প্রিয়তমা পর্ব-০৭

0
618

#গল্পঃপ্রিয়তমা
#লেখিকাঃজিন্নাত_চৌধুরী_হাবিবা
#পর্ব_০৭

রৌদ্রতপ্ত দুপুরে ঝলমলে সূর্যের কিরণ তার সমস্ত রাগ ঝেড়ে ফেলছে মেদিনীর বুকে।রোদের উত্তাপে শরীর থেকে ঘাম চুইয়ে পড়ছে।মধ্যাহ্নভোজ শেষে সবাই ভাতঘুম দিয়েছে।রূপক হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ঘাম মুছে ফাইল চেইক করে চলেছে।
প্রীতি সকালে কলেজে ভর্তি হয়ে এসে বাবার বাড়িতে এসেছে শাশুড়ীর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে।হুট করেই বাবা মায়ের কথা মনে পড়াতে হাজেরা বেগমকে বলে বাবার বাড়িতে চলে আসে।রূপক জানেনা কিছুই।হাজেরা বেগম গাড়ি দিয়ে যেতে বলেছেন কিন্তু প্রীতি উনার কথা না শুনে হেঁটে হেঁটেই বাবার বাড়ি এসেছে।বলতে হবে পায়ে জোর আছে তার।নয়তো যেখানে সবার আধা ঘন্টা সময় লাগে সেখানে প্রীতি বিশ মিনিটেই চলে এসেছে।সারাদিন বাড়িতে মা আর দাদিকে জ্বালিয়ে মেরেছে।মেয়ের এমন দস্যিপনায় প্রীতির মা মুখে মুখে যতই বিরক্তি প্রকাশ করুকনা কেনো অন্তর থেকে এতদিন মেয়েটার দুষ্টুমিগুলোকেই স্মরণ করেছেন।

দুপুরে সবাই ভাতঘুম দিলেও প্রীতি ঘুমোয়নি।চলল তার প্রাণ প্রিয় স্বপ্না আপার বাড়ি।রাস্তার পর একটা ক্ষেত পেরিয়ে স্বপ্নাদের বাড়িতে পৌঁছালো।সেখানে গিয়েই শুনলো স্বপ্নার দ্বিতীয়বার বিয়ের কথা চলছে।স্বপ্নার মা বললেন,তুই একটু বুঝাতো তোর স্বপ্না আপাকে।এভাবে আর কতদিন ওকে ঘরে ধরে রাখবো?তাছাড়া বিধবা মেয়েদেরকে কেউ বিয়ে করেনা।ওকে রূপের গুণে বিয়ে করতে চাইছে এটাই ওর সৌভাগ্য।
স্বপ্নার মায়ের কথায় প্রীতির মনঃক্ষুণ্ন হলো।এভাবে কেনো বলছেন চাচি?বিধবা বলে কি স্বপ্না আপা মানুষ না?তাদের কি স্বপ্ন দেখা বারণ?
তুমিইতো বললে রূপের গুণে তার জন্য সমন্ধ এসেছে তাহলে এটাকে কি করে তার সৌভাগ্য বলা যায়?রূপ দেখেইতো স্বপ্না আপাকে বিয়ে করতে চাইছে।আজ যদি তার রূপের ছিটেফোঁটা ও না থাকতো।তখন যদি কেউ বিয়ের প্রস্তাব দিতো ভালোবেসে তখন বলা যেতো সৌভাগ্য।
স্বপ্নার মা বিরক্ত হয়ে বললেন,দুদিনের পিচ্চি মেয়ে হয়ে জ্ঞান দিসনা আমাকে।পারলে স্বপ্নাকে বুঝা যাতে বিয়েতে রাজি হয়।আমাদেরতো আর তোর বাপের মতো টাকার পাহাড় নেই যে ওকে ঘরে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াবো।

প্রীতি থমথমে মুখে কোনার ছোট্ট রুমে প্রবেশ করলো।স্বপ্না সব কিছুই এতক্ষণ শুনছিলো।প্রীতি রুমে প্রবেশ করতেই স্বপ্না বিরস মুখে বলল,কেনো কথা বলতে যাস তুই?
একটা সময় মেয়েরা বাপের বাড়ির জন্য পর হয়ে যায়।বিয়ে দিলে সব ঝামেলা শেষ।বিয়ের পর আবার বাপের বাড়িতে উঠলে বাবা মায়ের মাথায় আগের তুলনায় দ্বিগুণ ভারী বোঝা চেপে বসে।আচ্ছা আমার দোষটা কোথায়?তারা কেউ বুঝার চেষ্টা করেছে আমি কেনো বিয়ে করতে চাইনা?যার তার সাথে বিয়ে দিয়ে দিতে পারলেই তারা বেঁচে যায়।
সম্পর্ক তৈরিতে মন থাকা লাগে।হৃদয়ের টান লাগে।আমার ভেতর থেকে সেই টান আসছেনা।তাহলে কেনো আমি অজানা সম্পর্কে পা বাড়াবো?

প্রীতি স্বপ্নার কথা মনযোগ দিয়ে শুনে আপন ভাবনায় মত্ত হয়ে গেলো।আচ্ছা আমার আর রূপকের সম্পর্কে টান আছে?হৃদয়ের গভীর থেকে উনি আমায় ভালোবাসেন?
মুহূর্তেই ম্লান মুখে নিজেই নিজেকে বলল,আমি কথা না শুনলেতো আমাকে ভালোইবাসবেননা।
স্বপ্না প্রীতিকে বলল,তোর চুলগুলোর এই অবস্থা কেনো?তেল দিস না চুলে?আয় আমার সামনে বস আমি তেল দিয়ে বেনুনি করে দেবো।
প্রীতি এক লাফে সরে গিয়ে বলল,নাহ আমি চুলে তেল দেবোনা।টিভিতে দেখোনা নায়িকারা এরকম শুকনো চুল বাতাসে উড়িয়ে হাঁটে আর নায়করা নায়িকার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে?
তাই আমিও চুলে তেল দেবোনা।বাতাসে চুল উড়িয়ে হাঁটবো আর উনি আমার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকবেন।
স্বপ্না মুখ টিপে হেসে বলল,তারা চুলে কতকিছু ব্যবহার করে।তাই তাদের চুল বেশি সুন্দর দেখায়।এখন চুপচাপ বস আমি তেল দিয়ে দিচ্ছি।আজকে তোকে পুরো পাগলীর মতো লাগছে।
প্রীতি মুখ কালো করে বলল,আচ্ছা তাহলে তেল লাগিয়েই দাও।
স্বপ্না সুন্দর করে তেল দিয়ে প্রীতির চুলে বেনুনি করে দিলো।লম্বা বেনুনি ঝুলিয়ে আবার বাড়িতে আসলো প্রীতি।শাশুড়ী বিকেলের মধ্যেই ফিরে যেতে বলেছেন।
বাড়িতে ঢুকে বাবা আর ভাইকে দেখলো প্রীতি।রাজিব শেখ প্রীতিকে কাছে ঢেকে কপালে চুমু দিয়ে বললেন,এই গগন ফাটানো রোদের মধ্যে কোথায় গেছে আমার আম্মাজান?
প্রীতি বাবাকে জরিয়ে ধরে বলল,স্বপ্না আপার কাছে গেছি।তার নাকি এখন আবার বিয়ের কথাবার্তা চলতেছে।
ফারুখ কিছু না বলেই বাড়ি থেকে হনহনিয়ে বেরিয়ে গেলো।
প্রীতি বাবার কাছ থেকে সরে এসে বলল,আমাকে যেতে হবে বাবা।আম্মা বলেছে বিকেলের মধ্যেই চলে যেতে।উনাকেও বলে আসিনি।রাজিব শেখ বললেন,আচ্ছা তুই বোরকা পড়ে নে আমি রিকশা ডেকে দিচ্ছি।প্রীতি বলল,তার আর দরকার হবেনা আমি এমনিতেই চলে যেতে পারবো।
রাজিব শেখ আর কিছু বললেননা।মেয়ের কোনো কথাই ফেলতে পারেননা তিনি।
প্রীতি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় রাস্তার পাশে বাদাম বিক্রি হচ্ছে দেখে থামলো।হাজেরা বেগম সকালে কিছু টাকা দিয়েছিলেন গাড়ি দিয়ে আসার জন্য।সেখান থেকে একটা নোট নিয়ে বাদাম কিনে বাড়িতে হাঁটা ধরলো প্রীতি।অর্ধেক রাস্তা যেতেই রূপকের সামনে পড়লো।রূপক জিপ চালিয়ে বাড়ির দিকেই যাচ্ছিলো।রাস্তায় বোরকা পড়া প্রীতিকে দেখে গাড়ি থামিয়ে এক ধমক দিলো।
তুমি এখানে কেনো?কোথায় যাচ্ছো তুমি?
প্রীতি প্রথমে ভয় পেলেও সব ভয় পাশ কাটিয়ে জবাব দিলো,বাবার বাড়িতে গিয়েছি আম্মা অনুমতি দিয়েছেন।রূপক রেগে বলল,এখন থেকে আমাকে না বলে কোথাও যাবেনা তুমি।কাল রাতে কি বলেছিলে ভুলে গেছো?এইটা তোমার সব কথা শোনার নমুনা?
প্রীতি মাথা নামিয়ে চাপা স্বরে বলল,আর হবেনা ভুল।রূপক প্রীতির হাত ধরে গাড়িতে নিয়ে বসায়।

বাড়িতে এসে রূপক ওয়াশরুমে ঢুকে যায় গোসল করার জন্য।ঘেমে চুপচুপে হয়ে গেছে পুরো শরীর।প্রীতি বোরকা খুলে নিচে নেমে আসে।কেউ কলিং বেল চাপ দিতেই রুবি গিয়ে দরজা খুলে দিলো।দুজন লোক ধরাধরি করে কিছু ভেতরে নিয়ে ঢুকছে।প্রীতি উঁকি মেরে দেখছে কে এসেছে।রূপক সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এসে লোকগুলোকে বললো দোলনা ছাদে নিয়ে যেতে।রুবি অবাক হয়ে তাকালো।প্রীতি খুশিতে হাত তালি দিয়ে লাফিয়ে উঠলো।হাজেরা বেগম নেমে এসে বললেন,কে এসেছে রে?
বাসায় দোলনা দেখে বললেন,এটা কে আনলো।রূপক প্রীতির দিকে একপলক তাকিয়ে বলল,ছাদে একটা দোলনার প্রয়োজন আছে।মাঝেমধ্যে বসা যাবে।
প্রীতির দিকে তাকানো দেখে হাজেরা বেগম ঠিকই বুঝলেন দোলনাটা প্রীতির জন্য আনা।কালকে শাড়ি নিয়ে প্রীতিকে দৌঁড়ে ছাদে যেতে দেখেছিলেন উনি।

দোলনা সেট করে দিয়ে লোকদুটো চলে যেতেই প্রীতি চুপিচুপি ছাদে গিয়ে দোলনায় বসলো।রূপক পকেটে হাত গুঁজে ছাদের দরজার সামনে দাড়িয়ে মুচকি হাসলো।
কোমল কন্ঠে বলল,পছন্দ হয়েছে?প্রীতি দুলতে দুলতে বলল,খুব পছন্দ হয়েছে।রূপক পেছন দিকে গিয়ে দোলনায় ধাক্কা দিলো।
তুমি যদি আমার সব কথা শুনো তাহলে আমিও তোমার সব ইচ্ছে পূরণ করবো।তাড়াতাড়ি নিচে নেমে এসো।বেশিক্ষণ ছাদে থাকার দরকার নেই।আমি যাচ্ছি।
——————————————★

রাতের আধারে ফারুখ ছুটলো স্বপ্নাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে।সারাদিন কিভাবে কেটেছে একমাত্র ফারুখ জানে।অপেক্ষায় ছিলো কখন রাত হবে আর কখন স্বপ্নার সান্নিধ্যে আসতে পারবে।
প্রতিদিনের ন্যায় আজ আর স্বপ্না জানালা খুলে রাখেনি।আজ জানালা বন্ধ দেখে রূপক জানালায় টোকা দিলো।স্বপ্নার কলিজা ধুকপুক করে উঠলো।সে জানালার পাশেই দাড়ানো কিন্তু আওয়াজ করছেনা।ফারুখ বজ্র কন্ঠে বলল,আমি জানি তুমি এখানেই জানালার পাশে আছো জানালা খোলো।স্বপ্না চোখ খিঁচিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।

ফারুখ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,আমার ক্ষতবিক্ষত হৃদয়কে আরো ক্ষতবিক্ষত,রক্তাক্ত করে দিয়ে অন্যকারো হৃদয়ে মলম লাগাতে যাবে?আর আমি এত সহজে সব কিছু ছেড়ে বসে থাকবো?তুমি যদি এই বিয়েতে মত দাও খোদার কসম আমি সব কিছু জ্বালিয়ে দেবো।কোনোদিন তোমার উপর জোর খাটাইনি।তোমার মতামতকে সম্মান জানিয়েছি তাই বলে এটা ভেবোনা তুমি বিয়ে করে চলে যাবে আর আমি বসে বসে দুঃখ বিলাস করবো।উহু সেই দুঃখের সাগরে তোমাকেও ডুবিয়ে মারবো আমি একলা মরবোনা।
তাড়াতাড়ি জানালা খোলো নয়তো আমি তোমাদের সদর দরজায় গিয়ে ধাক্কা দেবো।স্বপ্না চোখ বন্ধ করে এক নিঃশ্বাসে বলে দিলো,আমি বিয়েতে এখনো মত দেইনি।
ফারুখ মুহুর্তেই শান্ত হয়ে গেলো।কন্ঠে কোমলতা বিরাজ করছে।নরম কন্ঠে বলল,একটাবার জানালা খুলবে?একবার শুধু দেখবো প্লিজ।হয়তো এটাই তোমার আর আমার শেষ দেখা।স্বপ্নার কলিজা কেপে ওঠে।আস্তে আস্তে জানালা খুলে মাথানিচু করে দাঁড়ায়।ফারুখ একপলক দেখেই আর দাঁড়ালোনা চলে গেলো।স্বপ্না জানালা বন্ধ করে খাটে গিয়ে বসলো।
আল্লাহ তুমি আমাকে এই কেমন পরীক্ষায় ফেললে।আমি চাইনা আমার দ্বারা কোনো ভুল হোক।তুমি আমায় সঠিক পথ দেখাও।

কলেজ থেকে বইয়ের লিস্ট দিয়েছে।প্রীতি সেই লিস্ট বাড়িয়ে দিলো রূপকের দিকে।যাতে কালকে বই এনে দেয়।
স্বপ্নার করে দেওয়া লম্বা বেনুনি ঝুলিয়ে প্রীতি এসে খাটে বসলো।রূপক হাঁটার সাথে দোল খাওয়া লম্বা বেনুনিটা মনযোগ সহকারে দেখছে।বেনুনি করা শিখে নিয়ে একদিন প্রীতির চুলে বেনুনি করে দিবে বলে ভেবে নিয়েছে রূপক।
#চলবে….