Home "ধারাবাহিক গল্প "দৃষ্টির অন্তরালে নিস্তব্ধতা দৃষ্টির অন্তরালে নিস্তব্ধতা পর্ব-১৪+১৫

দৃষ্টির অন্তরালে নিস্তব্ধতা পর্ব-১৪+১৫

0
7

#দৃষ্টির_অন্তরালে_নিস্তব্ধতা
#লেখনী_মায়মুনা_আক্তার_মারিয়া
#পর্ব_১৪

কড়াইয়ে গরুর গোস্তো কসানো হচ্ছে।ধোঁয়া উঠানো কড়াই থেকে তরকারির ঘ্রাণ পুরো বাড়িতে ছড়িয়ে পড়েছে।মালিহা খানের হাতে জাদু আছে বলতে হয় তার হাতের রান্না যে খায় তার মুখে লেগে থাকার মতো।বাড়ির বড়ো বউ হওয়াশ তার উপর সব দায়িত্ব যেমন বর্তিয়েছে তেমনি তিনি তার সবটা দিয়ে সামলাচ্ছেও।রান্নার ক্ষেএে তিনি এই দিকটা সামলান আর তার কাজে সাহায্য করে সুফিয়া ও নাফিসা।কাটাকাটি ও হাতের সামনে এগিয়ে দেওয়া এগুলো তারা দেখে রাখে।ধোঁয়ার কাজে তো বিলকিস আছেই।মালিহার হাতের রান্না ভালো হওয়ায় সবার জন্য তিনি রান্না করে। সবাই তার হাতের রান্নাও পছন্দ করে তবে এই নিয়ে বাকি দুই বউয়ের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ নেই।তাদের কাছেও তাদের বড়ো ভাবির রান্না ভালো লাগে।তিন বোনের মতো করে সামলাচ্ছে সব।খুনতি লাড়তে লাড়তে মালিহা বলল,
-“কতো দিন পর সবাই একসাথে!উৎসটার জন্য এতোদিন চিন্তা হতো কোন দেশে গিয়ে বসে ছিলো।”

রোস্ট করা হবে তার জন্য পেঁয়াজ কাঁটছে সুফিয়া।পেঁয়াজের ঝাঁঝ লেগে তার চোখে পানি এসে জমেছে কিন্তু এতে তার কোনো অসুবিধা হচ্ছে না বরং চোখের পানি মুছে বলল,
-“হুম। দেখো আজ বাড়িতে সবাই থাকায় বাড়ির প্রতিটি দেয়ালে ছেলে মেয়েদের গলার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।ওরাও অনেক খুশি।”

নাফিসা মালিহাকে পানি এগিয়ে দিলো গোস্তে দেওয়ার জন্য।তার থেকে পানি নিয়ে মুচকি হাসি দেয় মালিহা।
-“আমার রোদু’টা বাবাকে পেয়ে কেমন করলো আজ।নিজেকে বড়ো ভেবে বসে আছে। আজ উৎস না থাকলে চাপাই রাখতো ইচ্ছে। ”

কড়াইয়ে পানি ঢেলে মালিহা বলল,
-“নিশাত, রোদসী হয়েছে এক ধরনের আর আমাদের মেহেক হয়েছে আরেক ধরনের।”

-“হুম এই মেয়ে যা জ্বালিয়ে মারছে।”

-“মেজো একদম মেয়ের উড়ন্ত পাখিকে নিয়ে মিথ্যা কথা বলবি না।ও না থাকলে বাড়িটাকে কে মাতিয়ে রাখতো।”

মালিহা সাথে নাফিসাও গলা মিলিয়ে বলল,
-“বড়ো ভাবি ঠিক বলেছো। মেজো ভাবি মেয়েটাকে শুধু শুধু তুৃমি বকো।”

-“শুধু শুধু বকি আমি? হাতে পায়ে বড়ো হলে তো হবে না। বুদ্ধি তো নেই আছে শুধু কুবুদ্ধি।”

তিন জা রুপে তিন বোনের মধ্যে তর্ক বিতর্ক লেগে যায়।সব সময় মেহেককে নিয়ে তাদের মধ্যে খুনসুটির চলতেই থাকে।মেহেক কথা না শোনায় এবং তার মধ্যে বাচ্চামো স্বভাব এখনো থাকায় সুফিয়া ওকে নিয়ে চিন্তিত। সব মায়েরি ছেলে-মেয়েদের নিয়ে চিন্তা হয় কিন্তু মেহেকের জন্য তার একটু বেশি চিন্তা হয়।

প্যান্টের পকেট কেঁপে উঠলো।কে ফোন দিলো আবার?কৌতুহল নিয়ে ফোনের স্কিনে তাকায় ফারাজ।আননোন নাম্বার!মেজাজ এমনিতেই তার চড়ে আছে তার মধ্যে এই অসময়ে আননোন নাম্বার থেকে কে ফোন করলো?ফারাজ ফোন কেটে দিয়ে তার কাজে মন দিলো।আবার ফোন বেজে উঠলো।হয়তে তার দলের কেউ ফোন দিয়েছে জরুরি বিষয় হতে পারে আর যদি না হয় তাহলে গুষ্ঠি উদ্ধার করে ফেলবে ঠিক করলো।

-“হ্যালো।”

-“আস্সালামুআলাইকুম।”

মেয়েলী কন্ঠ পেয়ে ফারাজ হতবাক হয়ে সালামের জবাব নেয়
-“ওয়ালাইকুমআসসালাম।কে?”

-“আ আমি ইয়াফা।”

ফারাজ ঠোঁট কামড়ে ধরে ওপর হাত মাথায় রাখে।এই অসময়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি তাকে ফোন দিলো!অবিশ্বাস্য ব্যপার!সে তার মনকে বুঝাতে পারছে না এটা ইয়াফারই কল কিন্তু তাকে কল দিয়েছে!
-“কি হলো? বিরক্ত করলাম? আসলে.”

ফারাজ পানির ট্যাংকের উপরে উঠে বসলো পা ঝুলিয়ে।
-“নো ওয়ার্ক নো বিরক্ত।”

ইয়াভা হেসে দেয়।
-“বাহ!বাংলুশ হবু মেয়র।”

-“বাংলুশ?”

-“হুম। বেশ মানিয়েছে আপনার সাথে।”

-“তোমাকে বেশ মানাবে।”

ইয়াফা চুপ হয়ে গেলো।কিছু দিন পর মেয়র হবে তার মুখে লাগামহীন কথা!দেখলে তো মনে হবেই না ভাজা মাছ উল্টে খেতে পারে না।হঠাৎ হঠাৎ এমন কথা বলে যে তাকে চুপ করিয়ে ছাড়ে।সে লজ্জায় সব কথা হারিয়ে ফেলে।

-“কি?দিল গালতি কার বেঠা হে..?”

-“মে..মেহেক কোথায়?”

-“নিচে আছে।”

-“আপনি কোথায়?”

-“আমার খবর নিচ্ছো?”

-“ইয়ে মানে।”

-“ইটিস পিটিস বাদ দাও।”

ইয়াফা অবাক হয়ে গেলো।তার স্বরে স্পষ্ট ভেসে উঠলো জানার আগ্রহ
-“ইটিস পিটিস কে করলো?”

-“আররে বাছ।ইটিস পিটিস ও বুঝো?”

-“না নানা না।”

-“আমি তোমার নানা নই।ডিরেক্ট কথায় আসো।”

-“মেহেককে কলে পাসছিলাম না তাই আপনাকে”

-“আমি এখন তিন তলার উপরে পা ঝুলিয়ে বসে আছি।”

ইয়াফার বুক কেঁপে উঠলো। তিন তলার উপর বসে আছে।এতো সাহস!সে হলে তো হার্ট অ্যাটাক করতো।
-“পড়ে যাবেন তো।”

-“যার ভালোবাসার কদর করো না তার জীবন নিয়ে ভেবো না সুইটি।”

ইয়াফা হতবাক।এই লোকের মাথায় বোদ হয় সমস্যা আছে।না হলে হুটহাট আবল তাবল কথা কীভাবে বলবে?
-“সুইটি কে?”

-“কান পাতো।”

-“কান তো ফোনের সাথেই লটকে আছে।”

-“ওকে বলছি।না থাক বাচ্চা মেয়ে ওসব বুঝবে না।”

-“বাচ্চা মেয়ের সাথে তো প্রেম করার সখ আবার!”

-“করবে নাকি? দেখবে এক দিনে বড়ো হয়ে যাবে।”

-“স্টুপিট বয়।”

-“স্টুপিট গার্ল।”

-“মেহেককে দিন।”

-“আরে সুইটি আমার।তোর শ্বাশুড়ি আমাকে পানির টাংকি পরিষ্কার করতে কাজে লাগিয়ে দিয়েছে।”

পানির টাংকি আসলো কোথা থেকে।মাএই তো বলল তিন তলার উপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে।ইয়াফার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।তাই সে প্রশ্ন করেই বসলো,
-“আপনি তো বললেন।”

-“বাড়ি হচ্ছে দু’তলা আর টাংকি হচ্ছে এক তলা মোট হলো না তিন তলা।”

ফারাজের উটভট যুক্তি দেখে ইয়াফা হতবাক।এই লোক আসলেই পাগল।এর সাথে বেশি কথা বললে সেও পাগল হয়ে যাবে।ইয়াফা মৃদু হাসি দিয়ে কল কেটে দেয়।
কল কাটার শব্দে ফারাজ কান থেকে ফোন সড়িয়ে টাংকির ভিতর লাফ দিয়ে পরিষ্কার করতে লাগলো।
———–
-“আব্বু আসবো?”

সাজ্জাদ চৌধুরী খবরের কাগজ পড়ছিলো খাটে হেলান দিয়ে।আব্বু ডাক শুনতেই দরজায় তাকিয়ে দেখে তার মেয়ে কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।তাকে এভাবে দেখে সাজ্জাদ অবাক হয়।উঠে দাঁড়িয়ে মেয়ের কাছে যায়।মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে জড়িয়ে ধরে মেয়েকে ঘরের ভিতরে নিয়ে এসে বসায়।রোদসী তার বাবার চোখে তাকিয়ে রইলো।যে চোখে শুধু ছিলো বাবার আদর পাওয়ার আকাঙ্খা। সাজ্জাদ মেয়ের পাশে বসে।
-“আমার সব কিছুই তো তোদের জন্য।বাবার ঘরে ধুঁকতে কিসের পারমিশন?”

-“আব্বু।”

-“পড়াশোনা কেমন চলছে?”

-“আলহামদুলিল্লাহ ভালো।”

-“আমার মেয়ের রেজাল্ট কিন্তু সব সময়ের মতো এবারো ভালো হওয়া চাই।”

-“জ্বি আব্বু।”

বাবা মেয়ের মধ্যে টুকটাক কথা চলতে লাগলো।কিন্তু হঠাৎ করে রোদসীর হাতের ফোন বেজে উঠলো। ফোন হাতে থাকায় ফোনে সেভকৃত নাম্বার ভেসে উঠলো।রোদসী ও সাজ্জাদ ফোনের স্কিনে তাকায়। সিজু।সিজানের নাম সিজু দিয়ে রোদসী সেভ করে রেখেছে।সিজু নাম দেখায় সাজ্জাদ অবাক হলো।তিনি বললো,
-“সিজু কে?”

রোদসী ইতস্ততবোধ করলো।বাবাকে কী বলবে এখন?আর এখন কেনো ফোন দিলো?সিজানের কথা বললেই তো জিজ্ঞাসা করবে এই নামে কেনো সেভ করা? তাছাড়া বড়ো ভাই হয় সেখানে ভাইয়া দিয়ে সেভ না করে সিজু দিয়ে সেভ করেছে!সব জানাজানি হয়ে গেলে তো ঝামেলা বেধে জাবে।তাই রোদসী মিথ্যা কথা বলল,
-“আমার বান্ধবী সেহনাজ। আমি সিজু দিয়ে সেভ করেছি।”

মেয়ের বান্ধবী কথাটা তার বিশ্বাস হচ্ছিল না।রোদসী এতোটাই অন্য রকমের যে ওর সাথে কেউ বেশি মিশে না।তার কারণ একটাই সে আড্ডা দেওয়া ও হাসি ঠাট্টা পছন্দ করে না।তাই তার কোনো বেস্ট ফ্রেন্ড নেই।এটাই তার গিন্নি থেকে শুনেছে।মেহেক একমাত্র মেয়ে যার কাছে ওর হার মানতে হয়।যেখানে বেস্ট ফ্রেন্ড নেই সেখানে বান্ধবীকে তার ফোন নাম্বার দেওয়ার মতো সে না।মেহেক হলে এক কথা ছিলো ও এক দিনেই বান্ধবী বানিয়ে ফোন নাম্বার দিয়ে আছে।তারপর তাদের থেকে ছেলেরা নাম্বার নিয়ে মেহেককে কল দিয়ে ডিস্টার্ব করে।এরকম করে কতো সিম যে নষ্ট করেছে!
বাবা যে তার কথায় বিশ্বাস করেনি তা সে ভালো করেই আন্দাজ করতে পারলো।এমন না যে তাকে বিশ্বাস করে না।করে কিন্তু তার এই কথাটা বিশ্বাস করতে মন সায় দিলো না।
-“ফোন ধর।”

রোদসী কল কেটে দিয়ে বলল,
-“পড়ে কথা বলে নিবো।”

-“আচ্ছা।”

-“তো আব্বু তুমি কতো দিন থাকবে আমাদের সাথে?”

-“ছু”
সাজ্জাদ বলার জন্য আগ্রহ হতেই আবার ফোন বেজে উঠলো।সে থেমে যায়।রোদসী একবার ফোনে আরেকবার বাবার দিকে তাকায়।এইরকম অবস্থায় সে কখনো পরেনি আর না কারো কাছে তাকে মিথ্যা কথা বলতে হয়েছে। সে মিথ্যা কথা বলতেও না। বলতে গেলেই ধরা খেয়ে যায়।
-“জরুরি হয়তো আগে ধর।”

এবার রোদসী ঘাবড়ে যায়।তার চেহারার রেখা স্বাভাবিক থেকে অস্বাভাবিক দেখায়।বাবার সামনে কীভাবে কথা বলবে?লোকটাও না একবার কেটেছে মানে বুঝতে হবে কেউ আছে সাথে আবার কেনো দিবে কল!
রোদসীকে চিন্তিত দেখে সাজ্জাদ মুখ টিপে হাসলো।তারপর মেয়ের থেকে ফোন নেওয়ার জন্য হাত বাড়ালে রোদসী বাঁধা দিয়ে বলল,
-“থাক না আব্বু।”

সাজ্জাদ রোদসীর কথায় তোয়াক্কা না করে ফোন কেড়ে নিয়ে কল রিসিভ করে লাউড স্পিকারে দিলো।রোদসী ভয়ে ক্রমাগত শুকনো ঢোক গিললো।কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমা হচ্ছে। টেনশনে বুক কাঁপছে তার।মেয়েটার অবস্থা ভয়ে নাজেহাল তার মধ্যে ফোনের ওপাশ থেকে চিন্তিত স্বরে সিজান বলল,
-“এই রোদ তোর কী হয়েছে?তুই নাকি পায়ে ব্যাথা পেয়েছিস।তোকে কে বলেছে ফুল গাছের যত্ন নিতে?তুই ছাদে না গেলে পায়ে ব্যাথা লাগতো না।এভাবে আমাকে কেনো কষ্ট দিচ্ছিস রোদ।জান আমার কথা বলছিস না কেনো?”

একটু থেমে আবার সিজান বলতে লাগলো
-“তোর কিছু হলে জানিস না আমার কতোটা কষ্ট হয় কেনো নিজের খেয়াল রাখিস না রোদ?কথা বলছিস না কেনো?উত্তর দে।আমার কথার জবাব দে।”

সিজানের কথায় স্পষ্ট ছিলো সে রোদসীর জন্য কতোটা উন্মাদ। কিন্তু তার প্রতিটি কথায় থমকে যায় রোদসীর নিশ্বাস। রোদসী তার পায়ের দিকে তাকায়।কী বলছে এসব আবোলতাবোল?সে কখন পায়ে ব্যাথা পেলো? সকাল থেকে সে ছাদেই তো যায়নি।এই খবর তাকে কে দিলো?কিন্তু এসব ভাবার তো এখন সময় না।তার দিকে যে এক জোড়া চোখ তাকিয়ে আছে। সেই চোখে সে কিভাবে চোখ রাখবে।

#চলবে

#দৃষ্টির_অন্তরালে_নিস্তব্ধতা
#লেখনী_মায়মুনা_আক্তার_মারিয়া
#পর্ব_১৫

প্রকৃতিতে ঠান্ডা আবহাওয়া বিরাজ করছে কিন্তু চৌধুরী নিবাসের ভেতরে গরম বাতাস বইছে।বাড়ির প্রতিটি দেয়ালে বাড়ি খাচ্ছে গভীর নিশ্বাসের।ড্রয়িং রুমে উপস্থিত চৌধুরী নিবাসের সকল সদস্য। শাহাদাত চৌধুরী পায়চারি করছে। সাজ্জাদ চৌধুরী এক কোনায় দাঁড়িয়ে আছে তার পাশে সাফওয়ান চৌধুরী।বাড়ির তিন বউ ডাইনিং টেবিল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে।তাদের মুখে চিন্তার ছাপ।মাথার উপর পাখা ঘুরছে কিন্তু ঘেমে যাচ্ছে রোদসীর কপাল কিন্তু হাত পা তার ঠান্ডা।সিঁড়ি ধরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে সে।ছোট বোনের করুন দশা দেখে নিশাতের খারাপ লাগছে।সে বোনের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।উৎস ও ফারাজ বাবার ডাকে নিচে এসেছে।সবার কাছে সব কিছু পরিষ্কার হলে এরিদ ও মেহেক নিচে আসে।কিন্তু বর্তমানের পরিস্থিতি সম্পর্কে তারা দু’জনেই অবগত নয়।সবাই শান্ত কিন্তু তাদের মুখ দেখে মনে হচ্ছে কিছু হয়েছে কিন্তু কী হয়েছে তা জানার জন্য মেহেক প্রশ্ন করে বসলো।

-“বড় আব্বু। তুমি এভাবে পায়চারি করছো কেনো?আর তোমাদের সবার কী হয়েছে?”

উৎস অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো মেহেকের দিকে।উৎসের সাথে তার চোখাচোখি হতেই মেহেক থ মেরে দাঁড়িয়ে রইল।উৎস মেহেককে চোখের ইশারায় রোদসীকে দেখালো।মেহেকের চোখ গেলো রোদসীর দিকে। তার রোদ আপু তার নিজস্ব রোদের তাপে ঘেমে যাচ্ছে। তার হাত পা কাপছে।কিন্তু হঠাৎ কী হলো যে রোদসীর এমন অবস্থা।মেহেকের বোধগম্য হলো কোনো গুরুতর বিষয়। না হলে উৎস অযথা এমন করতো না।না অকারণেও তাকে বকে। তবে বাড়ির সকলের মনে কিছু একটা চলছে যার কারণে উৎস তাকে ইশারায় থামিয়ে দিলো এটা বুঝতেই মেহেকের মনে নানান প্রশ্ন ঘুরপাক খেলো।সবার নিস্তব্ধতার মাঝেই শাহাদাত চৌধুরীর ফোন বেজে উঠলো। তার পা থেমে গেলো।তার ফোন সোফার এক কর্নারে পড়ে আছে। তিনি ফোন নেওয়ার জন্য পা বাড়ালে ফারাজ এগিয়ে দিলো।ছেলের দিকে এক বার তাকিয়ে শান্ত দৃষ্টিতে ফোন নিলো।ফারাজ আগের জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়ে উৎসের দিকে তাকায়।দুই ভাইয়ের দৃষ্টি মিললো। চোখের মিলের সাথে কথাও হয়ে গেলো।উৎস আড়চোখে তার ছটফটানো রোজকে দেখলো।যে এই মুহূর্তে কী হয়েছে তা জানার জন্য অধির আগ্রহে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।শাহাদাত চৌধুরী ফোন রিসিভ করলে ফোন স্পিকারে দেয়।তিনি কোনো টু শব্দ না করে ফোনের ওপর পাশ থেকে কথা শুনার আগ্রহ দেখায়।ফোনের ওপর পাশ থেকে গমগম স্বরে ভেসে এলো রাহিমার কন্ঠ।

-” ভাইজান”
-“…..”
-” আমি জানি আপনার কাছে নিশাত,রোদসী, মেহেক ও স্রোত সবাই নিজের মেয়ের মতো।তেমনি তো ফারাজ,সিজান, উৎস ও এরিদ ও আপনার ছেলে।কখনো কোনো ছেলে মেয়েকে নিয়ে ভেদাভেদ করেন নি। আপনার সব মেয়ের মধ্যে রোদসীকে আমি চাই। আমার সিজানের জন্য।ওদের চার হাত এক করে দেওয়ার জন্য আপনার কাছে অনুমতি চাইছি।ছেলে-মেয়েরা সুখে থাকলে তো দেখতে ভালো লাগবে আমাদের তাই না।আপনি আমার প্রস্তাব মেনে নিন।আমাকে ফিরাবেন না ভাইজান।আপনার ঘরের রাজকন্যা আমার রাজপুত্রের কাছে ভালো থাকবে এই টুকু বিশ্বাস আমার আছে।”

রাহিমা মিনতির স্বরে বড় ভাইয়ের কাছে আবদার করলো।ফোন হাতেই শাহাদাত চৌধুরী সোফায় বসে পড়ে। ফুপুর কথা শুনা মাএ মেহেক অবাক হয়ে যায়।সিজান ভাইয়ের সাথে রোদসী আপু!মেহেক চোখ বড় বড় করে উৎসের দিকে তাকায়।মেহেকের তাকানোর ধরন দেখে উৎস হতবাক হয়ে যায়।যেনো মেহেক চোখ দিয়ে গিলে খাবে উৎসকে।মেহেকের থেকে দৃষ্টি সড়িয়ে স্বাভাবিক স্বরে বাবার উদ্দেশ্যে উৎস বলল,
-“ফুপু অপেক্ষা করছে। উওরটা দিয়ে দাও।আমি জানি তুমি ওদের বিয়েতে বাঁধা দিবে না।”

মেহেক উৎসের কথায় আরো অবাক হলো।তার মাথা ঘুরচ্ছে এখানে হচ্ছে টা কী?

বাবাকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে ফারাজ এবার বলল,
-“আব্বু তোমার মতামত জানাও।আমরা সবাই অপেক্ষা করছি।”

শাহাদাত চৌধুরী বাড়ির সবার উদ্দেশ্যে বলল,
-” তোমরা কী এই সম্পর্ক মেনেছো?”

মালিহা গলার স্বর নামিয়ে স্বামিকে বুঝানোর জন্য বলল,
-“শুনুন না”

তাকে বাঁধা দিয়ে পুনরায় গম্ভীর স্বরে শাহাদাত বলল,
-“নিজস্ব মতামত জানাও।আমি অবুঝদার নয় তাই বুঝাতে আসতে হবে না।”

রাহিমা ঘাবড়ে গেলো ভাইয়ের রাশভারি কন্ঠে।কিন্তু বাড়ির প্রতিটি সদস্য একে একে বলতে লাগলো তারা এ বিয়েতে রাজি।সাজ্জাদ চৌধুরী মেয়ের কথা ভেবে যে রাজি হয়েছে এই অনেক কিছু রোদসীর কাছে।আজ বাবা, চাচা, তিন মা, ভাই-বোনরা তার জন্য বলল। তার সম্পর্কটাকে মেনে নিলো।সবার মতামত জানা হয়ে গেলে শাহাদাত চৌধুরী রোদসীর উদ্দেশ্যে বলল,
-“তুমি সিজানকে বিয়ে করতে চাও?”

বড় বাবার প্রশ্নে রোদসীর শরীর আরো ঘামতে লাগে।ফোনের ওপর পাশে মায়ের কাছ ঘেঁষে বসা সিজানের হাত কাপছে চিন্তায়।সে এই ভয়টাই পাচ্ছিলো রোদসী যেমন চাপা স্বভাবের মেয়ে মুখ ফুটে কিছু বলে না সেখানে বাড়ি সুদ্দ সকলের সামনে ভালোবাসার মানুষকে কীভাবে চাইবে?রোদসীকে সান্ত্বনা ও ভরসা দিতে সিজান বড়দের উপেক্ষা করে বলল,
-“রোদ জবাব দে।যদি সব সময়ের মতো আজও মুখ ফুটে নিজের মনের কথা না বলিস তাহলে আমাকে চিরতরে হারাবি।বাড়ির সবাই মেনে নিলে তুইও পারবি বলতে। বল।বল রোদ বল।”

সিজান ভাইয়ের পাগলামো দেখে মেহেক একবার ফোনের দিকে তো আরেকবার উৎসের দিকে তাকাচ্ছে।মেহেকের কান্ড দেখে উৎস রেগে যায়।কিন্তু রাগ সংযত করে রোদসীকে বলল,
-“যদি ভালোবেসে থাকিস ছিনিয়ে নিতে শিখ।যেখানে চেয়ে গেলেই পেয়ে যাবি সেখানে মুখ বন্ধ করে আত্মসম্মান দেখাবি না।”

ভাইয়ের কথা কানে বাজনার মতো বাজতে লাগলো রোদসীর।শুকনো ঢোক গিলে নিজেকে সাহস জুগিয়ে মোলায়েম স্বরে সুধালো,
-“হুমম।আমি বিয়ে করবো।”

রোদসীর উত্তরে সিজান স্বস্তির হাঁফ ছাড়লো।অবশেষে তার রোদ তাকে বিয়ে করবে বলে সবার সামনে স্বীকার করলো।সিজান খুশিতে উৎফুল্ল হয়ে বাচ্চাদের মতো বলে উঠলো
-“থ্যাংক্স রোদ।থ্যাংক্স।তোকে আমি”

শাহাদাত চৌধুরী গলা ঝাকি দিলেন।সিজান কথার মাঝপথে থেমে যায়।বাড়ির সবাই অবাক হয়।তারা আজ অন্য সিজানকে দেখলো।
-“বড়োরা আছে বুঝে শুনে কথা বলতে শেখো।”

-“সরি মামা।”
-“…..”
শাহাদাত চৌধুরীকে চুপ হয়ে যেতে দেখে সবাই একে ওপরের দিকে তাকায়।রাহিমা নীরবতা ভেঙে বলল,
-“ভাইজান।”

-“সময় করে একদিন আয়।বিয়ে নিয়ে কথা হবে।”

সবার মনোযোগ গেলো শাহাদাত চৌধুরী দিকে।শাহাদাত চৌধুরী অবশেষে মেনে নিলো ওদের সম্পর্ককে। রোদসী চোখ তুলে বড়ো আব্বুর দিকে তাকায়।শাহাদাত চৌধুরী মেনে নেওয়ায় সবাই খুশি হয়।সিজান তো খুশিতে লাফিয়ে উঠে।মেহেকও খুব খুশি হলো।বাড়ি সুদ্ধ সকলে মুখে হাসি দেখা যায়।সকলের দৃষ্টির অগোচরে উৎস তীক্ষ্ণ চাহনি নিক্ষেপ করলো। মেহেকের চোখ মিলতেই তাদের চোখাচোখি হয়।কিন্তু মেহেক লক্ষ্য করলো এবার উৎসের চোখ শান্ত।এই শান্ত চোখ জোড়া তার দিকেই স্তব্ধ হয়ে আছে।মেহেক তার দৃষ্টি সড়িয়ে নেয়।তার চোখ নামাতে দেখে মলিন হাসলো উৎস।
রোদসী অশ্রু শিক্ত দৃষ্টিতে নিজের বাবার দিকে সিগ্ধ চাহনিতে চেয়ে রইল। আজ তার বাবার জন্য এ সম্পর্কটা মেনে নিতে সবার কাছে সহজ হয়েছে। শুধু যে বাবার জন্য তা বললে ভুল হবে এর জন্য উৎসর অবদান ছিলো।উৎস যদি ফোন করে সব না জানাতো তাহলে এসব কিছু হতো না।

সাজ্জাদ চৌধুরী কাজের জন্য বাসায় আসতে পারছিলো না মাস তিনেক হবে।ডিউটির জন্য প্রচুর ব্যস্ত ছিলো।উৎস এসেছে শুনে সে আসার জন্য চেষ্টা করে কিন্তু পারেনি।তারপর একদিন উৎস তাকে ফোন দেয়।উৎস তাকে আসতে বললে সে জানায় অত্যাধিক জরুরি বিষয় যেমন:মৃত বা সন্তানের বিয়ে ছাড়া ছুটি দেওয়া জাবে না।সামনে নির্বাচন তাই সরকারের কঠর নির্দেশ দেশের সব জায়গায় যেনো শান্তি বজায় থাকে।অন্যদিকে উৎস তার ছোট বাবাকে বাড়িতে এনেই ছাড়বে।সে রোদসী ও সিজানের সম্পর্কের কথা জানায়।মেয়ে আর বোনের ছেলের সম্পর্কের কথা শুনে সে প্রথমে দ্বিধায় ভোগে।বড় ভাইজান জানলে কী হবে?তিনি কী মেনে নিবে আত্নীয়র মধ্যে আত্নীয়!সমাজের মধ্যে এসব তো দৃষ্টিকটু।ভাই-বোনের বিয়ে!কিন্তু উৎস তাকে রাজি করায়।উৎসের বিচক্ষণ বুদ্ধিতে সাজ্জাদ চৌধুরী সম্মতি দেয়।মেনে নেয় মেয়ের পছন্দকে।তার মেয়ে কখনো তার কাছে কোনো আবদার করেনি যদি কখনো কিছু চেয়ে বসে মেয়েকে কীভাবে ফিরিয়ে দিবে।মেয়ের খুশি থাকার কথা ভেবে তিনি জরুরি নোটিশের মাধ্যমে চলে আসে।

আজকের সিজানের দেওয়া ফোনটা ছিলো উৎস ও তার ছোট বাবার প্ল্যান।রোদসী যে সহজে মুখ ফুটে বলবে না তাই উৎস ইচ্ছে করে সিজানকে কল দিয়ে মিথ্যা কথা বলে রোদসী পায়ে ব্যথা পেয়েছে।আর সিজান তার রোদ বলতে পাগল সে সাথে সাথেই ফোন দিয়ে বসে রোদসীকে।

________

সন্ধ্যা হওয়ার সাথে সাথে প্রকৃতিতে নীরবতা নেমে এলো।বাইরে থেকে ঝিঁঝি পোকা ডাকার শব্দ ভেসে এসেছে। সূর্য টাও পুরো ডুবে গেলো।চারোদিকে অন্ধকার হয়ে এলো।রাস্তার স্ট্রিটলাইটগুলো একে একে জ্বলে উঠলো। পিচঢালা রাস্তার এক কর্নারে শুয়ে আছে একটা কুকুর।তার শরীর ঘেষে আরেকটি কুকুর শুয়ে আছে।কিছুক্ষন পরপর একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে আবার চোখ বন্ধ করছে।বেলকনিতে দাঁড়িয়ে উৎস তাদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখছে।
-“আপনার কফি”

পিছন থেকে পরিচিত স্বর ভেসে আসতেই বিরক্ত দৃষ্টি সড়িয়ে নেয় উৎস।পিছন না ফিরেই বলল,
-“রেখে দে।”

-“ঠান্ডা হয়ে যাবে তো।”

উৎস নিশ্বাস ছেড়ে কফি হাতে নিয়ে কফির মগে চুমুক দেয়।মেহেক বেলকনির রেলিং ঘেঁষে দাঁড়ায়।

-“কিছু বলবি?”

-“হুম।”

-“বল।”

পুরো ঘর শান্ত।তারা দুজনেই বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে।গা ছমছমে পরিবেশ।মেহেক আকাশের দিকে চোখ রেখে বলল,
-“আপনি সব জানতেন তাই না?”

-“কি মনে হয়?”

-“প্রশ্নের উপর প্রশ্ন করছেন!”
মেহেকের গলার স্বর অন্য রকম শুনালো।উৎস ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল,
-“মেইন পয়েন্টে আস।”

-“অন্যের ভালোবাসাকে পাইয়ে দিলেন।আমারটা দিবেন না?”

-“……”
-“কুড়িয়ে পাওয়া জিনিসকে কদর করুন।কুড়িয়ে পাওয়া জিনিস মনে করে ফেলে রাখবেন না। দিন শেষ এর মর্ম না বুঝার কারণে আফসোস করবেন।”

মেহেকের গলা শুকিয়ে এলো।শুকনো ঢোক গিলে বলল,
-“চুপ করে থাকবেন?”

-“নিজেকে পড়ে থাকার জিনিসের মতো অমূল্য ভাবছিস!”

-“কই না তো।আমি তো মাটিতে পড়ে থাকার জিনিসের মূল্য দিতে বললাম।”

উৎস কফির কাপে চুমুক দিয়ে আবার বলল,
-“ওই একি হলো।”

মেহেক কিছু বলতে চাইলো কিন্তু বলার জন্য কোনো শব্দ খুঁজে পেলো না।সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।তার চোখ অশ্রুতে ভরে উঠলো।কিন্তু এক ফোঁটাও গড়িয়ে পড়তে দিলো না।উৎস দেখার আগেই উল্টো পাশে ঘুরে দাঁড়ালো।ভালোবাসা বুঝি এমনি হয় যাকে ভালোবাসে সে যদি চোখের সামনে ঘুরঘুর করেও তাকে আপন করে নিতে পারে না তখন কষ্টটা পাহাড় সমান হয়ে যায়।মেহেককে ঘুরে দাঁড়াতে দেখে উৎস আন্দাজ করলো তার রোজের কচি মনে গাড়ো দাগ লেগেছে। না হলে আজকে এতো কঠর স্বরে কথা বলতো না।উৎসর হাতের কফির কাপ বেলকনিতে থাকা ছোটো টুলের উপর রেখে মেহেককে এক হেঁচকা টানে তার দিকে ঘুরিয়ে নিলো।মেহেকের চোখে তাকতেই তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ শূন্য হয়ে গেলো।মনে হলো তার ভেতরে থাকা ফুলটা ঝড়ে পড়ে গেলো।উৎস মেহেকের গাল দুই হাত দিয়ে তুলে ধরলো তার মুখের সামনে।শব্দ করে তার কপালে চুমু খেলো। মেহেক ভেজা চোখেই অবাক হয়ে তাকালো।সে আকস্মিক ঘটনায় হতভম্ব। মূহুর্তের মধ্যে সময় থেমে গেলো।
-“এই কয়েক দিনেই এই অবস্থা!ভেরি বেড মাই রোজ।আমার মতো বছর কাটলে বুঝতি ভালোবাসা কাকে বলে?”

মেহেকের চোখের পানি পড়া থেমে গেলো।এক অন্য রকম শিহরন হলো।উৎসের বলা কথার মানে খুঁজতে লাগলো।
-“মানে..”

উৎস গাল ছেড়ে দিয়ে অত্যাধিক মোলায়েম হাতে মেহেকের কমড় জড়িয়ে ধরে সে বলল,
-“Give me your Heart
in return you may take my life.”

মেহেক অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।তার দৃষ্টি স্থির সামনে দাঁড়ানো মুগ্ধ চাহনিতে তাকিয়ে থাকা মানুষটার দিকে।

#চলবে