কবিতা,বেকার সব’ই তা.
তার কথা কেউ বলে না
সে প্রথম প্রেম আমার নীলাঞ্জনা~

উৎসর মেসেজ দেখে মেহেক এক লাফ দিয়ে ইয়াফাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
-“জানটুস থাঙ্কু তোর বুদ্ধি কাজে লেগেছে।”

-“সত্যি!দেখি কী পাঠিয়েছে?”

ইয়াফা দেখলো উৎস একটা গানের কলি লিখে পাঠিয়েছে।উফ কী রোমান্টিক!ভালোবাসে সেটা গানের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিলো।

ইয়াফা বিকালে এসেছিলো মেহেককে শাড়ি পরিয়ে ছবি তুলতে তুলতে সন্ধ্যা হয়ে যায়।কিছুক্ষণ পর গুটগুটে অন্ধকার হয়ে আসবে।ইয়াফা একা যেতে ভয় পাচ্ছে আর কাউকে বলতেও পারছে না ইতস্ততবোধ করছে।ড্রয়িং রুমে সবাই আছে সবাইকে বলে ইয়াফা সদর দরজার দিকে পা বাড়ায়।
-“দাঁড়াও।”

ইয়াফার পা থেমে যায়।সবাই ফারাজের দিকে তাকায়।

-“মেহেক তোর বান্ধবীকে নিয়ে গাড়িতে বস আমি নামিয়ে দিয়ে আসছি।একা গেলে কিছু একটা হতে পারে কিছুক্ষন পর অন্ধকার হয়ে যাবে।”

ইয়াফা ফারাজের কথা শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। কেউতো তার মনের কথা বুঝলো।
মালিহা বললো,
-“আসলেই তো একদম খেয়ালি করিনি মেয়েটা একা যাবে কীভাবে!”

-“কিন্তু আমি কেনো যাবো তুমি নামিয়ে দিয়ে আসো!আমার অনেক ঠান্ডা লাগছে বাহিরে গেলে আরো লাগবে আমি যাবো না।”

-“তোর বান্ধবী যদি একা ভয় পায়।”

-“আমার বান্ধবী ভিতু না তুমি তো আছো সাথে।”

-“ওকে না গেলে কী করার তুমি গিয়ে গাড়িতে বসো।”

ইয়াফা শান্ত স্বরে বললো,
-“আমি একা যেতে পারবো শুধু শুধু আপনি কেনো ঠান্ডায় বের হবেন।”

সুফিয়া বললো,
-“তোমাকে তো একা ছাড়া যাবে না। ফারাজ দিয়ে আসবে।”

———
গাড়ির সামনে এসে ইয়াফা দাঁড়িয়ে থাকে। তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ফারাজ বললো,
-“কী যেতে ইচ্ছে করছে না পারমানেন্টলি থাকার ব্যবস্থা করে দিবো নাকি?”

-“পারমানেন্টলি মানে?”

-“চৌধুরী নিবাসের বউ হওয়ার কথা বলছি।”

-“আপনি কী ইভটিজিং করছেন!”

-“নো ডিয়ের।আমার হৃদয়ে গেঁথে গেছো সেখান থেকে মোছা অসম্ভব তাই ডিরেক্ট বউ বানানোর প্রপোস করলাম।প্রেম টেম আমার দ্বারা অসম্ভব ওসব হারাম কাজ আমি করি না।”

-“আমাকে কাল দেখতে আসবে।”

-“দেখাদেখির কী আছে বিয়ের পর দেখে নিবো।”

-“রাবিশ!আমার বিয়ে নিয়ে কাল পাকা কথা হবে।ছেলে পক্ষ থেকে লোক আসবে বিয়ের ডেট দিতে।”

ফারাজের নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলো মনে হচ্ছে।শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে!এতো দিনের ভালো লাগার মানুষটাকে কী হাত ছাড়া হয়ে যাবে!মনের ভিতর ভালোবাসা আটকে রেখেছিলো কাউকে বুঝতে পর্যন্ত দেয়নি আর আজ যখন জানতে পারলো প্রিয় মানুষটার বিয়ে হচ্ছে অন্য কারো সাথে তখন তার ভিতরে তুফান বয়ে গেলো।
ইয়াফা করুন স্বরে বললো,
-“আ…আমার ছেলেটাকে পছন্দ না প্লিজ বিয়েটা কোনো ভাবে ভাঙতে পারবেন।”

ইয়াফার কথায় ফারাজের মুখের রেখা বদলে গেলো।আশার আলোর পথ খুঁজে পেলো।
-“কাউকে পছন্দ?”

ইয়াফা দু’পাশে মাথা নাড়ালো।ইয়াফার মনে কেউ নেই জেনে ফারাজ খুশি হয়ে গেলো।
-“আগামীকাল দেখা হবে।গাড়িতে বসো।”

ইয়াফা ইতস্তত স্বরে বললো,
-“কোথায়?”

-“জিপে বসতে বলছি কোলে না।”
ইয়াফা ফারাজের লাগামহীন কথায় লজ্জা পেয়ে যায় কথা ঘুরানোর জন্য বললো,
-“আপনার জিপ নাকি?”

-“হুম।গাড়িতে আবার আমার পোসায় না কিছু সমস্যা হইছিলো তাই মেরামত করতে পাঠিয়েছিলাম শরীর সুস্থ হইছে তাই কামব্যাক করেছে আমার কাছে।কয়দিন বাড়ির গাড়িটা নিয়েই বের হতে হইছে।”

প্রথম দিনেই উৎস বাবার ব্যবসার অর্ধেক বুঝে নিয়েছে।তার বাবাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে সে দেরি করে বাসায় ফিরেছে।বাড়ির সবাই সবার ঘরে।উৎস ফোন করে মাকে বলে দিয়েছে তার খাবার ডাইনিং টেবিল ঢেকে রাখতে।উৎস অফিস থেকে ফিরে শাওয়ার নিয়ে নিচে যায়।অনেক খিদে পেয়েছে খেতে হবে।নিচে নেমে মেহেককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে।ঠোঁটের কোণায় রহস্যজনক হাসি।উৎস চেয়ার টান দিয়ে বসে।মেহেক খাবারের প্ল্যাট এগিয়ে দেয়।উৎস আন্দাজ করলো এই মেয়ের মাথায় কিছু ঘুরছে!
-“খেয়েছিস?”

-“হুম”

-“তাহলে ঘুমাসনি কেনো?”

-“আপনি এসে ঠান্ডা খাবার খাবেন এই ঠান্ডায় তাই।”

উৎস দেখলো সব খাবার থেকেই ধোঁয়া উড়ছে তার মানে গরম করেছে মেহেক।যে মেয়ে পানি ঢেলে খেতে পারে না মে মে করে চেঁচায়,সেই মেয়ে তার জন্য খাবার গরম করেছে!
মেহেক উৎসের পাশের চেয়ারে বসলো।উৎসকে মেহেক বললো,
-“উৎস ভাই।”

উৎস মুখে এক লোকমা ভাত দিয়ে বললো,
-“কিছু বলবি”

-“আপনার গানের মানে আমি বুঝিছি।”

-“কী বুঝেছিস?”

মেহেক তার ওড়না আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে মৃদু স্বরে বললো,
-“ওই যে যা বোঝাতে চেয়েছেন। আমি কিন্তু রাজি।”

উৎস আঁচ করতে পারলো মেহেক তাকে নিয়ে কী ভাবছে?কিন্তু এখন তো সব জানালে চলবে না আগে তো জানতে হবে তার জন্য কতটুকু পাগল এই মেয়ে।তাই উৎস ভাব নিয়ে বললো,
-“বাহ!ভালোই তো।তুই যেহেতু রাজি তাহলে বাড়ির সবাই রাজি হবে কিন্তু বড় ভাইদের আগে বিয়ে করা বেমানান।”

-“তাহলে কী করবেন?”

উৎস মুখের ভাত শেষ করে বললো,
-“ভাবছি বিয়েটা সবার অগোচরে সেরে ফেলি আর তুই যেহেতু রাজি তাহলে তুই হবি আমাদের বিয়ের প্রধান সাক্ষী।”

প্রধান সাক্ষী!কী বলছে এই লোক।তাকে বিয়ে করলে তো সে বউ হবে।সে কেনো প্রধান সাক্ষী হবে।
-“তোর ভাবি কিন্তু পর্দা করে।তাই তোকে ছবি দেখাতে পারলাম না কিন্তু দেখতে মাশাল্লাহ সেই সুন্দর।”

মেহেকের মুখ চুপসে গেলো।উৎস ভাইয়ের মুখে অন্য মেয়ের প্রশংসা!সে অন্য কাউকে পছন্দ করে,তার মনে অন্য কেউ!কিশোরী মনে একবার কাউকে নিয়ে স্বপ্ন দেখলে সেই স্বপ্ন পূরণ না হলে যে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়।তার মনে তো কেউ নেই তাহলে সে যাকে চাইলো সে কেনো অন্য কাউকে চাইছে তাও তার সামনে।মেহেকের খুব অসহায় লাগলো।মেহেককে আর একটু কষ্ট দেওয়ার জন্য উৎস বললো,
-“আমি তো ভেবেছিলাম তুই গানটার মানে বুঝবি না তাই বলেছি কে জানতো তুই বুঝে ফেলবি!জানিস মেহেক ও শাড়ি পড়লে অনেক সুন্দর লাগে।”

-“আর আমাকে?”

উৎসর খাওয়া শেষ।সে হাত ধুয়ে হাত মুছতে মুছতে বললো,
-“তোকে সে-রকম ভাবে দেখা হয়নি তাই বলতে পারছি না।”

হাত মুছা হয়ে গেলে উৎস বললো,
-“কেচ”
হাতের তোয়ালেটা মেহেকের দিকে ছুড়ে মারলো।মেহেকের মুখে গিয়ে পড়লো।মুখ থেকে সরিয়ে হাতে নিয়ে দাঁড়ালো।উৎস তার রুমে চলে গেলো।

মেহেক তোয়ালে হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে অভীমানি স্বরে বললো,
-“আমাকে কেনো দেখলেন না উৎস ভাই?যৌবনের প্রথম প্রেম তো আপনি কিন্তু আপনি আমার হয়েও হইলেন না!”

পরেরদিন~
সকালে নাস্তার টেবিলে সবাই উপস্থিত কিন্তু মেহেক নেই।উৎস আড়চোখে তাকিয়ে দেখলো একটা চেয়ার ফাঁকা।গতরাতে তার কথায় যে তার রোজ কষ্ট পেয়েছে সেটা উৎস বুঝতে পারলো কিন্তু এখন তো সেই সময়টা আসেনি সব বলে দেওয়ার!মেহেককে সব বললেই তাকে পাগল করে ফেলবে।এতো বছর যখন তার মনকে মানাতে পেরেছে আর কিছু দিন তো অপেক্ষা করতে হবে।বোকা রোজ তার ভালোবাসা বুঝলো না!ভালোবাসা কী মুখে বলতে হয় নাকি!ভালোবাসা স্বীকারোক্তি দিলেই ভালোবাসা হয়ে যায় না বরং ভালোবাসা অনুভব করতে হয়,ভালোবাসা ফুটে উঠে যত্নে।সাফওয়ান তার গিন্নিকে বললো,
-“মেহেক এখনো আসেনি কেনো?”

সুফিয়া তার উওরে বললো,
-“মেহেক সবার আগেই খেয়ে চলে গেছে।ওকে ডাকতে না করেছে বললো পড়তে বসবে।”
মেহেক এই কথা বলেছে! সবাই অবাক হলো কিন্তু খুশিও হলো মেহেক একদম পড়তে বসতে চায় না
পড়ার প্রতি তার আগ্রহ হলে ভালো তো।তবে ফারাজের মনে খটকা লাগলো।তার বোনের হঠাৎ পরিবর্তন তাও এমনি! ফারাজ উৎসের দিকে তাকালো।উৎস নির্বিকার ভাবে খাচ্ছে। তার খাওয়ার মনোযোগ দেখে ফারাজ সিজানের দিকে তাকালো। সিজান ও ফারাজ একে অপরের চোখাচোখি হলে উৎসের দিকে তাকায়।উৎস আন্দাজ করতে পারলো তার দিকে এক জোড়া না বরং দুই জোড়া চোখ তাকে গিলে খাচ্ছে।কিন্তু সে সেই দিকে খেয়াল না করে খাওয়ায় আগ্রহী হলো।

-“সিজান তোমার মামি বললো আজ নাকি চলে যাবে।”

-“হ্যা, বড় মামা।দুই দিনের ছুটি নিয়েছিলাম বিকালে চেম্বারে বসতে হবে। তাছাড়া স্রোত এর জন্য একটা ভালো সম্মন্ধ পেয়েছি। ছেলেটা খুব ভালো আব্বু চাইছে স্রোতের বিয়েতা দিয়ে দিতে।”

-“যা ভালো হয় করো।ভালো ছেলে পেলে হাত ছাড়া করো না।বাবা মাকে বলো সময় পেলে এসে ঘুরে যেতে।”

-“আচ্ছা।”
———-
টেবিলে সাজানো আছে কয়েক ধরনের খাবার সেগুলো খাওয়ার জন্য তাড়া দিচ্ছে ইয়াফার বাবা
জাহিদ দেওয়ান।ফারাজের বিরোধী পক্ষ মফিজের ছোট ভাই ইকবালের সাথেই ইয়াফার বিয়ের কথা চলছে। বড় ভাইয়ের নির্বাচনের প্রচার করার সময় ইয়াফাকে দেখে ইকবাল পছন্দ করে ফেলে।ভাইয়ের কাছে আবদার করে বসে এই মেয়েকে তার লাগবে।ছোট ভাই পছন্দ করেছে আর মফিজ এনে দিবে না তাকে তা কী করে হয়! তাই সে ইয়াফার বাবাকে প্রস্তাব দেয়।ইয়াফারা মধ্যবিও পরিবার তাদের তেমন বিলাসিতা জীবন যাপন নেই।এলাকায় নাম ডাক ভালোই এবং এবার মেয়র পদে দাঁড়াচ্ছে বড় ভাই।মেয়ে সুখেই থাকবে এই ভেবে জিহাদ রাজি হয় কিন্তু ইয়াফার পছন্দ না ইকবালকে।বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার আগে ইয়াফাকে অনেক বিরক্ত করেছে ইকবাল।বাবার কথা ভেবে সে রাজি হয়েছে।ইকবাল,মফিজ ও তার স্ত্রী এসেছে ইয়াফার বাসায় পাকা কথা বলতে।ইয়াফাকে শাড়ি পড়ানো হয়েছে সে পড়তে চায়নি যেখানে বিয়েতেই তার মত নেই সেখানে এসব সাজসজ্জা কীভাবে ভালো লাগবে!
মফিজের স্ত্রী বললো,
-“মেয়েকে নিয়ে আসুন এবার।”

-“হ্যা,নিয়ে আসতে বলছি।”
ইয়াফার মা বলে তার ছেলের বউকে বললো ইয়াফাকে নিয়ে আসতে।ইয়াফার ভবি ইয়াফাকে নিয়ে আসলো।ইয়াফার মাথায় ঘোন্টা দেওয়া।গুটিগুটি পায়ে হেঁটে আসছে।ইকবালের বরাবর সামনে বসালো ইয়াফাকে।ইকবাল তার নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরলো।কুদৃষ্টিতে ইয়াফার সারা অঙ্গে চোখ বুলালো ঠোঁটের কোণায় ফুটে উঠলো বাঁকা হাসি। ইয়াফা শাড়ির আঁচল শক্ত করে ধরে মাথা নিচু করে বসে আছে।তার অস্তিত্ব হচ্ছে।
-“সামনে নির্বাচন, ভোট দিবেন কাকে?”

-“ফারাজ ভাইকে।”

-“ফারাজ ভাইয়ের মার্কা”

-“বই মার্কা”
নির্বাচনের প্রচার করতে করতে ভিতরে ধুকলো ফারাজ ও তার দলের তিন চার জন ছেলে।ফারাজের মার্কা হচ্ছে বই এবং মফিজের মার্কা কলম। মফিজ ফারাজকে দেখে উঠে দাঁড়ালো।রাগান্বিত স্বরে বললো,
-“তুই এখানে কেনো?”

ফারাজ কোমড়ে হাত দিয়ে বললো,
-“আরে বড় ভাই দেখি!সালাম ভাই।”

-“এখানে কেনো এসেছিস?”

-“দেখতে পাচ্ছেন না কেনো এসেছি!”

-“এইখান থেকে বেরিয়ে যা এটা আমার ছোট ভাইয়ের শ্বশুর বাড়ি।এ বাড়ির ভোট আমার।”

-“আরে এতো দেখি সেই লেভেলের পলিটিক্স!জায়গায় জায়গায় ভাইয়ের বিয়ে দিয়ে ভোট আদায় করছেন ভেরি বেড।”
ফারাজ ভাব নিয়ে কথাগুলো বলে ইয়াফার পাশের সোফায় বসলো।ইয়াফা মাথা হালকা উঁচু করে ফারাজকে দেখে মুচকি হাসি দিলো।ফারাজও দেখলো সবার অগোচরে তার প্রেয়সীর মুচকি হাসি।
ইয়াফার বাবা বিরক্ত হয়ে বললো,
-“এই তুমি বের হও।এখানে আমাদের পারিবারিক কথা চলছে।”

-“আরে আঙ্কেল রাগেন কেলা?পিকচার তো আভিবি বাকি হে।”

ফারাজ ইয়াফার মাকে এবার বললো,
-“আন্টি আপনার মেয়েকে যার সাথে বিয়ে দিতে চাইছেন তার নাম কী?”

ইয়াফার মা বললো,
-“ইকবাল”

ফারাজ তাচ্ছিল্য স্বরে বললো,
-“ছি ছি।মেয়ের জামাইর নাম হবে আদুরে মার্কা নাম।মেয়ের জামাইকে যদি বাল টাল বলতে হয় তাহলে কেমন জামাই হলো!”

ফারাজের ছেলেপুলেরা হো হো করে হেঁসে দিলো। ইকবাল রেগে গেলো তার নাম নিয়ে মজা করছে তার সামনে!
-“ভাইয়া তুমি কিছু করছো না কেনো দেখছো না আমাকে নিয়ে মজা করছে।”

মফিজ রেগে গিয়ে ফারাজের কলার চেপে ধরে দাঁড় করালো।
ফারাজ দাঁত কিড়মিড় করে বললো,
-“ভালোই ভালো বলছি এখান থেকে কেটে পর না হয় এর ফল ভালো হবে না।”

-“তোর ফল তোর পিছন দিয়ে ভরবো শুধু নির্বাচনটা হয়ে যাক।”

-“এখানে আমার গুরুজন আছে মুখ খারাপ করতে চাইছি না।নামের মতো কাম কাইজ মফিজ মার্কা করলে তোর কলমের কালি তোর মুখেই পড়বে।”

মফিজ ফারাজের কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো,
-“একে তোর জন্য ছেড়ে দিবো যদি তোর গাছের একটা ফুল দেস।”
ফারাজ মফিজের পেটে ঘুষি মারলো। ব্যাথায় কুকঁড়িয়ে মফিজ স্বরে গেলো।তিন বোনকে নিয়ে কেউ কোনো বাজে কথা বললে ফারাজ তাদের ছাড়ে না। শুধু ফারাজ না উৎসও ছেড়ে দেয় না।মফিজ তার তিন বোনদের নিয়ে খারাপ ইঙ্গিতে কথা বলেছে আর সে ছেড়ে দিবে এমন ভালো মানুষ তো ফারাজ না।

-“আমি ভালোর ভালো আবার খারাপের সময় শয়তানের আব্বা।”
ফারাজ পকেট থেকে ফোন বের করে একটা ভিডিও অন করলো।সবাইকে ভিডিওটা দেখতে বললো।

#চলবে