#স্নিগ্ধ_প্রেমের_সম্মোহন
–[পর্ব-১৮]
লেখিকা: #সাদিয়া_মেহরুজ_দোলা
‘ বিয়েতে রাজি হলি কেনো? ‘
ভারী গম্ভীর কন্ঠস্বর শুনে থেমে থেমে কেঁপে উঠি। পূর্ব ভাই আমার হাত যুগল খুব শক্ত করে চেপে ধরে আছেন। আঁড়চোখে একবার পূর্ব ভাইয়ার মুখশ্রী দেখে ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে যাই! চোখদুটো বেশ লাল। বেশ বিধ্বস্ত লাগছে দেখতে! শার্টের ওপরের তিনটে বোতাম খোলা। বারবার এদিক ওদিকে তাকিয়ে রাগ দমনের ক্রমশ চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি!
পূর্ব ভাই ফের ঝাঁঝ মেশানো কন্ঠে বললেন,,,
‘ কি হলো? কথা কানে যায়না? কিছু জিজ্ঞেস করেছি আমি দোল, এন্সার দে!’
ধমকে কেঁপে উঠলেও এবার রাগ লাগে আমার। অদ্ভুত! আমি কি ইচ্ছে করে বিয়েতে রাজি হয়েছি? বেশ দম নিয়ে বলি,,,
‘ দেখুন পূর্ব ভাই, বিয়েতে আমার মত ছিলোনা এক ফোঁটাও। বাবা মা জোর করে বিয়েতে রাজি করিয়েছে। শুধুমাত্র বড় চাচার জন্য। আপনার বাবা চান যাতে তার ছেলের বউ হই আমি! এতে আব্বু আম্মুও সায় জানায়। আমি না করা সত্বেও তারা শোনেননি! এতে আমার কি দোষ?আমাকে ধমকাচ্ছেন কেনো? বিয়েতে রাজি হলেই বা আপনার কি? আমি যাকে খুশি তাকে বিয়ে করবো! ‘
কথাগুলো গরগর করে বলে দিয়ে ফোস করে শ্বাস ছাড়ি। মাথা তুলে পূর্ব ভাইয়ার দিকে তাকাতেই শরীর কেমন কাঁপুনি দেয় ভয়ে! আগের থেকেও বেশ কিছুটা লাল হয়ে আছে তার চোখজোড়া! তার দৃষ্টি দেখে মনে হচ্ছে এখনি আমায় কাঁচা গিলে খাবেন। ভয় হচ্ছে এবার। ইশ..! কথাগুলো বলা কি দরকার ছিলো খুব?
পূর্ব ভাইয়া এক প্রকার হুড়মুড়িয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসেন। আমি পিছে যেতে নিলেই তিনি তার একহাত দিয়ে আমার কোমড় চেপে ধরে টেনে নিজের সাথে মিশিয়ে নেন। রাগে ফোসফাস করছেন তিনি। আমি ভয়ার্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে চোখ নিচু নামাতেই খেয়াল হয় গলায় তীব্র ব্যাথা!
পূর্ব ভাইয়া গলায় মুখ ডুবিয়ে কামড় দিচ্ছেন। দুহাত দিয়ে ঠেলে সরানো সম্ভব হচ্ছেনা দেখে এক পর্যায়ে কেঁদে দেই ব্যাথাতে।
তিনি সরে আসতেই আমি ব্যাথাতুর কন্ঠে বলি,,,
‘ কামড় দিলেন কেনো?’
‘ শাস্তি এটা! তুই আমার, শুধু আমার। আমাকে ছাড়া অন্য কাওকে বিয়ে করার চিন্তাও করবিনা। মাইন্ড ইট?নাহলে কিন্তু আমার থেকে খারাপ আর কেও হবেনা। ‘
আমি ফুপিয়ে কেঁদে বলি, ‘ আপনি খুব খারাপ মানুষ পূর্ব ভাই। এতো জোরে কেও কামড় দেয়? ব্যাথা হচ্ছে! ‘
‘ ব্যাথা করছে? ওয়েট কমিয়ে দিচ্ছি! ‘
বাঁকা হাসলেন তিনি। তা দেখে আমি ঘাবড়ে যাই। পিছু সরতে নিলে তিনি ফের আমায় চেপে ধরেন নিজের সাথে। গলায় কামড় দেয়ার জায়গাটায় ছোট্ট ছোট্ট করে চুমু একে দিতে থাকেন!
আমি ফ্রীজড আকষ্কিক কান্ডে! নড়াচড়া সহ কথা বলতে ভুলে গেছি বোধহয়।
খানিক বাদে তিনি আমার থেকে সরে গেলেন। আলতো হেসে বললেন, ‘ ব্যাথা কমেছে?নাকি আরো দেবো?’
আমি বেশ জোরে মাথা নাড়িয়ে পিছু সরে যাই। একহাত গলায় বহমান! চোখদুটো বন্ধ করতেই অবাদ্ধ পানিগুলে কার্নিশ বেয়ে পড়ে যায়!
এ সুখানুভূতি যে ক্ষনিকের।
।
আবারো এক কালো অধ্যায় এর সমাপ্তি ঘটিয়ে ভোরের আলো ফুটেছে চারিদিকে। ঝলমলে রূপ ধারণ করেছে আশপাশ!
টিপটিপ করে চোখ খুলতেই মনে হলো আমায় কেও আষ্টেপৃষ্টে জরীয়ে ধরে আছে। ফট করে চোখ খুলতেই নজরে আসে পূর্ব ভাইয়া চেহারা! ঘন পাপড়ির চোখদুটো বন্ধ হয়ে আছে। তার ভারী নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে আমার মুখে!
পূর্ব ভাইয়ার বুকে নিজেকে দেখে লজ্জারা যেনো আমায় বেশ করে আক্রমণ করলো। কাল তো গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে ছিলাম আমি! তার বুকে আসলাম কি করে? ঘুমে যাওয়ার পর কি পূর্ব ভাই আমায় তার বুকে আগলে নিয়েছেন? হয়তো! ইশ..! লজ্জায় লাল নীল হতে হতে এক সময় গুটিয়ে যাই। নতুন নতুন অনুভূতি জাগ্রত হচ্ছে তার প্রতি। দিনকে দিন তার থেকে দূরে সরার বদলে আমার তার সাথে জরিত নতুন অনুভূতির জন্ম হচ্ছে! এভাবে যে তার থেকে দূরে থাকা বেশ কঠিন হয়ে যাবে আমার জন্য!
পূর্ব ভাইয়ার বলিষ্ঠ হাতজোরা নিজের কোমড় থেকে সরাতে নিলে আরো শক্ত করে ঝাপটে ধরেন তিনি! অসহায় চাহনি দিয়ে তার দিকে তাকাতেই তিনি হুট করে চোখ খুলে নেন!
এই মূর্হতে লজ্জাটা আরো বেশি লাগছে। খুব বেশি।
‘ তোর গালদুটো এতো লাল হয়ে আছে কেনো?’
পূর্ব ভাইয়ার প্রশ্ন শুনে আমি গুটিয়ে যাই। এক পর্যায়ে তিনি আমায় ছেড়ে দেন। ফের বললেন,,,
‘ ইউ নো হোয়াট তোকে এখন কতটা কিউট লাগছে? ইচ্ছে করছে তোর গালদুটো সহ তোকে গিলে ফেলি! ‘
আমি কুকড়ে গিয়ে তার দিকে অবাক চাহনিতে তাকাই।কি অসভ্য এই লোক!মারাত্মক অসভ্য তিনি! ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকার এক পর্যায়ে তিনি আমার গাল টেনে টুপ করে চুমু খান!
আমি জরোসরো হয়ে বসে বলি,,,
‘ ভাইয়া প্লিজ বাসায় চলুন! সবাই অনেক টেনশন করছে হয়তো। ‘
তিনি ব্যাকসিট থেকে নেমে যান। ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট দেন। স্বস্তির শ্বাস ফেলি! টেনশনে মাথা ব্যাথা করছে। জানিনা আব্বু আম্মু বাকিদের কি জবাব দেবো? তাদের কি অবস্থা হয়েছে কে জানে?বড় চাচুকে মুখ দেখাবো কি করে?
সুখানুভূতি অনুভূতি করলেও এবার কান্না পাচ্ছে আমার। এভাবে তুলে না আনলেও হতো। আমি কি জবাব দিবো সবাইকে এখন?
।
বাসার সবার সামনে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছি। আমার পাশেই পূর্ব ভাই ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে দাড়িয়ে ফোন স্ক্রল করছেন!
বাড়ির সবার দৃষ্টি আমার ওপর।
আমাকে পূর্ব ভাইয়ার সাথে দেখে বেশ বড় রকমের শক খেয়েছেন তারা।
নীরবতা কাটিয়ে বড় চাচু বললেন,,,,
‘ পূর্ব? দোলা তোর সাথে কেনো? ‘
এবার আম্মু বললেন,,,
‘ দোলা কাল তুই কই ছিলি? এভাবে সবাইকে কিছু না বলে কই গিয়েছিলি? কাল তোর বিয়ে ছিলো! এভাবে সবকিছু ফেলে চলে যাওয়ার মানে কি?’
আমি মৌনতা কাটিয়ে আমতা আমতা করে কিছু বলবো তৎক্ষনাৎ পূর্ব ভাই বললেন,,,,
‘ দোলকে আমি রাস্তায় পেয়েছি। কাল রাতে! গাড়ি নষ্ট হয়ে যাওয়াতে বাসায় আসতে পারিনি কাল রাতে। ফোনের ব্যাটারি ডাউন ছিলো। দোলের কাছে ফোন ছিলোনা। তাই কিছু জানাতে পারিনি। ‘
পূর্ব ভাইয়ার কথায় বড় চাচু বললেন,,,
‘ প্রিন্সেস তোমার কি বিয়েতে মত ছিলোনা? ‘
আমি দ্বিধা ছাড়া না অকপটে বলে দেই, ‘ না চাচু! আমি এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে চাইনা। তাই কাল রাতে বান্ধবীর বাসায় চলে যাচ্ছিলাম কিন্তু রাস্তায় পূর্ব ভাইয়ার সাথে দেখা হওয়াতে তিনি আমায় তার সাথে যেতে বলেন। ‘
কথ্য সম্পূর্ণ করার পর বড় চাচুর দিকে তাকাই হাবভাব বোঝার জন্য! বড় চাচু খানিক হেসে বললেন,,,
‘ ওহ এই কথা? আগে বললেই হতো মামনি! সমস্যা নেই। তোমার স্টাডি কমপ্লিট হলেই অভ্রর সাথে বিয়ে হবে। আপাতত এংগেইজমেন্ট হয়েছে তাতেই থাকুক ‘
আমি হতাশ পানে তাকাই ফ্লোরে! ভেবেছিলাম চাচু হয়তো বিয়েটা ভেঙ্গে দিবেন। কিন্তু হলোটা কি? সেই তো অভ্র ভাইয়ার বাগদত্তা হয়েই থাকতে হলো।
পূর্ব ভাইয়ার দিকে তাকাতে খেয়াল হলো তার চোখমুখে চাপা রাগ! তবে পরিস্থিতির কারণে তিনি তার রাগটা প্রকাশ করতে পারছেন না। পূর্ব আর অভ্র ভাইয়া দুজনেই তাদের বাবা মাকে যথেষ্ট সম্মান করেন। তাদের কথা অমান্য আজ পর্যন্ত করেননি! আমার ভয় হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত বিয়েটা হয়ে যাবে নাতো?
।
রুমে এসে দরজা লাগিয়ে পরণের গয়না গুলো মেঝেতে ছুড়ে মারি! কান্নারা দলা পাকিয়ে গলার কাছটায় আঁটকে ছটফট করছে!
দরজায় নকের শব্দে হুস ফিরে আমার। চটপট করে চোখের পানিগুলো মুছে নিয়ে দরজা খুলতেই দেখি অভ্র ভাইয়া দাড়িয়ে। তাকে দেখে আমি কিছুটা চুপসে যাই! অপরাধ বোধ কাজ করছে। তাকে এই মূর্হতে আমার রুমে আশা করিনি!
অভ্র ভাইয়া মুচকি হেসে বললেন,,,
‘ ভেতরে আসতে বলবে না?’
তার মুখে তুমি ডাকটা শুনে আমি হতবিহ্বল! তিনি তো আমায় তুই ডাকতেন। তবে কি তিনি এ বিয়েতে রাজি?
আমি সৌজন্যমূলক হাসি দিয়ে তাকে বলি, ‘ আসুন ভাইয়া। ‘
অভ্র ভাইয়া ভেতরে এসে ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দেন। মন নিভৃতে ভয়গুলো জরোসরো হয়ে আন্দোলন শুরু করেছে।
হটাৎ অভ্র ভাইয়া আমায় বেশ শক্ত করে জরীয়ে ধরলেন। এমন কান্ডে আমি স্তব্ধ রূপ ধারণ করে আছি। এসব কি?
চলবে,