#কারণে_অকারণে_ভালোবাসি02
#সুরাইয়া_আয়াত
২২.
ঘুম ভাঙতেই শরীরে একপ্রকার ম্যাজম্যাজে ব্যাথা অনুভব হতেই চোখ মেলে তাকালো আরু। মুখটা স্বল্প উচুঁ করে আরিশের মুখের দিকে তাকালো ও। আরিশের দিকে তাকাতেই আরিশের সাথে চোখাচোখি হলো। আরিশ্ ওর দিকেই তাকিয়ে আছে।
আরু দৃষ্টি নামিয়ে নিয়ে ঠান্ডা কন্ঠে বলল
— আমি কতখন ধরে ঘুমাচ্ছিলাম মি অভদ্র!
আরিশ উত্তর দিলো না। আরু এবার কন্ঠে তেজ এনে খানিকটা জোরে বলে উঠলো
— আমি কতখন ঘুমালাম বলতে পারেন? মনে তো হচ্ছে সকাল হয়ে গেছে।
আরিশ নির্বিকারে আচমকায় আরুর ঠোঁটে তার ঠোঁটের স্পর্শ দিতেই আরু চমকে উঠলো। তড়িৎ গতিতে শরীরের মাঝে লজ্জামাখা এক জড়তা ছেয়ে গেল। আরুর ঠোঁট কাঁপছে, বুকের ধুকপুকানি বাড়ছে।
হঠাৎ আরুর জড়তা কাটিয়ে আরিশ বলল
— এটা হলো আমার দৃষ্টিভ্রম করার পানিশমেন্ট।
আরু অবাক চাহনিতে আরিশের দিকে তাকিয়ে মিনমিনে সুরে বলল
— মানে?
আরিশ এবার আরু কে আগের তুলনায় আরও বেশি শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। আরু খেয়াল করলো যে সে ঘুমানোর আগে আরিশের কোলে ঠিক যেমন ভাবে বসে ছিলো এখনও ঠিক তেমন ভাবেই বসে আছে।
আরুর কল্পনার মাধ্যে আরিশ যে সবসময় বাঁধা দেই তা আর বলার ধার ধারে না, তেমনটাই হলো। আরুর ভাবনা ভাঙিয়ে আরিশ বলল
— ঘড়ির কাটা যদি ভুল না বলে তবে সকাল ১১.২৪ এ তুমি ঘুমিয়েছিলে আর এখন বাজে দুপুর ১.৪৫।
আরু চোখ নামিয়ে আধো আধো কন্ঠে বলল
— সে না হয় আমি ঘুমিয়েছি কিন্তু আপনার দৃষ্টিভ্রম আমি কি করে করলাম।
— এই যে টানা এতখন যে আমি একদৃষ্টিতে অমি তোমার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। বেশ তো লাগছিলো। কেন ঘোর কাটালে।
আরুর মনের মাঝে অদ্ভুত এক অনুভূতি হলো। আরু দু হাত দিয়ে চোখ ঢেকে বলল
— ইশ লজ্জা!
আরিশ এবার না হেসে পারলো না। একহাত দিয়ে আরুর হাত চোখ থেকে সরিয়ে দিয়ে বলল
— মিসেস ড্রামা কুইন যে লজ্জা পায় সেটা আগে জানা ছিলো না আমার। লজ্জা পাওয়ার ফিচারস টাও যে তোমার মাঝে বিরজমান ভেবে খুশি হলাম। আমি তো ভেবেছিলাম লজ্জা নামক জিনিসটা তার লজ্জায় তোমাকে ছেড়ে পালিয়েছে।
আরু হঠাৎ আরিশের খোঁচাখোঁচা দাঁড়ি টেনে বলল
— আমার না একটা ডাউট আছে। ক্লিয়ার করবেন একটু ডাউট টা।
আরিশ বেশ মাথা নাড়িয়ে বলল
— হমমম হমমম হমমম।
আরু ভ্রু কুঁচকে বলল
— আপনি তো আগে সর্বদা জল্লাদগিরি করতেন আমার সাথে, আর এই কদিন আমি বেশ লক্ষ করছি যে আপনার মাঝে অদ্ভুত এক চেন্জ।
আরিশ অবাক হয়ে বলল
— লাইক!
আরু তখন খানিকটা ভাবুক সুরে বলল
— লাইক এই যে আপনি এতো মিষ্টি মিষ্টি কথা বলছেন, সবার সামনে প্রপোজ ট্রপোজ ও করছেন, আমার সাথে এতো কিউট কিউট করে কথা বলছেন। আর সবচেয়ে খারাপ হলো কোনরকম অভদ্রগিরি করছেন না, আগের মতো বকাঝকা ও দিচ্ছেন না একদম পির আউলিয়া টাইপের হয়ে গেছেন আপনি। বাট আপনাকে এমনটা কি মানায়? জাতীয় অভদ্র যদি এখন পির আউলিয়া টাইপ ভাব নেয় তখন আমার মনের মধ্যে কি হয় বলুন তো।
আরিশ ধমকের সুরে বলল
— সো হোয়াট!
— সো হোয়াট ফোয়াট না। আপনাকে এমন ভালো মানুষ হয়ে থাকতে দেখে আপনার কি ভালো লাগবে জানি না তবে আমারই ভালো লাগছে না। আই মিস ইউর বকাঝকা।
আরিশ এবার আরু কে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে বলল
— আজাইরা কথা বলতে তোমার খুব ভালো লাগে? আর একটাও কথা না, নো মোর ওয়ার্ডস।
এতখনে বোধহয় আমাদেরকে খোঁজার জন্য চিরুনি তল্লাশি শুরু হয়ে গেছে। চলো এখন।
কথাটা বলে আরুর হাত ধরে নিয়ে যেতে গেলেই আরু বলে উঠলো
— মি অভদ্র!
আরিশ পিছন ঘুরে তাকিয়ে আবার বলল
— বলেছি না নো মোর ওয়ার্ডস। তারমানে আর একটাও কথা না চলো।
আরিশের কথার তোয়াক্কা করে কে! আরু তো আরুই।
— আমার কেন জানি না সন্দেহ হচ্ছে।
আরিশ এবার বিরক্ত হয়ে আরুর হাতটা ছেড়ে হাতে হাত গুটিয়ে বলল
— হমমম তা আপনার কি সন্দেহ হচ্ছে কাইন্ডলি যদি এক্সপ্লেইন করেন।
আরু গুটিগুটি পায়ে আরিশ কে ছাড়িয়ে দরজার দিকে এগিয়ে বলল
— আমার তো মনে হয় আপনি রাত দিন বউ পটানোর টিউটোরিয়াল দেখেন। কোন কোর্স ও কমপ্লিট করেছেন বোধহয় তাই তো এতো ইমপ্রেসিভ হয়ে গেছেন। বাট আমি কিন্তু আপনার অপর ক্রাশ ট্রাশ খাইনি।
কথাটা বলে আরু হো হো করে হেসে দৌড় দিলো আরু। আরিশ আরু কে ধরতে গেলেই আরু পালালো। আরিশ ও আরুর পিছনে দৌড়াতে লাগলো
— দাঁড়াও নাহলে আজ ধরতে পারলে তোমার খবর আছে। আমি বউ পটানোর টিউটোরিয়াল দেখি হু! আজ হচ্ছে তোমার।
আরু একবার জিভ ভাঙচি দিয়ে বলল
— না না না না না। আপনি অভদ্র পচা। এতো ভালো মানুষ হচ্ছেন কেন। এরকম ভাল্লাগেনা আপনাকে। আপনি রিজেক্ট। নতুন জামাই লাগবে আমার। টাটা।
কথাটা বলে আরু উঠানের বাইরে চলে গেল।
আরিশ আর দৌড়ালো না। স্বাভাবিক হয়ে রুমে চলে গেল, রূমে গিয়ে দরজা দিয়ে একটা পেটফাটা হাসি দিয়ে উঠলো। আর নিজের মনেই বলল
— টিউটোরিয়াল! লাইক সিরিয়াসলি। এমন উদ্ভট কথা তোমার পক্ষেই বলা পসিবল। লাভ ইউ মিস টুইটুই। এমনটাই থেকো।
………
— তুমি এতখন কোথায় ছিলে অরিও! ফুপি তোমাকে কতখন ধরে খুঁজছে তোমার হিসাব আছে!যাও দেখো কেমন বকা দেয় তোমাকে।
কথাগুলো একপ্রকার সতর্কতা বানী হিসেবে দিলো আরুকে। মধুকে দেখে মনে হলো সে গোসল সেরে অনেক আগেই গোছগাছ করে রেডি শুধু হলুদের অপেক্ষা। তাকে দেখে আরুর বিন্দুমাত্র মনে হলো না যে সে ভয় পেয়ে আছে। সুতারাং সে মধুর দিকে ভ্রু কুঁচকে একবার মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে বলল
— হমম বুঝলাম। আম্মু কই?
— ফুপি তো আম্মুর ঘরে, তোমার শাশুড়িআম্মুর সাথে আছে। তোমার শাশুড়ি আম্মুও তো তোমাকে সেই থেকে খুঁজছে। তোমাকে আর আরিশ ভাইয়াকে পাওয়া যাচ্ছে না দেখে সবাই চিন্তায় শেষ। আর এদিকে আমার চিন্তায় আমি! উফফ আর পারি না।
আরু হঠাৎ করে বলল
— উইইইহহহ! ওরম মনে হয়। ভিতরে ভিতরে তোমার খুশির যে শেষ নেই তা আমি বুঝি। তোমাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে তা।
হঠাৎ মধু আরুর গা ঘেষে দাঁড়িয়ে বলল
— সত্যি অরিও? আমাকে দেখে কি বোঝা যাচ্ছে যে আমি খুশি? কি করে এখন কি করি! দেখো আমি চাইছি না যে সবাই বুঝুক আমি খুশি। আমি চায় সবাই ভাবুক বিয়ে নিয়ে আমি অনেক ভয়ে আছি।
আরু ফিক করে হেসে দিলো। মধুর মাথায় একটা আলতো হাতে চাটি দিয়ে বলল
— জন্মের নাড়ি কাটার পর থেকেই যে তুমি পেকে গেছো তা আমার বুঝতে বাকি নেই। এখন একটু ভয় পাওয়ার অভিনয় করো। আমি আসছি।
কথাটা বলে আরু চলে গেল। গান করতে করতে ঘরে ঢুকতেই দেখলো সানা বিছানার ওপর পায়ে পা তুলে বসে আছে আর ফোনের দিকে তাকিয়ে, মুখে গম্ভীরতার ছাপ স্পষ্ট। আরু সানার দিক থেকে চোখ সরিয়ে আফসানা বেগমের কাছে গিয়ে বলল
— আম্মু ডাকছিলে?
উনি আচমকা আরুর কান মলা দিয়ে বললেন
— এতখন কোথায় ছিলে তুমি আরু? আমরা তো খুঁজতে খুঁজতে হয়রান।
আরু কান ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল
— আহ আম্মু ছাড়ো না। লাগছে তো। সবার সামনে এভাবে বকা দিচ্ছো হু! সবাই দখছি চেন্জ। কেও ডেভিল থেকে পীর আউলিয়া আর কেও পীর আউলিয়া থেকে ডেভিল।
অনিকা বেগম বলে উঠলেন
— আফসানা তুই ওকে ছাড়, ওকে আমার সাথে বোঝাপড়া করতে দে।
আফসানা বেগম কান ছাড়লেই আরু অনিকা খানকে জড়িয়ে ধরে ওনার গালে একটা চুমু দিয়ে বলল
— শাশুড়িআম্মু তুমি তো আমার উইইইমা টুইটুই টাইপের বলো। তুমি এখন বকোনা প্লিজ। আমি তো ঘুমাচ্ছিলাম নানাভাইয়ের ঘরে।
অনিকা খান বাকা চোখে তাকিয়ে বললেন
— আর আরিশ! সে কি বউ ছেড়ে যাওয়ার শোকে পাগল হয়ে ঘুরে বেডাচ্ছে নাকি!
আরু মুখ টিপে হেসে বলল
— অনেকটা তাই ফুপি। উনি না কেমন যেন হয়ে গেছেন 😕। আমার তো ভয় হচ্ছে উনি পাগল টাগল হয়ে গেল কিনা।
অনিকা খান আর আফসানা বেগম একসাথে বলে উঠলেন
— কেন কেন কেন?
— আর বলো না। উনি কেমন ভদ্র টাইপের হয়ে গেছে। আমার দেওয়া মি অভদ্র ট্যাগটা এভাবে বিফলে যাবে বলো! যেদিন থেকে বলেছে সিঙ্গাপুর যাবে সেদিন থেকে এমন ভালো মানুষ হয়ে গেছে। আর এটা যে আমার সহ্য হচ্ছে না। ওনাকে বিরক্ত করার দ্বিগুন ইচ্ছা চাপছে মনে কিন্তু উনি সে সুযোগ ই দিচ্ছে না।
কথাটা বলে আরু একটা উদা্স ভাব নিতেই অনিকা খান বললেন
— আয় এবার আমি তোর কানটা মলে দিই। আমার ছেলেকে এরকম বলা হু।
আরু ওনাকে জড়িয়ে ধরে বললেন
— উনি সিঙ্গাপুর গেলে আমরা অনেক ঘুরতে যাবো বুঝলে তো শাশুড়িআম্মু, হাতিরঝিল, গুলশান, বনানী। পুরো বাংলাদেশ জমির মতো চষে বেড়াবো আর পড়াশোনা চাঙ্গে। আমি জানি তুমিও ওনার ভয়ে বাইরের খাবার বেশি খাও না। বাড়িতে ডক্টর থাকলে এমনই হয়। যদিও আমি আর ননদীনি ওমন ডেভিল ডক্টর নই তোমার ছেলের মতো। আমরা তো মহান ডক্টর, লাইক মহান।
সানা যেন আরুর কথাতে কোন ভাব পরিক্রিয়া দিল না। সে আরুর ওপর রেগে আছে।
আফসানা বেগম বললেন
— তা আমার পীর আউলিয়া জামাই কই! সে তো কিছু খাইনি। তাকে ডেকে এনে খাওয়ার ব্যাবস্থা কর।
আরু হাত ঝাকিয়ে বলল
— না না এসব আমি পারবো না। তোমার মেয়ের জামাই তুমি খাতির আপ্যায়ন করো। আমি অতো ভালো বউ হয়ে কাজ করতে পারবো না, আমার অভ্যাস নেই অতো। ওনাকে ডাকো। আমার ক্ষুদা লেগেছে। বলো আমাকে খাইয়ে দিতে।
আফসানা বেগম ঘর থেকে বার হতে হতে বললেন
— আরিশটা বেশি মাথায় তুলে মেয়েটাকে একদম বাঁদর বানিয়েছে।
ওনারা দুজনেই বেরিয়ে গেলেন।
সানা চুপচাপ বিছানায় বসে আছে। আরুর দিকে তার নজর নেই। আরু হঠাৎই গান ধরলো
— লা লা লা লালা লালা।
বলে ওর শাড়ির আঁচলটা সানার ফোনের ওপর ফেলতে লাগলো তো কখনো সানার মুখের ওপর। যাতে সানা বিরক্ত হয় আর কথা বলে ওর সাথে।
লালা লা লা লালা করে ঘুরপাক খেতে লাগলো আরু সানার আশেপাশে।
হঠাৎ সানা রেগে বলল
— ভাইয়ার মাথা খেয়ে পেট ভরেনি? এখন আমি। আরু থাম। ভাল লাগেছে না আমার।
আরু সানার পাশে বসে বলল
— ভালো কেন লাগছেনা আর সেই ভালো না লাগার কারণটাই তো জানতে চাইছি ননদিনী।
সানার আরুর দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে বলল
–উনাকে এই বিয়েতে ইনভাইট কে করেছে? সত্যি করে বল আরু। তুই নাকি ভাইয়া?
সানার কথা শুনে আরু মুচকি হাসতে হাসতে বলল — এটা আমাদের দুজনেরই প্ল্যান। দেখ তোকে আমি বোঝাই একটা কথা। আর যাই হোক তোকে ভালো কিছুই বলবো। শোন, আমি তোর ভাইয়া একটা কাপল, ইভেন এই বিয়ে বাড়িতে যতজনকে সন্ধ্যায় দেখবি সবাই কাপল। সিঙ্গল মানুষ তোর চোখে পড়বেই না। আর তুই তো আধা মিঙ্গেল। বিয়ে তো ঠিক হয়েই আছে ভাইয়ার সাথে।
আশেপাশে সবাই জোড়া জোড়া থাকবে হলুদ খেলবে আর তুই একা থাকবে এটা কেমন না তাই ভাবলাম তোর এই নিসঙ্গতা দূর করার জন্য আরাভ ভাইয়াই কাফি। তাই তো ডাকলাম। দারুন আইডিয়া না?
সানা আরুর কান মলে বলল
–তাই না তাই!
— তুই জানিস না যে সে আসলে সারাদিন আমাকে তার সাথে আঠার মতো চিপকে থাকতে হবে লাইক ইউ। ভাইয়া যেমন তোকে ছাড়া একটা কদম ও এগোয় না তেমন। তোর এসব ভালো লাগতে পারে আমার লাগে না। কোথায় ভাবলাম এখানে এসে একটু একা একা থাকবো তা না।
আরু বিরক্ত ভাব নিয়ে বলল
— সবাই আমাকে কান মলে দিচ্ছে আজ। আর দিন শেষে মি অভদ্র কানে একটা কামড় দেবে ব্যাস আমি শেষ।
আরু তুড়ি মারতে মারতে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল
— শুধু আমি একা কেন প্যারা খাবো হু। তুমিও খাও চান্দু। আব আয়া না মাজা। তুমি মাত্র একমাস আরাভ ভাইয়ার প্যারা সহ্য করেছো আর আমি? পুরো উনিশ বছর। এবার দেখ কেমন লাগে চান্দু। লা লা লা লা লা লালা।
#চলবে,,,, Suraiya Aayat আরিয়া
#কারণে_অকারণে_ভালোবাসি০২
#সুরাইয়া_আয়াত
২৩.
— কতখন ধরে ডাকছি শুনতে পাচ্ছো না? নাকি ভালো ভাবে বললেও কথা তোমার কানে পৌছায় না কোনটা?
ধমকের সুরে কথাগুলো বলতেই আরু হাত ছাড়িয়ে নিলো। আরুর দু বাহু শক্ত করে চেপে ধরে কথাগুলো ঝা্ঝালো কন্ঠে বলছিলো আরিশ। আরিশের থেকে হাত ছাড়িয়ে সোফাতে বলে গাল ফুলিয়ে বলল
— আসছিলাম না মানে নিশ্চয়ই শুনতে পাচ্ছিলাম না, তাই বলে আপনি ওভাবে সবার সামনে থেকে হাত ধরে টেনে নিয়ে চলে আসবেন! সবাই কি ভাবলো!
আরিশ আরুকে সোফা থেকে টেনে তুলে বলল
— ইউ নো কে কি ভাবলো আই ডোন্ট কেয়ার। কে বউ পাগল ভাবলো নাকি তাবিজ করেছে ভাবলো তা আমার যায় আসে না। আমি যখন ডাকছি তখন তোমাকে আসতেই হবে এনি হাও।
আরু আরিশের থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে অবাধ্য কন্ঠে বলল
— শুনবো না। আর কিছু? এবার ছাড়ুন আমি হাতে ব্যাথা পাচ্ছি।
আরুর এমন কথা শুনে আরিশ আরুর হাতটা ধরে ছেড়ে দিতেই আরু বেসামাল হয়ে পড়ে যেতে নিয়েও সামলে নিলো। বুঝতে পারলো যে আরিশ ওকে ধরে ছিলো দেখে ও আরিশের ওপরই নিজের ভর ছেড়ে দিয়েছিল। আরিশের ওপর ও এতোটা নির্ভরশীল!
রেগে গিয়ে বলে উঠলো
— এভাবে ছাড়লেন কেন? আমি যদি পড়ে যেতাম!
কথাটা বলে পিছন ঘুরতেই দেখলো আরিশ রুমে নেই সে বেরিয়ে গেছে।
— যাহ বাবা চলে গেল। গেলে গেল আমার কি। আমি তো আর এমনি এমনি উত্তর দিইনি। আন্টি গুলো কিসব কিসব অদ্ভুত প্রশ্ন করছিলো তাই তো বাধ্য হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আর ওনার ডাকে হুঠহাঠ করে চলে আসলেই গোপনে যে ওনাকে বউ পাগলের ট্যাগ দিয়ে দিতো সেটা কি উনি বোঝে না। হুহ! আমাকে রাগ দেখিয়ে কিছু হবে না। না বললে না কথা বলবে আমার বয়েই গেছে। আমিও দেখবো কতখন আমার ওপর রাগ দেখিয়ে থাকে।
কথাটা বলে আরু রেডি হতে শুরু করলো।
,,,,,,,
গ্ৰামের শান্ত পরিবেশ। শহরে শীতকালীন ঠান্ডাটা ঠিক অনুভব করা যায় না যতোটা টা গ্ৰামে অনুভব কথা যায়। শীতে শরিষা ক্ষেতের ফুলের রেনুর মিষ্টি সুগন্ধও এখানে বাতাসের সাথে বয়ে আসে। ঘন কুয়াশায় কোনটা আল আর কোনটা মাঠ বোঝা মুশকিল। সন্ধ্যা সাতটা বাজলেই যে যার ঘরে আর রাস্তার নির্জনতায় দু চারটে কুকুরের ঘেউঘেউ ঢাক ছাড়া বিশেষ কিছু নেই।
বিয়ে বাড়ির গেটটা যেখানে শেষ হয়েছে তার কিছুটা দূরেই বড়ো রাস্তা। সেখান দিয়েই মানুষের চলাচল। আরিশ গটগট করে হাটতে হাটতে রাস্তার ধারে এলো। রাগের বশে পারলে সবটা ভাঙচুর করে এমন একটা পরিস্থিতি।
রাস্তার ধারে আরিশ এসে দাঁড়ালো। ভীষন কাঁপছে সে, শীতে নয় রাগে, আরূর ওপর ও নয় তবে নিজের ওপর রাগ যে রাগ ওর সহজে কমবার নয়।
ফোনটা বার করে কাঁপাকাঁপা হাতে আরাভের নাম্বারে ডায়াল করতেই প্রথম বার ওপর পাশ থেকে বলে উঠলো
— যে নাম্বারে আপনি কল করছেন সেটি এখন ব্যাস্ত রয়েছে।
বাকিটুকু শোনার প্রয়োজন বোধ করলো না। দাঁত কিড়কিড় করে বলল
— আমার দরকারেই ওনার প্রেম প্রেম পায় খালি।
কথাটা শেষ হতে নিতেই আরিশ পুনরায় ফোন ধরালো।
তবে এবার আর কোনরুপ ব্যাস্ততা বা দেরি নয় সঙ্গে সঙ্গেই ফোনটা ধরলো আরাভ।
ফোন ধরা মাত্রই অপর পাশ থেকে আরিশ কাঠ ফাঁটা কন্ঠে প্রশ্ন করলো
— শালা সারাদিন কি প্রেম করা লাগে! এবার থেকে ফোন বিজি পেলে বিয়েটা দুই বছর পর না পাঁচ বছরে গিয়ে দাঁড়াবে বলে দিলাম।
আরাভ মৃদু হেসে বলল
— আম্মুর সাথে কথা বলছিলাম। সন্ধ্যার ওষুধটা খেয়েছে কি জিঞ্জাসা করছিলাম। আর তুই আমার প্রেমের মাঝে ভিলেন হচ্ছিস কেন রে! তোর আর ভাবীর প্রেম কাহিনীতে কি ভিলেন ছিলো নাকি যে আমার প্রেমে কাঠি করছিস।
আরিশ উত্তর দিলো না, প্রশ্নটাকে এড়িয়ে বলল
— কখন আসছিস?
— এই তো হাই ওয়ে তে আছি এখান থেকে লোকেশনে দেখাচ্ছে পাঁচ মিনিট। এখান থেকে ছোট রাস্তাটায় নামবো তাই তো?
আরিশ আগের তুলনায় বেশ রাগী কন্ঠে বলল
— যে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আসবি আই তবে পাঁচ মিনিটের বেশি যেন দেরি না হয়।
কথাটা বলে আরিশ রেখে দিল।
আরাভ আরিশের কথা বলার ধরন শুনে বলল
— এভাবে কথা বলছিস কোন সমস্যা?
অনেকখন উত্তর এর আশায় রইলো আরাভ কিন্তু উত্তর না পেয়ে বুঝলো যে কলটা কেটে গেছে আগেই।
আরাভ গাড়ি চালানোর কনসার্নট্রেট করলো।
কথাটা কেটে আরিশ ফোনটা ছুঁড়ে মারলো অন্ধকারে। বিয়ে বাড়ির গেটের দরজা থেকে রাস্তার দূরত্বটা প্রায় এক মিনিটের তাই অন্ধকার টাই বেশি। ফোনটা ছুঁড়ে ফেলে আরিশ মাটিতে বসে পড়লো। মাটি ঠিক নয়, খড়ের ওপর। পাশেই খড়ের গাদা। খড়ের গাদা থেকে খড় বার করার সময় যে অতিরিক্ত কিছু খড় মাটিতে পড়ে যায় সেগুলোই আশে পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ধপ করে বসে পড়লো আরিশ। হাত দিয়ে মাথাটা শক্ত করে চেপে ধরলো ও। হাতে এখনো পাঁচ মিনিট সময় আছে। যতখন না আরাভ আসে ততখন ভাববে ও।
আরিশ চোখ বন্ধ করে সেদিনের কথা মনে করতে লাগলো।
আরু সেদিন কাঁদছিলো আরিশের বুকে। আরিশের শার্টের সাথে ওর মন ভিজ ছিলো সেদিন। সহ্য করতে পারেনি তার আরু পাখির চোখের জল। আপন করে নিয়েছিলো আরু পাখিকে কিন্তু সেখানেই হয়েছিল বড়ো ভুল। আরিশ উঠে দাড়ালো। চোখের সামনে আরুর মুখ ভাসছে। মনে পড়ছে কয়েকমাস আগে ডক্টর এর বলা কথাটা যখন উনি আরুর আর একটা টিউব অপারেশনের কথা বলেছিলেন।
— আরিশ আই থিংক তুমি তোমার ওয়াইফের কন্ডিশনটা বুঝতে পারছো। সি মাইট বি ইন ডেন্জার ইফ সি কন্সিভ। অর্থাৎ একটা টিউব তো কেটে না হয় বাদ দিলাম। আর একটা সিভিয়ারলি ইন্জিওরড। কন্সিভ এর প্রথম প্রথম তো অসুবিধা হবে না কিন্তু যখন ধীরে ধীরে বেবি বড়ো হবো তখন মাঝে মাঝে হঠাৎ হঠাৎ ভীষন পেইন হতে পারে, ব্লিডিং ও হতে পারে আর এন্ড রেজাল্ট মিসক্যারেজ এন্ড আরও অনেক কিছুই হতে পারে।
কথাটা শোনার পর সেদিন আরিশ ওনার দিকে যখন অসহায় দৃষ্টিতে তাকিলেন উনি আরিশের কাধে হাত রেখে বলল
— আরে চিন্তা করো না। আমি সবচেয়ে নেগেটিভ কথাগুলো তোমাকে বললাম। হয়তো এমন কিছু নাও হতে পারে। হয়তো বেবি ঠিকমতো ডেভলপ করে ভালো ভাবে ডেলিভারিও হতে পারে।
আরিশ সেদিন চোখ নামিয়ে বিনা বাক্যে সেখান থেকে চলে এসেছিল।
আরিশ যখন চলে আসছিলো তখন উনি বলেছিলেন
— ডোন্ট ওয়ারি ইয়াং ম্যান ভালো কিছু হবে যাস্ট ইউ হ্যাভ টু পুট আ রিস্ক অন ইউর ওফাইফস লাইফ।
সবকিছু ঠিকঠাক হবে, চিন্তা করো না শুধু তোমার ওয়াইফের জীবনের ওপর ঝুকি নিতে হবে।
সেদিন আরিশের খুব কেঁদে ছিলো আর শুধু ভেবেছিল যে আরুকে কি উত্তর দেবে।
পুরোটা কথা মনে পড়তেই অরিশ কেঁপে উঠল।
মনে মনে বিড়বিড় করে বলল’ রিস্ক। আই হ্যাভ টু টেক রিস্ক তাইনা! বলাটা কতো সহজ তাইনা। উনি তো জানেন না যে আমার আরু পাখির কিছু হয়ে গেলে আমি বাঁচবো না।
কথাটা বলে আরিশ পাইচারি করতে লাগলো তীব্রগতিতে। পাঞ্জাবীর প্যান্টে খড় আর ধূলোর ছড়াছড়ি সেদিকে আরিশের খেয়াল নেই। হঠাৎ মুখের ওপর আলো পড়তেই আরিশ চোখের ওপর হাত দিয়ে আলোর গতিবেগকে প্রতিরোধ করতে চাইলো কিন্তু তা হলো না। আরাভ আরিশকে খড়ের গাদার মাঝে লক্ষ করে হর্ন দিলো। আরিশ বুঝতে পেরে দৌড়ে ছুটে গিয়ে আরাভ কে বলল
— একটা সিগারেট দে! জলদি!
আরাভ অবাক চোখে তাকালো। কি বলবে বুঝছে না। যতখনে ও ভাবতে লাগলো ততখনে আরিশ গাড়ির কাচে ধাক্কা দিয়ে বলল
— কি রে সালা বললাম না সিগারেট দে। তুই কি শুনতে পাচ্ছিসনা?
আরাভ থতমত খেয়ে বলল
— দিচ্ছি দিচ্ছি।
#চলবে,,,