Home "ধারাবাহিক গল্প "অবহেলার মুক্তা অবহেলার মুক্তা পর্ব-১৬

অবহেলার মুক্তা পর্ব-১৬

0
17

#অবহেলার_মুক্তা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_১৬

বাইরে তখন ঝোড়ো হাওয়ার বিকট আওয়াজ। খড়গাদার আগুনের লাল আভা শেখ বাড়ির উত্তরের বড় ঘরের জানালাই এসে আছড়ে পড়ছে। উঠোনে শত শত মানুষের সমাগম, আর তার মাঝে শিউলির সেই কর্কশ, বিষাক্ত চিৎকার যেন পীরপুর গ্রামের শান্ত বাতাসকে বিষিয়ে দিচ্ছিল।

“মুরুব্বিরা দ্যাহেন! সচক্ষে দ্যাহেন!” শিউলি আঁচল মাথায় দিয়ে মাতব্বর ইদ্রিস আলীর সামনে এসে দাঁড়িয়ে হাত উঁচিয়ে হাঁক ছাড়ল, ” রফিক ভাই ডাকাত তাড়ানোর নাম কইরা বাজারে যাদের হুমকি দিছিল, আজ সেই রামচরণ কাকার র-ক্তমাখা গামছা আর জামা বড় ঘরের পেছনের মাটির সিন্দুকের নিচে লুকানো পাওয়া গেছে! গ্রামে এতগুলো বীভৎস খ-ুন আর র-ক্তপাত—এসব কি বাইরের ডাকাতদের কাজ, নাকি ঘরের শত্রুর কাজ?”

উঠোনে দাঁড়ানো গাঁয়ের চ্যাঙড়া-প্যাঙড়ারা ফিসফিস করে উঠল। কিন্তু রফিক শেখ ঘরের ভারী কাঠের খিলটা এক ঝটকায় খুলে বাইরে এল। ওর পরনে সুতির খালি গায়ের ওপর জড়ানো খাদি ফতুয়া। ওর চোখ দুটো তখন জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো লাল, চেহারা পাথরের মতো কঠিন।

রফিক শেখ এক পা এগিয়ে এসেই শিউলির মুখোমুখি দাঁড়াল। ওর গলার বজ্রকণ্ঠ উঠোনের সব শোরগোলকে এক নিমেষে স্তব্ধ করে দিল।

“শিউলি! তোর শয়তানির চক্রান্ত যদি শেষ হয়া থাকে, তবে মুখটা বন্ধ কর!”

ইদ্রিস মাতব্বর ধীরপায়ে এগিয়ে এলেন। উনার হাতে হারিকেনের ঘোলাটে আলো। মাতব্বরের কপালে চিন্তার গভীর ভাজ। “রফিক, শিউলি যাই বলুক না কেন, তোর ঘরের পেছনের সিন্দুকের নিচে র-ক্তমাখা জামাটা আইল কোত্থেকে? আর নদীর পাড়ে যে তাজা লা-শের টুকরো পাওয়া গেছে, তার খবর কি তুই জানিস?”

রফিক একচিলতে বিষাক্ত হাসি হাসল। ওর চোখ দুটো ঘুরতে লাগল মাতব্বরের মুখ থিকা শুরু করে ভিটের কোণে দাঁড়িয়ে কাঁপতে থাকা জাহিদের ওপর, এবং দূর বাঁশঝাড়ের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা গাঁয়ের কিছু অদ্ভুত চেহারার মানুষের ওপর।

“মাতব্বর কাকা,” রফিক শেখ বরফশীতল গলায় বলল, “আমার ঘরের পেছনের সিন্দুকের চাবি কার কার কাছে ছিল, তা আপনার চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। এক মাস আগে শিউলি ডুপ্লিকেট চাবি বানাইয়া আমার বউ মরিয়মরে চোর বানাইতে চাইছিল। আজ আবার সেই চাবি দিয়া ও আমার ঘরে র-ক্তমাখা জামা রেখে মোরে খু*নি বানাইতে চাইছে! কিন্তু কাকা,,,, রফিক শেখ যদি খু*নই করত, তবে প্রমাণ নিজের ঘরের সিন্দুকের নিচে জাঁকাইয়া রাখত না!”

মরিয়ম ততক্ষণে শাড়ির আঁচলটা পেটের ওপর ভালো করে জড়িয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। ওর চোখ জুড়িয়া নিজের স্বামীর প্রতি এক অবিচল আস্থার দীপ্তি।

মরিয়ম স্পষ্ট, দৃঢ় গলায় মাতব্বরকে উদ্দেশ্য করে বলল, “মাতব্বর কাকা, শিউলি আপা আজ সন্ধ্যা থিকাই বড় ঘরের আশেপাশে ঘুরঘুর করছিল। শাশুড়ি মা যখন পাড়ায় গেছিলেন, তখনো উনি ঘরের পেছনের জানালাই চাবি ঢোকানোর চেষ্টা করছিলেন আমি নিজে সচক্ষে দেখছি! উনি রফিক ওপর প্রতিশোধ নিতে এই সাজানো নাটক করতাছেন!”

শিউলি চেঁচিয়ে উঠল, “মিথ্যা কথা! একদম বানাও কথা! সতী-সাধ্বী বড় বউ এখন জামাইকে বাঁচাইতে আমার ওপর দোষ চাপাচ্ছে!”

“থাম শিউলি!”

হঠাৎ করে ভিটের কোণ থেকে জাহিদ চিৎকার করে উঠল! সবাই চমকে জাহিদের দিকে তাকাল। জাহিদের চেহারা শুকিয়ে গেছে, তার চোখ দিয়ে পানি গড়াচ্ছে। জাহিদ এক পা এগিয়ে এসে শিউলির শাড়ির আঁচল চেপে ধরল।

“অনেক হইছে শিউলি! আর মিথ্যা বলিস না!” জাহিদের গলার আওয়াজ কান্নায় ভেঙে পড়ল। “তোরে বিশ্বাস কইরা আমি আমার সহজ-সরল মরিয়মরে লাথি মে-রে ঘর থিকা বের করছিলাম! তোর উসকানিতে আমি রফিক ভাইয়ের সাথে দুশমনি করছি! আজ তুই রফিক ভাইরে খু-নি বানাইতে চাস? মাতব্বর কাকা, ও মিথ্যা বলছে! কাল রাতেও ও করিমন বুবুর সাথে মিলে পেছনের সিন্দুক খুলে র*ক্তমাখা কাপড়টা রাখছিল, আমি নিজে আড়াল থিকা দেখছি কিন্তু ভয়ে বলতে পারি নাই!”

পুরো উঠোনে যেন বাজের মতো বিস্ফোরণ ঘটল!
করিমন ভয়ে পেছনের উঠোনে সটকে পড়ার চেষ্টা করতেই গাঁয়ের দুই মহিলা তাকে ধরে ফেলল। শিউলির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল, সে তো কল্পনাও করেনি যে যেই জাহিদ এতদিন তার হাতের পুতুল ছিল, আজ সেই জাহিদই পুরো চক্রান্তের থলি উল্টে দেবে!

ইদ্রিস মাতব্বর লাঠি ঠুকে চিৎকার করলেন, “ধিক্কার তোদের! তোরা দুই জা মিলে এই শেখ বাড়ির সম্মান আর রফিকের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছিলিস?জানো*য়াররা, শিউলি আর করিমনরে ঘরে আটকে রাখ! কাল সকালে এদের বিচার হবে!”

কিন্তু রফিক শেখের চেহারায় বিজয়ের কোনো আনন্দ ফুটে উঠল না। ওর নজর তখনও মাতব্বর বা শিউলির দিকে ছিল না ওর নজর ছিল নদীর ঘাটের দিকের সেই অন্ধকারের দিকে।

রফিক ইদ্রিস মাতব্বরের দিকে ফিরে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “কাকা,,,, শিউলি আর করিমন তো ঘরোয়া ষড়যন্ত্রকারী, ওরা আমার ঘরে র-ক্তমাখা কাপড় রাখতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হইতাছে—রামচরণ কাকাকে যে বীভৎসভাবে খ-ুন করা হইছে, উনার শরীরের চামড়া ছুলে নিয়ে বুকের ভেতর থিকা র*ক্ত আর অ-ঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বের করে নেওয়া হইছে,,,,এই র*ক্তমাখা কাপড় শিউলিদের হাতে দিল কে? পীরপুর গ্রামে যারা খু*ন করতাছে, তাদের উদ্দেশ্য সম্পত্তি বা ডাকাতি না কাকা!”

রফিক শেখের এই কথায় পুরো উঠোনের বাতাস এক মুহূর্তে থমকে গেল।

রফিক এক পা এগিয়ে এসে ওর পিতল বাঁধানো লাঠিটা নদীর ঘাটের দিকে নির্দেশ করল।
“আপনারা যাকে সাধারণ ডাকাতি ভাবছেন, তারা কোনো সাধারণ ছ্যাঁচড়া চোর বা ডাকাত দল নয়! গত এক মাসে মধুমতী নদীর পাড়ে যতগুলো ল-াশ পাওয়া গেছে—জয়নাল মিয়া থিকা শুরু কইরা রামচরণ কাকা—-প্রত্যেকের শরীর পরীক্ষা কইরা আমি দেখছি, তাদের শরীরের ভেতরের দামি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, বিশেষ করে কিডনি আর কলিজা নিখুঁতভাবে ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে নেওয়া হইছে! এরা হলো শহরের বড় বড় ডাক্তার আর পিশাচদের পোষা ‘অঙ্গ পাচারকারী চক্র’ (Organ Trafficking Racket)!”

কথাটা শোনামাত্রই উপস্থিত মাতব্বর সহ সব গ্রামবাসীর গায়ের পশম খাড়া হয়ে গেল! সেই অন্ধকার অজপাড়াগাঁয়ে ‘অঙ্গ পাচার’ শব্দটা এক অতিপ্রাকৃতিক বিভীষিকার মতো শোনালো!

ইদ্রিস মাতব্বর তোতলে উঠলেন, “অ-অঙ্গ পাচার? মানুষের ভেতরের অঙ্গ কেটে বিক্রি করে? ও আল্লাহ! এ কী শুনি!”

“হ কাকা!” রফিকের চোখ দুটো তেজে জ্বলে উঠল। “নদীতে ট্রলার ভিড়িয়ে গভীর রাতে এই পিশাচের দল গ্রামে ঢোকে। সাধারণ মানুষকে বীভৎসভাবে খ-ুন কইরা তাদের পেটের ভেতরের অঙ্গ কেটে বরফের বাক্সে শহরের বড় হাসপাতালে চালান করে দেয়! আর শিউলি ও করিমনকে টাকা আর সোনাদানা খাইয়ে ব্যবহার করা হইছিল—যাতে সব দোষ আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে গ্রামের মানুষ আমার ওপর সন্দেহ করে, আর ওরা নিশ্চিন্তে ওদের এই নরকীয় ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারে!”

মরিয়ম বারান্দার খুঁটি শক্ত করে চেপে ধরল। তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। তার মানে, উনাদের জীবনের ওপর এত বড় যে বিপদ ঘনিয়ে এসেছিল, তার নেপথ্যে শিউলি বা জাহিদ আসল মাস্টারমাইন্ড ছিল না! শিউলিরা ছিল কেবল এই পৈশাচিক চক্রের হাতের বোড়ে!

তাহলে এই বিশাল, আন্তর্জাতিক অঙ্গ পাচারকারী চক্রের আসল মাস্টারমাইন্ড কে? যে পীরপুর গ্রামের মাঝখানে বসেই নিঃশব্দে চাল চালছে?

রফিক শেখ ধীরপায়ে নদী ঘাটের দিকে দুই পা এগোলেন। উনার ভারী গলার আওয়াজ আশ্বিনের ঝোড়ো বাতাসে ভেসে গেল।

“শিউলিদের সাজা কাল সকালে হবে। কিন্তু যে শয়তান এই গ্রামে বসে শহরের পিশাচদের সাথে হাত মিলিয়ে আমার পীরপুরের মানুষের র*ক্ত বেচতাছে,,,,সেই মাস্টামাইন্ডকে আমি চিনি! সে এই শেখ বাড়ির বাইরের কেউ নয়, সে গ্রামেই আমাদের চোখের সামনে ভালো মানুষের মুখোশ পরে ঘোরে!”

ঠিক সেই মুহূর্তে বাঁশঝাড়ের পেছনের গভীর আঁধার থেকে এক বিকট শিষের আওয়াজ পাওয়া গেল, আর মধুমতী নদীতে একটা ভারী ট্রলারের ইঞ্জিন চালুর বিকট শব্দ ছড়িয়ে পড়ল!

পীরপুর গ্রামের আকাশে আশ্বিনের কালো মেঘ আরও ঘন হয়ে নামল। একদিকে মরিয়মের গর্ভের সন্তানের নিরাপত্তা, ঘরের ভেতরের কলঙ্ক, আর অন্যদিকে সেই ভয়ংকর অঙ্গ পাচারকারী চক্রের আসল মাস্টারমাইন্ডের মুখোশ উন্মোচনের এক রক্তক্ষয়ী মহালড়াই এখন রফিক শেখের সামনে এসে দাঁড়াল!

চলবে,,,,,