#Out_Of_Bounds
#Ishrat_Jahan_Jarin
#part_3
বোস্টনের সকালটা আজ কুয়াশায় মোড়ানো। জানালার কাচের ওপর একটা ধোঁয়াটে আস্তরণ জমে আছে। ক্লারা বেনেট ডর্ম রুমের ছোট্ট আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে নিজের চশমাটা খুলে একটা সুতির কাপড় দিয়ে ভালো করে মুছল, তারপর খুব সাবধানে নাকের ওপর বসাল। আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। চোখের নিচে হালকা কালচে দাগ পড়েছে। কাল রাতের পর থেকে ঘুম জিনিসটা তার চোখ থেকে উধাও হয়ে গেছে। যখনই সে চোখ বন্ধ করছে, তখনই তার হাতের চামড়ায় জ্যাকের সেই শক্ত, গরম হাতের ছোঁয়াটা টের পাচ্ছে। কানের কাছে বাজছে সেই অহংকারী কণ্ঠস্বর। ক্লারা মাথাটা একটু ঝাঁকাল। মন থেকে এই কুৎসিত চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলা দরকার। সে নিজেকে মনে করিয়ে দিল, জ্যাক্সন মিলার একটা বখে যাওয়া বড়লোকের ছেলে ছাড়া আর কিছুই নয়। অনাথ আশ্রমের ভয় দেখিয়ে সে হয়তো ক্লারাকে সাময়িক আটকে রেখেছে, কিন্তু ক্লারার মনকে দমাতে পারেনি। সে তার ওভারসাইজড নেভি ব্লু সোয়েটারের হাতাটা কব্জি পর্যন্ত টেনে নিল। ল্যাপটপ ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে ভাবল, আজ ইউনিভার্সিটির ক্যাফেটেরিয়া থেকে এক কাপ কড়া ব্ল্যাক কফি না নিলে সে সারাদিন ক্লাসে মন দিতে পারবে না। মগজটা কেমন যেন জট পাকিয়ে আছে।ক্যাফেটেরিয়ায় পৌঁছাতেই কফির চনমনে সুগন্ধ ক্লারার মনটা কিছুটা শান্ত করল। সে লাইনে দাঁড়িয়ে নিজের কফির কাপটা হাতে নিল। ঠিক তখনই তার সোয়েটারের পকেটে ফোনটা মৃদু কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে একটা অপরিচিত নম্বর। ক্লারা মেসেজটা খুলল। “ক্যাফেটেরিয়ার ব্ল্যাক কফিটা বড্ড সস্তা। তার চেয়ে লাইব্রেরির পাশের ভেন্ডিং মেশিনের ক্যারাচিনো ট্রাই করতে পারো। আর হ্যাঁ, আজ বিকেল চারটেয় আমাদের ফিনান্সিয়াল মডেলিংয়ের কাজটা শেষ করতে হবে। লেট কোড়ো না।”
ক্লারা মেসেজটা দেখে পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে গেল। নম্বরটা কার, তা বুঝতে তার এক সেকেন্ডও সময় লাগল না। কিন্তু তার মাথায় যে প্রশ্নটা হাতুড়ি পিটতে লাগল জ্যাক কীভাবে জানল সে এই মুহূর্তে ক্যাফেটেরিয়ায় দাঁড়িয়ে ব্ল্যাক কফি কিনছে? সে কি তার ওপর নজর রাখছে? ক্লারা চট করে চারপাশটা দেখল। কিন্তু ক্যাফেটেরিয়ার এই গিজগিজে ভিড়ের মাঝে জ্যাকের সেই দীর্ঘ শরীরটা কোথাও নজরে পড়ল না। লোকটা কি তবে কোনো অদৃশ্য বাতাস, যে সব জায়গায় ঘুরে বেড়ায়? ক্লারা মেসেজটার কোনো উত্তর দিল না। ফোনটা ব্যাগে পুরে রাখার সময় তার ঠোঁট দুটো শক্ত হয়ে উঠল। সে মনে মনে বলল, ‘তুমি নিজেকে বড্ড চালাক ভাবো, তাই না মিস্টার ডাম্পস্টার? কিন্তু মনে রেখো, আমার মগজের হিসেব তুমি কোনোদিনও হ্যাক করতে পারবে না। ওটা জার্মানির লোহার সিন্দুক।’ কফির কাপটা হাতে নিয়ে সে একটা কোণার টেবিলের দিকে এগোতে যাবে, ঠিক তখনই দূর থেকে বেশ চড়া গলায় কেউ তার নাম ধরে ডেকে উঠল।
“হেয় ক্লারা! এদিকে!” ক্লারা তাকিয়ে দেখল, তাদেরই ডিপার্টমেন্টের ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট মার্কাস বসে আছে। মার্কাস ছেলেটা বেশ হাসিখুশি আর মিশুক প্রকৃতির। ফিনান্সের জটিল থিওরি নিয়ে প্রায়ই লাইব্রেরিতে ক্লারার সাথে তার টুকটাক আলোচনা হয়। মার্কাস হাত নেড়ে তাকে নিজের টেবিলের দিকে ডাকছে। ক্লারা একটু ইতস্তত করে মার্কাসের টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। মার্কাস এক গাল হেসে বলল, “আজকে তোমাকে বড্ড ক্লান্ত দেখাচ্ছে, ক্লারা। রাতে ঘুম হয়নি বুঝি? এই নাও, একটা চকোলেট মাফিন অর্ডার করেছিলাম, একা শেষ করতে পারছি না। শেয়ার করো।” মার্কাস খুব সহজভাবেই মাফিনের প্লেটটা ক্লারার দিকে এগিয়ে দিল এবং টেবিলের ওপর একটু ঝুঁকে এসে কালকের একটা অ্যাসাইনমেন্টের টপিক নিয়ে কথা বলতে লাগল। ক্লারা কফিতে চুমুক দিয়ে মার্কাসের কথায় হালকা হাসল। জ্যাকের মেসেজটা নিয়ে যে অস্বস্তি তার মনে তৈরি হয়েছিল, মার্কাসের সাথে স্বাভাবিক কথাবার্তায় সেটা অনেকটাই কেটে গেল। কিন্তু সেই স্বস্তি স্থায়ী হলো মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য। হঠাৎ করেই পুরো ক্যাফেটেরিয়ার চঞ্চল পরিবেশটা কেমন যেন থমথমে রূপ নিল। শোরগোল করা ছেলেমেয়েগুলো যেন হুট করে একটু নিচু স্বরে কথা বলতে শুরু করল। দরজার দিকে তাকানোর প্রয়োজন পড়ল না ক্লারার, বাতাসে ভেসে আসা সেই সিগনেচার ব্ল্যাক ওড আর হোয়াইট মাস্কের রাজকীয় সুগন্ধই জানান দিল যে মিস্টার ডাম্পস্টার এসে গেছেন। জ্যাক একা ছিল না, তার সাথে বাস্কেটবল টিমের আরও দুজন প্লেয়ার ছিল। সে হেঁটে যাচ্ছিল, কিন্তু তার ধূসর চোখ দুটো ক্যাফেটেরিয়ার ভিড় ঠেলে এক সেকেন্ডে আবিষ্কার করে নিল কোণার সেই টেবিলটা।
যেখানে মার্কাস আর ক্লারা বেশ কাছাকাছি বসে হাসিমুখে কথা বলছে, আর ক্লারার সামনে রাখা একটা মাফিনের প্লেট। এক মুহূর্তের জন্য জ্যাকের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। তার ধূসর চোখের মণি দুটো হিংস্র এক চিলতে আলোয় জ্বলে উঠল। সে তার বন্ধুদের কিছু একটা বলে একাই এগিয়ে এল সেই টেবিলটার দিকে। তার ছয় ফুট চার ইঞ্চির দীর্ঘ শরীরটা যখন টেবিলের পাশে এসে দাঁড়াল, টেবিলের ওপর এক বিশাল কালো ছায়া পড়ল। মার্কাস একটু অবাক হয়ে ওপরের দিকে তাকাল, “আরে জ্যাক! কিছু বলবে?”
জ্যাক মার্কাসের কথার কোনো উত্তর দিল না, সে তার দিকে তাকালও না। তার পুরো ফোকাস তখন ক্লারার ওপর। সে খুব অলস ভঙ্গিতে পকেটে হাত গুঁজে টেবিলের ওপর ঝুঁকে এল। তার সেই তীব্র সম্মোহনী পারফিউমের গন্ধটা এক ঝটকায় ক্যাফেটেরিয়ার কফির গন্ধকে গ্রাস করে নিল।
“ক্যাফেটেরিয়ার সস্তা কফির সাথে ফ্রি-তে মাফিনও পাওয়া যাচ্ছে দেখছি, মিস ক্যালকুলেটর?” জ্যাক তার নিচু, গম্ভীর গলায় বলল।
ক্লারা কফির কাপটা শক্ত করে ধরে ঠান্ডা চোখে জ্যাকের দিকে তাকাল। বলল, “আপনার এই টেবিলের দিকে না এলেও চলত, মিস্টার ডাম্পস্টার। আমরা একটা দরকারি আলোচনা করছি। মাঝখানে ডিস্টার্ব না করলে খুশি হব।”
জ্যাকের ঠোঁটের কোণে সেই চেনা বাঁকা হাসিটা ফুটে উঠল। সে মার্কাসের দিকে এক পলক তাকাল, তারপর আবার ক্লারার চোখের দিকে নিজের দৃষ্টি নিবদ্ধ করে সবার সামনেই একটু চড়া গলায় বলল,
“দরকারি আলোচনা? ফিনান্সের প্রজেক্ট পার্টনার হিসেবে তোমার মগজের সবটুকু সময় কিন্তু এই সেমিস্টারে আমার নামে রেজিস্টার্ড, মিস ক্যালকুলেটর। অন্য কোথাও নিজের এনার্জি নষ্ট করলে আমার প্রজেক্টের হিসেবটা কিন্তু বিগড়ে যাবে। আর আমি আমার জিনিসে অন্য কারো ভাগ বড্ড অপছন্দ করি। ওটা আমার ডিকশনারিতে অ্যালাউড নয়।” মার্কাস মুখটা হাঁ করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু জ্যাক তার চওড়া হাতটা সামান্য তুলে তাকে থামিয়ে দিল। জ্যাক ক্লারার একদম চোখের খুব কাছে নিজের মুখটা এনে ফিসফিস করে বলল, “মাফিনটা ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে ঠিক চারটেয় লাইব্রেরিতে চলে এসো। আমার সময় বড্ড দামি। অন্য কারো পেছনে ওটা নষ্ট করার বিলাসিতা আমার নেই।” কথাটা শেষ করেই জ্যাক ঘুরে দাঁড়িয়ে ক্যাফেটেরিয়া থেকে বের হয়ে গেল। মার্কাস কিছুটা অপ্রস্তুত এবং বিরক্ত হয়ে বলল, “জ্যাকের সমস্যাটা কী বলতো ক্লারা? ও নিজেকে কী ভাবে? ও কি এই ইউনিভার্সিটির মালিক?”
ক্লারা কোনো উত্তর দিল না। তার হাত দুটো রাগে কাঁপছে। তবে এই রাগের ভেতরেও একটা অদ্ভুত অনুভূতির জন্ম হলো। সে স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে মিস্টার ডাম্পস্টার যতই নিজেকে হর্তাকর্তা ভাবুক না কেন, মার্কাসের সাথে তাকে দেখে ছেলেটার পুরুষালি ইগোতে বড্ড জোরে ধাক্কা লেগেছে। বাঘের লেজে যেন টান পড়েছে। ক্লারা মাফিনের প্লেটটা একপাশে সরিয়ে রেখে নিজের মনেই বিড়বিড় করল, “খেলাটা তবে এবার সমান-সমান হবে, জ্যাক্সন বিচার। তুমি শুধু চাল দিতেই জানো, কাটতে জানো না। বিকেল চারটেয় দেখা হচ্ছে।”
–
বিকেল চারটে। লাইব্রেরির চারতলার এই নির্দিষ্ট কর্নারটা আজ বড্ড বেশি শান্ত। নিস্তব্ধতা যখন খুব গাঢ় হয়, তখন তা আর সাধারণ নিস্তব্ধতা থাকে না তা হয়ে ওঠে মানসিক চাপ। বাইরে আবার হালকা তুষারপাত শুরু হয়েছে। জানালার কাচের ওপাশে সাদা সাদা বরফকণাগুলো ভাসছে। প্রকৃতি যেন খুব অলস ভঙ্গিতে একটা সাদা চাদর বিছিয়ে দিচ্ছে পৃথিবীর বুকে। ক্লারা ল্যাপটপ অন করে স্প্রেডশিটের ডাটাগুলো সাজাচ্ছিল। তার আঙুলগুলো কিবোর্ডে দ্রুত চলছে, কিন্তু মনটা স্থির নেই। জ্যাক তার ঠিক উল্টো পাশের চেয়ারটায় বসে আছে। সকালে ক্যাফেটেরিয়া আর দুপুরে লেকচার থিয়েটারের সেই তীব্র বাকবিতণ্ডার পর একটা থমথমে, ঠান্ডা রেশ এখনো দুজনের মধ্যে ঝুলে আছে। জ্যাক কোনো কথা বলছে না। সে বেশ মনোযোগ দিয়েই ফিনান্সিয়াল জার্নালের পাতাগুলো ওল্টাচ্ছে। তার স্যুটের হাতাটা একটু গোটানো, ঘড়ির ডায়ালটা আলোয় চকচক করছে।
“এই ইনভেস্টমেন্ট গ্রাফটা একটু দেখবে?” জ্যাক হঠাৎ খাতাটা ক্লারার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল।
ক্লারা খাতার দিকে তাকাল। সংখ্যাগুলো তার চেনা জগৎ। সে ডাটাটা একনজর দেখে বলল, “এখানে রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্টের পার্সেন্টেজটা ভুল আছে। এটা ১২% হবে না, ১১.৫% হবে।”
“উঁহু, আমার হিসেবে কিন্তু ১২%-ই আসছে, মিস ক্যালকুলেটর,” জ্যাকের ঠোঁটের কোণে সেই বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।
“আপনার বাস্কেটবলের হিসেব আর ফিনান্সের হিসেব এক নয়, মিস্টার ডাম্পস্টার,” ক্লারা নিজের ল্যাপটপটা ঘুরিয়ে জ্যাকের সামনে ধরল। “এই দেখুন ফর্মুলা। সকালে ক্যাফেটেরিয়াতে ওভাবে নাটক না করে এই ফর্মুলাটা দেখলে আপনার হিসেব ভুল হতো না।” জ্যাক ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকানোর বাহানায় টেবিলের ওপর একটু ঝুঁকে এল। তাদের মধ্যকার দূরত্ব এক লহমায় কমে গেল। এতই কম যে, ক্লারা জ্যাকের নিঃশ্বাসের উষ্ণতা টের পাচ্ছে। সে চট করে নিজের শরীরটা একটু পিছিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু পারল না। জ্যাকের চোখ তখন ল্যাপটপ ছেড়ে সরাসরি ক্লারার নীল চোখের ওপর এসে স্থির হয়েছে। বাতাসে আবার সেই সম্মোহনী ব্ল্যাক ওডের সুবাস, যা চারপাশের অক্সিজেনের ওপর একচেটিয়া রাজত্ব কায়েম করে।
জ্যাক ভারী স্বরে বলল, “তুমি বড্ড বেশি নিখুঁত হতে চাও, ক্লারা। কিন্তু জীবনের সব হিসেব ফর্মুলা দিয়ে মেলে না। দর্শন বলে, অতিরিক্ত নিখুঁত জিনিস বড্ড একঘেয়ে। মাঝে মাঝে একটু ভুল করা ভালো। যেমন সকালে তুমি ওই মার্কাসের টেবিলে বসে ভুল করেছিলে।” ক্লারা নিজের খাতাটা বুকের কাছে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। সে বলল, “আমি কোনো ভুল করিনি। আর আপনাকে আমার জীবনের হিসেব দেওয়ার কোনো প্রয়োজন আমি মনে করি না। আপনি আমার প্রজেক্ট পার্টনার, আমার অভিভাবক নন।”
জ্যাকের চোখের সেই কৌতুকটা এক সেকেন্ডের জন্য মিলিয়ে গেল। সেখানে ঘনিয়ে এলো অন্ধকার। সে ক্লারার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। জ্যাক আবার একটু ঝুঁকে এল। তার গলাটা এবার এতটাই নিচু শোনাল যে মনে হলো সে কোনো অভিশাপ দিচ্ছে, “তুমি কার সাথে হাসবে, কার দিকে তাকাবে তার হিসেবও আমার কাছে থাকে ক্লারা। নিজেকে আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে ভাবাটা তোমার সবচেয়ে বড় ভুল।”
ক্লারা ফিসফিস করে বলল, “এটা আপনার মানসিক অসুস্থতা, জ্যাক্সন মিলার। একে জোর খাটানো বলে।”
“একে ওনারশিপ বলে,” জ্যাকের চোখ দুটো বিপজ্জনকভাবে চকচক করে উঠল। “আমি যখন কোনো জিনিস নিজের বলে ধরে নিই, তখন তার ওপর অন্য কারো ছায়া পড়াও আমি বরদাশত করি না। মার্কাস ছেলেটা বেঁচে গেছে যে আমি শুধু ওর মাফিনের প্লেটটা ফেলে দিতে বলেছি। পরের বার ওর হাতটাও ফেলে দিতে পারি। আমি তোমাকে সাবধান করছি না, ক্লারা। আমি তোমাকে আমার নিয়মটা জানিয়ে রাখছি।”
ক্লারা স্তব্ধ হয়ে গেল। এই ছেলেটা কোনো স্বাভাবিক মানুষ নয়। ওর ভেতরে একটা কুৎসিত, অন্ধকার ফাটল আছে। কিন্তু আশ্চর্য, এই ভয়ের মাঝেও ক্লারার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত কম্পন তৈরি হলো।
জ্যাক হঠাৎ করেই তার মনের ভাব আড়াল করে আবার চেয়ারে হেলান দিল। এক মুহূর্তে তার মুখটা আবার নিস্পৃহ হয়ে গেল। সে অলস গলায় বলল, “ঠিক আছে, তোমার ১১.৫% হিসেবটাই লক করা হলো। লজিক যখন তোমার পক্ষে, তখন হার মানতে ক্ষতি নেই। আজকের মতো কাজ এখানেই শেষ।”
সে জার্নালটা বন্ধ করল। কিন্তু তার সেই ঠান্ডা, স্থির দৃষ্টি ক্লারাকে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিল কাজ শেষ হলেও, তার ওপর জ্যাকের সেই অদৃশ্য, অন্ধকার খাঁচার নজরদারি মোটেও শেষ হয়নি।
–
লাইব্রেরি থেকে বের হতে হতে প্রায় সন্ধ্যা নেমে এল। বোস্টনের এই শীতের সন্ধ্যাগুলো বড্ড দ্রুত আর নিঃশব্দে আসে, ঠিক কোনো চোরের মতো। ক্যাম্পাসের ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোগুলো একে একে জ্বলে উঠেছে। সেই হলদেটে আলোয় কুয়াশার কণাগুলোকে ভাসতে দেখা যাচ্ছে। ক্লারা নিজের ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে ডর্মের দিকে হেঁটে যাচ্ছিল। কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া সূঁচের মতো তার ফর্সা গালে এসে বিঁধছে। ঠিক তখনই পার্কিং লটের মোড়ে একটা ডার্ক ক্রিমসন রঙের গাড়ির হেডলাইটের তীব্র আলো এসে পড়ল তার মুখের ওপর। আলোটা এতই চড়া যে এক মুহূর্তের জন্য চারপাশটা ধবধবে সাদা মনে হলো। ক্লারা হাত দিয়ে চোখ দুটো আড়াল করল। গাড়ির কাচটা আস্তে আস্তে নেমে গেল। ড্রাইভিং সিটে বসে আছে জ্যাক্সন মিলার। তার এক হাত অলস ভঙ্গিতে স্টিয়ারিং হুইলে, অন্য হাতে একটা দামি কফি চেইনের কাপ। হুডির হাতাটা কনুই পর্যন্ত গোটানো, যেন এই মাইনাস ডিগ্রি তাপমাত্রা তাকে স্পর্শও করতে পারছে না।
“উঠে পড়ো, মিস ক্যালকুলেটর। ডর্ম পর্যন্ত ড্রপ করে দিচ্ছি।”জ্যাক বলল। ক্লারা তার ল্যাপটপ ব্যাগটা বুকের কাছে শক্ত করে ধরে ঠান্ডা গলায় বলল, “ধন্যবাদ মিস্টার ডাম্পস্টার। আমার নিজের পায়ে হেঁটে যাওয়ার মতো যথেষ্ট শক্তি আছে। আপনার এই কোটি টাকার গাড়িতে ওঠার কোনো শখ আমার নেই। আপনি বরং আপনার বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে বেড়ান।”
মানুষ যখন খুব বেশি ভয় পায়, তখন সে নিজেকে আড়াল করার জন্য রাগ দেখায়। ক্লারাও সেটাই করছে। জ্যাক একটু হাসল। তার ছয় ফুট চার ইঞ্চির দীর্ঘ অবয়বটা যখন ক্লারার সামনে এসে দাঁড়াল, ক্লারা হঠাৎ আবিষ্কার করল প্রকৃতির আলো-বাতাস সবকিছু যেন এই একটা মানুষ একাই দখল করে নিয়েছে। তার সামনে দাঁড়ালে নিজেকে বড্ড অসহায় আর ছোট মনে হয়।
জ্যাক ক্লারার খুব কাছে এসে দাঁড়াল। এত কাছে যে, ঠাণ্ডা বাতাসে তার শরীর থেকে ভেসে আসা ব্ল্যাক ওড আর হোয়াইট মাস্কের সুগন্ধটা ক্লারার নিঃশ্বাসের সাথে ফুসফুসে ঢুকে গেল।
জ্যাক একটু নিচু হলো। তার ঠোঁট দুটো ক্লারার কানের লতি স্পর্শ করল না, কিন্তু তার গরম নিঃশ্বাস ক্লারার চামড়ায় এক তীব্র কাঁপুনি তৈরি করল। সে ফিসফিস করে বলল,
“তুমি বড্ড একগুঁয়ে, ক্লারা। বাইরে মাইনাস তিন ডিগ্রি তাপমাত্রা। অযথা জেদ মানুষকে ধ্বংস করে। এই ঠাণ্ডায় হেঁটে গেলে কাল তোমার জ্বর আসবে, আর আমার প্রজেক্টের কাজটা আটকে যাবে। সকালে ক্যাফেটেরিয়াতে যে ড্রামাটা হয়েছে, আমি চাই না এই জনশূন্য পার্কিং লটেও তার রিপিট হোক। কারণ, এখানে চিৎকার করলেও তোমাকে বাঁচানোর জন্য কোনো মার্কাস আসবে না। সো, স্রেফ প্রজেক্টের স্বার্থে গাড়িতে ওঠো। অন্য কোনো মানে খোঁজার চেষ্টা কোড়ো না।” ক্লারা জ্যাকের ধূসর চোখের দিকে তাকাল।ক্লারা বুঝতে পারল, এই ছেলের কথা না শুনলে সে মাঝরাস্তায় গাড়ি নিয়ে তার পিছু পিছু যাবে। হয়তো জোর করে তুলে নেবে। এই শয়তানটার পক্ষে সবকিছুই সম্ভব।
ক্লারা একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়ির প্যাসেঞ্জার সিটের দরজাটা খুলল। গাড়িটা যখন বোস্টনের রাতের হাইওয়ে দিয়ে নিঃশব্দে ছুটে যাচ্ছে, তখন ভেতরের পরিবেশটা দমবন্ধ করা। এই মুহূর্তে ক্লারার লজিক বলে তার এই লোকটাকে ঘৃণা করা উচিত। কিন্তু মনস্তত্ত্ব বলে ভয় আর আকর্ষণ খুব কাছাকাছি দুটি অনুভূতি। ক্লারার হঠাৎ মনে হলো, সে নিজের অজান্তেই এক অদৃশ্য শৃঙ্খলে জড়িয়ে পড়ছে। যেখানে ঘৃণা আর ভালো লাগার হিসেবগুলো দিন দিন ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। জ্যাক স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে আড়চোখে ক্লারাকে একবার দেখল। তার ঠোঁটের কোণে সেই তৃপ্তির হাসিটা আবার ফুটে উঠেছে। সে মনে মনে বলল, তুমি খাঁচায় ঢুকতে চাওনি ক্লারা, কিন্তু তুমি অলরেডি ঢুকে পড়েছ। দরজাটা আমি অনেক আগেই বন্ধ করে দিয়েছি।’
চলবে?

